চারভুবনের ছোটগল্প সিরিজ – ১ | পূরবী বসু | হামীম কামরুল হক | লুনা রাহনুমা

0
101

প্রায় সমস্ত পৃথিবী জুড়ে এই সময়ে কারা কোন ধরনের বাংলা ছোটগল্প লিখছেন? সেই গল্পগুলি কেমন? সমকালীন বাংলা ছোটগল্পের গতিপ্রকৃতির অনেকটাই পাঠকেরা আঁচ করতে পারবেন ভেবে তীরন্দাজ-এর বিশেষ আয়োজন – চার ভুবনের ছোটগল্প সিরিজ। এখানে প্রথম সিরিজের তিনটি গল্প প্রকাশিত হলো। এই গল্পগুলি অপ্রকাশিত গল্প। পরে প্রকাশিত হবে আরও বেশ কিছু গল্প। 

রাই ফুল
পূরবী বসু

গাঁয়ে পাশাপাশি দুই বাড়ির দু’টি বউ।
প্রায় সমবয়সী। কতো হবে তাদের বয়স? বড় জোর উনিশ-বিশ!
একজনের নাম ফুল, আরেজনের জবা।
গলায় গলায় ভাব তাদের।

প্রতি বিকেলেই একসাথে কলসী কাঁখে ওরা চৌধুরীদের বাড়িতে যায় তাঁদের ডীপ টিউবওয়েল থেকে এক কলসী করে খাবার জল তুলে আনতে। চৌধুরীরা যথেষ্ট জনদরদী। পাড়ার লোকজনকে একআধ কলস কলের জল দিতে কার্পণ্য করে না। যেতে আসতে প্রত্যেকদিনই বৌ দুটিকে পার হয়ে যেতে হয় সরকারদের বিশাল ভিটাখানি। বড় রাস্তাটি যেখানে কোমর বেঁকিয়ে আবার সোজা চলতে শুরু করেছে, ঠিক সেখানেই শুরু সরকারদের বাড়ির চৌহদ্দি। তাদের কাচারি ঘরটি একেবারে রাস্তা ঘেঁষে। মাসখানেক হলো, এইসময় প্রতিদিন সেই কাচারি ঘরের সামনে খোলা বারান্দায় একটি বেতের বুনুনি দেয়া বাদামি কাঠের চেয়ারে বসে থাকে এক যুবক। তাকে আগে কখনো এ গাঁয়ে দেখেনি ফুল কিংবা জবা। তরুণটির বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না। হাল্কা পাতলা গড়ন। সরু অথচ ঘন কালো গোঁফ। চুল ঈষৎ এলোমেলো। পরনে প্রায় প্রতিদিনই থাকে সাদা পায়জামার সঙ্গে নানা ধরনের রঙিন পাঞ্জাবি। কখনো সুতার কাজ করা, কখনো ছাপা, কখনো চেক চেক, কখনো বা লম্বা রেখা রেখা। পায়ে পেছন-খোলা চামড়ার স্যান্ডেল। চোখে কালো ফ্রেমের ভারি কাচের চশমা। যখনই তাকে দেখে তারা, সে হয় বসে বসে একাগ্রচিত্তে বই পড়ছে, না হয় সামনের গোল টেবিলে কিংবা পায়ের ওপরে একটি বাঁধানো খাতা রেখে মাথা নীচু করে কিছু লিখছে। অথবা চুপচাপ তাকিয়ে রয়েছে রাস্তা কিংবা আকাশের দিকে। কিন্তু এই অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে থাকা দেখেই বোঝা যায় কোন একদিকে চেয়ে রইলেও বিশেষ কিছু দেখছে না সে। তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছে বুঝি কিছু।

একদিন হলো কী, ভরা কলসি কাঁখে দুই বৌ যথারীতি ঘরে ফিরছে সেই চেনা পথ ধরে। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, কোথা থেকে একটা বিশাল কালো গাভী ছুটে এলো তাদের দিকে। গরুটির গলায় তখনো ঝুলছে একটা লম্বা রশি – পাটের তৈরি – পাকানো। বুঝতে কষ্ট হয় না কারো, মালিক মাঠ থেকে খুঁটি খুলে ঘরে নেবার সময়ে ছুটে পালিয়েছে গাইটি। বহুদিন পর হঠাৎ একটু স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সাধ হয়েছে হয়তো তার। গরুটির কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাবার আশায় ওরা দুই বউ ভরা কলসি কাঁখে রাস্তার সীমানা ঘেঁষে জায়গীরদারদের বাগানের বেড়ায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রচুর জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রাস্তায় ছুটে আসা বিশাল প্রাণীটির চলাফেরা, যাতায়াতের সুবিধের জন্যে। ওরা এটা বিশেষভাবে করেছে, যাতে করে ওদের কোন ঝক্কিঝামেলা না করে নির্বিঘ্নে গরুটি চলে যায় ওখান থেকে।

কিন্তু কী ছিল ঐ পশুর মনে কে জানে? কোন মতলবে সে সোজা এসে চড়াও হয় ফুলের ওপর। গরুটির চেপ্টা ও লম্বা মাথার ওপর ছোট ছোট দু’টি ছাই রঙের শিং এবং শিং-এর নিচে কোণাকুণি করা লম্বাটে দু’খানা সতেজ উজ্জ্বল চোখ। শিং দুটো ঈষৎ নামিয়ে নিয়ে এসে সে ফুলের কাঁখের কলসিটাকে সমানে গুঁতোতে থাকে। অযথা। কোনরকম প্ররোচনা ছাড়াই। তবুও যতক্ষণ সম্ভব কলসিটি ধরে রাখার চেষ্টা করে ফুল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই, হয়তো ভয়ের কারণেই অথবা শক্তির অসামর্থে, একসময় ফুলের কাঁখ থেকে কলসিটা পড়ে যায় মাটিতে। কাঁত হয়ে পড়া ভরা পিতলের কলসির জলে ভেসে যায় শুকনো রাস্তা। কী করবে বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখে পাশে গুটিসুঁটি মেরে দাঁড়ানো জবা, ফুলের সঙ্গে আসা অন্য বউটি, যার দিকে, আশ্চর্য, একবার ফিরেও তাকায় না কালো গরুটি।

শুধু কলসিটা মাটিতে ফেলে দিয়েই কিন্তু ক্রোধ কমে না গরুর। সে এবার ফুলের দিকে ছুটে আসে সম্পূর্ণ মাথা ঊঁচিয়ে। উপায় না দেখে জোরে দৌড়ুতে গিয়ে ইঁটপাথরের এবড়োথেবড়ো রাস্তায় উঁচু হয়ে থাকা একটুকরো ইঁটে হোঁচট খেয়ে সটান নিজের বুকের ওপর উপুড় হয়ে ধপাস করে পড়ে যায় ফুল। মুহূর্তের ভেতর কী ঘটে যায়। শাড়ির সাথে এমনভাবে পা পেঁচিয়ে পড়ে যে চেষ্টা করেও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে পারে না ফুল। কিন্তু সবকিছু ভালোভাবে বুঝে ওঠার আগেই ফুল টের পায়, দুটো শক্ত হাত তাঁর দুই বাহু ধরে তাকে মাটি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা শেষ বিকেলের ম্লান আলোয় বেকায়দায় রাস্তায় পড়ে থাকা ফুল দেখে তার রক্ষাকর্তাকে। দেখে অবাক হয়। অপরিচিত মুখ নয় এটি। অথচ তাকে পরিচিতও বলা যায় না। সে কে, কী নাম তার, কিছুই জানে না ফুল। আর ফুলকে তো তার চেনার কথাই আসে না। বড়জোর তার কাছে ফুল একজন নিত্য পথচারী। তবু, সত্যের খাতিরে বলতেই হয়, পরিচয় না থাকলেও পরস্পরের সম্পূর্ণ অজানা নয় তারা।

ফুল দেখে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসা এই নিস্তব্ধতায় আশেপাশে যখন আর কেউ নেই, তাকে দু’হাতে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আর কেউ নয়, সরকার বাড়ির কাচারি ঘরের সামনে প্রতিদিন চেয়ারে বসে থাকা সেই যুবকটি। এখনো তার পরনে সাদা পায়জামা, খয়েড়ি পাঞ্জাবি, পায়ে সেই কালো চামড়ার স্যান্ডেল। এতো কাছে থেকে তাকে এখন আরো সুদর্শন, আরো তরুণ দেখায়।
মাটি থেকে তাকে তুলতে তুলতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে ফুলকে জিজ্ঞেস করে। “খুব লাগেনি তো?” হয়তো প্রশ্নটা নেহায়েৎ সৌজন্যমূলক। কিন্তু ফুলের কানে তা অমৃতের মতো শোনায়। কী মধুর, কী মিষ্টি সে গলা! কী দরদ! আবেগ! কী দুশ্চিন্তা! আহা, সত্যি সত্যি আজ লাগতেও তো পারতো আরেকটু?
“না, না,” সংকোচে লাল হয়ে যায় ফুল।
ওমা! সে কী?
লোকটি করে কি? করে কী?
নিজের ডান পা’টি দ্রুত কাছে টেনে আনতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে ফুল।

