কেতকী সর্বাধিকারী >> কবির পাখিরা >> রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী >> শ্রদ্ধার্ঘ্য

0
282

কবির পাখিরা

রবীন্দ্র সাহিত্যে পাখিরা বিরাট স্থান অধিকার করে আছে। রবীন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই প্রকৃতির বুকে পাখিদের মহত্ত্ব ও গুরুত্ব ভীষণভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তার প্রথম অবিস্মরণীয় কবিতা ‘নির্ঝরের স্বপভঙ্গ’ থেকেই তার পরিচয় পাওয়া যায়। এই দীর্ঘ কবিতার আরম্ভেই “আজি এ প্রভাতে প্রভাত বিহগ/ কী গান গাইল রে!” এবং এই কবিতার অতি পরিচিত সংক্ষিপ্ত অংশের তৃতীয় ও চতুর্থ পঙ্ক্তিতে আছে “কেমনে পশিল গুহার আঁধারে/ প্রভাত পাখির গান।” ভোরের পাখিদের গানের মূল্য যে কতখানি এবং মানুষের দিনের কাজের সঙ্গে এর কী গভীর সম্পর্ক তা তিনি তাঁর সাহিত্যের ভাণ্ডারে অক্ষয় করে রেখে গেছেন। তাঁর রচনায় প্রায় চল্লিশ রকমের পাখির প্রসঙ্গ পাওয়া যায় যাদের মধ্যে অনেকগুলি আমাদের বিশেষ পরিচিত। | রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যে কোকিলের কথাই সবচেয়ে বেশিবার পাওয়া যায়। কাব্যের ক্ষেত্রে ‘শৈশব সংগীত’ থেকে শুরু করে ‘আরোগ্য’ পর্যন্ত কতভাবেই না কোকিল এসেছে। কোকিলকে ইংরেজিতে Cuckoo বলা হয় এবং জীববিজ্ঞানের নাম Eudynamys scolopacea । কোকিলের কতকগুলি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। এই জাতির পুরুষপাখিরা তাদের গলার স্বরের জন্য বিশ্বখ্যাত। সাহিত্যে কবিরা এর জয়গানে মুখর। “ডাকের জন্যেই কোকিলের বিশ্বজোড়া খ্যাতি।” এরা বাসা বানায় না। কাকের বাসায় ডিম পাড়ে এবং কাক বাচ্চাদের পালন করে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে রবীন্দ্রনাথ তার ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ নামক বিখ্যাত প্রবন্ধে উপমারূপে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, “কাকের বাসায় কোকিল ডিম পাড়িয়া যায়, মানব ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন (‘চারিত্র পূজা’)।” কোকিলের সঙ্গে বসন্তঋতুর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। “কোকিল যে বসন্তের বার্তাবহ ইহা শুধু কবির কল্পনা নয় প্রাকৃতিক সত্য।… তার কণ্ঠনালী শীতের সময় এমন আড়ষ্ট হইয়া যায় যে সে শব্দ উচ্চারণ করিতে পারে না… কোকিল ভারতবর্ষের অভ্যন্তরেই অপেক্ষাকৃত কম শীতের দেশে শীতকালটা কাটায়।” বসন্তের নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশকেই এই পাখিরা পছন্দ করে। রবীন্দ্রনাথ কোকিল ও কুহুধ্বনিকে সাধারণ অর্থ থেকে শুরু করে গূঢ়তর অর্থে ব্যবহার করেছেন। ‘কল্পনা’ কাব্যের ‘বসন্ত’ কবিতায় কুহুকলস্বর যুগে যুগান্তরে কবির ও মানবমাত্রের বসন্তদিনের মধুর কথা ঘোষণা করে যাবে। এই কোকিলের ডাক তাঁকে দূর অতীতে পৌঁছে দিয়েছে এবং তিনি আপ্লুত কণ্ঠে বলেছেন, “আজ দুপুরে কোকিল ডাকে/ শুনে মনে লাগে/ বাংলাদেশে ছিলাম যেন/ তিনশো বছর আগে (কোকিল’, ‘খেয়া’)।” আবার এই পাখিটি যে ক্লান্তিহীন ডেকে চলে সে কথা তাকে কত ভাবিয়েছিল তার উল্লেখ পাওয়া যায় তাঁর পরিণত বয়সে লেখা ‘পুনশ্চ’ কাব্যের ‘ফাঁক’ কবিতায়।
