কিযী তাহনিন >> শীতকালের গল্প >> জীবনের গল্পস্বল্প >> ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা

0
724

কিযী তাহনিন >> শীতকালের গল্প 

মটরশুঁটি ফুটছে তেলে
রোদ নেমেছে গঙ্গা জলে।

এ হলো আমার শীতকালের কবিতা। স্বরচিত। স্বমুগ্ধ। দু’লাইনের কবিতা বলে ছি ছো করতেই পারেন, কিন্তু যে জীবনে ছয়-সাতটি শব্দ আর দুটো আধাগোছের বাক্য সহজাতভাবে সৃষ্টি করেছে, তার কাছে এই হল কবিতা। এ প্রশ্ন কিন্তু আসতেই পারে, লিখতেই যদি না পারো, তো গড়গড় করে এতো কথা লিখছো কিভাবে? তা যা ভাবছি তাই লিখছি, যা ঘটেছে, তাই বলছি মাত্র। তাতে কোনো রং, রস, চারুকলা নেই কিন্তু। আছে খসখসে শীতে ছোট হয়ে কুঁচকে যাওয়া দিনের দাপটহীন আলোর মতন সত্য।
ওই শীতের কবিতার কথা বলছিলাম। শীতকাল এল। আমার ছোট বোন দুই বেণী ঝুলিয়ে হলুদ ফ্রক আর লাল রঙের কার্ডিগান পরে, আসনপিঁড়ি হয়ে বাড়ির দেয়াল কাঁপিয়ে গলা সাধে – শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন, আমলকির ওই ডালে ডালে। স্কুলের আমি মুখ বাঁকাই। আমলকির ডাল? দেখেছি নাকি জীবনে? যে ফলে মুখ তিতকুটে ঝাঁঝাল হয়ে ওঠে, তার ডালে নাচন লাগলে কী আসে যায়? আমার বরং ভাল লাগে মটরশুঁটি। আমি বুঝি শীতকাল মানে মটরশুঁটি। গরম ভাপে গুলিওঠা সবুজ দানা। মা এক গামলা কাঁচা মটরশুঁটি দিয়ে বলতেন, “নে তোরা বারান্দায় বসে একটু ছিলে দে। বিকেলে মটরশুঁটি ভেঁজে দিব। আমরা বারান্দায় বসে, মটরশুঁটির মোটা পেট ছিঁড়ে যত্নে দানা খুলে খুলে বাটিতে রাখতাম। মেঝেতে যেন একটাও না পরে। মটরশুঁটির দানা তো নয়, যেন ঝিনুকচেরা মুক্তো।
তো এমন একটা শীতের নাম মাত্র বিকেল সেদিন। কুয়াশা আছে, তাই চারপাশে আর কিছু নেই বলেই মনে হচ্ছে। আমরা গুটিশুটি হয়ে লেপের তলে বসে মটরশুঁটি ভাজা খাই। কাঁচা মরিচ কুচি, পেঁয়াজ কুচি ভাজা আর মুড়ির সাথে। আর মা “কড়াইয়ে তো তেল ফুটছে, চুলা থেকে নামিয়ে আসি।” বলে, রান্না ঘরে গেল।
আমি মটরশুঁটির দানা চিবুতে চিবুতে প্রথমবার ভাবলাম, মটরশুঁটি ফুটছে তেলে। আর তার পরের আধা লাইন? রোদ নেমেছে গঙ্গা জলে – একদম নিজের মাথা থেকে এল। সত্যি বলছি। আমাদের পাশের বাসায় গঙ্গা মাসি থাকেন। আদি বাড়ি কলকাতা। এখন বাংলাদেশে থাকেন। ছোটবেলায় গঙ্গার ধারে নাকি বাড়ি ছিল তাদের। তার বাবা প্রতিদিন ভোরে উঠে গঙ্গায় স্নান করতেন। আমি বলতাম,শীতেও? গঙ্গা মাসি বলতেন, “হ্যাঁ রে একদম ভরা শীতেও।” ভরা শীত দেখেই হয়তো গঙ্গাজল মাথায় এল। প্রায়ই এই গল্প গঙ্গা মাসি বলেন তো। নাইলে আমি তো আর গঙ্গা দেখিনি।