সে টের পায়নি, ইঁটের টুকরোয় হোঁচট খাওয়ায়, তাঁর খালি পায়ের আঙুলে লেগেছে বেশ। ফুল দেখে, তার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা থেকে রক্ত ঝরছে তখন। লোকটি রাস্তায় পড়ে থাকা পিতলের কলসিটা কাঁত করে জল নিঙড়ে প্রথমে নিজের দু’হাত ভালো করে ধুয়ে নেয়। তারপর বাঁ হাত দিয়ে ফুলের ডান পায়ের গোড়ালির পেছনটা ধরে কলসি থেকে অনেকখানি জল ঢেলে ফুলের পায়ের রক্তাক্ত বুড়ো আঙুলটি ভাল করে ধুয়ে পরিস্কার করে দেয় নিজের ডান হাতের আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে।
“এইসব রাস্তায় কত রকমের যে জার্ম রয়েছে! ঘরে গিয়ে আবার পা’টা ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে মুছে একটু অ্যান্টিবায়োটিক মলম লাগিয়ে নেবেন।“একটু থেমে আবার নিজেই বলে, “আচ্ছা, এরকম উঁচুনিচু সদর রাস্তায় খালি পায়ে কেউ হাঁটে?” ফুল ছেলেটির মুখের দিকে তাকায়। শেষের বাক্যটি বলার সময় তার কণ্ঠস্বরে – বলার ধরনে কি ধমক ছিল? নাকি সেটা শাসন বা শিক্ষা! ঠিক বুঝতে পারে না। তবে ফুল লক্ষ করে অন্যদিনের মতো আজো লোকটির চোখে রয়েছে কালো ভারি ফ্রেমের চশমা।

আছাড় খেয়ে পেটের দিকে বিশাল টোল-পড়া আধ-খালি কলসিটি মাটি থেকে নিয়ে ফুলের হাতে তুলে দেয় ছেলেটি। ফুলকে মাটিতে ফেলে দিয়ে গরুটি মুহূর্তে কোথায় কোন দিকে উধাও হয়ে যায় ওরা কেউ টের পায় না।। এতক্ষণে দেখা যায় গরুর মালিকটিকে। গরুর নাম (‘কালা’) ধরে ডাকতে ডাকতে রাস্তা দিয়ে তাকে এলোমেলো খুঁজে বেড়াতে শুরু করেছে সে।

“আহা। কলসিটি একটু বাঁকা হয়ে গেছে। শাশুড়ি যদি বকে এজন্যে, বলবেন, আপনার পায়ের ব্যথার কাছে ওটা তেমন কিছুই নয়।” বলে নিজের রসিকতায় নিজেই একটু শব্দের সঙ্গে হো হো করে হেসে ওঠে ছেলেটি। ওর কথা বলার ধরনে এতোক্ষণে ওপাশে দাঁড়ানো জবাও খিলখিল শব্দ করে হাসে। লোকটি একবার মুখ তুলে জবাকে দেখে। তারপর আর দেরি করে না। দ্রুত সরকার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

আছোঁয়া কুমারী মেয়ে নয় ফুল, দেখতে যতই কিশোরী কন্যার মতো লাগুক তাকে। রাতের অন্ধকারে স্বামীর প্রবল ইচ্ছা আর উচ্ছল আনন্দের কাছে অহরহ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে আমূল বিদ্ধ হওয়া প্রাত্যহিক জীবনের অতি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই একান্নবর্তী পরিবারে ফুল কোনদিন দিনে দুপুরে বা প্রকাশ্যে একটিবারের জন্যেও স্বামীর হাত কিংবা আঙুলের স্পর্শ পর্যন্ত টের পায়নি। তার কপালে-গালে-হাতে, কোথাও, এমনকি জ্বরে কিংবা মাথা ব্যথায় শরীর টনটন করে ফেটে পড়লেও।

এর পর থেকে প্রতিদিন কলসি কাঁখে জল আনতে যাওয়ার সময় সরকার বাড়ির সামনে এলেই ছেলেটির কথা মনে পড়ে ফুলের। কলসি খালি হোক আর ভরা হোক, একবার ঐ মুখের দিকে তাকাবেই ফুল। কী অসীম মমতা মাখা চোখ দু’টি দেখেছিল সে সেই পড়ন্ত বিকেলে! কেবল একটি পায়ের একটিমাত্র আহত আঙুলের ডগায় অতি সামান্য একটু ছোঁয়া! কিন্তু ওকথা ভাবতে গেলে এখনো শরীরে উষ্ণ এক শিহরণ টের পায় সে। কোমরের খালি কলসি যেন হঠাৎ টুসটুস করে পূর্ণ হয়ে যায় টলটলে পরিস্কার জলে।

অথচ কী আশ্চর্য! সেদিন বিকেলের পর আর একদিনও ছেলেটি ফুলকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি তার পা’টা কেমন আছে। খুব ব্যথা করে কিনা। ভদ্রতা করেও তো মানুষ এই প্রশ্ন করে! অথচ দেখে মনে হয় তাকে যেন চেনেও না সে। কচিৎ এদিকে, মানে তার দিকে তাকায়। কিন্তু বারান্দা ছেড়ে উঠে আসেনি একদিনও।

আরো সপ্তাহ খানেক পরে একদিন ফুল আর জবা যাচ্ছে জল আনতে। হঠাৎ ফুল লক্ষ করে, সরকার বাড়ির কাচারি ঘরের সামনে আজ আর কেউ বসে নেই। সেই বেত-কাঠের মজবুত চেয়ারটি খালি পড়ে আছে। বলতে গেলে সমস্ত কাচারি ঘর আর বিশাল বারান্দাটা ফাঁকা ধূ ধূ করছে। চারদিক খালি খালি লাগছে। ফুল ভাবে, কোনো কারণে হয়তো আসতে দেরি হচ্ছে তার। প্রতি বিকেলে যে এখানে বসে থাকে সে আজ একবারও আসবে না, এটা তো হয় না! ফেরার পথে নিশ্চয় দেখবে তাকে। কিন্তু ফেরার পথেও কাচারি ঘরের সামনেটা ফাঁকা। কেউ বসে নেই চেয়ারে। হঠাৎ ফুলের কাছে কাঁখের পূর্ণ কলসিটিকে সম্পূর্ণ শূন্য মনে হয়। অথচ পুরো জলে ভরা বড় কলসিটা রীতিমতো ভারী। কাঁখের কলসির ওপরে জলের দিকে তাকিয়ে, যেন বিরক্ত হয়েছে তেমন সুরে, জবার উদ্দেশে বলে ফুল, “ধ্যাৎ! একটা গান্ধী পোকা পড়েছে জলে।”
বলেই তাড়াতাড়ি সবটা জল উপুড় করে রাস্তার ধারে মাটিতে ফেলে দিয়ে আবার চৌধুরীদের বাড়িতে গিয়ে জল ভরে আনে ফুল আস্তে আস্তে টিউব ওয়েলের হাতল চেপে চেপে। ততক্ষণে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। সরকারদের কাচারি ঘরের সামনেটায় একদলা অন্ধকার পুরো বাড়িটি লেপ্টে আছে।

বারান্দাটা আগের মতোই ফাঁকা। কেউ এসে বসে না সেখানে। একই রকমভাবে চলে পরের দিনও।
তার পর দিন।
তার পর দিন।
তারপরের দিন।
পুরো এক সপ্তাহ।

একদিন সকালে কলসি ছাড়াই, সরকারদের বাড়িতে এসে হাজির হয় ফুল। এ বাড়ির ছোট মেয়ে মায়ার সঙ্গে খানিকটা জানাশোনা আছে তার। তাই অসময়ে ফুলকে একা এ বাড়িতে আসতে দেখে কেউ অবাক হয় না। এটা সেটা কথার পর মায়াকে সঙ্গে নিয়ে কাচারি ঘরের সামনে যেখানে এখনো সেই চেয়ারখানা পাতা, সামনে ছোট গোল টেবিল, সেখানে গিয়ে দাঁড়ায় ফুল। কোন কথা না বলে কেবল শূন্য চেয়ারটির পিঠটার ওপর আলতো করে তার হাত দু’টি রাখে। মায়া চেয়ারটির দিকে তাকায়। কী মনে করে নিজের থেকেই বলে, বিএ পরীক্ষা শেষে তাঁর মেজোকাকির ছোটভাই শহর থেকে কিছুদিনের জন্যে বেড়াতে এসেছিল এখানে। প্রতি বিকেলে এ জায়গাটায় বসে বসে গল্পের বই পড়তে ও হাওয়া খেতে খুব পছন্দ করতো সে। কবিতাও লিখতো মাঝে মাঝে। পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করেছে সে। এই গেল সপ্তাহেই জানতে পেরেছে। তাই বাড়ি ফিরে গেল। আরো নাকি পড়ার ইচ্ছা আছে তার।

