কবি কামাল চৌধুরীর সাক্ষাৎকার (দ্বিতীয় ও শেষপর্ব) | “কবিতার মূল ধারা বলে কিছু নেই – শুধু অনেক বিকল্প আছে…”

0
157

আগের কবিতা তো ছন্দ-মাত্রা হিসেবেই বিন্যস্ত। আগে কবিতা কীভাবে লেখা হয়েছে, কীভাবে পড়া হতো, এসব জানার প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়নি, কখনো হবেনা। চর্যাপদে বর্তমান বাংলা ছন্দের আদিরূপ খুঁজে পাওয়া যায়। একে বাদ দিলে বাংলা কবিতার ইতিহাস থাকে না।

শামীম রেজা

আমি আবার প্রশ্নে আসতে চাচ্ছি। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে – এই যে আপনার লেখার যে আশ্চর্য ক্ষমতা তৈরি, এই ক্ষমতা তৈরি তো নিশ্চয়ই একটা গুরুপরম্পরা আছে। এটা প্রাচ্যের মূল জায়গা। সেখানে আমরা দেখেছি সুররিয়ালিস্ট হওয়া নিয়ে পাবলো নেরুদা কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে, লাতিনে অসংখ্য গাছ আছে যা কেউ চেনে না এবং অসংখ্য পাখি আছে যার তেমন বর্ণনা করেনি কেউ তেমন করে। ফলে সুররিয়ালিস্ট হওয়া আমাদের জন্য খুবই সহজতর। কারণ যা কিছু আমরা জানি সবই নতুন। আমাদের দায়িত্ব হলো আমরা যেমনটি বুঝেছি যা কখনো শোনা যায়নি সেটিকে সঠিকভাবে প্রকাশ করা। এসব কিছু ইউরোপে চিহ্নিত হয়েছে, গানে ও রূপান্তরিত হয়েছে যা আমেরিকা বা লাতিনে আমেরিকায় হয়নি। তিনি হুইটম্যানকে প্রথম পথপ্রদর্শক ভাবছেন। আমরা অনেকে রবীন্দ্রনাথকে, জীবনানন্দকে পথপ্রদর্শক ভাবছি বা আমাদের গুরু হিসেবে ধরছি। আপনার এই আশ্চর্য ক্ষমতা তৈরিতে অনেকের অবদান থাকতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট করে একজনের কথা বলুন। যদি বলেন ইউরোপের বা আমেরিকার সেটা বলতে পারেন এবং এখানকার কে? আপনার মূল জায়গা।

কামাল চৌধুরী

বাংলা সাহিত্য অসম্ভবরকম প্রতিভাধর লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা কবিতায়, সাহিত্যে অনেক কিছুতেই পথপ্রদর্শক তিনি। যদি একজনের কথা বলি তবে, আমার প্রিয় তালিকায় অকুণ্ঠচিত্তে রবীন্দ্রনাথকেই এগিয়ে রাখব। তবে রবীন্দ্রনাথের পরে নিঃসন্দেহে আরও কয়েকজন আছেন। কবিতার জন্য কারো কাছে যদি ঋণ স্বীকার করতে হয় তাহলে প্রথমে আমি রবীন্দ্রনাথের কাছে ঋণ স্বীকার করব।

একজন কবি হিসেবে আমার তো অপরিসীম ঋণ আমার পূর্বসূরীদের কাছে। একইভাবে আমি মনে করি আমার সমসাময়িকদের কাছেও। এবং আমার পরবর্তী প্রজন্মের কবিতার কাছেও। আমি যদি কখনও কারও কবিতা পড়ে আরও একটা কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা পাই আমি মনে করি তার কাছে আমার কিছু ঋণ জমা আছে। সেজন্য পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার অনেক কবিদের কাছ থেকে, লেখকদের কাছ থেকে আমরা আইডিয়া নিই বিভিন্ন সময়ে। না হলে কেন বলা হবে বেশি বেশি কবিতা পড়তে। এ প্রেসক্রিপশন ডাক্তারের মতো দেওয়া হয় “কবিতা পড়ো , কবিতা পড়ো , কবিতা পড়ো।” অন্য কিছু বলে না কেন? এই প্রেসক্রিপশনের পেছনে কারণটা হচ্ছে, নানারকম কবিতা লেখা হচ্ছে, আঙ্গিক বদলাচ্ছে। কবিদের লেখাও নতুন নতুন ধারণা, অভিজ্ঞতা আসছে। সেই সঙ্গে আমি যদি বলি আমি মাইকেলের কাছে ঋণী নই, আমি জীবনানন্দ দাশের কাছে ঋণী নই কিংবা শামসুর রাহমানের কাছে ঋণী নই – সমসাময়িক কবিদের কাছেও ঋণী নই, তা হলে ঠিক বলা হবে না। একজন কবি কোনো না কোনভাবে ঋণী থাকেন। সত্তরের দশকে যখন আমরা লেখালেখি আসলে শুরু করি তখন নেরুদা কিন্তু আমাদের দারুণভাবে আকর্ষণ করছে। এবং একইভাবে কিন্তু আমরা দেখেছি সে সময়ের অনেকের কবিতা– শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাদের কবিতায় এবং সেই সময়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা প্রবলভাবে আমাদের তরুণ সমাজকে আলোড়িত করেছে।

