এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা >> অরবিন্দ চক্রবর্তী >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতা >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
538

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংখ্যা : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

অরবিন্দ চক্রবর্তী >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতা

সমুদ্র সংস্করণ
সমুদ্রে শুয়ে থাকা আজব কিছু নয় – মা শিখিয়েছেন।
কৈবর্ত পরিবারের সন্তান না হলেও
আমাদের নদীপাড়ে বাস, কুমারপুত্র আমি
অদৃষ্টের অথইয়ে জাল ফেলে
বাবা অতল থেকে তুলে আনেন
প্রচুর রহস্য, দৈনিক খুদকুড়ো
সবারই রয়েছে জিতে যাওয়ার বিজ্ঞতা
আমরা হেরে যেতে পারি জেনে
আমার পিতা নিয়ত উজানে বৈঠা চালান
চোখও যে সমুদ্রের সর্বশেষ সংস্করণ
মায়ের মুখে তাকিয়েই পেয়েছি এর সরল অনুবাদ।
পুষ্পক, ফলদ
গাছের পুত্র ফল। পোশাকের সন্তান দেহ।
হে গান্ধর্ব, কাকে তুমি বিবাহ করিবে?
সপুষ্পক বলে যার পেটে রেখেছিলে বীজ―
শরীরে কাঁটা আর হাতে হাতে ফুল নিয়ে সে হয়ে আছে মান্দার।
জনৈক ধাত্রী একদিন সঘর তলপেট খুলে প্রত্যাশা করবে
আলো আর পৃথিবী; ঝড় এলে, ঘূর্ণি এলে ভিজিয়ে নেবে সম্ভবার খিল।
অনাগত হে, দ্বিধাকর্ণ বলো, এবার কাকে তুমি মানবে জনক?
শোনো তবে ফলিত, দরজা জেনে যেখানে আমরা পেতে চাই শ্রয়
তারই অদৃষ্ট দূরে, ঘাপটি থাকে কোনো এক জল্লাদ।
ফলে, চিত্রল বাঘ ও মায়াহরিণ জগতে সকলে আমরা যেন
খাদ্য-খাদকের ঘূর্ণ চাকতিতে লোলিত তদ্ভব, অপলা কারক।
কস্টিউম বনাম শরীর অথবা কাঠামো সমাচার
শরীর ধরে মারো টান―শব্দ হবে মাড়াই মাড়াই।
এবার বলি, আমাদের মুগ্ধতা ধানবাচক হলে
কী এমন ক্ষতি হতো রে লখাই?
শোনরে বিধান, যার ঘরে মহিষ আছে,  ইঁদুর নাই―
সে কেমনে জানবে গোলাঘরের মাধুর্য কুটকুট?
তুইও শরীর, সাথী সয়ম্ভরের,  দেহস্বরে জানতিস যদি,
ঘরে এনেছে যারা গান্ধারধ্বনি―নাচ কেন মোহন পরিচয়?
ও মন,  পাপড়ির কাঠামো তোর,  জানে সর্বজনা―
আরও চিত্রল ইতিহাস লিখেছিস আয়ুর বিবিধ খৎনায়―
ফলে, তোর জিভে আরজ নিশ্চয়, আমিষ জাতের ট্যাটু আঁকা
যে কল্পনায়,  একই ঘরে শুয়েবসে কীভাবে হয় পৃথক পর্বে হৃদয়চাষ?
জীবন,  বেঁচে থাকা পেয়ারা আমার, ভাবতেই এক পরিখা রহমত―
এই দুরাশয় নাট্টমে এলিয়েন বোধহয়
মানুষের,   শরীরের,  হৃদয়ের পোশাকধোয়া ব্যবহারিক লোগো-পরিচয়!
ব্যবহারিক
চোখ দেখেছিল, আমার সিঁড়ি কার বন্দিশ করতে করতে উপরে উঠে যায়। এদিকে আমি আলোর শরীর নিয়ে নদীর ভরসায় মোম গেড়ে বসে থাকি। উঁচুত্যকা আশকারা দেয়―কানকথায় মুকুট ছুঁয়ে আসতে বলে―রাবণসম্প্রদায় জানে না, আমি সমতলকে কথা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘাটোয়াল। কথার সঙ্গে কথা বলি। হৃদয়ভাণ্ডকে বোঝাই এ আমার আনন্দলোক―নাচুকের ঘুঙুর থেকে একটি পালক ছিটকে গেলে সে দায় তোমার করতালির।
ব্যবচ্ছেদের নীল অংশকে ডাকুন পূর্ণিমা কলোনি
শরীর থেকে চিকিৎসা পৃথক হবার পর
সাত রামদার কোপ নিয়ে একজন দুর্ধর্ষ
সার্কাস পায়ে দৌড়াচ্ছে
উত্তর গোলার্ধ ছুড়ে দিচ্ছে চাঁদে
দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের মতো তাগড়া বর্ম নিয়ে
রসাতলবাসীদের উঠিয়ে দিচ্ছে পাতালে।