তো এই কবিতা মাকে শোনালাম। মা আমার চেয়েও বেশি মুগ্ধ। ছেলে কালে এক বড় কবি হবে। আব্বা ও শুনলেন। মাথা নাড়লেন। আমি কম্বলের নিচে শুয়ে কবি হবার স্বপ্ন দেখি। আমার সেই শীতকালের স্বপ্ন। তো যা চায় মানুষ তাই কি হয়? তায় যখন আবার শীতকাল। বেশ মনে আছে, তখন স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। এই সেই করে দিন কাটে। চলমান উলের গোলা হয়ে থপথপ করে ঘুরি। মা ছোটবেলা থেকে বলেছে, আমার নাকি শীত বেশি। তো আমি সেটা ঠিক জানিনা আমার শীত কেমন। কারণ অক্টোবরের শুরু থেকে আমার শীত বেশির অজুহাতে আমার মুখ থেকে পা পর্যন্ত, চোখ দুটো আর নাকের ফুটো বাদে, সব উলে মোড়ানো থাকত। ঘেমে নিয়ে একাকার হলেও, কিছু করার নেই। আমার শীত নির্ভর করত, মায়ের কতটুকু শীত লাগছে তার ওপর।
যা বলছিলাম, অলস শীতে, এই সেই করে দিন কাটে, আর মনে মনে ভাবি কবি হব। এর মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষার ফল দিল। অংকে প্রায় পাশ করতে করতে ফেল করেছি। ২৯.৫ পেয়েছি। ৩৩ এ পাশ। অনুত্তীর্ণ লিখে দিয়েছে রিপোর্ট কার্ডে। এর পরের গল্প কি বলব, একটাই ভাল ঘটনা, ভাঁজে ভাঁজে উলের কাপড়মোড়া ছিলাম বলে, আব্বার ওই বেত স্কেলের উল্টোপাল্টা সপাট মাইর বেশি গায়ে লাগলো না। আমার বান্দর টুপি টেনে খুলে আম্মা কানও মলে দিল। শীতের মধ্যে কান মলা খেলে, ওই হাওয়ার নাচন দেখে আর পাগল হওয়া লাগবে না। টনটনে কান ব্যথার কষ্ট, শীতকালে যে না পেয়েছে, সে কি বুঝবে যে এ কেমন এক অ-কাল। অংকে ফেল করা ক্লাসের ৭ জন এর পরের কয়দিন, স্যারদের পিছে পিছে ঘুরে বেড়ালাম, এই কুয়াশায়, স্কুলের বারান্দায়, এ দিক ওদিক। বড় স্যারের দয়া হল, তিন মার্ক করে গ্রেস দেয়া হবে। এতে যারা পাশ করবে তো করবে, নাইলে রাস্তা মাপ। আমার তো রাস্তা মাপার মতোই অবস্থা। আর আধা নম্বর পেলেই তো পাশ করে যাই। স্যার বললেন, তুই তো ২৯.৫ পেয়েছিস, ৩ নম্বর জুড়লে তো ৩২.৫ হয়। তুই ফেল। আমি আমার শেষ কৌশলের আশ্রয় নেই। স্যারের পায়ে পরে যাই। ধুলো মাখা ঠান্ডা সিমেন্টের মেঝেতে আমার উলের গোলার শরীর নিয়ে গড়াগড়ি খাই। সেদিন ও ছিল শীতের দিন।
ধুলোয় গড়াগড়ি খেয়ে পাশ নম্বর জোগাড় করে, পরের ক্লাসে প্রমোশন নিয়ে, বাসায় ফেরার পর আব্বা বললেন, পড়াশোনা বাদ দিয়ে অকাজের কবিতা যদি আর লিখি, তো মাইর একটাও মাটিতে পরবে না। আপনে বাঁচলে না সে কবিতা। আমি তাই আর কবিতা লিখিনি। হারিয়ে গেল আমার কবি, কোন এক শীতকালে।
