কামরুল হাসান অনূদিত > আরও একটি দিনের জন্য মিচ আলবম >> ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ২)

0
690

আরও একটি দিনের জন্য মিচ আলবম >> ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ২)

ধারাবাহিক এই উপন্যাসটি পড়ার আগে জেনে নিন

‘আরও একটি দিনের জন্য’ (For One More Day) হলো সেই দিনটি যা আমরা সকলেই কামনা করি আমাদের প্রয়াত প্রিয়জনের সঙ্গে একটিবার দেখা করার জন্য। আহা, যদি তারা ফিরে আসতো, যদি আরেকটি দিন তাদের সঙ্গে কাটাতে পারতাম, তবে অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেত, সবচেয়ে বড়ো কথা নিজেদের ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়া যেত, বলা যেত তাদেরকে কী গভীরভাবে আমরা ভালোবাসি, কী বিপুল বেদনা বহন করি তাদের হারিয়ে। এই বইতে এই প্রিয়জন হলেন চার্লস বেনেটোর মা পলিন বেনেটো।
জীবনের প্রতি চরম বীতশ্রদ্ধ হয়ে চার্লস গিয়েছিল আত্মহত্যা করতে। চাকরি হারানো এক মানুষ, যার স্ত্রী ছেড়ে চলে গেছে, যে ক্রমশই ওই সব ব্যাথা ভুলতে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছিল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নেয় এ-জীবন সে আর রাখবে না সেইদিন যেদিন তার একমাত্র মেয়ের বিয়েতে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। দুবার আত্মহত্যার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে চার্লি বাড়ি ফিরে হতবাক হয়ে দেখে আট বছর আগের মৃত মা ফিরে এসেছেন। চার্লি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না, কিন্তু এও তো সত্য তার স্নেহময়ী মা জলজ্যান্ত সামনে দাঁড়িয়ে। ঔপন্যাসিক বলেছেন পাঠকরা এই উপন্যাসকে ভূতের গল্প বলেও ভাবতে পারেন। লেখকের মতে, প্রতিটি পরিবারেই একটি ভূতের গল্প আছে। মিচ আলবম একজন আমেরিকান ঔপন্যাসিক, যার বই সারা পৃথিবীতে ৩৯ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। মিচ আলবমের জন্ম আমেরিকার নিউ জার্সিতে, ১৯৫৮ সালে। ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসন্তান আলবম ভূমিকম্পে পিতৃ-মাতৃহীন হাইতির কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের জন্যে গড়ে তুলেছেন একটা চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান নিয়েই কাটে তার জীবনের অনেকটা সময়।

পর্ব ২

চিক সবকিছু শেষ করে দিতে চাইল

কোনো এক শুক্রবারে আমার মেয়ের চিঠিটি এসে পৌঁছেছিল, সপ্তাহান্তের ছুটির দিনগুলো নিজেকে ভাঙচুর করতে সুযোগ দিল, তবে সেসব খুব একটা মনে নেই। সোমবার সকালে এক লম্বা ও দীর্ঘ স্নানের শেষে আমি দুঘণ্টা দেরিতে কাজের জায়গায় পৌঁছলাম। আমি যখন অফিসে ঢুকলাম, সেখানে পয়তাল্লিশ মিনিটও থাকিনি। আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। জায়গাটিকে মনে হচ্ছিল একটি সমাধিস্থল। আমি ফটোকপি কক্ষে ঢুকে গেলাম, তারপর বাথরুম, এরপর চলন্ত সিঁড়িতে, কোনো কোট বা ব্রিফকেস ছাড়াই, যাতে কেউ যদি আমার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তবে তা স্বাভাবিক মনে হবে, মনে হবে না যে সেটা কোন পরিকল্পিত চলাচল।
সেটা ছিল আহাম্মুকি। কেউ খেয়ালই করলো না। এটা ছিল একটি বড়ো কোম্পানি, তাদের প্রচুর বিপণন কর্মী, আমাকে ছাড়া চলতে তাদের বিন্দুমাত্র সমস্যা হবে না, যেমন এখন চলন্ত সিঁড়ি থেকে হেঁটে গাড়ি পার্কিংয়ের স্থানে পৌছানো ছিল একজন কর্মী হিসেবে আমার শেষ ভূমিকা, যা এখন আমরা জানি।

