এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা >> অনুভব আহমেদ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
1653
সম্পাদকীয়
আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংখ্যা : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

অনুভব আহমেদ >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

নেকরোফিলিয়া
প্রোলেতারিয়েত হাঙরের দাঁতে ঘুমিয়ে পড়েছে শরৎ
ফ্যান্টাসি জুড়ে কালো রঙের মাইম, জোকার মঞ্চ
অস্তিত্বের ওপর ঝুঁকে আধোলীন
সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে থাকা অন্ধকারপ্রিয় জানালা
তোমার ভঙ্গিমা এড়িয়ে
ক্ষুধা আমাকে ফেরি করে পৃথিবীময়।
এখানে আধোছায়া
মাংসের মর্মরে ভাঙার আওয়াজ
ধাতুফলকের বিচূর্ণ রঙে উড়ে যাচ্ছি
কুহকে, অন্তরালে পালকের নরম কাটছে দ্রাঘিমা
তোমাদের শহরে আমার স্বাধীনতা মিথের পতাকা।
আগুন আর পোড়াচ্ছে না
গড়ে নিচ্ছে কঠিন
এখন সকল আঘাতই ঝংকার
তথাপি আমার শরীরে বিরহ খোদাই করে চলেছে যে কারিগর
সে বড়ই নিখুঁত।
ক্লাসঘরের নৈঃশব্দ্যহিমে আমাকে কাঁদে শিশুর মন
পেন্ডুলামের অশনিসংকেতে
দিকপালহীন বাড়ছি আমি
বেঁচে থাকার বেরসিক মেমব্রেনে।
মনখারাপের পোস্টকার্ড
ঠোঁট পোহানো ক্লান্তিগুলো হাসি হলে ভালো থাকে আকাশ
এভাবেই আয়নায় দাঁড়াই, দিনশেষের পা ডুবিয়ে বসি সেখানে
প্রচ্ছন্ন দূরত্ব পেরুতে থাকে আমাকে।
পুরনো দিন, মৃতমাছ, ছাতিম অন্ধকার, আর স্বরের কোলাহল ছিঁড়ে
নিজের এতো কাছাকাছি এলে ঘামতে থাকে চোখ।
সমুদ্রস্বাদ, নিজেকে বড়ই মহৎ লাগে।
ভাবি, শেকড়ে চাপা মাটির অনাদর জানে পাতার হলুদ
অবিন্যস্ত রূপকে নীল পাহাড়, পাখির নখে নিঃশব্দ খেলাঘর আর মায়ামী ঢল ছেড়ে উঠে আসো তুমি
স্মৃতির রিবনে কিছু সুতো তোমার তাঁতে বোনা
এখনো তোমাকে ভেবে ব্যথার স্নায়ু দপদপ করে ডাকঘরের মনখারাপি জানালায়।
নির্ঝর
সে এক ভিনগাঁয়ের পথ
ম্যাপল উডের বাঁশি
মানুষের ব্যথার মতো চরিতার্থ করে নেয় নিজেকে।
ট্যুরিস্ট
সুখ নামক ট্যুরিস্ট লাউঞ্জে মাঝে মাঝে বেড়াতে আসি। এখানে বেশিদিন থাকা আমার মতো দরিদ্র্যের পক্ষে সম্ভব হয় না। কষ্টে-সৃষ্টে জমানো সম্বল ফুরিয়ে যায় অল্প আয়েশেই।
অগত্যা ফিরি নিজ গ্রামে। দুঃখ। নাম তার। হলুদাভ গ্রাম কাঠকয়লার মতো পোড়া অকালপ্রয়াত বাসনার ঘরবাড়ি। কী স্পষ্ট চেয়ে থাকে! হাসে। আদর করে বলে – “বাছা, ফিরলি তবে এতোদিনে। দ্যাখ, কেমন মলিন হয়েছি তোর অনাহারে। ”
ঘরের পাশে গাছ। ভূতে ধরা একা। আমারে দেখে কাঁদে। জিগায় – মনে আছে প্রেম?
আমি হাসি। প্রেম- মনোহরা পাখি, মাধুকরি সুর কানে রেখে উড়ে গেছে বাদাড়ে।
ফিরবে না জেনেও অপেক্ষায় বাঁচি।
ঘুঁটি
একদিন খুব ঝিঁঝিঁদের ডাক শুনে আমরা যে পথ ভুল করেছিলাম
বাঁকবদলের মুখে সেখানে তল খুঁজে পায় না শিশুদের ঘুম।
হরফে লুকানো নির্জনতায় প্রলাপগুলো ক্ষণমাত্র!
আমাদের গাঢ় অভিসন্ধিগুলো গাছের পাশে উদ্ধত কুঠার
নিজেদের চোখে চোখ রাখা তীব্র বিষাদে
পথিকবর তুমি কোথায় চলে যাও?
তোমার চোখের বিষাদ আমি খুঁজেছি সমস্ত। জ্ঞাত অভিলাষে আর অভিলাপে তুমি চূড়ান্ত।
ইঙ্গিতের দিকে ডেকে অন্তিমের ছল। এভাবেও হয়!
প্রিয়, আমার সাবধানী নৌকা, আমিও শিখে গেছি ছল। মৃৎফুলের গলনাঙ্কে এইবার তুমি চেলে দাও অগুণতি ঢেউ।

কবিতাভাবনা

ছোটবেলা আমি আমাদের পুকুরে সাঁতার শিখেছি। যখন সাতার শিখতাম কেউ না কেউ ঘাটে বসে থাকতো। কিছুতেই একা ছাড়তো না। এভাবে বহুদিন কেটে গেলো। কিন্তু আমার সাঁতার শেখা হলো না। একদিন দুপুরে পুরো বাড়ি যখন ঘুমায় তখন আমি একাই ঝাঁপ দিলাম পুকুরে। ডুবে যেতে যেতে, পানি খেতে খেতে, প্রাণপণ হাত-পা ছুঁড়তে লাগলাম। এবং অদ্ভূত আশ্চর্যজনকভাবে আমি ভেসে উঠলাম। এবং পানিতে ভাসতে থাকলাম। কবিতা আমার কাছে সেই প্রথম সাঁতার। জীবনের থৈ-থৈয়ে আমি যখন ডুবুডুবু তখন আমি কবিতায় আমার হাত-পা ছুড়ে দিই। ভেসে উঠি। যখন লিখতে পারি মনে হয় সাঁতার কাটছি। স্বচ্ছ জলের কোনও লেকে। আমার পাশে পাশে সাঁতারে বেড়াচ্ছে জলজ ফুল, অজস্র পানকৌড়ি। পাড়ের গাছের সবুজেরা আবেশে নুয়ে আছে আমাকে ঘিরে।
কবি পরিচিতি
অনুভব আহমেদ। জন্ম ৫ নভেম্বর, ১৯৯৩, মৌলভীবাজার। ইমেইল : onuvob96@gmail.com
Share Now শেয়ার করুন