এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> শামীম আরেফিন >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
473

শামীম আরেফিন >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

শামীম আরেফিনের কবিতাগুচ্ছ

যে পথের চিহ্ন নেই

নিচে জল শুকিয়ে গেছে—এমন
যে কোন ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে
তোমার মনে পড়ে, অন্য কোন পৃথিবীতে
অন্য কোন জীবন পড়ে আছে তোমার।

এইখানে, তুমি একলা, পথ না চিনেই
হেঁটে যাচ্ছো শুধু, ধুঁধুঁ মাঠের দিকে— ঘর নেই।
নদী থেকে দূরে—
কিংবা সন্ধ্যা নামার কিছু আগে;
যে কোন গাছের নিচে
তোমার থামার কথা।

অথচ খুঁজে পাচ্ছো না গাছ;
এমন কোন গাছ—যেখানে থামা যায়।
ভেবে পাচ্ছো না, এতোদূর কিভাবে এলে!

হাড়ের কারখানা

কারাখানার পাশ দিয়ে কারা যায় ছপ ছপ শব্দ তুলে? হামাগুড়ি অথবা গড়িয়ে গড়িয়ে কারা যায়? যেন এই যাত্রার ভেতরে ঠিকরে পড়ছে গাছেদের অট্টহাসি। যেন গভীর কোনো শূন্যতা থেকে কিংবা ঘুর্ণায়মান অন্ধকার থেকে কিংবা সূর্যাস্তের উগরানো বিদ্রুপ থেকে ছুটে আসছে অজস্র মাদি ঘোড়া। পথের দুইপাশে টানটান শুয়ে আছে ঘড়ির ফসিল। খুলির ভেতরে উল্টে আছে রক্তাক্ত ক্যালেন্ডার। একদিন গুলতি বানিয়ে তারিখগুলো ছুঁড়ে দিয়েছিলাম মৃত্যুদণ্ডের গায়ে। আর পৃথিবীর নাড়ি ছেকে বের করে এনেছিলাম কালো বসন্তের ভ্রুণ। সেই তখন থেকেই তো কারখানার ভেতরে তৈরি হচ্ছে হাড়ের ভাস্কর্য।
—হাড়, তোমার পূর্বপুরুষের নাম?
—হাড়, তুমি স্ত্রী না পুরুষ?
—হাড় তুমি জুয়া খেলতে জানো?
হাত পা বেঁধে রাখা ক্যামেরার সাথে আমারও কথা হয়েছিলো দু-একবার। লেন্স থেকে চোখের দূরত্ব মাপতে মাপতে ভুলে গিয়েছিলাম হত্যাকারীদের নাম। ওই তো, লম্বা পা ফেলে ফেলে কুয়াশাবনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে দরজা। ওপাশে শীতার্ত পাখিরা ফ্রিজ খুলে বেরিয়ে পড়েছে সূর্য শিকারে। সূর্য ছুটছে। সূর্য পালাচ্ছে। তার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে কারখানা। ঠিক এই মুহূর্তে যারা কারখানা থেকে পিছিয়ে পড়েছে অনেকদূর, তারা হয়তো জানে না রাত গভীর হলে কীভাবে বেড়ে ওঠে রাস্তার অসুখ। জানে না প্রাপ্তবয়স্ক মৃত্যুরা ছিলো ঘুমন্ত নাইটগার্ড। নয়তো শুনতে পেতো চাকার চিৎকার। হ্যাঁ, আমি দেখতে পাচ্ছি, অসুখভরা ট্রাক ছুটে আসছে এদিকেই। লিঙ্গহীন সোসাইটিকে এবার ডেকে তোলা যাক। পৃথিবীর ডান চোখে লাথি দিয়ে যারা ভাঙতে চেয়েছিলো আগুনের কারফিউ, তারাও শুনুক পোড়া মাংসের সাইরেন।

ইশারাপ্রবণ আঙুল

দ্রাঘিমা ছিঁড়ে নেমে আসে লিফট। সেও বোঝে আঙুলের ভাষা। সতর্ক দারোয়ান তোমার অনামিকা। নামতে নামতে কত দূর নামে? হয়তো মাটির নিচে আরো যত মাটি ঘুম হয়ে আছে। তারও গভীর নিচে নেমে আসে রাত, লিফটের দরজা খুলে। আমি তো সামান্য কুয়াশা বিক্রেতা। তাই সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে চাই। সিঁড়ির দুইপাশে কেন দাঁড়িয়ে থাকে নির্জনতা? নাকি তারাও নামে? কিম্বা উঠে যায় বাতাসের ভেতর। বাতাসেও ভাসে তোমার ইশারা। দুলতে দুলতে পাক খায়। ফলে আমি আর উঠতে পারি না। উপরে উঠতে উঠতে অনেক ওঠা হলে তাকে বুঝি নেমে যাওয়া বলে! লিফটের বোতাম মিথ্যে বলে না জানি। বোতামের গায়ে সাজানো সংখ্যা গুনে গুনে হিসেব করি তোমার বয়স। যদিও কুয়াশার অংকে আমি বরাবরই ভুল করে ফেলি। আর সে কারণেই তোমার আঙুল এতো ইশারাপ্রবণ হয়।

পুনশ্চ

মানুষের ভেতরে কেমন আছো মানুষ? কেমন আছো তরবারির ‘পরে শুয়ে থাকা জীবন? জানি, জলজ হৃদয়ে ছুটে চলা জল একদিন মিথ্যে মনে হয়। নাভিশ্বাস থেকে উঠে এসে হাড়ের দোকানে উলঙ্গ কাতরায় খসেপড়া মুকুট। শিশিরে ন্যুব্জ ডালে নাড়া দিও না বাতাস। এখানে অবিশ্বাসে বেড়ে ওঠে শীতকাল। হায় বিশ্বাস, ইতিহাস থেকে পালিয়ে ধ্বংস নগরীর মাঝখানে তুমি কার ছবি আঁকো?

