কবিতাগুচ্ছ | কেনেথ কোখ | তর্জমা : বদরুজ্জামান আলমগীর

0
184

ধুনিক নাগরিক জীবন যেভাবে অভিজ্ঞতা আর অভিজ্ঞানের প্রিজম হয়ে ওঠে, কেনেথ কোখের কবিতা সেই রকম। তাঁর কবিতায় আছে জন্মোৎসব আর শবযাত্রার মর্সিয়া। কোখ নিজের কবিতা সম্পর্কে যেভাবে ভাবেন, তা এখানে প্রনিধানযোগ্য : অনেকেই ভাবেন কবিতা উৎসবের মেজাজে উচ্ছল, কিংবা শবযাত্রার বেদনায় মুহ্যমান; তা উপরিতলের আপদকালীন সত্য, অন্তর্লোকে আছে একটি শুকিয়ে যাওয়া নদীর ফাটল, ঠাট্টা, রগড়, প্যারোডি। কবিতার গাঢ় সত্যটি প্রাত্যহিক, যা হাতের কাছে নড়েচড়ে, খুঁজতে গেলে ডোবে আর ভাসে। কবিতার কেন্দ্রীয় ভাব কখনও দেখা যায় খণ্ড মুহূর্তের যোগফল। কেনেথের কবিতা অনেকটা এরকমই। এ জন্যেই কেনেথ কোখদের নিউইয়র্ক স্কুল অব পোয়েট্রির কবিদের কবিতায় পাওয়া যায় দাদাবাদের চিহ্ন, পরাবাস্তববাদী চল, র‌্যাপ মিউজিকের দৈনন্দিন ছন্দস্পন্দ। বিট জেনারেশনের সঙ্গে নিউইয়র্ক স্কুল অব পোয়েট্রির একটি পার্থক্য দেখা যায় এইখানেই। বিদ্যমান রাজনীতি কাঠামোর বিরোধিতা করতে গিয়ে বিট জেনারেশন যে অতি প্রত্যক্ষ কাব্যশৈলীর আশ্রয় নিয়েছিলেন, নিউইয়র্ক স্কুলের কবিতা সেই তুলনায় অনেকটাই অপ্রত্যক্ষ ও অন্তর্মুখী। এই অন্তর্মুখিতা জন অ্যাশবেরি, ফ্রাঙ্ক ও’হারাতে যেমন আছে, তেমনি দেখা যাবে কেনেথ কোখের কবিতায়।

সাধারণত কোখের কবিতা ২টি স্তরে বিন্যস্ত : উপরের স্তরে কিছুটা হালকা কমিকি চাল লক্ষ করা যাবে; কিন্তু অব্যবহিত পরেই এক স্থিতধী অভিজ্ঞান ঝলছে ওঠে। কিন্তু তার বয়ান কখনই গম্ভীর নয়; এই কারণে কোখের কবিতা অনেক সময় বেশ গুরুত্বহীন ভাবা হয়। কিন্তু ননসিরিয়াস ভঙ্গিতে তিনি লিখে থাকেন সিরিয়াস কবিতা।

ফুটন্ত পানি

পানি ভীষণ একাগ্র হয়ে ওঠে যখন তা ফুটতে থাকে, অন্যদিকে যারা এই পানি খাবার টেবিলে কী গোসলখানায় তোলে, তারা ঠিক স্বস্তিদায়ক মনে করে না, কালেভদ্রে কেউ ফুটন্ত জলের তাৎপর্য বোঝে – একজন সাধুসন্ত, কোন কবি, লাইনছাড়া একজন, নয়তো এমন কেউ যে রাগে গজগজ করছে, বা ভিতরে ভিতরে তীব্র ভাঙচুর তার – যে স্বাভাবিক গার্হস্থ মাত্রার বাইরে অন্য এক উপচানো অভিব্যক্তির দিকে ঝুঁকে থাকছে।