এরপর, আমি আমার প্রাক্তন স্ত্রীকে ফোন করি। একটি পাবলিক টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করি। সে তখন তার অফিসে ছিল।
“কেন?” সে সাড়া দেবার পরে বললাম।
“চিক?”
“কেন?” আমি ফের বললাম। রাগকে শান্ত করতে আমি তিনদিন সময় নিয়েছি, আর ওটাই ছিল একমাত্র কথা আমি বলতে পারলাম। একটি শব্দ। “কেন?”
“চিক।” তার স্বর নরম হয়ে এলো।
“আমাকে এমনকি আমন্ত্রণ জানানো হলো না?”
“এটা ওদের পরিকল্পনা। তারা ভেবেছে যে এতে….”
“কী? নিরাপদ? আমি কিছু একটা ঘটনা ঘটাতাম?”
“আমি ঠিক বলতে পারব না – ”
“আমি এখন একটা দৈত্য, তাই না? তাই কি না বলো?”
“তুমি এখন কোথায়?”
“আমি কি একটা দৈত্য?”
“থামো।”
“আমি চলে যাচ্ছি।”
“চিক, বোঝার চেষ্টা করো, সে এখন আর খুকি নয়, আর যদি … ”
“তুমি আমার পক্ষে কথা বলতে পারলে না?”
আমি তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পেলাম।
“কোথায় যাচ্ছ?”
“তুমি আমার পক্ষে কথা বলতে পারলে না?”
“আমি দুঃখিত। এটা জটিল ছিল। সেখানে জামাইয়ের পরিবারও তো আছে। আর তারা…”
“তুমি কি কাউকে সঙ্গে করে গিয়েছিলে?”
“ওহ, চিক… আমি কাজে আছি, ঠিক আছে?”
সেই মুহূর্তে আমি খুব নিঃসঙ্গ অনুভব করলাম, এমন নিঃসঙ্গতা জীবনে কখনো অনুভব করিনি, সেই নিঃসঙ্গতা আমার ফুসফুসকে জখম করে যেন আমার ন্যূনতম বাতাসকে বের করে দিতে চাইল। আর কিছুই বলার ছিল না। এ বিষয় নিয়ে আর নয়। আর কোনো বিষয় নিয়েই নয়।
“ঠিক আছে। আমি ফিসফিস করে বললাম। “আমি দুঃখিত।”
একটা বিরতি নেমে এলো।
“কোথায় যাচ্ছ? সে জিজ্ঞেস করল।
আমি ফোন রেখে দিলাম।
* * *

