গৌতম গুহ রায় >> ১৯ মে ও রক্তস্নাত মাতৃভাষা >> স্মরণ

0
241

উনিশে মে ও রক্তস্নাত মাতৃভাষা

দশটি ভাই চম্পা একটি পারুল বোন
কলজে ছিঁড়ে লিখেছিলো, ‘এই যে ঈশান কোণ –
কোন ভাষাতে হাসে কাঁদে কান পেতে তা শোন ।

গুনলি না? তো এবার এসে কুচক্রীদের ছা
তিরিশ লাখের কণ্ঠভেদী আওয়াজ শুনে যা –
‘বাঙলা আমার মাতৃভাষা, ঈশান বাংলা মা।

১৯৬১ সালের ১৯ মে, ঈশান কোণের বাংলাভাষাভূমের আত্মবিসর্জনের দিন । মাতৃভাষার জন্য প্রদত্ত ১১ শহীদের আত্মবলিদানের রক্তধৌত শিলচার । অভিমানী শিলচরের কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর উচ্চারণ : ‘এই যে ঈশাণ কোণ– / কোন ভাষাতে হাসে কাঁদে কান পেতে তা শোন’, এই স্বর ৬০ বছর পরেও প্রান্তিক উচ্চারণ হয়েই পরে রইলো । এটা নিছক আক্ষেপ নয়, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ভাষিক গোষ্ঠীর কূপমণ্ডুকতাও। ঈশান বাংলার কয়েক কোটি মানুষ, যাদের মাতৃভাষা বাংলা, তাদের অস্তিত্ববিস্মৃতি আসলে ভাষাটাকেই আস্বীকার করা, অমলিন গৌরবের এক আলোকবিন্দুকে অস্বীকার করা ।
১৯৫২র ২১শে ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ একটি স্বধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিলো, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা । ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে রাষ্ট্রসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে, গোটা বিশ্ব মান্যতা দিয়ে পালন করছে। বাহান্ন থেকে ঠিক নয় বছরের মাথায় ভারতের ঈশান কোণের কাছারে, আজকের বরাক উপত্যাকায় ভাষার অধিকার রক্ষার দাবী জানাতে গিয়ে এগারোটি তাজা প্রাণ বলি দিতে হয়েছিলো। ভারতীয় নাগরিক তাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দাবিতে আন্দোলনে নামলে শিলচরের মাটি সেই মানুষদের তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলো রাষ্টীয় রক্ষিরা। সেদিন শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলি্তে ১১ জন প্রাণ হারান। অনেকে আহত ও পঙ্গু হয়ে আজো সেই দুঃসহ স্মৃতি বহন করছে । এই স্মৃতি কি শহীদের ক্ষতের যন্ত্রণার? নাকি ক্ষোভের ও অভিমানের? যে-অভিমানের উচ্চারণ দেখি কবি বিজিতকুমার ভট্টাচার্যের কলমে :

আমাদের দিকে তাকিয়ে তারা বলে
তোমারা রক্ত দিয়েছিলে? উপবাস করেছিলে?
আহা… তাই তোমাদের এমন চেহারা, একদম চেনা যায় না।
যাকে চেনা যায় না তাকে আমরা কেমন করে চিনব?
কেমন করে বলব তোমরা আমার দেশবাসী?
তা হলে তোমরা নিশ্চই বিদেশি ।
(কবিতার বদলে / ১৯৮১)

