চারভুবনের বাংলা ছোটগল্প সিরিজ – ২ | মঈনুস সুলতান | শিল্পী নাজনীন | লাবনী আশরাফি

0
173

প্রায় সমস্ত পৃথিবী জুড়ে এই সময়ে কারা কোন ধরনের বাংলা ছোটগল্প লিখছেন? সেই গল্পগুলি কেমন? সমকালীন বাংলা ছোটগল্পের গতিপ্রকৃতির অনেকটাই পাঠকেরা আঁচ করতে পারবেন ভেবে তীরন্দাজ-এর এই বিশেষ আয়োজন – চার ভুবনের বাংলা ছোটগল্প সিরিজ। এর আগে সিরিজের প্রথম গল্পগুচ্ছে তিনটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। সেই গল্পগুলি লিখেছিলেন পূরবী বসু, হামীম কামরুল হক ও লুনা রাহনুমা। আজ প্রকাশিত হলো সিরিজের দ্বিতীয় গল্পগুচ্ছের তিনটি গল্প। লিখেছেন মঈনুস সুলতান, শিল্পী নাজনীন ও লাবনী আশরাফি। সবগুলি গল্পই অপ্রকাশিত গল্প। এর পরেই ধারাবাহিকভাবে আসছে সিরিজের তৃতীয় গুচ্ছগল্প। পড়ুন এবারের গল্প তিনটি তীরন্দাজ-এ।

ছোটগল্প

হাতপাখায় রেশমের এমব্রয়ডারি
মঈনুস সুলতান

মোটরবাইকে বসে মোর্শেদ ব্ল্যাকচেরি ব্র্যান্ডের এক চিমটে ট্যবাকো পাউচ থেকে বের করে। সে রোলিং পেপার দিয়ে তা প্যাচাতে প্যাচাতে আড় চোখে গেস্ট হাউসের চুনকাম করা ধবধবে সাদা দেয়ালের দিকে তাকায়। ওখানে তার হেলমেট পরা ছায়াকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক অশ্বারোহীর মতো দেখাচ্ছে। জংধরা টিনের বাহারি চালওয়ালা দোতলা বাড়িটি বোধ করি শত বছরের পুরানো। তার আঙিনায় কেয়ারি করা ফুলের বাগিচা- ছোট্ট একটি শাপলাফোঁটা গোলাকার পুকুর নিয়ে ছড়াচ্ছে ভাবগম্ভীর আভিজাত্য। বছর দুয়েক আগে বনেদি চা-করের এ বিরাট বসতবাড়ির আঙিনায় চাঁদোয়া খাটিয়ে সন্ধ্যাবেলা বসেছিলো রবীন্দ্র জয়ন্তীর জমকালো অনুষ্ঠান। তখন মোর্শেদের সুযোগ ঘটেছিলো, এ বাড়ির বাগানে শিরিষ গাছের বাঁধানো গোড়ায় বসে পূজাপর্বের চমৎকার কিছু সংগীত শোনার। আজ তাকে আসতে হয়েছে নিতান্ত হৃদয়ের তাগিদে। ভেবেছিলো, গতকালকের মতো আজও আরিয়া ‘মানবিক উন্নয়ন উদ্যোগ’ নামক এনজিও- যা কেবলমাত্র ‘উদ্যোগ’ বলে পরিচিত, তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বারান্দায় বসে চুপচাপ পড়বে ইংরেজি কোন পেপারব্যাক বই। কিন্তু আরিয়া অপ্রত্যাশিতভাবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আজ সকালবেলা এসে হাজির হয় নি।

যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করছে আরিয়া। সামারের দীর্ঘ ছুটিতে সে দেশে ফিরেছে। সিলেটে এসেছে সে গেল পরশু, তার বড়বোন মারিয়া সুলতানার সাথে। মারিয়া উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ে কনসালটেন্সি করে থাকেন। তিনি এসেছেন উদ্যোগের মাঠকর্মীদের সাথে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন তৈরির কলাকৌশল নিয়ে সপ্তাব্যাপী একটি কর্মশিবির পরিচালনা করতে। গতকাল মারিয়া উদ্যোগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মশিবিরের সূচনা করছেন। তার ছোটবোন আরিয়া বারান্দায় একটি বেতের চেয়ারে বসে চুপচাপ পড়ছিল সিলভিয়া প্লাথের লেখা উপন্যাস ‘বেল জার’।

মোর্শেদ উদ্যোগের শিশুশিক্ষা কর্মসূচিতে উপকরণ উন্নয়নের কাজ করছে বছর চারেক হলো। তার আঁকাজোকার হাত ভালো, শিশুশিক্ষার বইগুলোর ইলাস্ট্রেশনের কাজ নিয়ে তার ব্যস্ত সময় কাটছে। তাই সে মারিয়া সুলতানার কর্মশিবিরে যোগ দিতে পারে নি। একটি গ্রামের শিশুবিদ্যালয়ে কিছু ইলাস্ট্রেশনের ফিল্ড টেস্ট সেরে সে মোটরবাইক হাঁকিয়ে যথারীতি ফিরেছিল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। তখন আরিয়াকে বারান্দায় বই হাতে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গিয়ে হ্যালো বললে- তারা কথাবার্তা বলে পরিচিত হয় পরস্পরের সাথে।

মোটরবাইকের সিটে বসে বসে অপেক্ষা করতে মোর্শেদের বিরক্ত লাগে। মিনিট দশেক আগে সে দারোয়ানকে দিয়ে তার ভিজিটিং কার্ড ভেতরে পাঠিয়েছে। জেলা শহরে বনেদি এ চা-কর এর বিরাট চকমিলান বাড়িতে আরিয়া ও মারিয়া দিন কয়েকের জন্য উঠেছে । তাদের সাথে চা—কর পরিবারের যোগাযোগ দূর সম্পর্কে আত্মীয়তার। তো ঠোঁটে ট্যবাকোর রোল করা সিগ্রেট ঝুলিয়ে মোর্শেদ বাইকটি পার্ক করে হেঁটে আসে গেস্ট হাউসের দিকে। তখন চোখে পড়ে, লতানো ফুলে ছাওয়া বেলকনি থেকে তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে আরিয়া। চৌকিদার গেট খুলে তাকে বাগিচার মোরাম বিছানো পথ দিয়ে নিয়ে আসে দ্বিতল বাড়িটির গাড়ি-বারান্দায়। অতঃপর সে কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়ে বাঁশের চিকে রোদ ফেরানো প্রশস্ত বারান্দায়। গরুর গাড়ির চাকার শেইপে তৈরি বেতের ভারী সোফায় বসে মোর্শেদ রোল করা সিগ্রেটটি লাইট করে। মাঝবয়সি এক পরিচারিকা দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে।

বারান্দার ছাদ থেকে ঝুলানো পোড়ামাটির কতগুলো পাত্রে হরেক বর্ণের অর্কিডরাজি ছড়াচ্ছে প্রসন্নতা। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ের দেয়ালে লাগানো পর্বতী-হরিণের শিংগাল মাথাটিতে চিক গলে আসা আলো পড়ে কাচের চোখ দুটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। পরিচারিকা ট্রেতে পাইনেপোল জুস নিয়ে এসে নীরবে টিপয়ের ওপর রাখে। মোর্শেদ কাটগ্লাসে টলমল করা কোমল পানীয় চাখতে চাখতে গতকাল দুপুরে উদ্যোগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আরিয়ার সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাবে। গ্রাম থেকে ফিল্ড টেস্টিংয়ের কাজ সেরে সে ঘর্মাক্ত হয়ে ফিরেছিল কেন্দ্রে। বই পড়তে পড়তে বার দুয়েক চোখ তুলে আরিয়া তাকে অবলোকন করলে- মোর্শেদ মেয়েটিকে অবজ্ঞা করতে পারে না। সে-ও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করে। কুচকুচে কালো স্নাগলি স্ল্যাকসের সাথে ফুলেল ছাপার স্লিভলেস টপ পরা আরিয়া বই রেখে ফস্ করে একটি মার্লবরো ধরায়। তারপর ধোঁয়া ছেড়ে মৃদু হেসে বলে, ‘হাই, ইউ মাস্ট বি কামিং ব্যাক ফ্রম দি ফিল্ড।’

মোর্শেদ মাথা হেলিয়ে হ্যাঁ বাচক জবাব দিয়ে নিজেকে ইনট্রোডিউস করে। আরিয়া উঠে দাঁড়িয়ে পরিচিত হতে হতে তার মোটরবাইকের দিকে ইশারা দিয়ে মন্তব্য করে,‘ আই লাইক ইয়োর বাইক, রাফ, রাস্টি, রাগেড এন্ড স্পোর্টি।’
তার কাদামাটির দাগ লাগা বজরা গোছের হানড্রেড সিসিটির তারিফ শুনে একটু অবাক হয়ে মোর্শেদ রিয়েক্ট করে,‘ এ ভাঙ্গারোঙ্গা বাইকের কোন জিনিসটি ইন্টারেস্টিং ঠিক বুঝতে পারছি না…।’

আরিয়া এবার সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে বাড়িয়ে দেয় মার্লবরোর প্যাকেট। মোর্শেদ এক শলা সিগ্রেট তুলে নিতে গিয়ে ফের তাকে অবলোকন করে। চোখের সাজে ন্যাচারেল রঙের শেড ব্যবহার করেছে আরিয়া। আই লাইনারও টেনেছে মোটা করে। গাঢ় কালো রঙে আঁকা ভ্রু-যুগল তুলে দারুণ স্বাচ্ছন্দ্যে মোর্শেদকে তুমি সম্বোধন করে আরিয়া জানতে চায়,‘তুমি কি মোটরবাইক একা চালাতে পছন্দ করো- না-কি তার পেছনের সিটে অন্য কেউ বসার সুযোগ পায়?’

মেয়েটির কন্ঠস্বরে এমন এক ধরনের মাদকতা ছিল যে, মোর্শেদ রীতিমতো আচ্ছন্ন বোধ করে। সে বেতের অন্য একটি চেয়ার টেনে তার পাশে বসে কী জবাব দেবে তা নিয়ে ভাবে। আরিয়ার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ফের তাকাতেই মনে হয়- কোথায় যেন শালুকফোঁটা অলীক এক বিলে হাল্কা চালে আকাশ থেকে গ্লাইড করে নামছে এক ঝাঁক বেলেহাঁস। মেয়েটি ফিল্টারে লিপস্টিকের দাগ লাগা সিগ্রেটের শেষাংশ এ্যাসট্রেতে রেখে ফের কথা বলে,‘ এখানে বসে বসে বই পড়তে বোরিং লাগছে। ভাবছি, তোমার চার্মিং বাইকটি চড়ে একটি গ্রাম দেখতে যাওয়া যায় কি-না?’

কর্মশিবিরের লাঞ্চ বিরতিতে আরিয়ার বড়বোন মারিয়া সুলতানার সাথে মোর্শেদ আগ বাড়িয়ে পরিচিত হয়। আরিয়াকে নিয়ে একটি গ্রাম দেখতে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি আপত্তির কিছু দেখেন না। বরং ধন্যবাদ দিয়ে তাকে উৎসাহিত করেন। আরিয়াকে পেছনের সিটে বসিয়ে অতঃপর রোদে পুড়ে মোর্শেদ রওয়ানা হয় বরইতুল গ্রামের দিকে। যেতে যেতে টুকটাক কিছু কথাবার্তা হয়। কলম্বিয়া ইউনিভারসিটিতে আরিয়া ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ছে, শিশুসাহিত্যে তার ঝোঁক আছে। আঁকাজোকাও পছন্দ করে। একাডেমিক পড়াশোনার চাপ একটু কমলেই গ্রাফিক আর্টস ও ইলাস্ট্রেশনের উপর সে আলাদাভাবে কোর্স করতে চায়। মোর্শেদও এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিল। কিন্তু ডিগ্রির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সে কখনো আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে নি।। অনার্স শেষ করে নি মোর্শেদ। ড্রপআউট হয়ে সে একটি বিজ্ঞাপনী ফার্মে আঁকাজোকার কাজ নিয়েছিল। ছবি তোলা তার হবি। তবে সবচেয়ে পছন্দ করে গভীর রাতে বারান্দায় একা বসে ধ্রুপদী সংগীত শুনতে। আরিয়া আংশিকভাবে বড় হয়েছে ঢাকায়। তবে তার বাবা ডক্টরেট করতে ইংল্যান্ড গেলে, শিশু বয়সে সে বছর পাঁচেক বার্মিংহামের একটি গ্রামার স্কুলের ছাত্রী ছিল। তার হবি হচ্ছে, অজানা বা আধেক চেনা কোন ছেলের সাথে আউটিংয়ে যাওয়া। তার বাঙালি বান্ধবীরা এ প্রবণতাকে সাহসী তবে রিস্কি বিবেচনা করে, তাদের মতামতে আরিয়ার বিশেষ কিছু আসে যায় না। ব্লুগ্রাস মিউজিক তার খুব প্রিয়। এ ধরনের সংগীতের রিদমে মনোযোগ দিয়ে কারো সাথে ড্যান্স করলে তার মুড উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

বরইগুলে যাওয়ার কাঁচা সড়কটি রাজ আইলের চেয়ে সামান্য বড়, তাতে খানাখন্দ প্রচুর। অনেক বছরের পুরানো বাইকটি দুর্বল মাফলারের কারণে ধাতব শব্দ ছড়িয়ে পথ ভাঙলে- খানাখন্দের ঝাঁকুনিতে পেছন থেকে বার বার মোর্শেদের কোমর জড়িয়ে ধরছিলো আরিয়া। কখনো স্রেফ ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনে তার যুগল বক্ষ দেয়ালে ছুড়ে দেয়া জলবেলুনের মতো স্পর্শ করছিলো মোর্শেদের পিঠ। তাতে নষ্ট কানেকশনের ফলে ছড়িয়ে পড়া বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ হয়ে তাদের মধ্যে ছড়াচ্ছিল সংবেদনশীল স্পার্ক। মোর্শেদ বড় বড় গাছপালায় ছায়াচ্ছন্ন একটি পায়ে চলার ট্রেইল ধরে দক্ষতার সাথে বাইক চালায়। গাছের ডালে লাফানো ছায়া দেখতে পেয়ে আরিয়া অবাক হয়ে হাঁক পাড়ে,‘ওহ, মাই গড, হোয়াট অ্যাম আই সিইং? মোর্শেদ, প্লিজ স্টপ।’

বাইক থামতেই নেমে পড়ে দুজন। একটি বয়স্ক বানর ডালপালা দারুণভাবে ঝাঁকিয়ে তাদের হুঁশিয়ার করে দেয়। ছোট্ট ইন্সট্যান্ট প্যানোরমিক ক্যামেরায় ফ্লাশ ঝলকিয়ে আরিয়া এক্সাইটমেন্ট ছড়ায়,‘ মাই গড, নেভার থট আই উড সি সামথিং লাইক দিস।’
ততক্ষণে মোর্শেদও ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে নিয়েছে তার জেনিথ ক্যামেরাটি। বাচ্চা কোলে একটি বানরী উপরের দিকের ডালে লাফ দিয়ে ওঠার প্রস্তুতি নেয়। আর মোর্শেদ ঘাসে হাঁটু গেড়ে বসে শাটার টেপে। আরিয়া তার হাত ধরে টেনে উঠাতে উঠাতে বলে,‘হোয়াট অ্যা ওয়ান্ডারফুল টাইম আই অ্যাম হেভিং উইথ ইউ, ম্যান।’
মোটরবাইক স্টার্ট দিতে দিতে মোর্শেদও অনুভব করে- তার মধ্যেও দারুণভাবে ভালো লাগার অনুভূতি ঝুপসি গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে নামা আলোর মতো ঝলকে দিচ্ছে চেতনার অবতল।

বরইগুল গ্রামের নারী ও শিশুরা আঁটসাট স্ল্যাকস্ ও টপ পরা আরিয়াকে ঘিরে ধরে। সে গ্রামে আলকাতরা মাখানো কেরোসিন টিনের চালে তৈরী মসজিদের সিঁড়িতে বসে থাকা ছাগলের ছবি তোলে। ঢেঁকিতে পাড় দেয়া নারী, গোটা আষ্টেক ছানাপোনা সহ পালক খিকড়ানো মুরগি, থেলো হুক্কায় ধুমপান করা গামছা—কাঁধে বৃদ্ধ প্রভৃতি তার প্যানোরমিক ক্যামেরার বিষয়বস্তু হয়। অতঃপর ‘উদ্যোগ’ এর কর্মসূচির সূত্রে পরিচিত নারীদের দেয়া এক আঁটি পাকা তেঁতুল ও পাঁচটি পেয়ারা ব্যাকপ্যাকে পুরে খুশি মনে তারা বিদায় নেয় গ্রাম থেকে। বাইকে চাপার সময় ছোট্ট একটি টিলার ঢালে ফলানো চারা—ধানের তীব্র সবুজ দীপ্তির দিকে নজর দিয়ে আরিয়া মন্তব্য করে,‘হোয়াট অ্যা বিউটিফুল সেটিং! অহ্, সাচ অ্যা ওয়ান্ডারফুল ডে, এ পরিবেশে একটা জয়েন্ট স্মোক করতে পারলে কী যে ভালো লাগতো।’
এ কমেন্টের জবাবে কিছু না বলে মোর্শেদ একটি চা বাগানের দিকে দারুণ তোড়ে বাইক হাঁকায়।