“ওঃ।” আর কোন শব্দ বেরুল না ফুলের কণ্ঠ দিয়ে। তার বোঝা উচিত ছিল এ গাঁয়ের মানুষ সে নয়। চলে তো যাবেই একদিন। কী আছে এই গাঁয়ে যা তার মতো তরুণকে ধরে রাখতে পারে!
ফুল দুই হাত বাড়িয়ে চেয়ারের পিঠটাতে আস্তে হাত বুলোয়। চোখ বুজে অনুভব করার চেষ্টা করে চেয়ারের হাতল, পেছন, মাথার দিকটা। যেন চেয়ারটি খালি নয়। শান্ত পরিশীলিত এক তরুণের শরীরের উত্তাপ ছড়িয়ে আছে সেখানে। অঘ্রাণ মাসের সকাল। কিন্তু পরিত্যক্ত চেয়ারটি আসলেই ঠান্ডা নয়। উষ্ণই। এই ঘরের বারান্দাটি কি পূব দিকে মুখ করা? সকালের তীর্যক আলো এসে পড়েছে কি সোজা বারান্দার ওপর। এই উত্তাপের উৎস কি তাহলে জাগতিক নয়? বহির্বৈশ্বিক? সূর্যের কিরণ থেকেই কি তা ধার করা? আকাশের দিকে তাকিয়ে মধ্য-সকালের ঘড়ির সময় নিরুপণের চেষ্টা করে ফুল। তারপর দু’ হাত দিয়েই পরম মমতায় কাঠের চেয়ারটির পেছনটা শক্ত করে ধরে থাকে। আর সেভাবেই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ।

প্রতি বিকেলে এখনো চৌধুরীদের বাড়িতে কলসি কাঁখে জল আনতে যায় দুই বউ – ফুল আর জবা।
যাবার সময় প্রতিদিন তার কথা মনে পড়ে ফুলের। অন্তত একবার বারান্দাটির দিকে, খালি চেয়ারটির দিকে তাকায়।
মনে পড়ে সেই উল্টাপালটা দিনটির কথা। পাগলা গরুর পাগলাটে চোখ দুটোর কথা। কোনো কারণ ছাড়া শিং উঁচিয়ে তাঁর দিকে ধেয়ে আসার সেই ভয়ার্ত সন্ধ্যার কথা।
আর তারপর বোকার মতো সোজা উপুড় হয়ে তার সেই মাটিতে পড়ে যাওয়া। সে স্পষ্ট টের পায় তাঁর ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে অন্য এক পুরুষের উষ্ণ মমতাময় স্পর্শ।

ফুল নিচু হয়ে নিজের হাত দিয়েই ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটির ডগায় হাত বুলোয়।
জবা জিজ্ঞেস করে,”কী হয়েছে রে?”
“ব্যথা পেয়েছি! আবার। সেখানেই। বড্ড যন্ত্রণা!”

অবস্থানবিন্দু
হামীম কামরুল হক

অফিস থেকে বেরুতেই চোখে পড়ে, একটা লোক তাদের অফিসে ঢোকার মুখের একটু পাশে, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে আর রিং বানিয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। আহামরি কোনো দৃশ্য নয়, কিন্তু কেমন ভাবনাহীন চিন্তাহীন মুখ, আর আলাদা বলতে ওই ধোঁয়া গোল্লা গোল্লা করে ভাসিয়ে দেওয়া।… জায়েদির দিনরাত মনে হয় চারদিক থেকে দেওয়ালগুলি এগিয়ে আসছে। সে মাঝখানে থেকে ছটফট করে একবার ডানে একবার বাঁয়ে, আর সামনে পেছনে দেখছে দেওয়ালগুলির এগিয়ে আসা। একটু একটু করে ধীরে ধীরে… দেওয়ালগুলি এগিয়ে এসে এসে… নাহ! তার আগেই কিছু একটা করা দরকার। হাতে সময় কমে আসছে। টাকাও তলানিতে। এই সময়ের ভেতরে কিছু একটা জোগাড় না করতে পারলে, একদম গ্রামের বাড়ি ফিরতে হবে। প্রায় ছয়মাস হলো অফিসে কোনো বেতন নেই। হাতে যা ছিল সব শেষ। ব্যাংকে রিমির নামে থাকা ফিক্সড ডিপোজিট কোনোমতেই ভাঙা যাবে না।

মিজান ভাই বলে, আরে ধার করো, ধার না করলে ধারালো হবে না। ধার করবে, দেখবে মাথা খুলবে। হাতও খুলবে। কাজে-কর্মে স্পিড এসে যাবে।

কাওরান বাজারের অফিসের নিচে একটু সামনে এগিয়ে হাতে বামে ছিরু মিয়ার দোকান। সেখানে চা খেতে খেতে মিজান ভাই বলে, রুহুল হোসেন জায়েদি, সময় খারাপ মানি, আমার অবস্থা তো জানো, বাবা প্যারালাইসিস, দুবছর ধরে বিছানায়, বেড সোর হয়ে কী বাজে অবস্থা! ছোটবোনটা উধাও হয়ে গেছে তার লাভারের সঙ্গে, আমি আর আমার বউ কোনোমতে চালিয়ে নিচ্ছি। ছোট ভাইটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়ছে। ও—ই এখন আমাদের একমাত্র ভরসা। তোমার ভাবির কাছে কদিন আগে শুনলাম এক বড়লোকের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে। বাপের ঢাকায় তিনটা বাড়ি। তাও নাকি বাপের একমাত্র মেয়ে। মারাত্মক স্টাইলিস্ট। দেখলে বাঙালি বলে মনে হবে না। তোমার ভাবি যেভাবে বললো, হেঁটে এলো না যেন ক্যাটওয়াক! শুনে মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছা হলো। ছোটনকে গিয়ে বলি, নিয়ে আয় একদিন। এটা বলার আগেও অনেক কিছু বলেছি, তুই তো জানিস, আমাদের অবস্থা, যা করবি ভেবে চিন্তে করবি। আমাদের পরিবারে খাপ না খাক, তোর সঙ্গে খাপ খেলেই আমি খুশি। তুই শক্তমতো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেলে আর চিন্তা করি না। আমাদের জীবন তো কেটেই গেল।… এত কিছু বলে কিন্তু কথাটা বলেছি। চুপচাপ শুনছিল। যখন বললাম, নিয়ে আয় একদিন, বলে, আমাদের ব্রেক আপ হয়ে গেছে!…যাহ! বাবা! বাঁচা গেল! মুখে এসেই গিয়েছিল, কিন্তু জানি না আমার মুখের ভাব লুকাতে পেরেছিলাম কিনা, ও জানালার দিকে মুখ করে আকাশে দিকে তাকিয়ে কথাটা বলছিল, তাই রক্ষা! তারপর একটু আপন মনে বলে, মাত্র এক বছর তিন মাসের সম্পর্ক…! আমি যা বোঝার বুঝলাম, করোনা শুরুর আগে শুরু, করোনা শুরুর পর আরো কিছু দিন ছিল, এরপর ঘ্যাচ্যাং!… বুঝলে ভাই, বিপদে আছে সবাই, কম আর বেশি, যার যার স্ট্যাটাস অনুযায়ী বিপদ, নেও চলো, ছিরু ভাই, কালকেই সব টাকা একবারে, কী চলবে না…।

ছিরু একটু ম্লানমুখে চায়। কিছু বলে না। মিজান খেয়াল করেই জিনসের প্যান্টের পেছন দিক থেকে মানিব্যাগ বের করে নিয়ে আসে। বিলটা দেয়। ছিরুর মুখটায় আলো খেলে। জায়েদি খেয়াল করে ম্যানিব্যাগটা বেশ মোটা। হাজার টাকার নোটে গাদানো।

লিয়াকত বলেছিল, মিজানুদ্দিন দফাদার কঠিন মাল। দেখলে মনে হবে, ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না! কী সহজ সরল, সাদাসিধা মানুষ, কোনো পোজ—পাজ নেই, কিন্তু জানো না, সাংবাদিক প্লটের জমি আছে, আরো কিছু জমি কিনেছে, শুনেছি গাজীপুরের দিকে নিজের জমিতে টিনের চাল দেওয়া মেসবাড়ি করে ভাড়া দিয়েছে। মাসে মাসে চাকরির বাইরেও মালপানি আরো আছে।

জায়েদি সেদিন সন্ধ্যা হওয়ার আগের সময়টায় তার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
মিজান ভাই, আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল…
শুনেই তিনি জায়েদিকে বলেন, চলো নিচে যাই, চা খাই কী বলো!
– চলেন।
জায়েদি ও মিজান যখন লিফটে ওঠে। মিজান বলেন, মুখ শুকনা কেন, আচ্ছা আচ্ছা, নিচে গিয়ে শুনছি।

লিফটে মিজান জায়েদি আর ওপরের তলার কোনো অফিসের এক মহিলা ছিল। মহিলার কড়া মেককাপ, আর চওড়া শরীর। মাঝারি দোহারা গঠন, সরু কোমরের নিচে বিশালবিস্তৃত নিতম্ব। সে-তুলনায় জায়েদিকে একেবারে পাতলা ছিপছিপে মনে হচ্ছিল। ফৌজি ছাঁটের চুল, ফুল হাতা শার্টের হাতা গোটানো, জিনস প্যান্টে গুজে দেওয়া, দামি কেডস, জায়েদির বোনদুলাভাই গত বছর কানাডা থেকে তার জন্য নিয়ে এসেছিল এই স্নিকার। পঞ্চাশ ষাট বছর আগে হলে, তরুণ তুর্কি বলা যেতে পারত, জায়েদিদের মতো লোকজন আগে রাজনীতি করত, খুব আদর্শবাদী একটা ধারা বেছে নিয়ে মার্কস, লেনিন, মাও সে তুংয়ে ঝড় তুলত।

জায়েদির আড়ালে লোকে তাকে নিয়ে খুব বেশি কথা বলে না। কারণ, সে কোনো আলোচ্য—বিবেচ্য বিষয় হওয়ার মতো মানুষই নয়। তাও যে কটা কথা লোকে বলে, তার একটা হলো, ছেলেটা দিব্যি ছিল। অনেস্ট এনার্জিটিক আর ভীষণ সম্ভাবনাময়। বেচারা বিয়ের পর আর সবার যা হয় তাই হলো। সংসারে ফেঁসে গেল। বৌটা মহাসুন্দরী।

জায়েদি অবশ্য এসব চিন্তাও করে না। হিমি মফস্বলের মোটামুটি শিক্ষিত ঘরের মেয়ে। বাবা একটা ব্যাংকে চাকরি করেন। সে আর তার একটা ছোট ভাই নিয়ে ছোট সংসার। জায়েদিকে পছন্দ করেছিল ওর মামা। তিনি তখন একটা দৈনিকের বার্তা সম্পাদক। নিজেকে সবসময় বলেন, দৈনিকের সৈনিক, লড়ে যাচ্ছি গত ত্রিশ বছর, এরশাদের পতনের সময় থেকে আছি, তারপর কত খেল দেখলাম, কত কিছুর স্বাদ পেলাম।

মামা সিগারেট সাধে।
জায়েদি বলে, নো, থ্যাংকস!
-বাব্বা! তুমি দেখি অন্য মাল!