কবিতা অনেক সময় এমন নাজুক অনুধ্যান থেকে আসে – কথাবার্তা, যুক্তিতর্কও এমন পরিসরে গঠিত হয়ে উঠতে পারে। সংবেদনশীল মানুষদের অনেকে এমন বিষয়আশয়ে কথা বলতে বলতে একদম খুঁটি গেড়ে বসার মতো এক জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে, আপনিও তাদের পাল্লায় পড়ে ঘেমেটেমে একসা হতে পারেন – অনেকক্ষণ বাদে পানি হয়তো মাত্র ফুটতে শুরু করেছে।

জলের জন্য সে দারুণ এক ব্যাপার বৈকি! এরই মধ্যে দেখি – গাছের পাতারা হাত নাড়ছে, আদতে এটি বাতাসের কারবার – হাওয়ার কল্যাণেই গাছের শাখা আর পাতারা কাঁপে। কেউ যদি ভিতরের শাঁসটা বুঝতে চায় তাহলে হয়তো তাকে ঘটনার হুড়োহুড়ি থেকে চোখ সরিয়ে নিতে হবে, এগুলো এমন এক আলোড়ন যা থেকে কেউ তার শিল্পের কাঠামোটা গড়ে তোলে – ব্যাপারটাকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে যৌনতার সঙ্গে তুলনা করা যায় – যারা এর মধ্যেই প্রেমকে মূর্তিমান হয়ে উঠতে দ্যাখে। ফলে ফুটন্ত পানির আদত গুমর প্রায়শ অনাঘ্রাতাই থেকে যায় – একটি খাঁটি কবিতা লিখে ওঠার যে ঘূর্ণয়মান ভার, তা শেষাবধি ধরে রাখা এক বিশাল যজ্ঞ – পরিস্থিতির আবরণটুকু ভেদ করে অনিবার্য ঝাঁকুনির ভিতর শেষ পর্যন্ত একটি কবিতা লেখা হয়ে ওঠে।

এটি পানি ফুটতে থাকার মতো একটি ব্যাপার, আপন মনে পানি জ্বাল হতে থাকুক, ঘুরে ঘুরে এ বিষয়ে কথা বলার, বা অধৈর্য হয়ে ওঠার কিছু নেই, কারো জন্য অপেক্ষা করার সময় প্রতীক্ষার কথাটি যেমন ভুলে থাকতে হয়। ভাবনাচিন্তা করে কবিতার শেষটা আমদানি করা দুঃসাধ্য কাজ।

পুরোমাত্রায় ফুটতে শুরু করার পর যে পানি ফোটাচ্ছে তার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে – অবলীলায় দেখতে পারে পানি উত্তরোত্তর বলকে উঠছে, না হয় চুলা বন্ধ করে চায়ের কাপে, কফি, চকলেট বা গোস্তের সুরুয়া বানানোর জন্য পানি ঢেলে দেয়া যায়। বলকানো জল ঢেলে যা বানানো হলো তা-ও কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই মুখে দেয়া যাবে না, খানিকটা সবুর করতে হয় – নইলে জিহ্বা পুড়ে অঙ্গার হবে।

তীব্র গরম পানিতে গোলাপের কাঁটা থাকে, ছোট ভেড়ার মাথার চোখা শিং থাকে, যা বিপজ্জনক। উষ্ণ পানি আর গাছ বাতাসে ফুঁ দিয়ে যায়। এখানে গাছের বেলায় অনুপাতটা এই – গাছ তার ডালে কতটা হাওয়া আর পানির চলন আত্মস্থ করতে পারে; গোড়ার কথাটিই হলো – গাছ তার জন্য কতটা প্রস্তুত ও উন্মুখ। জল ফুটতে থাকবে, আর স্ফুটানঙ্ক ধরে রাখতে থাকবে – জল এই শক্তি পেলো কোত্থেকে? গাছ উত্তাপ ধরতে পারে না, বাতাসও অপারগ। এক্ষেত্রে নৈশভোজ আর খোয়াবের কথা ভাবতে পারি – তারা হয়তো এই উত্তাপ আত্মস্থ করতে পারে। কিন্তু আমরা ঠিক এগুলো নিয়ে কথা বলছি না। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না গাছের কম্পন কতোটা তীব্রতা ধরে রাখে, সেই তুলনায় পানির ফুটতে থাকার ব্যাপারটা অনেক বেশি চাঞ্চল্যকর – অনেকটা সাগরে ঝড় ওঠার সামিল – আজদাহা ঢেউ সব ওলোটপালট করে দেয়, জাহাজ গোত্তা খেয়ে নিচের দিকে পড়তে থাকে, কিন্তু খানিক বাদেই সব যে-ই কী সে-ই, একদম আগের মতো, স্বাভাবিক।

