খালেদ উদ-দীন | ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’ : মহাকাব্যিক এক জীবনচরিত | পাঠপর্ব

0
129

দীর্ঘ এক কবিতার বই ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’। চার অধ্যায়ে বিভক্ত ৮৪ পৃষ্ঠার এই কবিতার বইতে জাহানারা পারভীন এক ঘোরলাগা কাব্যভাষায় মোহগ্রস্ত করে রাখেন শেষ লাইন পর্যন্ত। আছে ইতিহাস, মিথ, স্মৃতি, বিরহ ও স্বপ্ন। পারভীন মহাকাব্যিক দ্যোতনায় আমি-সত্তাকে প্রাচ্যের নানা অনুসঙ্গে, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গেঁথেছেন আশ্চর্য শব্দমালায়।

স্তিত্বের যন্ত্রণা থেকে যে তাড়নার সৃষ্টি হয় সেখানে শিল্পসত্তা যোগ হলে বুঁদবুঁদ উঠবেই। সনাতন জীবনপাঠে বৈচিত্র্য আছে। আজও অমরতার লোভ ও বিস্ময় কাটেনি। উপভোগে মত্ত কিংবা জিজ্ঞাসু মন চারপাশের দেয়াল টপকাতে চায়।

“আত্মা চুরি হওয়া মানুষের শার্টের কলারে জমা মনের ময়লা বেচতে এসেছি ভেজাল শহরে। ঈর্ষার সূচে ফুটো হতে হতে বেঁচে যায় নির্বোধ বেলুন। তবু তাকে বলো, ভিনগ্রহের প্রাণীদের সাথে দেখা হলে যেন বলে পৃথিবীর দূষিত বায়ু আর মানুষের কথা। (পৃষ্ঠা-৮১)”

দীর্ঘ এক কবিতার বই ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’। চার অধ্যায়ে বিভক্ত ৮৪ পৃষ্ঠার এই কবিতার বইতে জাহানারা পারভীন এক ঘোরলাগা কাব্যভাষায় মোহগ্রস্ত করে রাখেন শেষ লাইন পর্যন্ত। আছে ইতিহাস, মিথ, স্মৃতি, বিরহ ও স্বপ্ন। পারভীন মহাকাব্যিক দ্যোতনায় আমি-সত্তাকে প্রাচ্যের নানা অনুসঙ্গে, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গেঁথেছেন আশ্চর্য শব্দমালায়। দীর্ঘকবিতা অনেকটা ক্লাসিকাল মিউজিকের মতোন হয়তো সবার জন্য না। এ ধরনের কবিতার জন্য দরকার প্রস্তুত পাঠক, যিনি আসল স্বাদ আস্বাদনের জন্য দীর্ঘপাঠযাত্রায় নিমগ্ন থাকবার জন্য তৈরি থাকেন। এই কবিতার বইতে যে-সব চিত্রকল্প এঁকেছেন জাহানারা পারভীন, পাঠে-পাঠে আপন সত্তাকে যেন খুঁজে পাওয়া যায় আর সেই সত্তার মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে আমাদের শিশুবেলা ও স্বপ্নময় সারাবেলা।

“তোমাকে দেখলে নায়াগ্রার কথা মনে হয়। জলপ্রপাতের ওপর ওড়া পাখি রেখে গেছে পায়ের মাপ। ছোট নূপুরের প্রসঙ্গ রেখে কেন যে মাপতে চেয়েছি চীনের প্রাচীরের দৈর্ঘ্য। জানতে চেয়েছি প্রশ্নকর্তার নাম। দর্জিবাড়ির গজ ফিতেয় নিয়েছি মনের মাপ। এসব কথার কোনো মানে হয়, যদি ঠিকঠাক শুনতে না পারো হাতের আঙুল! বুঝতে না পারো চোখের ভাষা, ছুঁয়ে থাকা হাতের অভিমান। তবুও মেনেছি পৌরহিত্য তোমার। যাজক যেমন মেনে নেয় গির্জার হাসি। নাবিকের লবণাক্ত চোখ স্বীকার করে সমুদ্রের নুন।”

ফ্ল্যাপে কবি শামীম রেজা লিখেছেন, ”পারিপার্শ্বিক সমাজ-বাস্তবতার বাঁক বদলের মতোই জাহানারা পারভীন নিজেকে পূর্বাপর কাব্যগ্রন্থ থেকে আলাদা করে তাঁর জাত চিনিয়েছেন ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’ দীর্ঘ কবিতায়। মহাকাব্যিক দ্যোতনার মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বের সঙ্গে আমি-সত্তার যে সংশ্লেষ স্থাপনের চেষ্টা, নিজস্ব কাব্যভাষায় তার স্বার্থক উপস্থাপন এই কাব্যগ্রন্থ। বাস্তব-পরাবাস্তব-অধিবাস্তবের মেলবন্ধন ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’ কাব্যগ্রন্থটি। প্রাতীচ্য ও প্রাচ্যের নানা প্রসঙ্গ অনুষঙ্গের অবতারণার ভিতর থেকেও একবারও ভুলে যাননি কবি তাঁর আপন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্থানিকতা। এখানেই জাহানারা পারভীনের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট।”