খুবই রগুড়ে লোক, বলেন, আমাদের সেক্টরে মালপানি কম যাদের কম, তাদের কমই, আর বাড়ে না, আর যারা করে নিতে পারে, তারা ছাপ্পড় ফাইরা কইরা নেয়, কিন্তু সিগারেট আর পানি (তিনি অর্ধমুঠো করা ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা মুখের কাছে নিয়ে একটা ভঙ্গি করেন) খায় না মনে হয়, এক তুমি আর আমি, হা হা হা!… আমাদের ভেতরে কী আছে বলো তো! আমরা কি অন্য কোনো ধাতুতে গড়া?

জায়েদি বলে, আসলে, আমার বাপ চাচাদের মধ্যে কেউ সিগারেটও খায় না, একমাত্র চা চলে, তা-ও চলে না।
তিনি বলেন, তাই বলে, ভেবো না আমার একেবারে নিরামিষ জীবন, খাওয়া কি কেবল মুখ দিয়ে খায়? চোখ দিয়ে, মন দিয়ে কত কত খাওয়ার জিনিস! ভেবে দেখেছ! কলমের কালি তো সব নিউজ পেপারেই ঢেলে দিলাম, নইলে ইতিহাস লিখতে পারতাম। আমি কিন্তু ইতিহাসে এম.এ, ফ্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, নাইন্টিন এইট্টি ফোর, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড।

-আমি ফক্সফোর্ডের।
-মানে! জাহাঙ্গীরনগরের?
-একদম!
-জাহাঙ্গীর খুব প্রেমিক ছিলে, জানো বোধ হয়, আর এত মদিরাগ্রস্ত… জাহাঙ্গীরনগরে কি এখনও সন্ধ্যা রাতে শেয়াল ডাকে?
– কে জানে, সব শেয়াল ঢাকায় চলে এসেছে বোধ হয়।
-হাঃ! হাঃ! হাঃ!… শেয়াল ডাকা কমে গেছে অনেক। আমি তো যাই মাঝে মাঝে।
-তাই নাকি? কেন?
-বলব আরেক দিন।

এসব আলাপ হতে হতে প্রেসক্লাবে গিয়েছিল সে খসরু পারভেজের সঙ্গে। কীভাবে কীভাবে আরো কদিন দেখা, আলাপ হতে হতে জমেই গেল তার সঙ্গে। একটা ভাঙাচোরা টয়োটা আছে তার, আদ্যিকালের, তাতে চড়িয়ে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন সাভারের দিকে। একটা জমি, গেরুয়া বাজারের পাশে, মাদ্রাসার উল্টো দিকে। মোটামুটি বড় জায়গা। বলেছিলেন, এই একটাই প্রোপার্টি আছে আমার, তবে তোমার ভাবি, তার বাপের একমাত্র মেয়ে, খুলনা শহরে রাজকীয় বাড়ি আছে, সে তো তক্কে তক্কে আছে, কবে আমি অবসরে যাব আর আমাকে সে পাকড়াও করে খুলনা নিয়ে যাবে। জানো তো, ব্রিটিশ আমলে বাংলায় দুটো শহর খুব সুন্দর করে গড়ে উঠেছিল। এক হলো কুচবিহার, আর হলো খুলনা। খুলনার কথা উঠলে তোমার ভাবির চোখ ছলছল করে ওঠে।

খসরু ভাই-ভাবি, হয়ে গেলেন মামা শ্বশুর-শাশুড়ি। সুন্দরী ভাগ্নীর জন্য এমন ভালো পাত্র আর হাতের কাছে ছিল না! চাইলে ইউরোপ-আমেরিকায় থাকা বাঙালি পাত্রের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া যেত, জায়েদি ভালো মানুষ বলে কথা।

জায়েদি জানতেও চেয়েছিল, কী দেখে তাকে বেছেছিল তার মামা?
হিমি বলে, ভালো মানুষের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে, যে মানুষটা আমাকে কখনো কষ্ট দেবে না, দুঃখ দেবে না…!
জায়েদি বলে, তাই কী হয়! দুঃখ-কষ্ট ছাড়া জীবন হয়? যাবৎ জীবন তাবৎ সমস্যা, যতক্ষণ জীবন ততক্ষণ জীবন যন্ত্রণা, তাই না?
– তাহলে সুখ বলে কিছু নেই?
-না নেই, যা আছে, তা হলো আনন্দ, মানো তুমি?
-দুরো আমি এসব কথা বুঝি না, কী শক্ত শক্ত কথা, বাপরে বাপ!
-জানো, সুন্দরীরা যেদিন আয়নার সামনে দাঁড়ায়, আর বুঝতে পারে, আরে আমি তো সুন্দর, সেদিন থেকে তাদের হয়ে যায়!
-কী হয়ে যায়?
-মানে আর কিছু হয় না, মানে নিশ্চিত হয়ে যায়, আমি সুন্দর, এটা হয়ে গেলে, আর কিছু করার থাকে বলো?
-আমি বুঝি আয়নার সামনে পড়ে থাকি?

ঘরে একটা ভালো আয়না নেই, ড্রেসিংটেবিলও নেই। হিমি এক আশ্চর্য মেয়ে! এই সময়ে এমন মেয়ে কি একটাও পাওয়া যাবে! সত্যি তো এত সুন্দর মেয়ে সে, কিন্তু কসমেটিক্স, সাজসজ্জার কোনো কিছুর প্রতি কোনোমাত্র টান নেই। কোনোদিন এটা দাও, ওটা আনো করে না! কেন করে না? রাগলে চুপ করে থাকে। কোনোদিন চিৎকার করতে শোনে নি। ওর জন্য কেমন একটা সমীহ তৈরি হয়েছে জায়েদির। হিমিকে সে ভয় পায় না, আবার ভালোবাসা জিনিসটা তার আসে না। কোনোদিন কোনো মেয়ের জন্য পাগল হয় নি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দুয়েকজনকে দেখতে ভালো লেগেছে – সে পর্যন্তই। তাহলে হিমির প্রতি কী কাজ করে? ভরসা। হিমিকে সে ভরসা করে। সংসারে ভরসাই কি তাহলে আসল ভালোবাসা?

হিমির পছন্দের কেবল একটা জিনিস সে বের করতে পেরেছে- আইসক্রিম। আর কোনো কিছু নিয়ে হিমির কোনো বিলাস নেই। বাসায় আইসক্রিম নিয়ে গেলে, কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব চলে আসে, রিমি আর হিমির আইসক্রিম খাওয়ার দৃশ্যই জায়েদির সংসার জীবনের একমাত্র বিলাসী সুখ। আজ অব্দি কক্সবাজারে একবার বেড়াতে গিয়েছিল, তাও বিয়ের একবছর পর। রিমিটাও পাঁচে পড়ে গেল, এর ভেতরে কোথাও যাওয়া হয় নি। রিমিকে সেন্ট পলসে আর বেশি দিন রাখা তো যাবে না, সেখানে মাত্র তিন বছর পড়া যায়। এরপর নতুন স্কুল দেখতে হবে।

অনেক আগে মনোয়ার ভাইয়ের একটা কথা প্রায়ই ফিরে আসে, ছেলেমেয়েদের কখনো বাজে স্কুলে দেবে না, ভালো স্কুলে দেবে, ভালো স্কুল মানে, যে কটা নাম করা স্কুল – অবশ্য সেগুলি উন্নতমানের কোচিং সেন্টার! ভালো স্কুল, বা বাচ্চাদের স্কুলিং বিষয়টা তো উঠেই গেছে, কোথাও কিছু শেখার জন্য কেউ টান দিতে পারে না!… কী যে হবে আমাদের!… আমরাই বা কী করতে পারলাম বলো? আমরা তো সব বিদেশে ভাগলাম, আমাদের জেনারেশানের বড় একটা অংশ দেশে নেই। নিজের বন্ধুবান্ধবদের দিকেই দেখো না- অর্ধেকের বেশি লোক আমেরিকা, নয় কানাডা, নয় অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। আমি গেলে যেতাম জার্মানি, কিন্তু ওই খটোমোট ভাষাটা শিখতে ইচ্ছা করে না, বাংলার চেয়ে মিষ্টি ভাষা ফেলে কোন আক্কেলে জার্মান শিখব বলো! হাঃ হাঃ হাঃ, তাতে কী! বাংলাটাও কোনোমতে চালাই, ইংরেজিতে খাবি খাই, কেটে গেল একটা জীবন, কী বলো জায়েদি?… তা কেটে গেল, কিন্তু রক্তও বের হলো অনেক!

