এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> নীহার লিখন >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
463

নীহার লিখন >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ 

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।

সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংখ্যা : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

হসন্তের মতো

হসন্তের মতো কোনো মানুষটাও দেখা যায়, যারা আদত সংখ্যাগুরু, ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত ভূগোল জুড়েই যারা হয়ে আছে হেলেঞ্চা লতার মতন বিস্তার

যারা পরিতাপে পোড়ারও অবসর পায় না কোথাও কোনো স্পেইসে, যারা পায়ের তলায় থাকে, মাটির মতোই
কিন্তু পায়ের স্পর্শ পায় না, জুতাটি ঢেকে রাখে তাঁর ন্যূনতম সেই অধিকার

এমন একটা মানুষের প্রেমে তুমি পড়েছো যখন প্রিয়তমা, কী করি তখন বলোতো! যখন ঠোঁটের ফাঁকে, গুঁজে দিতে চাও বরফ-শীতল এক চুমা

চোখ আমার নেই, নিভে গেছে জন্মের পরেই, মস্তিষ্ক হয়ে গ্যাছে গোলামের ঘামের মতন

হাত দুটো ধরে আছে পৃথিবীর সমস্ত ভর,
যার পেটের ভিতরে থাকে তোমাদের ঘর

বিনয় সেদ্ধ ঢেঁড়শ খেতো

জীবনের শেষ কিছু দিনে বিনয় কোথাও একটা থালা পেতে ধরতো কয়েকটা সেদ্ধ ঢেঁড়শ সাথে সামান্য গরম ভাতের জন্যে, দিনে এক-কী-দুবার

পড়ন্ত বস্তুর সূত্র মেনে পৃথিবীতে তাঁর পাতে পড়তো সেসব উপাদেয়, ধোঁয়াটে গ্রামের কোনো চিপাগলি দিয়ে সে চলে এসেছিলো এক স্থানে, দূরে রেখে আরেকটা পৃথিবী, প্রস্ফুটিত কলকাতার মতো সব নগর

বিনয় এখন নেই, পৃথিবী এখনো আছে, আছে ঢেরশেরা, তাদের যখন কাপাস তুলার মতো ফুল ফোটে, তখন ঝকঝক করে ওঠে আশপাশ

বিনয় এই ঢেঁরশের সেদ্ধ পেলে, একসময় খুব খুশি হয়ে যেতেন, এই পৃথিবীতে

গায়েত্রী দেবী এসবের কিছুই জানতেন না, তিনি ঢেঁরশ খেতের পাশে কোনোদিনই দেখবে না; বিনয় বসে আছে থুম ধরা একা একটি সারস, যার ছায়া ক্রমশ অস্ত যাচ্ছে, আর দেখা যাচ্ছে না

বিকল বিষাদ

সমাহিত হয় না নদী, অথবা জলজ; মেঘমল্লার কথা দূরে শোনা গেছে এক অগুনতি কাল, অথচ আগুন জানি সমনের রঙ; জবানটা চিড়ে, চিটে ওড়া বাতাসে আমিও, সলতা মেলেছি কোনে আগুনের বাউরি প্রদীপ।

ভুলা গানের মাটিতে গড়িয়ে নেমেছে নুলা নীরব ঝুমুর, তমাল পাতার ছায়া ভুলে যাওয়া বেমালুম দেশে, আমার তো আর মনে নাই, সেই কাটা মুখ, মনেও আসে না কোনো পার্বতী দিন,ঝুলন জরিনে থাকা অলঙ্করণ মুছে সকাল নামে; পাথারে পবন।

ট্রেইন লাইন ধরে হুইসাল অপেক্ষা নিয়ে থাকি কার?
কর্পুরে উড়ছে কফিন তুলা বায়ু, পাখি উড়ে গেছে আশ্বিন কালে, আমার ঠিকানা আজও তোমার নিদান,ঘুম ভেঙে গেলে পরে শিশুরা যেমন কাঁদে দুপুর গড়ালে।

পাড় ক্ষয়ে যাওয়া এক অবেলার দিনে, বিছানার কেন্দ্রটা তাকেও কী গ্রাস করে স্থিতি জড়তায়! যেমন আমিটা; কখনো আমার থেকে উঠে আসি নাই, অথচ দেখেছি বহূ উড়ুক্কু গাছ, থুম ধরে হেঁটে গেছে অনুপ্রাসের মুখে যেন এক দাড়কিনা মাছ; স্বচ্ছ জলের পরে ফোটা ফোটা তুলছে জীবন, পাতা কি আসলে তবে মাটির ত্বরণ!