আর তখন, শেষবারের মতো আমি মদ খেলাম। প্রথমে মি.টেডের পাব বলে একটা দোকানে, যেখানে মদ পরিবেশনকারী ছিল গোলাকার মুখের রোগাপাতলা এক যুবক, সম্ভবত আমার মেয়ে যে যুবককে বিয়ে করেছে তার চেয়ে বেশি বয়স হবে না। এরপর আমি আমার এপার্টমেন্টে ফিরে আসি এবং আরো কিছু মদ পান করি। আসবাবের সাথে বারকয়েক ধাক্কা খেলাম। দেয়ালে কীসব লিখলাম। মনে হয় আমি মেয়ের বিয়ের ছবিগুলো ময়লা ফেলার জায়গাতে ফেলে দিয়েছিলাম। রাতের মাঝামাঝি কোনো একসময়ে আমি আমার বাড়িতে, মানে পিপারভিল বীচ, যে শহরে আমি বড়ো হয়েছি, যেতে মনস্থ করি। গাড়িতে যেতে দুঘণ্টার পথ, তবু আমি সেখানে কয়েক বছর যাইনি। আমি আমার এপার্টমেন্টের ভেতর ঘুরতে লাগলাম, বৃত্তাকারে হাঁটতে লাগলাম, যেন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। শেষবিদায়ের যাত্রার জন্য আপনার খুব বেশি জিনিস দরকার নেই। আমি শোবার ঘরে গিয়ে ড্রয়ার থেকে একটি পিস্তল বের করে নেই।
গ্যারেজে গিয়ে গাড়িটি পেলাম, পিস্তলটিকে গাড়ির কম্পার্টমেন্ট রেখে, একটা জ্যাকেট পেছনের সিটে, হতে পারে সামনের সিটেই, ছুঁড়ে মারলাম, বা এমনও হতে পারে জ্যাকেটটি সেখানেই ছিল, আমি ঠিক জানি না, আর আমি এসে পড়ি সড়কে। শহরটি ছিল শান্ত ও চুপচাপ, ট্রাফিক বাতিগুলো হলুদ আলো জ্বেলে মিটমিট করছিল, আর আমি সেই স্থানে যাচ্ছি যেখানে আমার জীবন শুরু করেছিলাম।
ভুল করে ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাওয়া, তেমনি সহজ সেটা।

* * *
আমরা গর্বিত জানাতে

চার্লস আলেক্সানাডার
৮ পাউন্ড ১১ আউন্স
নভেম্বর ২১, ১৯৪৯

জন্মগ্রহণের খবর

লিউনার্ড ও পলিন বেনেটো

(চিক বেনেটোর কাগজপত্রের ভেতর পাওয়া)

* * *

দিনটি ছিল ঠান্ডা আর হাল্কা বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু হাইওয়ে ছিল ফাঁকা, আমি এর চারটি লেনই, এপাশ থেকে ওপাশে, এঁকেবেঁকে চালাচ্ছিলাম। তুমি ভাবতে পারো, আশাও করতে পারো যে আমার মতো আলো জ্বালিয়ে চলা কাউকে পুলিশ থামাবে, কিন্তু তেমন কেউ থামাল না। একসময় আমি এমনকি সারারাত ধরে খোলা থাকা মুদি দোকানে ঢুঁ মারলাম, আর সরু গোঁফঅলা এক এশীয় লোকের কাছ থেকে ছয়টি বিয়ারের একটি প্যাক কিনে নিলাম।
“লটারি টিকেট?” সে শুধালো।
বহুবছর ধরে আমি, এমনকি যখন বিধ্বস্ত থাকি- মাতাল হয়েও যখন হেঁটে বেড়াই- তখন একটি কর্মক্ষম চেহারা দেখানোর কায়দা রপ্ত করেছি- আমি ভান করলাম যে প্রশ্নটিকে নিয়ে খুব ভাবছি।
“না, এবার নয়,” আমি বললাম।
সে বিয়ারগুলো ব্যাগে ভরে দিল। আমি তার দুটো ভাবলেশহীন বড়ো বড়ো চোখের দিকে তাকালাম, আর ভাবলাম পৃথিবীতে এটাই হলো শেষ মুখ যা আমি দেখছি।
লোকটি কাউন্টারের উপর দিয়ে ভাংতি পয়সাগুলো ঠেলে দিল।