সেদিন হো হো করে হেসেছিল সবাই।
-নিজের বিপর্যয়, দুর্ভাগ্য নিয়ে হাসার ক্ষমতাই আসলে মানুষের চূড়ান্ত ক্ষমতা।
মনোয়ার ভাই হাসির শেষে কথাটা গুঁজে দিয়েছিলেন। বহুদিন মনোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা নেই। সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করবেন বলে সেই যে চট্টগ্রাম গেলেন, আর যোগাযোগ নেই। এখন এই সময়ে কেমন আছেন, কোথায় আছেন কে জানে।
জায়েদির একবার ইচ্ছা হয় মনোয়ার ভাইয়ের খোঁজ নিতে। মনোয়ার ইব্রাহিম, শাপলাপুর, মহেশখালী – এই ঠিকানায় নাকি একটা চিঠি লিখলেই চলে যাবে, তিনি পেয়ে যাবেন। এটুকুতেই হঠাৎ মনে সাড়া পড়ে।

সেই যে বলেছিলেন, দেখছই তো জানার্লিজম ইজ ডেড, কারণ, পলেটিক্স ইজ ডেড। জনগণের অধিকার পাওয়ার রাজনীতি নতুন করে শুরু করতে না পারলে আর কোনোদিন জানার্লিজম জানার্লিজম হয়ে উঠবে না।

তাহলে বিদেশে?
দুরো মিয়া! আমগো হয়ত এখন নুন আনতে পান্তা ফুরায় না, কিন্তু থালাটা কিন্তু বার বার চুরি হয়ে যাচ্ছে!… আমি ইব্রাহিম মোল্লার পোলা, আবার গভীর সমুদ্রে চলে যাবো, মাছ ধরার কাজ না করলেও মাছ ধরার ব্যবসা করব, শহরে এসে ভদ্র হতে গিয়ে জীবনটাই আর তৈরি করা গেল না, এর চেয়ে নিজের এলাকায় থাকতাম, আর জেলেমাঝিদের নিয়ে এলাকা উন্নত করার কথা ভাবতাম… অবশ্য মনে হয়, সেখানে দল-পার্টির পান্ডারা কী রকম বাগড়া দিতই, তো ঢুকেই যেতাম কোনো দলে লীগে পার্টিতে, তাও এই শহুরে পয়েন্টলেস জীবনের চেয়ে ভালো হতো। কিছু একটা হতো। এই শহরে এসে স্রেফ নিজের গ্রাসাচ্ছাদন আর স্ট্যাটাস মেইনটেইন করা ছাড়া আর কী করলাম বলো তো? ছেলেমেয়ের পড়ালেখা? সে আমি মহেশখালীতে থেকে পাঠিয়ে দিতে পারতাম, ঢাকা কি দার্জিলিংয়ে, না হলে ক্যাডেট কলেজে, করতেই পারতাম। করলাম না তো। জীবনে কোনো বিন্দু তৈরি করতে পারলাম না, যা দিয়ে নিজেকে কোনো পরিধিতে পেতে পারি। সাংবাদিক হওয়ার আগেই সাংবাদিকতাটা চোখের সামনে মরে গেল। পত্রিকায় কাজ করলেই তো আর সাংবাদিক হওয়া যায় না।

সেদিন আড্ডার টেবিলে হতাশার অদৃশ্য কালি ঢেলে দিয়ে মদছাড়া মাতালের মতো টলতে টলতে চলে গিয়েছিলেন মনোয়ার ইব্রাহিম।

সেই সন্ধ্যাটার কথা জায়েদির অনেক দিন পর জীবন্ত হয়। আসলেই তো কী করতে পেরেছে সে এখানে? কী করছে সে এখানে? অন্যরা যারা করতে পেরেছে তা বাড়ি গাড়ি সম্পত্তি, আর টাকা, কিন্তু সে? এভাবে ঠুলি পরে খেটে যাবে, সব কিছু চোখের সামনে ঘটতে দেখে, প্রত্যেকটা ঘটনার ভেতরের কথা সবাই তারা জানে, কিন্তু কেউ তা সামনে আনছে না, আনবে না, সেই সব নোংরা উগরে দিলে শহরটা আর কতটাই-বা আর নোংরা হতো?

হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে।
জায়েদি দেখে অচেনা নম্বর।
-হ্যালো, জায়েদি?
-জি বলছি।
-আমি মনোয়ার ভাই বলছি, মনোয়ার ইব্রাহিম। চিনতে পেরেছো?
জায়েদি মুখে কিছুক্ষণের জন্য কোনো কথা তৈরি হয় না।
ওপাশ থেকে তিন চার বার হ্যালো হ্যালো শুনে, সে বলে, আপনাকে কি ভোলা সম্ভব!
-যাক। তা কেমন আছো?
-কথাটা দেখা করে বলি?
-তা বলতে পারো, আমি মহেশখালীতে নেই। ফের ঢাকা শহরে ফিরে এসেছি। হাইরা গেলাম, বুঝলা!
জায়েদির চোখে পড়ে, সামনে দাঁড়িয়ে আয়েশ করে সিগারেট টানতে থাকা লোকটা শেষ টান দিয়ে সিগারেটটা তখন ফেলে দিয়ে পায়ের তলায় ফেলে দিয়ে আচ্ছামতো পিষে দিচ্ছে।

তারিফ, ঘুড়ি ও একটি হলুদ স্লাগ
লুনা রাহনুমা

জ তারিফের মনটা খুব ভালো। বাংলাদেশ থেকে মজনু মামা ওর জন্য একটা নতুন ঘুড়ি পাঠিয়েছে। গতমাসে বার্মিংহামের একজন বাঙালি বাংলাদেশে গিয়েছিলো ভীষণ এক জরুরি কাজে। তার কাছে মামা তারিফের পছন্দের খাবার- ম্যাংগো বার, শুকনো ছোলাভাজা, মুরালি, বাখরখানি, পেয়ারা সন্দেশ আর একটা ঘুড়ি পাঠিয়েছে। সবগুলো উপহারের ভেতর ঘুড়িটি পেয়ে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে তারিফ। আগে প্রতিবছরই ওরা বাংলাদেশে যেত সামারে, স্কুল ছুটির সময়। এই বছর যেতে পারেনি। করোনা ভাইরাস নামে নাকি কি একটা অসুখ হয়েছে এই পৃথিবীর। তাই এখন কেউ কোথাও যেতে পারে না।

তারিফের স্কুল বন্ধ আছে সেই মার্চ মাস থেকে। এখন আগস্টের মাঝামাঝি। ওর দশ বছরের জীবনে এতদিন বাড়িতে আটকে থাকার মতো ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এটা একটা বিশেষ ঘটনা নাকি দুর্ঘটনা! তারিফ এখনো শিওর না। তবে সময়টা “অঘটন-ঘটন-পটিয়সী!” আচ্ছা এই কঠিন শব্দটি ওর মাথায় এলো কি করে? অবশ্য মাথায় এলেও নিজের মুখে সে কিছুতেই উচ্চারণ করতে পারবেনা এই শব্দ। অনেক্ষণ মাথার চুল টেনে ধরে রেখেও মনে পড়লোনা শব্দটি কার মুখে শুনেছিলো তারিফ।

যাই হোক, বাংলাদেশ থেকে আসা সাদাকালো ডোরা কাটা ছাপের ঘুড়িটির গায়ে নাক লাগিয়ে গন্ধ শুঁকলো তারিফ বেশ কয়েকবার। মজনু মামার গায়ের গন্ধ পাচ্ছে যেন। বাংলাদেশে গেলে মজনু মামা যখনই তারিফকে ঘাড়ে করে এখানে সেখানে নিয়ে যেতেন, মামার গায়ের ঘামের গন্ধ খুব খারাপ লাগতো তারিফের। নিজের নাক আঙ্গুল দিয়ে টিপে ধরে থাকতো যতক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে না আসে। কিন্তু আশ্চর্য কথা, আজ ঘুড়ির গায়ে মজনু মামার ঘামের গন্ধটি খুব ভালো লাগছে তারিফের। মজনু মামা নিজে তারিফকে ঘুড়ি উড়ানো শিখিয়েছে। বার্মিংহামে ওদের বাড়ির পেছনেও বেশ বড় বাগান আছে। তারিফ বাগানে গিয়ে ঘুড়িটিকে নিজে নিজে উড়ানোর চেষ্টা করলো কয়েকবার। কিন্তু কিছুতেই সেটাকে বাতাসে ভাসাতে পারলো না কয়েক সেকেন্ডের জন্যও। হাত থেকে ছেড়ে দিলেই ধপ করে পড়ে যাচ্ছে ঘুড়িটি। হতাশ মনে নিজের ঘরে গিয়ে ঘুড়িটাকে খাটের পাশের নীল দেয়ালের পিনবোর্ডে আটকে রাখলো একটা আলপিন দিয়ে। খাটের উপর শুয়ে থাকলে ঘুড়িটি এখন ওর ঠিক চোখের সামনে থাকবে। তারিফ খাটে শুয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ঘুড়িটির দিকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে তার আকৃতি, রং, লেজের পাতলা ফিনফিনে কাগজটুকু ঘরের ভেতর জানালা দিয়ে আসা বাতাসে ঝিরঝির কাঁপতে থাকে।