এই অভিমান স্বাভাবিক। যে দাবিতে এই আন্দোলন, তা আজও অস্বীকৃত, মাতৃভাষার দাবিতে আত্মত্যাগের ষাট বছর পরেও শহিদের স্বীকৃতি নেই আজও। স্বাধীন ভারতে ভাষার দাবিতে জমায়েত হওয়া শান্তিপূর্ণ মানুষদের উপর গুলি চালনার ঘটোনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের রিপোর্ট আজও ঠান্ডা ঘরে বন্দী।
দক্ষিণ আসামের পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রায় সাত হাজার বর্গ কিলোমিটারের পাহাড়ঘেরা ঘন সবুজ সমভূমির সাম্প্রতিক নাম বরাক উপত্যকা। এই অঞ্চল ও সন্নিহিত ডিমসা কাছাড়ি রাজাদের রাজত্বকাল থেকেই বাংলা ভাষার সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা এখানে চলে আসছে। ১৭০৮ সালে ডিমসা-কাছাড়ি রাজতন্ত্র নিজেদের রাজকার্য ও সংস্কৃতির ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করে এবং ভূবনেশ্বর বাচস্পতিকে রাজকবি নিযুক্ত করে। এটা উল্লেখ করা দরকার যে বাংলায় রাজকীয় ভাষার মর্যাদা প্রদান, রাজকার্য পরিচালনা এবং রাজকীয় আইনকানুন প্রথম বরাক উপত্যকায় চালু হয়েছিলো। বাংলার অন্য কোথাও সেটা তখনো ছিল না। ১৮৩০ সালে রাজা গোবিন্দচন্দ্র নারায়ণ আততায়ীর হাতে নিহত হন। ১৮৩২ সালে ইংরেজরা বরাক দখল করে। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৮৭৪ সালে আসাম স্বতন্ত্র রাজ্য হিসাবে গঠিত হয়। সেই সময় ইংরেজরাজ প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বরাক ও সিলেট বা শ্রীহট্টকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেয়। বিভেদ ও শাসনকৌশলের মাধ্যমে শুরু হয় ও বাঙালি বিভেদের রাজনীতি। স্বাধীনতার সময় এই ধারাতেই কথা বলা হতো। জীবিকার টানে ও উদ্বাস্তু হয়ে আসা অ-অহমিয়া মানুষ, বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষীদের বিদেশি বলে চিহ্নিতকরণ শুরু হয়। স্বাধীনতার সময়ের ভাষিক গোষ্টীগত হিসাবে ১ কোটি জনতার মধ্যে বাংলাভাষী ছিলেন ৩২ লক্ষ, অসমীয়াভাষী ২৮ লক্ষ, হিন্দিভাষী ১১ লক্ষ, বড়োভাষী ৬ লক্ষ, নেপালী ৪ লক্ষ, খাসিয়া ৩.৫ লক্ষ, গারো ৩.২৫ লক্ষ, মিজোভাষী ২.২৫ লক্ষ। ১৯৫১ সালে এই সমীকরণ অবিশ্বাস্যভাবে পালটে দেওয়া হলো।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তখন কাছার, মিজোরাম, মণিপুর, ত্রিপুরা প্রভৃতি মিলে আলাদা উত্তর-পূর্বাঞ্চল রাজ্যের দাবি প্রবলতর হচ্ছিল। এভাবেই স্থানীয় সংঘাত নানা রূপে প্রকাশিত হচ্ছিলো । যদিও এই দাবি ভাষা কমিশন মেনে নেয়নি। তাদের নীতি ছিলো কোনো ভাষা যদি স্থানিক জনতার ৭০% মানুষের ভাষা হয়, তবেই তারা স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি জানাতে পারে। এদিকে ১৯৬০-এর ২১ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি এক সভা থেকে ঘোষণা করে যে, আসামের ভাষা হবে একমাত্র অহমিয়া ভাষাই। এই ঘোষণা গোটা ব্রহ্মপুত্র এলাকায় দাঙ্গার আগুন জ্বলিয়ে দেয়। ৪ জুলাই গৌহাটির ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলি চললে রঞ্জিত বরপূজারী নামে এক ছাত্র মারা যান। এই আগুন আরো লেলিহান হয়ে ওঠে। নওগাঁর ভাষাকর্মী ও দাঙ্গাবিরোধী নেতা শিশির নাগকে বাঙালি বলে দাঙ্গাকারীরা হত্যা করে।