এইটুকুই কি যথেষ্ট নয় শীতকালকে অতো ভালো না বাসবার জন্য? কিন্তু এক মাঘে তো ভাই শীত যায় না। মাঘ আসে, শীতকালের নাম করে। দুর্ভোগ বাড়ে বই কমে না। সে এক শীতকাল। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। চাঁদা তুলে বাড়ির সামনের মাঠে কোর্ট কেটে। নেট টাঙিয়ে, বাতি জ্বালিয়ে, পাড়ার ছেলেমেয়েরা বিকেল-সন্ধ্যে ব্যাডমিন্টন খেলি। সেদিন খেলতে খেলতে খেলা জমে উঠেছে। ২-০ তে খেলছি। দান দান তিন দান এর খেলা। জিতে যাচ্ছি প্রায়। ঠিক এমন সময় সাইঁ করে উল্টো দিক থেকে এসে, জুয়েলের ব্যাট করা কর্ক আমার বাম চোখে। মা গো মা গো করতে করতে, মাঠিতে চিৎ। বাম চোখ ধরে রেখেও বেশ বুঝলাম, গরম তরল কি যেন চোখ ঢাকা আঙুলগুলো চুইয়ে নামছে। হাত ভিজে যাচ্ছে। আমি চিৎকার করি, রক্ত রক্ত। কে যেন পাশ থেকে বলে, সম্ভবত আমার ব্যাডমিন্টন পার্টনার ঝুমা আপা, “না-রে রক্ত না। চল চল বাড়ি চল।” বাড়ি, বাড়ি থেকে চোখের ডাক্তারের চেম্বার।
সব দেখে শুনে চোখের ডাক্তার চাচা বলে, “বাবুর চোখে তো একটা অঞ্জনি ছিল, সেদিন যে নিয়ে এলে, বললাম না ছোট্ট অপারেশন করে অঞ্জনি কাটতে হবে?
আব্বা-আম্মা মাথা নাড়ে। কথা সত্যি। চোখে একটা অঞ্জনি জ্বালাচ্ছে বড় মাস খানেক ধরে। সপ্তাহখানেক আগে চোখের ডাক্তার চাচা দেখে ড্রপ দিল। আর বললো এর মধ্যেই অঞ্জনি অপারেশন করতে হবে। তো সেই অপারেশন হতে তো আরো ২/৩ দিন বাকি।
ডান চোখ দিয়ে তেছরা করে তাকিয়ে দেখি, ডাক্তার চাচার মুখ ভরা হাসি। “ভাল হল, অঞ্জনি ব্যাডমিন্টনের বাড়িতে ফেটে গেছে। চোখের অপারেশন লাগবে না। তোমাদের অপেরেশনের টাকা বাঁচল। চোখ ঠিক আছে একদম। হা হা হা হা।”
বড়ই হতাশ হই। সবাই হে-হে হাসছে, আব্বা-আম্মাও। কেমন মানুষ এরা? যে অঞ্জনি অপারেশন করে কেটে বের করা, তা যদি এক ব্যাটের আঘাতে ফেটে যায়, তাতে যে কি ব্যথা, তাকি তারা বোঝে? চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে পরে থাকি পাঁচ দিন। আর ব্যাডমিন্টন খেলা। আর শীতকাল। ছোটবোন মামাদের সাথে নানাবাড়ি বেড়াতে যায়। আমি এক চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে শীতকাল কাটাই।
শীতকাল যদি গরম ধোঁয়া ওঠা হা হু করে কামড় দেয়া ফুলকপির পাকোড়া হত শুধু, তাকে ভালবাসা যেত। গরম ফুলকপিতে জিভ পুড়ে ঠিকই, কিন্তু তার বিনিমিয়ে গরম ভাপের ফুলকপিতে নরম মাখন স্বাদ আহা। শীতকাল যদি শুধু অতটুকুই হত। কিংবা গুড় ভরা পিঠার মতন ধোঁয়া ওঠা গরম চারপাশ। তা তো নয়। বরং উলের গোলার স্তূপ, হার কাঁপাকাঁপি, খুকখুক কাশি, কুয়াশা, স্নোয়ের ডিব্বা, নারিকেলের তেল।
নারিকেলের তেলের কথায় মনে হল। নারিকেল তেলের জমে ওঠার ব্যাপারটা আমার কিন্তু বেশ ভাল লাগত। দাদির হাতে বানানো খাঁটি নারিকেল তেল শীত আসলে, কেমন মোমের মতন সাদা হয়ে যেত। মাখনের মতন আলতো তুলে তুলে হাতে মুখে চুলে মেখে খানিকটা খেয়েও ফেলা যেত। তো আমার আর নারিকেল তেলের এই একসাথে জমে ওঠার ব্যাপারটা, এক অযথা শীতেই শেষ হল। শুকনো বড়ই আর গুড়ে মাখামাখি আচারের মতন টিকে থাকল না। বরং ওই আচারে জন্ম নেয়া সাদা ফাঙ্গাসের মতন, মাখামাখি সম্পর্কের স্বাদ নষ্ট করে দিল।
