খালিদ মারুফ > ‘সাপ ও শাপ সংক্রান্ত গল্পাবলি’ বিষয়ে >> নিজের বই নিয়ে

0
1843

খালিদ মারুফ > সাপ ও শাপ সংক্রান্ত গল্পাবলি বিষয়ে >> নিজের বই নিয়ে

“গল্পের প্লট, চরিত্র, প্রারম্ভ, সমাপ্তি এসব নিয়ে ভেবে ভেবে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে রাত পার করে দেয়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। ‘গল্প ভাবনা’ নিয়ে আমি যখন ভাবছি তখনও সেই রাত; একই রকম নির্ঘুম। এমন অসংখ্য ভাবনাজাত গল্পপ্রকল্প আমার মস্তিষ্ক থেকে উবে গিয়েছে, হারিয়ে গিয়েছে, খসে গিয়েছে, সকালে শাওয়ারের নিচে উদোম দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে, দূর ছাই! কিছুইতো আর মনে করতে পারছি না।”

গল্প তো লেখা হলো বেশকিছু, বইও প্রকাশিত হলো। সম্পাদক বললেন, সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমার প্রকাশিত গল্পের বইটি বিষয়ে কিছু জানতে চান, আমি যেন লিখে জানাই। গল্পের প্লট, চরিত্র, প্রারম্ভ, সমাপ্তি এসব নিয়ে ভেবে ভেবে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে রাত পার করে দেয়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। ‘গল্প ভাবনা’ নিয়ে আমি যখন ভাবছি তখনও সেই রাত; একই রকম নির্ঘুম। এমন অসংখ্য ভাবনাজাত গল্পপ্রকল্প আমার মস্তিষ্ক থেকে উবে গিয়েছে, হারিয়ে গিয়েছে, খসে গিয়েছে, সকালে শাওয়ারের নিচে উদোম দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে, দূর ছাই! কিছুইতো আর মনে করতে পারছি না। তবে ‘গল্প ভাবনা’কে আমি জিইয়ে রেখেছি বেশ খানিকটা সময়, বেশ কয়েকটা দিন ও রাত।
শুরুতে আমি ভেবেছি, ‘গল্প কী? গল্প নামক প্রত্যয় কি শুধু ধারণা (অবধারণ অর্থে) ও এর বস্তুগত অবস্থানের যুগপৎ উপলব্ধি? নাকি কেবল ধারণা ও অভিজ্ঞতার চিত্তাকর্ষক বর্ণনা? এমন দ্বন্দ্বমুখর মানসিক সংকট থেকে আমি প্রাথমিকভাবে মেনে নিয়েছি ‘মানুষের কোনো কল্পনা শক্তি নাই, অন্তত মিথিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজে। সূত্রবদ্ধ, পদ্ধতিগত কল্পনায় চড়ে আমরা অজ্ঞাত রাশির ফল কিংবা মান নির্ণয় করতে পারি তবে পারি না যাপিত জীবনের হিসাব মেলাতে সেটার প্রায় পুরোটাই ভরা থাকে গোঁজামিলে। তবে কি চূড়ান্ত পর্বে আমাদের শুধু মৃত্যুর জন্যেই অপেক্ষা ?
এই ক্রাইসিস থেকে আপাত উত্তরণের পথ হিসেবে আমি মনে করার চেষ্টা করেছি ‘গল্প’প্রত্যয়টি কবে থেকে আমার স্নায়ুতে প্রবেশ করলো, গেড়ে বসলো? এই প্রত্যয়ের সাথে আমার পরিচয় কবে থেকে? গল্পগুচ্ছ আমার বাড়িতে ছিলো না, হয়তো নিচু বাংলার ভূমি আর আর ভূমির ফসলনির্ভর জীবনাবাসে কদাচিৎ এর উপস্থিতি লক্ষ করা যাবে। আমার বাড়িতে ছিল ছেঁড়াখোড়া, উইকাটা বিবর্ণ একখানা ঠাকুমার ঝুলি। পাঠকরার কৌশল রপ্ত করে ওঠার পূর্বেই সেইসব গল্প আমি শুনেছি, বলতে দ্বিধা নেই আমার মায়ের চেয়ে নানির গলায়ই বুদ্ধু আর ভূতোম আরো বেশি জীবন্ত হয়ে ধরা দিতো। রানি হয়েও কেবল পেঁচা আর বানর প্রসব করা সেই ক্ষমতাহীন নারীর প্রতি তীব্র দরদে আমার নানির ঠোট কেঁপে কেঁপে উঠতো। সুড়ঙ্গে আটকে পড়া লোভী রানির সন্তানদের বুদ্ধুর লেজ বেয়ে মুক্তি পাবার পর আবার সেই কৃতঘ্ন আচরণ। উফ ! কেন তারা এমন! কিয়ৎক্ষণে খেই হারিয়ে ফেলা আমি বলতাম, ‘নানু আবার কও’। নানি বলতেন, আবার বলতেন। শেষ হলে তিনি এবার আমাকে নিয়ে যেতেন পারস্য দেশে। ঘুমিয়ে পড়া রুস্তম পালোয়ানের চুরি হয়ে যাওয়া ঘোড়ার পেছনে আমিও তখন চলে গিয়েছি তহমিনার দেশে, সম্ভবত সামেনগান।
