গুলজার >> কবিতাগুচ্ছ >> ভূমিকা ও তর্জমা : ফারহানা আনন্দময়ী >> জন্মদিন

0
1017

গুলজার >> কবিতাগুচ্ছ

গুলজার বলছেন, “আমার বই বাংলা ভাষায় দেখতে খুব ভালো লাগে। উর্দু ছাড়া বাংলাই আমার প্রিয় ভাষা কিনা! হিন্দির টানে ‘গরম চায়ে’ বলার চেয়ে গোল গোল মিষ্টি বাংলায় আমি ‘গরোম চা’ বলতেই বেশি পছন্দ করি। আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের প্রতি, যাঁর কবিতা বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতিতে আমায় আকৃষ্ট করেছিল। এবং অবশ্যই আমার গুরু বিমল রায়ের প্রতি, যাঁর ছায়ায় আমার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বোধ সমৃদ্ধ হয়েছিল। আমার স্ত্রী’র অবদানও অনেক, যাঁর জন্য আমি ঝরঝরিয়ে বাংলা লিখতে পড়তে শিখে গিয়েছিলাম… প্রেমপত্র লেখার সুবাদে। ভবিষ্যতে কখনও আমি বাংলায় কবিতা লিখবো। উর্দু থেকে বাংলায় অনুবাদ করা কবিতা হবে না সেগুলো।” উর্দু কবিতার কবি গুলজার বলেছেন এই কথাগুলো।
কবি, লেখক, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সংলাপ লেখক গুলজার দিনায় জন্মগ্রহণ করেন। ভারত বিভাগের পর এই স্থানটি এখন পাকিস্তানের অন্তর্গত। ভারতীয় সাহিত্য জগতের বিশাল এই ব্যক্তিত্ব উর্দু-হিন্দুস্তানী ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর কাব্য সংকলনগুলোর মধ্যে ‘পোখরাজ’, ‘রাত পাসমিনে কি’, ‘ত্রিবেণি’, ‘ইয়ার জুলাহি’, ‘পন্দরা পাঁচ পঁচাত্তর’ উল্লেখযোগ্য। ইংরেজিতেও তাঁর কবিতার অনূদিত যে সংকলনগুলো পাওয়া যায় সেগুলো হচ্ছে, ‘সিলেক্টেড পোয়েমস’, নেগলেক্টেড পোয়েমস’ এবং ‘গ্রিন পোয়েমস’।
জনপ্রিয় এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রিয় কবি, যিনি এখন পর্যন্ত উর্দু ভাষাভাষী কবি হিসেবেই আন্তর্জাতিক সাহিত্যবলয়ে পরিচিত, ‘গুলজার সাব’ নামেই প্রায় সকলে তাঁকে সম্বোধন করেন, সেই কবির গতকাল ছিল ৮৬তম জন্মদিন। কবির একগুচ্ছ কবিতা বাংলায় ভাষান্তরের মধ্য দিয়ে তাঁকে জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছি।

চোখের কোনো ভিসা লাগে না

(ফুটপ্রিন্টস অন জিরোলাইন)

চোখের কোনো ভিসা লাগে না
স্বপ্নের আছে সীমানাহীন সীমানা;
চোখ বন্ধ করলেই আমি সীমানা পেরোই, প্রতিদিন
দেখা হয় মেহদি হাসানের সাথে।

আমি শুনেছি ওর কণ্ঠস্বরে জন্ম নিয়েছে ক্ষত
ওর গজল ওর সামনেই বসে থাকে স্তব্ধ
তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, যখন বলে,
“ফুলগুলো শুকোচ্ছে বইয়ের ভাঁজে
স্বপ্নেই বোধহয় কেবল দেখা হবে
আমার চলে যাওয়া বন্ধু ফারাজের সাথে!”
আমি প্রায়ই পেরোই মানচিত্রের সীমানা, চোখ বুঁজে।
চোখের কোনো ভিসা লাগে না
স্বপ্নের আছে সীমানাহীন সীমানা।