আমি যখন আমার জন্মশহরের সাইনপোস্ট দেখলাম – ‘পিপারভিল বীচ, বেরুনোর পথ এক মাইল’-  ততক্ষণে দুটো বিয়ার সাবাড়, তৃতীয়টি যাত্রীসিটের উপর ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াইপারগুলো কাচের উপর জোরে ঘুরছিল। জেগে থাকার জন্য আমাকে লড়াই করতে হচ্ছিল। আমি নিশ্চয়ই ভাবনার বেখেয়ালে ছিলাম, ‘বেরুবার পথ একমাইল’ সাইনটি দেখিনি- কারণ একটু পরে আমি যখন পরবর্তী শহরটির সাইন দেখলাম, তখন বুঝতে পারলাম নিজের শহরের দিকে ঘোরার ফোকরটি আমি পুরোপুরিই ফেলে এসেছি। রাগতভাবে আমি ড্যাশবোর্ডে জোরে থাপ্পড় মারলাম। সেই জায়গাতেই গাড়িটি চড়কির মতো ঘুরিয়ে ফেলি, হাইওয়ের ঠিক মাঝখানে, আর উল্টো ও ভুল পথে গাড়ি চালাতে থাকি। কোনো ট্রাফিক ছিল না, আর থাকলেও আমি তাকে পাত্তা দিতাম না। আমি সেই নির্গমন পথের দিকে যাচ্ছিলাম। এক্সিলেটরে জোরে চাপ দিলাম। খুব তাড়াতাড়িই একটি বাঁক দৃষ্টিগোচর হলো, প্রবেশের সংযোগস্থল, নির্গমনের ঢাল নয়, আমি সেটার দিকে চীৎকার করে এগুলাম। সেটা ছিল ওইসব লম্বা প্যাঁচালো জিনিসের মতো, আমি চাকাকে সম্পূর্ণ ঘোরানো অবস্থায় ধরে রেখে এটার পাশ ঘেঁষে দ্রুত নিচে যেতে চেষ্টা করলাম।

হঠাৎই দুটি অতিকায় সূর্যের মতো দুটি বৃহৎ আলো আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। এরপরই একটি ট্রাকের হর্ন বেজে উঠলো, তারপর একটি প্রবল ধাক্কা আর আমার গাড়িটি বাঁধের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সজোরে মাটিতে পড়ে খাদে গড়িয়ে পড়ল। সব জায়গায় কাচের টুকরো ছড়িয়ে ছিল, বিয়ারের ক্যানগুলো এদিক থেকে ওদিক ধাক্কা খাচ্ছিল, আর আমি পাগলের মতো স্টিয়ারিং হুইল আঁকড়ে ধরলাম, আমাকে ধরাশায়ী করে গাড়িটি পেছন দিকে লাফিয়ে উঠলো। কোনোক্রমে দরোজার হাতলটি খুঁজে পেলাম আর সেটাকে জোরে টান দিলাম, আর আমার যা মনে আছে তা হলো কালো আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি ও সবুজ গুল্ম আর বজ্রপাতের মতো প্রচণ্ড একটি শব্দ এবং উঁচু ও কঠিন কিছু একটা পতনের আভাস।

যখন চোখ খুললাম দেখলাম আমি ভেজা ঘাসের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছি। আমার গাড়ি একটি স্থানীয় শেভ্রোলেট ডিলারের বিলবোর্ডের ভেতর অর্ধেক ঢুকে আছে, মনে হচ্ছে গাড়িটি বিলবোর্ডের ভেতর চাষ করতে ঢুকেছে। পদার্থবিজ্ঞানের সেই সকল অসম্ভব মুহূর্তে আমি নিশ্চয়ই গাড়িটির সর্বশেষ আঘাতের আগে ছিটকে পড়েছিলাম। আমি এটা ব্যাখ্যা করতে পারব না। যখন তুমি মরতে চাও, তখন তোমাকে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়। কে এর ব্যাখ্যা দিতে পারে?