গৌতম গুহ রায়

এখানে আমি একটা সম্পূরক প্রশ্ন করি। সেটা হচ্ছে যে আফ্রিকার যে কবিতা বা লাতিন আমেরিকার যে কবিতা কিংবা ইউরোপের কবিতা সমসাময়িক কবিতার সঙ্গে আমাদের বাংলা কবিতার পার্থক্যটা কোন জায়গায়? বাংলায় যে রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ দাশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, সেখান থেকে বাংলা কবিতার সঙ্গে লাতিন আমেরিকার কবিতার বিভিন্ন আনুষঙ্গিক বিষয় তার সঙ্গে আমার মিলে না কিন্তু কোথাও একটা মিলে। এ পার্থক্যের জায়গাটা একটু জানার দরকার ছিল।

কামাল চৌধুরী

মূল পার্থক্য প্রকৃতি ও পরিবেশে, ভাষায় ও ইমেজে। যেমন আমাদের কবিতায় সুন্দরবন আছে, কিন্তু সাভানা ইকোসিস্টেমের ইমেজ নেই। ইউরোপীয়, আমেরিকান কবিতায় শীতকাল আছে, আমাদের কবিতায়ও আছে। তবে ধরণ আলাদা- আমাদের কবিতায় তুষারপাত নেই । দেখা যাচ্ছে ইমেজ, উপমা, রূপক এগুলো আলাদাভাবে আসছে। ঔপনিবেশিকতা, জাতিগত সংঘাত, বৃহত্তর ভাষা গোষ্ঠীর নৈকট্য ও আধিপত্য – এগুলোও বৈশিষ্ট্য হিসাবে আসে। ভাষার সঙ্গে উপনিবেশিক ভাষার মিশ্রণ ঘটে তারও ব্যবহার দেখি। সে অর্থে এও বলা যায় Post-Colonial লেখকগণ ঔপনিবেশিক ভাষাকে নতুন করে তৈরি করেছেন। কবিতায় বৈষম্য আসছে, Feminity আসছে, Geography আসছে, ইতিহাস আসছে। T. S. Eliot বলেছেন, No art is more stubbornly national than poetry – poet is more local than prose – কথাটি যথার্থ কারণ কবিতা প্রধানত যে আবেগ অনুভূতি নিয়ে প্রকাশ করে – যেটি দেশজ। এজন্যই Anglophone west বা Francophone দেশগুলোসহ পৃথিবীর সর্বত্রই Contemporary Poetry জাতীয় বা আঞ্চলিক থেকে গেছে। Fiction-এর ক্ষেত্রে এটা তেমন নয়। বরং বলা যায় পোস্ট কলোনিয়াল লেখকরা এখন ইংরেজি কবিতার চেহারা বদলে দিয়েছে। কবিতার সেরকম প্রভাব বিস্তারকারী উদাহরণ কম হলেও এখন নানাভাব তা দৃশ্যমান হচ্ছে।

বিতায় এখন যেসব উপমার ব্যপক ব্যবহার হচ্ছে তাতে আমরা দেশজ নানা অনুষঙ্গ দেখি। তবে বিশ্বায়নের কারণে World Poetry-র সঙ্গে তাৎক্ষণিক সংযোগের ফলে জাতীয় ঐতিহ্য বা আবেগের ভেতরে একধরনের ধ্বংস বা ভাঙনও দৃশ্যমান। ফ্রাঞ্জ ফানো কিংবা এডওয়ার্ড সাঈদের কথা যদি ধরি ইউরোপের ইমেজ, অভিজ্ঞতা এর ভিত্তি হচ্ছে প্রাচ্য কিংবা তথাকথিত তৃতীয়বিশ্ব।