হয়েছে কি, পেটমোটা গলা সরু এক বোতলে নারিকেল তেল রেখেছিলাম সেই বর্ষাকালে। এই শীত শীত সময়ে প্রতিদিন বেশ মাখি, হাতে পায়ে, চুলের সামনের ছোট্ট ঢেউ খেলানো গোছাতে হালকা করে। সারাদিনের জন্য চুল পাটপাট। তখন কলেজে পড়ি। সেদিন শুক্রবার। রাসেলের সাথে খুশবু রেস্তোরাঁতে যাব। দুপুরের বন্ধুরা মিলে একটু একসাথে খাওয়া দাওয়া। আর রাসেলের সদ্য-হওয়া বান্ধবী শান্তা, তার দুই একজন বান্ধবীকে নিয়ে আসবে। রাসেল পই পই করে বলে দিয়েছে, একটু ফিটিং দিয়ে যেতে। এই রিক্তা বলে যে মেয়েটা আসবে, তার সাথে আমার একটা যদি সম্পর্কের ব্যবস্থা করা যায়। এমনি অন্য কলেজের মেয়েরা আসবে, তাই একজনের সাথে বিশেষ সম্পর্কের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। একটা লম্বা গোসল দিয়ে, হাত পায়ে সেই সরু মুখের বোতল থেকে তেল বের করতে যেয়ে দেখি, তেল জমে পাথর। অন্য সময়ে এই জমা তেলকে মাখন, মোম কত কি মনে হয়। আজ বড্ড তেতো বিচ্ছিরি লাগল, চিটচিটে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাসায়ও কেউ নেই। অগত্যা বুদ্ধি করে, মায়ের উলের কাঁটা দিয়ে বোতলের ভেতর ঢুকিয়ে জমাট তেল কুড়িয়ে কুড়িয়ে আনি। জমাট তো, আন্দাজ ঠিক বুঝতে পারিনি। অল্প অল্প করে মুখে চুলে তেল ঘষতে ঘষতে মনে হয় একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। সেদিন রেস্তোরাঁয় এই তেলতেলে চেহারায় আর কিছু জমে ওঠেনি। রিক্তা নাকি একে-তাকে বহুদিন বলে বেরিয়েছে, আমার চেহারা তেল-তেলে সিঁধেল চোরের মতন। অগত্যা আসন্ন বসন্তের সম্ভাবনা এক শীতকালেই মিলিয়ে গেল।
এর পরের শীত এসেছে শহরের অলি গলি ভাঁজ চিনতে চিনতে। বয়স জুড়ে, হেমন্তের ঝকঝকে আলো। তারুণ্য। কিন্তু তাতে যে শীতকাল খুব পাল্টে গেছে তা নয়। মাঝখান দিয়ে ভরে করেছে গোলমেলে হাঁপানি। পুরো শীতে সে দিব্যি আমার হৃৎমাঝারে থেকে যায়। ছেড়ে যায় না কোথাও। তবুও বয়সের গুণে, হাঁপানি উলের গোলা, জমাটি নারকেল তেলের চিটচিটে বিড়ম্বনাময় এক শীতে, আমার মনের শুকনো পাতার গাছে বসন্তরঙা টুকটুকে ডালিম জন্ম নিল। প্রেমানুরাগ। যার প্রতি এই টুকটুকে অনুরাগ জন্ম নিল, তার জীবনে আমার জন্য ডালিম তো দূরের কথা, কৎবেল গোছেরও কোনো অনুভূতি নেই। মানে একদমই নেই। অন্য কোথাও কোন ঘটনা আছে, ধারণা করা হচ্ছে। বন্ধু রাসেল বিজ্ঞ মানুষ। বললো, “হাল ছাড়া যাবে না, বরং কণ্ঠ ছাড় জোরে। এই মেয়ের এইসব পাতি ছুটকা ঘটনা তো টিকবে না। মেয়ে তোর কাছেই আসবে। তুই একবার যখন দিয়ে ফেলেছিস, এখানেই থাকবি।”