বিভ্রান্তির মোড়ে এসে থেমে আছে প্রশস্ত ছায়া। অপ্রেমের গান শেষে ছায়াগুলো শরীর হয়ে ওঠে। সেইসব রমণীয় গান কাঁধে নিয়ে কেমন আছো প্রিয় দেশলাইকাঠি? কেমন আছো বুকের ভেতরে কাজলটানা ছুরি? হাতের ভেতরে হাত, কেমন আছো? আঙুলের ডগায় এখনো কি সমুদ্র নাচাও? বেসাতি চুম্বন ঠোঁটে নিয়ে কোথায় উড়ে যাও সান্ধ্য-কইতর?

স্বপ্ন কিংবা মৃত্যুর মত ঘোর

বৃষ্টি নেমে গেলে ঘর পালানো বাতাস
ফুসফুসে পুরে নিয়ে বলি—এবার স্থির হও।
এই ধ্বংসস্তূপের উপর পড়ে থাকা নিথর
রাস্তায় হেঁটেছো অনেক।

ডানে ধূসর শূন্যতা—বায়ে দীর্ঘ নদী; ভাঙা ব্রিজ
কাঁধে নিয়ে জাদুকরের লাঠির মতো আছে শুয়ে।
বুকের ভেতর নীল শালবন—কাঁপছে তিরতির।

যেন এই বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে পালক—
এই বনে—টুপটাপ পাতার এস্রাজে আমার
ডুবে যাচ্ছে ঘর। তুমি কি মৃত মায়ের মত দীর্ঘ
শালপাতা? মাথার উপর মেলে ধরেছো প্রেম।

জ্বর জড়িত কপালে—তোমার আঙুল।
পৃথিবীর প্রথম মৌমাছি আমি। যেন ফুলের
ড্রেসিংরুমে গন্ধের কাছাকাছি—রয়েছি বেহুঁশ।

মানুষের তালিকা

আপনি যাকে পাখি বলছেন, মূলত সে পাখি নয়
সেও একজন মানুষ; ডানাঅলা মানুষ
আপনি যাকে গাছ বলছেন, মূলত সে গাছ নয়
সেও একজন মানুষ; শেকড়অলা মানুষ

এই সূত্র যদি মেনে নিই, তবে সূত্রমতে –
নদী একজন মানুষ—তরল মানুষ
মেঘ একজন মানুষ—উড়ন্ত মানুষ
চাঁদ একজন মানুষ—জোছনাঅলা মানুষ
সূর্য একজন মানুষ—রৌদ্রঅলা মানুষ
মাছ একজন মানুষ—জলচর মানুষ
ঘর একজন মানুষ—দেয়ালঅলা মানুষ
গোলাপ একজন মানুষ—গন্ধঅলা মানুষ

এভাবে, আপনার চারপাশ থেকে একেকটি উপাদান তুলে এনে
নামের পাশে ‘মানুষ’ শব্দটি যোগ করে দিন
এবং মানুষের একটি নতুন তালিকা তৈরি করুন
অতঃপর ভাবুন, পৃথিবীতে যা কিছু আছে বস্তুত সবই ‘মানুষ’

অর্থাৎ, গত শীতে আপনি সমুদ্র দেখতে যাননি; বরং বিচে বসে
একজন নোনা ঢেউয়ের নিঃসঙ্গ মানুষকেই দেখেছেন।
গত বরষায় আপনি বৃষ্টিতে ভেজেননি একদম—
ছাদে দাঁড়িয়ে অথবা রাস্তায়
আপনি একজন মানুষের জলে ভিজে ভিজে একাকার হয়েছেন

অনুরূপ, গতকাল আপনার প্রেমিকাকে
যে গোলাপ উপহার দিয়েছেন, তা কি গোলাপ? না মানুষ?
সূত্রমতে, প্রেমিকার হাতে আপনি আরেকজন মানুষকেই তুলে দিয়েছেন
এবং আপনার সম্মুখেই আপনার প্রেমিকা তাকে
মুখে ও বুকে জড়িয়ে গন্ধ নিতে নিতে
আপ্লুত হয়েছে বারবার।

কাব্যভাবনা

কোন নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই যেমন হঠাৎ করেই প্রেম হয়ে যায়, আমার কবিতা লেখার ঘটনা অনেকটা সেরকমই। এর পেছনে মহৎ কোন কারণ বা উদ্দেশ্য নেই। তবে হ্যাঁ, একটা ছোট্ট কারণ অবশ্য আছে। স্বভাবে আমি কিছুটা মিতভাষী হওয়ায় আমার ভেতরে ভাবনার চাকাটা চলমান থাকে বেশি। কিন্তু সেইসব প্রকাশে আমি ব্যর্থ হই বরাবরই। কবিতা এই ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করে। তাই প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কবিতাকেই আমি বেছে নিয়েছি। এছাড়া নিজেকে আবিষ্কারে কিংবা জীবনের নানান রহস্যময়তা অনুধাবনে কবিতা আমার কাছে নান্দনিক এক খোলা জানালার মতই।

শামীম আরেফীন-এর প্রকাশিত বই : তৃতীয় চোখের কোরাস (২০১৫), মানুষ কেনো ফুলের নাম নয় (২০১৬), কফিনভর্তি মেঘ (২০১৭)। মোবাইল: ০১৮৮৯১৪১৭৯১
মেইল : shamim.arefin19@gmail.com

Share Now শেয়ার করুন