এখানে তিনি বলেছেন, “অত একান্ত জেদ কোরো না।/ বনান্তরের উদাসীনকে মনে রাখবার জন্যে।” কোকিলের ডাকের মধ্যে যে কী নিবিড় ও গভীর আকুতি তিনি শুনতে পেয়েছেন। তাঁর শেষ বয়সের লেখাতেও শোনা যায় “আম্রবনছায়ে/ কোকিল কোথায় ডাকে ক্ষণে ক্ষণে নিভৃত শাখায়।” এই উল্লেখে পাখিটির স্বভাব, বৈশিষ্ট্য এবং বাসস্থানের ঠিকানা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তাঁর ‘রাজা ও রানী’ নাটকের রাজপুরোহিত দেবদত্ত ও তার পত্নীর কথোপকথনে কোকিলের রূপ ও স্বরের পরিচয় পাওয়া যায়—“কোকিলের মতো রঙ বলছি নে, কোকিলের মতো পঞ্চম স্বর (প্রথম অঙ্ক, পঞ্চম দৃশ্য)।” ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে পোষা কোকিলের মৃত্যু আশা ও মহেন্দ্রের জীবনে অশুভ সংকেত বহন করে এনেছিল। সেই সঙ্গে এ কথাও জানা যায় যে একটি কোকিলের ডাক শুনে অন্য কোকিল ডেকে ওঠে। তার ছোটগল্প ‘মাল্যদান’ ও ‘হালদার গোষ্ঠী’তেও কোকিলের ডাকের কথা বিশেষ করে বলা হয়েছে। | রবীন্দ্রনাথের রচনায় কোকিলের পরেই হাঁসের স্থান। হাঁসের অনেকগুলি প্রজাতি আছে। কিন্তু কবির লেখায় দু’তিনটি প্রজাতির কথা পাওয়া যায়। তবে তারা এসেছে বারবার এবং নানান ধরনের ভাবনা তার মধ্যে ব্যক্ত হয়েছে। ইংরেজিতে সাধারণ হাঁসকে বলা হয় Duck, রাজহাঁসকে (মরাল) Greylag goose যার বৈজ্ঞানিক নাম Anser anser; চখাচখিকে ইংরেজিতে বলে Ruddy shelduck এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Tadorna ferruginea৷ । যদিও হাঁসেরা উভচর প্রাণী কিন্তু তাদের জলের সঙ্গে যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তাঁর রচনায় তা বারবার দেখা যায়। পক্ষীবিশারদেরা বলেছেন, “এই হাঁসেরা ঝিলের জলে থাকতেই ভালোবাসে। কবির ‘প্রভাতসংগীত’ কাব্যের ‘পুনর্মিলন’ কবিতায় রাজহাঁসের তীরে ভেসে বেড়ানোর কথা পাওয়া যায়। ‘মানসী’র ‘মরণস্বপ্ন’ কবিতায়, ‘নদী’নামক দীর্ঘ কবিতায়, ‘চিত্রা’ কাব্যের ‘আবেদন’কবিতায়, ‘চৈতালি’ কাব্যের প্রভাত’ কবিতায়, ‘ক্ষণিকা’র ‘দুই তীরে’ কবিতায়, ‘নৈবেদ্য’র ২৫ সংখ্যক কবিতায় হাঁসেদের জলে ভেসে বেড়ানোর কথা এসেছে। ‘গীতাঞ্জলি’র ১১ সংখ্যক কবিতায় গানে মরালের ডানা মেলার কথা পাওয়া যায়। তাঁর বিখ্যাত ‘বলাকা’ কাব্যটির উৎস ঝিলম নদীর উপর দিয়ে আকাশে ভেসে যাওয়া বুনোহাঁসের পাখার ধ্বনি। কাব্যটির নামকরণও পঙ্‌ক্তিবদ্ধ পাখির শ্রেণির নামে। ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যের এগারো সংখ্যক কবিতায় তিনি যে সাধারণ একটি সকালকে বিশেষভাবে চিরন্তন করে রেখেছেন তাতে একটি মেয়ের পোষা রাজহাঁস আর তার ছানাদের চরাতে আনার ছবি হাঁসেদের জীবনধারার উপর আলোকপাত করে। আর ‘সহজ পাঠ’-এর বিখ্যাত পঙ্ক্তি – “হাঁসগুলি ভেসে ভেসে করে কোলাহল,” হাঁসেদের গতিবিধিকে জীবন্ত করে তোলে। কবি ‘রোগের চিকিৎসা’ নাট্যের কাহিনিতে ছোটো ছেলের চুরির প্রবৃত্তি সমূলে বিনাশ করার জন্যে হাঁসের প্রসঙ্গ এনেছেন। ছেলেটি সাহেবের বাড়ি থেকে হাঁসের ডিম চুরি করে আনত, পরে আস্ত হাঁসকে চুরি করে থলিতে ভরে পেটের মধ্যে রেখে নিজের বিপদ নিজে ডেকে এনেছে। চেপে ধরলেই হাঁসেরা ডেকে ওঠে আর তাদের ডিম যে লোভনীয় সেই বিষয়গুলি কবি অত্যন্ত কৌতুকের সঙ্গে পরিবেশন করেছেন। ‘শুভদৃষ্টি’ গল্পে একটি ছোটো বোবা মেয়ের সন্তানতুল্য হাঁসপ্রীতির মধ্যে এই পাখিটির সঙ্গে সাধারণ মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের পরিচয় পাওয়া যায়। অনেকটা হাঁস প্রজাতির পাখি চক্রবাক যা চখাচখী বা চকোর নামেও খ্যাত। সাহিত্যে এই পাখিটির সম্মানিত স্থান। এর সম্বন্ধে রবীন্দ্র-সাহিত্যেও বার কয়েক বলা হয়েছে। পক্ষীবিজ্ঞানীরা লিখেছেন, “পশ্চিম বাংলার শীতের আগের অতিথি চখাচখী বা ব্রাহ্মণী হাঁস সুদূর তিব্বতের মালভূমি থেকে শীতকালে উড়ে আসে আমাদের দেশে।