জিপসি

অরণ্য থেকে তুলে নিলাম চারটে বনলতা
কানে দিলাম শস্যদানার দুল
গড়িয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা অশ্রু
আর নিলাম শুকনো ঠোঁটের কিছু তৃষ্ণা
তোমার কবর ছুঁয়ে একমুঠো মাটি
আর নিলাম দুলতে থাকা আমাদের আকাঙ্ক্ষা।

জিপসি তার নিঃস্বতার সবটুকু দিয়ে
গড়ে তুলতে চায় বাসনার দালান,
হাতে নিয়ে খড়কুটো জীবন, ঘোরে নগরেপ্রান্তরে
আর একবার যদি দেখা হয়ে যায় আমাদের
বিরাম নেবো আবার, মাতৃগর্ভের মতো শান্তিময়
তোমার কাঁধে!

সম্মতি

আমার কিছু ঐশ্বর্য রাখা আছে তোমার কাছে। আমাদের কিছু মুহূর্ত ফেলে এসেছি তোমার হাতে; কিছু বৃষ্টিদিন, আর ধূসরখামে মোড়ানো একটি রাত। ভুলিয়ে দাও সব আর ফিরিয়ে দাও সেই চিঠিপড়া রাতের প্রহর। ফিরিয়ে দাও আমার যা কিছু গচ্ছিত আছে তোমার কাছে।
পাতা ঝরার আওয়াজ পাচ্ছি, পাচ্ছো তুমিও? পাতার সাথে আরো কিছু ঝরছে; ঝরছে কিছু ভুলও! ভুলে যাওয়া পাতার গানে আজও কেঁপে উঠি; ওঠো তুমিও? দাও তবে, ফিরিয়ে দাও সেই পাতাঝরার কাল; দুলে-ওঠা ডাল। ফিরিয়ে দাও আমাদের যা কিছু তোমার কাছে গচ্ছিত আছে।
এক ছাতায় বৃষ্টিস্নান আর গা-শুকোনো সেই ছাতারই নিচে; মনে পড়ছে ছাতা ভাগাভাগির সেই বাদলসন্ধ্যা। আধখানা আমি আমার কাছে, আর ভেজা আধখানা হৃদয় তোমার মাথার পাশে, জানালার কাছে। ফিরিয়ে দাও আমার সমস্ত স্মৃতি, সবকটা বৃষ্টিফোঁটা; তোমার কাছে গচ্ছিত আছে।
একশো ষোলটি চন্দ্রমল্লিকার রাত আর তিলে-আঁকা তোমার কাঁধ। দাও ফিরিয়ে, তাও। না-শুকোনো মেহেদি নকশায় লীন হয় আমাদের অঙ্গীকারগুলো, ভুল করে তুলে দিয়েছিলাম ভুল সময়ের হাতে;
তাও ফিরিয়ে দাও। ফিরিয়ে দাও আমাদের যা কিছু, গচ্ছিত আছে তোমার কাছে।
সাথে দিও শুধু শেষ এক সম্মতি, এদেরকে চিরবিশ্রামে পাঠিয়ে আমিও ঘুমিয়ে যাবো ফিরে – পাওয়াদেরই সাথে; যা এতকাল রাখা ছিল তোমার কাছে।

জাগো, জাগো, জেগেই থাকো

জাগো, জাগো, জেগেই থাকো
রাত সাজাচ্ছে ওরা সন্ত্রাসের জন্য
মাকড়সার জালের মতো বিছিয়ে দিচ্ছে অন্ধকার
আতঙ্ক লালিত হচ্ছে ওদের হাতে
জাগো, জাগো, জেগেই থাকো।

বিশ্বাসগুলোকে চিবিয়ে খাচ্ছে আগুনেগোলা
মানুষগুলো কুটিকুটি হচ্ছে আগুনে দাঁতের কামড়ে
আগুনের গর্জনে আমি ভীত
এই আগুনে মানবতা পোড়াবে, আমি ভীত
মানবতাকে পায়ে পিষে যাবে আগুনখেঁকো মানুষ
জাগো, জাগো, জেগেই থাকো।

