খালেদ হামিদী > ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা >> প্রবন্ধ

0
1840

‘কবিতার দুটি লাইনের মধ্যে এতটুকু শূন্যস্থান রাখতে / হয় যেন তার মধ্যে একটা সূর্য উঠতে পারে’

খালেদ হামিদী

শূন্য দশককে, প্রথম দিকে, কেউ কেউ কাব্যশূন্য ধরে নেন। কিন্তু ওই কাল-পরিধির কয়েকজন তীব্র তরুণ কবির প্রাণপ্রাচুর্য পরে আর অস্বীকারের উপায় থাকে না। এই প্রখরতা আর সজীবতা একাধিক রূপে ভাস্বর হয়ে ওঠে। কারো ছন্দকুশলতা যেমন অনায়াসলব্ধ কিংবা সহজাত পারঙ্গমতা বলে প্রতীয়মান হয়, তেমনি কারো কারো আর্থসামাজিক-রাজনীতিক সচেতনতাও পরিণত ব্যক্তির ভাষ্য হিসেবে ঔজ্জ্বল্য লাভ করে। একদিকে বিশ্বপুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিস্তার, আরেক দিকে দেশে, বিগত পঁচিশ বছরে সাধিত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ইত্যাকার বাস্তবতার অভিঘাতে কবিতারও পণ্য হয়ে ওঠার এই যুগে, যে স্বল্প-সংখ্যক তরুণ কবি সচেতন পাঠককে আশাদীপ্ত করে তোলেন, ইমতিয়াজ মাহমুদ তাঁদের অন্যতম। পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগ-বিপ্লব ঘটে যাওয়ার ফলে যে বিশাল তরুণ সমাজ কারিগরি দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট সচেতনতায় পূর্বসূরীদের ছাড়িয়ে যায় তারই একটি ক্ষুদ্র অংশ কাব্যিক সৃজনশীলতায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে কিছুটা পৃথকতাযোগে।

 

আমরা ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিত্ব, সচেতনতা ও নিজস্বতা অর্জনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের প্রয়াস পেতে পারি। তাঁর কালো কৌতুক (২০১৬) কাব্যের উন্মাদ কবিতাটি সম্পূর্ণই পাঠ করা যাক। ‘উন্মাদ হবার মুহূর্তটা অনেক ক্রিটিকাল/ঐ মুহূর্তটিতে মানুষ দুটি ভিন্ন ভিন্ন/জগতের নো ম্যানস ল্যান্ডে/চলে যায়/তখন তাকে ঠিক এই জগতের/বা/ঐ/জগতের/মানুষ বলে চিহ্নিত করা যায় না/এই জগতহীনতার সময়টা অনেক ক্রিটিকাল/আপনি যদি/কখনো/এমন নো ম্যানস ল্যান্ডে পড়ে যান/তবে উচিত হবে দ্রুত/যেকোন একটি জগতকে বেছে নেয়া/একটু দেরি হলে আপনি আটকা/পড়ে যাবেন/আর বের হতে পারবেন না/আপনি/বের/হতে/পারবেন/না/নিঃসঙ্গ আর অভিশপ্ত/পৃথিবী থেকে/আপনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করবেন/কিন্তু কেউ তার অর্থ উদ্ধার/করতে পারবে না/কেননা আপনার চিৎকারটা/দুই ভাগ হয়ে যাবে/যার/অর্ধেক পৌঁছবে এই জগতে/বাকি/অর্ধেক/ঐ জগতে!’ কবিতা কবিকে ঘোরগ্রস্ত করে তোলে। বৈষয়িক লোকজন তাঁকে ‘পাগল’ সম্বোধনেও দ্বিধান্বিত হয় না আর এমনই হয়। কবিতাটি পড়ে এরকম একটা ইঙ্গিত মনে এলেও বলতে পারি, প্রাগুক্ত সার্বিক বিষম অবস্থার চাপ যে মানুষকে উন্মাদ করে তোলার সমমাত্রায় বিদীর্ণ করে, তা অনুবাদে অভিনব সাফল্যে মুদ্রিত করেন কবি, উপর্যুক্ত কবিতায়। ‘জগতের’এই‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ টি এস এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর সমতুল্য কি? অমন না হলেও  ইমতিয়াজের ‘উন্মাদ’ কিন্তু এলিয়টের ‘হলো ম্যান’ বা ফাঁপা মানুষ নয়। যদিও, উভয় প্রকার মানুষই কম-বেশি শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি। লক্ষণীয়, ফাঁপা মানুষের উল্লেখ এলিয়টের সূক্ষ্ম ব্যঙ্গেরও প্রকাশ বটে। কিন্তু ইমতিয়াজের ‘উন্মাদ’ দলিতের উদ্ধার-অযোগ্য করুণতম কঠিন অবস্থার রূপক। আরো লক্ষযোগ্য, এলিয়ট যে  কবিতাকে আবেগের শিথিল বাঁক ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ নয় বলে অভিহিত করেন, এবং কবিতা আবেগ ও ব্যক্তিত্ব থেকে উদ্ধার (এসকেপ) বলেই ঘোষণা দেন, আমাদের আলোচ্য কবি তা যথার্থরূপে বুঝতে পারেন। কেবল তাই নয়, এলিয়টের সমান্তরালে  ইমতিয়াজও, অবশ্যই আবেগ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষই জানেন কেন আবেগ ও ব্যক্তিত্ব থেকে মুক্ত থাকতে হয়, সেটা বুঝতে পারেন। তাঁর এই উপলব্ধি আরো কিছু কবিতায় পরিদৃষ্ট হয় :