গৌতম গুহ রায়

আর একটা প্রশ্ন হচ্ছে, যেটা বাংলার শ্রেষ্ঠকবিতা বলা হয়, “কেউ আমাকে দাবায়ে রাখতে পারবা না” – সেখান থেকে পরবর্তী বাংলা কবিতা এবং তার আগের বাংলা কবিতা কোনো চরিত্রগত পার্থক্য হয়েছে কি না? এরমধ্যে প্রশ্নটা যদিও আসে।

শামীম রেজা

দারুণ প্রশ্ন। মানে “দাবায়ে রাখতে পারবা না” আমাদের স্বাধীনতার পর্ব এবং আমরা যে উন্মুক্ত হলাম শত শতবছরের পরাধীনতা থেকে।

কামাল চৌধুরী

বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এখন আমাদের প্রাত্যহিকতার অংশ। তাঁর জীবৎকালে ও মৃত্যুর পরে অসংখ্য কবিতা লেখা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধকালে লেখা অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘বঙ্গবন্ধু’ (যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/ গৌরী মেঘনা বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার / শেখ মুজিবুর রহমান) সম্পর্কে আমরা জানি। আমিও অনেক কবিতা লিখেছি। আমার ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ গ্রন্থটি ঢাকা ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা সবাই জানি, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ ভাষণের মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটে যায়। এর আগে বাঙালিকে কেউ এভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি, কেউ এভাবে স্বাধীনতার ডাক দেয়নি; এ ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যুদ্ধাবস্থার ভাষণ। ৭ই মার্চের অগ্নিগর্ভ ভাষণে তিনি আবির্ভূত হন জাতির একমাত্র প্রতীক হিসেবে। তিনি বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সাহসের তর্জনী উঁচিয়ে আরও বলেছিলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো।”

তিনি খুবই দ্ব্যর্থবোধক একটা কথা বলেছিলেন, “আর দাবায়ে রাখতে পারবা না”। সেইক্ষণে রচিত হয়েছিল বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মহাকাব্য। তাঁর তর্জনী আজ বাঙালির সাহসের প্রতীক হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির কাছে বিজয়ী বীর ও ট্রাজেডির মহানায়ক। তাঁকে নিয়ে বাঙালি কবিরা অসংখ্য কবিতা লিখেছেন – এখনও লিখছেন। সকল গুরুত্বপূর্ণ কবিই তাঁকে নিয়ে লিখেছেন। প্রতিবছর বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও শাহাদত বার্ষিকীতে যত কবিতা লেখা হয় – আমার মনে হয় বিশ্বে এটি বিরল। এর একটা ছাপ আমাদের কবিতায় দৃশ্যমান প্রবলভাবে। ফলে বর্তমান সময়ের কবিতায়ও গুণগত পরিবর্ত এসেছে – এক সময়ে কবিতা ছিল শৃঙ্খলমুক্তির কবিতা – এখন শোক যুক্ত হয়েছে, সেই সঙ্গে আগামীর স্বপ্ন। পরিবর্তনের এই সূচকগুলোও কবিতায় দৃশ্যমান।

শামীম রেজা

‘আবার দেখা হবে টুঙ্গিপাড়ায়’ কবিতায় আপনি রাশান কবি ওসিপ মান্তেলস্তামের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন, যিনি স্তালিন সরকারের সময় বন্দি হয়েছিলেন। উদ্ধৃতিটি এমন – We shall meet again, in Petersburg/ As though we had buried the sun there.
Osip Mandelstam

কামাল চৌধুরী

এ উদ্ধৃতি আরো অনেকেই ব্যবহার করেছেন। আগা শহীদ আলী তাঁর The Country Without a Post Office গ্রন্থে ব্যবহার করেছেন। এটি চিরায়ত লাইন। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিবেদিত কবিতায় এটি আমাদের দেশজ রূপকে ব্যবহার করেছি।