পিঁপড়ের পায়ে আহত হচ্ছে সুখ সম্পর্কিত
একদল স্পাই জাহাজ
জেদি গোঁয়ার যুবকের বুক ও পিঠে অহেতুক ঝরে পড়ছে
রক্ত নয়, বিষাদের তরল পূর্ণিমা
মিসেস অরবিন্দ হয়তো জানেন, আমার
বাবার মায়ের বিশ্বনাম হাসি
মাটিতে তিনি এঁকে চলছেন পানবুক ত্রিভুজ রঙের চারুকলা।
আর আমি লালঝরা দিনে দেখছি, ঠাকুমা
লেপে দিচ্ছেন আকাশ আকাশ আলকাতরা।
কবিতাভাবনা
কবিতা এক ধরনের ব্যক্তিগত দিনলিপির প্রচারণা
আমরা কী এমন মহৎ কাজ করি যে,একজন ডেভেলপারকে বলা হয় না তাঁর টাওয়ার ভাবনা লিখতে,একজন কৃষককে তো নয়ই,সুইপারকেও না। আমাকে বলা হচ্ছে! তাহলে কি ধরে নেব,এই পৃথিবীতে তাদের কোনো বিশেষ অবদান নাই। যা করি তা শুধু আমি-তুমি। এমন প্রস্তাবে বুঝে কূল পাচ্ছি না আমি ধন্য হবো নাকি দৈন্য বোধ করব। যা হোক আমাকে লিখতে বলা হয়েছে,মনিটরের সামনে বসে বারবার ভাবছি,‘কবিতা ভাবনা’ জিনিসটা কি? যা লিখি তাই আমার কবিতা,আমার ভাবনা। এখানে লুকোনোর কি কিছু আছে? যদি থেকে থাকে আমি জোর গলায় বলছি,আজ অব্দি কিচ্ছু লুকাইনি,লুকাবোও না। একজন কবির ব্যক্তিগত বলে কিছু থাকে না,আমারও নেই। কাউকে কোনো দিন খুন করে থাকলে- সেটাও আমার সময়ে যথার্থ প্রকাশ করে দেব।
কেটে ছিঁড়ে যাচ্ছে,রক্ত বের হচ্ছে না। তাহলে কি ভেতরকার ছিন্ন ভিন্ন যন্ত্রণা উগড়ে দেয়াই আমার আনন্দ- আমার কবিতা? হয়তো তাই। নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না এই কারণে যে,আমার চাহিদা মৌলিক হোক- পারটিকুলার হোক। নিয়ত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকছে না,থাকবার সুযোগ নেই। ধরা যাক,সকালে আমি সাধারণত নাস্তা করি ডিম-পরোটা দিয়ে। অন্যদিন সময়কে মৃত গরুর মতো টেনে নিয়ে দুপুর ২টা বাজলে উদরপূর্তি করি। আপনারা বলেন,লাঞ্চ।
তাহলে দাঁড়ালো আমার ব্যক্তিগত রুটিন নেই। এই যে অগোছালো জীবন! আর হিজিবিজি যাপনের মধ্য দিয়ে লেখা হয়ে যাচ্ছে আমার দিনলিপি। এসে যাচ্ছে আগামী দিন। বেঁচে থাকলে লিখব,লিখবই। লেখার কোনো বিকল্প নেই। আর যাপনের সকল অনিবার্যতা নিয়ে পাল্টে যাবে আমার কবিতা,ভাবনাও।
কবি পরিচিতি
বাবা : অমল কৃষ্ণ চক্রবর্তী। মা : শ্যামলী রানি চক্রবর্তী। জন্মদিন : ১১ আগস্ট ১৯৮৬। জন্মস্থান : রায়পাড়া সদরদী, ভাঙ্গা,ফরিদপুর,বাংলাদেশ।
কবিতার বই : ছায়া কর্মশালা (২০১৩),সারামুখে ব্যান্ডেজ (২০১৬),নাচুকের মশলা (২০১৮) ও রাত্রির রঙ বিবাহ (২০১৯), অতিচল্লিশ ইন্দ্রিয়দোষ (ফেব্রুয়ারি ২০২০) ও ছিটমহলচিহ্নিত (ফেব্রুয়ারি ২০২০)। সম্পাদিত গ্রন্থ : দ্বিতীয় দশকের কবিতা (ফেব্রুয়ারি ২০১৬); অখণ্ড বাংলার দ্বিতীয় দশকের কবিতা (ডিসেম্বর ২০১৬); একজন উজ্জ্বল মাছ বিনয় মজুমদার (ফেব্রুয়ারি ২০১৯); বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠকবিতা (ফেব্রুয়ারি ২০২০)। সম্পাদক : মাদুলি (বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পত্রিকা)। ইমেইল : aro.maduli@gmail.com মোবাইল : ০১৭৫৭১৫০৬২৫ / ০১৮৫২০৪৬০২৮

সংযোজন

পড়ুন এর আগে প্রকাশিত এই সিরিজের প্রকাশিত অনুভব আহমেদ-এর কবিতা

এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা >> অনুভব আহমেদ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

Share Now শেয়ার করুন