এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> সালেহীন শিপ্রা >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
54

সম্পাদকীয়

দতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।

সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

রণদৌড়ের ঘোড়া

তুমি সুন্দর, তুমি শারীরিক
বসন্তের কাম আলুথালু
ফুলদের পাশে শুয়ে শুয়ে
দেখে যাচ্ছি।

কথা কমছে, শ্বাস বাড়ছেই
মাথাভর্তি যেন চুল নয়,
কচি ধানক্ষেত
আঙুল ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে খুব হচ্ছে।
রণদৌড়ের ঘোড়া যেন এক
এসে সামনেই নত, বলছে—
আর কিছু নয়, দিগ্বিজয় নয়
চাই তোমাকেই, হৃদয় টলছে।
ধরছ না, হায়, এমন তপ্ত
গলিত লোহা এ
আগ্নেয়মুখে অগ্নিস্নানে লাল…

প্রেম নাকি পাপ
কটেজের রাত মুছে দিচ্ছে এ সমস্তই।
মনে পড়ছে না সেই ব্যথাদেরও যারা
প্রশমিত হতে পারে নাই।
ওই বাহুডাল যেন রাস্তাই,
দুর্ঘটনার নেই শঙ্কাও।
ফোঁটা বৃষ্টির মতো রোমকূপ জুড়ে কম্পন,
তুমি কাঁপছ, কী যে টের পাই!
স্তনবৃন্ত এত ভালো লাগে যেন সমতলে
অমসৃণ গোল ভূমি আর সামান্য ঝোপঝাড়
নাকে ঘষছি।

তির্যক চোখ
তৃষ্ণার বনোভূমিতেই পথ হারিয়েছে,
তাতে ঝরাপাতা ঝ’রে পাতার উপর,
মৃদু ঝরে পড়ার শব্দ।
শীৎকারও এই সুনসানে এক সাইলেন্ট রূপমাত্র,
অধীর ঝর্না পাথর-খাঁজে ছড়ার চলন বুঝে নিচ্ছে।

এত তীব্র যেন সূর্য—
ঝুমসন্ধ্যায়
সাগর-জলে ঢুকে যাচ্ছ।
এই দৃশ্যও
যত সত্য তত মিথ্যে,
জানি অন্য আরেক দেশে
তুমি সকালের রোদ হচ্ছ।

রঙ

বিচূর্ণ হওয়ার রাত
আরো ধীর, নম্র হয়ে আসি।
ঘৃণামেঘ সরে না গেলেই
শহর তলায় ঝড়ে,
চোখের উত্তাপসম রৌদ্রভাসিত মুখ
কাঁপে, মুছে যেতে থাকে।

জাহাজ ডুবানো হাওয়া
বাড়ি খায় দালানে দালানে
‘ফিরে আসব’ বলে
না ফেরা সে মৃত নাবিকের আকাঙ্ক্ষাসমেত।

এই ছলোছলো ঘুম
নত অন্ধকারটিকে
যে রঙে ডুবিয়ে দিতে চায়
সে জানে না
মেরুন কি রঙ নাকি রঙের চিৎকার।

অন্য পৃথিবী

ছায়ার ওপর থেকে ছায়া সরে গেলে
দৃশ্যত হেরফের নাই ৷
জবুথবু রোদের ভেতর তোমাদের কেমনকেমন স্বর;
মূর্ত হয় ফণীমনসার ঝোপ, কাঁটাবিদ্ধ আলো ৷
প্রাত্যহিক জীবন তো ভুলে গেছে
কতটা নিঃশব্দে কোনো নিঃস্ব হাত
প্রতীক্ষায় থাকে ৷

কাঁটাতার সরে যায়
অখন্ডিত পৃথিবীর স্বপ্নের ভেতর ৷
বস্তুত বিবাদঋতু
হাতের ওপর থেকে হাত সরে যায় ৷

বিষাদের গান

রাতভর শঙ্খনিনাদ ৷ ঘুমের দুর্গে এক সুঁইচোরা পাখি শুধু জেগে আছি, বুকের পাশে ঘুমন্ত রাজকন্যার মুখ- নীড়ের শান্তি খেলা করে ৷ আর সেই গোপন রুমাল কেবলি উড়ে যেতে চায় বাতাসে…
আমি ডাল হয়ে আটকাই , মেঘ হই , অবশেষে আকাশও হলাম ৷ তোমার নামটি লিখে পৃথিবীর একপাশে ধরে আছি রাত্রি-রুমাল ৷
বিনিদ্র রাতের ঘ্রাণে কিভাবে যে মিশে যায় তোমার চুলের ঘ্রাণ ! প্রশ্ন করো না ৷বরং ঘুমাও চাঁদ, ঘুমাও প্রশান্ত মুখ,বিনম্র চোখের পাতা, বিষাদের গান ৷

প্রবল প্রকাশ্য প্রেম থেকে

কেন উড়তে পারছি না !
আমায় টেনে ধরছে এক
নীল অবাক প্রজাপতি,
তার পালকে আঁকা মেঘ ৷

এই মগ্ন চাঁপা ভোর
তোমার শূন্যতাকে ঘিরে
ছেঁড়া পেঁয়াজ-খোসা যেন
ভেসে যাচ্ছে কোথা উড়ে !

অই দুপুর রোদের দিকে
কারো মাতাল করা ঘাম
আমায় উসকানি দেয় ঘ্রান,
তোমায় দেখতে দাঁড়ালাম ।

একা শরীর ব্যথার মোড়ে
দুটো মন খারাপের রং
আড্ডা জমায়, উড়িয়ে নিল
ছোট্ট চায়ের টং ।

আহা, মন খারাপের রঙে
কেন আষাঢ় নেমে আসে
কারও না থাকাকে ঘিরে
ফোটে কদম বারো মাসে ৷

তুমুল বৃষ্টি এবং স্মৃতি
বিষাদ হচ্ছে শুধুই গাঢ়
প্রবল প্রকাশ্য প্রেম থেকে
আমি গুটিয়ে যাচ্ছি আরো ৷