এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> রিমঝিম আহমেদ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
291

রিমঝিম আহমেদ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।

সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

রিমঝিম আহমেদের কবিতাগুচ্ছ

মানুষ, মাটিহীন

তোমাকে ডাকি না আমি, তোমার ভেতর থেকে শুধু
আমাকেই ডাকি, আয়! এই পাকচক্রে গলে হার
না দেখার অজুহাতে। সভ্যতার চারপাশে ধস
আমাদের পথ বাকি নেই আর, ফিরে তাকাবার

তোমার ভেতরে কবে আমাকেই গুঁজে দিয়ে আসি!
শূন্যতম বিন্দু থেকে রেখা টেনে কার কাছে যাই!
শিশুদের শব এই পথে পথে ছড়ানো রয়েছে
তাদের মাড়িয়ে যাই, ডিঙোবার সাহস তো নাই

ধর্মের শেকড় বাড়ে চুরি গেল সব এবাদত
দেশ নেই, রাষ্ট্র নেই, জলে-জলে বেহুলা-ভাসান
বারোমাস ভিক্ষা করে একফালি মাটির আস্বাদ
মানুষ বেড়ায় খুঁজে, চাঁদের আলোও আজ ম্লান
আমাকেই খুঁজি আজ তোমার ভেতর থেকে আমি
ভেবে নিয়ে পূত গঙ্গা অতল সমুদ্রে রোজ নামি।

ইছামতী

হরফ ভাঙার পর চিঠিটা অচেনা হয়ে যায়
থাকে শুধু হাহাকার, মূক ও বধির শব্দমালা
অনিচ্ছেয় কি ইচ্ছেয় যে-কথা বোঝোনি কোনওদিন
পাখিদের ঘাড়ে চেপে উড়ে গেছে দূরে তার দায়

ছায়ার সংসার পেতে আকাশ অঘোর ঘুমিয়েছে
এইবেলা পাল তোলো, ইছামতী, তোমার নৌকোয়
ল্যান্টানা ফুলের গুচ্ছ অযতনে ফুটেছে বৃথাই
আমার শরীরে বসে কেউ যেন ঘাপটি মেরেছে!

আত্মার চেয়েও কেউ অধিক পূজিত হতে নেই
অনিবার্য বৃষ্টিভারে নিজেকে পতিত হতে হয়
মানুষের মুখগুলো পাথরের মূর্তি মেনে নিয়ে
চোখ টেনে নিয়ে যায় কুহকের দিকে নিমিষেই

নিজেকে লুকিয়ে রাখে নিজেরই আড়ালে এক মুঠি
মাটির পুতুল সেজে সোনার সিন্দুকে বেড়ে উঠি

স্বপুরাণ

নিজেই নিজের বুকে গান হয়ে বাজি
নিজেই তরণী আমি নিজে হই মাঝি
অন্তরে বিরাজ করে সদা-মন্দ্র ভোর
নিজেই নিজের চোখে হয়ে যাই ঘোর

নিজেই অতল দিঘি পাতাভাসা জলে
নিজের উদ্ভিদ নিজে হাসি ফুলে-ফলে
জীবন বিরাগ হলে মুক্ত করি মন
নিজের নিকটে নিজে থাকি সারাক্ষণ

নিজেরই উঠোন জুড়ে নিজে হই পাতা
নিজেকে প্রসব ক’রে নিজেই বিমাতা
অনেকেই কাছে আসে ফের চলে যায়
নিজে রয়ে যাই শুধু নিজেরই ছায়ায়

নিজের কাঁধেই তাই নিজে রাখি হাত
নিজেরই ঝরনাতলে নিজেই প্রপাত
নিজেই নিজের মনে আলো জ্বেলে রাখি
নিজের আকাশ জুড়ে নিজে হই পাখি