আবারো কণ্ঠনালী ছিন্ন হবে, টুকরো হবে মাথা
বিভেদে হাওয়া দেবে বিদ্বেষ, মানুষ পৃথক হবে
মানুষের কাছ থেকে, দেয়াল উঠবে ঈশ্বরে ঈশ্বরে
আমার নাম, গোত্র, রক্তপরিচয় ধরে টান দেবে
আমি ভীত, আমার উপাসনাকে লুণ্ঠন করবে ওরা
এই আগুনে মানবতা পুড়বে, আমি শঙ্কিত
আর কতবার আমাকে ঝুলিয়ে দেবে ওরা
বিদ্বেষের ফাঁসিকাষ্ঠে,
আমাকে তোমরা নির্ভয় করো
জাগো, জাগো, জেগেই থাকো।

রেইনকোট

অবুঝ এক মরসুমি হাওয়া এসে
দেয়ালের ছবিটাকে কাঁপিয়ে দিল, বাঁকিয়ে রেখে গেল
গত বর্ষায়ওতো দেয়ালটা এমন ভেজা ছিল না
এবার সব আর সবটুকুই ফাটলে হারালো।
জলের ধারা দেয়ালে এমন পথরেখা এঁকে দেয়
অশ্রুনদী সেই পথ চিনে ছুটে গেল চিবুকের মোহনায়।

এই বৃষ্টিই তো সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠতো,
ছাদ করতো সঙ্গত, আর জানালার শার্শিতে লেখা হতো মেঘদূত
বন্ধ ঘুলঘুলিতে আছড়ে পড়ে এবার কেটে গেল তাল, লয়, ছন্দ।
গত বর্ষায় তো এই ঘুলঘুলিতে হাওয়া বৃষ্টিগান বইয়ে দিতো।

খয়েরি বিকেলগুলো যেন ধূসর দাবার বোর্ড
শূন্যতার আঁকিবুকি ছাড়া নেই আর কারো চলাচল
দিনের আলো আর রাতের মায়া একবিন্দুতে স্থির
অকরুণ এক স্তব্ধতার সামনে নতজানু বিগত সময়
শুধু অবাধ্য সেই মরসুমি হাওয়া এসে
দেয়ালের ছবিটিকে কাঁপিয়ে দিল,
বাঁকিয়ে রেখে চলে গেল।

দেজা-ভূঁ
(সাইলেন্স)

আমি বিস্মিত, কথাটি কী ছিল ভুলেই গেলাম
যে কথাটি বলবো বলে আজ তোমার কাছে গিয়েছিলাম!

আমাদের দেখা হলো আর আমি সকলই বিস্মৃত হলাম
কী তোমাকে বলার আর কী বলবো বলে ভেবেছিলাম!
যখনই তোমার চোখে রাখলাম চোখ, কথারা হারালো
মন বলে উঠলো, সবটুকু বলা হলো।
অথচ কিছু কথা আজও বাকি রয়ে গেল যা বলার ছিল
নাকি তোমায় বলেই এলাম, দ্বিধারা আজও আমায় দোলালো।

তুমি তো জানোই, আমি না-অমনোযোগী, না আত্মভোলা!
শুধু তোমার কাছে যখন গেলাম,
তোমার সর্বপ্লাবী ভালোবাসা আমার সব এবং সবই ভোলালো।

করোনাকালের দেশান্তরী

সাতচল্লিশেও আমি ঠিক এই একই শরাণার্থীযাত্রা দেখেছি
ওরা পালাচ্ছে নিজের দেশেই, নিজের গ্রামের দিকে
আমাদেরকে পালাতে হয়েছিল নিজের গ্রাম থেকে
দেশ নামের আরেক দেশের দিকে।
শরণার্থী ডেকে আমার দেশ আমাকেই আশ্রয় দিয়েছিল
ওদেরকেও থামতে হয়েছে নিজের দেশের সীমান্তে
নিজের দেশ এবার আশ্রয় দিয়েছে পরিযায়ী ডেকে
বিপদের আশঙ্কা এখনো যেমন করছে রাষ্ট্র,
সেদিনও আমাদের একই আশঙ্কা ছিল
হত্যা নামের মৃত্যু ওঁৎ পেতে ছিল, ধর্মের নামে।
এখনো সেই হত্যামৃত্যু আমাদের চারপাশ ঘিরে থাকে
আজ আর জাত-পাত, নাম-ধর্মের দোহাই লাগে না
সরাসরি হত্যা চলে; সাতচল্লিশের সাথে পার্থক্য এটুকুই।