… নদীর চরে শুকনো ডাঙায় এরা সারিবদ্ধভাবে বসবাস করে।” কবি তাঁর ‘নদী’ নামক দীর্ঘ কবিতায় লিখেছেন শীতকালে নদীর চরে দলে চখাচখী/ করে সারাদিন বকাবকি।” এরপরই আসে কাকের কথা। কাক অতি পরিচিত এবং ঘরোয়া পাখি। একে House crow বলে এবং প্রাণীবিজ্ঞানে বলে Corvus splendens. গৃহপালিত না হলেও মানুষের জীবনের সঙ্গে এই পাখিটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যেও ‘ছবি ও গান’ থেকে ‘সানাই’ পর্যন্ত নানাভাবে কাকের উল্লেখ পাওয়া যায়, ‘পত্রপুট’ কাব্যের নয় সংখ্যক কবিতায় প্রচণ্ড ঝড়ের দাপটে বিপর্যস্ত জনজীবনের সঙ্গে বিপন্ন কাকের যে ছবি পাওয়া যায় তা যতটা বাস্তব ততটাই চিত্ররূপময়—“কাকগুলো পড়ছে মুখ থুবড়িয়ে মাটিতে,/ ঠোঁট দিয়ে ঘাস ধরছে কামড়িয়ে,/ ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছে সরে সরে,/ ঝটপট করছে পাখাদুটো।” সকালসন্ধ্যায় কাকের চেঁচামেচি থেকে শুরু করে তাদের সমস্ত গতিবিধি কবি গভীরভাবে লক্ষ করেছিলেন। তাঁর শেষদিকের রচনায় কাকের কথা বেশ কয়েকবার পাওয়া যায়। অনাদৃত এই পাখিটির প্রতি তার অসীম মমত্ব ছিল। পরিত্যক্ত বাগানে কাকের ডাক এবং হাওয়ার আন্দোলনে নারিকেল ডালে কাকের দোল খাওয়ার মধ্যে কবি অপূর্ব জীবনবোধ ও অপার্থিব আনন্দের সন্ধান পেয়েছেন এবং লিখেছেন “কালো অঙ্গে চটুলতা, গ্রীবাভঙ্গী, চাতুরী সতর্ক আঁখিকোণে/ পরস্পর ডাকাডাকি ক্ষণে ক্ষণে—/ এ রিক্ত বাগানটিরে দিয়েছিল বিশেষ কী দাম।/ দেখিতাম আবছায়া ভাবনায় ভালোবাসিতাম (‘স্কুল-পালানে’, ‘আকাশ প্রদীপ’) ।” কাকেরা সদা সতর্ক। “প্রখর বুদ্ধি, সাহস ও সহজাত অনুভূতির সাহায্যে সবসময় ঠিক বিপদ এড়িয়ে চলতে পারে। ”কবি ‘পাখির ভোজ’ কবিতায় লিখেছেন, “একটুখানি যাচ্ছে সরে আসছে। আবার কাছে,/ উড়ে গিয়ে বসছে তেঁতুলগাছে।/ বাঁকিয়ে গ্রীবা ভাবছে বারংবার,/ নিরাপদের সীমা কোথায় তার।” কাকেদের এই বিশেষত্ব, তাদের আচরণ তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। কেবল নিরাপত্তাবোধেই নয়, যে কোনো অবস্থাতেই তারা সতর্ক। তাদের চরিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কবি বলেছেন, “কাকের দলের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিৎমন/ সন্দেহ আর সতর্কতায় দুলছে সারাক্ষণ।” পক্ষী বিশেষজ্ঞ বলেছেন, “বিরুদ্ধ পারিপার্শ্বিকের সহিত যুঝিয়া তাহাকে আত্মরক্ষা করিতে হয় বলিয়া কাক চোর, লোভী, ধূর্ত, দুর্মুখ।
পায়রা ইংরেজিতে Blue Rock Pigeon বলে পরিচিত এবং জীববিজ্ঞানে এর নাম Columba livia৷। এর সঙ্গে আমাদের ঘরোয়া জীবনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। কবির কাব্যে অনেকবার এর দেখা পাওয়া গেছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘পাখির ভোজ’ কবিতার অংশবিশেষ, যেখানে এদের শস্য খাওয়ার বিশেষ ধরনটির প্রতি তার গভীর ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য—“খানিক পরেই একে একে জোটে পায়রাগুলো,/ বুক ফুলিয়ে হেলে-দুলে খুঁটে খুঁটে ধুলো/ খায় ছড়ানো ধান।/… মাঝে মাঝে কী অকারণ ত্রাসে/ ত্রস্ত পাখা মেলে/ এক মুহূর্তে যায় উড়ে ধান ফেলে।/ আবার ফিরে আসে/ অহেতু আশ্বাসে।”এই দৃশ্য সকলেরই অতি পরিচিত। ‘সানাই’ কাব্যের ‘বাসাবদল’ কবিতায় পায়রাদের ওড়ার বিশেষ ভঙ্গিটির কথাও তিনি লিখে গেছেন—“আকাশেতে পায়রাগুলো ওড়ে/ ঘুরে ঘুরে চক্র বেঁধে।”