এরপর ১৯৬০-এর ৭ জুলাই নিশীথরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে বরাক উপত্যকার ছাত্র সম্মেলন ছাত্র সংগ্রাম কমিটি গঠন করে। এই সভা থেকে ৪ দফা কর্তব্য নির্ধারণ করা হয় এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সরকারের কাছে দাবিপত্র দেওয়া হয়। ১৮ জুলাই জহরলাল নেহেরু আসামের তৎকালীন রাজধানী শিলং-এ এসে এক জনসভায় এই দাঙ্গার নিন্দা করেন। ওই বছরেরই ১০ অক্টবর আসাম বিধানসভায় ভাষাবিল পেশ করা হয়। সেখানে বলা হয় যে শুধুমাত্র অহমিয়া ভাষাকেই রাজ্য ভাষারূপে গ্রহণ করা হোক। অন্য দিকে আসাম বিধান পরিষদে অহমিয়ার সঙ্গে বাংলাকেও স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব আসে। কিন্তু সেই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে। ১৪ অক্টোবর আসাম বিধানসভায় অহমিয়া ভাষাকে রাজ্য ভাষা হিসাবে গ্রহণ করা হয়। বাংলাকে কাছার জেলার ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় কিনা তার ভার ছেড়ে দেওয়া হয় স্থানীয় মহকুমা পরিষদের হাতে। বিরোধীদের সমস্ত আবেদন নিবেদন অগ্রাহ্য করে ২৪ অক্টোবর আসামের রাজ্যভাষা বিলটি পাস হয়ে যায়।
২৪ অক্টবর পার্বত্য কংগ্রেস পরিষদ ১২ ঘণ্টার বন্‌ধ ডাকে। শিলচরে গণবিক্ষোভ আছড়ে পরে। কাছারে বন্‌ধ পালিত হয়। ২ নভেম্বর করিমগঞ্জে ‘কাছাড় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এরপর ৭ নভেম্বর ‘নিখিল আসাম বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’-এ গৃহীত হয় মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায়ের সনদ।
১৫ জানুয়ারি ১৯৬১, করিমগঞ্জ, শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জের কংগ্রেস কমিটির কনভেনশান অনুষ্টিত হয়। সেখানে কাছাড়কে আলাদা শাসনতান্ত্রিক সংস্থা রূপে পরিণত করার প্রস্তাব নেওয়া হয়। ১লা বৈশাখ (১৯৬১ ১৪ এপ্রিল) গঠন করা হয় ‘কাছাড় জেলা গণপরিষদ’। শুরু হয় গণচেতনা প্রচার আন্দোলন। ১৯ মে থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।
১৯ মে, ১৯৬১, শুক্রবার। সমগ্র কাছারের মানুষ অসহযোগের ডাকে সেদিন রাস্তায়। শান্তিপূর্ণ সেই জনতার হাতে হাতে প্রচারপত্র, ’১৯ মে কাছাড়বাসীর সামনে এক অগ্নিপরীক্ষার দিন। এই দিন প্রমাণ হবে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে কতটুকু ভালোবাসি। ভাষা দিয়েই জাতির পরিচয়। ভাষা না থাকলে জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে প্রথম ট্রেন চলার কথা, অসহযোগী মানুষেরা ভীড় করলেন রেল স্টেশানে। ৪টা পর্যন্ত কোনো রেল চলবে না। ক্রমশ জনতার সম্মিলন বাড়ছিলো। ওদিকে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সেন্ট্রাল রিজার্ভ ফোর্স, মাদ্রাজ রেজিমেন্টের বাহিনি। সকাল ৬টা। লাঠি চালানো হলো মাতৃভাষার দাবিতে সমবেত মানুষদের উপর। সাড়ে ছয়টায় আবার লাঠিচার্জ। কিন্তু অপসারণের চেষ্টা সফল হলো না প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষদের কারণে। ৭টা ৫ মিনিটে ছোঁড়া হলো কাদানো গ্যাস। ৭টা ৩০ থেকে শুরু হলো গ্রেপ্তার। পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হতে থাকে একজন-একজন করে। ২টা ৩৫ মিনিটে হঠাৎ একটি গাড়িতে আগুন লাগার খবর রটে যায়। পুলিশ লাঠিচার্জ করে বেপোরয়াভাবে। আন্দোলনের নেতৃত্ব এর মধ্যেই মাইকে ঘোষণা করতে থাকে শান্তিপূর্ণভাবে সত্যাগ্রহ চলবে। কিন্তু হঠাৎ গুলি চালানো শুরু করে পুলিশ। একের পর এক সত্যাগ্রহীদের রক্তাক্ত দেহ শিলচর স্টেশনে লুটিয়ে পরে। আহত হন অনেকে। ১১ জন সত্যাগ্রহী শহীদ হন – ভাষাশহীদ। কমলা ভট্টাচার্য এদের অন্যতম, প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ। এদিন পুলিশের গুলিতে আরও যারা শহীদ হন তাঁদের মধ্যে ছিলেন হীতেশ গোস্বামী, শচীন্দ্র পাল, কুমুদরঞ্জন দাস, তরণী দেবনাথ, চন্ডীচরণ সূত্রধর, কানাইলাল নিয়োগী, সুকোমল পুরকায়স্থ, সুনীল দে সরকার, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সত্যেন্দ্র দেব ।

