এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> শাহ মাইদুল ইসলাম >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
269

শাহ মাইদুল ইসলাম >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

শাহ মাইদুল ইসলামের কবিতাগুচ্ছ

সহজ

তুমি এসেছিলে সহজ। তোমার পায়ের নখগুলো ছিলো অযত্নে বেড়ে ওঠা। যেমন
আমাদের বুকের ভেতর বেড়ে উঠে পরাবাস্তব শহর। দালির ঘড়ি।

তুমি হাসছিলে তোমার হাসি। বাতাসে তোমার চুলগুলো ভিজে যাচ্ছিলো…

“আমাকেও বহন করো।”
— এই ছিলো আমার মনের দশা। সূর্যগ্রস্ত, চন্দ্রগ্রস্ত…

এবং তুমি বহন করেছিলে, “আমাকেও বহন করো।” আর আমরা দিক পরিবর্তন করেছিলাম। তেরোটি স্বর্ণমুকুটে শোভিত অত্যুজ্জ্বল সূর্যের নীচে। আমি আঁকড়ে ধরেছিলাম তোমার হাত। তুমি হয়ে উঠেছিলে সন্তানসম্ভবা…

তোমার ঘুমের শিশুকে আমার সেকুইয়া বৃক্ষ মনে হচ্ছিলো। যখন সে জেগে
উঠলো, জেগে উঠলো একজন—শিশু।

তুমি এসেছিলে সহজ। তোমার পায়ের নখগুলো ছিলো অযত্নে বেড়ে ওঠা। যেমন আমাদের বুকের ভেতর বেড়ে উঠে পরাবাস্তব শহর। দালির ঘড়ি।
.
যে’র দারাখতানে জয়তুঁন

অনেকাংশ চোখের দিকে—
নিগূঢ় জলপাই বন। সবুজ, একটি পোয়াতি রঙ। সবুজের ভেতর সবুজ হামাগুড়ি দিয়ে বাড়ে। বেড়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে চিরদিকের দিকে। আর বাতাস, উজ্জ্বল ত্বক ঘেঁষা শব্দ; জলপাই বনে নিঃশব্দ আলোড়ন তোলে।

চারদিকে নরোম বন ছড়িয়ে আছে
জলপাই ঘনবন;
আমি পেরিয়ে এসেছি বিজন ঘুমের উপত্যকা
আমার মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসী হৃদয়ের
গাঢ়তরসবুজ— গড়িয়ে যাচ্ছে নরোম বনের দিকে…

অনূঢ়া আকাশ দেখি। আকাশে মেঘেরা অদম্য জড়ো হচ্ছে। আমি কল্পনা করি তোমার চোখ। কাজল মাখা, প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি নিঃশব্দ অনুসরণ করি। মিহিন সবুজের বাঁকে তোমার মুখের আদল। কাঁখে সবুজ। বাতাসে বইছে—

জলপাই বন। ঢেউসবুজ, লোমশ বুকে…
.
নাভি

মুষলধারে রোদ নামছে
আমার গোপন ইপ্সার সমুদ্র
সমুদ্রে এসে দাঁড়াই
সারা সমুদ্রে সপুষ্পক হাসি—
কিছুই দেখছি না— দেখার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি
উঠোন
বারান্দা
স্বর্ণ-
কুঠুরী
উঠোনে
বারান্দায়
স্বর্ণ-
কুঠুরীতে, সারা ও সুনসান—
সারা ও সুনসান মিলে,
বাগানবিলাস রঙের অদম্য সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছি
তার দরোজায় সর্বশরীর কাঁটা হচ্ছে

ঐ নাভি, কুণ্ডলী…
চোখের অন্তর্ভেদী চোখ—
দেখে, যেই অন্ধ লাগার ঝোঁক আছে;
নগ্ন—
তুমিই ছিলে তোমার নগ্নতা
আবৃত—
তুমিই ছিলে তোমার আবরণ
— তখনি পরীর মতন

দেখার অন্ধতা বজায় রাখি
শিমের লতা বাতাসে
গাঢ় বেগুনি গায়ের রঙ, উজ্জ্বল সবুজ কুঁড়ি—
তিরতির কাঁপছে…

আমি ভাবছি সোনালী এই হ্রদ
নীল হাঁসভর্তি—এই জীবনে আমি প্রবেশ করেছি
আমি ছিলাম উন্মাদ,
বেঢপ উন্মাদ—

হাড়হিম মৃত্যু পাক খায়
পাতাগুলো তিরতির…
খিঁচুনিগুলো ঠান্ডা সাপের চলাচল
আমার সুকঠিন রক্তের ভেতর
তীক্ষ্ণ
হালুম—
প্রাণভয়ে তোমাকে এই