ধীরে, অশেষ ব্যাথা নিয়ে দুপায়ের উপর দাঁড়ালাম। পিঠটা একেবারেই ভিজে গিয়েছিল। সারা শরীরে ছিল ব্যাথা। তখনো মৃদু বৃষ্টি হচ্ছিল কিন্তু পরিবেশ ছিল শান্ত, ঝিঁঝিঁ পোকাদের ডাক স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সাধারণত এমনি কোন সময়ে আপনি হয়তো বলবেন, “আমি সুখী যে আমি বেঁচে গেছি”, কিন্তু আমি তা বলতে পারিনি, কারণ আমি সুখী হইনি। আমি উপরে হাইওয়ের দিকে তাকালাম। কুয়াশার ভেতর আমি একটি বিশাল ভাঙা জাহাজের মতো পড়ে থাকা ট্রাকটিকে শনাক্ত করতে পারলাম, তার সমুখের অংশটি এমনভাবে বেঁকে আছে যেন এর নাক থ্যাবড়া করে দেওয়া হয়েছে। হুড থেকে ধোঁয়া উঠছিল। একটি হেডলাইন তখনো জ্বলছিল, মাটির পাহাড়গুলোর দিকে আলোকের একটি নিঃসঙ্গ বীম পড়েছিল; তাতে বিধ্বস্ত ঘাসগুলো হীরের টুকরোর মতো ঝিকমিক করছিল।

ট্রাকের চালক কোথায়? সে কি বেঁচে আছে? সে কি আঘাত পেয়েছে? তার কি রক্ত ঝরছে? এখনো কি নিঃশ্বাস ফেলছে? অবশ্যই সাহসিকতার কাজ হতো যদি আমি পাহাড় বেয়ে উঠে সেটা পরীক্ষা করে দেখতাম, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার চারিত্রে সাহস বলে কিছু ছিল না।
তাই আমি তা করলাম না।
পরিবর্তে আমি আমার দুহাত শরীরের দুপাশে ঝুলিয়ে দক্ষিণ দিকে ঘুরলাম, আমার পুরনো শহরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। এটা নিয়ে আমার কোনো অহঙ্কার নেই। কিন্তু আমি কোন বিচারেই যুক্তিপূর্ণ ছিলাম না। আমি ছিলাম একটি জড়পিণ্ড, একটি রোবট, কারো জন্য কোনো মায়া বা উদ্বেগ নেই, নিজের জন্যও নয়- বস্তুত যাদের জন্য আমার কোনো মায়া নেই তার তালিকার শীর্ষেই আমি। আমি ট্রাকটির কথা, আমার গাড়ি ও বন্দুকের কথা ভুলে গেলাম; সবকিছু পিছনে ফেলে এলাম। পাথরের নুড়ির উপর আমার জুতো কড়কড় আওয়াজ করছিল আর আমি শুনলাম ঝিঁ ঝিঁ পোকাগুলো হাসছে।
* * *
আমি বলতে পারব না কতক্ষণ ধরে আমি হেটেছি। তবে মনে হয় অনেকক্ষণই কেননা ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে আর আকাশ ভোরের প্রথম আভাস নিয়ে হালকা হতে শুরু করেছে। আমি পিপারভিল বীচের বহির্প্রান্তে, যেখানে বেসবল মাঠগুলোর পেছনে একটি জংধরা বড়ো পানির ট্যাংক নিশানার মতো দণ্ডায়মান, সেখানে পৌঁছাই। আমাদের শহরের মতো ছোট শহরে পানির ট্যাংক বেয়ে ওঠা যেন একটা অধিকার, আমি ও আমার বেসবল খেলার বন্ধুরা সপ্তাহের ছুটির দিনে এর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতাম, আমাদের কোমরের বেল্টে বাঁধা থাকতো রঙ ছিটানোর কৌটোগুলো।
