এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> সারাজাত সৌম >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
581

স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

দতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

ঢিল

এখানে এসো
আর মিলিয়ে যাও
মুখ, মথেরা আমার

লোহা পোড়ানো হচ্ছে, বাজারে
কামারের পেশি⎯শিল্প মনে হচ্ছে
দূর থেকে, ঠান্ডা বাতাসে
শুধু এই শীতের জন্য।

কে পাঠাচ্ছে?

তুমি সেই রাগী বেড়াল
লেজ ফুলিয়ে
যেন রোদকে শাসন করছ।

এটা ছোট্ট দিন
আমি আমার ঘুম ভাঙতে চাই না

তুমি এসো, যমদূত
এখানে কয়লা পড়ে আছে
ধুয়ে দাও। মগজ

আর ডেকো না আমাকে।

কী বলতে এসেছিলাম
তার কিছুই বলতে পারিনি
যদিও আমি, ঈশ্বরের ছোড়া পাথর

কখনও কখনও হয়তো
একটুআধটু জ্বলে উঠি কোথাও
অন্য কোথাও

জানি এর কোনো শর্ত নেই!

তবুও এসো, মিলিয়ে নাও
আমরা হাঁটতে হাঁটতে
যখন লাফিয়ে উঠব বাতাসে

দ্যাখো, শেষবারের মতো
শেষবার বাতি নেভার আগে
যেভাবে জ্বলে ওঠে
হঠাৎ, আলো!
তারপর আমি যাই
আরও দূরে, আকাশ থেকে ঢিল মারি

আমার চোখের মণি।

জুতা

আমার জুতা হারিয়ে গেছে।

এখানেওখানে, যারা জানত
তারা সুন্দরী ছিল এককালে
কিন্তু পিতলের আয়না
সে রূপকথার মতো, আম্মা বলতেন
বাছা, তোর তো পালাবার পথ নেই আর।

দেখ, প্রাচীন এই পেট
তুই যখন এখানে থাকতি, অন্ধকার
তাদের ভালোবাসতি তুই

পানির ভেতর, মৃৎমৎস্য ছিলি আমার।

সমস্ত ঋতু দিয়ে বানানো সে পুকুর ঘাট
ও গোলাপ, ও জবা
তুই কি শুধুই লাল?

যেন এই প্রথম লজ্জা
আমাকে ছুঁয়ে মরে গেছে গতকাল!

তবু বলি আয়, আয় এখানে
এই পেটের ভেতর
আবার নতুন করে জুতা বানানো শুরু করি

তোর মতো এক পাগলের আশায়।

ডুব

যে আমাকে প্রশ্ন করল,
সে কিছুই না
যদি এমন বাতাসের কাছে গিয়ে রোজ
আমি মারা যাই
কিংবা, আমার দিকে

তাকিয়ে তুমি ছোট্ট একটি ভাষার মতো
তাকে আদর দাও⎯আর বলো কিছুই না!

এই দেখা,
অন্য কিছুর সাথে কিছুই মেলে না
অথচ পাতার নিচে পিঁপড়ের সম্মেলন
যুদ্ধ আর মুক্তির চেয়েও
তারা সুন্দর নৃ

বিস্ফোরণের আগের রাত, এটা আশ্চর্য
আমাকে সব দেখাওকিন্তু সে আমি না!

ভাবি, প্রতিটি ছকের সাথেই
ধাক্কা হবে আমার
কোথাও শব্দ হবে আবার হবে না!
মৃদু রেণুর ভেতর
পাখি ও ফুলের সম্পর্ক কী ?

কে জানে? শুধু কাঁচকান্নার মতো এই দৃশ্য
যেন যাবতীয় যন্ত্রতারা কোথাও স্থির না!

কিভাবে দেখি তোমাকে
মৃত্যু কি এমন অভয়
বাতাসকে ফাঁকি দিয়ে যাওয়া
একটি ফুল
আমাকে বিশ্বাস করে ফোটে,
দূরের হাওয়ায়

যে কাঠবিড়ালি বিগড়ে যায় রোজ হঠাৎ হঠাৎ
সেও তো হৃদয়বনের ছোট্ট এক পরিখা

দমের উপর বসে যে আঁকছে
চোখের মণি
আর তোমার প্রতিবিম্ব।

ওখানে কে আমি?

ছোট্ট গাছের শরীর, পোকা খাওয়ার সুর
গৃধিনীর গুঞ্জনে ভারি এ ঘর, জাহাজ যেন
আমাকে নিয়ে যায়। কিন্তু কোথাও যাচ্ছি না!

কালো কৃষক,
তুমি শস্য বানাও। হালকা
এবং মিষ্টিকিছুটা বিষ,
লালের গভীরে
সে সূর্যাস্তের শার্ট আমার!
গৃহিণীর আঙুল

তাকে জোড়া লাগাচ্ছে রাত্রি দিয়ে, আকাশ
কে নিবে এখন? কেউ তা জানে না!

তবু কথার কয়েন
বাজি ধরতে পারি আমি
এটা পরিবর্তনযোগ্য,
টস করছে কেউ গাছে

ছায়া আর শরীরের ভেতর ছাতারের দল

কেউ কেউ ধূলিতে ডুব দিয়ে
আর ভাসছে না।

গীত

অঙ্গ না হও
এই হাওয়া সত্য, পুকুর ঘাটে
অর্ধ স্নানরত চুলে

যদি একটু ঘুরে তাকাও
পাখির উপর চোখ রাখো

ছোট্ট নয় সে আলো
কী জানি ভাবলে, বলো?

ডুব দাও, শরীর ভাসাও
জলের উপর মৃদু তরঙ্গ
যেন একটি অসামান্য নাও!

কিভাবে বলি, গাছের শরীর⎯
পাখি সত্যসত্য যেদিকে তাকাও

বনের ধুলা চোখ মেরেছে
গাছে! পাতার শরীর জুড়ে

ফুটছে দূরে, তুমি গ্রামের মেয়ে
জানি, ঋতুভরা ফুল ফুল গন্ধে
লেখা সে নাম আমার স্কন্ধে

আহা! এভাবে কেন যাও
কোথায় যে কী হারাও

ভাবি, গৃহবধূ এক কিশোরী
না হওয়া সেইসব হাঁস

জলের নিচে ডুবে গিয়ে মিথ
মাটির গভীরে ঘুমিয়ে পড়েছে আজ
হারানো সেইসব সোনার গীত

তুমি একটু কথা কও।

অনঙ্গ

আমার তাই হলো
তিনি যা চাইলনে।

আমি জন্মালাম
আমি ভালোবাসলাম
আমি মারা গেলাম

তিনি যা চাইলনে
তাই তো হলো।

এবং আমি আমার
আত্মা নিয়ে উড়তে থাকলাম
একটি পাখি মতো

দূরে, অনঙ্গ বাহানায়।

যেন নিজের দিকে তাকালেও
তোমাকেই দেখতে পাই।

কবিতা ভাবনা

শুধু কবিতা নয় বরং আমার যা কিছু ভাবনা বা কল্পনা তার সবই আমার মন দ্বারা প্রভাবিত এবং মন দিয়েই তা দেখতে এবং বুঝতেও চাই। এর বাইরে আমি যাই না, এমনকি যেতেও পারি না আর যেতে চাইও না।

সারাজাত সৌম-এর জন্ম ১৯৮৪ সালের ২৫ এপ্রিল, ময়মনসিংহে। পেশা চাকরি।
প্রকাশিত বই : একাই হাঁটছি পাগল এবং নুর নুর বলে চমকায় পাখি।