(১) ঐ তসবিহ’র/দিকে মন দিতে গিয়ে কোন ফাঁকে ঈদ হারিয়ে ফেলেছি টের/পাই নাই। থানা পুলিশ করার মতো সঙ্গতি বাবার ছিলো না।/তিনি বলেছিলেন মন খারাপ করিস না। সবার ঈদ থাকে না।/এর চেয়ে আমার ঈদটা তুই নিয়ে নে। আমি বললাম আপনি/ঈদ কোথায় পাবেন? আমি তো শুনেছি দাদা বেঁচে থাকতেই/আপনার ঈদ হারিয়ে গেছে। বাবা অপরাধীর মতো বললেন/তা ঠিক আছে, তবে তোর মায়ের ঈদটা আমি চুরি করে রেখেছি! (ঈদ, কালো কৌতুক)

(২) একটা গাছে পাঁচটা গোলাপ ফুটেছে/তাদের একজন হাসপাতালে রোগী দেখতে যায়,/একজন জেলখানায়  নেতাকে ছাড়িয়ে আনতে, একজন/বাসর ঘরে যায়, আর একজন মরদেহের সাথে,/পাঁচ নম্বর গোলাপটা ডালে ঝুলে আছে,/এখনো বিক্রি হয়নি (গোলাপ, প্রাগুক্ত)।

(৩) দোজখে অনেক আগুন/তাতে/আপনার/গা পুড়ে যায়/যেন সাত তলার বারান্দায় বসে আছেন/আপনার বউ বারান্দায় আসে/আপনার মনে হয় সে/বারান্দা/থেকে পড়ে যাবে/রেলিং নাই/হারুন, পড়ে যাবার আগে ধরুন! (হারুন : ৬, প্রাগুক্ত)

(৪) মাঠকর্মী তাকে পিকআপে ওঠানোর সময় তিনি আমার/মৃত্যু কামনা করলেন। আমি অবশ্য তার দীর্ঘায়ু চাই,/বাবাকে ভাড়া দেয়া ছাড়া; আমার কোনো রোজগার নাই! (সম্পর্ক, প্রাগুক্ত)

(৫) বাজার থেকে আপনার বাবা আপনাকে খুব দরদাম করে/কিনে আনল; তারপর আপনার বউ আপনাকে কেটেকুটে/চুলার উপর তপ্ত কড়াইতে ছেড়ে দিলো – জীবন একই রকম! (জীবনের প্রকার : দুই, প্রাগুক্ত)

তবে বলে রাখা দরকার, পশ্চিমা সভ্যতার একজন কবির পক্ষে যতটা নিরাবেগ-প্রায় হওয়া সম্ভব, আমাদের একজন বাঙালি কবির ততটা নয়। ইমতিয়াজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের পারঙ্গমতা যেমন খানিকটা হলেও পৃথকতামণ্ডিত, তেমনি পাঠকের মর্ম ছোঁয়ার শক্তিও তাঁর ক্ষীণ নয় মোটেও। ‘ঈদ’ কবিতায় ‘বাবা’র ওই স্বীকারোক্তি বাপ-দাদার আনন্দও চুরি যাবার সমান্তরালে, ‘পকেটের ভেতরে পকেট’ (নারীশোষণ প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক যেমন বলেন) হিসেবে, নারীর অবস্থান প্রকাশ করে অসামান্যরূপে। ‘হারুন’ কবিতাটি অভিজ্ঞতা উপস্থাপন-রীতির অভিনবত্বে এবং এক অতল গহন বেদনায় অনবদ্য। সাততলার রেলিংবিহীন বারান্দায় বসা এক পুরুষ স্ত্রী হত্যার মিথ্যা অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডিত হয়। ওই বারান্দায় চাদর শুকাতে দিতে এসে স্ত্রী হঠাৎ নিচে পড়ে মারা গেলে শেষে এমনটি ঘটে। স্বামী তাকে বাঁচাতে পারে না। হারুন তো নিহত। কিন্তু কবি সদা জাগ্রত। তাই হারুনের মৃত্যুত্তর অনুভূতি, অপ্রমাণিত অভিযোগে ওভাবে দণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তার স্ত্রীকে বাঁচাতে না পারার অনুতাপ, অতুলনীয় মানবিক আবেদন তৈরি করে। ‘সম্পর্ক’ কবিতায় বৃদ্ধ পিতাকে জীবিকা সকাশে পাঠিয়ে, সম্ভবত কর্মহীন সন্তানের মনে হয়, সে তার জনককে ভাড়া দেয়। শ্রমিক যে নিজের জন্যে কাজ করে না, মালিকের পুঁজির পাহাড়কে পর্বতে উন্নীত করতেই শ্রমব্যয়ে বাধ্য থাকে, তা চিত্রিত হয় এই কবিতায়। নারী, নর ও শ্রমশোষণের এই ছবিসমূহে গল্পের ক্ষীণ রেখাও টের পাওয়া যায়। ইমতিয়াজ এভাবে প্রমিত অথচ অনেকটা মৌখিক এমন এক ভাষারীতির আশ্রয়ে মোক্ষম সব অভিঘাত সৃষ্টি করে চলেন আরো কিছু কবিতায়। ‘জীবনের প্রকার’ কবিতায় জীবন বদল করতে-চাওয়া এক মানুষের নদীতে ডুব দিয়ে চিতল মাছ হয়ে ভেসে ওঠার রূপকল্পটি সত্যিই অসাধারণ। এই ঘটনায় নিবিষ্টতর হলে পাঠকের চোখ ভিজে আসে। জীবনাবস্থা পরিবর্তনে অক্ষম মানুষ প্রাণ হারিয়েও ভোগ্যপণ্য হয়ে, কয়েক হাত ঘুরে, শেষে তপ্ত কড়াইয়ে জ্বলে। এই বহুমাত্রিক শোষণ ও অসহায়ত্ব প্রকাশে ইমতিয়াজ কিন্তু আর্দ্র নন। আগেই বলেছি, তিনি নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু তাঁর সাফল্য এখানে যে, তাঁর অধিকাংশ কবিতাই আবেদন সৃষ্টিতে সক্ষম। রবার্ট ফ্রস্টের সংজ্ঞানুযায়ী, আবেগ ও চিন্তার সার্থক মিলন ঘটে তাঁর অনেক কবিতায়।