শালিখও আমাদের অত্যন্ত পরিচিত পাখি। একে ইংরেজিতে Common Myna বলে এবং এর জীববিজ্ঞানের নাম Acridotheres tristis। বিজ্ঞানীরাও একবাক্যে বলেছেন “শালিখ আমাদের নিত্যসহচর।” কবির সাহিত্যসৃষ্টিতে শেষের দিকেই এই পাখিটিকে বেশি দেখা গেছে। পাখিটিকে নানা নামে ডাকা হয়। তিনিও বিভিন্ন নামে ডেকেছেন, যেমন—শালিক, শালিখ, সারী বা শারিকা। শালিখের ঝগড়া করায় খ্যাতি আছে। তাঁর ‘পলাতকা’ কাব্যের ‘আসল’ কবিতায় সেই স্বভাবের পরিচয় তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন, “দশ বারোটা শালিখপাখি/ তুমুল ঝগড়া বাঁধিয়ে দিয়ে করত ডাকাডাকি।” পক্ষীবিজ্ঞানী বলেছেন, “দলবদ্ধভাবে বাস করিলেও ইহাদের পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বিরোধ অজ্ঞাত নহে। ঝগড়া মল্লযুদ্ধ—এগুলি তাদের জীবনের আমোদ-আহ্লাদেরই শামিল।” একটি খোঁড়া শালিখকে তিনি অমর করে রেখেছেন ‘পুনশ্চ’ কাব্যের ‘শালিখ’ কবিতায়। কবিতাটি সত্য ঘটনার উপর আধারিত। হিন্দি সাহিত্যের প্রখ্যাত সাহিত্যিক হজারীপ্রসাদ দ্বিবেদী “এক কুত্তা অউর একময়না” নামক স্মৃতিকথায় এর উল্লেখ করেছেন। কবির সংবেদনশীল মন ছোট্ট পাখিটির প্রতি প্রগাঢ় স্নেহ বর্ষণ করেছে।
চিলের কথা রবীন্দ্রনাথের রচনায় বারবার ফিরে এসেছে। এরা Pariah Kite বা Black Kite বলে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Milvus migrans। চিলের তীক্ষ্ণ ডাক এবং অনেক উঁচুতে ওড়া—এই দুটি বৈশিষ্ট্য তাঁকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করত। তাঁর রচনার মধ্যে যেমন ‘প্রভাতসংগীতে’ এর প্রসঙ্গ আছে তেমনি ‘জীবনস্মৃতি’তে ছেলেবেলার দিনগুলির স্মৃতিচারণের মধ্যে চিলের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ‘বীথিকা’ কাব্যের ‘প্রাণের ডাক’ কবিতায় তিনি যে বিশ্বজগতের মধ্যে প্রাণের ডাক শুনতে পাওয়ার কথা বলেছেন, সেখানেও দূর আকাশে উড্ডীয়মান পাখিটির নাম তাঁর সবচেয়ে আগে মনে পড়েছে, “সুদূর আকাশে ওড়ে চিল।” “ছড়ার ছবি’ কাব্যের ‘আকাশ’ কবিতায় চিলের সঙ্গে তাঁর নিবিড় আত্মিক সম্পর্কের কথা বিশেষ করে বলেছেন, “দুপুর রৌদ্রে সুদূর শূন্যে আর কোনো নেই পাখি, কেবল একটি সঙ্গীবিহীন চিল উড়ে যায় ডাকি/ নীল অদৃশ্যপানে;/ আকাশ প্রিয় পাখি ওকে আমার হৃদয় জানে।” প্রত্যেক পক্ষীতত্ত্ববিদ চিলের স্বভাব ও তার আচরণ এবং তার বিশেষ ধরনের প্রতি যে আলোকপাত করেছেন তাতে তার লোভী ও শিকারী রূপটিই সবচেয়ে বেশি প্রকট। কিন্তু কবির কাছে শিকারী হলেও তা রসময়। তাই ‘ছড়া’র ৬ সংখ্যক কবিতায় তিনি বলেছেন কুচো মাছের টুকরি থেকে চিলেতে নেয় ছোঁ মেরে।/ মেছনি তার সাত গুষ্টি উদ্দেশ্যে দেয় যমেরে।”