কত কত মানুষের সঙ্গেই তো আমি চা কফি খেয়েছি, কিন্তু তাদের কজনই বা ফুটন্ত পানির স্বভাব নিয়ে ভাবে, কোন ভাবাভাবি নাই কেবল অপেক্ষা করে থেকেছে কখন পানি ফুটবে, আর তা দিয়ে চা,কফি বা চকলেট বানাবে। এই তো, তারপর কী? শরীর চাঙ্গা হয়ে উঠেছে, মস্তিষ্ক সচল – কেননা চায়ের কেটলিতে চা বা কফির দানা পড়েছে; জানালার বাইরে গাছেরা মাথা ঝাঁকাচ্ছে, মনে হয় সবকিছুই একটু বেশি ফুরফুরে, শরীর মন তাতিয়ে উঠেছে, কেননা তরতর করে পানি গরম হয়ে উঠেছিল আর আমরা আয়েশ করে চা পান করেছি।

পানি সবসময় মোটের উপর একইভাবে ফোটে, আর আজ অবধি সমান হারে স্বনিষ্ঠ, কেননা পানি ফুটছে। আমার মনে হয়, জলের এই দিকটাই সবার দেখা উচিত। এখান থেকে সহমর্মিতা জন্মাতে পারে, এভাবেই অভিব্যক্ত প্রকৃতির উদ্যোগ ও জ্ঞান, যদিও আমি তা সেভাবে মনে তুলবো না। একজন, যে অনায়াস বোধ নিয়ে খুশি, তাকে সহজাতিরিক্ত কিছুর জ্ঞান দেয়া আল ডিঙাইয়া ঘাস খাবার সামিল। এক্ষেত্রে জল ফোটার মাহাত্ম্য জারি করার চেয়ে তীরের কথাটা পাড়াই অধিকতর সমীচীন। আসা-যাওয়ার পথের ধারেই জগৎ সংসারের গভীর প্রত্যয়ের দেখা মিলতে পারে – অত্যন্ত পরিশীলিত জীবনবীক্ষা থেকেও কেউ চিরচেনা সিদ্ধান্তে আসতে পারে – টাকাকড়ি জমানো দরকারি কাজ, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে তোলা পাথরখণ্ডও তাবৎ প্রতিসরণ আর ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কাঠিন্য ধরে রাখে। মূল রাস্তার লাগোয়া পায়ে-চলা পথই সবজায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম – তার জন্য কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার দরকার নেই।

দ্বীপের জন্য সেই সময়টুকু প্রসন্নতম যখন গাছেরা তার উপর ছায়া বিছিয়ে দেয়, আর সমুদ্রের ঊর্মিমালা তটভূমি থেকে বড় বড় ভাঙাচোরা জিনিস ধুয়ে সাফ করে নিয়ে যায়। কেউ ওখানে ঘুরে-ফিরে দ্যাখে, হয়তো ঠিক দ্বীপের দিকে নিবিষ্টভাবে তাকায়ও না, দেখে তার অনুষঙ্গে যা কিছু অবস্থিত সেগুলো, দেখতে দেখতে কেউ বুঝি ভাবে, এই যে দ্বীপাবলি সমুদ্র বেষ্টনের ভেতর নিজেকে বাঙ্ময় করে তুলেছে, তা-ই তার মৌল প্রত্যয়। এখানকার এই ব্যাপারগুলোই তাৎপর্যে অসীম – বাতাসের বিলোড়নের সামনে পাল নিজেকে মেলে ধরেছে, যে জানালা পাট খুলে রেখেছে হাওয়ার সামনে, অথবা একটি পলকা পালক বাতাসে গোত্তা খেয়ে উড়ে উড়ে যায়।