তারিফ ওর বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। তারা বার্মিংহামে থাকে। মা বলেছে তারিফ বার্মিংহামের কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে জন্মেছে। ওদের বাসাটি যে রাস্তায় সেখানে মোট আঠারোটি বাড়ি রয়েছে। নয়টি করে রাস্তার দুপাশে মোট আঠারোটি। তারিফরা ছাড়া বাকি সতেরোটি বাড়ির মানুষই বয়স্ক। হয় তারা খুব বুড়ো হয়ে গিয়েছেন কিংবা বুড়ো হতে চার কি পাঁচ বছর বাকি আছে মাত্র। তারিফ বিবিসি ওয়ানের নিউজে শুনেছে, করোনা নামের অসুখটি বুড়ো মানুষদের একদম দেখতে পারে না। নানু দাদুদের বয়সী মানুষদের শরীরে ঢুকে ভেতরের সবকিছু কামড়ে দেয় দাঁত দিয়ে। একদম মরে যায় তারা। এই ভয়েই তো ওদের রাস্তার কেউ বাইরে বের হয়না। দোতলায় স্টাডি রুমের জানালায় বসে তারিফ তাকিয়ে থাকে মাঝেমাঝেই। কয়জন মানুষ দেখলো তার একটা হিসাব রাখছে সে একটা খাতায়। সারাদিনে হয়তো তিনজন কি পাঁচজন মানুষ দেখা যায়।

বাড়িতে বসে সারাদিন তারিফ টিভি দেখে, গেমস খেলে পিএস-৪, ছবি আঁকে, জানালায় বসে মানুষ দেখার জন্য অপেক্ষা করে। আর সব চেয়ে বেশি অপেক্ষা কখন বিকেল পাঁচটা বাজবে। কারণ ওর বাবা ও মা দুজনেই বাসা থেকে অফিস করছে এখন। তারা ল্যাপটপ বন্ধ করে বিকেল পাঁচটায়। তখন তারিফ ওর মুখের ছিপি খুলে দেয়। কত গল্প যে করতে পারে! কিন্তু সবচেয়ে প্রিয় সময় হলো সন্ধ্যা হয়ে যাবার পর। কারণ রাতের খাবারের পর তারিফ ওর মায়ের সাথে বাগানে যায়। স্লাগ খুঁজতে।

তারিফের মা গাছ ভীষণ ভালোবাসে। প্রতিবছর সামারে অনেকরকম শাকসবজি ও ফুলের গাছ লাগান তিনি। বিকেলে গাছে পানি দেন নিজের হাতে আর সন্ধ্যায় ছেলেকে নিয়ে স্লাগ নিধনের অভিযানে নামেন। স্লাগ বাংলাদেশে দেখা যায় না। বিলাতের মাটিতে গাছের সবচেয়ে বড় শত্রু এই স্লাগ। এরা শামুকের মামাতো চাচাতো ভাই হবে। শুধু শামুকের মতো তাদের গায়ে কোনো শক্ত কোট পরানো থাকে না। খোলস ছাড়া এই ছোট্ট পোকার গায়ের রংটিও শামুকের মতোই কিছুটা। বাদামি, সবুজের কাছে, কোনটা আবার কালচেও হয়। তারা খুব আস্তে হাঁটে। উড়তে পারে না। মানুষকে কামড়ায়ও না। কিন্তু তারিফের মা বলেছে, স্লাগ গাছের এনিমি। কারণ তারা মায়ের কষ্ট করে লাগানো গাছ খেয়ে ফেলে। তাই তারিফের কাজ ওদেরকে দেখলেই মেরে ফেলা।

প্রতিদিনের মতো আজকেও তারিফ বিকাল পাঁচটা বাজার সাথে সাথেই হৈ করে উঠলো। এমনিতে সে খুব চুপচাপ ছেলে। কিন্তু পাঁচটা বাজতেই একটা চিৎকার দিয়ে ফেলে। খুশির প্রকাশ। বাবা মায়ের সাথে গল্প, ঘর গুছানো, সন্ধ্যা সাতটায় রাতের খাবার শেষ করে হালকা অন্ধকার নামলে তারিফ ওর মায়ের সাথে বাগানে যায়। মা গাছে পানি দেয়। আর তারিফের হাতে একটি দুই ব্যাটারির ছোট টর্চ লাইট। ঘাসের উপর আর গাছের গোড়ায় টর্চ ফেলে স্লাগ খোঁজে তারিফ। স্লাগ দেখতে পেলেই পকেট থেকে লবণের বোতলটি বের করে স্লাগের গায়ের উপর উপুড় করে একটুখানি লবন ঢেলে দিতে হয়। তুলতুলে নরম স্লাগগুলো লবন সহ্য করতে পারে না। একদম গলে যায়। স্লাগ মারা তারিফের খুব প্রিয় একটা কাজ। তাই স্লাগ দেখার সাথে সাথে তারিফ খুব উত্তেজিত হয়ে যায়। “মা, মা দেখো, এইটা কত বিরাট!”

আজ সন্ধ্যায় মনটা অন্যদিনের চেয়ে বেশি ভালো তারিফের। এক, মজনু মামার পাঠানো ঘুড়িটা পেয়েছে। দুই, অনলাইনে বাবা একটি নতুন গেইম কিনেছিলো তারিফের জন্য। সেটি পোস্টে এসেছে আজ। কাল সকালে খেলতে পারবে তারিফ। দু দুটি মন ভালো করা ঘটনার সাথে আরেকটি আশ্চর্য ঘটনাও ঘটলো আজকেই। সন্ধ্যাবেলায়। তারিফ যখন টর্চ হাতে বাগানে স্লাগ খুঁজছিলো, প্লে-হাউজের পাশে বেগুনি আর গোলাপি ফিউশা ফুলের ঝোপ গাছের নিচে টর্চের আলো পড়তেই কিছু একটা ঠিকরে উঠলো যেন মাটিতে। তারিফ হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসলো। গাছের খুব কাছে টর্চটি নিয়ে চকচকে বস্তুটির উপর আলো ফেললো। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা কি? এটা তো মনে হচ্ছে নড়াচড়া করছে। আরে, এটা তো দেখি খুব আস্তে আস্তে হেঁটে সামনের দিকে যাচ্ছে। দেখে তো একটা স্লাগই মনে হচ্ছে। কিন্তু স্লাগ তো হলুদ হয়না! একেবারে উজ্জ্বল হলুদ রঙের স্লাগের মতো দেখতে প্রাণীটি অন্ধকারে টর্চের আলোয় আকাশের চাঁদের মতো জ্বলে আছে যেন। পকেটে লবণের বোতলে হাত রেখে চিন্তায় পড়ে গেলো তারিফ। কিছুতেই মন সায় দিচ্ছে না এই অত্যাশ্চর্য স্লাগটির গায়ে লবন ঢালতে।

তারিফের মাথায় একটি বুদ্ধি এলো। মাকে লুকিয়ে চুপিচুপি সে রান্নাঘরে গেলো। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলো জিনিসটা। শেষ হয়ে যাওয়া আচারের একটি কাছের বোতলট। মা ধুয়ে শুকিয়ে রেখেছে। তারিফ সেই কাচের বোতলটি নিয়ে বাগানে গেলো। তারপর সাবধানে হলুদ রঙের স্লাগটিকে ওর ভেতরে ভরে ফেললো। এইবার গাছের দুটি কচি পাতা আর একটুকরো গাজর ফেলে দিলো বোতলের ভেতর। স্লাগের খাবার। আবার পা টিপেটিপে সাবধানে বোতলটি নিয়ে ওর শোবার ঘরে বুকশেল্ফের তিন নাম্বার তাকে ডাইরি অফ উইম্পি কিডস সেটের পিছনে লুকিয়ে রাখলো। তারিফের বাবা বাড়িতে কুকুর, বিড়াল, গিনিপিগ, ইঁদুর কিছুই পালতে পছন্দ করে না। মনে মনে তারিফের খুব শখ ছিল একটি পেট রাখার। আজ মনে হয় সেই শখটি পূরণ হলো। যদিও হলুদ স্লাগটিকে লুকিয়ে রাখতে হবে। কারণ বাবা দেখলে সর্বনাশ। নিজের হাতেই লবন দিয়ে মেরে ফেলতে পারেন তারিফের জীবনের প্রথম পেটটিকে। ভাবতেই ওর ছোট্ট বুকটা ভারী হয়ে গেলো ভীষণ।

