এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> রাসেল রায়হান >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
380

রাসেল রায়হান >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ 

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

রাসেল রায়হানের কবিতাগুচ্ছ

নস্টালজিয়া

কোনো এক সূর্যাস্তকালীন অনিয়ন্ত্রিত বৃষ্টিতে হেঁটে যাওয়ার সময় বিজলির চমক দেখে এই সিদ্ধান্তে আসি যে, আকাশও ধাতব। সম্ভবত আরেক ধাতুর আঘাতে ঝন ঝন করে বেজে উঠবে সে। তেমন হলে খুব ভালো জাতের কোনো বাদ্যযন্ত্র বানানো সম্ভব—ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ধারণা করি, ওখানে ওয়েল্ডিং মেশিনে কেউ একজন চিড় ধরা আকাশ ঝালাই করছে; হয়ত তারই নাম মিকাইল এবং সে নিজে কখনো বৃষ্টিতে ভেজার অনুমতি পায়নি। তার চোখও কি ওয়েল্ডিং মেশিন থেকে ছিটকে আসা উজ্জ্বল ফুলকির ঝাঁঝেই অশ্রুসিক্ত হয়, এমন সব সূর্যাস্তে?
শিরিন, আমারও পুরোনো জীবনের কথা খুব মনে পড়ে

মনোপলি

আজ মুত্তিয়া মুরালিধরনের মতো একজন ক্যানভাসার দেখলাম, শুদ্ধ বাংলায় দাঁতের মাজন বিক্রি করছে। অবিকল জনি ডেপের মতো একজন আছে, দৈনিক পত্রিকায় ফটোগ্রাফারের চাকরি করে। ফ্রিদা কাহলোর মতন একজনকে দেখেছিলাম—জোড়-ভ্রু—বাগেরহাটের পুরোনো রেলস্টেশনে স্যাক্সোফোন গড়নের একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাত। রাস্তার ক্যানভাসার মুরালিধরন কি জানে, তার মতন এক শ্রীলঙ্কান পাঁচ আঙুলে ছুঁড়ছে ঘূর্ণিঝড়, কিংবা ফটোগ্রাফার জানে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দস্যুর গল্প? কাহলোর চোখের গভীরতা কতটুকু জানে স্টেশনের মেয়েটি?
…রাসেল জানে, হিব্রু ভাষায় ধর্মগ্রন্থ লিখছে আরেক রাসেল, ইসরায়েলে!

নাচ

‘এ তবে ময়ূর! আমি অন্ধভাবে ভেবেছি অপ্সরা!’

—এরা যদি উড়ে আসে অভ্রময় সুস্বাদু পালকে
অথবা ঝড়ের সাথে যদি আসে পঙ্খিরাজ ঘোড়া
সবাই দেখেছে যাকে—জন্মান্ধ শাদ্দাদের চোখে।

সেসব ময়ূর আর ঘোড়াগুলি কোন পৃথিবীর,
মাংসময় ছুটে গিয়ে ভেঙে দেয় কেমন প্রাচীর,
আহির ভাঁয়রো গায় ভোরবেলা—অস্থিচেরা রাতে
পঙ্খিরাজ ঘোড়া, নাকি ময়ূরেরা স্নান করে
আমাদের ঘামের প্রপাতে?

আয়ুর্বেদ

আমার সর্বকনিষ্ঠ কন্যাটির একেক ঝলক হাসিতে আমার আয়ু দুবছর করে বেড়ে যায়। আমিও আয়ু বাড়ানোর লোভে তাকে হাসানোর নানাবিধ কসরত করতে থাকি। নিজের বাড়িতেই বানানো এই যে সার্কাসপার্টি, যেখানে ক্লাউনের দায়িত্ব আমার; দায়িত্ব চতুর দর্শকের—সে–ও আমার আয়ু বাড়ানোর লোভেই। নিজের সমস্ত মৌলিক জ্ঞান, বই আর অন্তর্জাল-লব্ধ জ্ঞানসমূহ কাজে লাগাই তাকে হাসানোর জন্য।
সেদিন দেখলাম, কোনো এক যুবকের হাত ধরে আমার সর্বকনিষ্ঠ কন্যাটি হাসছে। আর টের পাই, থার্মোমিটার বেয়ে সাতান্ন বছর নেমে যাচ্ছে আমার আয়ুর রেখা। মনে আছে, একদিন আমিও কারও আয়ু কমিয়ে দিয়েছিলাম এভাবেই—সাতান্ন বছর!