দোয়েল এমন একটি পাখি যে চেহারায় ছোটো কিন্তু গলার সুরের আধিপত্যে সে অনায়াসে কবির মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। ফলে সাহিত্যে তার অপরূপ ছবি দেখতে পাওয়া যায়। ইংরেজিতে একে Magpie Robin বলে এবং এর প্রাণীবিজ্ঞানের নাম Copsychus saularis. সাদায় কালোয় মেশা পুচ্ছটি উঁচিয়ে নৃত্য ও ভুবনভুলানো সুরলালিত্য কবিকে ভীষণ মুগ্ধ করেছিল। তার কাব্যে ‘সোনারতরী’ থেকে ‘রোগশয্যায়’ পর্যন্ত এই পাখি ফিরে ফিরে এসেছে। ‘ভরা ভাদরে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “দোয়েল দুলায়ে শাখা/ গাহিছে অমৃতমাখা।” পক্ষী বিশেষজ্ঞ বলেছেন, “গাইয়ে পাখিদের মধ্যে দোয়েলকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করা হয়।… দোয়েল যখন গান গায়, ওর লেজটি থাকে ঝোলানো আর লেজের পালকগুলি ঈষৎ প্রসারিত। গান গাওয়ার সময় ক্রমাগত লেজ নাচায় ওরা, দেখে মনে হয় যেন ঐভাবে গানের সঙ্গে তাল দিয়ে চলেছে। সারাদিন ধরে, এমনকি সন্ধ্যার পরও অনেক সময় দোয়েলের গান শোনা যায়।” ‘বীথিকা’ কাব্যের মাটিতে আলোতে’ কবিতায় এই পাখিটির বিশেষ ভঙ্গী, চাঞ্চল্য ও স্বভাববৈশিষ্ট্য কবি অতি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন—“চটুল দোয়েল পাখি সবুজেতে চমক ঘটায়/ কালো আর সাদার ছটায়/ অকস্মাৎ ধায় দ্রুত শিরীষের উচ্চ শাখা-পানে/ চকিত সে ওড়াটিতে যে রহস্য বিজড়িত গানে।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে. এই পাখিটি বাংলাদেশের জাতীয় পাখি।
ময়ুর ভারতের জাতীয় পাখি এবং সাহিত্য জগতের রাজকীয় স্থানটি সে দখল করে আছে। সেইসঙ্গে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের মানসজগতে তার বিরাট স্থান। কত ভাবে ও কত ভাবনায় যে ময়ুর কবির রচনায় পাওয়া যায় তা বিস্ময়ের বিষয়। শিবকালী ভট্টাচার্য বলেছেন—“এই নামটি ভারতের আদিসভ্যতার সঙ্গে যুক্ত।” ইংরেজিতে এর সাধারণ নাম Common Peafowl, Peacock এবং বিজ্ঞানে Pavo Cristatus. এই পাখিটির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল। ‘ক্ষণিকা’ কাব্যের ‘নববর্ষা’ কবিতায় তার ঐকান্তিক অভিব্যক্তি, “হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ুরের মতো নাচে রে”—এর চেয়ে বড়ো পক্ষীপ্রীতির, ময়ুরপ্রীতির উদাহরণ বিশ্বে বিরল। ময়ূরের নৃত্যের কথা তাঁর রচনায় বারে বারে পাওয়া যায়। ‘কল্পনা’ কাব্যের বিখ্যাত ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় শোনা যায় তালে তালে দুটি কঙ্কণ কন কনিয়া/ ভবনশিখীরে নাচায় গণিয়া গণিয়া/ স্মিত বিকশিত বয়নে।” এই কবিতার কল্পনার সরণী বেয়ে পাঠক কালিদাসের কালে উপনীত হয়েছেন। সেকালে ময়ূর গৃহপালিত ছিল এবং গার্হস্থ্য জীবনের সঙ্গে কত গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল, এখানে তার পরিচয় পাওয়া যায়। পক্ষী বিশারদেরা বলেছেন—“রাজস্থান, গুজরাত প্রভৃতি রাজ্যে ধর্মীয় কারণে ময়ূরদের সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে, তাই এইসব জায়গায় ময়ূরেরা অনেক পোষমানা নিরীহ প্রকৃতির।” ‘ক্ষণিকা’ কাব্যের ‘সেকাল’ কবিতায় তা কবি একেবারে স্পষ্টভাবে বলেছেন কালিদাসের কালে থাকলে তিনি কি কি করতেন। সেকালে নারীরা নাচিয়ে দিত ময়ূরটিরে/ কঙ্কণ ঝংকারে।” বর্ষার সঙ্গে ময়ূরের নৃত্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং এটি বৈজ্ঞানিক সত্য। পক্ষীবিজ্ঞানীরা বলেছেন, “প্রধানত বর্ষার ঋতুতে স্ত্রী