‘কালো কৌতুক’ গ্রন্থভুক্ত ‘শূন্যস্থান’একটি দুর্দান্ত কবিতা। শুরু থেকে শেষ অব্দি এতে কোনো প্রকার পতন ঘটেনি। বিন্দুমাত্র না শৈথিল্য ঘটেছে দৌড়-পরম্পরার ইমেজসমূহের, না সিকোয়েন্সগুলোর। এমন টানটান বিবরণ বা বর্ণনাপ্রতিম উল্লেখ আমাদের কবিতায় খুব সুলভ নয়। প্রারম্ভেই কবি বলেন : ‘কবিতার দুটি লাইনের মধ্যে এতটুকু শূন্যস্থান রাখতে/হয় যেন তার মধ্যে একটা সূর্য উঠতে পারে আর/সূর্যের আলোয় একটা লোক হকার্স মার্কেটে কমলা/রঙের একটা মশারির দরদাম করতে পারে। দরদাম/শেষ হবার আগেই/এই/কবিতা/পরের/লাইনে চলে যাবে যেখানে দেখা যাবে লোকটা তারও পরের/লাইনের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে ছুটছে। কেননা একটু/আগে তার পকেটকাটা গেছে। সে পকেটমারের পেছনে/দৌড়াচ্ছে। আর তার পেছনে দৌড়াচ্ছে আরও দশজন।/(ঐ দশজন অবশ্য তাকেই পকেটমার সন্দেহ করছে!)’ এই ব্যতিক্রমী ও চমৎকার সূচনার পর অপেক্ষায় থাকে আরো চমকে-দেয়া অনুঘটনারাজির পারম্পর্য। পকেট কাটা-যাওয়া লোকটাই নিহত হয় পেছনের ওই দশজনের হাতে। কিন্তু কবি বাণী উচ্চারণের ধরনে বলেন : ‘মানুষ জীবনভর নিজের লাশের পেছনে দৌড়ায়।’ এরপরে নানা ঘটনাচক্রে সে  যথাক্রমে বাস, বাঘ ও চাঁদের পেছনে দৌড়ায় আর অবশেষে ফিরে আসে, লাশ হয়েই, সেই হকার্স মার্কেটে। পরিশেষে কবি বলেন : ‘(অথচ কবিতার শেষেও থাকে এক দীর্ঘ শূন্যস্থান/যেখানে অনায়াসে একটি কবর রচনা করে/চক্র ভাঙা যায়)/‘জামান?’/‘জ্বি’/আপনার লাশটা ঐ শূন্যস্থানে নামান!’

মরদেহ নামানো হোক বা না হোক, বাঁচার সংগ্রামে মানুষের জীবিত ও মৃত এই ঊর্ধ্বশ্বাস ছুটে চলার ব্যঞ্জনা কিন্তু ফুরায় না। জীবনের মহাচলিষ্ণুতার এমন কাব্য আসলে বিরল। ‘রুচি’ কবিতায় ধরা আছে ইমতিয়াজের বিশ্বরাজনীতিক বোধ এবং তা উপনিবেশিতের কথন। এর শুরুটাও ব্যতিক্রমী ও স্মার্ট : ‘সাত বছর বয়সে একটা সাইক্লোন খেয়ে আমি বিখ্যাত হয়েছিলাম।’ তিনি সুনামি, টর্ণেডো, সাইক্লোন, বিশ্বযুদ্ধ এবং এমনকি বিদ্যুৎও খেয়ে ফেলার রূপকে জর্জরিত তৃতীয় বিশ্বের মর্মছোঁয়া ভাষ্যই প্রতিষ্ঠিত করেন : ‘তবু কী মনে করে যেন সুলতানী আমলের/এক সড়কে বসে আমি বিশ্বযুদ্ধটা খেয়ে ফেলি। আর তুমুল/আক্রোশের মুখোমুখি হই।’ ‘তাইপে বা কুয়েত/থেকে এটা শুরু হবার কথা থাকলেও ইওরোপের সম্মান রাখার/জন্য শেষ মুহূর্তে আংকারা’ থেকে শুরু-হওয়া ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ খেয়ে ফেলায় এমনটি হয়। কবিতার শেষে ইমতিয়াজের জীবনোপলব্ধির দার্ঢ্যে চমকে উঠতে হয় : ‘গরুর দল জানে না,/একটা বিশ্বযুদ্ধ খেয়ে ফেলার পর মানুষের আর খাবার রুচি থাকে না!’