মরিয়া হয়ে লেগে থাকা – কত বার এই দুর্নিবার লেগে থাকার কথা ভেবেছি – কিন্তু এর মর্ম বোঝে এসেছে নিতান্ত কম, যদিও এটুকু হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছি যে, সিরিয়াসনেস ব্যাপারটা পরিবর্তন চায়। ধরো, একজন বলতেই পারে – জল, তোমার আর বলকানোর দরকার নেই, বলেই আগুন নিভিয়ে দিলো। তাতে পানির বলকে ফুটতে থাকা বন্ধ হয়ে যাবে, এবং তা ঠান্ডা হতে শুরু করবে। এবার পানিতে হাত দাও, মনে হবে এই পানি আর তীব্র নয়। যাই হোক, তার পারঙ্গমতা নিঃশেষ হয়ে যায় না, প্রক্রিয়াটা বদলায় মাত্র – পানির তীক্ষ্ণ চাপ ফুটকি বুদবুদে ফোটে, তা জলীয়বাষ্প আকারে বেরুতে থাকে, বাতাসের ক্ষিপ্রতায় মেশে, প্রচণ্ড ঝড়ের গতিবেগ তৈরি করে – যা সমুদ্র উপকূল উড়িয়ে নিয়ে যায়, বালুর ঢিবি তাদের সামলে উঠতে পারে না। মূর্ছা যাওয়া একধরনের প্রাবল্য – কান্না আরেক প্রকার, ঝাঁকি দিয়ে কাঁপতে থাকা অন্য নামের দৃঢ় অভিব্যক্তি।

টেলিফোন হৃদয়সংহারী হয় যখন তা বেজে ওঠে, দূরালাপনীর ও-মাথা থেকে একজন মানুষ, বরং বলা ভালো একজন দেবদূত, বা তুমি কথা বলো, শেষ পর্যন্ত যে উত্তর দেয় সে আমার পাখা, ফেলে আসা দিনগুলি মোর, আমার একান্ত চলাচল, বাঁধভাঙা জোয়ার, প্রাণোৎসার, আমার চুম্বনের পিছুটান।

আমার বেহিসেবি চলাফেরা, বয়স পঞ্চাশের পৃথুলতা, সেই সাথে সাকুল্যে আমার বুদ্ধির দৌড়ে ঘোর লাগে দুই পাহাড়ের সমান্তরাল রেখা, আর কার সি’এস্ট টোই আ’ লা’এপারিল-এর চপ্পল, ফোনের ওপাশে তুমি – তুমিই কী সেই মনোহর – তুষারপাতের সময় বাসের চলায় ওই যেমন প্রাণান্ত ব্রেক কষা – বাস বরফে পিছলে যায় – এঁকেবেঁকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে না হয়, সেই নাজুক বেলায় কেবল কপাল ভরসা।

মাছি চূড়ান্ত পরীক্ষা পাড়ি দেয় যখন সে ওড়ে, আর হাঁসের সব থেকে বড় মোকাবেলা তার সাঁতার কাটার সময় পানিতে নামে, ফুর্তিতে জলের উপর পাখা মেলে, পানিতে পায়ের বৈঠা মেরে সামনে এগুতে শুরু করে। যে-ক্ষণে আকাশে একচ্ছত্র নীল-ই সবচেয়ে ঘনীভূত রূপ, মনে হয়, এখনই কিছু মেঘ তাকে ঢেকে ফেলতে আসে, আরেকবার আসমান গভীরে মুহ্যমান, যখন তা কালো রঙে গম্ভীর। দেশলাই সবচেয়ে বেশি প্রাতিস্বিক যখন তা জ্বলে ওঠে, তার গোলাপি আগুনের লিকলিকে শিখা চূড়ান্ত স্পর্শকাতর, একইসাথে এই তীব্র নিঃসঙ্গতার মুহূর্তটিই তার জীবনের জমাটবাঁধা রূপ।