পাখিকে আকর্ষণ করার জন্যে পুরুষ ময়ূর লেজের বাহারী পালকগুলোকে অর্ধচক্রাকারে উপরের দিকে তুলে পেখম মেলে নাচ দেখায়।” ‘নববর্ষা’ কবিতায় কবি বর্ষার আগমনে তার সমগ্র সত্ত্বার স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে বিকশিত রূপের সঙ্গে ময়ূরের নৃত্যের যে উপমা দিয়েছেন তার সঙ্গে বিজ্ঞানের সত্যটিও মিলে যায়। তিনি বলেছেন, ‘শত বরণের ভাবউচ্ছ্বাস/ কলাপের মতো করেছে বিকাশ/ আকুল পরাণ আকাশে চাহিয়া/ উল্লাসে কারে যাচে রে।” ‘বনবাণী’ কাব্যের ‘চামেলি বিতান’ কবিতায় তার পাশে এসে বসা ময়ূরের প্রতি লিখেছেন— “তোমার আমার তরে জানি/ মধুরের এই রাজধানী।/ তোর নাচ, মোর গীতি,/ রূপ তোর, মোর প্রাতি,/ তোর বর্ণ, আমার বর্ণনা—/ শোভনের নিমন্ত্রণে/চলি মোরা দুইজনে,/ তাই তুই আমার আপনা।” সুন্দরের উপাসক কবি এই সুন্দর পাখিটির তার কাছে নিঃশঙ্ক ও নিঃসঙ্কোচ আসাযাওয়ার মধ্যে নিত্য যে পুরস্কার লাভ করেছেন, সেকথা মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন। জনৈক মৃগয়া বিলাসী ইংরেজের ময়ুর বধের প্রতি তার তীব্র প্রতিবাদও এই কবিতায় শোনা যায়। অনুরূপ ভাবনা আছে ‘আকাশপ্রদীপ’ কাব্যের ‘ময়রের দৃষ্টি’ কবিতায়। কবি তাঁর প্রতি ময়ূরের ঔদাসীন্য দেখে লিখেছেন, “আমাদের ময়ুর এসে পুচ্ছনামিয়ে বসে/ পাশের রেলিংটির উপর।/ আমার এই আশ্রয় তার কাছে নিরাপদ।/ এখানে আসে না তার বেদরদী শাসনকর্তা বাঁধন হাতে।” তাঁর উপলব্ধি, “মনে প্রাণের দেনা-পাওনায় আর সবের সঙ্গে ময়ুরের চিরস্থায়ীত্ব এবং নীল আকাশ থেকে শুরু করে সবুজ পৃথিবী পর্যন্ত কোথাও ওদের দাম যাবেনা কমে।” ময়ুরের সৌন্দর্য ভুবনভুলানো কিন্তু তার কণ্ঠস্বর কিছুমাত্র সুমধুর নয়। কিন্তু কবি তাকেও অতি অপূর্বভাবে পরম রমণীয় করে আশ্চর্য বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ‘বিচিত্র প্রবন্ধে’র ‘কেকাধ্বনি’ প্রবন্ধে বলেছেন—কেকাধ্বনি “সমস্ত বর্ষার মর্মোদঘাটন করে এবং নববর্ষাগমে গিরিপাদমূলে লতাজটিল প্রাচীন মহারণ্যের মধ্যে যে মত্ততা উপস্থিত হয় কেকারব তাহারই গান। আষাঢ়ে শ্যামায়মান তমালতালীবনের দ্বিগুণতর ঘনায়িত অন্ধকারে, মাতৃস্তন্যপিপাসু ঊর্ধ্ববাহু শতসহস্র শিশুর মতো অগণ্য শাখাপ্রশাখার আন্দোলিত মর্মরমুখর মহাল্লোসের মধ্যে, রহিয়া কেকা তারস্বরে যে একটি কাংস্য ক্রেংকারধ্বনি উখিত করে তাহাতে প্রবীণ বনস্পতিমণ্ডলীর মধ্যে আরণ্য মহোৎসবের প্রাণ জাগিয়া ওঠে। কবির কেকারব সেই বর্ষার গান, কান তাহার মাধুর্য জানে না, মনই জানে।” কেকাধ্বনি অন্তর্নিহিতভাবে বর্ষাঘন প্রকৃতিতে যে কী মহামূল্যবান, রবীন্দ্রনাথ তাকে সুতীব্র উপলব্ধির গভীরে উপস্থাপিত করেছেন। কবির উপলব্ধ সত্য, প্রকৃতির সত্য ও বিজ্ঞানের সত্য এখানে এক হয়ে গেছে।
বকও অতি পরিচিত পাখি। নানান ধরনের বকের প্রজাতি আছে। সাধারণত ছোটো কোর্চে বকই আমাদের কাছে বক বলে পরিচিত। একে ইংরেজিতে বলে Median Egret এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Egretta intermedia। রবীন্দ্রনাথের কাব্যে ও অন্যান্য রচনায় বেশ কয়েকবার বকের কথা পাওয়া যায়। পক্ষীবিজ্ঞানীরা বলেছেন, “ভারতের সর্বত্রই এদের সারাবছর ধরেই দেখা পাওয়া যায়। সাধারণত এদের দেখা যায় জলের পাড়ে।” কবি তাঁর ‘নদী’ নামক দীর্ঘ কবিতায় বলেছেন নদীর যাত্রাপথে “তাহার দুইকূলে উঠে ঘাস/ সেথায় যতেক বকের বাস।”