পাট্টার সামনে বাইক স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে মোর্শেদ বলে, ‘একটি জয়েন্ট স্মোক করতে আমারও ইচ্ছা হচ্ছে। তো আমি এখান থেকে দুটি মারিজুয়ানার পুরিয়া কিনছি। তুমি চাইলে একটি পুরিয়া নিয়ে যেতে পার।’
মারিজুয়ানা ও বাংলা ফোর্টি ব্র্যান্ডের অ্যালকোহল বৈধভাবে পাট্টায় বিক্রি হচ্ছে দেখে আরিয়া অবাক হয়। ফের বাইকে চাপতে চাপতে মোর্শেদ কমেন্ট করে,‘ আমাদের দেশে এ ধরনের কন্ট্রাব্যান্ড জিনিসপত্র পাট্টার মাধ্যমে লিগ্যালি বিক্রি হচ্ছে ব্রিটিশ আমল থেকে। তবে মাস কয়েক আগে এগুলো নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক প্রটোকল সাইন করেছে। আগামি বছরের জুলাই থেকে এসব আইনত নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।’

বাইকের ঝাঁকুনিতে ব্যালেন্স রাখতে রাখতে এক হাতে মোর্শেদের কোমর জড়িয়ে ধরে আরিয়া রিয়েক্ট করে,‘ টু ব্যাড, উপভোগ করার মতো কিছু সুন্দর জিনিস এখানে ছিল, আন্তর্জাতিক আইনের মারপ্যাচে তা-ও হারিয়ে যাবে। সাউন্ডস্ সো স্টুপিড।’

প্রচুর জারকিং এর ভেতর চড়াই পাড়ি দিয়ে মোর্শেদ তার বাইকটিকে নিয়ে আসে রাবার বাগানের নিরিবিলিতে। বেলা পড়ে আসছে, তাই শ্রমিকরা কাজ সেরে ফিরে গেছে দিনকার তলব সংগ্রহ করতে। ইউক্যালিপটাসের এক সারি সোমত্থ বৃক্ষ সৈনিকদের মতো কুচকাওয়াজ করতে করতে নেমে গেছে ছড়া-নদীর মৃদু স্রোতের দিকে। মোর্শেদ ব্ল্যাকচেরী ট্যাবাকোর সাথে মারিজুয়ানা মিশিয়ে দক্ষ হাতে জয়েন্ট বানায়। আরিয়া স্মোক করতে করতে উচ্ছ্বাস ছড়ায়,‘ ইয়োর ট্যাবাকো এডেড সাচ অ্যা গুড অ্যারোমা, ম্যান। ’

জয়েন্টের শেষাংশ স্পোর্টস্ শু-তে পিষে মোর্শেদ ইউক্যালিপটাসের কিছু পাতা ছিঁড়ে কচলে আরিয়ার দিকে বাড়িয়ে দেয়। সে ভেষজের সৌরভ শুঁকতে শুঁকতে অস্ফুটে বলে,‘হোয়াট অ্যা লাভলি প্লেস! আই অ্যাম সো একসাইটেড।’
-বলেই দ্রুত তার স্নিকারটি খুলে, মোজা ঘাসে ছুড়ে দিয়ে, ভেজা বালুকায় পা ডুবিয়ে নেমে যায় ছড়া-নদীটির দিকে। বহমান জলের ছোঁয়ায় ভিজে যায় তার স্ল্যাক্সের পায়া। সে আঁজলা ভরে পানি তুলে ছুড়ে দিচ্ছে শূন্যে। তাতে তেরছা হয়ে পড়া সূর্যরশ্মি মিশে গিয়ে ইন্সট্যান্টলি তৈরি করে রঙধনুর বিচ্ছুরিত আভা। বিকালের কিছু মোলায়েম আলো তার চোখমুখকে উদ্ভাসিত করে তোলে। মোর্শেদ জেনিথ ক্যামেরা দিয়ে তার গোটা কতক স্ন্যাপশট নেয়। তাতে খুশি হয়ে আরিয়া ছুটে এসে তার হাত স্পর্শ করে বলে,‘ আই ওয়ান্ট সাম কপি অব দিজ পিকচারস্ ।’

জেনিথ ক্যামেরাটি পিঠে ঝুলাতে ঝুলাতে মোর্শেদ রোদে তেতে ওঠা আরিয়ার মুখের দিকে তাকায়। এক গুচ্ছ অলক দেয়াল বেয়ে ওঠা টিকটিকির মতো নেমে এসেছে গণ্ডদেশে। অনেক দিন ধরে দরোজা-জানালা বন্ধ হয়ে আলোরিক্ততায় পড়ে থাকা তার দেহমনের কুঠুরিতে যেন জ্বলে ওঠে একটি লাইট বাল্ব। মোর্শেদ আরিয়াকে কাছে টেনে নিয়ে চুমো খায়। প্রতিদানে সে তার বুকের বোতাম স্পর্শ করে মেয়েলি রুমাল দিয়ে মোর্শেদের মুখে লেগে যাওয়া লিপস্টিকের রঞ্জনি মুছে দিতে দিতে ফিক করে হেসে বলে,‘ আমি চাই না তুমি মুখ কালারফুল করে স্টুপিডের মতো ‘উদ্যোগ’ এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফেরো।’

অতঃপর বাইকের রিয়ার ভিউ মিররের দিকে তাকিয়ে আরিয়া টিস্যু দিয়ে লেপ্টে যাওয়া মেকাপ মুছে ব্রাশ বুলিয়ে রোদপোড়া মুখে প্রসাধনের রিটাচ দেয়।

গতকাল গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর দুর্দান্ত স্মৃতি ঘেঁটে ঘেঁটে মোর্শেদ চলে গিয়েছিল এক ধরনের ঘোরের মধ্যে। ভেতরের কামরায় দেয়ালঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজার আওয়াজ হয়। তাতে সম্বিত ফিরতেই মোর্শেদ দেখে, মেহগিনি কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নেমে আসছে আরিয়া। হাইহিল পায়ে স্কিনি রিপড্ জিন্সের সাথে ক্রপকাটের ফতুয়া পরেছে, তাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার একহারা গড়নের ফিগার। মোর্শেদের কাঁধে সাবলিলভাবে চাপ দিয়ে সে বলে,‘ আই অ্যাম সো স্যারি, তোমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি, লাভলি টু সি ইউ, ম্যান।’
মোর্শেদ উইন্ডব্রেকারের ভেতরের পকেট থেকে বের করে কয়েকটি ফটোগ্রাফস। আরিয়া উচ্ছসিত হয়ে বলে, ‘এত তাড়াতাড়ি ছবিগুলো প্রিন্ট করলে কীভাবে?’
মৃদু হেসে সে জবাব দেয়, ‘আমার বাসার বাথরুমে ছোট্ট একটি ডার্করুম বানিয়ে নিয়েছি, নিজের তোলা ছবি আমি সচরাচর ওখানে প্রিন্ট করে নিই।’
এ তথ্যে খানিক ইমপ্রেসড্ হয়ে আরিয়া তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে ফটোগ্রাফগুলো খুঁটিয়ে দেখায় মনোযোগ দেয়। একটি আলোকচিত্রে চোখ পড়তেই সে ফের এক্সাইটমেন্ট ছড়ায়,‘ দিস ওয়ান লুকস্ সো ওয়ান্ডারফুল, লাভ ইট, ম্যান…।’
ছবিতে আরিয়া উর্দ্ধমুখি হয়ে তাকিয়ে আছে ডালপালায় ছড়ানো পেল্লায় বৃক্ষটির দিকে। বেশ উঁচুতে শিশুপিঠে মা-বানরীর আবছা আউটলাইন দেখা যাচ্ছে। তবে যা দর্শকের চোখে প্রথম দৃষ্টিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে আলোকিত অঞ্জন, তা হচ্ছে সবুজাভ পত্রালি চুঁইয়ে আরিয়ার মুখে ঝরে পড়া রশ্মির রেণুকা, তাতে মেয়েটির চোখমুখ ও গ্রীবা উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। সে ছবিটি বাঁ-হাতে বুকে চেপে ধরে ডানহাতে মোর্শেদের কব্জি ছুঁয়ে বলে,‘ আমার পেরেন্টসরা একটি রবীন্দ্রসংগীত প্রায়ই শোনে, আলো ওগো… আলো… তারপর আরো কী যেন, গানের লাইনটি আমার পরিষ্কাররভাবে মনে আসছে না, তবে তোমার তোলা ছবিটি দেখতেই মন ভরে উঠলো আলোয়।’
মোর্শেদ মৃদুস্বরে তাকে সংগীতের কথা মনে করিয়ে দেয়, ‘আলো, ওগো আলো , আমার আলোয় ভুবন ভরা…।’
‘ইয়েস, দ্যাটস্ ইট, আই লাভ দিস সঙ। তুমি যদি এ ছবিটা কখনো পাবলিশ করো, প্লিজ এটার ক্যাপশন দেবে আলোয় ভুবন ভরা।’
আলোকচিত্রটি আরিয়াকে এতো মুগ্ধ করে যে, সে পাশে বসে তার দিকে একমনে তাকিয়ে কী যেন ভাবে। তারপর জানতে চায়, ‘ সো হোয়াটস্ ব্রিংগস্ ইউ হিয়ার টুডে? তুমি আসাতে আমি কিন্তু খুশি হয়েছি, নেভার মাইন্ড।’
মোর্শেদ ঘাড় ঘুরিয়ে তার মুখোমুখি হয়ে জবাব দেয়,‘ আজকে তুমি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাও নি, তোমাকে ওখানে দেখতে না পেয়ে মনে হলো একটু খোঁজ নিই।’
আরিয়ার চোখেমুখে খেলে যায় দুষ্টুমির ঝিলিক। এ অভিব্যক্তিকে সংগোপন করে সে অনুযোগ করে, ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য ভোরে প্রস্তুত হয়েছিলাম, কিন্তু গতকাল তুমি বললে না- আজ তোমার ব্যস্ততা যাবে, তাই যেতে ইচ্ছা হলো না।’ মোর্শেদ হাত দিয়ে উইন্ডব্রেকারের ভেতরের পকেট থেকে পুরানো পত্রিকার কাগজ দিয়ে ফানেলের মতো প্যেঁচিয়ে তৈরি একটি প্যাকেট সাবধানে বের করে বলে,‘ ভোরে উঠে ছবিগুলো প্রিন্ট করলাম, তারপর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে তোমাকে দেখতে না পেয়ে আর কাজে যেতে ইচ্ছা হলো না, তো আজ পুরো দিনের জন্য ছুটি নিয়েছি।’ বলেই সে প্যাকেটটি আরিয়ার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
‘হোয়াট অ্যা লাভলি রোজ, তোমার প্যাকেট কিন্তু ভালো হয় নি, কিন্তু গোলাপটা সুন্দর, সুইট… লাভ ইট।’
বলে আরিয়া সবুজ ডাঁটিঅলা ফুলটি শুঁকতে শুঁকতে চেয়ার থেকে উঠে বলে, ‘কামঅন… ম্যান, আই লাইক দিস লিটিল ফ্লাওয়ার, পরিয়ে দেবে না আমাকে?’

তারা বারান্দা ছেড়ে ড্রয়িংরুমের প্রশস্ত কামরায় ঢোকে। দরোজার পাশে উড কার্ভিংয়ে করা প্রমাণ সাইজের একটি মনুষ্যমূর্তি, তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে ধরা শেড পরানো ল্যাম্প। তারা মূর্তিটির আড়ালে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করে। অতঃপর আরিয়া তার ক্রপকাট ফতুয়ার একটি বোতাম খুলে ওখানে ফুলটি গুঁজে দিতে ইশারা করে। মোর্শেদ গোলাপ পরিয়ে দিয়ে ফতুয়ায় এম্ব্রয়ডারি করা হংসমিথুনের নক্সায় লুজ হয়ে আসা রেশমের সুতো আংগুল বুলিয়ে মসৃণ করে দেয়। এতে আরো ঘন হয়ে কাছে এসে আরিয়া মোর্শেদের গণ্ডদেশে দুদিনের না কামানো দাড়িতে হাত ঘষে মন্তব্য করে,‘ইউ লুক রাফ এন্ড র্যা গেড, একটা কথা তোমাকে ফ্র্যাংকলি বলি, তোমার অগোছালো, শেভ না করা, রাফ.. এন্ড স্লাইটলি টাফ ব্যাপারটা আমার কিন্তু ভালো লাগছে।’
শুনে মোর্শেদের ভেতর বিলের জলে গ্লাইড করে নামা বেলেহাঁসের ইমেজটি ফিরে আসে। তারা একটি কাউচে পাশাপাশি বসে। তার বুকে যেন একটি বেলেহাঁস ডানা ঝাপটিয়ে জলকেলি করছে। সে অস্থিরতাকে আমলে না এনে ফের আরিয়াকে গাঢ়ভাবে অবলোকন করে। মেয়েটি তার পাশে বসে একটি কুশন কোলে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তাতে নানাবিধ ফুলের চিত্রিত নক্সা। মোর্শেদের দৃষ্টিপাত অনুভব করে সে-ও চোখ তুলে ঠোঁট টিপে হাসে। আজ সে গালে হাল্কা করে সোনালি রঙের ব্লাশঅন ব্যবহার করেছে, তাই হাসতেই তার চোখমুখ ও হলুদাভ ত্বকে ফোটে লাজুকভাব। মোর্শেদের কেন জানি ধৈর্য্যচ্যুতি হয়, সে প্রশ্ন করে,‘খুব সুন্দর করে সাজগোজ করেছ আরিয়া, কোথাও তোমার যাওয়ার কোনো প্ল্যান আছে কি আজ?’
জবাবে মেয়েটি ম্লান হাসে,‘ আমার আজকের অবস্থা হচ্ছে, অল ড্রেসড্ আপ বাট নো হোয়ার টু গো।’
শুনে মোর্শেদ জানতে চায়,‘ আমার সাথে যাবে আরিয়া? তোমার কোনো অসুবিধা না থাকলে…।’
উৎসাহের সাথে আরিয়া জবাব দেয়,‘ অফকোর্স আই উইল গো উইথ ইউ.. অ্যা স্মল রিকোয়েস্ট, কালকে তুমি একটি চা বাগানের পাট্টার সামনে নিয়ে গেলে, কলঘরের চিমনি খানিকটা দেখলাম, কিন্তু চা-বাগানটি ভালো করে দেখা হলো না।’
মোর্শেদ জবাব দেয়ার কোন অবকাশ পায় না। কর্ডলেস টেলিফোন হাতে পারিচারিকা এসে চৌকাঠের পর্দা সরিয়ে বলে,‘আপা, আপনার টেলিফোন, আক্রাম হাবীব সাহেব…।’
সে কর্ডলেস সেটটি হাতে নিয়ে নিচু গলায় বলে,‘ হাই আক্রাম, আই অ্যাম অ্যা বিট ভিজি, ওয়েট অ্যা মিনিট প্লিজ…।’
তারপর মাউথপিস করতলে চেপে জানায়,‘ দিস ইজ আক্রাম, থিয়েটার গাই… হি এডৌরস্ মি… তাঁর সাথে একটু কথা বলতে হয় যে।’
নাট্যজন আক্রাম হাবীবের সুনাম সম্পর্কে মোর্শেদ অবগত। টিভি-র কল্যাণে তাঁর চেহারাসুরতের সাথেও তার পরিচিতি ঘটেছে। কিন্তু মেয়েটির মুখে তাঁর নাম শুনতেই কেন জানি তার অস্বস্তি হয়। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলে না। আরিয়া উঠে পড়ে কর্ডলেস রিসিভারটি বুকে চেপে বলে,‘ তুমি ফ্রুটকেক পছন্দ করো, কাল রাতে আমি বেক করেছি। তোমাকে কফি দিচ্ছে..। প্লিজ একটু অপেক্ষা কর, আমি আলাপটা সেরেই আসছি।’

