এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> শুভ্র সরকার >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
419

শুভ্র সরকার >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

শুভ্র সরকারের কবিতাগুচ্ছ

ওয়াসিফা জাফর অদ্রি

কেটে রাখা ধানের পাশে চুপ
রোদে পোড়া দুপুর একা একা
অকপট তোমার ধোয়ামুখ
গামছার মনের পাশে রাখা।
চমকানো বুকের তিল শোনে
আয়াতুল কুরসি দিনমান
পাঁচিলের ফসকে যাওয়া পা
পরানে জেগে ওঠে শমশান

শোনা কথা ব্যথার সাবলীল
পরিণত ভুলের যতো ঋণ
কোমরের সুতোয় ফুটে আছি
আমি যেন ফুলের শ্রীহীন,
প্রশ্নের অদূরে পুড়ে যাই
মচকানো ফুলের বিব্রত
অবহেলা ভাষার অনায়াস
ভেজাচোখ শুকিয়ে আছে ক্ষত!

উলটানো তেলের কৌটো দেখো
তোমাকেও শোনায় দু’কথা
কাটাদাগ আমিও তো হাতের
যেন কেউ রেখে গেছে অযথা,
অন্ধ দরজার পাশে তুমি
ফাঁস দেয়া দড়ির বেদনায়!
সমস্ত ব্যথার থেকে কাছে
বৃষ্টিও সহজ ঝরে যায়।

মাঝনদী অবাক তিস্তার
প্রেম এমন জলের করুণা
বিড়ালের পায়ের চে’ নরম
বিঁধে থাকা কাঁটার যন্ত্রণা,
বঁড়শিতে আহত নির্জন
মাছেদের আয়ুটুকু নদীর!
ভাঙা মন অধীর ডাকে নাম
ওয়াসিফা জাফর অদ্রির।

আমিও অস্ত যাবো সিরাজের মতো

হাওয়ার মনে ভেসে যাওয়া সন্ধ্যার নত মুখে
মেঘ যেন কৃষাণীর ব্লাউজের মতো ঢিলেঢালা
কাটা ধান কাঁখে সে কি তোমার মনের কথা জানে!
নিজেকে যেভাবে গাঁথো তুমি বাঁধুলি ফুলের মালা,
কলিজার আড়পার তবে কেন আমার বিরহে?
ধানের কপাল পুড়ে কেন লাল বধূয়ার শাড়ি?
কেন শিশুটিও কাঁদে দাঁত চেপে মায়ের স্তনে?
অন্ধ ভিখারিটিও একা চিনে ফিরে গেলে বাড়ি,
বিষণ্ণ এতো তুমি কি বাচ্চা মেয়েটির ভাঙা দাঁত?
মহীরুহ কানে যার চলে যাওয়া পাখির শিস
আসমান খুঁড়ে খুঁজে পাইনি খোদার তাকদীর
আমার ধর্ম দেয়নি তোমারে পাবার কশিস!
তবু কবরে নামানো লাশের মুখটি শেষবার
দেখার মতন করে তোমারেই দেখি প্রতিবার।

অদূরে হাঁসের বাচ্চাটিও ভিজছে মায়ের পাশে
মানতের সুরে তারে বুকে রাখো শান্ত সূরার
ঝিঁঝিঁর ডাকের মতো বর্ষায় কোনকালে যদি
শাড়ির কায়দা থেকে উড়ে যায় পরান আমার!
চন্দন কাঠ হয়ে না হয় ওঠো আমার চিতায়,
কোমরের বাঁকে বেঁধে রাখো নুহু নবীর নৌকাটি
জলের মুখ শুকিয়ে আসে তীরের গলা ব্যথায়
হাতের বালায় বাজে দরদ ভরা মন তিস্তার
বঁড়শিতে ধরা পড়া মাছের শেষ ইচ্ছা মতো
পোষা বিড়ালের মোনাজাত পাতে তুলে দিও তার,
মূর্খের যুক্তির পাশে ঘাড় ধরে দাঁড়াই নিজের
দেখি না তোমার মুখ, বুকে পুষেছি অজস্র ক্ষত
বৃষ্টির ছাঁটে এখানে ভেজে মিরজাফরের মন
পূরবী রাগে আমিও অস্ত যাবো সিরাজের মতো!

কথা এক অন্ধ গানঅলা

আলপিনে গেঁথে রাখা কাগজের ওড়ার সমস্ত স্পর্ধা নিয়ে, আমি তবু তোমার কাছে কাছে রয়ে যাই,

অথচ ছায়াদেরও তো ফোঁড়ার মতো টনটনে রোদে, জলতেষ্টা পেলে মানুষকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে ছেড়ে যাওয়া পাতার বিরহে, অনাথের মুখের সমস্ত মায়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের বুকে, কুঠার হয়ে নেমে আসতে। এই যেমন নেমে আসা ছুরির নিচে থাকা, ফলের বুকে দোয়া পড়ে তুমি ফুঁ দাও, অথচ আমি তোমাকে কথা বলি; আর কিছু বলি না।

তোমাকে পাওয়া হবে না ব’লে

দাবার বোর্ডে, ঘোড়ার সামনে ঘাসের জীবন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমি অশেষ এক বোড়ে। যতোটা অপমানে, মেঘ কোনও কিশোরীর চুল থেকে খ’সে পড়া বেগুনি রঙের গার্ডার। আমি ঠিক অতোটা দূর। নিচু চাঁদ ধরতেÍ কুয়োয় ছিপ ফেলে আকাশও তো ব্যর্থ ছাদ মাত্র। সামান্য জল সে আটকাতে পারেনি।

আমি তোমাকে কীভাবে আটকাবো, বলো?

সারা দুপুর যেনো বিধবার শোবার ঘর, থমথম করছে। ফকিরের শূন্য হাতে ফিরে যাওয়া তাকিয়ে আছে। গৃহস্থের নিশ্চিন্ত ঘুমের পাশে!

আমার কপালে তুমি নেই, যেন সেও জেনে গেছে!

কাব্যভাবনা

ভীড় লোকাল বাসে পকেটমারের জিভের নিচে ব্লেড লুকিয়ে রাখার কৌশল হতে পারে কবিতা, হতে পারে পত্রিকা বিক্রেতার মৃত্যুসংবাদ বিক্রির নির্বিকার ভঙ্গিটুকু কিংবা বৃষ্টির মধ্যে দু’হাত ছড়িয়ে ভিজতে থাকা ট্রাফিক পুলিশ। যদিও আমার সাথে তাদের খুব একটা জানাশোনা নেই। তবে খুব ভালো হতো, বন্ধুর মুখস্থ ফোন নাম্বারে তাকে যদি পাওয়া যেতো! কিন্তু না। অনেক পরে জেনেছি, বিয়ের দিন ঘরের আড়ায় গলায় দড়ি দেয়া নিলুফা আপার লেখা শেষ চিঠিটা পড়তে পারলে, কবিতা লেখা যেতো। অনেক খুঁজেও সেই চিঠি আমি পাইনি। যেমন তোমাকে পাইনি, তেমন কবিতাও। আর যাকে পাইনি, তাকে নিয়ে আমার কোন ভাবনা নেই।

শুভ্র সরকারের প্রকাশিত কবিতার বই : ঈর্ষার পাশে তুমিও জুঁইফুল, পথ পৃথিবীর মুখে বসন্তের দাগ। ইমেইল : suvro280192@gmail.com মোবাইল: ০১৭১৭৪৫৩১৮৭

Share Now শেয়ার করুন