অকথ্য আঁকড়ে ধরা
তোমার উন্মুখ জোয়ারের নিস্তব্ধতায়
অফুরন্ত সোনা
ওঁৎ
পেতে
আছে;
অতিশয়োশক্তির মতো—
যে
নন্দিতা
বেঁকে
গেছে

যে গাছের কোন আটখানা নাম নেই
যে স্ত্রী মশা চিরদিকের জন্য পাগল হয়ে গেছে
সেগুন কাঠের দরোজা
দুধপুকুর
অসীমের জেলখানা
বাস্তুভিটার পয়মন্ত সাপ
গলায় ঠান্ডা বসে যাওয়া ট্রাকের ভেঁপু
রাতের হাপর…

কীটের অবশেষ
এবং—
গাঁদাফুলের সাথে সাদৃশ্য
যে নাচের ভঙ্গিমা করে
যে বুকে ভর দিয়ে হাঁটে
জলের প্রাণি
ডাঙার কুকুর…

নিঃসাড়ে কেটে চলেছি
সাঁতার; মিহিন জলের গুড়ো—
ছড়ে যাচ্ছে
বাতাসে, উবে যাচ্ছে
বাতাসে, যতদূর
দূরবহু…

যাওয়ার দিকের বাড়ি—
আমি তোমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি
তুমি ঘোর শক্তিতে আছো
আকাশের দূর পর্যন্ত—
টানা শস্যক্ষেত… মর্মাভিষেকের সাড়াদিন
আ-
হলুদ শস্যেরা
— চোখে অসহ্য নাড়ছে…

আমার সহ্যশক্তি ঘোরে কাতর
কিছুই অনুভব করছি না—হাড়হিম অনুভব করছি
আমার
আর
দ্বিতীয়
গন্তব্য নেই

আমার
কোনো
দ্বিতীয়
গন্তব্য নেই; ভাবি সংস্পর্শেই মরি—
জড়িয়ে রই ফানাফিল্লাহ
আসমান ফেঁড়ে ফেলা হোক
জমিন তামাতামা

আমার রাত্রিদিন দিন কাটে
বিপর্যস্ত চোখের—
শ রী রে

তুমি বাস করো মহৎ বৃক্ষের
গম্ভীর খোড়লে,
তুমিই দানব বৃক্ষ—সাত্ত্বিক খোড়ল—নষ্ট অহমিকা
দাঁড়িয়ে সকাল সন্ধ্যাসকাল
দুপুর রাতদুপুর
বুটিদার হাসি হাসছো
ছোপছোপ হাসি হাসছো
অট্টহাসি…

আচানক
ঘাই
মারছে
অন্ধ হওয়ার নারী
তুমি কতো বেশি নিঁখুত

তুমি বাগান ভর্তি

চিরদিকের সূর্যের
নিচে
হৃদয় নিংড়ানো দুপুর
বাগান ভর্তি

তুমি সবুজ বাগানের ভেতর
হাঁটাহাঁটি করছি
আত্মার চোর ফুঁটো দিয়ে দেখছি
অনাবিল শস্যক্ষেত তিরতির –
কাঁপছে বাতাসে ছড়ে আছো
আকাশে মিশে আছো
চিল চড়ুই
ফুল
ও পাতার

শ্রী পাহাড়ের দিকে
দুচোখ হাসতে বেরিয়েছি
পরিপূর্ণ দুপুরালোয়
আসবুজ জ্বাজ্বল্যমান বৃক্ষের –
অবর্ণনীয় শরীর; চিরহরিৎ পত্রালি
দিকফেঁড়ে ডালপালা
খানাখন্দ
উঁচুনিচু গড়াপেটা

চিড়বিড়ে দুপুরের ডালপালাগুলো
ছায়াটুক ঝোঁকের উপর
সন্ধ্যা যেন
শংকায় গা গুলিয়ে উঠলে –
কতকটা পাখি এসে
দম ধরে
বসলো

কড়া মেশানো চোখে তোমার
ঝগড়া বাড়ছে
ভালো অশান্তি আহা নিরলস সর্বাঙ্গে
দয়া দেখাবার মতন পূর্ণ স্বাস্থ্যবতী
তোমাকে সুখী ঈশ্বরী দেখাচ্ছে
নিয়ত কম্পমান; ছড়ে যাওয়া, সংকোচিত
হওয়া
অনাবিল শস্যক্ষেত
নকশাআঁকা প্রচুর পাখি,
উড়ছে