আরিয়া ফোনে কথা বলতে দোতলার প্রাইভেট পরিসরে চলে গেলে, খানিক বিরস মুখে মোর্শেদ বসে থাকে বনেদি চা-করের জমকালো ড্রয়িংরুমে। কামরাটি আকার-প্রকারে এতোই প্রশস্ত যে, চাইলে বাচ্চারা এখানে ব্যাডমিন্টন খেলতে পারে। সময় কাটানোর অসিলায় সে সচেতনভাবে সাজিয়ে রাখা কিছু জিনিসপত্র আগ্রহ নিয়ে দেখে। পুরানো দিনের মারফি রেডিওগ্রাম, রেকর্ড বাজানোর গ্রামোফোন এবং দেয়ালের প্যানডোলাম দোলানো ঘড়িটি যেন তৈরী করছে ব্রিটিশ আমলের আবহ। মোর্শেদ উঠে গ্লাস ক্যাবিনেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কাচের পাল্লার ভেতর দিয়ে পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কানন বালা ও রসুলান বাঈ প্রমুখের মাটির রেকর্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সে আন্দাজ করার চেষ্টা করে, এইচ-এম-ভি এসব রেকর্ড কত সালে বাজারজাত করেছিল? মোর্শেদ পাউচ থেকে খানিকটা ট্যবাকো বের করে, সিগ্রেট রোল করতে করতে ঘাড় ফেরাতেই অভাল শেইপের একটি আয়নায় প্রতিফলিত হয়- তার মস্তক ও হাঁটু থেকে শরীরের উর্দ্ধভাগ। ধুলিধূসরিত জিন্সের সাথে আধময়লা বুশসার্টে তাকে সত্যিই রুখুশুকু দেখাচ্ছে। অনেক দিন পর মোর্শেদ তার নিজের দিকে খুঁটিয়ে তাকাল। সে ভাবে, গতকাল আরিয়াকে নিয়ে বরইতল গ্রামে যাওয়ার পর থেকে তার মধ্যে তৈরী হয়েছে এক ধরনের মানসিক চাপ। সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে একা আধো অন্ধকারে বসে ওস্তাদ রাশিদ খানের ঠুমরি শোনার চেষ্টা করছিল। তখন সে অনুভব করে- ডিপ্রেশনের ঘন মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে তার করোটি। তো সে বাইক হাঁকিয়ে সংগ্রহ করে নিয়ে আসে কেরু কোম্পানির এক পাঁইট রাম। পানের সাথে একাধিক জয়েন্টস্ স্মোক করার ফলে রাতে তার ঘুম আসছিল না। মোর্শেদ ফের খুঁটিয়ে ভিন্টেজ কোয়ালিটির আয়নাটি দেখে। ফ্রেমের দুপাশে স্ট্যান্ডে রাখা দুটি হাতির দাঁত এবং এসবের ওপরে ঝুলানো আদ্যিকালের মাস্কেট বন্দুকের জন্য আরশিটির সেটিংয়ে এসেছে দারুণ এক কম্পোজিশন। সে গৃহকর্তার অনুমতি ছাড়া ফ্লাশ না ঝলকিয়ে, এপারচার একটু বড় করে জেনিথ ক্যামেরায় আয়নাটির স্ন্যাপশট নেয়। পরিচারিকা ট্রলিতে করে নিয়ে আসে ফ্রুটকেক ও ফেনাতোলা কফি।

কিশমিশের সাথে কাটা আপেলের টুকরার মিশেল দেয়া, আইসিং এর ওপর কমলালেবুর কোয়া বসানো ফ্রুটকেক খেতে খারাপ লাগে না। সে কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ফের আয়নার দিকে তাকায়। কাউচে বসে আছে, তাই খানিক দূর থেকে তার মস্তক ও শরীরের উপরের দিকের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। নিজের মুখচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মোর্শেদ ভাবে, নিত্য নৈমিত্তিক অনিদ্রা এবং একাকীত্ব কাটানোর জন্য মাঝেসাজে পান ও ক্রমাগত জয়েন্ট স্মোক করার কারণে কি তার চেহারাতে রুখুসুকু অভিব্যক্তি গাঢ় হয়ে ফুটছে? ইতিপূর্বে কালেভদ্রে যে দু-একটি মেয়ের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়েছে, তারা তাকে হয় নির্মম নয় নির্লিপ্ত আখ্যা দিয়ে নীরবে সরে গেছে দূরে। শৈশবে মোর্শেদ পিতৃহীন হালতে আত্মীয়স্বজনদের বাসায় থেকে পড়াশোনা করে। অই সময় সে কোনো না কোনো আত্মীয়ের নির্মম আচরণের শিকার হয়। তবে কি এ জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তার চরিত্রের ভেতর দিয়ে মূর্ত হচ্ছে খানিক নির্মমতা ও নির্লিপ্তি। স্কুলজীবনে ভালো ছেলে বলে কখনো কোনো খ্যাতি জোটে নি মোর্শেদের। হকি স্টিক দিয়ে মারপিট করে রক্তাক্ত শরীরে ঘরে ফেরার ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। চরিত্রের অসহিষ্ণুতা আরো প্রকট হয়ে ওঠে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। শিক্ষকদের চাপিয়ে দেওয়া একাডেমিক সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রতিবাদ করে বিরাগভাজন হয়েছিল সে। বিরক্ত হয়ে কোনো এক অধ্যাপককে ঝাড়ি দেওয়ার ফলে মাস্তান বলে কুখ্যাতিও জুটেছে। তো অনার্স থেকে ড্রপআউট হয়ে কিছুদিন মোর্শেদ একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ডিজাইনার হিসাবে কাজ করে। চিত্রকলার বিষয়ে তার আগ্রহ সহজাত । লাইব্রেরিতে বই ঘেঁটে, চিত্রকলার রঙিন প্লেট খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে- করে, সে নিজে নিজেই শিখে নিয়েছিল প্রেক্ষিত, কম্পোজিশন ও বর্ণসামঞ্জস্যের কলাকৌশল। কিন্তু যার তত্ত্বাবধানে তাকে কাজ করতে হতো- তিনি মোর্শেদের মতামতের বিশেষ একটা তোয়াক্কা করতেন না। তাই হামেশা বেঁধে যেতো দ্বন্দ্ব। বর্তমানে ‘উদ্যোগ’ বলে যে এনজিও-তে সে শিশুশিক্ষার জন্য উপকরণ উন্নয়ন ছাড়াও কর্মসূচি সমন্বয় করার দ্বায়িত্ব পালন করে চলছে, এখানকার আপার ম্যানেজমেন্ট তার কাজের কদর করেন। গেল চার বছরে সে গোটা দুয়েক প্রমোশন পেয়েছে, তবে ম্যানেজমেন্ট তাকে দিয়ে খাটিয়েও নিচ্ছে প্রচুর। ইংরেজিতে তার লেখাজোকার হাত গড়পড়তা অন্যান্য কর্মীদের চেয়ে অনেক ভালো বিধায় ফান্ডিং এজেন্সিতে কোন রিপোর্ট জমা দেয়ার ডেটলাইন আসলেই তার ডাক পড়ে। গ্রামের প্রভাবশালী মহল বা মৌলবাদী মোল্লাদের সাথে ‘উদ্যোগ’ এর কর্মসূচির সংঘাত বাঁধলে, ম্যানেজমেন্ট তাকে পাঠায় নিগোসিয়েট করতে। সে ব্যবস্থাপনা চক্রের ওপর-মহল থেকে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, এ কারণে তার সহকর্মীরা তাকে বিশেষ একটা পছন্দ করে না। চার বছর ধরে এদের সাথে একত্রে কাজ করেও কারো সাথে তার গড়ে ওঠে নি বন্ধুত্ব।

এ রকম অনাহুতভাবে কোন মেয়ের বাড়িতে গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে বসে অপেক্ষা করাও তার চরিত্রে সহজাত নয়। এ মুহূর্তে আরিয়ার ওপর বিরক্ত হয়ে খেপে ওঠা হতো মোর্শেদের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু কী যেন এক প্রত্যাশায় অপেক্ষা করতেও তার খারাপ লাগছে না। সে রোল করা সিগ্রেট লাইট করে একটি বিষয় নিয়ে নীরবে তর্পণ করে। যাদের সাথে সে হামেশা কাজ করছে, বা যেসব মেয়েদের সাথে কর্মসূচির সূত্রে তার মিথস্ক্রিয়া ঘটছে, তারা কিন্তু তার সাথে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে চলতে পছন্দ করে। ফটোগ্রাফি, ইলাস্ট্রেশন বা রিপোর্ট রাইটিং এর দক্ষতা নিয়ে তার মনে যথেষ্ট কনফিডেন্স থাকলেও সে প্রশংসা শুনে অভ্যস্থ নয়। তবে কি আরিয়ার তারিফপূর্ণ দৃষ্টিপাত ও অন্তরঙ্গ হওয়ার উদ্যোগ তার মধ্যে তৈরি করছে অভিভূত হওয়ার আবেশ। মোর্শেদের প্রতিফলন দানা বেঁধে ওঠার অবকাশ পায় না। সিঁড়ি ধরে নেমে আসে আরিয়া। সে হাইহিল পাল্টিয়ে স্পোর্টস স্নিকার পরে এসেছে। অজুহাতের ভঙ্গিতে সে বলে,‘ আই অ্যাম সো স্যরি, তোমাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম। দিস থিয়েটার গাই আক্রাম ফোনে তাঁর নেপালে ঘুরে বেড়ানোর লম্বা-চওড়া গল্প শুরু করে দিল। লেটস্ গো, বেরিয়ে পড়া যাক, তুমি কিন্তু আজকে আমাকে একটি চা বাগানে নিয়ে যাচ্ছ।’
মোর্শেদ উঠে পড়ে আরিয়ার দিকে তাকায়। মেয়েটি ক্রপটপ ফতুয়ার সাথে এবার রোজি-ব্রাউন কালারের ওড়না গলায় প্যেঁচিয়ে এসেছে। এতে তার স্তনযুগলকে দেখাচ্ছে পত্রালির ছায়ায় বেড়ে ওঠা পেঁপের মতো। সে হাত বাড়িয়ে অবলীলায় মোর্শেদের ঠোঁট থেকে রোল করা সিগ্রেটটি নিয়ে তাতে দম দিয়ে বলে,‘ ইয়োর ট্যবাকো হ্যাজ সাচ অ্যা গুড ফ্রিগরেন্স।’
মোর্শেদ তার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মৃদু স্বরে প্রস্তাব করে,‘ আমি তোমাকে খুব সুন্দর একটি চা বাগানে নিয়ে যাব। বাগানের এসিসট্যান্ট ম্যানেজার ইশতিয়াক আমার বন্ধু। তার বাংলো থেকে টিলা-টক্করের দুর্দান্ত ভিউ পাওয়া যায়। তুমি চাইলে ওখানে আমরা খানিকটা সময় কাটাতে পারি।’
সিঁড়ি দিয়ে গাড়িবারান্দায় নামতে নামতে আরিয়া তার ডান হাত মুঠোয় নিয়ে মৃদুস্বরে জানায়,‘ দ্যাট উড বি লাভলি।’

বাইক হাঁকিয়ে টিলাগড়ের কাছাকাছি শহরতলীতে আসতেই তারা ট্র্যাফিক জ্যামের ঝামেলাতে জড়ায়। লাল-নীল বাতি ফ্লাশ করে ছুটে যাচ্ছে সশস্ত্র পুলিশের ভারী মোটরবাইক। তার পেছন পেছন সড়ক পরিষ্কার করতে করতে এগুচ্ছে হুডখোলা জীপ ও পিকাপ ট্রাক। খানিক পর এ পথ ধরে রাষ্ট্রপতি জাস্টিস সাত্তারের মোটর-কেইড যাবে গ্রামে খালকাটা কর্মসূচি উদ্বোধন করতে। মোর্শেদ দক্ষতার সাথে ভীড়ভাট্টা সামলিয়ে কোন ক্রমে তার বাইকটি নিয়ে ঢুকে পড়ে এম-সি কলেজের ক্যাম্পাসে। হাল্কাচালে ড্রাইভ করে এলোপাথাড়ি ঘুরপাকে সে সময় কাটানোর উদ্যোগ নেয়। পিছনের সিটে বসে চলমান বাইক থেকে কলেজের ঔপনিবেশিক ধাচে তৈরি দালানকোটার স্ন্যাপশট নিচ্ছে আরিয়া। এক পর্যায়ে তারা চলে আসে মেয়েদের হোস্টেলের কাছাকাছি। মুনিয়া পাখির মতো রঙচঙে শালওয়ার-কামিজ পরা কয়েকটি মেয়ে খিলখিলিয়ে পরস্পরের গায়ে ঢলে পড়ে হাঁটছে গাছ-বিরিক্ষের ছায়ায়। আরিয়া হাত তুলে তাদের ওয়েভ করলে তারাও সাড়া দেয়। তো সে মোর্শেদের কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বাইক থামাতে ইশারা করে। আরিয়া নেমে পড়ে মেয়েদের সাথে পরিচিত হয়। সে কখনো বাংলাদেশের কোনো কলেজ হোস্টেলে ঢোকেনি শুনে মেয়েগুলো তাকে তাদের রুমে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। মোর্শেদকেও তারা হোস্টেলের ওয়েটিং লবিতে বসে অপেক্ষা করতে বলে। কিন্তু তাদের প্রস্তাবে রাজি না হয়ে সে একটি কড়ই গাছের ছায়ায় বাইক পার্ক করে চুপচাপ সিটে বসে ট্যাবাকো রোল করে সিগ্রেট বানায়।

মোর্শেদ সিগ্রেটটি ফুঁকতে ফুঁকতে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে মেঘভাসা আকাশের দিকে। মৃদু হাওয়ায় উড়ছে মিমোসার মঞ্জুরিচ্যুত হাল্কা ফুল। কোথায় বুঝি ফুটেছে আমের বৌল, তার সৌরভে আচ্ছন্ন লাগে। কলেজের হোস্টেল থেকে আরিয়ার ফিরে আসতে বেশ দেরি হচ্ছে। তাতে কিন্তু মোর্শেদের বিরক্তি লাগে না। এই যে প্রায়-অচেনা একটি মেয়ে তার সাথে ঘুরে বেড়ানো উপভোগ করছে, এ বিষয়টি তাকে এক ধরনের স্যাটিশফেকশন দেয়। মনে হয়, সে আরিয়ার প্রতীক্ষায় এখানে কড়ই গাছটির তলায় বসে থাকতে পারবে দিনের পর দিন। উঁচু ডালে ছাই রঙের ডানায় আলোছায়া মেখে একটি ঘুঘু তার কন্ঠস্বরে উদাসীনতা ছড়ালে, স্বপ্নের মতো চুপিসারে তার মধ্যে ফিরে আসে একটি বেদনাদগ্ধ স্মৃতি। আজ থেকে বছর আষ্টেক আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে অন্য একটি মেয়ের জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে তার ভালো লাগত। মোর্শেদ তখন কলেজের ছাত্র। এক আত্মীয়ের বাসায় বাস করছে সে। ষোলো কিংবা সতেরো বছরের কিশোরী পরাগ ছিল তাদের ওপরের তলার বাসিন্দা। মেয়েটির জিহ্বা বোধ করি খাটো ছিল, সে বেশ কয়েকটি বর্ণ সুষ্ঠভাবে উচ্চারণ করতে পারত না। তাই তার কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে না শুনলে বোঝা যেত না। কচুরিপানা ভাসা পুকুরের কালচে-সবুজ জলের মতো স্নিগ্ধ রূপের কিশোরী পরাগের চোখের বর্ণ ছিল ব্যতিক্রমি রকমের সবুজাভ। সে কারো দিকে স্থীরভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারত না। তার চোখের পুতলিতে হামেশা খেলা করতো আলোর আধোস্ফুট বলয়। পরাগ বার কয়েক স্কুল পাল্টায়, উচ্চারণ বিকৃতির জন্য মেয়েরা তার পেছনে লাগত। দৃষ্টিক্ষীণতার জন্যও তাকে হেরাস করতো সারাক্ষণ। তো এক পর্যায়ে মেয়েটি স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে ঘরে বসে বসে সময় কাটাত।

মোর্শেদের নীরব অনুরাগ সম্পর্কে পরাগ কি সচেতন ছিলো- এত বছর পর নির্দিষ্টভাবে তা বলা মুশকিল। তবে কোনো কোনোদিন দুপুরে- বাসার পুরুষ আত্মীয় অফিসে এবং নারী আত্মীয়া যখন রান্নাঘরে ব্যস্ত, তখন মোর্শেদ তার কামরায় একা বসে টেপে বাজাত ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের রাগপ্রধান গান বা ওস্তাদ আলী আকবর খানের সরোদ। স্যান্ডেলহীন পায়ে আলতা পরে পরাগ নেমে আসত নিচতলায়। কখনো পিরিচে করে নিয়ে আসত গাজরের বরফি বা বাটিতে মুড়িমাখা। উচ্চারণ সংকটের জন্য পরাগ কথা বলত না একেবারে। তবে একবার তার হাত থেকে নোটবুক টেনে নিয়ে লিখেছিল,‘ গান খুব ভালো লাগে আমার।’
আরেকদিন দুপুরে একটি কার্ডে মোর্শেদ পরাগের একটি পেন্সিল স্ক্যাচ করলে সে মুগ্ধ হয়ে চেপে ধরেছিল তার কব্জি। তারপর কার্ডটি টেনে নিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আলোয় তুলে ধরে নিরিখ করে মেয়েটি দেখছিল, তার নিজ দেহের নানাবিধ রেখায় বঙ্কিম চিত্র। এক পর্যায়ে অস্ফুট আওয়াজ করে চিত্রিত কার্ডটি কামিজের ভেতর বুকের কাছে চেপে ধরে পরাগ ছুটে গিয়েছিল ওপর তলায়।

যদিও অত্যন্ত দুঃখজনক ট্র্যাজিডিটি গেল কয়েক বছরে মোর্শেদ তর্পণ করেছে বহুবার, তথাপি সে কখনো নিশ্চিত হতে পারে নি, পরাগের অকস্মাৎ আত্মহত্যার পেছনে মূল কারণটা কী, অথবা তার অনুরাগের সাথে ঘটনাটি সম্পর্কিত কি না? ক্লাসমেটদের সাথে মিলেঝুলে মোর্শেদ কুষ্টিয়ায় গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি ও ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়া দেখতে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে বাড়ির সামনে এম্বুলেন্সকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু তাজ্জব হয়েছিল সে! পরাগের লাশ গাড়ি থেকে নামিয়ে আনতে তাকেও হাত লাগাতে হয়েছিলো। মেয়েটি নানাবিধ রোগে পঙ্গু তার নানীর পেইন কিলার ও সিডেটিভের দুটি বোতলের সবগুলো ট্যাবলেট গিলে দিবানিদ্রার ভান করে শুয়েছিল তার বিছানায়। বিকালে যখন তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল, তখন ডাক্তারদের করার কিছু অবশিষ্ট ছিল না। না, মোর্শেদ তার আত্মহননে নীলাক্ত হওয়া মুখ দেখে নি। কেউ তাকে দেখতে বলেও নি। তবে ওপরতলায় লাশ তোলার সময় স্ট্রেচার থেকে খেপে ওঠা সাপের মতো তার দিকে ঝাঁপিয়ে উঠেছিলো পরাগের দীর্ঘ বেণী।