আজ রাতে ওর যেন ঘুমুতে যাবার ভীষণ তাড়া। মা বলার আগেই সে হিসু করে, দাঁত ব্রাশ করে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। খাটে শুয়ে হালকা আলোয় নীল দেয়ালের পিনবোর্ডে সাঁটা মজনু মামার পাঠানো ঘুড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু মন পড়ে আছে ডান দিকে দরোজার পাশের বুক শেলফে। ডাইরি অফ উইম্পি কিডস সেটের পিছনে লুকিয়ে রাখা কাচের বোতলটিতে। যেখানে এই মুহূর্তে গাজর চিবোচ্ছে হলুদ রঙের স্লাগটি। রূপকথার রাজপুত্রের প্রাণ ভোমরা যেমন বোতলে বন্দী ছিলো হাজার বছর ধরে, তেমনি তারিফের প্রাণটিও ছটফট করছে হলুদ স্লাগটিকে দেখার জন্য।

মা এসে তারিফের কপালে একটি চুমু দিয়ে লাইট অফ করে দিলো। মা রুমের দরজা টেনে বন্ধ করার পর কয়েকমিনিট অপেক্ষা করে তারিফ চোখ খুললো। ওর রুম এখন অন্ধকার থাকার কথা। অথচ পুরো ঘরে কেমন ডিম লাইটের মতো ঘোলা হলদে একটি আলো জ্বলছে। তারিফ বুঝতে পারে। এটা ওর পেট স্লাগের গা থেকে আসছে। পা টিপে টিপে বুক শেল্ফের কাছে গিয়ে কাচের বোতলটি হাতে নিলো। বোতলের ভেতর স্লাগটি মনে হচ্ছে বেশ আরামেই আছে। হৃষ্টপুষ্ট শরীরটি হালকা উঠানাম করছে। মনে হয় খাচ্ছে সে। বোতল আর স্লাগটি নিয়ে তারিফ বিছানায় গিয়ে বসলো। হলুদ স্লাগটিকে মুখের খুব কাছে এনে দেখছে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো স্লাগটির দুটি চোখ রয়েছে। সেই চোখ দুটিও তারিফকে দেখছে। মজা করে তারিফ বললো, “এই তোমার নাম কি?”

মিহি চিনচিনে গলায় স্লাগটি বলে উঠলো, “আমার কোনো নাম নেই। তুমি আমাকে যে কোন নামে ডাকতে পারো।”
ভয় পেয়ে গিয়েছিলো তারিফ একটুখানি। স্লাগটি কি সত্যি কথা বলছে ওর সাথে? পরীক্ষা করার জন্য বললো, “আমার বয়স দশ, তোমার বয়স কত?”
আবারো সেই মিহি চিনচিনে গলায় উত্তর এলো, “আমার বয়স তিপ্পান্ন বছর।”

এইটুকু স্লাগের বয়স তিপ্পান্ন বছর শুনে এতো আশ্চর্য হলো তারিফ যে একটু আগের ভয়ের কথা ভুলেই গেলো।

“আচ্ছা, তোমার বাবা মা কোথায়?”
“আমি জানি না। আমার কেউ নেই। আমরা সবাই একলা একলা চলি। কারণ আমাদের একেকজনের পছন্দ একেকরকম। কেউ ফলের গাছ পছন্দ করে, কেউ সবজি খেতে পছন্দ করে, কারো টমেটো গাছ বেশি প্রিয়। বেশিরভাগ স্লাগের লেটুসগাছ মোস্ট ফেভারিট খাবার।”
“তোমার কি খেতে বেশি ভালো লাগে?”
“আমার পছন্দ ফুলের গাছ। তোমার মায়ের বাগানের অনেকগুলো ফুল গাছের চারার কচি পাতা আমি খেয়েছি অনেকদিন। দারুন সুস্বাদু পাতা। তোমার এই গাজরের চেয়ে হাজার গুন্ ভালো।”
মা শুনলে এইটাকে এখন যে কি করতো সেটা ভেবে একটু আঁতকে উঠলো তারিফ। স্লাগটিকে অবশ্য সেটা না জানানোর সিদ্ধান্ত নিলো। বরং ওর সম্পর্কে আরেকটু জানা যাক। বললো, “আচ্ছা তোমার মামা আছে? আমার মজনু মামার মতো?”
“না। আমার কেউ নেই।”
“মানে কি? তুমি যখন ছোট ছিলে তখন থেকেই একা?”
“হুম”, স্লাগটি তারিফের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো মনে হলো, “আমি আমার বাবা-মা কে, তাও জানি না।”
“একাই বড় হলে তারমানে?”
“তাই তো জানি।”
“আজ থেকে তুমি আর একা নও। আমাকে তোমার বন্ধু ভাবতে পারো। আমি তোমাকে একটি নাম দিতে চাই।”
কি নাম দেয়া যায় ভাবলো তারিফ বেশ কিছুক্ষণ। তারপর লাফিয়ে বললো, “পেয়েছি। আমি তোমার নাম দিলাম চিনি গুঁড়া!”
“এ আবার কেমন নাম বাবা? গুঁড়া গুঁড়া! আমি তো আর পিঁপড়া নই যে চিনির জন্য পাগল হবো!”
“তবুও তোমার নাম চিনি গুঁড়া। আমি যখন বাংলাদেশে যাই, আমার কাকিমা নিজের হাতে আমার জন্য জাউ ভাত রান্না করেন চিনি গুঁড়া চাল দিয়ে। এমন সুস্বাদ খাবার পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর নেই।”
“সে তোমার ইচ্ছে। যা খুশি ডাকতে পারো। নাম নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই বাপু।”
তারিফের জীবনে আজ সত্যি এমন বিশেষ একটি দিন আসবে, সে ভাবতেও পারেনি কোনোদিন। এতোদিনে মনের সব কথা খুলে বলার মতো একজন সঙ্গী পেয়েছে সে। বলে, “আসলে এতগুলো দিন বাড়িতে বসে বসে খুব খারাপ লাগছে আমার। কিন্তু কি করবো বলো। গোটা পৃথিবীরই যে কঠিন অসুখ! কেউই জানে না কিভাবে এই রোগ সারবে।”
“অঘটন-ঘটন-পটিয়সী। অসম্ভব ঘটনা ঘটাতে পটু এই করোনা ভাইরাস।”
আশ্চর্য হয়ে গেলো তারিফ, “এই শব্দটিও তুমি জানো? আবার এর অর্থও জানো!”
কথা বলেনা চিনি গুঁড়া। কাচের বোতলের ভেতর দেয়া গাজরের সবকটি টুকরো খেয়ে শেষ করেছে সে। ওর শরীরটি এখন আস্তে আস্তে করে টিকটিকির ডিমের মতো গোল হয়ে যাচ্ছে যেন। তার গা থেকে আসা হলুদ আলোর আভা কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
তারিফ জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা তুমি কি এখন ঘুমুবে? গোল হয়ে যাচ্ছ যে?”
“ঘুমাবো না। তোমাকে একটি গল্প দেখাবো।”
“বাহ্, তুমি গল্পও জানো দেখছি। আগে আমার বাবা আমাকে অনেক গল্প বলতো। গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগে।”
“আমার গল্প তুমি শুনবে আবার সাথে সাথে দেখতেও পারবে।”
তারিফ তাকিয়ে দেখে চিনি গুঁড়ার গোল বলের মতো শরীরটি এবার চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। অনেকটা টিভি স্ক্রিনের মতো। চোখের চশমাটি আবার মুছে নিয়ে বোতলের ভেতর স্লাগ-স্ক্রিনের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইলো তারিফ। ধীরে ধীরে একটি মুখের অবয়ব ফুটে উঠছে যেন সেখানে। রোগা, হার লিকলিকে একটি বালকের মুখ। বয়স এগারো বারো হবে। অপুষ্টির কারণে বয়স আরো কম মনে হয় যদিও। মুখের আদল বোতলে পরিষ্কার হতেই তারিফ চমকে উঠলো। এই মুখটি ওর চেনা।
ফিসফিস করে বলে উঠলো, “কাদির মিয়া!”

চিনি গুঁড়া কিছু বলে না। তারিফ স্ক্রিনে দেখছে কাদির মিয়া একটি পরিচিত মাঠে খুব দৌড়াচ্ছে। মাঠের শেষ মাথা থেকে কুড়িয়ে আনলো একটি কাটা ঘুড়ি। ঘুড়িটি হাতে নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে মাঠের আরেক মাথায়। সেখানে খুব সুন্দর জামা কাপড় পরা একটি বালকের দিকে এগিয়ে দিলো ঘুড়িটি। তারিফ চমকে উঠলো খুব, দ্বিতীয়বারের মতো। কেমন যেন বেশি ভয় লাগছে ওর এখন।

তারিফের মনে পড়ে, দুই বছর আগে ওরা বাংলাদেশে গিয়েছিলো যখন সেই সময়ের কথা। তারিফের পূর্বপুরুষ দিনাজপুরের জমিদার ছিলেন। এখন জমিদারি না থাকলেও তারিফের দাদা চৌধুরী শামসুদ্দৌলার ভেতর জমিদারদের রাশভারী মেজাজটি রয়ে গিয়েছে। প্রতিবছরের মতো সেবারও তারিফের সাথে খেলা করার জন্য গ্রামের এতিমখানা থেকে একটি ছেলেকে নিয়ে আসা হয়। তার নাম ছিলো কাদির মিয়া। অন্যসব ছেলেদের মতো কাদির মিয়াকেও কঠিন করে বলে দেয়া হয়েছিল, সে যেন জমিদারের একমাত্র নাতিটির সাথে বেশি মাখামাখি করার চেষ্টা না করে। শধু ফাই ফরমাস খাটবে। পাশে পাশে থাকবে।কিন্তু কয়েক দিনের ভেতর তারিফ আর কাদিরের ভেতর খুব ভালো বন্ধুত্ত্ব হয়ে গেলো। তারিফের বেশিরভাগ কথা ইংরেজিতে হলেও কাদির কিভাবে যেন সব কথাই বুঝতে পারতো। দিন রাত কথা বলতো ওরা দুইজন।