অপার আয়তনে তোমার
বুদ্ধ দিনের হাসি
চিরভরা ষড়যন্ত্র, চিরভরা ষড়যন্ত্রে
হাসিগুলো জামা-জুতো
পরছে না
হতোদ্যম হয়ে আছি
হাসির তলানিতে জমছি
নিংড়ানো সবুজের
নিচে
মানুষের গুটিয়ে যাচ্ছি

সারা-তুমি আকাশ আলোয় ভরা
হাসি হাসো
যে নকশা ও কৌশলে
অস্থির ক্রিয়াবিধি এই
সারানিকটদূর বৃক্ষপনা
তোমার রক্তের ভালোবাসা
দিয়েছ কাহারে

ভালো উদ্ভাসিত সূর্যের
নিচে
দুপুরের অনায়াস দেখার আয়তক্ষেত্র
সহসা রঙের পেড়ে বসে আছি আর শবদিকে
আল্লারওয়াস্তে ধক করা
শব্দ
চিরদিকের দিকে বাঁকিয়ে দিচ্ছে
মনের অবস্থা
ডাঁকসাই
আলামত বেড়ে সঙ্গীন হচ্ছে

তোমার গহীনে ক’গুণ
গহীন হ্রদ
কতটা চিলতে মাছ হল্লা করে
নোনা ও মিঠে রোদ

তুমি বাগান ভর্তি
তুমি সবুজ

আমরা দুজনে মিলে

আমরা দুজনে মিলে
আমাদের
মনসম্ভব রোদ
ভালো অজুহাত তুমি টেনে জড়ো করো
তোমার কালো-জামা, লাল-পাজামা
পাজামার গিঁট খুলে যেতে পারে এমন অমূলক
ভয় হয় আমার
ফিক করে হেসে ফেলো
পথশিশুদের জন্য আমাদের উপচে পড়া
উদ্বায়ী দুপুরের
হলুদ বন
এইখানে কাকসমগ্র –
অনেকটা কাক দারুণ খুশিতে আছে
আর দুটি মনের পথশিশু
এখন যতটা সন্ধ্যা,
ততটা কাক
অমন বাস্তব কাকগুলো গেল কই
শিশুদের আমরা জানি
কোথাও তারা হারাচ্ছে না
রোদগ্রস্তের ভেতরকার
কিড়মিড় আমাদের মনে—আমরা টইটম্বুর
চলচ্ছবি, যথেচ্ছ মৎসবিকেলের দিকে –
ঝোঁক
মান্দারিন ভাষায় রহস্যগুলো ডালপালা
সকল ভাষায় সুস্বাদ মুগডাল রান্না হয়
লাল-পাজামা পরিহিত যে কেউ জন্মদ্বার ছড়িয়ে রান্নাশহরে বসে –
সেই তোমার অবিকল
আজকের প্রসঙ্গ খামারে
একগাধা
সরীসৃপ খড়
বুয়েনোস আইরেসের দিকে
সকল ভাষার পিতৃভাষায় যেখানে অন্ধ বোর্হেসের ঝোঁক
থির ভাষা হই? রোদগ্রস্তের ভেতরকার
কিড়মিড় আমাদের মন;
এর সিন্ধু উপত্যকা –
এর মহেঞ্জোদারো
ডাকাবুকোদের দরাজ হাসির ভেতর
সক্রোধে খুলছে নগর কপাট
কোনো এক সিন্ধুরানি তুমিও অবিরাম স্বাস্থ্যকর
অনেক ব্যতিব্যস্ত জল
আর আমাদের
মনসম্ভব রবিশস্য

কবিতাভাবনা

মানুষ হওয়া সুভাগ্যে কাতর হয়ে আছি। অগত্যা মনুষ্য স্বভাবে তাড়িত ও বিড়ম্বিত। যখন কবিতা এলো, ভেতরবাড়িতে তোলপাড় শুরু হলো। মনে হলো এ-ই মোক্ষম, ইহকাল ও পরকাল। বেঁচে আছি যদি হয় একটি অশ্লীল প্রদর্শনী, কবিতা হলো তার সবচেয়ে নিবিড়তম প্রকাশ। এসব ভাবতে ভাবতেই কবিতা লেখা হয়ে গেলো একদিন। কবিতা লেখা যে জেনে গেছি, এই স্পর্ধা থেকেই কবিতা লিখি।

শাহ মাইদুল ইসলাম-এর জন্ম ২০ জুন, ১৯৮৬, হবিগঞ্জে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ঘোড়া ও প্রাচীর বিষয়ক  (তিউড়ি প্রকাশন) ও নিখিল গুচ্ছগ্রাম (চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনী)। E-mail: mydul86@yandex.com

Share Now শেয়ার করুন