ইমতিয়াজ মাহমুদ প্রতিকবিতাও লেখেন। তাঁর ‘ম্যাক্সিম’ (২০১৬) ও  ‘পেন্টাকল’ (২০১৫) শীর্ষক কবিতাগুচ্ছ কী প্রতিকবিতাভুক্ত? এই ধারার আরো কিছু কবিতায়ও প্রতিকবিতার চারিত্র্য মেলে বটে। আক্ষরিক অর্থ বিবেচনায় নিয়েই বলতে হয়, ম্যাক্সিম বা সাধারণ নীতিমালা কী কবিতা? যদিও :

(১) ঘোড়া যতদিন দৌড়াতে পারে ততদিন পরাধীন,/অচল হয়ে গেলে স্বাধীন। (মুক্তি; ম্যাক্সিম)

(২) বাঘকে দশ লাখ টাকা ঘুষ অফার করা হলে বাঘ জানায় যে, সে ঘুষ খায় না।/তবে উপহার হিসেবে কোন হরিণ দেয়া হলে সে গ্রহণ করে। (সততা; প্রাগুক্ত)

(৩) এই পৃথিবীতে মৃতরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। (গণতন্ত্র; প্রাগুক্ত)

(৪) রাস্তা আর বারান্দায় বসে বারো মাস গান গাইলে কোকিলের সামাজিক মর্যাদাও কাকের মতো হতো।(মর্যাদা; প্রাগুক্ত)

(৫) নিজের চিৎকার নিজে গিলে ফেলার নাম হচ্ছে সহনশীলতা। (সহনশীলতা; প্রাগুক্ত)

(৬) পাখির গানের বাজার মূল্য নাই, মাংসের আছে। (মূল্য; প্রাগুক্ত)

(৭) তৈলাক্ত বাঁশ থেকে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বানরটা বুঝতে পারলো, মানুষ কতটা হারামি হতে পারে! (গণিত; প্রাগুক্ত)

এই উচ্চারণসমূহ মুখরোচক, বিদ্যমান ব্যবস্থার সমালোচনায় নির্দ্বিধ এবং সূক্ষ্ম, তথাপি প্রবচনতুল্য এসব রচনা কবিতা কী? মনে পড়ে, প্রতিকবিতার জনক বলে খ্যাত নিকানোর পাররা তাঁর `Artefactors’ বা ‘কৃত্রিম নির্মাণ (১৯৭২)’ বইয়ের জন্যে, যা বিভিন্ন বাণী আর উক্তির সমাহার, ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন এবং কাব্যগ্রন্থের স্বীকৃতি বইটির মেলে না। তবে ইমতিয়াজের চমৎকার কাব্যোচ্চারণ নান্দনিক তৃপ্তি সঞ্চারিত করে পাঠকের চেতনায়, যখন তিনি বলেন : ‘আমার কাফন তবু চুরি হয়ে যায়/আমার গায়ের জামা ছোট হয়ে যায়।’ এবং, আরো যুক্ত করেন : ‘পৃথিবীতে আমি মরে যেতে পারতাম/হাসতে হাসতে একা মাথা ঘুরে পড়ে,/ধারালো ছুরিতে আর কফির চুমুকে!/কফির বদলে লোকে বিষ খেতে দেয়/আমি এক চুমুকে তা খেয়ে উঠে ভাবি,/এবার আমারে আর যাবে না বাঁচানো।’ (অমরতা; পেন্টাকল) উপর্যুক্ত নিম্নরেখাঙ্কিত অংশে এসে এলিয়টকে আবারো  মনে পড়ে। তিনি কফির চামচে মেপেছেন নিজের জীবন (‘জে. আলফ্রেড প্রুফ্রকের প্রেমগান’ কবিতায়)। বিষম  ধনতান্ত্রিক সমাজে মানুষের অকিঞ্চিৎকরতা অদৃষ্টপূর্ব পরিণাম হিসেবে চিহ্নিত করেন এলিয়ট আর আমাদের ইমতিয়াজে এসে সেই কফি জহরে পরিণত প্রায়। কেননা বিশ্বপুঁজিবাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আস্ফালন মানুষের ক্ষুদ্রত্ব শুধু নিশ্চিত করে না, তাকে নানাভাবে হত্যাও করে। তবে নিকানোর পাররা কবিতায় উচ্চকিত হন এই বলে : ‘আমরা তো সত্যি শক্ত জমিরই মানুষ-/কফিখানার কবিতার বিরুদ্ধে আমরা দাঁড় করাই/খোলা হাওয়ার কবিতা।’ (ইশতেহার; অনুবাদ : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রসঙ্গত আবারো স্মর্তব্য, আমাদের ইমতিয়াজ মাহমুদ, ‘কালো কৌতুক’ কাব্যভুক্ত ‘রুচি’ কবিতায়, খেয়ে ফেলেন তৃতীয় বিশ্বসমর, যা এখনো সংঘটিত হয়নি। আর, পাররা গেল শতাব্দীতে ‘আমি জিহোভা হুকুম করছি’ কবিতায় বলেন : ‘আমরা দাঁড়িয়ে আছি তিন নম্বর বিশ্বযুদ্ধের কিনারে/আর কেউ যে সে নিয়ে আদপেই মাথা ঘামাচ্ছে তা বোধ হচ্ছে না (প্রাগুক্ত)।’ এই কফি ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে আমাদের কবি, বলা যায়, দুই মহান পূর্বসূরীর প্রতীতিকে বহুদূর সম্প্রসারিত করেছেন কিংবা এতে যুক্ত করেছেন অকল্পিতপূর্ব মাত্রা। ‘আমিত্ব’ (পেন্টাকল) কবিতায় শাসক, প্রিন্টমিডিয়ার সংবাদ পাঠক এবং নিজের স্ত্রীকেও নিজের প্রতিরূপ কিংবা প্রতিসরণ বলে মনে হয় কবির। অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থা আদ্যন্ত বুঝতে তিনি সক্ষম। এতে তাঁর একপ্রকার সর্বজনীন মনুষ্যত্ববোধও প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বলা যায় আমাদের কবিতায় নতুন। এভাবে কবির আরো কিছু কবিতা উল্লেখ্য যেগুলো উপর্যুক্ত পদ্ধতিতে আলোচিত না হলেও প্রণিধানযোগ্য।