হোস্টেলের বারান্দা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে আসতে আরিয়া তার দিকে নিশানা করে হাতে গোলাকার রঙিন কিছু নাড়ে। তার সাথে সাথে নামছে কলেজের আরেকটি মেয়ে। মোর্শেদের ভাবনাসূত্রে দারুণভাবে টান পড়ে। তৎক্ষনাৎ তার মনোজগত থেকে মুছে যায় স্ট্রেচারে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া পরাগের মরদেহের চিত্রপট। কলেজের মেয়েটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরিয়া একটি বর্ণীল হাতপাখা নাড়তে নাড়তে বাইকের দিকে আসছে। অনেক বছর পর মোর্শেদের মনে ফের ভেসে ওঠে পরাগের নোটবুকে একটি ছত্র লিখে লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি। আগের মতো এ স্মৃতি কিন্তু তার মধ্যে এবার জাগায় না সুরা পানে মত্ত হওয়ার বুনো আবেগ। পরাগকে চিত্রের মতো নির্মোহ কয়েকটি রঙিন রেখার সমাবেশ মনে হয়। আরিয়া এসে উচ্ছ্বাসের সাথে জানায় যে,‘ দিস গার্ল ইজ সো কুল, হার নেইম ইজ নীলিমা, ভেরি ফ্রেন্ডলি। দ্যাখ, সে আমাকে কী সুন্দর একটি হাতপাখা উপহার দিয়েছে।’ মোর্শেদ আরিয়াকে পিছনের সিটে বসিয়ে বাইক স্টার্ট দেয়। আর তার পাঁজরের যে অদৃশ্য দেয়ালে কিছুক্ষণ ধরে ঝুলছিল পরাগের অলীক চিত্রপট, তা মুছে গিয়ে ওখানে ফুটে ওঠে রেশমের সুতোয় নক্সা তোলা একটি পাখা- যার কোণায় ছোট্ট করে লেখা, ‘ভুলো না আমায়’।

প্রেসিডেন্ট সাত্তারের মোটর-কেইড চলে যেতেই সড়ক ক্লিয়ার হয়। মোর্শেদ তার জংধরা বজরা গোছের বাইকটিতে ঝড়োগতি তুলে মিনিট বিশেকের ভেতর নিয়ে আসে জেমস ফিনলে কোম্পানির সবুজ গাছপালায় সুনসান একটি চা বাগানে। বনজ একটি গাছের ছায়ায় সে বাইক পার্ক করে। গাছটি থেকে ঝুলছে প্রচুর স্বর্ণলতা। আরিয়া ওখানে দাঁড়িয়ে সমান করে ছাঁটা চা ঝোপের দিকে তাকায়। বছর কয়েক আগে টিভির ন্যাশনেল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে সে সমুদ্রে ভেসে ওঠা শ্যাওলা মাখা জোড়া তিমির ডকুমেন্টারি দেখেছিল। সামনের কালচে—সবুজ টিলা দুটির দিকে তাকাতেই সাগর জলে পরস্পরের কাছাকাছি আসা তিমি দুটির ইমেজ তার মনে ভাসে। সে ছবি তোলার জুতসই প্রেক্ষিত পাওয়ার জন্য দু-পা সামনে বেড়ে ঘাড় ঘোরায়, আর তার চোখের সামনে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। প্রতিটি চা ঝোপের কাছে পিঠে বেতের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে নারীশ্রমিকরা দারুণ দক্ষতায় খুঁটে তুলছে নরোম কুঁড়ি। এ দৃশ্যপটের প্রতিটি ডিটেলের দিকে নজর রেখে আরিয়া মৃদু স্বরে বলে,‘ থ্যাংক ইউ সো মাচ মোর্শেদ, তোমার সাথে সাহস করে আজ না বেরোলে এ রকম সুন্দর একটি দৃশ্য দেখা থেকে আমি বঞ্চিত হতাম। একটা বিষয়ে গেল কয়েকদিন ধরে আমার মধ্যে খুব এ্যংজাইটি হচ্ছিল। এখানে তোমার সাথে আসতে পেরে মন থেকে সব দুঃশ্চিন্তা উবে গেল।’
মোর্শেদ আগে থেকে রোল করা একটি জয়েন্টে টান দিয়ে তা আরিয়ার হাতে তুলে দিয়ে মন্তব্য করে,‘ মনে হয় তুমি কোনো কিছু নিয়ে ডিলেমায় আছো, ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছ না- কোন দিকে যাবে?
’ আরিয়া ধোঁয়া ছেড়ে জয়েন্ট ফিরিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলে,‘ ইউ সিমস্ অ্যান ইন্টারেস্টিং গাই। হাউ ডু ইউ নো অল দিস? কীভাবে বুঝলে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমার মধ্যে চেপে বসেছে?’
মোর্শেদ নিরাসক্তভাবে বলে, ‘ আমিও মাঝে মাঝে ডিলেমায় পড়ি, ঠিক বুঝতে পারি না আমার করনীয় কী? তখন প্রাকৃতিক পরিবেশে চুপচাপ কিছুক্ষণ হাঁটলে মন শান্ত হয়ে আসে।’
আরিয়া বাইকে ফিরে মোর্শেদের কাঁধে হাত রেখে সিটে বসতে বসতে বলে,‘ আমার মা-বাবাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। তাঁদের ইচ্ছায় বাধা দিয়ে আমি দুঃখের কারণ হতে চাই না। কিন্তু তাঁরা যা চাচ্ছেন, তাতে এখনই সায় দিতে… তোমাকে কী বলবো ..আই ডোন্ট থিংক আই অ্যাম রেডি ফর দ্যাট।’
মোর্শেদ আরিয়ার দ্বিধাদ্বন্দ্বের বিষয়টি নীরবে শোনে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে সশব্দে বাইকে কিকস্টার্ট দেয়।

টিলা-প্যাচানো সর্পিল সড়কে গোটা দুয়েক বাঁক ফিরতেই দেখা হয়, মোর্শেদের বন্ধু চা বাগানের এ্যসিসটেন্ট ম্যানেজার ইশতিয়াকের সাথে। সে ইউক্যালিপটাসের দীঘল একটি সারির পাশে দাঁড়িয়ে তিনজন শ্রমিক সর্দারদের সাথে কথা বলছে। তার পাশে ট্রেলারে করে সারের বস্তা টেনে নেওয়া একটি ট্র্যকটর দাঁড়িয়ে পড়ে ফটফট আওয়াজ ছড়াচ্ছে। তাদের দেখতে পেয়ে ইশতিয়াক ধীরে-সুস্থে কথাবার্তা সেরে হেঁটে এসে হ্যালো বলে। সাদা সর্টস এর সাথে একই বর্ণের টেনিস সার্ট ও স্নিকার পরায় কালো শাল-প্রাংশু গোছের শরীরওয়ালা তরুণটিকে হ্যান্ডসাম দেখায়। সে হ্যাট খুলে আরিয়াকে বাগানে ওয়েলকাম জানালে, তার কথা বলার সফ্ট-স্পোকেন ভঙ্গিটি আরিয়ার ভালো লাগে। জবাবে সে পরিচিত হতে-হতে লাজুকভাবে বলে,‘ আন-ইনভাইটেভ ভাবে আপনার টি এস্টেটে এসে পড়েছি, আশা করি এতে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।’
ইশতিয়াক আরিয়াকে বিব্রত হওয়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে মাথায় সাদা বারান্দাওয়ালা হ্যাটটি চাপাতে-চাপাতে বলে,‘ গিভ মি দ্যা অনার টু ইনভাইট ইউ ফর লাঞ্চ টু মাই বাংলো।’

তখনই আরিয়ার চোখে পড়ে, ইশতিয়াকের গলায় ঝুলানো সোনার লকেটে এনগ্রেইভ করা একটি সেতারের নক্সা। টুকটাক কথাবার্তায় খুব সহজাতভাবে তাদের তিনজনের সংগীতপ্রীতির প্রসঙ্গ চলে আসে। আরিয়া জানতে পারে, ইশতিয়াক ও মোর্শেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে। তারা ‘শুদ্ধ সঙ্গীত গোষ্ঠি’ বলে একটি প্রতিষ্ঠানের জলসায় প্রতি মাসে হাজিরা দিত। আরিয়া ভালোবাসে ব্লুগ্রাস মিউজিক, ইশতিয়াক সংগীতের এ ধরনের ঘরানার সাথেও পরিচিত শুনে সে খুশি হয়। তবে এদেশে সহজে ব্লুগ্রাসের টেপ বা সিডি পাওয়া যায় না। তা শুনে আরিয়া বলে,‘লুক, আই অ্যাম ক্যারিং সেবারেল ব্লুগ্রাস সিডিজ উইথ মি। এগুলো আমেরিকাতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন দরকার নেই। সিডিগুলো আমি গিফ্ট হিসাবে দিতে চাই, হোপ ইউ উইল একসেপ্ট দিজ।’

ইশতিয়াকের ঝাঁ চকচকে বাইকটির পেছন পেছন ভর দুপুরে তীব্র রোদ মাথায় পতঙ্গের ধ্বনিময় সড়কে মোর্শেদ বাইক চালায়। তার পেছনের সিটে বসে যেতে যেতে আরিয়ার মধ্যে রহস্যময় অভিজানের এক্সাইটমেন্ট ছড়ায়। বাংলোটি বেশ উঁচু একটি টিলার ঢালে। খোলামেলা পর্টিকোতে কুশনপাতা বেতের সোফায় বসতেই এলোমেলো হাওয়া এসে জুড়িয়ে দেয় আরিয়ার শরীর। ইশতিয়াক বাবুর্চিকে ডেকে লাঞ্চের জন্য টেবিল লাগাতে বলে। মোর্শেদকে অস্থির দেখায়, সে ব্যাকপ্যাক থেকে আধ-বোতল রাম বের করে গলায় ঢেলে নিট সিপ নেয়। তারপর বোতলটি আরিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিলে সে উৎসাহ না দেখিয়ে বলে, ‘ আই লাইক অ্যা লিটিল রাম উইথ কোক অর ফ্রুট জুস। কিছু না মিশিয়ে রাম খেতে চাচ্ছি না।’
ইশতিয়াক হাঁকডাক করে ব্লেন্ডারে আনারসের চাকতি ক্র্যাশ করে তাতে অল্প একটু রাম মিশিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। আরিয়া তাতে চুমুক দিয়ে বলে,‘ম্যান, ইউ আর অ্যা সুপার ফাইন হোস্ট। ইট টেইস্ট সো গুড।’

বাবুর্চির ইশারায় তারা ডায়নিংরুমে এসে টেবিল ঘিরে বসে। গ্লাসে গোঁজা ধবধবে সাদা ন্যাপকিন তুলে নিতে নিতে আরিয়ার খেয়াল হয় যে, সে ইশতিয়াকের সাথে জেমস জয়েসের ‘এ পোর্ট্রেট অব দি আর্টিস্ট অ্যাজ অ্যা ইয়াংম্যান’ পুস্তকটির চরিত্র নিয়ে আলাপ করছে, আর উল্টাদিকে বসে মোর্শেদ ডিশ থেকে প্লেটে এগফ্রাইড রাইস নিতে-নিতে আড়চোখে তাকে দেখছে। সচেতন হতেই টেবিলের তলা দিয়ে পা বাড়িয়ে মোর্শেদ তার পা ছোঁয়। তখনই তার তলপেটে চেনা এক অনুভূতি কী যেন এক প্রত্যাশায় শিরশির করে ওঠে। কোফ্তা আর স্যালাদ দিয়ে ভাজা পেঁয়াজ ছড়ানো ফ্রাইড রাইসের লাঞ্চ বেশ ভালোভাবেই জমে। খাওয়া দাওয়ার পর তারা এসে ড্রয়িংরুমে বসে। পরিবেশিত হয় কমলালেবুর রসে জারিত কিশমিশ মেশানো পেঁপের ডেজার্ট। তা খাওয়ার সময় বাগানের এক চৌকিদার ছুটে এসে ইশতিয়াককে একটি ঝামেলার রিপোর্ট করে। বস্তির কিছু লোকজন শ্রমিকলাইনে ঢুকে পড়ে কী কারণে জানি গোলামাল পাকাচ্ছে। চৌকিদারের কথা শুনতে শুনতে ইশতিয়াকের ভ্রু কুঁচকে ওঠে। তাকে চিন্তিত দেখায়। বাবুর্চি ট্রেতে করে টিপট নিয়ে আসে। কিন্তু সৌরভ ছড়ানো চা পানের অবকাশ হয় না ইশতিয়াকের। সে সিগ্রেট লাইট করে আরিয়ার কাছে অ্যাপোলজি চেয়ে চৌকিদারকে গ্যারেজ থেকে বাইক বের করার নির্দেশ দেয়। অতঃপর ইশতিয়াক মাথায় হেলমেট চাপাতে চাপাতে বলে,‘ স্যরি, আই রিয়েলি হ্যাভ টু গো এন্ড টেকোল দ্যা ট্রাভোল। বাট আরিয়া এন্ড মোর্শেদ, প্লিজ বি মাই গেস্ট। তোমরা বাংলোর গেস্টরুম ব্যবহার করতে পার। কেউ তোমাদের ডিসটার্ভ করবে না। সো এনজয় ইয়োর আফটারনুন।’

ইশতিয়াকের বাইকে কিকস্টার্টের শব্দ দূরে অপসৃত হয়। মোর্শেদ ও আরিয়া ড্রয়িংরুমে বসে চুপচাপ চা পান করে। আরিয়া এক সাথে দুটি মার্লবরো জ্বালিয়ে একটি মোর্শেদকে অফার করলে সে ধুন ধরে কিছুক্ষণ স্মোক করে। তারপর উঠে ড্রয়িংরুমের টিপয় থেকে তুলে নেয় ভারী একটি ক্যাসেট প্লেয়ার। সে অন্যহাতে ব্যাকপ্যাকটি তুলে- নিরাসক্তভঙ্গিতে উঠে পড়ার ইশারা দিয়ে গেস্টরুমের দিকে পা বাড়ালে, আরিয়া আধপোড়া সিগ্রেটটি অ্যাসট্রেতে পিষে নীরবে তাকে অনুসরণ করে। সুপরিসর কামরার চারদিকে নজর বুলিয়ে আরিয়া কৌতূহলি চোখে চা-গাছের শিকড়ের ফ্রেমে তৈরী একটি গ্লাসটপ টেবিল খুঁটিয়ে দেখে। মোর্শেদ দরোজার ছিটকিনি আটকিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। আরিয়া মৃদু হাসিতে কৌতূক ছড়িয়ে মন্তব্য করে, ‘ম্যান, ইউ সিমস্ কুকিং আপ অ্যান আইডিয়া।’
কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে মোর্শেদ প্লাগ পয়েন্টে প্লেয়ারটি কানেক্ট করে তাতে একটি ক্যাসেট পুরে তা অন করে বলে,‘ দ্যা অনলি আইডিয়া আই হ্যাভ ফর দিস ঈভনিং ইজ টু প্লে সাম ইন্টারেস্টিং ভায়োলিন ফর ইউ।’
প্লেয়ারে ডক্টর রাজম শংকরের বেহালা-বাদন মূর্ত হলে, আরিয়া তার ধ্বনিকে উপেক্ষা করে কাছে এসে মোর্শেদের বুশসার্টের বোতাম খুলে লোমশ বুকে মৃদু চাটি মেরে বিদ্রুপ করে,‘ ইউ হ্যাভ নট কেইম আপ উইথ অ্যান আইডিয়া, রাইট! ইউ আর অ্যা প্যাথেটিক লায়ার।’