– “ইয়ে কি দিয়ে ফেলেছি।

– “মন, গাধা মন। এখন সারাদিন আসে পাশে ঘুরঘুর করবি। ক্লাসে, পাশে বসার চেষ্টা করবি। মনে থাকে যেন।”
আমিও তাই করি। এই ভরা শীতে, সকালের ক্লাস শেষে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ওই মেয়ের পেছন পেছন হাঁটি। সে বাসায় যায়, আমি পিছু পিছু যাই। মেয়ে পার্কে যায়, আমি দূর থেকে তার চারপাশে ঘুরি। তাতে ওই মেয়ের জমাটি নারকেল তেলের মতন ঘন চিটচিটে মন একটুও গলে না। লাভের মধ্যে লাভ হয়, কে যেন আব্বার কানে কথা দেয়। আমি নাকি মেয়েদের পেছনে ঘুরঘুর করি। সে এক শীতকাল। আমাদের ব্যাচের পিকনিক। চাঁদা তোলা হচ্ছে, বাসভাড়া, বাবুর্চি ঠিক, ভেন্যু, মেনু, র্যা ফেল ড্র, গান বাজনা… গিটার। আমি হাতখরচের টাকা দিয়ে নতুন একটা খয়েরি সোয়েটারও কিনে ফেলছি। এই মেয়েও যাবে পিকনিকে। আমিও যাব। এই শীতে, গরম ভাপা পিঠার স্বাদে, শহর থেকে দূরে, মেয়ের যদি আমার জন্য মন গলে। চান্স তো হাত ছাড়া করা যাবে না।
পিকনিকের আগের দিনে আব্বা জানিয়ে দিলেন, কোনো পিকনিক বনভোজন আমার জন্য না। আমি একটি বখাটে ছেলে। পিকনিকে যেয়ে মেয়েদের উতক্ত করতে পারি। আমার পিকনিক বন্ধ। আমি ভেবে পাই না, আমার নামে এমন মিথ্যা অপবাদ কে দিল। ইউনিভার্সিটির প্রথম পিকনিক। পিকনিকের দিন সকালে সে-কী শীত। সকালে উঠে বসে থাকি। আব্বার যদি মন গলে। বারান্দায় বসে ভেউ ভেউ করে কাঁদি। অনেক কুয়াশা তো, আর এই ভোরে কেউ ভাগ্যিস তা দেখে না। ইউনিভার্সিটির বাস ছেড়ে দিয়েছে। ঘড়ি দেখে বুঝি। আর তার পাঁচ মিনিট পর আব্বা এসে বলে, “আচ্ছা যেতে চাইলে যা।” আর কী লাভ। হল না পিকনিকে যাওয়া। আমি গলা ছেড়ে সবার সামনে ভেউ ভেউ করে কাঁদি। তখন ভরা শীত।
এর পরেও যদি মনে করেন, শীতকালের আর এমনকী দোষ, তবে আর কি বলার আছে? আরেকটি গল্প বলি তবে? কয়েক বছর পরের শীতে, ইউনিভার্সিটির রেজাল্ট বেরিয়েছে। ছোটখাট এক চাকরি পেয়েছি। সেই মেয়েটিকে বলব বলব ভাবছি। মোক্ষম সময়। তার সেই আগেকার সেই ঘটনা কেঁচে গেছে। মেয়ের মনের রাস্তা ফাঁকা। আমি সুযোগ বুঝে একদিন তার কাছে যাবো যাচ্ছি করছি, খবর আসল, সেই মেয়ে, বিয়ে করে ইতালি চলে গেছে। ততদিনে একটা মোবাইল কিনেছি। সস্তা। হাঁটছিলাম। মেয়ের মনের রাস্তার মতো, সেই হেঁটে যাওয়ার রাস্তাও আপাত দৃষ্টিতে ফাঁকাই ছিল। রাসেল যখন ফোন করে মেয়ের বিয়ের খবর দিল, কী যে হলো, মাথা ঘূর্ণি দিল। কোথেকে সেই ফাঁকা রাস্তায় এক ডাবল ডেকার বাস, সদ্য কেনা মোবাইল হাত থেকে ছিটকে প্রাণ হারাল। আমি বাঁচলাম। ওই পা ভেঙে হাসপাতালে কাটাতে হলো। তখন ছিল শীতকালের ঠিক মাঝামাঝি।