‘নদীর চোখে পানি ও অন্যান্য কোয়াট্রেট (২০১৩)’ কাব্যভুক্ত চতুর্পদীগুলোর দুয়েকটিতেও কবির প্রাগুক্ত সচেতনতা প্রকাশিত। যেমন : ‘খুন বন্দুক বোঝে না/বন্দুক খুন বোঝে না/মানুষ দুটোই বোঝে/ফলে বন্দুক খোঁজে!’ (অবুঝ) ‘মানুষ দেখতে কেমন’ (২০১০) কাব্যের নামটিই কবির শৈল্পিক কৌতূহল প্রকাশ করে। এর ‘যাত্রা’ কবিতায় স্বদেশে বহিঃশক্তির উপনিবেশ কায়েমের সূচনা এবং আমাদের অনেকের মানস-উপনিবেশ আভাসিত হয়। এই পর্যায়ের সব রচনাও কাব্যোত্তীর্ণ নয়। তবে ঝিলিক দেয় ‘বেদনা’ কবিতাটি যার অন্তিমে কবি কহেন : ‘তবে বেদনার গন্ধ আমার মুখস্থ/যে কোনো বেদনার ভেতর আমি মা মা গন্ধ পাই!’ আরো কিছু কাব্যাংশ উল্লেখযোগ্য : (ক) ‘মানুষ ঘুমাবে আর পাখির ডাকে জেগে উঠবে। অনাদর্শ রাষ্ট্রের জাতীয় পাখি হবে পুলিশ।’ [রাষ্ট্র ২; সার্কাসের সঙ (২০০৮)] (খ) ‘যে কাঁদে কাঁদুক তবু লিখি ফুটনোট/ফুল তুই তেলাবিবে বোমা হয়ে ফোট! (ফুটনোট; প্রাগুক্ত); (গ) জলের উপর চক্রাকারে ঘুরতে থাকা বক/তোমায় দেখে বাড়ে আমার নদী হবার শখ! [শখ; মৃত্যুর জন্মদাতা (২০০২)] (ঘ) ‘আন্দামান সাগরের এক একলা দ্বীপে এক সাধু যখন একটা পাখির কিচির/মিচিরে অতিষ্ঠ হয়ে ভাবছিলো কিভাবে আরো একা হওয়া যায় তখন/জাকার্তার জনাকীর্ণ সড়কে হাজার হাজার মানুষের ভিড় ঠেলে/একটা লোক একা একা হেঁটে যাচ্ছিলো’[নিঃসঙ্গতা; অন্ধকারের রোদ্দুরে (২০০০)] এই অনুচ্ছেদে উদ্ধৃত বেশিরভাগ কাব্যাংশে (কবিতায়) কবি ছন্দসচেতনতার পরিচয় লিপিবদ্ধ রেখেছেন। দেখা যায়, পয়ার, স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তে তিনি অনায়াস। আবির্ভাবকালে ব্যাকরণিক সজাগতার চিহ্ন অঙ্কনের পর তিনি মুক্তছন্দে ও গদ্যে তাঁর কাব্যিক সক্রিয়তা অনুবাদে নির্দ্বিধ হয়ে ওঠেন সুন্দর স্বতঃস্ফূর্ততায়। ‘সুন্দর’ এ জন্যে যে ইমতিয়াজের কবিত্ব ও পটুত্বের কোনোটাই উল্লিখিত ব্যাকরণের আবশ্যিকতা দাবি করে না।

