এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> নাহিদ ধ্রুব >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
567

নাহিদ ধ্রুব >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।

সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংখ্যা : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

নিজস্ব ছায়ার প্রতি

বেদনার মূল্য যদি দিতো মানুষ
আমি হতাম এ জগতের বাদশা

ছায়াপথ

তোমাদের নাম আমি ভুলে গেছি।
তুমি কোন গ্রহ? কার পাশে থাকো?
ভালবাসো পৃথিবীকে?

খুব সুন্দর ঘ্রাণ নীরবতার মতো মনে আসে

ডানে গিয়ে দেখি অনন্ত রাত —
উপরে তাকালে এলোমেলো ছায়াপথ
আর একা চাঁদ দুটো নক্ষত্রের
দূরত্ব মাপে

একবার মনে হয় আমি চাঁদ
কখনও নিজেরে নক্ষত্র ভাবি

এই ব্রহ্মাণ্ডের কোন দুঃখই নতুন না —
তবু নিজেরে সবচেয়ে
দুঃখী লাগে

লং ড্রাইভ অন অ্যা রেইনি নাইট

বৃষ্টির ফোটাগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ছে উইন্ডশিল্ডে। ছমছমে রাত্রির পেট চিড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হেডলাইটের আলো। হারিকেনের ঢিমঢিমে আলোর মতো মৃদুসুরে বেজে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের গান। শৈশবের বিলের স্মৃতি নিয়ে এলো বাতাস — কালো মেঘের মতো তোমার চুল এসে পড়ছে মুখে। তোমার মুখে ফোটা ফোটা নিসর্গের ছবি। কোন তাড়া নেই। হাইওয়েতে বৃষ্টি — তুমি আমি আর বৃক্ষরাজি।

বাতাসের নাম

অনেক প্রার্থনার পর ভর দুপুরে ফেরেশতার মতো সন্ধ্যা নেমে এলো। যখন ভাবছি মিলায়ে যাবো অন্ধকারে — তখন আকাশের মতো বিস্তৃত ঝাউবনে দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো আগুন। নিষ্প্রাণ সূর্যমুখী হঠাৎ গেয়ে উঠলো বেথোভেনের নবম সিম্ফনি; উদাসীনতার দিকে তাকায়ে দেখি — স্কাইওয়ে, স্কার্ফেও কী ভীষণ নগ্ন তুমি!

বিবর্ণ কাঁচে দীর্ঘশ্বাসের মতো আটকে পড়ে কিছু অদৃশ্য দিন। মনে মনে আওড়াই বাতাসের নাম। আয়নার পাশে কান খাড়া করে বসে থাকি — শুনি সে গাছের কথা, যে কাটায়েছে জীবন পাতাহীন।

নৈঃশব্দ্যে

শুধু নৈঃশব্দ্যে                  তারে পাই
ঘোর একাকীত্বে               মনে পড়ে
এমন ব্যথা নিয়ে              এ জগতে
দেখি অন্ধকারে
সে যেন দাঁড়ায়েছে         এসে দ্বারে

বছর গেছে চলে              তিন চার
তার হয়েছে সুখ              সংসার
জোয়ারভাটা তবু             আসে যায়
কোথাও সুখ আছে
হয়তো চারপাশে
আমার কেন যেন           কিছু নাই!

রাতকে ভালবেসে         ওঠে চাঁদ
আকাশে নির্জন             মেঘনাদ
হৃদয় ছোট এতো
কোথাও আছে ক্ষত
মানুষ বলে শুধু             ভুলে যাও
জগতে আছে কতো       অনুতাপ

যা কিছু দেখা যায়        খালি চোখে
সুন্দর রয়েছে               তার মাঝে
এমন কেন শুধু           মনে হয়?
এই যে বারবার
দেখছি চলে যাওয়া
এভাবে প্রেম শুধু         বেড়ে যায়।

যা ছিল আমাদের
যা রয়েছে স্বপ্নে
যা কিছু ভালবাসি        মুছে যায়
এসবে আমি যেন        তারে পাই।

কবিতাভাবনা

অন্তর্জগতের দিকে যখন তাকাই তখন দেখি একটা বিষণ্ণ ঘুঘু বসে আছে হিজল গাছের ডালে, বহির্জগতে তখন হয়তো কেউ পাখি শিকারে যাচ্ছে। আমি এইসব দেখি, অনুভব করি আর করতে করতে একসময় মনে হয় কাউকে ডেকে পাখিদের ভাষায় শোনাই নদীদের গান। নির্মাণ থেকে নির্মাণ… দৃশ্য থেকে দৃশ্য… গাছ থেকে ঝরাপাতা… গন্তব্য তো এমনই। একটা নিঃসঙ্গ সন্ধ্যা তো জ্যোৎস্নার কাছেই যাবে। তাই না? মানুষের সাথেই আমার সমস্ত কাজ কিংবা মানুষ বলতে আমি যা বুঝি তার সাথে। এই বোঝাপড়াগুলো বলার একটা মাধ্যম হয়তো কবিতা। অন্তঃসারশূন্য জীবনে যদি তুমি পড়!

নাহিদ ধ্রুব : জন্ম ২ ডিসেম্বর ১৯৯১, বরিশাল। মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজমে স্নাতক। প্রকাশিত কবিতার বই : মৃত্যুর মতো বানোয়াট, থাকে শুধু আলেয়া। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : হিম বাতাসের জীবন। সেল ফোন : 01622-879877, ইমেইল : dhubonahid@gmail.com

Share Now শেয়ার করুন