“জন্মগ্রামে ফেলে এসেছি বিপ্লবী কাস্তের ধার। নাড়িপোঁতা মাটিতে গজানো খেজুরগাছের অধিকার। আমার অভিধানে যত শ্লোক, দুঃখিত বর্ণমালা, কথাসূত্রে কখনো বলিনি। অহল্যার ঘুম ভাঙাতে আসবে, ভাঙাবে অক্ষরের জেদ, নেই এমন অপেক্ষার তাড়া “ (পৃষ্ঠ ৩৭)

এ যুগে মনস্তাত্ত্বিক ও যন্ত্রকেন্দ্রিক যে বৈপরীত্য লক্ষ করি, সেখানে প্রবল হাহাকার যেমন আছে, তেমনি সৃজিত হচ্ছে বহুরৈখিক চমক। সময় কখনও নিরাশ করে না। সেই প্রাচীন যুগ থেকে কবিতাই তৈরি করে দিচ্ছে শেকড়। শিল্পের অবয়বে কবিতা হয়ে ওঠে সর্বগমনের শেষ পাঠ। বাংলাভাষী ভূগোলে কবিতার যেখানে শেকড় সেখানে ভাঙা-গড়া এক চিরায়ত খেলা।

“ধোপাঘর ফেরা শার্ট চিনেছে তোমাকে? সেলাইকলে মাথা পেতে সূচের ঘা সয়ে যারা নির্মাণ করেছে পোশাকের মর্যাদা। তাদের ভগ্নাংশ মানুষের সেলাইকরা সম্পর্কের মতো ঠুনকো। সেই সেলাইকন্যা, সেলাইপুত্ররা মেরামত করতে পারেনি ছেঁড়া কপাল।” (পৃষ্ঠা ৪৫)

প্রতিটি চিত্রকল্পে কী এক মায়াবী আলোড়ন। সেখানে কখনও আবেগ কখনও প্রকৃতির মায়াবী রূপ তুলে ধরে জাহানারা পারভীন এঁকেছেন কাঙ্ক্ষিত শিল্পচিত্রই।

যাপিত দ্বন্দ্বে নিরন্তর ছুটে চলা। এখানে ওখানে কেবল কোলাহল, কে আর কবে পেয়েছে খুঁজে অতল শিল্পসমুদ্রের তল। তবুও জীবন কখনও থেমে থাকে না। প্রবহমান স্রোতে ভেসে যায় স্বপভেলা :

“তালপাতার বাঁশি বাজাতে না পারার অপরাধে পাইনি সিনেমা হলের টিকেট। মায়ের মাটির ব্যাংকে লুকিয়ে রেখেছি চতুর্থ দাবি। তৃতীয় দাবি বাবার পকেটে। দ্বিতীয় বর্ষে পায়ের রক্তপাতে পাওয়া যায়নি মমতার ডেটল। ওষুধের দোকানে ঠেলে এসেছি জুতোর একপাটি। প্রথম বর্ষে শহর থেকে অনেক দূরে সরে গেছে নদী – যেভাবে জীবন থেকে সরে যায় প্রেম। মহাসাগরের জল ধুয়ে দিয়ে গেছে জংধরা উপশহরের পায়ের মরচে। পঞ্চম বর্ষে ধানদূর্বা নিয়ে বরণ করা তোমাকে বসতে দিয়েছি হাতির দাঁতের কারুকাজ করা পিঁড়ি। পিঁড়ির মালিকানা পাওয়ার পর জানতে চাওনি ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে এসেছি কার রোল নম্বর। জন্মদিনে খালি হাতে বাড়ি ফেরা আমি চেয়েছি শুধু এক গ্লাস পবিত্র জল, আবে-জমজমের।” (পৃষ্ঠা ৮১)

প্রতিটি চিত্রকল্পে কী এক মায়াবী আলোড়ন। সেখানে কখনও আবেগ কখনও প্রকৃতির মায়াবী রূপ তুলে ধরে জাহানারা পারভীন এঁকেছেন কাঙ্ক্ষিত শিল্পচিত্রই। আমাদের চিরায়ত জীবনের অংশ হয়ে যাওয়া মিথ, ইতিহাস, হাসি-কান্না ও নানাবিধ অপূর্ণতার হাহাকার যেমন আছে, তেমনি আছে প্রবহমান নদীর ছলাৎছলাৎ ঢেউয়ের ভাষা। কবি সুনিপুণ সেলাইয়ে গেঁথেছেন এমন এক মালা, যে-মালার প্রতিটি ফুল তুলে আনা হয়েছে হাজার বছরের ভাষাসিঁড়ির এক-একটি ধাপ থেকে। ঘোরলাগা এই কাব্যে পাঠক যেমন নিজেকে খুঁজে পাবে, তেমনি খুঁজে পাবে তার অতীত।

অসাধারণ এই কবিতার বই পাঠের আমন্ত্রন জানাই পাঠককে।

স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি । জাহানারা পারভীন । মূল্য ২৫০ টাকা । নালন্দা, ২০১৫।
আমাজনে কিন্ডল সংস্করণও পাওয়া যাচ্ছে।

Share Now শেয়ার করুন