কামরুল হাসান অনূদিত > আরও একটি দিনের জন্য মিচ আলবম >> ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ৩)

0
550

পর্ব ৩

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ : সকাল

চিকের মা

আমার বাবা আমাকে একবার বলেছিল, “তুমি হয় মায়ের ছেলে হতে পারো কিংবা বাবার ছেলে। কিন্তু একসঙ্গে দুটো হতে পারবে না।”
আমি তাই বাবার ছেলে হলাম। আমি তার হাঁটার ভঙ্গি অনুকরণ করে হাঁটতাম। তার গভীর ধোঁয়াশপূর্ণ হাসি নকল করে হাসতাম। আমি একটি বেসবল গ্লাভস সঙ্গে নিয়ে ঘুরতাম, কারণ বাবা বেসবল ভালোবাসতেন, তাঁর ছুড়ে দেওয়া প্রতিটি শক্ত বল আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরতাম, এমনকি সেই থ্রোগুলি যেগুলো আমার তালুতে এত জোরে এসে আঘাত করতো যে, আমার মনে হতো আমি ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠব।
স্কুল ছুটি হলে আমি ক্রাফট অ্যাভিনুতে তার মদের দোকানে ছুটে যেতাম আর ডিনারের সময় পর্যন্ত সেখানেই থাকতাম, স্টোররুমের খালি বাক্সগুলো নিয়ে খেলতাম আর অপেক্ষা করতাম কখন বাবার কাজ শেষ হবে। তাঁর আকাশী নীল রঙের বুইক গাড়িতে চড়ে আমরা বাড়ি ফিরতাম, কখনো কখনো আমরা ড্রাইভওয়েতে গাড়ি থামিয়ে বসে থাকতাম আর বাবা তার পছন্দের চেস্টারফিল্ড সিগারেট টানতে টানতে রেডিওতে খবর শুনতেন।
রবার্টা নামের আমার একটি ছোট বোন আছে, সেই দিনগুলোতে সে প্রায় সর্বত্রই গোলাপি রঙের ব্যালেরিনা স্লিপার পরে হাঁটত। আমরা যখন স্থানীয় রেস্টুরেন্টে ডিনার খেতে যেতাম, মা তখন তাকে ‘মহিলা’ প্রক্ষালনগৃহে নিয়ে যেত – তার গেলাপি পা-দুটো টাইলসের উপর গড়িয়ে যেত – আর বাবা আমাকে নিয়ে যেতেন ‘পুরুষ’ প্রক্ষালনগৃহে। আমার তরুণ মন ভাবতো এটাই জীবনের নির্ধারিত ছক : আমি বাবার সাথে, আর রবার্টা মায়ের সাথে। মহিলা প্রক্ষালনগৃহ। পুরুষ প্রক্ষালনগৃহ। মায়ের মেয়ে। বাবার ছেলে।
বাবার ছেলেটি।
আমি ছিলাম বাবার ছেলেটি, আর স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার বছর বসন্তের এক মেঘহীন উত্তপ্ত শনিবার সকাল পর্যন্ত আমি তাই রইলাম। সেদিনই লাল উলের ইউনিফর্ম পরা কার্ডিনাল দলের বিপক্ষে আমাদের দুটি খেলা ছিল। ওদের স্পন্সর করছিল কনর্স প্লাম্বিং সাপ্লাই কোম্পানি।
লম্বা মোজা পরে গ্লাভস হাতে আমি যখন খাবার ঘরে এলাম ততক্ষণে সূর্যের তাপে আমাদের রান্নাঘর যথেষ্ট উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মাকে দেখলাম টেবিলে বসে একটি সিগারেট খাচ্ছেন। আমার মা যথেষ্ট সুন্দরী ছিলেন, কিন্তু সেই সকালে তাকে সুন্দর লাগছিল না। তিনি ঠোঁট কামড়ে ধরে আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন। মনে আছে আমি পোড়া পাউরুটির গন্ধ পাচ্ছিলাম আর ভেবেছিলাম ব্রেকফাস্ট পুড়িয়ে ফেলার জন্য বোধহয় তার মন খারাপ।
“আমি সেরিয়াল খাব,” আমি বলেছিলাম।
কাপবোর্ড থেকে আমি একটি বাটি বের করলাম।
মা তার গলা পরিস্কার করে নিলেন। “তোমার খেলা কখন আরম্ভ হবে, সোনা?”
“তোমার কি ঠান্ডা লেগেছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে মাথা নাড়ল আর একটি হাত রাখল গালে, “তোমার খেলার সময় কখন?”
“আমি জানি না।” আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম। আমি তখনো ঘড়ি পরতে শুরু করিনি।
আমি দুধ-ভরা কাচের বয়াম এবং কর্নফ্লেকের বড়ো বাক্সটি নামিয়ে নিলাম। বেশ তাড়াহুড়া করে কর্ন ফ্লেক বাটিতে ঢালছিলাম, কিছু টুকরো বাটি থেকে ছিটকে বেরিয়ে টেবিলের উপর পড়ল। মা সেগুলো একটা একটা করে তুলে নিয়ে তার হাতের তালুতে রাখলেন।
“আমি তোমাকে নিয়ে যাব,” সে ফিসফিস করে বললো, “যখন যেতে চাও।”
“কেন বাবা কি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে না?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“বাবা এখানে নেই।”
“কোথায় সে?”
মা কোন উত্তর দিলেন না।
“বাবা কখন ফিরে আসবেন?”
মা কর্নফ্লেকের টুকরোগুলো মুঠির ভেতর শক্ত করে চেপে ধরলেন আর সেগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ল।
সেইদিন থেকে আমি মায়ের ছেলে হয়ে গেলাম।