বহুকিছু মোকাবেলা করে যেতে হলো। দেশলাই ফ্যাক্টরির লোকগুলো আছে, সেই সাথে জনগণের মতিগতি, গোলাঘর ঢাকা ধূলার আস্তরণ, ফলে পরিস্থিতির হাড্ডির ভিতরে মজ্জার খোঁজ মেলা ভার, দেশলাইয়ের চনমনানো সাদা আলোর নিরক্ত শিখা – এ সবের নিষ্পত্তি কোথায় – যে-ই না টেলিফোন বেজে ওঠে, হাওয়াগুলি বাড়ি দেয়, কী দেশলাই  আগুনের শিখায় জ্বলে ওঠে।

একাট্টা, আমাদের পুরো জীবনের রোখ একাট্টা, আমাদের জিন্দেগির চারপাশে অন্য ঘটনারাশির মধ্যেও একটা হাড্ডাহাড্ডি ব্যাপার আছে – এগুলো থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে রাখা সম্ভব নয় – বরং এগুলো থেকেও আমরা নানা তাৎপর্যের ইঙ্গিত পাই। একটি বাড়ির গড়ে ওঠার যে অন্তর্যাত্রা, তার নির্মাণ প্রক্রিয়া, মোটামুটি শেষ পর্যায়ে আসা, সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে ওঠা – এর মধ্যেও ঘোরতর তাৎপর্য নিহিত আছে।

মৌমাছির হুল ফোটানোর মধ্যে তার একটা অপরিহার্যতা আছে – আমরা বলি, ভোমরা কামড়ে দেবার জন্য তার গোটা জীবন নিংড়ে গড়ে তোলে, কী তাজ্জব ব্যাপার, তাই না? আমাদের মধ্যে একটা বোধের জন্ম হয় যে, আমরা মৌমাছির সংকল্পে নিজেদের নিশ্চিদ্রভাবে জমাটবদ্ধ করে তুলতে পারি না, আমরা নিষ্কলুষ নই, মৌমাছির গুনগুনিয়ে গানের মাধুর্যের গভীরতা আমাদের নেই। মৌমাছি ওড়ে ঘরের ভেতরে যায়, একবিন্দু আলো ছড়িয়ে চেয়ারের হাতলে বসার জায়গাটি বেছে নেয়, খানিকক্ষণ বসে থাকে, নিজেকে সংবিতে জড়ো করে, এভাবেই আবার উড়ে যাওয়া রপ্ত করে। সে নিজের অন্তরে একটি চুলা ধরিয়ে দেয়, অপেক্ষা করে। অচিরেই সবাই তার কথা বেমালুম ভুলে যায়, নিজেদের মধ্যে গালগল্পে মশগুল হয়ে পড়ে।

পূর্ণ মনোনিবেশকরণ, সবাই মনঃসংযোগ নিয়ে যে-ই কথা বলাবলি শুরু করে, সে তা বোঝে, অথবা তার বুদ্ধি পেতে বের করার চেষ্টা করে এই আসরে আসলে কী কথা হচ্ছে। একটা বাচ্চাকে হুল ফোটানো হয়েছে, ব্যাপারটা পাশ কাটিয়ে যাবার নয়। ডাক্তারের জীবন সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। মৌমাছির মতোই তার জীবনও আমাদের কাছে চাক্ষুষ তাৎপর্যপূর্ণ। বারি, বারি – অনিমেষ  আমরা তার মুখাপেক্ষী। সে নিয়ত নিচের দিকে নামে – খোঁজে নিজস্ব শ্রেণি বিন্যাস, বাষ্পে মিলায়, টগবগ ফোটে, এখন নিজেকে বদলে হয়ে উঠছে বরফ জালি, ক্রমান্বয়ে বরফ ও বরফি, এবার গড়ে তুলছে আমাদের দেহ। আমরা অতঃপর কফি পান করি, আর নিজেরাই একজন আরেকজনের সামনাসামনি অদৃশ্যকে গড়ে তুলি।