সে আরো কিছু বলতে গেলে মোর্শেদ দু হাতে তার গাল চেপে ধরে ঠোঁটে চুমো খায়। আরিয়া প্রতিদানে তাকে কিসব্যাক না করে তার গ্রীবা পিছন দিকে হেলিয়ে মোর্শেদকে তার নেকলাইনে চুমো খাওয়ার সুযোগ করে দেয়। সে আবেশে চোখ মুদে অন্তরঙ্গতাটুকু উপভোগ করে। তাদের শরীরে জমে ওঠা দুটি ভিন্ন অঙ্গের সুর যেন পরস্পরের কাছাকাছি এসে একত্রে বেজে ওঠার উপায় খুঁজছে। চোখ খুলে আরিয়া প্রথমে নীরবতা ভাঙে। গ্লাসটপ টেবিলে রাখা ব্লোআপ করা ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট একটি ফটোগ্রাফের ওপর তার নজর পড়লে- ‘হোয়াট অ্যা লাভলি পিকচার’ বলে সে ফ্রেমটি হাতে তুলে নেয়। ছবিতে একটি ছোট্ট মৌটুসি পাখি সুঁচালো ঠোঁটে বিদ্ধ করছে করবী ফুলের কোরক। মাটিতে পুষ্প ও খেচরের সমান্তরাল ছায়াতে চায়নীজ ইন্কে করা মোর্শেদের পরিষ্কার সই। তাতে আঙ্গুল রেখে সে ফের উচ্ছ্বাস ছড়ায়,‘তুমি এত সুন্দর ছবি তোলো, মুর্শেদ!’
প্রশংসাতে বিব্রত হয়ে সে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলে,‘ হাউ ডু ইউ লাইক দ্য ভায়োলিন, আরিয়া? ডক্টর রাজম শঙ্করের বাজনা তুমি আগে কখনো শুনেছো? উনার বাবা ভিদওয়ান নারায়ন ছিলেন কারনাটাকি মিউজিকের গুরু। তাঁর কন্যা, ভাই, নাতনি- পুরো পরিবারের সবাই ভায়োলিন বাজায়।’
আরিয়া কাটখোট্টাভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে,‘ দিস ভায়োলিন সাউন্ডস্ কুল, আমি কিন্তু তোমার রাজাম শংকরের পরিবার সম্পর্কে ইন্টারেস্টেড না।’
এ মন্তব্যে মনক্ষুন্ন হয়ে মোর্শেদ জানতে চায় ,‘ জাস্ট টেল মি হোয়াট আর ইউ ইন্টারেস্টেড ইন আরিয়া?’
সে দুষ্টুমি করে ওড়না খুলে নিয়ে তা মোর্শেদের গলায় প্যাচিয়ে ফিক করে হেসে বলে,‘ আই গেস্, মাই ইন্টারেস্ট ইজ ইউ, নট ডক্টর রাজামস্ ফ্যামিলি।’
বলেই সে গণ্ডদেশে লালিমা ছড়িয়ে ঢুকে পড়ে এটাচড্ বাথে।

বাথরুমে আরিয়া বেশ খানিকটা সময় নিচ্ছে। মোর্শেদের অধৈর্য লাগে। তার মাথায় একটি আইডিয়া খেললে সে কামরার দুটি বিশাল আকারের জানালা খুলে আলো ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয়। সূর্য হেলছে, তাই তেরছা মতো কিছু রশ্মি এসে ঝলমলিয়ে তোলে গ্লাসটপ টেবিলটি। তার নিচে চা-গাছের কোঁকড়া শেকড়ে ফ্লোরের মোজেকেও তৈরি হয়েছে আকর্ষণীয় ছায়া। মোর্শেদ ব্যাকপ্যাক থেকে তার জেনিথ ক্যামেরাটি বের করে একটি কম্পোজিশনের কথা ভাবে। আরিয়া টেবিলের ওপারে দাঁড়ালে, ফ্লাশ ব্যবহার না করে হাইস্পিড ফিল্মে তাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে টেবিলটপ, তাতে রাখা করবী ফুলে বসা মৌটুসি পাখির ছবি ও শেকড়ের ছায়া সবই গাঁথা যায় আলোকচিত্রের এক সূত্রে।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে আরিয়া। তার শরীর থেকে অপসারিত হয়েছে স্কিনি রিপড্ জিন্স ও স্লিভলেস ফতুয়া। ঊরুতে জড়ানো কালো ফিসন্যাটের বন্ধনীর বর্ণের সাথে সাযুজ্য রেখে একই ম্যাটিরিয়েলের অন্তর্বাসে হলুদাভ ত্বকের নারীটিকে দেখায় ম্যানস্ ম্যাগাজিনের পৃষ্টায় মুদ্রিত মডেলের মতো। সে ফস করে একটি মার্লবরো লাইট করে হেঁটে যায় পিকচার উইন্ডোর সামনে। একটু সময় ওখানে দাঁড়িয়ে চুপচাপ স্মোক করে। তারপর আধপোড়া সিগ্রেটটি জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে ঘুরে তাকিয়ে বলে,‘ ইউ ওয়ান্ট অ্যা পিকচার মোর্শেদ, ঠিক আছে, পেছন থেকে তুমি স্ন্যাপ নিতে পারো। আই ডোন্ট মাইন্ড। কিন্তু প্লিজ..ছবিতে আমার মুখ ইনক্লুড করবে না।’
বলেই সে ফের পিকচার উইন্ডো দিয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করে সমান করে ছাঁটা চা-ঝোপে ভরপুর টিলাটির ঢালে। নিচে একটি ছড়া-নদীর ওপরে বাঁশের সাঁকো ধরে হেঁটে যাচ্ছে বেতের ঝুড়ি পিঠে শ্রমজীবী নারীদের একটি সারি। তাদের চলাচলে নজর রেখে সে ক্লিপ খুলে নিয়ে পিঠে ছড়িয়ে দেয় দীর্ঘ চুল।

ক্যামেরার ক্লিক শব্দটি নীরবতায় চিড় ধরিয়ে দেয়। আরিয়া নিস্পন্দ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কোমর বাঁকা করে। কিন্তু ফের স্ন্যাপশট নেয়ার আগ্রহ হারায় মোর্শেদ। কিছুক্ষণ ঘটে না কিছুই। তাদের যুগল স্তব্ধতায় জানালা দিয়ে ভেসে আসা পতঙ্গের ধ্বনিপ্রবাহ জুড়ে দিচ্ছে নৈসর্গিক এক মাত্রা। বিড়ালের মতো পা টিপে সামনে বাড়ে মোর্শেদ। নিতম্বের বঙ্কিম ভাঁজে পুরুষালি হাতের ছোঁয়া লাগতেই আরিয়ার মেরুদণ্ড বেয়ে শিরশিরানি উঠে যায় তার করোটিতে। সে হাতটি মুঠো করে ধরে, তা দিয়ে কোমর পেচিয়ে গ্রীবা বাঁকিয়ে মোর্শের্দের দিকে তাকায়। সে তাকে কাছে টানলে আরিয়া চুমোর প্রত্যাশায় বাড়িয়ে দেয় তার ঠোঁট। কিন্তু তাতে সাড়া না দিয়ে চোখে চোখ রেখে শীতলভঙ্গিতে ফিসফিসিয়ে মোর্শেদ জানতে চায়,‘ তুমি আমাকে এভাবে তোমার ছবি তোলার সুযোগ দিলে কেন, আরিয়া?’
ফিক করে হেসে সে জবাব দেয়,‘ মোর্শেদ, কিছুক্ষণ পর আমি বাংলোর এ কামরায় থাকবো না। সপ্তাহ দুয়েক পর আমি এদেশেও থাকবো না..আই উইল বি রিটার্নিং ব্যাক টু ফার ফার অ্যাওয়ে ইন কলম্বিয়া ইউনিভারসিটি ক্যামপাস.. প্লিজ ট্রাই টু ইমাজিন দিস।’
সে কী বলতে চাচ্ছে তা বুঝতে না পেরে মোর্শেদ তাজ্জব হয়ে তাকায়! তখন আরিয়া তার বোতাম-খোলা বুকে হাত দিয়ে বলে,‘ আমি চাই ছবিটি তোমার কাছে থাকুক।’ বিরক্ত হয়ে মোর্শেদ জানতে চায়,‘ হোয়াই? টেল মি আরিয়া?’
সে ফের ফিক করে হেসে ঠোঁটেমুখে দুষ্টুমি ফুটিয়ে তুলে বলে,‘ আই লাইক ইউ টু লুক অ্যাট দ্য পিকচার এন্ড বার্ন…।’
বাঁধ ফেটে তোড়ে বেরিয়ে যাওয়া বেনোজলের মতো মোর্শেদের ইমোশন এবার উথলে ওঠে। সে পাঁজাকোলা করে আরিয়াকে নিয়ে যায় অন্য একটি পিকচার উইন্ডোর পাশে পাতা খাটে।

জানালার লেসে বোনা পর্দা চুঁইয়ে তেড়ছা আলো এসে পড়েছে আরিয়ার শরীরে। পাশে বেডকভারের ওপর সাপের খোলশের মতো পড়ে আছে তার ফিসন্যাটের অন্তর্বাস। মোর্শেদ মৃদু আলোয় স্বপাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থাকা হলুদাভ ত্বকের নারীদেহের দিকে তন্ময় হয়ে তকিয়ে থাকে। আরিয়ার শুয়ে থাকার ভঙ্গির মাঝে চিত্রকলার পুস্তকাদিতে দেখা নগ্নিকাদের দেহলতার প্রচুর মিল আছে। মোর্শেদ অবলোকন করতে করতে ভাবে,এ পোশ্চারটি আরিয়া কি সচেতনভাবে তৈরি করেছে? তার ধারনা বিস্তৃত হবার অবকাশ পায় না। আরিয়া চোখ খুলে জড়ানো স্বরে বলে,‘ হোয়াট আর ইউ লুকিং অ্যাট? আই অ্যাম নট অ্য মডেল অর এনিথিং, কামঅন.. ম্যান।’ নারীদেহের অভিজ্ঞতা মোর্শেদের অতি সল্প, যৎসামান্য যা-ও আছে, তা আদতে সম্পন্ন হয়েছে আবেগ বহিভূর্তভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। তাই পারস্পরিক স্পর্শের উষ্ণতায় উদ্দীপ্ত হতে হতে সে হৃদয়ের গহনে প্রথম বারের মতো অনুধাবন করে- এ মিথস্ক্রিয়ার প্রসন্ন ক্রীড়াপ্রবণ অনুভূতি। জোড়া শরীর যুগলবন্দীর মতো তৈরি করে চলছে সুসংহত এক সঙ্গীত। মোর্শেদের তীব্র আলিঙ্গনের ভেতর মৃদু বৃষ্টিপাতে যেন সিক্ত হয়ে আরিয়া খামচে দেয় তার পিঠ।

বজ্রবৃষ্টি পরবর্তী নীলাভ আকাশের মতো নির্ভার অনুভূতি নিয়ে কামরার এক কোণে রাখা রকিংচেয়ারে এসে বসে মোর্শেদ। একটু তফাতে কাউচে শরীরে বেডকভার জড়িয়ে বসে আছে আরিয়া। সে নিরিখ করে তার বর্ণিল নখের চিত্রে যেন খুঁজছে কোন অসংগতি। তার চোখমুখে গাঢ় হয়ে ফুটছে উদ্বেগের ম্লান আভা। তা অবলোকন করে মোর্শেদ জানতে চায়,‘ ইজ এনিথিং বদারিং ইউ আরিয়া, এ রকম মন খারাপ করে বসে আছ যে?’
তার দিকে না তাকিয়ে নিরাসক্তভাবে সে জবাব দেয় ‘ নো ট্রাবোল, নট রিয়েলি, আই অ্যাম অলরাইট।’
আরিয়ার মন্তব্যে আশ্বস্ত না হয়ে মোর্শেদ কোনো প্রটেকশন ব্যবহার না করার প্রসঙ্গ তুলে জানতে চায়- এ জন্য কি আরিয়ার স্ট্রেস হচ্ছে। সে এবার চোখ তুলে জবাব দেয়,‘ দেয়ার আর পিলস্, মনিং আফটার বলে একটা ব্যাপার আছে।’ তারপর পজ্ নিয়ে মৃদু হেসে মন্তব্য করে,‘ তুমি বোধ হয় এসব বিষয়—আশয় তেমন জানো না, মোর্শেদ।’
এতে সে একটু আহত হয়ে বলে,‘ আমি তোমার চোখেমুখে পরিষ্কার স্ট্রেস দেখছি আরিয়া।’
সে উঠে বুকের ওপর বেডকভারটি প্যাচিয়ে গিট্টি দিয়ে তার কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলে,‘ নট টু ওয়ারি। আমি মজার একটি বিষয় ভাবছিলাম।’
মোর্শেদ পরিষ্কার বুঝতে পারে যে, সামান্য সময় আগে দারুণভাবে অন্তরঙ্গ হওয়া মেয়েটি তার গহনে কী ঘটছে তা খুলে বলতে চাচ্ছে না। তো সে-ও আগ্রহী হয়ে ওঠার ভান করে বলে,‘ ও-কে আরিয়া, গো এহেড, টেল মি… মজার ঘটনাটা কী?’
আরিয়া নিরাসক্তভাবে জানায়,‘সপ্তাহ দুয়েক পর আমি যখন কলম্বিয়া ইউনিভারসিটির ক্যাম্পাসে ফিরে যাবো, তখন নানা দেশ থেকে জড়ো হওয়া ইন্টারন্যাশনেল স্টুডেন্টসদের একটি পার্টি হবে। দিস ইজ গোয়িং টু বি অল গার্লস্ পার্টি। ছেলেরা পার্টিতে যোগ দেবে না, এমন কী কোন মেয়ের বয়ফ্রেন্ডকেও আমরা এ পার্টিতে ইনভাইট করবো না।’
বলে চোখেমুখে রহস্য ফুটিয়ে তাকালে মোর্শেদ উত্যক্ত হয়ে জানতে চায়,‘ হোয়াই, ছেলেদের ইনভাইট করবে না কেন আরিয়া?’
চটজলদি জবাব আসে,‘ বিকজ, আমরা- নানাদেশের মেয়েরা আমাদের সামারের ছুটিতে আমাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো। মেয়েরা খোলামেলা ভাবে একে অপরকে তাদের সামার কনকোয়েস্টের কথা ডিটেলস্সহ বলবে।’
মোর্শেদ পুরো বিষয়টি ঠিক মতো বুঝতে না পেরে জানতে চায়,‘ হোয়াট ইজ সামার কনকোয়েস্ট আরিয়া?’
সে ফিক করে হেসে তার চোখে চোখ রেখে বলে,‘ ইউ আর অ্যা বিট নাইভ, সিম্পলটন মোর্শেদ, তোমার সরল-সিধা ইনোসেন্ট ব্যাপারটা আমার কিন্তু খুব ভালো লেগেছে।’
অতঃপর সে তার বাইসেপে হাত রেখে ফিসফিসিয়ে বলে,‘ সামার কনকোয়েস্ট হচ্ছে..গ্রীষ্মের ছুটিতে হঠাৎ করে কোন পরিকল্পনা ছাড়া কারো সাথে আউটিংয়ে যাওয়া, এক্সাইটিং কিছু করা.. লাইক রিয়েল ফান। গার্লস রিইউনিওনে আমি তোমার সাথে এ বাংলোতে আসার গল্প বলবো ভাবছি, হোয়াট অ্যা লাভলি ন্যাচারেল সেটিং… আর তুমি… ম্যান, ইউ আর রিয়েলি স্ট্রং এন্ড এথলেটিক।’
বলে তার দিকে আবেশভরা চোখে তাকালে, হঠাৎ করে মোর্শেদের করোটিতে নিভে আসা অংগারের স্তূপে জেগে ওঠা নীল শিখাটির মতো জ্বলে ওঠে বাসনাদগ্ধ প্যাসোনের বহ্ণি। আরিয়ার হাত ধরে তার দিকে আকর্ষণ করলে সে অবাক হয়ে বলে,‘ এগেইন! ওহ হেল নো, আই নিড টু গো ব্যাক।’ মোর্শেদের মুঠো শ্লথ হলে সে হাত ছাড়িয়ে নেয়, কিন্তু দূরে সরে যায় না। বরং কাছে এসে মোর্শেদের চুল মুঠো করে মৃদুগতিতে আংগুল চালায়। তারপর তারা চুপচাপ বসে থাকে পাশাপাশি।

প্রত্যাখানে তার ক্রোধ হচ্ছে না দেখে মোর্শেদ নিজেই অবাক হয়। তাদের পারস্পরিক নীরবতা কেন জানি দারুণভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে। অনেক বছর আগে ইউনিভারসিটির পাঠ্যবইতে পড়া ওয়াল্ট হুইটম্যান এর কবিতার দুটি ছত্র ফিরে আসে মোর্শেদের মনে,‘ দেয়ার ইউ টু,/ হ্যাপি ইন বিয়িং টুগেদার/স্পিকিং, পারহেপ্স নট অ্যা ওয়ার্ড।’
কিন্তু চরণ দুটি মুখ ফুটে আরিয়াকে বলতে তার লজ্জা হয়। তখনই নজরে পড়ে, আরিয়াও তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।

এক পর্যায়ে আরিয়া খাট থেকে তার অন্তর্বাসাদি কুড়িয়ে নিয়ে চলে যায় বাথরুমে। মোর্শেদ তার ব্যাকপ্যাক থেকে একটি কার্ড বের করে দ্রুত পেন্সিলে আরিয়ার গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকিয়ে থাকার ভঙ্গিটি স্ক্যাচ করে। নিচে ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতার চরণ দুটি চায়নীজ ইন্কে যত্ন করে লেখে। বাথরুম থেকে চুল গুছিয়ে সুপ্রসাধিত হয়ে বেরিয়ে আসে আরিয়া। মোর্শেদ কার্ডটি তার হাতে তুলে দিলে, সে তা আড়চোখে দেখে পার্সে ঢুকিয়ে বিজনেস্-লাইক ভঙ্গিতে জানতে চায়,‘মারিয়া আপা ঘরে ফেরার আগেই আমি বাড়ি ফিরতে চাচ্ছি, ক্যান ইউ টেক মি হোম, মোর্শেদ?’
সে ঘাড় হেলিয়ে সায় দেয়,‘ অবকোর্স আই ক্যান, মিনিট তিরিশেকে ফিরে যাওয়া যাবে শহরে।’