এখন আমি আবার সেই পানির ট্যাংকের সমুখে দাঁড়িয়ে আছি, সিক্ত ও বুড়িয়ে যাওয়া, ভগ্ন ও মদ্যপ এবং যা আমার যোগ করা উচিৎ, একজন খুনী, কেননা আমি ট্রাক ড্রাইভারকে দেখিনি। ওতে অবশ্য কিছু যায় আসে না, আমার পরের কাণ্ডটিও কোন বুদ্ধিপ্রসূত ছিল না কারণ আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম সেটাই যেন আমার জীবনের শেষরাত্রি হয়।
আমি সিঁড়ির তলাটা খুঁজে পেলাম।
আমি উপরে উঠতে শুরু করলাম।
রিভেট দ্বারা আটকানো ট্যাংকটির উপরে উঠতে আমার অনেকটা সময় লাগল। শেষ পর্যন্ত যখন উপরে পৌঁছালাম আমি প্রান্তসীমার উপর ধুপ করে পড়ে গেলাম, জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস টানতে লাগলাম। আমার মাথার পেছনে একটি কণ্ঠস্বর আমার ওই বিধ্বস্ত আকৃতির জন্য বকুনি দিল।
আমি নিচের গাছগুলোর দিকে তাকালাম। তাদের পেছনে আমি বেসবল মাঠটি দেখতে পেলাম যে মাঠে বাবার কাছ থেকে খেলাটা শিখেছিলাম। দৃশ্যটি তখনো আমার ভেতরে বেধনার স্মৃতি খুঁড়ে তুলল। শৈশব কী এমন জিনিস যা তোমাকে কখনো তা ছেড়ে যেতে দেয় না, এমনকি এমন এক সময়ে যখন তুমি এতটা বিধ্বস্ত যে এটা মনে করা কঠিন যে তুমি কোনদিন শিশু ছিলে।
আকাশ পরিষ্কার হচ্ছিল। ঝিঁ ঝিঁ পোকাগুলো আরো জোরে ডাকছিল। আমার স্মৃতির পর্দায় হঠাৎই আমার বুকের ভেতর ঘুমানো ছোট্ট মারিয়ার ছবি ভেসে উঠলো, সে তখন এতটাই ছোটো ছিল যে আমার একহাতের ভিতর ঘুমাতে পারত, তার গা থেকে টেলকম পাউডারের ঘ্রাণ বেরুত। এরপর আমি নিজের একটি ছবি দেখতে পেলাম, ভেজা আর নোংরা, যেমন আমি এখন, মারিয়ার বিয়ের উৎসবে ঢুকছি, বাজনা থেমে গেছে, সবাই বিস্ফারিত চোখে আমাকে দেখছে, সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়েছে মারিয়া।
আমি আমার মাথা নিচু করলাম।
আমি না থাকলে কারো ক্ষতি নেই।
আমি দু ধাপ দৌড় দিলাম, রেলিং আঁকড়ে ধরলাম আর নিজেকে তার উপর দিয়ে ছুঁড়ে ফেললাম।

এর পরের ঘটনা ব্যাখ্যা করা সাধ্যের অতীত। আমি কোথায় আঘাত করেছিলাম, কীভাবে আমি বেঁচে গেলাম, আমি তোমাকে বলতে পারব না। যা মনে আছে তা হলো। আমার মুখের এই দাগগুলো? আমি টের পেয়েছি এগুলো সেভাবেই ঘটেছে। মনে হয়েছিল আমি অনেকক্ষণ ধরে পড়ছি।
যখন আমি চোখ খুললাম, আমি গাছের ভেঙে-পড়া ডালপালা দিয়ে ঢাকা ছিলাম। আমার বুক ও পেটের উপর পাথর চেপে ছিল। আমি মুখ তুললাম আর দেখলাম : আমার কৈশোরের বেসবল মাঠখানি, ভোরের আলোয় দুটো ডাগআউট, পিচারের দাগ।
আর দেখলাম আমার মাকে, যিনি বেশ কিছু বছর আগে মারা গেছেন।

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বের লিংক

https://www.teerandaz.com/%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%9a-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%ac%e0%a6%ae-%e0%a6%86%e0%a6%b0%e0%a6%93-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8/

পরবর্তী লিংক আসছে

Share Now শেয়ার করুন