মুখ থেকে চশমাটি খুলে তারিফ নিজের চোখ দুটো কচলে নিলো একটু। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বোতলের ভেতর স্ক্রিনের দিকে। স্ক্রিনে কাদির একটি সাদাকালো ডোরাকাটা ছাপের ঘুড়ি তারিফের হাতে দিয়ে বললো,
“সার, চলেন আপনেরে আমাদের বাগানের নয়া ফুল দেখাই। এমন সুন্দর রং এই ফুলের। বেগুনি আর গোলাপি এই দুই রঙের এক ফুল। ফুলের মাঝখানেরটুক গোলাপি। তার চারপাশে কেটকেটা বেগুনি রঙের ঝুমকার মতো ফুল। আবার লম্বা শুঁড় আছে ফুলের মাইঝখানে। মালিসাব কই থিকা যে পায় এইসব গাছ।”
“তুমি ফুল পছন্দ করো কাদির? আমি তোমাকে বার্মিংহামে আমাদের বাগানের ফুলের ছবি দেখাবো। ওসব ফুল তুমি কোনোদিন দেখো নাই।”
“জি আচ্ছা। দেখাবেন। কিন্তু বাগানের ভিতর খুব সাবধানে হাঁটবেন। বাগানের ঐ দিকে সাপ আছে শুনছি।”
“সাপ?” ভয় পেয়েছিলো তারিফ। “আমি দেখতে চাই না ঐ ফুল।”
ব্যঙ্গ করে হাসে কাদির। “আপনি এতো ভীতু কেন? তারা কিছু করে না। খালি খেয়াল রাখবেন তাদের লেজে যেন পা না দেন। লেজে পা দিলেই সাপ খুব ক্ষেপে যায়। সাংঘাতিক বিষদাঁত আছে, তারা কিন্তু অঘটন-ঘটন-পটিয়সী।”
তারিফের মনে পড়েছে এতক্ষণে। অঘটন-ঘটন-পটিয়সী শব্দটি প্রথম সে কাদিরের মুখেই শুনেছিলো। যদিও শব্দটা পরিষ্কার করে বলতে পারছিলো না কাদির। পরে বাবার মুখেও শব্দটা শুনেছিলো কয়েকবার। এখন মনে পড়েছে।

তারিফ মাথা থেকে চিন্তা সরিয়ে মনোযোগ দেয় স্ক্রিনের উপর। সেখানে তারিফ আর কাদির হেঁটে যাচ্ছে বাগানের নানারকম গাছের ভেতর দিয়ে। তারিফ আসলে কোনো গাছ দেখছেনা। দুইহাত নেড়ে সামান্য বাংলা আর বেশি ইংরেজিতে ওর স্কুলের বন্ধুদের মজার গল্প শোনাচ্ছে কাদিরকে। কাদিরের চোখ আটকে আছে মাটির কাছাকাছি একটি হলুদ পাতার জংলা গাছের গোড়ায়।

তারিফ খেয়াল করলো, হলুদ পাতার ভেতর থেকে ফণা উঁচিয়ে আছে কী একটা! ওটা কী? সাপ!
ভয়ে শিউরে উঠে তারিফ। বাগানের যেই পাশে তারিফ হাঁটছে, সাপটি ঠিক ঐপাশেই তো। কিন্তু স্ক্রিনের ভেতর তারিফ সেদিকে তাকায়না কেন! আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে আর গল্প বলে যাচ্ছে মগ্নভাবে। মাটিতে জিভ বের করে বসে থাকা মৃত্যুর দিকে চোখ যায়নি ওর। আর একটি পা ফেললেই সাপের লেজের উপর পা পড়বে। আর সাপটিও প্রস্তুত হয়েই আছে যেন। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তারপর তারিফ পা তুলেছে ঠিকই। কিন্তু তারিফের পা মাটি কিংবা সাপের লেজ অথবা সাপের বিষাক্ত ছোবল কোনোটাই স্পর্শ করার আগে প্রচন্ড জোরে একটি ধাক্কা এসে লাগে ওর গায়ে।

এতদিন ঘটনাটির এইটুকু তারিফের জানা ছিল। ঘটনার অপর অংশটুকু আজ দেখছে সে বোতলের ভেতর সাদা স্ক্রিনে।

সেদিন সন্ধ্যাবেলায় বাগানের নরম মাটিতে হাঁটছিলো ওরা দুইজন। বাতাসে ভেসে আসছিলো অজানা ফুলের মিষ্টি গন্ধ। তারিফ আর কাদির হাঁটছে বাগানের ভেতর। তারিফ দুইহাত নেড়ে নেড়ে কাদিরকে ওর বার্মিংহামের স্কুলের বন্ধুদের মজার গল্প বলছিলো। ঠিক সেই সময় তারিফ কিছু বুঝে উঠার আগে কাদির ওকে ধাক্কা দেয়। জোর ধাক্কার তাল সামলান না পেরে তারিফ বাগানের পাশে দেয়ালের উপর গিয়ে পড়ে। মাথায় খুব চোট লাগে ওর। ঐতো, সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে ঢলে পড়েছে।

তারিফের মেঝো চাচা সোহান চৌধুরী তখন কী প্রয়োজনে বাগানে উঁকি দিয়েছিলেন। দূর থেকে তিনি দেখে ফেলে এই দৃশ্য। কাদির ধাক্কা মারছে তারিফকে। সোহান চাচা ছুটে এসে কাদিরকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই এমন চড় থাপ্পড় মারতে লাগলেন যে কাদিরের নাক, কান, গাল, এমনকি চোখ থেকেও রক্ত ছিটকে পড়তে লাগলো। অর্ধাহারে অনাহারে বড় হওয়া এতিমখানার দুর্বল শরীরের ছেলে কাদির, সোহান চাচার এমন মারের আঘাত সহ্য করতে পারেনি। তিনদিনের মাথায় তার মৃত্যু হয় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে।

কাদিরের মৃত্যুর কথা অবশ্য তারিফকে কেউ জানায়নি। তারিফও কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। মনের ভেতর খুব অভিমান হয়েছিল তার। ওরা তো বন্ধু হয়েছিল! এরপর কাদিরকে আর দেখেনি তারিফ। দেড় মাসের ছুটি শেষে বাবা মায়ের সাথে আবার বার্মিংহামে চলে আসে।

দুইবছর পর বার্মিংহামে নিজের খাটে বসে আবার দেখা হলো কাদিরের সাথে। নিজের ঘরের হালকা আলোয় তারিফ দেখে সোহান চাচার পেশীবহুল বলিষ্ঠ হাতের মারের চোটে কাদিরের মুখের চামড়া ফেটে এক দলা রক্ত ছিটকে গিয়ে পড়লো তারিফের ঘরের নীল দেয়ালে।

স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ফেলে তারিফ। আর দেখতে চায় না এমন নিষ্ঠুরতা। কিন্তু, চোখের সামনে ঘরের নীল দেয়ালে পিনবোর্ডে লাগিয়ে রাখা সাদাকালো ছোপের ঘুড়িটির দিকে দৃষ্টি পড়তেই ওর গা জমে গেলো ভয়ে। ঘুড়িটির ঠিক মাঝখানে গিয়ে তীরের ফলার মতো ছিটকে পড়েছে সেখানে কাদিরের গায়ের লাল রক্তের কয়েকটি ছিটা!

তারিফ গা গুলিয়ে উঠছে এবার। সহ্য করতে পারছে না। প্যান্টের পকেট থেকে লবণের বোতলটি বের করে সবটুকু লবন ঢেলে দিলো ভেতরের স্লাগটির গায়ে। এক মিনিটের কম সময়ের ভেতর ধীরে ধীরে গলে গেল হলুদ রঙের অদ্ভুত স্লাগটি। “অঘটন-ঘটন-পটিয়সী,” গলে যেতে যেতে হলুদ স্লাগটি ধীরে ধীরে কালচে বাদামি রং ধারণ করছে। এখন স্লাগটিকে অন্য আর সব সাধারণ স্লাগের মতোই মনে হচ্ছে।

রাতের এমন সব কান্ড কারখানার পর স্বাভাবিকভাবেই পরদিন তারিফের ঘুম ভাঙতে অনেক দেরি হলো। অবশ্য দেরি হলেও ওকে কেউ ডাকেনি। কারণ পুরো পৃথিবীর এখন কোথাও যাবার তাড়া নেই। দুপুর পর্যন্ত ঘুমালেও কিছু যায় আসে না।

ঘুম ভেঙে তারিফ বিছানা থেকে নেমে ভয়ে ভয়ে দেয়ালের পিনবোর্ডে লাগানো মজনু মামার পাঠানো ঘুড়িটির কাছে গেলো। সাদা কালো ছাপের ঘুড়িটির বুকে এখন পরিষ্কার লেগে আছে কালির কলমের ছিটার মতো টকটকে রক্তের দাগ!

 

 

 

Share Now শেয়ার করুন