হেমন্তে

মনে হয় তুমি আছ, যতটা ছিলে না-এর ভিড়ে। খাবারে ছড়িয়ে
পড়ছ নুন-স্বাদের মতন। সমালোচক-জিভ কেটে দিচ্ছে
সম্পর্কের পরিধি। একা হচ্ছি, আরো যতটা একা হলে হাড়ের
শব্দ শোনা যায় বুকের ভেতর। ছোট চুলে চিরুনি চালাতেই
নেমে আসে পৃথিবী, থোকা থোকা মানুষ। পা-হারা হলে
সাঁকোর ওপারে জেগে থাকে ঘুম, ছড়ানো পাঁজর । শেয়ালের
মূকাভিনয় দেখি। পরমশূন্য থেকে সমাগত তোমার বাড়ির
দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে আমার কাটা মুণ্ডু। ডাঁসা পেয়ারায় কামড়
দিতে দিতে সুটকেসে ভরছি হারানো গোধূলি। হেমন্তে,
কৃষিখেত শুয়ে আছি, অন্ধ গিরগিটির মতো তুমি আমার বুকের
উপর দিয়ে এপার-ওপার করছ…

সুবহে তারা

জুতার বাক্সে ইঁদুর। ওখানে ঘরবাড়ি, সংসার অপরিমিত আহার, উপদ্রব। ছানাপোনা নিয়ে থাকা তারাও তো বোঝে! মানুষ বোঝে না এ বাৎসল্য, হার্দিক প্রণয়। যুগপৎ উপলব্ধির দিকে চেয়ে ভালো নেই। হাজারদুয়ারি শিস দূর ভেঙে ডাকে কাছে, কাছ ভেঙে দূরে। ইশারা প্রবল হলে কাঁটাতার পাখি হয়। উড়ে যেতে চায় অলৌকিক সওয়াবের দিকে। সুবেহ-সাদিক লাল হয়ে ওঠে, ঘন হয় সরের কুয়াশা। আমূল কম্পন তুলে সুবেহ তারা, মীমাংসা হয়ে এসো, চিবুকের কাছে।

কবিতাভাবনা

এই একই প্রশ্ন আমিও নিজেকে করেছি। বহুবার। উত্তর নেই। তবে ধরে নিয়েছি- একটা অনিশ্চিত পথে হাঁটাই আমার নিয়তি। নইলে কেন সংসার-সন্তান, জীবিকা, তেল-ঝাল-নুনের জীবন ছেড়ে কবিতায় মগ্ন হলাম! একটা সাধারণ মানুষের জীবন পেয়েই তো খুশি থাকতে পারতাম। কিন্তু পারিনি। হয়তো আমার অনেক কথা আছে। হয়তো আমার জানা নেই- ঠিক কীভাবে বললে মানুষের কাছে প্রকাশিত হওয়া যায়। আর হয়তো আমি ভেবেছি- এভাবে বললেই বুঝি কিঞ্চিৎ বলা যায় । কবিতা-ই বুঝি আমার কথা আমার মতো করে বলতে পারে। হয়তো পারেই না!
কবিতা বলে যা লিখি তা আমার বোবা-ব্যথা, ব্যক্তিগত ক্ষত-যন্ত্রণা। যার বেশিরভাগই অব্যক্ত থকে যায় যথাযথ শব্দের অভাবে, যা নিজের কাছেও জলে ভেজা কাচের মতো ঝাপসা, অ¯পষ্ট। যা কাউকে জানাতে চাই, আবার চাইও না। কবিতার এই অনিশ্চিত পথ ধরে আরও অনিশ্চিতের দিকে হাঁটছি । এ এক মহাকালের পথ । কাদাজল, ধুলোবন, কাঁটা-পাহাড়, রক্তপাত, হাড়ের দঙ্গল পেরিয়ে কেবলই ছুটে চলা অবিরাম। সেইসব ক্লান্তি, বিরহ, না পাওয়া, হাতছানি, ভাবাকুলতা ছুঁয়ে যায় মন ও মননে।
কবিতা আসে, ধরা দিতে দিতে হারিয়ে যায়। তাও ছুটি এই অধরার পেছনে।

পরিচিতি

রিমঝিম আহমেদের জন্ম ৮ জুলাই ১৯৮৫ রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম। পেশা উন্নয়নকর্মী। বই : লিলিথের ডানা (২০১৬), কয়েক লাইন হেঁটে (২০১৮), ময়ূরফুলের সন্ধ্যা (২০১৯), সুবেহ তারা (২০১৯), বিস্ময়চিহ্নের মতো (২০২০, উপন্যাস)।

Share Now শেয়ার করুন