সমাপ্তির আগে তাঁর অগ্রন্থিত ‘লাইভ’ শীর্ষক গদ্যের কথা না বললেই নয়। ইলেকট্রোনিক মিডিয়ায় ব্যবহৃত কোনো টান টান উত্তেজনাকর ঘটনার রিপোর্টিংয়ের ভাষায় লেখা এই অনবদ্য রচনাকে উদ্বেগময় প্রতিবেদন, উচ্চতর ক্লাইমেক্সসম্পন্ন নাটিকা, শ্লেষাত্মক ও সাংকেতিক গদ্যে রচিত প্রতিকবিতা ইত্যাদি নানাভাবে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু একে অকবিতা বলার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের কবিতায় একে নতুন কাব্যাঙ্গিকের সূচনাও বলা যায়। কবিতা ও প্রতিকবিতার সীমানা, এই ব্যতিক্রমী অনবদ্য রচনায়, একাকার হয়ে আছে। শুরুতে অজগর রাজাকে পেঁচিয়ে ধরে। ঊর্ধ্বশ্বাস প্রতিবেদনের ধাপে ধাপে এই সংবাদ ভুল প্রমাণিত হয়। রটে যায় যে, রাজা নয় তাঁর রান্নাঘরের পাচককেই বন্দী করে পাইথন। সবশেষে জানা যায়, একটা সাধারণ সাপ বাবুর্চির রাজহাঁসটিকেই পেঁচিয়ে ধরেছিলো আসলে। পরে ওই হাঁসটির চিকিৎসায় অবহেলা এবং এর মৃত্যুদৃশ্য প্রচারের মধ্যে মিডিয়ার যে বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি ধরা পড়ে, কবিতায় তা অনন্য। ক্যামেরাম্যান ও ক্যামেরার ওপর ‘হাত তোলার’ব্যাপারটিও খুব ব্যঙ্গাত্মক। সাধারণ মানুষের রাজবাড়িতে প্রবেশের অধিকারহীনতা ও শোষিতের অবস্থান কবি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে শনাক্ত করেন এক নিরীহ নিরপরাধ ‘আমড়া বিক্রেতা’র পুলিশের হাতে আটক হবার ঘটনা উল্লেখের  মাধ্যমে। বলতে দ্বিধা নেই, ইমতিয়াজের মতো শ্রেণিবাস্তবতা অনুধাবনে অনেক কবিই এখনো সক্ষম নন। ‘লাইভ’ কবিতার মৃত হংসটির ‘অলৌকিক’ ও ‘অবিশ্বাস্য’ রূপে জীবিত হয়ে উড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানবিক  সৌন্দর্যেরও কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের এক প্রতীকী ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়।

তবে দুয়েকটি কবিতায় কবি ধর্মীয় বিশ্বাসের আভাস দেন কি লোকমানসের প্রতি তাঁর সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধাশীলতার কারণেই? এই প্রশ্ন এ জন্যে যে, সম্প্রদায়, শ্রেণি ও রাষ্ট্রজাতীয় ঐক্যকে ব্যাহত করে (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন বিশদ করেন)। প্রতিকবিতার কবিগণ (যাঁদের কাব্যের প্রধান তিন শক্তি হিসেবে চিহ্নিত পূর্ববর্তী সেজার ভালেহো, নিকোলাস গিয়েন ও পাবলো নেরুদা) এরকম সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিরুদ্ধে শব্দসেনারূপে সক্রিয় থাকেন লাতিন আমেরিকায়। তবে ‘পেন্টাকল’ কাব্যভুক্ত ‘জীবিকা’ও ‘পূর্বসূরী’ কবিতায় জেলে ও কৃষকের পূর্বাপেক্ষা করুণতর চলমান দশা ইমতিয়াজ বাঙময় করেন বিষয়ের বিপরীত এক কাব্যিক কোমলতায়। এমন  আধেয়র কবিতায় মসৃণতা সৃষ্টি সবসময় সহজ নয়। বিশেষভাবে অবশ্য এও লক্ষণীয়, উপর্যুক্ত সকল কাব্যে প্রেম-বিরহের কবিতা অত্যল্প। অথচ দেশের অগ্রজ কবিদেরও কয়েকজন কাম-প্রেম তথা আত্মরতির চর্চায় কালক্ষয় করে চলেছেন এখনো। এ ছাড়াও, বক্ষ্যমাণ গদ্যে টি এস এলিয়ট উল্লিখিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতা, সেই অর্থে নাগরিক ইমেজের নয়, বরং শহর ও কিয়ৎ গ্রাম মিলিয়ে বঙ্গীয় আমেজের। যদিও নিজস্ব কণ্ঠস্বর গড়ে ওঠা সত্ত্বেও শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত তাঁর বাকপ্রতিমায় বৈচিত্র্য সংযোজিত  হয়নি, তথাপি, তাঁর সম্ভাবনায় আস্থাশীল হতে কোনোই বাধা থাকে না পাঠকের। কেননা পকেটকাটা সেই লোক, ঈদ চুরি-যাওয়া মা কিংবা আটক আমড়া বিক্রেতার কবিকৃত ভাষ্যও মনে করিয়ে দেয় হোসে মার্তির সেই কথা : ‘মানবজাতির একটাই গাল! সেখানে যখন থাপ্পড় পড়ে, তখন সবাই টের পায়। ‘আর, ‘এই কবিতা তাই সকলের (মার্তির উক্তি প্রসঙ্গে মানবেন্দ্র যেমন বলেন)।’ আমাদের পাঠকদের।