এই তো এমন করেই কেটে যাচ্ছে। জীবনে আয়-উন্নতি কিছুটা বেড়েছে, অস্বীকার করার উপায় নেই। নামওয়ালা এক প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করি। কিন্তু শীতকাল পিছু ছাড়ছে না। আমাদের যিনি বড় স্যার, খুব ভাল মানুষ। সারাবছর কাজ এতো মন দিয়ে করেন, আমার কাজের প্রশংসা করেন। উৎসাহ দেন। কিন্তু শীতকালে উনার একটু অসুখ হয়। মনের অসুখ। উনি শীতকালে সব ভুলে যান। এই অসুখের নাম নাকি, শীত-ভোলা। তো শীতে এমনি খুব শান্তই থাকেন। কিন্তু সব ভুলে যান। আর বেতন শব্দটাতে খুব খেপে যান। এই-যে সারাবছরের কাজের জন্য বছরের শেষে শীতকালে বেতনের ইনক্রিমেন্ট হবার কথা। উনার অসুখটাও এসময় শুরু হয় তো, তাই আর ইনক্রিমেন্ট হয় না। কোম্পানিও উনার ভুলে যাওয়ার এ অসুখ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কিন্তু কোম্পানি মনে করে, এমন কাজের লোক, শুধু শীতকালে একটুআধটু ভুলে যায়, বিশেষ করে বেতন বাড়ানোর কথা, এজন্য তাকে ছাটাই করা উচিত হবে না। তাই এমন করেই চলছে। আমারও আর ইনক্রিমেন্ট হয় না গেল তিন শীতকাল।
তো যাই হোক। আজ এখানেই শেষ করি বরং। শীত আসি আসি করছে। সুটকেসের উলের কাপড়গুলো নামানো দরকার। বউ দুদিন ধরে বলছে।
ওহ, এই যে এত বাজে বকতে যেয়ে বউয়ের কথা বলা হয়নি, নাকি? ওই যে অঙ্কুরে বিনষ্ট প্রেম আর ভাঙা পা নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম এক শীতে, মনে পড়েছে? তো যিনি নার্স ছিলেন তার সাথে আমার খুব খাতির জমেছিল। উনি সকালে রেডিওতে পুরান দিনের গান শুনতেন। আমার পছন্দ বলে আমার রুমে রেডিওটা নিয়ে আসতেন। লো ভলিউমে ভাঙা পা নিয়ে গান শুনতাম। হাসপাতাল ছাড়ার পরেও সেই নার্সের সাথে যোগাযোগ হত। জ্বি না, আপনারা ঠিক যা ভাবছেন তা না। উনার সাথে না। কিন্তু উনার দেবরের বড় জ্যাঠাশের ননদের জামাইয়ের এক ভাগ্নির সাথে আমার বিয়ের কথা চালালেন। কথা চলল। তখন শরৎকাল। বিয়েটা কিন্তু শীতকালেই হল। এবং বেশ ভাল হল কিন্তু, সত্যি। বেশ চলছে। সবচেয়ে ভাল হল, আমরা দুজনেই মটরশুঁটি খেতে দারুন ভালবাসি। দুজন মিলে, এক গামলা মটরশুঁটি ভাজি নিয়ে বসে গল্প করি যখন, আর শীতের গুষ্টি উদ্ধার করি, সময় কিন্তু অসময় মনে হয় না। বউই বুদ্ধিটা দিল, এই যে শীত নিয়ে এতো অভিযোগ এইগুলো লিস্টি করে রাখ। যদি কখনো ভুলে যাওয়া রোগ ধরে, তো লিস্ট পরে মনে করতে পারবে।
এই লিস্টি করতে যেয়েই তো এত অযথা কথা লিখলাম। আর লিখলাম বলেই তো মনে পড়ল যে, ভাল এক ঘটনা ঘটেছিল এক ভরা শীতে। আরো দু-এক খানা ঘটনা কিন্তু ঘটেছিল শীতকালে। মানের বিচারে তাদের খারাপ বলা যাবে না। ঠিকঠাক ধরনের ঘটনা। সে গল্প না হয় আরেকদিন লিখি। যাই কম্বলগুলো রোদে দিতে হবে। বউ ডাকছে।

Share Now শেয়ার করুন