বিদায় জানানো বাবুর্চির হাতে টিপস্ হিসাবে কিছু টাকা তুলে দিয়ে বাইকের ব্যাকসিটে চাপে আরিয়া। বাংলোর ঢালু সড়কে উপত্যকার দিকে যেতে যেতে মোর্শেদের মানসপটে ফিরে আসে, অনেক বছর আগে সে যখন পরাগের স্ক্যাচ করেছিলো, তখন উচ্ছ্বসিত হওয়া কিশোরীটির আচরণের ইমেজ। এ তুলনায় আরিয়ার স্ক্যাচ দর্শনজনিত প্রতিক্রিয়া অনেকটা শীতল। আরিয়ার অনেক কিছুই পরাগের তুলনায় মাপা ও মনে হয় খানিকটা কালকুলেটেড। এ ধরনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ মোর্শেদের করোটিতে বেশী দূর বিস্তৃত হওয়ার অবকাশ পায় না। জারকিং এর তোড়ে আরিয়া পেছন থেকে তার কোমর জড়িয়ে ধরে। সমতল সড়কে আসলেও তার হাত মোর্শেদের শরীর ঘেঁষে ছড়াতে থাকে অন্তরঙ্গ উষ্ণতা।

আরিয়াকে ড্রপ করে দিয়ে আসার দুই দিন পর মোর্শেদ ফের তার আত্মীয় চা-করের বাড়ির দিকে বাইক চালায়। এ দুদিন তাদের মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। তবে শিশুশিক্ষার উপকরণ উন্নয়নের কাজে দারুণভাবে ব্যাস্ত থেকেও মোর্শেদ বারবার অন্যমনস্ক হয়ে আরিয়ার কথা ভেবেছে। নিদ্রাহীন রাতে তার অনুপস্থিতি মোর্শেদের দেহমনে জন্ম দিয়েছে কার্বাঙ্কলের মতো টনটনে বেদনাময় অস্বস্তি। মনে হয়েছে, এ পরিস্থিতি থেকে রিলিজ পাওয়া খুবই জরুরি। তাদের দেখা-সাক্ষাৎ না হলেও অপ্রত্যক্ষভাবে যোগাযোগ হয়েছে। তার বড়বোন মারিয়া ‘উদ্যোগ’ এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মশিবির পরিচালনা করতে এসে মোর্শেদের মেইল বক্সে ড্রপ করেছেন আরিয়ার পাঠানো একটি প্যাকেট। তাতে তার বন্ধু ইশতিয়াকের জন্য আরিয়া পাঠিয়েছে টেনিসির আফ্রিকান-আমেরিকান ব্লুগ্রাস সিংগার কার্ল জনসনের তিনটি সিডি। সাথে সাদামাটা একটি খোলা কার্ডে তার বাংলোয় আতিথেয়তার জন্য ছোট্ট একটি থ্যাংক ইউ নোট। মোর্শেদকে আরিয়া নতুন কোন কার্ড বা এ ধরনের কিছু পাঠায় নি। তবে তার স্ক্যাচ ও ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতার চরণ লেখা কার্ডটি ফেরত পাঠিয়েছে। এবং তার তলায় নীল কালিতে লিখেছে,‘ আই ডোন্ট লাইক ওয়াল্ট হুইটম্যান, আমার প্রিয় কবি হচ্ছে সিলভিয়া প্লাথ।’
এ তথ্যের নিচে সে ছোট্ট করে লিখেছে ‘লাভ, আরিয়া।’
স্ক্যাচ করা কার্ডটি ফেরত আসাতে ঈষৎ মনক্ষুন্ন হলেও বিষয়টি সে যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছে। তাকে আরেকবার চাক্ষুষ করার স্পৃহা অদম্য হয়ে উঠলে কার্ডের তলায় নীল কালিতে লেখা লাভ শব্দটি নিয়ে সে দারুণভাবে ভেবেছে। আর মনে হয়েছে, জাদুময় এ শব্দটি তার করোটিতে ভাংতি পয়সার মতো বাজছে ঝনঝনিয়ে।

আরেকটি বিষয় মোর্শেদের অপ্রাপ্তিজনিত হাহাকারে যুক্ত করেছে ঈর্ষা। ইশতিয়াকও তার কর্মস্থলে থেমেছিলো গতকাল। আরিয়া তার বাংলোতে অসাবধানতাবশত ফেলে রেখে এসেছিলো রেশমের সুতোয় এম্ব্রোডারি করে লেখা ভুলো না আমায় পাখাটি। সে পাখাটির সাথে আরিয়ার জন্য সুরভিত চা এর একটি প্যাকেট রেখে গেছে। তাতে স্টেপলারে আটকানো চিরকুটে বাংলোতে ফের বেড়াতে যাওয়ার জন্য অপেন ইনভাইটেশন। মোর্শেদকে বিমর্ষ দেখে ইশতিয়াক কৌতূক করে জানতে চেয়েছে,‘হোয়ার ইজ ইয়োর লাভবার্ড ফ্লাইং টু-ডে?’ এতে উত্যক্ত হয়েছে মোর্শেদ।

চা-করের বাড়ির গেটে বাইক পার্ক করে দারোয়ানের হাতে সে ভিজিটিং কার্ডটি তুলে দেয়। তারপর গোলমোহর গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে লুজ ট্যবাকো দিয়ে সিগ্রেট রোল করতে করতে খ্যাপার মতো অনাহুতভাবে এখানে ফের এসে পড়ার জন্য বিব্রত হয় মোর্শেদ। আরিয়াকে এক নজর চাক্ষুষ দেখার প্রেষণা তার মাঝে খানিকটা হ্রাস পেলেও সম্পূর্ণ তিরোহিত হয় নি। ভাবে, তবে কি পাখা ও চা এর প্যাকেটটি গেটে দারোয়ানের হাতে দিয়ে ফিরে যাবে। তখনই গেট খুলে দারোয়ান তাকে ভেতরে ঢুকতে ইশারা দেয়। কেয়ারি করা ফুল বাগিচার ভেতর দিয়ে সে হেঁটে যায়। যেতে যেতে শাপলাফোঁটা পুকুরের পাড়ে নাট্যজন আক্রাম হাবীবকে দেখতে পেয়ে অবাক হয়। আক্রাম সাহেব একটি ছাতার তলায় ইজিচেয়ারে আয়েশ করে বসে বাহারি পাইপে ধুমপান করছেন। প্রগতিশীল ঘরানার এ শক্তিমান নাট্যকার কাম চরিত্রাভিনেতার প্রতি মোর্শেদেরও শ্রদ্ধা আছে। তাই সে হাত তুলে তাঁকে সালাম জানায়। নাট্যজন ইশারায় আলেক দিয়ে মৃদু হেসে হাতে তুলে নেন একটি ম্যাগাজিন।

গাড়িবারান্দায় লাল রঙের ঝাঁ চকচকে পাজেরো ল্যান্ডক্রুজারের পাশ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে প্রশস্ত বারান্দায় উঠতেই দেখা হয় আরিয়ার সাথে। কর্ডলেস একটি রিসিভারে কারো সঙ্গে সে সেরে নিচ্ছে টেলিফোনিক আলাপ। মেয়েটি আজ লেবু রঙের একটি স্লিভলেস কামিজ পরেছে। সিল্কের সবুজাভ জমিনে গাঢ় কমলারঙের লেসের কাজ, তার সাথে ম্যাচ করে ঠোঁটেও সে বুলিয়েছে লিপস্টিকের নজরকাড়া বর্ণালি। রিসিভার সাইডটেবিলে রেখে আরিয়া বলে ওঠে, ‘হাই মোর্শেদ, ডিড ইউ সি দ্য থিয়েটার গাই আক্রাম হাবীব সিটিং রাইট বাই দ্য লিলি পন্ড?’
জবাবে মোর্শেদ মাথা হেলায়, কিন্তু বলার মতো তেমন কিছু খুঁজে পায় না। তাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিয়া উচ্ছল হয়ে জানায়,‘ দিস থিয়েটার গাই ইজ সো ঔসম, সে ব্র্যান্ড নিউ পাজেরো গাড়িটি কিনে কাল সারারাত ড্রাইভ করে চলে এসেছে এখানে। আক্রাম আমাকে আজ জয়-রাইড দেবে, একটু পর নিয়ে যাচ্ছে জাফলঙে।’ মোর্শেদ এবারও বলার মতো মুখে কিছু যোগাতে পারে না, তাই সে আরিয়ার কথার প্রতিধ্বনি করে বলে,‘ তো তুমি কি এখনই জাফলঙ যাচ্ছ?’
আরিয়া তার কব্জিতে লেবুরঙের স্ট্র্যাপে বাঁধা ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,‘ এই মিনিট বিশেকের মধ্যে আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি। আই অ্যাম শিওর, আই অ্যাম গোয়িং টু লাভ দিস আউটিং টু জাফলঙ।’
সৌজন্যবশত অতঃপর মোর্শেদ বলে ওঠে,‘ এই লেমন ও অরেঞ্জ কালারের কম্বিনেশনে তোমাকে খুব কালারফুল দেখাচ্ছে আরিয়া।’
কপ্লিমেন্টটি শুনে গণ্ডদেশে লাজরক্তিম আভা ছড়িয়ে আরিয়া কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলে,‘ আমার আম্মা চাচ্ছে, আমি এই জবরজং কামিজ সেট পরে আক্রামের সাথে আউটিংয়ে যাই। এই মাত্র আমার বাপি-ও ফোন করলো। আক্রাম নাকি এ দেশের হিউজ এক বিগ শট। আমার পেরেন্টসরা চাচ্ছে আমি এ থিয়েটার গাই এর সাথে এনগেইজড্ হই… আই অ্যাম নট শিওর আবাউট ইট, কিন্তু জয়-রাইডের অফারটা নিচ্ছি, আই অলওয়েজ ওয়ান্ট টু সি দ্য এক্সাইটিং ভিউ অব জাফলঙ।’
মোর্শেদ ‘হ্যাভ অ্যা নাইস ট্রিপ টু জাফলঙ’ বলে তাকে শুভেচ্ছা জানালে, আরিয়া হাত তুলে হাসিমুখে ‘গুডবাই’ বলে। সিঁড়ি বেয়ে গাড়িবারান্দায় নেমে আসার সময় আরিয়া পেছন থেকে ডাকে,‘ মোর্শেদ, লিসেন..হোয়েনেভার ইউ সি ইয়োর ফ্রেন্ড ইশতিয়াক, প্লিজ গিভ হিম মাই গ্রিটিংস।’
মোর্শেদ পেছন দিকে না তাকিয়ে বলে,‘ ও-কে, আরিয়া, আই উইল।’
তখন তার চোখে পড়ে, পাজেরো গাড়িটির লোহিত বর্ণের ঝলমলে চেসিসে ফুটে উঠেছে আরিয়ার পুরো দেহের ছায়া।

ট্র্যাফিকের ভীড়ভাট্টায় সামলে-সুমলে বাইক চালিয়ে মোর্শেদ চলে আসে শহরতলীর প্রান্তিকে। সকালে পুরো দিনের জন্য লিভ রিকোয়েস্ট সাবমিট করে বেরিয়েছিল, তাই আর অফিসে ফিরে যেতে ইচ্ছা হয় না। গোটা দুই গলিতে এলোপাথাড়ি ঘুরপাক করে সে অবশেষে চলে আসে শ্মশানঘাটে। ছড়া-নদীর পাড়ে মানব জীবনের এ অন্তিম ঠেকে এখনো কায়ক্লেশে দাঁড়িয়ে আছে গোটা তিনেক ডালপালা বিস্তৃত বৃহৎ গাছ। তার ডালে বসে ঝিমাচ্ছে বেশ কিছু আওয়ারা কাক। তাদের কর্কশ ধ্বনির সাথে স্তব্ধতা মিশে গিয়ে তাবৎ পরিবেশ খা—খা করছে। মোর্শেদ গাছের ছায়ায় বাইকটি দাঁড় করিয়ে দ্রুত একটি জয়েন্ট রোল করে নেয়। অলস ভঙ্গিতে স্মোক করতে করতে- মন থেকে আরিয়াকে ফের চাক্ষুষ করার স্পৃহা উবে গেছে অনুভব করে সে ভারি অবাক হয়। কাজা-কচ্চিৎ তার অলোকচিত্র বা ইলাস্ট্রেশন প্রকাশিত হয়ে থাকে পত্রপত্রিকায়। তো কোন ম্যাটেরিয়েল ছাপা হলে পত্রিকাটি কিনে তার নিজস্ব সৃষ্টি কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তা না দেখা পর্যন্ত সে শান্তি পায় না। কিন্তু একবার পত্রিকাতে চোখ বুলানোর পর তা খুঁটিয়ে ফের দেখার আগ্রহ সে হারায় দ্রুত। আরিয়ার ব্যাপারেও তার এ রকম হচ্ছে, তাকে নিয়ে আর নীরবে তর্পণ করতে তেমন একটা উৎসাহ হচ্ছে না। মনে হয়, কলম্বিয়া ইউনিভারসিটির অল গার্লস রিইউনিওনে আরিয়ার গল্পগুজবে তার সঙ্গে আউটিং এর প্রসঙ্গটি প্রধান্য নাও পেতে পারে। তা না-ই বা পেল।

জয়েন্টের আগুন নিভে আসলে সে পকেট হাতড়িয়ে লাইটার খুঁজে পায় না। খানিক দূরে একটি ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতিমন্দিরের চূড়ায় পিতলের জংধরা কলসিটি দুপুরের তীব্র রোদে ঝলসাচ্ছে। অনেকদিন পর তার মাঝে প্রাণবন্ত হয়ে ফিরে আসে পরাগের বিধুর স্মৃতি। আত্মীয়দের যে বাড়িতে সে বাস করত, তার একটি কামরায় বসে দুপুর বেলার নির্জনে সে নিচু স্বরে শুনছিল কুমার গন্দর্ভ এর নিরগুনি ভজন ঝিনি ঝিনি বিনি চাঁদারিয়া.. । সিঁড়ি বেয়ে পা টিপে টিপে নেমে এসেছিল পরাগ। মেয়েটি কেবলমাত্র গোসল সেরেছে। তার ভেজা চুলের গোড়ায় লেগে আছে পানির রূপালি বিন্দু। ফুলেল ছিটের হলুদাভ একটি কামিজ পরায় তার সারা চোখেমুখে খেলছে সূর্যমুখীর আভা। মোর্শেদের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই, সে ইশারায় ক্যাসেট—প্লেয়ারের ভলিয়ুম বাড়াতে অনুরোধ করে ফিরে গিয়েছিলো ওপরতলায়।

জয়েন্টের আধপোড়া বাকিটুকু স্মোক না করলে তার চলছে না। তাই মোর্শেদ ব্যাকপ্যাক খুলিবিলি করে একটি লাইটারের তালাশ পায়। তখন খেয়াল করে যে, আরিয়াকে চা-পাতার প্যাকেট ও পাখাটি দেয়া হয় নি। ফিরে গিয়ে চা-করের বনেদি বসতবাড়িটির গেটে এগুলো ড্রপ করে দেয়া যায়। কিন্তু অতো ঝামেলায় যেতে মোর্শেদের উৎসাহ হয় না। ভাবে,‘ উদ্যোগ’ এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফিরে প্যাকেটটি তার বড়বোন মারিয়া সুলতানার হাতে ধরিয়ে দিলেই হবে। সে নীরবে জয়েন্টের অবিশিষ্ট অংশটুকু স্মোক করে। তারপর ব্যাকপ্যাকের ঝিপার টেনে বন্ধ করতে গিয়ে পাখাটিতে রেশমের সুতোয় তোলা নক্সাটি তার নজরে পড়ে। তার নিচে একই রঙের সুতোয় আঁকা ‘ভুলো না আমায়’ বাক্যটি। পরাগের মুখ রাজ্যের সিগ্ধতা নিয়ে তার স্মৃতিপটে ফের উঁকি দেয়। আর সাথে সাথে একটি ভাবনা তার করোটিতে জিওল মাছের মতো নড়ে ওঠে। ইচ্ছা হয়, জলরঙের একটি নস্টালজিয়াধর্মী চিত্র আঁকার। ইলাস্ট্রেশনের কাজ পেশাদারীভাবে করলেও সৃজনশীল ধারায় চিত্রাদি সে তেমন একটা আঁকেনি। পাখায় আঁকা নক্সাটি তার মনে ধরে। ভাবে নক্সাকে ভিত্তি করে সে সৃজন করে নিতে পারে স্মৃতিময় একটি চিত্র। না, লোকধারায় করা নক্সাটির হুবহু অনুকৃতি সে করবে না। তবে ঝংকারের অনেকগুলো প্রতীকী চিহ্ণের সমবায়ে সে নতুনধারায় তৈরি করতে পারে বিমূর্ত আকৃতি। আর তাতে কবিতার একটি চরণ জুড়ে দিতে পারলে চিত্রটিতে যুক্ত হবে ভিন্ন এক ব্যঞ্জনা। পরিকল্পিত চিত্রের সাথে সাজুয্য রেখে কবিতার একটি পংক্তি খুঁজতে গিয়ে ফের তার ভেতর-জগতে অনুভব করে পরাগের অশরীরী উপস্থিতি। এবং সাথে সাথে বেশ কয়েক বছর আগে পড়া আমেরিকার কবি ই ই কমিংস্ এর একটি ছত্রও তার কানে অনুরণন ছড়ায়,‘ আই ক্যারি ইয়োর হার্ট উইথ মি..।’ ভাবতে ভাবতে রোদে পোড়া গাছ-বিরিক্ষের শাখা অতিক্রম করে দৃষ্টি চলে যায় মেঘভাসা নীলাকাশে। ওখানে চক্রাকারে ওড়ে দুটি চিল। তারা ঘুরতে ঘুরতে ব্যাপক এক ঘূর্ণন চক্রের অভ্যন্তরে তৈরি করে নিচ্ছে আকারে ছোট আরেকটি বৃত্ত।

ছোটগল্প

মায়াকুসুম
শিল্পী নাজনীন

রুবী নেমে গেছে খানিক আগে। আবছা অন্ধকারে রিকশা ছুটছে দ্রুতলয়ে। হাইওয়েতে রিকশার এই দ্রুতগতি, কেমন একটু ভয় ধরিয়ে দেয় মনে। অস্থির লাগে আমার। আমি অন্তুকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি। ওর ছোট্ট শরীরটা আঁকড়ে রাখে আমায়। হাওয়া কেটে রিকশা এগোয়। অন্তু আধফোঁটা কণ্ঠে বলে, আমলা কোতায় দাত্তি, মা?