ঈশ্বরই শুধু জানেন, করোনাকালের দেশান্তরযাত্রা মহান
নাকি সাতচল্লিশ মহত্তর ছিল!

অসীমে সসীমের ভ্রমণ

জীবন নামের এক বাজিকরের খোঁজে
আকাশের অসীমে অনেকটা দূরে আমি যাই।
সূর্যটাকে কালো চৌকোয় ভরে ভেবেছিলে
সব চালে আমাকে হারিয়ে দেবে; হারিয়ে যাবো অন্ধকারে।
আমি জীবনে জীবন ঘষে আগুন জ্বেলেছি,
মুক্তির পথ নিয়েছি খুঁজে।
তুমি হাতের মধ্যে সমুদ্র পুরে ছুড়ে দিয়েছ আমার দিকে
আমি নোয়ার নৌকাতে পাল তুলে দিয়েছি।
মৃত্যুমুখী সবকিছুকে তুমি আমার সামনে মেলে দিয়েছ
আমি অন্তের কাছে শিখে নিয়েছি, প্রতিবিন্দু জীবনে
কীভাবে জীবনময় বাঁচতে হয়।
তুমি আমাকে শেকড় থেকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছ
লৌকিক-অলৌকিকের অজুহাতে,
আমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানুষ হয়ে লড়াই জারি রেখেছি।
খেলার সমাপ্তি ঘোষণাতে তুমি ভেবে নিয়েছ আমাকে মৃত;
শরীর নামের খোলসকে তোমার কাছে হস্তান্তর করে
আমার আত্মাকে আমি অবিনশ্বরতা দান করেছি।

এবার আকাশের অসীমে যতদূর ইচ্ছে তুমি যাও,
নতুন খেলায় নাম লেখাও।

বন্ধু

সারাটাদিন কেটে গেলো একার সঙ্গে একা
অচেনা, আগন্তুক এক একা, বান্ধবহীন একা
সমুদ্রপারে সঙ্গী হলো ছোট্ট বিষাদকণা
ঘরে ফেরার পথটিরও একাকী পড়ে থাকা
বিষণ্ণ বিকেলে ঝরাপাতার গান শোনা।

টেবিলের ওপর বইটা ছিল ঘরে একাকী আর একা
নিঃসঙ্গ বাতাসে পাতার ওপর আছড়ে পড়া পাতা
শান্ত স্বরে বললো,
তোমার কেবলই দেরি হয়ে যায়, সখা।
সারাদিন তাই আমাদের কেটে গেলো একার সঙ্গে একা।

প্রিয় বুননশিল্পী
(ইয়ার জুলাহি)

প্রিয় শিল্পী, আমাকে শেখাও তোমার বুননবিদ্যা
সুচারুতায় বুনে যাও পৃথ্বীঢাকা নকশিকাঁথা
আঙুলে লিখে যাও একের পর এক রূপকাঁথা
কোথায় শুরু কোথায় শেষ তার খোঁজ অজানা।
তুমি শুধু শিল্পী নও, তুমি বুনন জাদুকর
জোড়াগুলো মিলিয়ে দাও সুঁই ও সুতোর জাদুটোনায়।

এ জীবনে একবারই এক সম্পর্ক বুনেছিলাম
অপারগতায় নুয়ে পড়েছি বারংবার
প্রতি ফোঁড়ে সশব্দে কেঁদে উঠেছে ভাঙনের যন্ত্রণা…
ইয়ার জুলাহি, আমাকে শেখাও তোমার বুননবিদ্যা।

Share Now শেয়ার করুন