এখন, যখন আমি বলি যে আমি আমার মৃত মাকে দেখেছিলাম, তখন আমি সেটাই বোঝাতে চেয়েছি। আমি তাকে দেখেছিলাম। তিনি পকেটবুক হাতে ডাগআউটে দাঁড়িয়েছিলেন, তার পরনে ছিল ল্যাভেন্ডার জ্যাকেট। মা একটি কথাও বলেননি। শুধু আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন।
আমি মায়ের দিকে ঘুরে নিজেকে মাটি থেকে তোলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পরক্ষণেই পড়ে গেলাম, শরীরের মাংসপেশীর মধ্য দিয়ে ব্যাথার একটা তীব্র স্রোত বয়ে গিয়েছিল। আমার মস্তিস্ক চিৎকার করে মায়ের নাম ধরে ডাকতে চাইছিল, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
আমি আমার মাথা নিচু করে করতল দুটি জড়ো করলাম। আমি পুনর্বার জোরে মাটিতে ধাক্কা দিলাম আর সেবার নিজেকে মাটি থেকে অর্ধেকটা তুলতে পারলাম। আমি ঊর্ধ্বে তাকালাম।
মা নেই, চলে গেছেন।
আমি এখানে আশা করি না যে আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন। আমি জানি, এটা স্রেফ পাগলামি। মৃত মানুষকে কেউ দেখতে পায় না। তারা পৃথিবীতে দেখা দিতে আসেন না। আত্মহত্যা করার সর্বোচ্চ আন্তরিক ইচ্ছা নিয়ে একটি পানির ট্যাংকের উপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ে আপনি নিশ্চয় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান না, আর দেখেন না যে আপনার মরে যাওয়া প্রিয়তম মা তার পকেটবুক হাতে নিয়ে বেসবল খেলার মাঠের তৃতীয় বেসলাইনের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

আপনি এখন বিষয়টি নিয়ে সম্ভাব্য যতকিছু ভাবছেন আমিও সে-সময়ে সে-সবই ভেবেছি। মতিভ্রম, কল্পনা, মাতালের স্বপ্ন, এলোমেলো মস্তিষ্কের এলোমেলো ভাবনা। আগে যেমন বলেছি, আমি এখানে আশা করি না যে আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন।

কিন্তু ঠিক এটাই ঘটেছিল। মা সেখানে ছিলেন। আমি তাকে দেখেছিলাম। আমি অনির্দিষ্ট কাল ধরে মাঠের উপর পড়ে ছিলাম, তারপর দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম আর নিজেকে হাঁটতে বাধ্য করলাম। আহত হাঁটু ও দুইবাহু থেকে ধুলোবালি ও ময়লা ঝেড়ে ফেললাম। কয়েক ডজন ক্ষত, বেশিরভাগ ছোটো, কয়েকটি বড়ো, থেকে রক্ত ঝরছিল। মুখের ভিতর রক্তের স্বাদ অনুভব করতে পারছিলাম।