শামীম রেজা

দগ্ধ সময়ের উচ্চারণ করতে গিয়ে সত্তর দশকের কবিগণ পাবলো নেরুদার উপরিতলের অনুভব গ্রহণ করেছেন, আপনি যাকে কবিতার ইনার সোল বলছেন তার খোঁজ পাইনি ওই সময়ের কবিতায়; যা পাবলো নেরুদার কবিতায় বিদ্যমান। সত্তর দশকের দু’একজন কবি পরবর্তী সময়ে নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলেছেন – পোয়েট্রির ইনার সোল থেকে সাবলাইমে পৌঁছেছেন কবিতায় তাদের মধ্যে আপনি অন্যতম। আপনি পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্যদেশীয় সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন করেছেন। অথচ চল্লিশ বছর ধরে একই কবিতা লিখছেন আপনার দশকের প্রায় অনেকেই। হয়তো এটাও একটি ধরন। আপনি এবং আপনার সময় সম্পর্কে বলবেন কি? বাংলা কবিতার গৌরবকাল পঞ্চদশ শতক ষোড়শ শতক সপ্তদশ শতক মূলত মঙ্গলকাব্য আর বৈষ্ণব পদাবলীর সময়কাল। পাবলো নেরুদা যেমন বলেছেন স্প্যানিশ কবিতার ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের গংগড়া, কেভাদো, লোপে দ্য ভেগার কবিতার অনুপ্রেরণার কথা বলেছেন রবার্ট ব্লেককে। এই সময়ের কবিতা নিয়ে কোনো কাব্যতত্ত্ব আসেনি বাংলায়। অথচ অনুপ্রাণিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। মধ্যযুগের এই পর্বের দেহাত্মা – প্রেমাত্মার দার্শনিকতা আপনাদের সময়কে অনুপ্রাণিত করেছে কি?

কামাল চৌধুরী

যে-সময়ে আমারা পাবলো নেরুদাকে কাছে পেয়েছি, তখন বিশ্ববব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ও সাম্রজ্যবাদ বিরোধী প্রতিবাদের সময়। চিলিতে সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করা হয়েছে – তারপর নেরুদা প্রয়াত হয়েছেন। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। তখন কবিতায় নেরুদা বিপ্লবের প্রতীক – স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কাছে তাঁর প্রতিবাদী কবিতাই পৌঁছেছে প্রথম। আমরা সেখান থেকে প্রেরণা নিয়েছি। একজন কবি শুধু ন্যারেটিভ দিয়ে টিকতে পারেন না – নেরুদার কবিতায় দেশ, সমাজ ভূপ্রকৃতি সবকিছুই এসেছে বহুমাত্রিকভাবে। তাঁর ডিকশনটাই আলাদা ভেতর বাহির – দুটোকেই সমানভাবে আকর্ষণ করতে পারে।

শামীম ঠিকই বলেছে, বাংলা কবিতার একটা ঐতিহ্য আছে যদিও ইউরোপীয় কবিতার মতো দীর্ঘ নয়। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, এগুলো আমাদের ঐতিহ্য। ভাষার সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক নিবিড়, সংস্কৃতির সঙ্গেও। সেজন্য কবিতার ইতিহাস সংস্কৃতির ইতিহাস – কবিতা সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ বাহন। এই যে ঐতিহ্য তাকে আমরা সবসময় কবিতায় নবায়ন করি। আমরা আমাদের মঙ্গলকাব্য, কিংবা বৈষ্ণব পদাবলী থেকে অনেক কিছুই গ্রহণ করেছি। কবিতা কোনো স্থির বিন্দু নয় – গতিময় বিষয়। বাস্তবে টাইম মেশিন নেই, তবে কবিতায় আছে। কবিতা পেছন ফিরতে পারে। সামনেও দেখতে পারে। আসলে উত্তরসূরি হওয়ার ক্ষমতা না থাকলে পূর্বসূরীও হওয়া যায় না। ঐতিহ্য সেতুবন্ধের মতো সময়কে সংযুক্ত করে। এ উপলব্ধি কবিতার জন্য জরুরি।

একই ধরনের কবিতা সারা পৃথিবীতেই লেখা হচ্ছে। বাংলা কবিতায়ও এর ধারাবাহিকতা দেখি। এটি শুধু আমার দশকের কবিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় – সমকালের অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে, যে বিবেচনায় করি না কেন, মোদ্দা কথা হচ্ছে কবিকে তার ভাষায়, কণ্ঠস্বরে আলাদা হতে হবে।

শামীম রেজা

বিংশ শতাব্দীর সেই প্রজন্মের কথা – যারা রাজনৈতিক জাগরণের কবিতা লিখতে গিয়ে মহোৎসব কবিতা লিখলেন যেমন লোরকা, আলবার্ট এবং আলেহেইন্দ্রা। নিহতও হলেন ফ্রাঙ্কোর হাতে লোরকা, মিউগুয়েন হারহান্দেজ, আন্তনিও মাচাদোর মতো মহান কবিরা। আমাদের একাত্তরেও বুদ্ধিজীবী নিধন পর্বের এবং পরে শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান, হুমায়ুন কবিরসহ অনেক প্রতিভাবানকে হারিয়েছি। এর প্রভাব কি সাহিত্য সমাজে পড়েছে? ভাবুন তো শতাব্দীর একজন তরুণ কবি বা গবেষক কোন ধরনের কবিতার খোঁজ করবেন কবিতার ইতিহাস থেকে?