এই উক্তি থেকে অনায়াসেই বকেদের বাসস্থানটি সম্পর্কে জানা যায়। ‘পুনশ্চ’ কাব্যের ‘ছেলেটা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, “মরা নদীর বাঁকে দাম জমেছে বিস্তর/ বক দাঁড়িয়ে থাকে ধারে।” এতে যেমন তাদের থাকার জায়গার কথা জানা যায়, তেমনি তাদের শিকার করার ধরনটিও জানা যায়। বিজ্ঞানীর ভাষায়, “শিকার দেখতে পেলে এরা অনেকটা হেরনের কায়দায় সরু লম্বা গলাটিকে তীরের মতো জলের মধ্যে ঢুকিয়ে তীক্ষ্ণ ঠোট দিয়ে তাকে ধরে। এ ছাড়াও আছে বকের উড়ে যাওয়া, বকের দলের পঙ্ক্তিবদ্ধ হয়ে উড়ে চলা, তাদের পাখার শব্দ তার কাছে গভীর ও গৃঢ় বাণী বহন করে এনেছে। এমন কি ঘর সাজানোর ব্যাপারেও দেওয়ালে ‘ঝিনুক বসিয়ে আঁকা বকের সার’-এর ছবির কথা আছে যা ‘গৃহপ্রবেশ’ নাটকে পাওয়া যায়। পঙ্‌ক্তিবদ্ধ বকের শ্রেণির সুদূরতার মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ায় যেমন আছে গতির বাণী, তেমনি আছে সৌন্দর্যের অসীমতা।।
টিয়া, শুক বা তোতা আমাদের অত্যন্ত চেনা পাখি। ইংরেজিতে একে বলে Rose Ringed Parakeet বা Parrot এবং প্রাণীবিজ্ঞানে এর নাম Psittacula Krameri। ভারতবর্ষে প্রাচীন কাল থেকেই এই পাখিটির বিশেষ মহত্ত্ব ও গুরুত্ব আছে। কবির রচনাতেও বারকয়েক এই পাখিটিকে পাওয়া যায়। এই পাখিটির মুখস্থ করার বা শেখানোর কথা বলার বিশেষ গুণ অছে। ‘ছড়া’ কাব্যের ছয় সংখ্যক কবিতায় তিনি বলেছেন, “টিয়ের মুখের বুলি শুনি হাসছে ঘরে পরে/ রাধেকৃষ্ণ, রাধেকৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে।” পক্ষী বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, “টিয়াদের তীক্ষ্ণসুরের কিয়াক্‌-কিয়া ডাকটি সব সময়েই শোনা যায়, উড়বার সময়ও ডাকে, আবার চুপ করে বসে বসেও ডাকে। এই প্রজাতিটি এবং এর চেয়ে বড়ো জাতের, যেগুলিকে রায় তোতা বা হীরামন্ত (হীরামন) তোতা বলা হয়। এই দুই জাতের টিয়াই লোকে শখ করে খাঁচায় পোষে এবং কথা বলতে শেখায়। শেখানো এরা কিছু কিছু বুলি অস্পষ্টভাবে বলতে পারে।” এই প্রসঙ্গে ‘লিপিকা’র ‘তোতা কাহিনী’র কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। গল্পটিতে তোতাকে শেখানোর প্রয়াস ও পরিণতির কথা আছে। কিন্তু এই পাখিটির মধ্যে শেখানো কথা বলার প্রবণতা যে আছে, সে কথাটি অতি সহজ ও স্বাভাবিকভাবেই সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
আর একটি পরিচিত ও ঘরোয়া পাখি চড়াই বা চড়ুই যাকে ইংরেজিতে বলে House sparrow আর প্রাণীবিজ্ঞানে Passer domesticus। এদের সঞ্চরণ সর্বত্র আর অবাধ। এই পাখিরা নিজেরা খুব ঝগড়াঝাটি করে আর প্রচুর শব্দ করে। ‘পলাতকা’ কাব্যের ‘ছিন্নপত্র’ কবিতায় দুপুরের নিস্তব্ধতার মধ্যে একমাত্র চড়ুই পাখির সরব অস্তিত্বের কথা কবি মনোরমভাবে লিখেছেন, “বেলা যখন আড়াইটে প্রায়, নিঝুম হল পাড়া,/ আর সকলে স্তব্ধ, কেবল গোটাপাঁচেক চড়ুই পাখি ছাড়া।” এই পাখির উৎপাত ও উপদ্রবে গৃহস্থ মানুষ মাত্রে অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু কবির কাছে অসীম প্রাণের, অফুরন্ত আনন্দের ও আলোর বার্তাবহ এই চড়াইপাখি। এর প্রতি তাঁর প্রগাঢ় মমত্ব ও দরদ উপচে পড়েছে ‘রোগশয্যায়’ কাব্যের ছয় সংখ্যক কবিতায়—অসুস্থ কবির ঘরের “শাসির পরে ঠোকর” মেরে