ঘাসভরা চেনাশোনা একজায়গা দিয়ে এগুলাম। একটি মৃদু ঝড়োবৃষ্টির মতো সকালের বাতাস গাছগুলোকে নাড়িয়ে একঝলক হলুদ পাতা উড়িয়ে নিয়ে এলো। আমি দু’-দুবার নিজেকে খুন করতে ব্যর্থ হলাম। কতটা করুণ ছিল সেটা?
আমি আমার পুরনো বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম অসমাপ্ত কাজটি সমাপ্ত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায়।

+++++++

প্রিয় চার্লি,

আজ স্কুলে অনেক অনেক মজা করবে!
লাঞ্চের সময় তোমার সাথে দেখা করবো এবং আমরা মিল্ক শেক খাবো।
আমি তোমাকে প্রতিদিন ভালোবাসি!

মা

(চিক বেনেটোর কাগজপত্রের ভেতর পাওয়া, ১৯৫৪)

+++++++

বাবার সাথে মায়ের কী করে পরিচয় হলো

আমার মা আমার উদ্দেশ্যে সবসময় ছোট ছোট চিরকুট লিখতেন। যখনই আমাকে কোথাও পৌঁছে দিতে যেতেন, তিনি ওইসব আমার হাতে ধরিয়ে দিতেন। মায়ের এই আচরণ আমি কখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, কারণ কিছু বলার থাকলে তিনি আমাকে সরাসরিই বলতে পারতেন, ফলে তার কাগজ বাঁচত আর চিঠির আঁঠার বিশ্রী স্বাদ থেকে রেহাই পেতেন।

মনে হয় প্রথম চিরকুটটি মা লিখেছিলেন ১৯৫৪ সালে কিন্ডারগার্টেনে আমার প্রথম দিনটিতে। তখন কত বয়স ছিল আমার, পাঁচ বছর? স্কুলপ্রাঙ্গনটি মুখরিত ছিল শিশুদের কলকাকলিতে, যারা হৈ চৈ করছিল আর দৌড়াচ্ছিল। শিক্ষকদের সামনের একটি কালো সারির দিকে আমরা এগুলাম, আমি মায়ের হাত ধরে আছি। আমি দেখলাম অন্য মায়েরা তাদের বাচ্চাদের চুমু খেয়ে এক-এক করে বিদায় নিচ্ছে। মনে হয় আমি কাঁদতে শুরু করেছিলাম।
“কী হয়েছে?” মা আমাকে জিজ্ঞাসা করল।
“চলে যেও না।”
“তুমি যখন স্কুল থেকে বের হবে, আমি তখন এখানেই থাকব।”
“না।”
“ঠিক আছে। আমি এখানেই থাকব।”
“যদি আমি তোমাকে খুঁজে না পাই?”
“অবশ্যই খু্ঁজে পাবে।”
“যদি তোমাকে হারিয়ে ফেলি?”
“তুমি তোমার মাকে কখনো হারিয়ে ফেলতে পারো না, চার্লি।”
মা হাসলেন। তিনি তার জ্যাকেটের পকেটের ভেতর থেকে বের করে একটি ছোট নীল খাম আমার হাতে দিলেন।
“এই নাও,” মা বললেন। “তুমি যদি সত্যি আমাকে খুব মিস করো, তা হলে এটা খুলে দেখো।”
তার ব্যাগ থেকে একটি টিস্যুপেপার বের করে তিনি আমার চোখ মুছে দিলেন আমাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানালেন। আমি আজো দেখতে পাই আমার দিকে বাতাসে চুমু ছুঁড়তে ছুঁড়তে তার পিছনপানে হেঁটে যাওয়া, লাল রেভলনে তার ঠোঁট রাঙানো, কানের উপর ঢেউখেলানো কেশরাশি। আমি চিঠিধরা হাতে তাকে বিদায় জানালাম। ধারণা করি, এটা বোধহয় মায়ের মনে আসেনি যে আমি তখন কেবল স্কুলে পা দিয়েছি আর তখনো আমি পড়তে শিখিনি। এই ছিল আমার মা। তার ভাবনাই ছিল অন্যরকম। গুরুত্বপূর্ণ।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (২) লিংক

https://www.teerandaz.com/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a7%82%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a4-%e0%a6%86%e0%a6%b0%e0%a6%93-%e0%a6%8f/

 

পরবর্তী (৪) পর্বের লিংক আসছে

Share Now শেয়ার করুন