চট্টগ্রাম, সেপ্টেম্বর ২০১৬

চকিতমন্তব্য

সৈয়দ তারিক, কবি

বছর তিনেক হলো আছি ফেসবুকে। ফেসবুকেই অনেকের লেখার সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছে, অনেকের সাথে তার বিস্তার। ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা প্রথম পড়ি ফেসবুকেই।

‘সাপ’ শিরোনামের রহস্যময় এক অপরূপকথা। এর জঁর বা বর্গ ঠিক কী, এটি কবিতা নাকি গল্প বা অনুগল্প, তা নিয়ে একাডেমিক তর্ক চলতে পারে, বিতর্ক চলতে পারে যে এটি জাদুর বাস্তবতা নাকি বাস্তবতায় নিহীত জাদুর রূপক তা নিয়েও। তবে, কথা এই যে এটি মনকে সিক্ত করে দেয় আজব এক রসে। অদ্ভুত এক আবহাওয়া আবিষ্ট করে দেয়। কাহিনি শেষ হয়েও শেষ হয় না, জিজ্ঞাসা জাগিয়ে রাখে। আমাদের লোককাহিনী, লোকসংস্কার, রূপকথা এবং কথকতার যে ধারা আছে তার উত্তরাধিকার আছে এই আখ্যানের ভিতর এবং বর্ণনার রীতিতে। রচয়িতার সৃজনপ্রতিভা মুগ্ধ করল আমাকে। তার আরও-আরও রচনা আস্বাদনের লোভে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলাম। তিনি তা গ্রহণ করলেন।

ক্রমে তার আরও অনেক লেখা পড়লাম বিভিন্ন স্বাদের। গত দশ-পনের বছর ধরে যারা কবিতার চর্চা করছেন তাদের কয়েকজন আমার বিশেষ প্রিয়। তাদের কবিতায় স্বকীয় ধরনের নানা বিষয় থাকছে : কবিতার গঠনে, বয়নে, আধেয়তে, প্রকাশে। ইমতিয়াজ তাদের একজন।

তার কবিতার ভাষা একদম সহজ সরল। অনেক সময়ই একটা আখ্যান বা আখ্যানমূলক পটভূমি থাকে তার কবিতায়। মোপাসাঁ বা ও হেনরির গল্পের শেষে যেমন একটা চমক থাকে, তার কবিতার শেষে প্রায়শই থাকে তেমন একটি উপসংহার। এপিগ্রামশোভন শানিত পঙক্তি রচনায় আগ্রহ আছে তার, সুতরাং তিনি যে ম্যাক্সিমগোত্রীয় রচনায় ঝুঁকবেন তা স্বাভাবিক। যদিও অদ্ভুত, বিস্ময়কর, অসম্ভব ধরনের পরিস্থিতির বর্ণনা বারবার পাওয়া যায় তার কবিতায়, কিন্তু এগুলোর পটভূমিতে থাকে যুক্তি ও গনিতের সুদৃঢ় পাটাতন, তাই তার কোনো-কোনো কবিতায় ‘যদি’, ‘ধরা যাক’ এইসব শব্দবন্ধ বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, অন্যগুলোয় এসব ব্যবহৃত না হলেও বাক্যসমূহের বিন্যাস অতীব যুক্তিপরম্পরায় গঠিত। আর, তিনি যে নকশাদার কবিতাগুলো রচনা করেছেন তার গঠনই তার স্থাপত্যিক চেতনাকে প্রকাশ করে। জীবন ও বিশ্বলোক সম্পর্কে তার অনুধ্যানকে রূপক-উপমা-উৎপ্রেক্ষার অবয়বে গঠন করেন তিনি। তাই যুগপৎ বৌদ্ধিক ও বুদ্ধির অতীত দুই অক্ষের কেন্দ্রে নিরন্তর পেণ্ডুলামের মত দোল খায় তার কবিতা। আবার, প্রায় সোজাসুজি বলে ফেলা ধরনের কবিতাও অনেক আছে তার, কিন্তু সেখানেও শেষে এসে দারুণ এক ধাক্কা খেতে হয়। তার কবিতায় কোথাও যেমন বক্তব্য থাকে প্রচ্ছন্ন, কোনোটিতে থাকে উপলব্ধিজাত তীব্র উচ্চারণ।

বিষয় হতে বিষয়াতীত, কাল হতে কালাতীতের অভিজ্ঞতা সকল সার্থক শিল্পই দেয়। আমার বিপুল আনন্দ, আমাদের কালের একজন অনুজপ্রতিম কবির রচনায় এই অভিজ্ঞতা বারবার পাই।