পাখির উষ্ণতায় ওকে আগলে রেখে বলি, আমরা বাসায় যাচ্ছি, মা। আমরা এখন বাসায় যাচ্ছি।
অন্তু তোতাপাখির মতো আওড়ায়, বাতায় দাত্তি মা! আমলা একন বাতায় দাত্তি!

অন্তু দারুণ খুশিতে ঝলমল করে। রুবীর কিনে দেয়া লাল টুকটুকে গাড়িটা দুহাতে আঁকড়ে রাখে যত্নে, এমনকি আমি ধরতে গেলেও বিরক্ত হয়ে হাত সরিয়ে দেয়। হঠাৎ নিজের শৈশব এসে হামলে পড়ে স্মৃতিতে। আমার আর রুবীর হারিয়ে যাওয়া সেইসব দিন মনে পড়ে। দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস গড়িয়ে যায় হাওয়ায়। আহা। শিশুরা বড় সরল। -ভাবি আমি। কত অল্পেই তুষ্ট তারা, কত সামান্যেই খুশি। শুধু আমাদের মতো বড়দেরই যত অতৃপ্তি, যত অসন্তোষ আর হাহাকার। নইলে আজ রুবীর জীবনটা অন্যমরকম হতে পারত।

রুবী আমার ছোটবোন । একমাত্র বোন আমার। সেই ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর ওকে কোলে-পিঠে করে বড় করেছি আমি। আমার তখন আট। রুবীর চার। তবু আমিই মা হয়ে উঠেছিলাম রুবীর। কীভাবে পেরেছিলাম, এখন, এই মধ্যু-ত্রিশে এসে যত ভাবতে যাই, ততই অবাক হই, অবিশ্বাস্য লাগে। কী করে আট বছরের এক শিশু চার বছরের আরেক শিশুর মা হয়ে উঠতে পারে, অভয়াশ্রম হয়ে উঠতে পারে, প্রশ্নটা রীতিমতো বিস্মিত করে আমাকে। আমি থৈ পাই না ভেবে। হাল ছেড়ে দেই শেষে। ভাবনার নৌকা পাল তুলে ভেসে যায় দিগ্বিদিক। আশলে সময়ই মানুষকে বাধ্য করে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে। শিখিয়ে দেয় কঠিন সব সমস্যার সঙ্গে সহজ বাস্তুসংস্থানের নব নব তরিকা। নইলে ওই অতটুকু বয়সে মাকে হারানোর শোক কাটিয়ে রুবীর দেখভালের দায়িত্ব নেয়া আমার পক্ষে কী করে সম্ভব ছিল!

বছর খানেক বাদেই বাবা আবার বিয়ে করেছিল। আমি আর রুবী বাবার ভালোবাসা হারিয়েছিলাম তখন থেকেই। বিপুল বিস্ময় নিয়ে দেখেছিলাম সংসারের সঙ হয়ে ওঠা। আমাদের স্নেহময় বাবা ধীরে ধীরে হয়ে গেছিল নতুন মায়ের সন্তানদের আদর্শ বাবা। আমাদের মায়ের অতি যত্নে গড়া সংসারে আমরাই হয়ে উঠেছিলাম অবাঞ্চিত। আমাদের প্রতিদিনের খাবারে বরাদ্দ থাকত সংসারের উচ্ছিষ্টটুকু। আর সবাই খেয়ে যা কিছু বাঁচত, বাঁচতও সামান্যই, সেটুকুই সোনামুখ করে খেতে হতো আমাদের। কোনোরকম ট্যাঁখফোঁ বরদাশত করা হতো না। টুঁ শব্দ হলেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার জোর হুমকি জারি ছিল। ফলে ট্যাঁ ফো বড় একটা করতামও না আমরা। রুবী ছোট ছিল, অতটা বুঝতে চাইত না, তাকে থামাতে আমার নিজের ভাগের খাবারটুকুও তাকে দিতে হতো অনেক সময়। সেসব দিন গেছে। যাক।

সময় থেমে থাকে না। সব গ্লানিই একসময় সে ভাসিয়ে নেয় বহমানতায়। রুবীর আর আমার সেই গ্লানিময় দিনগুলোও ভেসে গেছে কালের খেয়ায়। তবু সব কি আর গেছে! যায় নি। যায় না। স্মৃতি নামক এক চোরাকাঁটা বিঁধে থাকে তবু মনের বনে। আছে। কারণে, অকারণে, সময়ে, অসময়ে সে জানান দেয় তার অস্তিত্ব। মানুষ অতীতপ্রিয়। সময় পেলেই সে স্মৃতির জাবর কাটে। তার কাছে অতীতের সময়টুকুই শ্রেষ্ঠ। সুযোগ পেলেই সে তাই অতীতে ফিরতে চায়। কিন্তু এটা সম্ভবত গড়পড়তা বিচার। মুষ্টিমেয়র হিসাব। আমি নিজে অন্তত অতীতে ফিরতে চাই না। আমি জানি রুবীও চায় না। আমাদের কাছে অতীত মানেই নিষ্করুণ এক পৃথিবী। স্নেহহীন এক মরুপ্রান্তর।

রুবীর জন্য মনটা ভারী হয়ে আছে। কতদিন পরে দেখা হলো আজ আমাদের! তবু কই, রুবীর চোখে তেমন আলো তো জ্বলল না আজ! তেমন উচ্ছ্বাস তো দেখাল না রুবী! অভিমানে চোখে জল জমে যায় আমার। বুকের মধ্যে কেমন একটা ব্যমথার ছুরি ঘাই মারে জোরে। তবু রুবীর সামনে অচঞ্চল, স্থির ছিলাম আমি। এমন একটা সময়ের হাত ধরে আমরা বেড়ে উঠেছিলাম, যত বাধা, যত বিপত্তিই পথ আগলে দাঁড়াক, স্থির থেকে সেখান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করতাম তখন আমরা দুবোন। সব অবহেলা, অপমান অগ্রাহ্য করে হাসিমুখে পথ করে নিতাম নিজের। ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণায়, কষ্টে, ছিঁড়েখুড়ে গেছি, জ্বলেপুড়ে গেছি, বুঝতে দেই নি কাউকেই। বুঝতে দেয়া মানেই হেরে যাওয়া। বুঝতে দেয়া মানেই পরাজয়। সে চর্চা এখনো বহাল। তাই রুবীকেও আজ বুঝতে দেই নি আমার কষ্ট। আমার শরীরের গন্ধ ছাড়া ঘুম হতো না যে রুবীর, মাত্র চার বছরের ব্যইবধান সত্বেও মা হয়ে উঠেছিলাম যে রুবীর, নিজে আধপেটা খেয়ে যাকে বড় করেছি, সেই রুবীর অমন শীতল আচরণ তাই কষ্ট দিলেও ঘুর্ণাক্ষরেও বুঝতে দেই নি রুবীকে। নিজেও তাই নিরুত্তাপ ছিলাম, নিরাবেগ। রুবীও আমার মতোই শামুক খোলসে লুকিয়ে রেখেছিল নিজেকে, আমি জানি। অন্তুর সঙ্গে খুনসুটি করছিল, আমার সঙ্গে শুধু দরকারের আলাপ। ওর-ও ভেতরে ভেতরে ক্ষরণ ছিল, ছিল চাপাকান্না। কেউ কাউকে সেটা বুঝতে না দিয়ে তবু দিব্যিপ হাসিমুখে কথা বলছিলাম আমরা। আমাদের মধ্যে কেন এই দূরত্ব, কেন এই আড়াল-প্রাচীর, কবেই বা তৈরি হলো সেটা, বুঝতে পারি নি একদম। হঠাৎ একদিন চমকে উঠে দেখি অনতিক্রম্যর বাধা, অপ্রতিরোধ্যক অভিমান মাথা তুলে আছে আমাদের সম্পর্কের মাঝে। রুবীর সামনে স্থির থাকলেও এখন পারি না। অভিমানে ঠোঁট কাঁপে, জল নামায় চোখ। অন্তু আমাকে চমকে দিয়ে বলে, তুমাল কী উইচে মা? কষ্ত উইচে তুমাল? কান্না কত্তিচো?
ওকে বুকের মধ্যে মিশিয়ে নিয়ে বলে, আমার কিচ্ছু হয় নি মা। কান্না করছি না। তুমি আছ না আমার কাছে! কান্না কেন করব আমি!
অন্তু একহাতে রুবীর দেয়া গাড়িটা ধরে অন্যহাতে আমার মুখে আদর করে। দুদিকে মাথা নেড়ে বলে, কান্না কত্তিচো না?
ওর কথায়, ওর এই ঐশ্বরিক ভালোবাসার ছোঁয়ায় অন্তর কানায় কানায় ভরে ওঠে আমার। বলি, না মা। কান্না কত্তিচি না।
অন্তু নিশ্চিন্ত হয়। খুশি হয়ে বলে, আচ্ছা। কান্না কলে না। কান্না কত্তে হোয় না।
আমি চুমুতে ভরিয়ে তুলি ওকে। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলি, আমার সোনাবাবাটা! আমার লক্ষ্মীবাবাটা!
আদরে গলে গিয়ে অন্তু বলে, আমি কান্না কলি না? দুত্তু কলি না?
না মা। তুমি লক্ষ্মীছেলে আমার। একটুও কান্না করো না, একটুও দুষ্টু করো না।
আচ্ছা। -বলে অন্যআদিকে মনোযোগ দেয় অন্তু। আমাকে রাস্তায় চলমান গাড়ি দেখিয়ে বলে, দেকচো আম্মু, কত্ত গালি? ছুন্দল না?
দেখেছি মা। অনেক সুন্দর।

উল্টোদিক থেকে ধেয়ে আসা বাসটায় চোখ যায় আমার। সন্ধ্যার আবছায়া অন্ধকার তীব্র আলোয় উড়িয়ে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে আমাদের নাক বরাবর। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে আমার। অন্তুকে শক্তহাতে আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে উঠি আমি।

অন্তুর কান্না থামে না। আমার মুখের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে অন্তু কাঁদে। আম্মু কী উইচে তুমাল? আম্মু ওথো, এই আম্মু! -অন্তুর সবে দুই। ওর আধফোটা কথায় আর চিৎকারে ভীড় জমে যায়। গাড়ি চলাচল থেমে থাকে। আমি নিজেকে দেখি। অসাড় পড়ে আছি রাজপথের আধো আলো আধো অন্ধকারের গাঢ় মায়ায়। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমার মগজ দেখতে পাই। আমি আশলে কে ছিলাম? রাস্তায় পড়ে থাকা ঐ অসাড় শরীর, না-কি ঐ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গাড় হলুদ মগজটুকু? না-কি এই বোধটুকু, যে এখনো নিজেকে ‘আমি’ হিসেবে সনাক্ত করতে পারছে? বুঝতে পারি না। শুধু অন্তুর জন্য ভীষণ কষ্ট টের পাই। ওকে ছেড়ে কিছুতেই যাব না আমি, যেতে পারব না, ভেবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই।

কেউ একজন আমার ফোনের কললিস্ট খুঁজে রুবীকে ফোন দেয়। আমার ফোনের ডায়াল আর রিসিভ কলে সবশেষ নাম্বারটা রুবীর। আমি হঠাৎই রুবীকে দেখতে পাই। রুবী ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি ভাঙছে। পাঁচতলার ছোট্ট একটা এপার্টমেন্টে থাকে রুবী। একা। কী আশ্চর্য! রুবীর মনের কথা শুনতে পাচ্ছি আমি! রুবী বলছে, অন্তুটা কী সুন্দর কথা শিখেছে! ওর জন্য এত্তগুলো আদর! রুনুপা দেখতে আরও সুন্দর হয়েছে! রুনুপার সাথে আরেকটু সহজ হলেও পারতাম। আমার আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছে বেচারা।

রুবীর ভাবনায় ছেদ পড়ে। রুবীর ফোন কেঁপে ওঠে প্রবল ভূমিকম্প নিয়ে। ফোন রিসিভ করে রুবী। হ্যাালো! রুনুপা!
হাহা। রুবী ভেবেছে আমি ফোন করেছি। আমার নাম্বার থেকে অচেনা কণ্ঠ রুবীকে জানায় বিস্তারিত। রুবীর ক্লান্ত পা সব ক্লান্তি ভুলে দ্রুত সিঁড়ি ভাঙে আবার। ওপরে ওঠা বাদ দিয়ে নিচে নামে রুবী। প্রায় দৌড়ে গিয়ে পথচলতি এক রিকশাকে থামিয়ে লাফিয়ে উঠে বসে সে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর দুঃশ্চিন্তায় ভেতরটা শুকিয়ে আসে তার। আমার আর অন্তুর জন্য তার ভেতরটা কতটা আকুল হয়ে ওঠে সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারি আমি। পুরোটা পথ সে রিকশাঅলাকে তাড়া দেয় আরও দ্রুত যেতে। তার দুচোখ বেয়ে জল গড়ায় অনবরত আর মনে মনে সে দোয়া ইউনুস পড়ে। আমার বা অন্তুর কারো কোনো ক্ষতি যেন না হয়, বিড়বিড় করে তেমন প্রার্থনা করতে থাকে রুবী। হঠাৎই রুবীকে ভীষণ ঈর্ষা হয় আমার। যে আমি এই কিছুক্ষণ আগেও রুবীকে বকাঝকা করেছি, কতরকমভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, এবার অন্তত বিয়ে করা উচিত তার, জীবনটা এমন ছন্নছাড়া কাটানোর মানে হয় না কোনো, জীবন একা চলতে পারে না, সেই আমিই এখন রুবীর প্রতি ভয়ানক ঈর্ষা টের পাই নিজের ভেতর। মনে হয়, আহা। রুবী কত স্বাধীন। কোনো পিছুটান নেই রুবীর। ইচ্ছে হলে বাঁচবে, না হলে না। অথচ আমি! মৃত্যুার দুয়ারে দাঁড়িয়ে ভাবছি কোনদিকে পা বাড়াব আমি, জীবনের দিকে না-কি মৃত্যুর দিকে! অন্তুর কান্না আমাকে দ্বিধাগ্রস্ত করে দিচ্ছে, অসাড় করে দিচ্ছে। ওর কান্নাভেজা কচি মুখ, আধফোটা ভাষার মা মা কান্না আমাকে ছুরির ফলায় গেঁথে দিচ্ছে।

রিকশা থেকে ছিটকে নেমে এলো রুবী। দুহাতে সজোরে ভীড় ঠেলে চলে এলো সামনে। অন্তুকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল আমার পাশে। চিৎকার করে ডাকল, রুনুপা! রুনুপা!
অন্তুও কাঁদছে। কেঁদে কেঁদে বলছে, আম্মু তোমাল কী উইচে? ওথো না কেন আম্মু?
আমার সাড়া না পেয়ে রুবীর দিকে তাকিয়ে বলছে, খালামণি, আম্মুর কী উইচে? আম্মু ওথে না কেন?

অন্তুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে রুবী। অন্তু আর রুবীর কান্নায় হাওয়ায় করুণ একটা সুর বেজে ওঠে। আশেপাশের ভীড় ছাপিয়ে একইসঙ্গে পুলিশের গাড়ি আর এম্বুলেন্সের শব্দ ভেসে আসে। আমার গাঢ় হলুদ মগজ ছড়িয়ে থাকে রাজপথে, শরীর আধখোলা চোখে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে রাতের কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্যময় অন্ধকার ছুঁয়ে। ফয়সালও ততক্ষণে খবর পেয়েছে। তার বাইকও দ্রুত ছুটে আসছে এদিকটায়। রুবীর কথাগুলো শুনতে পাই আবার। ফয়সালের প্রতি তীব্র ঘৃণা জমে আছে তার মনে। আমি আবার চমকে উঠি। আশ্চর্য! রুবীর মনের মধ্যে কী করে যেতে পারছি আমি! কী করে সাঁতার কাটছি তার মনের নিভৃত নদীজলে! সেখানে তিনটে নদী। ভালোবাসার। দুঃখের। ঘৃণার। রুবীর ভালোবাসার নদীতে সাঁতরাই। টলটলে জল তাতে। আমার আর অন্তুর কী প্রগাঢ় ছায়া তাতে! আর আছে মায়ের ছায়া। মা। আমাদের মা। আমার আর রুবীর। আরও আরও ছায়া তাতে। সবাইকে চিনি না। রুবীর পরিচিতজনেদের ছায়া তারা। আমি অবাক হয়ে দেখি, রুবীর ভালোবাসার নদীতে কোনো পুরুষ নেই। এমনকি বাবাও নেই! রুবীর দুঃখের নদী নোনাজলে টইটুম্বুর। ঘোলা। রুবীর ঘৃণার নদী নিকষ কালো। নদীতে বাবা। ফয়সাল। দুনিয়ার তাবৎ পুরুষ। রুবীর মন পড়ি আমি। স্বচ্ছ। রুবী কাঁদে। বলে, কেন বোকামি করতে গেলি রুনুপা? কেন? অন্তুর কী হবে এখন? ফয়সাল ভাই আবার বিয়ে করবে এখন, বাবার মতো। আমাদের মতোই শেকড়হীন আগাছার এক জীবন হবে অন্তুরও। ফয়সাল ভাইয়ের নতুন সংসারে সে হবে, অযাচিত, অনাকাঙ্ক্ষিত। উচ্ছিষ্ট ছাড়া কিছুই তার ভাগ্যে জুটবে না আর। কেন সব জেনেশুনে অন্তুকে এই নরকে ফেললি রুনুপা! আমি তো এজন্যই ভুল করতে চাই নি। বাবাকে দেখে আমি পুরুষ চিনেছি রুনুপা। তুই কেন চিনলি না তবে? তুই ফয়সাল ভাইকে বিয়ে করবি জানার পর থেকেই নিজেকে তাই তোর থেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম। এখন অন্তুর কী হবে বল? ওই অতটুকু একটা বাচ্চা! কী করে বাঁচবে ও? আমার তো তবু তুই ছিলিস, ওর কী হবে রুনুপা?

