এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> শ্বেতা শতাব্দী এষ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
660

শ্বেতা শতাব্দী এষ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

কবিতাগুচ্ছ

সাজানো বসন্ত

শেয়ানা হাওয়ারা জানে—
ঝিঁঝিরা কীভাবে ইশারায় রাত্রি নামায়,
রাঙাচোখের পথ পার হয়ে ভেসে আসে
ফুলেদের মৌতাত, কোথাও অপর্যাপ্ত নেই নরম আঁধার—

হাপধরা জীবনের প্রেম ঝুলে থাকে অসুস্থ সাঁকোর ওপরে!
এইসব দৃশ্য ঠিকঠাক—ঝরে যায় সময়ের খয়েরী ত্বক
তিসির ফুলের মতো নীলাভ আকাশে।

নির্মোহ পৃথিবী থেকে লোকেদের নিবাস উঠে যায়
নিস্তব্ধতা গুনগুন করে সমস্ত চরাচরে—
যেন, কারা খুব গোপনে কাঁদে—
আয়ু মুছে মুছে পৃথিবীকে বসন্তে সাজায়!

মালহার

একটা আনন্দের ছায়া হয়ে একটা বেদনা এগিয়ে যাচ্ছে
ফুলগাছটির দিকে—
বাতাস হয়তো অনেক কিছু জানে
কখন ধীর পায়ে সন্ধ্যা আসবে সেইসব ঝরে যাওয়া বুকে নিয়ে
আকাশে ছড়িয়ে যাবে ভ্যান গঘের লাল
বিচ্ছুরণ বিগত মুহূর্তের স্মরণে—

তবু ফুল একটা প্রতীকী ব্যাপার ধরে নিয়ে
আমরা আরো যাই—শূন্যতার উল্টো দিকে যেখানে
সত্যিই কথা ছিলো অনেক আনন্দ পাবার!
অথচ ঘড়ির কাটা থেকে কেবলই ফুল ঝরে যাচ্ছে!
ফুল, ঝরে যাচ্ছে—

মায়ার খিলান

পৃথিবীতে সমস্ত প্রেম একতরফা জেনেও
হৃদয় ভালোবাসে নিমফুল,
আনত পথের দিকে মুখ রেখে চেয়ে থাকা
যে-কোনো চলে যাওয়ার দৃশ্যে
নৈঃসঙ্গ্য নেমে আসে অচেনা সন্ধ্যার গভীরে!
তারপরও মানুষ নদীর কাছে যায়
যেখানে অপরূপ মায়ার খিলান
আঁকা আকাশের গায়ে!
স্পর্শের অধিক অনুভবে এইভাবে বেঁচে থেকে
কেউ কেউ পাখিদের কাছে থেকে শিখে নেয় ঝড়—
অন্তর্গত বিষাদের দর্পণে।

শরণার্থী

যেন আমি চোখে কিছু দেখতে পাইনা
যেন পৃথিবীতে কোনো শরণার্থী নেই
যেন রাজপথে ফুটে আছে অগণিত ফুল
অথচ আমি দেখতে পাই না

হৃদয়ের বধিরতা শোনে হৃদয়ের অন্ধত্ব জানে—
এইসব না-দেখার মাঝে তবু
শরনার্থীদের কোনো দেশ থাকে না—
ফুলের পরাগ থেকে উড়ে যাওয়া রেণুর
ব্যক্তিগত আর কোনো বন থাকে না!

আমাদের বাড়িতে শীত

বরফকল ছিল না কোনো
আমাদের বাড়িতে তবু বারোমাস শীত—
আগুনে হাত সেঁকে সেঁকে
পুড়ে গেছে ভাগ্যরেখা, হাতের অলীক!
বসন্ত আসবে ভেবে হাওয়ার বাগানে
প্রতিদিন সকালে বৃষ্টি দিতাম;
রক্তকরবীর শরীরে কেবলই
পাতাভরা অসুখের খাম!

এভাবে আমরা বড় হতে হতে
শীতকেই মনে হতো স্বাভাবিক—
বাকি সব ঋতু ভুল-সর্বনাম।
কে কোথায় চলে গেলো
বাড়ি থেকে দূরে,
সবার প্রথম আমি বসন্ত পেলাম
এইখানে তোমাদের ভিড়ে।
সময়-স্নায়ুভরা বিচ্ছিন্ন বাতাস
বসন্ত বেশিদিন ভালো লাগে না!
কুয়াশাছায়ার বুকে ফিরে যাওয়া সুর
আমাদের বাড়ির গভীরে
জমে থাকা শীত শীত গান!

শ্বেতা শতাব্দী এষ-এর জন্ম ১২ই অক্টোবর ১৯৯২, জামালপুরে। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ : অনুসূর্যের গান (২০১০), রোদের পথে ফেরা (২০১৩), বিপরীত দূরবীনে (২০১৬), ফিরে যাচ্ছে ফুল (২০১৯)। ২০১৭ সালে বিপরীত দূরবীন কাব্যগ্রন্থের জন্য আয়েশা ফয়েজ সাহিত্য পুরষ্কার অর্জন।

Share Now শেয়ার করুন