ভোরবেলায় তার ঘুমের ঘোর ভাঙিয়ে দিয়ে যায় চড়ুই পাখি। তার মনে হয়েছে সে জানতে এসেছে “কোনো খবর আছে নাকি।” অসুস্থতায় ঘেরা বন্দিজীবনের বাইরে যে বিরাট প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা বিশ্বজগৎ আছে, তার সংবাদ সে কবির কাছে বহন করে এনেছে। তিনি গভীর আনন্দে আপ্লুত হয়ে গেছেন। এই ছোট্ট পাখিটি মহাকবি কালিদাসের কাছেও কোনো মর্যাদা পায়নি কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেছেন যে পাখিটি তা ‘কেয়ার’ই করেনি। তিনি তার সম্বন্ধে লিখেছেন, “কালিদাসের ঘরের মধ্যে ঢুকে/ ছন্দভাঙা চেঁচামেচি/ বাঁধাও কী কৌতুকে।/ নবরত্ন সভায় কবি যখন করে গান/ তুমি তারি থামের মাথায় কী কর সন্ধান।” খাদ্যের সন্ধানে সর্বত্র তার অবাধ গতিবিধি। পক্ষীবিজ্ঞানী বলেছেন, “যেখানে মানুষ আছে সেখানেই চড়াই পাখিও হাজির।” অসুস্থ বৃদ্ধ কবি তার রোগশয্যায় দীর্ঘ অনিদ্ররাত ব্যথা বেদনায় কাটান কিন্তু অপেক্ষায় থাকেন সকালে কখন এই ক্ষুদ্র বন্ধুটি এসে তার দরজায় “প্রথম চঞ্চুঘাত” করবে। এই অপেক্ষা কি সাধারণ অপেক্ষা, সাধারণ আশা। কবির উৎকণ্ঠিত ব্যাকুল চিত্তের প্রত্যাশা সমস্ত বিশ্বপ্রাণশক্তির প্রতিভূ। ছোট্ট চড়ুই পাখির কাছ থেকে। তাই কবিতাটির শেষ পঙ্ক্তিগুলিতে তার সমস্ত অন্তরের কৃতজ্ঞতা, উপলব্ধি ও আশা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে—“অভীক তোমার, চটুল তোমার,/ সহজ প্রাণের বাণী/ দাও আমারে আনি—সকল জীবের দিনের আলো/ আমারে লয় ডাকি,/ ওগো আমার ভোরের চড়ুই পাখি।” রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “…জাগ্রত জগতের প্রতিও কবির দৃষ্টি আজ তেমনই দরদে পূর্ণ, যে দরদ মানুষ পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ গাছপালা ফুল ফলে বিশ্বচরাচরে সমভাবেই ব্যাপ্ত। বিনিদ্র রজনী শেষে আলোর প্রথম অভ্যুদয়কে তিনি আভনন্দিত করেন; আবার সকলের বিরক্তি-উৎপাদক চড়ুই পাখি, কোনো কবি যাহার জন্য দুইটি পংক্তিও লিখিয়া যান নাই—তাহাকে অমর করিয়া গেলেন ছন্দোমধ্যে।”
পরিশেষে আর একটি পাখির উল্লেখ করা প্রয়োজন যার নামকরণ স্বয়ং কবিই করেছেন। এই পাখিটি হল উড়োজাহাজ, যাকে কোথাও বলেছেন দানবপক্ষী এবং কোথাও পক্ষীমানব। অবশ্যই এর বৈজ্ঞানিক নাম আছে Aeroplane। যখন দেশে দেশের সংঘাত আকাশকেও কলুষিত করে তুলেছে তখন কবি তীব্র ধিক্কারে বলেছেন দানবপক্ষী; ‘প্রান্তিক’ কাব্যের ১৭ সংখ্যক কবিতায় তারই প্রকাশ—“এ দিকে দানবপক্ষী শুধু শূন্যে/ উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে বৈতরণী নদীপার হতে/ যন্ত্রপক্ষ হুংকারিয়া নরমাংসধিত শকুনি,/ আকাশেরে করিল অশুচি।” পক্ষীমানব শব্দটি যখন তিনি উড়োজাহাজ বা বিমানযানের প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছেন তখনও আকাশে পাখির মতো বিচরণ করা এই যন্ত্রের চেয়ে বিধাতার সৃষ্ট পাখির শ্রেষ্ঠত্বকে সহর্ষ স্বীকৃতি দিয়েছেন এই বলে—“যুগে যুগে তারা গগনের পথে পথে/ জীবনের বাণী দিয়েছিল আনি অরণ্যে পর্বতে” (পক্ষীমানব’,নবজাতক)।” প্রকৃতির বুকে সঞ্চরণশীল এই পাখিরা কবির কাছে কেবল প্রাণীমাত্র নয়, নিত্যবহমান সৃষ্টিধারায় তারা জীবনের নবীনতার এবং আনন্দের বার্তাবহ। সেইসঙ্গে অবশ্যই “তাহাদের প্রাণ, তাহাদের গান/ আকাশের সুরে সাধা।”

Share Now শেয়ার করুন