কামাল চৌধুরী

স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের সময় লোরকার মৃত্যু পৃথিবীব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। সে সময়ের প্রেক্ষাপটটা বিবেচনায় আনতে হবে। লোরকা, পাস-এর মতো কবিরা সরাসরি অংশ নিয়েছেন। সে-সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল ফ্যাসিবাদ বিরোধী অবস্থানের অংশ। ইউরোপে ডব্লিউ. এইচ. অডেন, জর্জ অরওয়েল, হেমিংওয়ে অনেকেই অংশ নিয়েছেন। এটি শুধু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রীদের লড়াই ছিল না। এটি বর্বরতার বিরুদ্ধে মানবমুক্তির লড়াই হিসাবে সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। এক ধরনের প্রতিরোধের কবিতা Resistance Poems লেখা হয়েছে তখন।

লোরকা হার্নান্দেজদের নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে – সেটিও ভাষার আধিপত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইংরেজি বা স্প্যানিশ ভাষাভাষীরা দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠছেন তাদের ভাষার সুবিধার জন্য। এমনকি দেশগুলোর লেখক যেমন এইমে সেজার – তাঁরা উপনিবেশ বিরোধী লেখক হিসাবে পরিচিতি পেয়েছেন ব্যাপক। আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। যদি পৃথিবীব্যাপী প্রতিবাদের কবিতা বা প্রতিরোধের কবিতাকে ধরি তাহলে আমি কাজী নজরুল ইসলামকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করব। কিন্তু ভাষার কারণে নজরুল সারা পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারেননি। নজরুলকে আমি নাজিম হিকমত কিংবা অ্যালেন গিন্সবার্গের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ বা কম তীব্র মনে করি না। সে জন্য আমাদের গবেষণা দরকার। গবেষকদের তো আমাদের আতিক্রান্ত ইতিহাস থেকে আগে উপাদান সংগ্রহ করতে হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে লেখক-শিল্পীদের আত্মত্যাগ ও অবদান নিয়ে, বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তীতে কবিদের প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়ে আরও অনেক লেখা দরকার। ভালো অনুবাদের মাধ্যমেও এ কাজটা হতে পারে।

শামীম রেজা

‘ক্লদ মনের সঙ্গে এক দুপুর’ কবিতাটি আমাকে আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আপনার যাপিত জীবনে কখনো কামরুল কখনো জয়নুল কিংবা সুলতানের সংস্পর্শেও এসেছেন, তাঁদের নিয়ে কিন্তু এমন কবিতা নেই – থাকতে হবে এমন কথা নেই তবে এক্ষেত্রে বলতে পারি কি আপনার কবিতায় আপনি বিংশ শতকের ত্রিশের তথাকথিত আধুনিকতা এবং বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকের ধার-করা প্রগতিশীলতা দায়ী এমন মনন তৈরিতে। যদিও এই কবিতার শেষে ‘আমার স্বদেশ আছে, কৃষ্ণচূড়া পলাশের রঙে ভালবেসে সেই ফুল তোমাকেও অর্ঘ্য দিতে চাই।’ এমন বাঙালিয়ানদের খোজঁ মেলে।

কামাল চৌধুরী

দেশ সবসময় কবির সঙ্গে থাকে। তুমি যে কবিতার উল্লেখ করেছ, সেটি আমার ভ্রমণ কবিতা। কিন্তু সেখানেও দেশ উপস্থিত। আমার কবিতায় স্বদেশের নানা অনুষঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে।

আমি কবিতায় আলাদা কোনো মনন তৈরি করতে চাই না। কারণ কবিতা সৃজন-উৎসব-মননের ছায়াসঙ্গী। আগেই বলেছি পৃথিবী বদলে গেছে – এলিয়ট, পাউন্ড বা আমাদের তিরিশের বা পঞ্চাশের কবিতায় আবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিশশতকের আধুনিকতা পেরিয়ে কবিতা এখন চতুর্থ বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। কবিকেও এ জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