গাছ নড়ে, হেলতে দুলতে পারে – বৃক্ষের জন্য যা অনন্য ঘটনা, তার দোলাচলের অনায়াস স্বভাব জীবনেরই মৌল গুণের টিপসই। এখন গাছেদের ঝাকড়া চুল ছেয়ে আছে কলি ও মুকুলের কলহাস্যে, ফুলমোহর থেমে নেই – আরো মুকুলে মৌ মৌ করে, গোলাপি ও শুভ্র কোরকে দুনিয়া সয়লাব, বাতাস বহতা, তার সঙ্গে উষ্ণতা, চারদিকে যেন উদ্বোধনের মেলা, বসন্ত এসে গ্যাছে, কেউ ঘরে বসে নেই, দরজা খুলে বেরিয়ে গ্যাছে তারা, লক্ষ নিযুত পোকা জন্মেছে বসন্তপলকে, তুমি আমাকে ডাকো, ডেকে বলো –  এতো আনন্দধারা উচ্ছ্বাসের মাঝে আমাদের নিজেদের জীবন বুঝি ম্রিয়মাণ। আমি বলি, তোমাকে দেখতে আসছি। আমি গাড়িতে চাবি দিই, সে যক্ষা রোগীর শ্রান্তিতে গড়গড় করে হাঁপিয়ে স্টার্ট নেয়।

তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়া একটা ঝড়ো ব্যাপার, তোমার দিক থেকেও তা-ই, যদিও আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না – আমাদের পক্ষে আর কারো সঙ্গে সখ্যের সম্পর্কে জড়ানো আদৌ সম্ভব হবে কিনা। কারো সাথে হয়তো তেমন কিছু হয়ে ওঠার সম্ভাবনাটুকু যাচাই করাও এক ঘোরতর কঠিন ব্যাপার – সময় এভাবেই আমাদের মাঝখানে কালশিটে লেপে দিচ্ছে। এটি না জানা ভয়ানক, আবার জানাও কম মারাত্মক নয়, কান্নার গুঁড়ার উপর নিশ্চয়ই কোন একটি পাটাতন তৈরি হবে।

একজনের পায়ের উপর পা সাঁটা, মৃদু দোলাচ্ছে তাদের, আঙুলে ধরা সিগারেট পুড়ছে, সামনে পড়ে আছে খয়েরি ফুলের তোড়া – জল বলকে বলকে ফুটছে। যে-কোন কিছুর জন্ম, আহারে কী বাঙ্ময়তা- গাছের নড়াচড়া – এক হুলুস্থুল ব্যাপার, প্রেমঘন চখাচখির জন্য – তারা যা কিছু করে তার সবই আমূল তুমুল।

তাদের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া অস্থির, সোজা লাইন নয় কভু – ওঠানামা, আবার উপচে পড়া। একটি জীবাণু শরীরে ঢোকে যে তৎপরতায়, বেরুতেও একইভাবে গলদঘর্ম, একটি মাছি উড়বে বলে যে তার কিঞ্চিৎ পাখা জোড়া খানিকটা হাওয়ায় মেলে ধরে।

ঘাটলায়

ওখানে ঘাটলার কাছে

সবই প্রসন্ন আর নমিত

রাত্রির মোহনায়

ছিপনৌকার মৃদু ছলাৎছল

আমি লাগিয়েছি একটি মেপল গাছ

প্রতি রাতে তার তলায়

ঘাটলায় বসে

বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আমার কলমের তুলি।

 

মধুমতি নারীরা আমার কথাটি শোনো

ঘাটলা কাঠে বানানো

মেপল গাছ তা নয়

মেপল নিজেই কাঠ

মেপল গাছ থেকে তক্তা আসে

যেমন সুর আসে আমি আর

মেন্ডোলিনের যৌগ থেকে

যা আমি বানিয়েছি মেপল গাছের কাঠে।

 

পরশ্রীকাতর ভদ্রলোকের দল,

মন মজে বের করো – মেপল থেকে কাঠ হবার বীক্ষা,

তোমার প্রেমার্তি সেভাবে বিন্যস্ত করো

যা দেখা যায় – তার অধিক কিছু

সঞ্চিত রাখো তোমার গোপনে –

গাছের একটি সোজাসাপটা ডালে কেমন

ফোটে সাদা সাদা ফুল, ডগা ভর্তি পাতা,

কোত্থেকে আসে

উত্তর খুঁজে বের করো পুরুষ!