ঈশান বাংলার এই আত্মত্যাগের আলো ক্রমশ মানুষের বিস্মৃতিতে চলে যাচ্ছে কি? ক্রমশ একঘরে হয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা উপত্যকার বাংলা ভাষাভাষীদের বর্তমান অবস্থা অন্তত সে কথাই বলে। আত্মবিস্মৃত উত্তর প্রজন্মের কাছে ১৯শে মে শুধুমাত্র একটি তারিখ আজ, যেদিন শিলচর রেল স্টেশানে গুলি চলেছিল! ভাষার অধিকার, ভাষার শক্তি যে জাতীয় আবেগ, জাতিসত্তার আবেগ, তা এই প্রজন্ম ক্রমশ বিস্মৃত। শিলচরের মানুষ – প্রাক্তন উপাচার্য ড. তপোধীর ভট্টাচার্য তাই ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “কী চেয়েছি কেন চেয়েছি – এ নিয়ে মাথাব্যাথা নেই কারো। উনিশে মে কি ঘটেছিল, এর প্রতিটি অনুপুঙ্খ যাঁদের জানা – তাঁরা স্বরচিত হিম নীরবতার দুর্গে স্বেচ্ছাবন্দী। ইতিহাসের কাছে কোনো দায় আছে, এমন ভাবনা্র পরিচয় তাঁরা দেননি আজো।… কালের যাত্রার ধ্বনি শুনবো কীভাবে? কালের বহতা ধারায় কাকস্নান মাত্র করে চলেছি। আপাত-কালের রঙিন মুখোশে আমরা মুগ্ধ ও বিভ্রান্ত, প্রকৃত কালের গভীর সংবেদনায় কেউ প্রাণিত হতে শিখিনি।” এই আক্ষেপ শুধু বরাক সন্তানের নয়, আজ সমগ্র বাংলাভাষীর। যখন বরাক উপত্যকাসহ গোটা ঈশান বাংলার কয়েক লক্ষ বাংলাভাষাভাষীর রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। রাষ্ট্রহীন হওয়ার আশঙ্কায় এখন লক্ষ লক্ষ মানুষ। ভাষা শহীদ দিবসের তর্পণ নয় সেই আত্মত্যাগের মুল্যায়ন আজ জরুরি। মনে রাখতে হবে, মাতৃভাষার অধিকার আজ মানবিক স্বীকৃত সত্য, জাতিসত্তার সাথে ভাষার অধিকার জড়িত। সবশেষে দেবেশ রায়ের কথার উদ্ধৃতি দিতে চাই, “একটা ভাষা যদি তার পরিচয় থেকে বাদ চলে যায়, তাহলে কী ক্ষতি হয় মানুষের? একজন বাঙালি যদি সারাটা দিন কোনো বাংলা অক্ষর না লিখে, না দেখে, না শুনে কাটিয়ে দিতে পারেন – কী ক্ষতি হয় তাঁর? এমন কোনো ক্ষতি হয় না, যা দেখা যায়।
“এমন কোনো ক্ষতি হয় না, যা দেখা যায় –” মেফিস্টোফেলিস এই কথা বলেই ফাউস্টের আত্মাটা নিয়ে নিয়েছিল। সেই আত্মার খোঁজে মাথা কুটে মরছে আসামের বাঙালিরা।

Share Now শেয়ার করুন