শামীম রেজা

ছন্দবিজ্ঞানী প্রবোধকুমার সেনের লিখিত বাংলা ছন্দের বই ‘ছন্দপরিক্রমা’র নির্দেশনা অনুযায়ীই চলছে বাংলা কবিতার ছন্দের শৃঙ্খলা যা রবীন্দ্রনাথের দ্বারা অনুমোদিত; সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আবুল হোসেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এবং আপনিও। কিন্তু জীবনানন্দের অক্ষরবৃত্তের ছন্দের ত্রুটি নিয়ে কেউ কেউ লিখেছেন আর আপনিও ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন। প্রচলিত ছন্দ জানা প্রয়োজন। কিন্তু কবি যদি প্রকৃত কবিতা লিখতে জানেন তবে ছন্দপরিক্রমা বা প্রচল শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে লিখতে পারেন তাহলে সমস্যা কোথায়? নতুন ইমারত গড়তে ও ভাঙতে সব শৃঙ্খলা জেনে শুরু করতে হয়। আপনাকে যদি বলি আপনি প্রাচীনপন্থী কী ভাবে নেবেন?

কামাল চৌধুরী

বর্তমান সময়ে যখন সারা পৃথিবীতে নানা রকম কবিতা লেখা হচ্ছে। সাহিত্য এখন বিন্যস্ত বিভিন্ন ফর্মে, নানা নামে কবিতার চর্চা হচ্ছে – এসব দেখেশুনে একজন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারেন – ছন্দ কেন শিখব? সাধারণ পাঠক বেশিরভাগই অন্ত্যমিলকে ছন্দ মনে করেন। তারা ভাবেন এখনকার কবিতা ছন্দ নেই, তাই ছন্নছাড়া এসব কবিতা। আবার অনেকে এরকমও মনে করেন যারা ছন্দ নিয়ে বেশি কথা বলেন তারা কবিতায় প্রাচীনপন্থী। এরকম ধারণা পোষণ করলে তো আগের কবিতা পড়াও বাদ দিতে হবে। আগের কবিতা তো ছন্দ-মাত্রা হিসেবেই বিন্যস্ত। আগে কবিতা কীভাবে লেখা হয়েছে, কীভাবে পড়া হতো, এসব জানার প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়নি, কখনো হবেনা। চর্যাপদে বর্তমান বাংলা ছন্দের আদিরূপ খুঁজে পাওয়া যায়। একে বাদ দিলে বাংলা কবিতার ইতিহাস থাকে না। তেমনি মাইকেল কিংবা রবীন্দ্রনাথ না পড়লে বাংলা কবিতায় ছন্দোমুক্তির আকাঙ্ক্ষা অনুধাবন করা যায় না। অতীতের সঞ্চয় থেকে আহরণ করে বর্তমানের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে হয়। কবিতার ইতিহাস, আঙ্গিক ও প্রকরণের পরিবর্তন সম্পর্কে জানা মানে প্রকৃত কবিতা সম্পর্কে জানা। মনে রাখতে হবে, কবিতার মূল ধারা বলে কিছু নেই – শুধু অনেক বিকল্প আছে।

ছন্দ হলো কবিতার কাঠামো। এতে মাত্রার হিসাব আছে। প্রবোধচন্দ্র সেনের ভাষায়, মাত্রা হচ্ছে পরিমাপক – এই পরিমাপের দ্বারা ছন্দের প্রকৃতি বা কাঠামো সম্পর্কে ধারণা করা যায়। সবকিছুতেই গণিত আছে – রাধানাথ শিকদার এভারেস্টের চূড়ার উচ্চতার পরিমাপ করছিলেন গণিতিক পদ্ধতিতে। কবিতার ধারণার সঙ্গেও গণিত আছে – সেটি ছন্দমাত্রার হিসাবের মধ্যে। তবে শুধু গাণিতিক হিসাবে কবিতা রচনা করা হলে সেটা হবে পদ্য অর্থাৎ কাঠামো বা বর্ণনা থাকবে – প্রকৃত কবিতা যা অনুভবের বিষয় থাকবে না।