স্বল্পালোকিত চাঁদের রাতে উঠোনে মাদুর বিছিয়ে গল্প শোনার যে মহান অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে তা ছিলো আমার বড়ফুপুকে ঘিরে। কত শত রাক্ষস-খোক্কস, দেও-দানব, পরি-জীন এক একটা যেন জীবন্ত হয়ে হয়ে আমাদের শোতৃমণ্ডলির চারপাশে ঘোরাঘুরি করতো। মাঝ উঠোন থেকে কয়েকটি পা ফেলে একা ঘরে পৌঁছার সাহস হতো না। ফুপু বলে যেতেন, পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছে রাক্ষস, তার সাথে সন্ধি হয়েছে গ্রামবাসীর, সে আর পাহাড় থেকে নেমে গ্রাম উজাড় করে দেবে না। প্রতিদিন গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে একজন স্বাস্থ্যবান পুরুষ যাবে তার কাছে আর সে মহানন্দে ঘাড় মটকে মুণ্ডু ছিড়ে রক্তমাংস ভক্ষণ করে জমিয়ে রাখবে শুধু হাড়।
তারপর মাথার উপরে চাঁদ যখন আরো গাঢ় লাল হয়ে উঠতো তখন রাক্ষস ছাপিয়ে জেগে উঠতো সিরাজ মাস্টার, আর তার গরু জবাইয়ের ছোরা। সারারাত বৃষ্টির পর সেদিন সকালে রোদ উঠেছিল ঝলমলে। সকাল হওয়া মাত্রই সিরাজ মাস্টার উদ্যত ছোরা হাতে মিলিটারি নিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়ে। কেননা সকালের নাস্তার আগেই তার ত্রিশ জনকে জবাই করা চাই। তারপর? গ্রামের সক্ষম সকল পুরুষকে বেঁধে নিয়ে যায় এক দড়িতে। শরীর-জীবন বাঁচাতে মজা পুকুরের শাপলার ঝাড়ে ঢোড়া সাপের পাশাপাশি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে বসতবাড়িতে লাগানো আগুনের লাফিয়ে আকাশ ছুঁয়ে উঠতে দেখার গল্প। কেউ নেই, দূর থেকে কার যেন আর্তনাদ শোনা যায়, উঠে এসে কান্না ঢাকা চোখে আজলা ভরে পানি ছিটিয়ে আগুন নেবানোর প্রাণান্ত চেষ্টা। একসময় আগুন সব ভস্মসাৎ করে দিয়ে নিভে যায়। খাল সাঁতরে কার যেন এপারে আসার শব্দ শোনা যায়। কাটা গলনালী আর বেয়নেটে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাওয়া পেট নিয়ে কিভাবে কাঞ্চন এপারে আসলো তা আল্লাই জানে। পাড়ে এসে পড়ে যাওয়া কাঞ্চন কী যেন বলছিল অস্ফুটে। তার ফুটো হয়ে যাওয়া গলনালিতে তখন আর বাতাস আটকায় না। মৃত্যুর পূর্বে কাঞ্চন কী সব বলছিলো, তা আমার বড় ফুপু শুনে নিতে পারে নাই। মরণোন্মুখ প্রিয় ভ্রাতার মুখে একফোঁটা পানি তুলে দিতে আবার দৌঁড়ে খালের পাড়ে যাওয়া, উপুড় হয়ে আজলায় পানি তুলতে গেলে তার চোখ যায় সামনে। পিছমোড়া করে বাধা মুণ্ডহীন-মুণ্ডসহ মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে খালে।
এদের কেউ কি তখনও বেঁচে ছিলো? কী সেই কথাগুলো যা আমার পূর্বপুরুষ বলে যেতে পারে নাই। কী? কী? সেইসব অসমাপ্ত সংলাপের পশ্চাদ্ধাবন করাই কি তবে আমার গল্প লেখা?

বই সম্পর্কিত তথ্য
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত মোট ষোলটি গল্প রয়েছে এই বইয়ে। বইটি বাতিঘর প্রকাশন থেকে বের হয়েছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯-এর শুরু থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাতিঘর প্রকাশনের স্টলে বইটি প্রদর্শিত হচ্ছে। স্টল নম্বর ১২১-১২২। বইটির নান্দনিক প্রচ্ছদ অলঙ্করণ করেছেন শিল্পী সব্যসাচী মিস্ত্রী। উন্নত কাগজ ও বাঁধাঁইয়ে ১৮৪ পৃষ্ঠার বইটির মুদ্রিত মূল্য ৩৪০.০০ (তিনশত চল্লিশ) টাকা। মেলায় বইটি ২৫% কমিশনে সংগ্রহ করা যাবে। এছাড়া এই মুহূর্তে বাতিঘরের ঢাকা-চট্টগ্রাম কেন্দ্র ও অনলাইন মাধ্যমে বইটি পাওয়া যাচ্ছে।

Share Now শেয়ার করুন