জাহানারা পারভীন, কবি

ইমতিয়াজের কবিতার সাথে পরিচয় ১০ বছর আগে। তখন থেকেই মুগ্ধতা। মুগ্ধতার প্রধান কারণ অনায়াস কথনভঙ্গি; সহজ, আন্তরিক ভাষা। অনেকটা গল্প বলার ঢঙে পাঠককে তিনি নিয়ে যান বিষয়ের গভীরে। এই বিষয় কখনো আত্মজৈবনিক, কখনো সামাজিক, কখনো মনস্তাত্ত্বিক। পড়তে গিয়ে কবির মনোজগতের সাথে একাত্ম হয়ে ওঠার সুযোগ থেকে যায়।

‘আত্মহত্যা’ কবিতায়, ইমতিয়াজ ঘুম ও পাথরের গল্প বলতে গিয়ে আমাদের নিয়ে যান ভাবনার অন্য এক জগতে।

আমি একটি পাথরের উপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম/বহুকাল আমার ঘুম হয়নি/আমি তাই একটি পাথরের উপর ঘুমিয়ে পড়লাম/আর ঘুমানোর আগে আমি পাথরটাকে একটা জলপাইর মতো করে/জলপাইর মতো করে আমি পাথরটাকে খেয়ে ফেললাম…।

ইমতিয়াজের কবিতার প্রধান গুন উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অলংকারে সাজিয়ে কবিতার প্রকৃত মুখ ঢেকে দেন না কবি। এই বৈশিষ্ট্য তার কবিতাকে নিয়ে আসে পাঠকের কাছাকাছি। কবিতার বিরুদ্ধে যে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ সাম্প্রতিক পাঠকের, তা থেকে মুক্ত তার কবিতা। ‘ঈদ’ কবিতায় যখন চুরি হয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া ঈদের গল্প বলেন, আমার মনে ভেসে ওঠে নিজের হারানো শৈশবের নানা অনুষঙ্গ।

আমার কোন ঈদ নাই/এগার বছর আগে নামাজ পড়তে/ যাবার সময় আমার ঈদ চুরি হয়ে গেছে/ আমি ঐদিন সবার মতো পাঞ্জাবি পরে নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম/ বাড়তি বলতে হাতে একটা তসবিহ ছিলো/ ঐ তসবিহর দিকে মন দিতে গিয়ে কোন ফাঁকে ঈদ হারিয়ে ফেলেছি টের পাই নাই…।

জীবনের নানা অনুষঙ্গ, অসঙ্গতি, দেখা না দেখার ফাদ, বোঝা না বোঝার যন্ত্রণা, না-মেলা হিসেবের বয়ান কখনো পরিহাস, কখনো ক্ষোভ, কখনো নির্লিপ্ত ঘোরের মাধ্যমে ঘটান কবি। কখনো বা পাঠককে নিয়ে যান পরাবাস্তব দুনিয়ায়, যেখানে কাব্যিক কুয়াশায় পথ হারিয়ে পাঠক খুঁজতে থাকেন তার নিজের মনের গতিপথ। মিলিয়ে নেন নিজেকে। এরকম কবিতার আয়নায় নিজের মুখের অবয়ব খুঁজে পেতে হলে প্রস্তুতিও থাকা চাই পাঠকের।

স্বকৃত নোমান, কথাসাহিত্যিক

ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতার ভাষা সরল কিন্তু গভীর। কোনো কোনো কবিতা ভালো লেগেছে। যেমন হারুন, স্বপ্ন, শূন্যস্থান, রুচি, সাপ, লাইভ। আবার কোনো কোনো কবিতা পড়ার সময় মনে হয়েছে, কবিতা নয়, প্রবাদ-প্রবচন পড়ছি। কোনো কোনো কবিতা পড়ার সময় মনে হয়েছে, কবিতা নয়, যেন টানা গদ্য পড়ছি। কাঠখোট্টা গদ্য। কবিতার কি নিজস্ব কাব্যিক ভাষা থাকা লাগে, যে-ভাষা পড়ে বুকের ভেতরটা নড়ে উঠবে। যেমন জীবনানন্দের ভাষা। অবশ্য এখন জীবনানন্দের যুগ নয়। যুগ বদলে গেছে। যুগের সঙ্গে হয়ত ভাষাও বদলে গেছে। পাঠক হিসেবে হয়ত আমি অর্বাচীন। তাই যুগের ভাষার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারি না।

তবে ইমতিয়াজ যে কবিতার প্রতি বেশ নিবেদিত, তা বোঝা যায়। তার কোনো কোনো পঙক্তি বোধে নাড়া দেয়, যদিও সংখ্যাগত দিক থেকে সেসব পঙক্তি আরও বেশি পেলে ভালো লাগতো। কোনো কোনো কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি উচ্চমার্গের দর্শনকে ছুঁতে চেয়েছেন। এটা ভালো দিক। এভাবে লেগে থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভালো লিখবেন। তার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গি নিজস্ব,  ভালো করার সম্ভাবনা তাই বেশি। তার কবিতাগুলো পড়ে সেই ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।

Share Now শেয়ার করুন