ভবন নির্মাণের কলাকৌশল না জানলে স্থাপত্যকলার স্পর্শ দেওয়া যায় না। সেজন্য কাঠামোগত দিক বা প্রকৌশল জানা জরুরি। কবি প্রকৌশলী নন – কিন্তু কবিতার রকমফের ও কাঠামো সম্পর্কে ভালোভাবে জানলেই তবে কবিতার স্পর্শ দেওয়া যায়। এখানে আমি দাবা খেলার উদাহরণ দিতে পারি। এটি অর্থনীতির আদলে কোনো গেইম থিওরি নয় – স্রেফ খেলতে গিয়ে কবিতা কীভাবে জীবন্ত হয়ে ওঠে সে সম্পর্কে বলা। মনে রাখতে হবে অর্থনীতিতে যা ‘প্রেফারেন্স’ কবিতায় সেটি ‘চয়েস’। দাবাখেলায় রাজা, মন্ত্রী, হাতি, ঘোড়া, সৈন্য সবই আছে, কিন্তু সবই নিয়মের অধীন। কে কত ঘর পর্যন্ত যেতে পারবে নির্দিষ্ট করা আছে । যুযুধান পক্ষও আছে, কিন্তু দাবার গুটি প্রাণ পায় খেলোয়াড়ের হাতে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে। ছন্দের কাঠামোও অনেকটা দাবার বোর্ডের মতো। নিয়মটা জানতে হয়। কিন্তু নিয়ম জানলে কী হবে – কবিতার ঘোড়া যখন লাফ দেয় তখন আড়াই ঘরের নিয়ম মানে না – নৌকাও পাল উড়িয়ে দেয় অন্য কোনো দিগন্তের দিকে। কবিতার ঘোড়া হচ্ছে মহাকবি অভিদের (Ovid) মেটামরফোসিসের রথের ঘোড়া – তার সওয়ার প্যাইথনের (Phaeton) মতো হালকা হলে কবি তখন তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। যেমন প্যাইথন পারেননি।

পিতা সূর্যদেবতার সূর্যদেবতা রথ চালাতে গিয়ে মৃত্যু ঘটে প্যাইথনের, কারণ রথ চালাতে সে জানত না। এ কাহিনী দীর্ঘ, আমি একে একটা উদাহরণ হিসাবে দিলাম এ জন্য যে কবি যখন কবিতার রচনা করেন, তখন তিনি কবিতার রথে চড়েন, কবিতায় কীভাবে ছুটন্ত রথের লাগাম টেনে ধরতে হবে – কীভাবে প্রয়োজনমত শব্দ, মাত্রা, ধ্বনিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তা জানতে হয় কবিকে। না হলে কবির পতনও অনিবার্য। তবে, কবিকেও শব্দ ব্যবহার, আঙ্গিকে সাহস দেখাতে হবে – ব্যর্থতার ভয় করলে চলবে না।

প্রবেধচন্দ্র সেন ছন্দগুরু। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য যে নেই তা নয়। আরও অনেকে আছেন বাংলা ছন্দচিন্তার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

জীবনানন্দ দাশ আমার প্রিয় কবিদের একজন। তবে একজন কবিকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হতেই পারে – রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও হয়েছে। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অক্ষরবৃত্তের মাত্রা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক লেখা হয়েছে। একজন কবি প্রচলিত ছন্দ ভাঙবেন – এটা অগ্রসর কবির কাজ। তবে, ছন্দোবদ্ধ কবিতায় ছন্দমাত্রার বিষয়ে সচেতন থাকা সমীচীন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কোনো কোনো শব্দ আমারও কানে লেগেছে।

শামীম রেজা

আপনি শুধু কবিই নন। ভবিষ্যতের কবিতা কেমন হবে, ছন্দ নিয়েও কাজ করছেন কিন্তু এমন কোনো পরিকল্পনা আছে কি? কিংবা ভেবেছেন কি যে আমাদের কবিতা বিশ্লেষণে কিংবা সাহিত্য বিশ্লেষণে শুধু ইউরোপের চোখ দিয়েই বিশ্লেষণ করি কতকটা আরোপিত তত্ত্বে কতটা প্রয়োজনীয়। এই উপনিবেশ আসার পূর্বেও তো আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য ছিল – বাংলা সাহিত্যতত্ত্বের দ্বার কেন গবেষণায় কিংবা প্রয়োগে এলো এ-কী হীনন্মন্যতা নয়?