 

একরোখা ঢেউ মানে না মানা

মাথা কোটে মরে পাড়ের অঞ্চলে

শোন তুমি আমার এ তরঙ্গ লহরি

আর সঞ্চারিত গম্ভীর নীল।

পর্বত

কিছুই নড়ছে না কাউকে নড়তে দেখছি না

আমি জানি এটি কোন ধাঁধা নয়

নড়ছে না, সত্যিই ওখানে কিছু নড়ছে না

আর কোন মানুষও নেই। এই জায়গাটিই শৃঙ্গ –

সবচেয়ে উঁচু, এখানে তা অস্বাভাবিক নয়।

তুষার জমে আছে – মনে হচ্ছে কারো মাথায়

সাদা চুল বিছানো।

আঁচড়ানো সাদা চুল – সামনে, পিছনে।

এটি সেপ্টেম্বর মাস – বরফের আস্তরণ

হালকা হতে শুরু করেছে

কয়েক মাসের মধ্যেই সম্ভবত নতুন শস্য আসবে।

ব্যাপারটা কেউ জানে না, তাই আমাদেরও

জানার প্রশ্ন আসে না –

কোন কোন বছর ফসল ওঠে নভেম্বরে

কেবল এক বছরেই ১৯২৩-তে তা পিছাতে পিছাতে

ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত গড়ায়

সেবার পাহাড়ের শৃঙ্গদেশ খটখটে পড়েছিল বহুদিন

শেষাবধি ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এসে বরফ পড়া

শুরু করে – আমরা ইঁদুরের মতো টুকটুক করে সেই

তুষারপাত দেখছিলাম – আমাদের সারি ছিল

ইঁদুরের লাইনের কায়দায় একটার লেজে লাগানো আরেকটা,

আরেকজনের লেজের পিছনে আরেকজন।

পুরো পাহাড়ে শনশন করছিল নীরবতা

মাথায় ওঠার কোন পথ ছিল না

ওখানে ওঠা যায়, খানিক থাকা যায় – এমন কোন

ব্যবস্থাই ছিল না – বসবাসের প্রশ্ন সম্পূর্ণ অবান্তর।

রাস্তাঘাট বলে কিছু নেই – সহসা রাস্তা হবার কোন

সম্ভাবনাও সুদূর পরাহত।

জীবন যাপনের কোন চিহ্ন নেই,

পাহাড়ের মাথায় আছে কোন ইতিহাস?

আজগুবি কিছু নেই ওখানে, ফলে তুমি কিছু না বুঝে

নির্বোধ হয়ে থাকবে – তারও সুযোগ নেই, আকস্মিকভাবে

ট্রাক থামার ঝাঁকুনি খাবার কোন কারণও নেই।

কোন কোম্পানি শোষণ করতে পারবে না

বাড়ির দালাল তোমাকে মক্কেল বানানোর

ফন্দিফিকির করতে পারবে না।

ধড়িবাজ মহিলা ঢৌলনকশায় খপ্পরে ফেলতে

পারবে না।

আমার পক্ষে এমন একটি জায়গায় বসবাস করা

কস্মিনকালেও সম্ভব হবে না।

ওখান থেকে যে-ই এসেছো – তুমি সম্পূর্ণ উন্মোচিত, তোমার মধ্যে কোন আব্রু নেই;

এভাবে পর্বতশৃঙ্গ যখনই বসবাসের সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষিত হয় –

আমি তখনই ওখানে যাওয়ার জন্যে চঞ্চল হয়ে উঠি।

 

বদরুজ্জামান আলমগীর : কবি, নাট্যকার, অনুবাদক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।

 

 

 

Share Now শেয়ার করুন