বহুবার এমন শুনেছি এক পতন বিভোরতা উপলের,
পা ঠেলা গাড়ির ছায়ায়, বিবষ ঘুমের কোনো মাদি কুকুরের আপাত ভূবনে আমিও, একটু জারুল ফুল যদি ফেলে রাখি মনে, তাতে পৃথিবীর কমতি পড়ে কি কোনো সুখ, একান্নবর্তী এক উঠানের কবুতর কুট মুখে নিয়ে আদতে প্রহসন রেখে যায় বেভুলা মাঠে।

এসব কিছুকে আমি এড়িয়ে মাড়িয়ে কবে আসতে পেরেছি এক দরগার পাকুর তলায়?
কুন্তির ছেলে যদি হই, বরফ কী গছবে আমায়!
নতুবা আরেকটা কোনো কুরুর সমরে আমি অন্তর্যামী সায়রী; কোথাও কি যেতে পারি গহীন ছায়ায়! লাল আগুনওতো পোহাতে গেলেই দেখেছি, কেমন যানি এক নীল হয়ে যায়, লীন এক ছাই হয়ে ওড়ে ধোঁয়া হেতালের ডালে।

তবু কিসের এক গৌরবে এখনো তেমনই আছো দূরপরবাসে, কদম ফোটার দিন ঘুরে-ফিরে আসে,
ফিরে আসে অযথার পাতার বিকাল, কালো পাখিদের রূপ, শীতের বিষুব ।

নিয়ম জানে না সেও, আর কিছু না, শুধু নিজেকে রাখেই একা থামা ওয়াগন; মর্চে পড়ার পরও নিয়তির মতো এক বিকল বিশাদ; সাপেক্ষে তার থাকে বুনো ঘাস-দামী, সময়কে নাড়ে, এমনকি ছায়াও, এদিক-ওদিক হলে স্নায়ুকোষ জমে; কমে বাড়ে।

এসব ভেবেছি আমি তুমি চলে গেলে,সামান্য বলে ভূভাগে তেমন কিছু নাই; শুকনো দিনেও দেখি সাজোয়া যানের মতো তেড়ে আসে আকাশ, যেভাবে তুমিও; ফাঁক পেলে খুলে ধরো পাপড়িগুলো, দিনশেষে আমিও যেমন করে সব ভুলে যাই

মাঝরাতের কবিতা

পৃথিবী শব্দটা বদলে, অন্য একটা শব্দে পৃথিবীকে লিখতে ইচ্ছে করে আমার, প্রতিটা মাঝরাতে

জানি না কী কারণে এমন ইচ্ছা হয় রাত বেড়ে গেলেই

এমন তো না যে, মাঝরাতে রাতের অন্য কোনো রূপ বা অরূপ প্রকাশিত হতে দেখি আমি রাস্তায় শুয়ে থাকা কুকুরের ডাকে, গলির অন্ধকারে, বাতাসের আওয়াজে

বরং কিছুই দেখি না কোনোদিন তেমন নতুন,
যার জন্যে বদলে ফেলতে ইচ্ছে করতে পারে অনেক কিছুই

উল্টো আরও মনে হয় একটা ওল্টানো বাটির থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে পৃথিবী, কোনো জলটার মতোন মাটিতেই ফুঁসে যাচ্ছে সে

তারপরও মাঝরাতে কী এক মাজেজা যেন আমি টের পাই এই পৃথিবীর, আকাশ অথবা শূন্যে; মনে আসে অন্য বিষয়

মাঝরাতে শুধু মনে হয় পৃথিবীতে পৃথিবী থাকে না

কারণ জানি না, শুধু মনে হয় মাঝরাতে তাঁর অন্য একটা নাম ডাকনামের হলেও কোনো, রাখাটা উচিত, এর কারণ হয়তো কিছু নাই, কারণ বলতে যা বোঝায়

রাজধানী

রাজধানী বলে একটা হামুখ আছে আমাদের, এই দেশে, যার পেটটা অনেক মোটা, তাঁর অনেক মহিমা ও শোভা, তাঁর ভিতরে মানুষ কেউ ঢুকলে পরেই, কিছুদিন বাদে আর আগের রংটা থাকে না

তেলেসমাতির কেবল একটাই স্থান আছে আমাদের এই কোটি কোটি মানুষের খোঁজে, যার দূনির্বার আকর্ষণে খাল-বিল-পাহাড়-হাওর ফেলে সাইবেরিয়ার শীত পাখিদের মতো সবাই দলে বলে ছুটে আসতে চায় এখানে, এখানে রাজা-রাজরারা থাকেন, গাড়ি-ঘোড়া আর কত ইমারত দেখে মনে হয় জগতে সবাই খুব সুখী আর সুশ্রী, সুন্দর

একসময় উত্তরবঙ্গে প্রচণ্ড মঙ্গা হতো, তেমন ছিলো না কাজ বলার মতন বরিশালে, রাজশাহী কিম্বা অন্য কোথাও; ময়মনসিংহে শুধু মাগনাই পাওয়া যায় সুপেয় জলটা, ফলে চরের দিকে কিছু সব্জি ও ধান, এছাড়া তেমন কিছু দেখার মতন কই জীবনে এথায়!

