এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> মিছিল খন্দকার >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
271

মিছিল খন্দকার >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।

সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

কবিতাগুচ্ছ

আ-মরি কবিতা

কী যে সমীরণ, বাঁকা বায়ু বয়, আহা!
যাহাই কুহেলী, কুয়াশাও নাকি তাহা!

সতত সে তপে; ভ্রান্তি-ছলনে ফেলে
যেন মোরা কোনো সাগরদাঁড়ির ছেলে!

আজি শ্যাম হিয়া উথলি পরানে মেশে
জোড়াসাঁকো থেকে বজরা এসেছে ভেসে?

রণে যবে মম ক্লান্ত বাঁশরি দেখো,
একা পড়ে আছি আসানসোলের সাঁকো।

ঢের দিন হায় কাটিয়ে চিলের দলে
হয়তো মরব যে কোনো ট্রামের তলে!

সম্মুখে হেরি মাস্তুলে পাঞ্জেরি –
শীতে-কুয়াশায় নোঙরে রয়েছে ফেরি।

নাঙা পদধ্বনি, দিগন্তে চলে উট-
ধ্বস্ত নীলিমা লিখে গেছে চিরকুট।

ওদিকে আয়শা মক্তব থেকে ফেরে
চুল খোলা রোদে ঘাঁই মারে মাছ ঘেড়ে।

যে স্মিত দৃশ্যে রক্তিম হলে ফল,
রসালো ভুট্টা – বসে পড়ে চঞ্চল।

দুপুর নীরবে তাকায় হালিক টোনে
‘নাও, মেগ খাও’, বলে কালিদাস ফোনে।

আমি কিনা সব খুঁটিয়ে খাওয়ার কূলে-
প্যারাসুট তেল মাখি কুন্তলে-চুলে।

শালবনের ভেতরে একা

সন্ধ্যার মন্থর আলো নদীতে ভাসতে থাকবে। ক্রমে এ মানবশরীর রূপান্তরিত হবে রাতে। মিশে যাবে চেনা কুয়াশায়। দূর থেকে বাসের গর্জন শোনা যাবে। যেন কাছেই লোকালয়। হাইওয়ে। অথচ মনে হবে পৃথিবী তো চিরকাল জনহীন ছিল। দৌড়ে চলা গাড়ির ধাতব ইঞ্জিন যে শব্দ করে, বনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা পাবে অরণ্যস্বভাব, যেন শিকারকে লক্ষ্য করে ছুটে যাওয়ার কালে কোনো অদেখা পশুর কেশর বেজে চলছে বাতাসে। এসবের মধ্যে বসে কিছুটা ভয় আর তন্দ্রাভাব নিয়ে নিজের ভেতরে তাকিয়ে বলব, চাই। বৃষ্টি নেমে আসবে সহসাই!

আমি যে তখন কাকে

একদিন সকল সন্তাপের ঝুলকালি-মাখা-মুখে বেরিয়ে পড়বো, না-ফেরার ইচ্ছা গোপন করে।
কিছুদূর গেলে মনে হবে, যে কোনো যাওয়াই মূলত ফেলে যাওয়ার বেদনাবোধ বহন করে সাথে।

পথে সন্ধ্যা আসবে রাতের পূর্বাভাস নিয়ে। কোনো নামহীন নদীর পাড়ে, ঝাউ বা কেওড়ার বনে আবহমান জোনাকিরা একই রকমভাবে জ্বলবে নিভবে জ্বলবে নিভবে জ্বলবে।

চারপাশের শব্দহীনতায় অস্থিরতা আরও চাপা হয়ে অস্থির হয়ে ধরা দেবে। বৃষ্টি আসবে ধেয়ে, চরাচর শূন্য শূন্য শূন্য করে দিয়ে। বর্ষার চাঞ্চল্যে পাশের পুকুরে, কোলায়, নদীতে পানির ফূর্তি দেখে দেখে দেখে আমি যে তখন কাকে ঘুম থেকে তুলতে চাইবো গিয়ে ডেকে!

আয়নার সাধ

কী যে খাঁ খাঁ লাগে, আঁকাবাঁকা লাগে খালি
ধরণী আমার মুখে মেখে দেয় কালি।

পথে পথে কারা বিছিয়ে রেখেছে নুড়ি!
বুক থেকে গেছে পাঁজরের হাড় চুরি।

আকাশে ছুটছে কাফনের যতো থান –
মরা মানুষেরা ফিরে পেতে চায় প্রাণ।

জীবিতেরা দেয় পাহাড়ের থেকে ঝাঁপ
গরুরা দিচ্ছে শকুনেরে অভিশাপ

ফলে তারা কিনা বিলুপ্ত প্রায় আজ,
বাজারের থেকে মাছরাঙা কেনে মাছ।

শেয়াল পাচ্ছে মুরগীকে নাকি ভয় –
সন্ধ্যা করছে সকালের অভিনয়!

রাত থেকে যতো শীৎকার ছুটে এসে
অবদমিতেরে বিষাদে ধরছে ঠেসে।

কোথা থেকে ফলে উঠে আসে হাহাকার
নিজেকে দেখবে সাধ জাগে আয়নার।

বায়বীয় ছায়া

আমাদের বাগানের স্কুলে
যে সব সুদর্শন গাছ
দুই যুগ ধরে
শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত,
পুকুরের আয়নায় তাদের ছায়া
বাতাসে যখন দোল খায়;
অবাক চোখে তাকায় মাছেরা
ছায়ার রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে।
প্রকৃত অর্থে, গাছকে তখন তারা
বায়বীয় ছায়া মনে করে!

কবিতাভাবনা

কবির কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

কবি পরিচিতি

জন্ম ২০ ডিসেম্বর ১৯৮৫, বাকেরগঞ্জ, বরিশাল। প্রকাশিত বই: মেঘ সামান্য হাসো, পুস্প আপনার জন্য ফোটে, আকাশ চাপা পরে মরে যেতে পারি।

এই সিরিজের পরবর্তী কবি রাসেল রায়হান

Share Now শেয়ার করুন