কামাল চৌধুরী

আমি আগেই বলেছি কবিতা মূলত ভাষা ও জাতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। তবে এর ভেতরে অনেক তত্ত্ব এসে গেছে বেশিরভাগই পাশ্চাত্যের। আঙ্গিক ও প্রকরণের যে পরিবর্তন এসেছে তাও ইউরোপ, আমেরিকাজাত। আসলে এখানে হীনন্মন্যতার কিঁছু নেই, একে বিবেচনা করতে হবে ইতিহাসের আলোকে। চর্যাপদের আগে আমাদের সাহিত্যর কেনো নিদর্শন নেই — সে দিক থেকে ইউরোপ ঐতিহ্যগতভাবে এগিয়ে। গ্রীসে আখ্যানকাব্য, মহাকাব্য রচিত হয়েছে খিস্টপূর্ব সময়ে — আমাদের কাহিনিকাব্যের বা মঙ্গলকাব্যের বয়স এখনো হাজার বছর হয়নি — যদিও এ উপমহাদেশে রামায়ণ, মহাভারত রচিত হয়েছে খিস্টপূর্ব সময়ে, কিন্ত মধ্যযুগে কৃত্তিবাস ও কাশীরাম দাসের অনুবাদের আগে আমাদের কাছে রামায়ণ-মহাভারত পৌছেনি। । সাহিত্যতত্ত্বের জন্মও গ্রীসে। আমরা বহুভাবে তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছি – মাইকেলও গ্রহণ করেছেন ।আমাদের তিরিশের সকল কবির মনন তৈরি করেছে ইউরোপ – এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম ররীন্দ্রনাথ তিনি, যেমন গ্রহণ করেছেন, বিশ্বও তাঁর কাছ থেকে গ্রহণ করেছে। আমরা ঔপনিবেশিকতার শিকার ছিলাম দুইশ বছর – ফলে আধুনিকতাকে, জ্ঞান-বিজ্ঞানকে এতদিন আমরা দেখেছি ইউরোপের চোখে। কিন্ত এখন সময় বদলে গেছে। ঔপনিবেশিকতার স্থলে সাহিত্যে উওর-ঔপনিবেশিকতা এসেছে। ইয়েটসের ভাষায় কেন্দ্র ভেঙে পড়েছে – এখন পৃথিবী শুধু পাশ্চত্যমুখী নয় – বলা হয় এখন পোস্টওয়েস্ট পৃথিবী। এখন ঔপনিবেশিকগুলোর লেখকরা, বিশেষকরে ফিকশন লেখকরা বিশ্বসাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছেন। কবিতা এতদিন পিছিয়ে ছিল, কিংবা অবহেলিত ছিল বিশ্বকবিতায় ইংরেজির আধিপত্যের কারণে। এখন আধুনিক বিশ্বকবিতায় বিভিন্ন সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ ইমেজ, উপমা, রূপক স্থান করে নিচ্ছে। পুঁজির মতো কবিতাও পৌছে যাচ্ছে সারা পৃথিবীতে, আমাদের সাহিত্যর মানচিত্র সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইউরোপ আমেরিকার সাহিত্য এখন হাইব্রিড সাহিত্য। বরং আমাদের সাহিত্যেই সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রে বেশি উজ্জ্বল। সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র বজায় রাখার পাশাপাশি আমাদের সাহিত্য আরে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য উদ্যোগের প্রয়োজন আছে। সৃজনশীল গবেষক এবং তাত্ত্বিকদের উচিত বাংলা সাহিত্যতত্ত্ব নির্মাণ করা, এটা কবিদের কাজ নয়।

কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন করি : সংক্ষিপ্তভাবে উওর দেবেন

১. প্রথমে প্রেমে পড়া
কামাল : যৌবনের শুরুতে, কলেজ জীবনেই – আমরা একই কলোনিতে কাছাকাছি কোয়ার্টারে থাকতাম। এখনও একসঙ্গে আছি।

২. কোন নায়িকাকে ভাল লাগত?
কামাল : প্রিয় ও পছন্দের তালিকা ছোট নয়, সুচিত্রা সেন, সেফিয়া লরেন, মাধুরী দীক্ষিত, করবী, অনেকেই — তবেএকজনের কথা যদি বলি – মাধুরী দীক্ষিতের অভিনয় ভালো লাগত। আমার একটি কবিতায় তার প্রসঙ্গ আছে। যেমন “পার্বতীর কথা ছাড়ো – আমাদের নায়িকা মাধুরী।”

৩. কোন লেখকের সঙ্গে আড্ডা মারতে চান?
কামাল : অনেকের সঙ্গে, রবীন্দ্রনাথ, নেরুদা, হুইটম্যান, পাস। একজন হলে রবীন্দ্রনাথ।

৪. রবীন্দ্রনাথকে কী জিজ্ঞেস করতেন?
কামাল : আপনার কলমটা আমাকে একজীবনের জন্য দেবেন?

৫. কোন খেলা পছন্দ?
কামাল: ফুটবল, দাবা।

৬. আবার যদি পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয় কোন জীবন চাইবেন?
কামাল : একজীবনই যথেষ্ট, অন্য কোনো জীবন চাই না। তবে যদি আসতে হয়, মানুষ হিসাবে আসতে চাই।

প্রথম পর্বটি পড়বার জন্যে এই লিংকে ক্লিক করুন >> 

কামাল চৌধুরীর সাক্ষাৎকার (প্রথম পর্ব)

Share Now শেয়ার করুন