আমাদের কোটি কোটি মানুষ তাই ঝুক বুঝে টুপ করে চলে আসে এই মেগা-নগড়ে, ভবন আর টাকা ও ফুডাংগির ভাব দড়িয়ায়, একসময় তারা এর নাড়ি-নক্ষত্রে প্যাঁচিয়ে যায় দেউরি বাড়ির বুনো মেহেদী গাছের সব হিজিবিজি শরীরের মতো

এবং তাঁরা এভাবেই একদিন রাজধানীর অতন্ত্র প্রহরী হয়ে যায়, তাদের জাত্যাভিমানে যুক্ত হয় আধুনিক কতশত কালচারাল ভাব-নন্দন, তারা এক্সেটিক একটা সৌভাগ্য পায়; স্পা,পার্ক, বার, কার, চাইনিজ খাবারের রেস্তোরাঁটায়
তাদের উন্নত রুচি আর কায়দার ছেলেপুলে ঘরে বসে বিদেশের সাথে একযোগে পাল্লা মারে, বিশ্বের সামনে দেশকে আগায়

তাদের মধ্যেই কেউ কেউ খুব কেমন জানি হয় খুব অদ্ভুত
এতো কিছুর পরেও তাদের মনে থাকে বিস্মৃত খাল, বিল, পাহাড়, হাওর

ফাঁক পেলেই তারা পাতার বাঁশির মতো ফুঁপিয়ে কাঁদেন

কাব্যভাবনা

সত্যি বলতে আমি কবিতা লিখতে বসে আমার ভেতরের একটা নিরীহ মানুষের কথা লিখি। জগতে সে এমন একটা মানুষ, যে কখনো তাঁর অস্তিত্বের প্রশ্নেও সবিশেষ সিদ্ধান্তটি নিতে পারে না, বরং সে এক ফ্যালাসির ভেতরে বসে স্ফটিক দেখতে চায় সভ্যতার, ন্যায্যতার আর সুন্দরের, কিন্তু খুব নিভৃতির চোখ দিয়ে। সাদা দৃষ্টিতে দেখতে গেলে এক পলায়নপর মানুষটিকেই আমি লিখি কয়েকটা মহাযুদ্ধের পরের মানুষের পৃথিবীতে কী যেন এক নির্মিতির ছলে। মনে করি কথা বলা জরুরি এবং তা বল্লমের মতোই, বোমারু বিমানের মতোই বা কোনো ধানের গোলার মতোই । কবিতা আমার কাছে সত্যের একটা কাঠি যার দ্বারা অসংখ্য সত্যকে নিংড়ানো যায়, যেহেতু আমার বোধ অন্যের সাথে মেলাবার কোনো পার্থিব কিছু আমি পাই না যুতের, তাই শব্দে তাকে গড়িয়ে আনতে চাই, তার জন্যে তাড়না ও ব্যাকুলতা আছে আমার, এমনকি যে বাস্তব আমি কখনোই পাই না, পাবোও না হয়তো কোনোদিনই, সেটাকেও নাজেল করতে পারার বা দেখার একটা প্রয়াস হিসেবে কবিতা মন্দ না বলেই মনে হয়, যেহেতু এর দেমাগ বা নন্দন আছে, তাই সে আমার নিরীহতাকে প্রায়ই শক্তিতে রুপান্তর করে দিতে পারে, দিতে পারে এক বিস্তর বিভরতাটা যাকে সংবেদে ঠিকঠাক তুলে নিতে পারলে দুশ্চিন্তার আশপাশে একটু সুচিন্তার স্পেইস তৈরি হতে পারে যা এই সামান্য জীবনে বেশ বড়সড় একটা প্রাপ্তিই।

নীহার লিখন : জন্ম ৩ অক্টবর, ১৯৮৩, শিববাড়ী শেরপুর। বসবাস করেন ময়মনসিংহে, পেশাজীবনে একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ব্রহ্মপুত্র, আমি আপেল নীরবতা বুঝি, ব্ল্যাকহোল ও পড়শিবাড়ি, পিনাকী ধনুক, মনসিজ বাগানের শ্বেত। অনুবাদ ও কথাসাহিত্য নিয়েও কাজ করেন। ইতোমধ্যে অনুবাদ করেছেন মিরোস্লাভ হলুব, জন অ্যাশবেরি, ইবসেন, ইয়াং লি-সহ অনেকের কবিতা। ইংরেজি কবিতাও ইতিমধ্যে দেশ ও দেশের বাইরে জার্মানি, আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সংকলনে সংকলিত হয়েছে। তাঁর কবিতা অনুদিত হয়েছে রুশ, ইংরেজি ভাষায়। ‘বয়ান’সহ বেশ কিছু পত্রপত্রিকা ও ছোটকাগজে তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম উপন্যাস ‘মধুপুর’ প্রকাশের অপেক্ষায়। ইমেইল : niharlikhan82@gmail.com

Share Now শেয়ার করুন