উৎসর্গ

আব্বা, আপনার চশমা ভেঙে গেছে—চশমার সামনে বাসি পত্রিকা নিয়ে চোখ কুঁচকে থাকেন। দু’বছরের একটা শিশুকে অক্ষর চেনান, রাসেল, এইটা ক—এই যে বামে এক দাগ, তারপর কোনাকুনি ডানে, আবার খাড়া উপরে, তারপর ছাতার বাঁটের মতো বাঁকা দাগ। পড় বাবা, কঅঅঅ
দুই বছরের রাসেল বলে ওঠে আড়ষ্ট জিভে, টঅঅঅ
আপনি আবার বলেন, আগে ট শিখবি? আচ্ছা, এই দেখ, বড় একটা ছাতার বাঁট নিচের দিকে, আর ওপরে ভয়ংকর অজগর। এইটা ট। পড়, টঅঅঅ
রাসেলের বর্ণমালার শুরু হয়েছিল নিচের দিকে বড় একটা ছাতার বাঁট, আর উপরে ভয়ংকর অজগর নিয়ে।

কবিতা-ভাবনা

কবিতা নিয়ে আলাদাভাবে তেমন কোনো ভাবনাই আমার নেই। হাজার হাজার সংজ্ঞা আছে, সেগুলোর কোনোটাই চিরসঠিক নয়! এমনকি যিনি সংজ্ঞা দিয়েছেন, তিনিও সেটিকেই একমাত্র সংজ্ঞা হিসেবে দাবি করেছেন বলে আমার জানা নেই। সেই জায়গা দিয়ে আমার নিজেরও একটা ভাবনা আছে, সেটা হলো : একজন কবি নিজের যে লেখাটিকে কবিতা দাবি করবেন, সেটিই কবিতা; সেটি যদি আপনার-আমার দৃষ্টিতে আপাতভাবে গল্প কিংবা উপন্যাস মনে হয়; এমনকি কাঠখোট্টা প্রবন্ধ মনে হলেও। বলা বাহুল্য, এটিও একমাত্র সংজ্ঞা নয়। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে কবি কে, সেটা নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা হতে পারে। আর আমার নিজের কবিতা নিয়েও আসলে তেমন কিছুই বলার নেই। যা মনে হয়, লিখি। সেটি কবিতা কি না, নির্ভর করবে আমি নিজে কবি কি না তার ওপর! আনন্দের বিষয়, আমি সেটি জানি না। জানি না বলেই আনন্দময় একটা জীবন যাপন করতে পারি; একটি লেখা লিখে মনে হয়, জীবন বড় মূল্যবান, কিছু ছুঁতোয় এখনো বেঁচে থাকা যায়!

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান। জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৮, বাগেরহাটে। মা মাসুমা আক্তার, বাবা আলী আকবর। পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। বিব্রত ময়ূর কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির জন্য মার্কিন গবেষক অধ্যাপক ক্লিন্টন বি সিলি ও প্রথমা প্রকাশনের যৌথ উদ্যোগে প্রবর্তিত ‘জীবনানন্দ দাশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ১৪২২’ পেয়েছেন। একই গ্রন্থের জন্য পরবর্তীকালে ‘মাহবুবুল হক শাকিল পদক ২০১৭’ পেয়েছেন।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : সুখী ধনুর্বিদ, বিব্রত ময়ূর, তৃতীয় অশ্বারোহী, ইহুদির গজল; উপন্যাস : একচক্ষু হরিণীরা, অমরাবতী।

এই সিরিজের পরবর্তী কবি রিমঝিম আহমেদ

Share Now শেয়ার করুন