এসপার গার্সিয়া লাভিনার দুটি কবিতা
সরোবরে ধ্যান
নদীতীরে ধ্যানস্থ এই তোমার থেকে আমি বহু দূরে
সুরচ্যুত স্বরলিপি বাঁধছি এখন পুনরায় সুরে সুরে
অবিরাম ঢেউ বুনছি নিবিড় শব্দ ফুরে ছন্দে ও ভাষায়
যেমন ছিল সে লিপি পেলাম ফেরত আবার তরঙ্গ আসায়
সরোবর ফের পাঠ করে যায়
জল নাচিয়ে ফেনায় ফেনায়
আবার বলে এবং আবার কণ্ঠে তুলে সেই নাম অবিরাম
মুক্তি মুক্তি মুক্তি মুক্তি মুক্তির সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম!
জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড
দাঁড়াই যখন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের পাশে
নিজেকে আমি ভাবি এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড।
বিপ্লবে জ্বলে ওঠে দুটি চোখ আমার
দুটি চোখ আমার যেন হায়েনার চোখ
আঙুলের আড়ালে লুকিয়ে রাখা ছোট চাকু
যেন সিংহের নখর, যেন ঈগলের ঠোঁট।
সম্মিলিত জনতার সন্মুখে দাঁড়াই যখন
রক্তে আমার নাচে বিদ্রোহ আর বিপ্লব।
এসপার গার্সিয়া লাভিয়ানা। জন্ম ১৯৪১ সালে। নিকারাগুয়ার ধর্মযাজক, কবি। লাভিয়ানা গ্রামের কৃষক ও দরিদ্র জনসাধারণের ভেতরে কাজ করতে গিয়ে অবর্ণনীয় শোষণ ও অত্যাচার প্রত্যক্ষ করে সেসবের প্রচণ্ড সমালোচক হয়ে ওঠেন। লিবারেশন থিয়োলজিতে বিশ্বাসী লাভিয়ানাকে সামোজার ন্যাশানাল গার্ড দুবার গোপনে হত্যার চেষ্টা চালায়। তিনি দেশত্যাগ করে কোস্টারিকায় পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। ১৯৭৮ সালে কোস্টারিকা সীমান্তে সান্দানিস্তা গেরিলা বাহিনীর হাতে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর নিকারাগুয়ার খ্যাতনামা কবি আর্নেস্তো কার্দেনালের তত্ত্বাবধানে তাঁর লেখা পত্র ও কবিতাগুলি সংকলিত হয়।
বেই দাওয়ের দুটি কবিতা
সময়ের গোলাপ
যখন দারোয়ান নিদ্রিত থাকে ফটকে
আর তোমরা দল বেঁধে ঝড়ের সাথে বাড়ি ফিরে আসো
এই যে আলিঙ্গনে চলার বয়স – তা হলো
সময়ের গোলাপ।
যখন পাখিদের চলাচল আকাশকে সাজায়
আর তোমরা পেছনে তাকিয়ে সূর্যাস্ত দেখো
এই যে অন্তর্ধানের মাঝে প্রত্যক্ষ করা – তাই হলো
সময়ের গোলাপ।
যখন তলোয়ার বেঁকে যায় ডুবো জলে
আর তোমরা ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে বাঁশিতে সুর তোলো
এই যে বাধাবিঘ্নের উচ্চকিত আর্তনাদ – তা-ই হলো
সময়ের গোলাপ।
যখন কলম আঁকে দিগন্তের রেখা
আর তোমরা প্রাচ্যের ঘণ্টাধ্বনীতে বিস্ময়ে জেগে ওঠো
এই যে ধ্বনির অনুরণনে কম্পন – তা-ই হলো
সময়ের গোলাপ।
মনের আয়নাতে বিম্বিত যে-কোনও মুহূর্ত
যা পৌঁছে দিতে পারে পুনর্জন্মের দরজায়
খুলে দিতে পারে সাগরের কপাট – তা-ই হলো
সময়ের গোলাপ।
ফিরে আসা ধ্বনি
আকাশের পাখিগুলো সোনালি আলোতে উড়ে
ফিরে এসে বসে পাহাড়ি গাছের ডালে
রাতের ফানুসগুলো নিভে গিয়ে
পরে যায় মাটিতে।
আমাদের ডাক, হে প্রভু, ফিরে যায় তোমার কানে।
আমাদের চিৎকার পাহাড়ে সাগরে নদীতে
কত ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে পুনরায়।
হে প্রভু, তোমার গোপন সুর ফিরে যায় তোমারই কানে।
বেই দাও চীনের একজন বিখ্যাত কবি। সারা পৃথিবী জুড়েই তাঁর খ্যাতি। চিনের যে ক’জন কবি কবিতায় মরমীবাদকে আগলে রেখেছেন, বেই দাও তাদেরই একজন। বেই দাও শব্দটির আরেকটি উচ্চারণ আছে – পেই তাত। এই শব্দটির অর্থ ‘উত্তরের দ্বীপ’। কবির জন্ম ১৯৪৯ সালের ২ আগস্ট বেইজিংয়ে হলেও কবির শিকড়টি চিনের উত্তরের একটি দ্বীপে প্রোথিত। বেই দাও-এর প্রকৃত নাম ঝাও ঝোনকাই। কবি নির্জনতা পছন্দ করেন বলেই হয়তো ‘বেই দাও’ নামটি লেখক নাম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।