রুবীর মনের ভেতর হাহাকারে ভরে ওঠে। ভালোবাসার নদী উছলে ওঠে কান্নায়। দুঃখের নদী জোয়ারে ভাসে। ঘৃণার নদীর নিকষ কালোয় আগুন জ্বলে। পোড়ে। রুবীর ভেতরটা দেখে ভয়ানক কষ্ট হয় আমার। অন্তুর জন্য, রুবীর জন্য, ভীষণতর কষ্টে আমার দিশেহারা লাগে।
কেন রে রুবী? অন্তুরও তো তুই আছিস! তুই আমার সোনাপাখিটাকে আগলে রাখবি না, বল?
কাঙালের মতো বলে উঠি আমি। রুবীর মনের ভেতরটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে। আর পড়তে পারি না তাকে।

আম্মু! এই আম্মু! কী বলতিসো তুমি? -অন্তুর ডাকে চমকে উঠি ভীষণ। রিকশা হাইওয়ে ছাড়িয়ে পাড়ার গলিপথে ঢুকেছে কখন, টের পাই নি। রিকশাঅলা জানতে চাইছে কোথায় নামব। তাকে জায়গাটা দেখিয়ে অন্তুকে কোলে নিয়ে নেমে দাঁড়াই আমি। রুবী ফোনে জানায় সে বাসায় পৌঁছে গেছে। আমি অন্তুকে নিয়ে এগোই। তার হাতে তখনও রুবীর দেয়া গাড়ি।
তার সব মনোযোগ সদ্য্ পাওয়া গাড়িটাতে এখন।

ছোটগল্প

মেয়েটি তার ছোট্টবেলার ফ্রক কোথাও খুঁজে পায়নি
লাবনী আশরাফি

অমানিশা
একটু জিরিয়ে নিই।
একটু জিরিয়ে নিই?
কথাটা বাতাসের সাথে মিশে হারিয়ে যাবার আগেই রতির কান পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় নিল। তবুও কি মনে করে যেন সে একবার পিছন ঘুরে তাকালো। দেখলো বৃষ্টির ফোঁটা আমনের শরীর ছেড়ে তার দিকে ক্রমে এগিয়ে আসছে। রাতের ঝাপসা আলোয় বৃষ্টির কুয়াশায় আমন হাত নেড়ে নেড়ে কি যেন বলতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমন যেন বোবা। কোনদিন যেন সে কথা বলতে জানতো না। হঠাৎ করেই আমনকে দূর অতীতের কেউ মনে হচ্ছে। বর্তমানের কোথাও রতির জীবনে আমনের কোন অস্তিত্ব নেই। রতি বিড়বিড়িয়ে কি যেন বলছে। অমানিশা। গভীর রাত। রাত মানে তার কাছে শহরের রাত। কোনদিন সে গ্রামের রাত দেখে নাই। রাত আর শহর তার কাছে সমার্থক শব্দ। অমানিশায় এখন সব কুয়াশাচ্ছন্ন। বাবা, মা, রেবা, আমন সবার থেকে সে দূরে বহুদূরে এসে পড়েছে। মুহূর্তেই একটা হাতের ধাক্কা এসে লাগলো, সঙ্গে বৃষ্টির ফোটা।

কি হলো তোর? ডাকছি শুনছিস না? রতি তখনো ফ্যালফ্যাল করে আমনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তখন একেবারে ঝপ করে এক পশলা বৃষ্টি এসে ওদের দুজনকেই প্রায় ভিজিয়ে দিয়ে গেল। আমন হ্যাঁচকা টানে একটা টং দোকানের ভেতরে রতিকে নিয়ে ঢুকে গেল। রাত কত তাদের দুজনের কারো জানা নেই। শহরের রাস্তা প্রায় শুনশান, শুধু একটা-দুটো এম্বুলেন্স ছুটে আসছে আর যাচ্ছে। রতি চোখ তুলে চারপাশটা দেখে নিল একবার। তারা এই মুহূর্তে মেডিকেলের সামনে ছোট এক টং দোকানে বসে আছে। প্লাস্টিকের পর্দাঘেরা দোকানের ভেতরে বসে বৃষ্টির ছাট থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে নিচ্ছে। একটা কুকুরও তাদের সাথে সাথে এসে আশ্রয় নিয়েছে। সোডিয়ামের বাতিতে বৃষ্টিকে মনে হচ্ছে হলুদ ফুল। মামা চা লন। চায়ের দোকানির আচমকা কথোপকথনে রাতের নীরবতা ভেঙে গিয়ে দোকানির মুখটা রতির কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। কিছুটা আঁতকেও উঠলো সে। হুবহু তার বাবার চেহারা। কিন্তু বাবা তো বাড়িতে। বাবা এখন কি করছে? খবরের কাগজ ওল্টাচ্ছে না হয় টেলিভিশনের নিউজের সামনে মুখ গোমরা করে বসে আছে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমন বলে উঠলো, আজ বাড়ি ফিরে যাই। অনেক তো খুঁজলাম। না, রতির গলার স্বর দৃঢ় কঠিন আর রুক্ষ শোনালো। আমন আবার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল এমন সময় হুড়মুড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজের ছাত্র আর কয়েকজন রিকশাওয়ালা টঙের ভেতরে ঢুকে পড়ল। মুহূর্তেই একটা ক্যাওয়াস তৈরি হয়ে অবশেষে যে যার আসন খুঁজে নিল। আবার সব চুপ। একদম চুপ। চায়ের কেটলির তলায় আগুন যেন দাউদাউ করে বেড়েই চলছে। আগুনে যেন সব্বাইকে পুড়িয়ে মারবে এমন ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দুটি পাশে ফিসিফিয়ে যাচ্ছে, ওদের মোবাইলের স্ক্রিনের আলোয় খানিকটা জায়গা আলোকিত।
– বেশ্যা মাগি একটা , শালা ৬০ টাকা নিয়েই ছাড়লো, বলেই মুখ থেকে একগাদা থুতু কুকুরটার গায়েই ফেললো।
– মাগী তখনো তো পা ফাঁক করে পড়ে ছিল আরো দু-স্ট্রোক মেরে দিয়ে আসলি না ক্যান? চায়ে চুমুক দিতে দিতে পাশের ছেলেটি বলে উঠলো।
রিকশাওয়ালা দুজনের সিগারেটের ধোঁয়ায় তখন টং দোকানটা ভরে উঠেছে।
– বেবুস্যে মাগীগুলানের রাত্তিরে বার হতি হবি ক্যান? লাং ধরতি বারোয়। নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দেওয়ার তৃপ্তি নিয়ে সে চায়ে চুমুক দিল।
এই কিছুক্ষণ আগে একজন মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় হসপিটালে ফেলে গেছে কেউ, মেবি রেইপড কেস, মেডিকেলের ছেলেটি মুখ খুললো এবার। রেবাও তো রাতে বের হয়েছিল, কোন এক রাতে, তার জন্যই বের হয়েছিল। তাহলে রেবাও কি বেশ্যা মাগি, বেবুস্যে খানকি হয়ে গেছে? হাসপাতালের ওই রক্তাক্ত মেয়েটি কি রেবা? নাকি সোহরাওয়ার্দির সেই ৬০ টাকা নেওয়া বেশ্যা মাগী! রেবা কে? রতি এসব ভাবতে ভাবতে দোকান থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো। দোকানি পেছন থেকে চিৎকার করছে, এ মামা বিলডা দিয়ে যান। আমন যতক্ষণে বিল মিটিয়ে রতির পাশে এসে দাঁড়ালো ততক্ষণে বৃষ্টি তীব্র গতিতে ঝরে পড়ছে। রতি আর আমনের দু পায়ের ফাঁক গলে মিউনিসিপালিটির জল উপচে পড়ছে, রতি দেখছে তার জন্মের সময় মাতৃগর্ভ থেকে যে রক্ত বয়ে নিয়ে এসেছিল, সেই রক্তের ধারা তার দু পায়ের ফাক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। রতি হঠাৎ করেই সেই পানির মধ্যে বসে পড়লো। আমন তাকে টেনে তুলতে পারছে না বা রতি ওঠার জন্যও এতটুকু তাড়া অনুভব করছে না। আমন এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিয়ে রেগেমেগে চিৎকার করে উঠলো, রতি অনেক হয়েছে, আজ দুদিন হলো, আমরা খুঁজেছি সম্ভাব্য সব জায়গা, শহরের আনাচেকানাচে সব সব জায়গায়, পুলিশের কাছে গিয়েছি তারা ডায়রি পর্যন্ত নেয়নি, তোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাডার ভাইদের কাছেও গেলাম তারা কি করলো? তারা মুতে দিল। তোর কথার উপরে জাস্ট মুতে দিল। এভাবে হয় না।
জোয়াল ভেঙে গেছে। গরুগুলো আর হালে দেওয়া যাচ্ছে না। ওরা বুড়ো হয়ে গেছে, ওদের বদলের পালা এসেছে কিন্তু কে বদলাবে? চাষিটাই যে মারা যাচ্ছে, রতি প্রায় জোরে জোরে এসব বলতে থাকলো, বৃষ্টির তোড়ে তার সব কথা আমন অব্দি পৌছাল না। তুই এমনভাবে ভেঙে পড়িস না। হতে পারে রেবা বাড়ি ফিরে গেছে। আমরা বাড়ি ফিরে দেখলাম রেবা তার ঘরে ঘুমুচ্ছে, আমন কথাগুলো যেন নিজেকেই শোনাচ্ছে।
রেবা বাড়ি ফিরে গেছে?
হ্যাঁ, বাড়ি ফিরে গেছে।

বাড়িতো ফিরতেই পারে। যেমন করে সুখি ফিরে এসেছিল। ছোটবেলায় বাবার মুখে অনেকবার শুনেছে সে সুখি ফিরে আসার গল্প। সুখি ছিল ৬ কি ৭ বছরের। সারা বিকেল সে যখন মাঠে খেলে সন্ধ্যা পেরিয়েও ঘরে ফিরলো না সেদিন সারারাত একবাড়ি লোক মিলে সুখিকে খুঁজেছিল, পুকুরে জাল পেতেছিল তাতেও সুখি ভেসে উঠলো না, আশেপাশের গাঁয়ের আত্মীয়দের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়েছিল। সেখানেও সুখি নেই। অবশেষে মসজিদের বড় হুজুরকে ডাকা হলো। উঠানে পাটি পেরে সারারাত কোরান তেলওয়াত চললো। হুজুর ধ্যান ভেঙে বললেন সুখিকে জ্বিনে নিয়ে গেছে। এখন শুধু আল্লায় পারে সুখিকে ফেরত দিতে। সব্বাইকে আল্লার উপরে ভরসা রাখতে বলে হুজুর আবার ধ্যানে বসলেন। সেদিন নাকি কোজাগরি পুর্ণিমা ছিল। জ্যোৎস্নায় উঠোন ভেসে যাচ্ছিল। উঠোনে পাটি পেতে সবাই জড়ো হয়েছিল। আব্বার ফুফু সুখির মা তখন ঘরের দোরে বসেছিলেন নিথর নিশ্চুপ। উঠোনের কোণায় বড় ঝাকড়া বড়ই গাছটার মাথায় তখন কোজাগরি চাঁদের খেলা চলছে। ঝুপ করে কিছু একটা পড়ল। সুখির মা চোখ খুললেন। মা, মা ছোট্ট সুখির গলা পাওয়া গেল শেষরাতে। দৌড়ে গিয়ে সবাই বড়ই গাছের নিচে সুখিকে পড়ে থাকতে দেখলো। ঘরে নিয়ে আসা হলো সুখিকে। সুখীকে তখন শান্ত মৌন আর নিথর শাদা দেখাচ্ছিল, কেবল তার দু পায়ের ফাঁকটুকু রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। সেদিন হুজুরের শোকর গোজার করলো সবাই, সাথে আল্লার শোকর গোজার করতেও ভুললো না। সুখিকে জ্বিনেরা অনেক মিষ্টি খাইয়েছে তাই সুখি এখন বিভোর ঘুমোচ্ছে।
রেবাও ফিরে আসবে সুখির মতো?
কে সুখি? আমনের প্রশ্ন।
রতি কোন উত্তর করলো না কেবল আমনের দিকে একবার তাকালো। তারা দুজন হাঁটতে হাঁটতে তখন ঢাকা গেটের কাছে এসে পড়েছে। শেষ রাতের চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে শহরের সবচেয়ে পুরাতন ইমারতের ভগ্নাংশ। গেটের পিলার ঘেঁষে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় তার মুখটা আরো মায়াবিনী লাগছে। সে যেন দুই বাহু মেলে রতিকেই ডাকছে। রতি দৌড়ে তার কাছে গেল। রেবা! রেবা তুই এখানে! রেবা। মেয়েটিকে জাপটে জড়িয়ে ধরে রতি কাঁদতে লাগলো। মেয়েটি জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে রতিকে রাস্তায় ফেলে দিল। আ মরণ, কোন ঘাটের মরারে, দিলো আমার সব কাপড় ভিজিয়ে! মেয়েটি রাগে গজগজ করছে আর কাপড় ঝেড়ে পানি ময়লা ফেলার চেষ্টা করছে।
আমন রতিকে ছো মেরে তুলে নিয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগলো। রতি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো তখনো সেই শেষ রাতের জ্যোৎস্নায় অদ্ভুত মায়াবিনী দু বাহু বাড়িয়ে তাকে ডেকে যাচ্ছে।

লাল ফ্রক ও রুপোলি মাছটা
বাইরে থেকে বাড়িটাকে রতির দুর্গ মনে হলো। বাড়িটার ভেতরের অন্ধকার চুম্বকের মতো রতিকে টানছে। সে টান যেন মাতৃগর্ভের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার টান। কিন্তু এ-তো ঘোর অন্ধকার। আমিতো ডুবে যাচ্ছি, রক্তে তলিয়ে যাচ্ছি, দাইমা আমাকে এখনই টেনে বার করো, আমি আর সহ্য করতে পারছি না সে অন্ধকার। আমন রতির কাঁধে হাত রাখতেই রতি তার হাতটা চেপে ধরলো। তারা দুজন যখন বাড়ি ফিরলো বাবা তখনো টেলিভিশনের সামনে বসে আছে আর একের পর এক নিউজের চ্যানেল পালটে যাচ্ছে। বাবা একবার চোখ তুললেন কিছু বললেন না। আরেকটা চ্যানেল পালটালেন, আমনের দিকে একবার চোখ তুলে বললেন,
আমন! বাবা, আজ রাতে তুমি এ বাড়িতেই থেকে যাও।
আমন কিছু একটা বলতে যাবার আগেই বাবা হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। আমন গিয়ে বাবার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলো। রতি তখনো একদৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
– তোমার বাবাকে গিয়ে বলো, রেবা খুব ভালো মেয়ে।
আমন কোন কথা না বলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জানালার বাইরে। আকাশে তখন মেঘ কেটে গেছে। চাঁদটাকে মেঘ আলতো করে জড়িয়ে রেখেছে যেন। বাড়িটা বেশ পুরোনো, কোথাও একটা তক্ষক ডেকে উঠলো। আমনের মনে হলো বাড়িটা যেন ইতিহাসের গহ্বর থেকে হা করে বেরিয়ে আছে।
– তোমার বাবাইতো চাকরির ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিলেন। না হলে তো আমরা…
আমন রতির বাবার কথা শেষ করতে দিল না, তার আগেই সে বলে উঠলো,
– বাবা তো আমেরিকা চলে যাচ্ছেন।
– ও… বাবা বিরবিড় করে বলছেন, তাহলে রেবা…
আমন দেখছে পূর্ণ চাঁদের আলোর নিয়ে রেবা গটগট করে হেঁটে চলে গেল তার সামনে দিয়ে। বয়সে রেবা দু-কি-তিন বছরের বড় হবে তবুও সে রেবা বলেই ডাকতো, তবে যেমন করে রতি ডাকতো তেমন করে নয়। রেবার সাথে সে বৃষ্টির পরে ফুলার রোড দিয়ে হেঁটেছে। বৃষ্টিভেজা রাধাচূড়ার ফুল গুঁজে দিয়েছে তার চুলে। রেবা কখনো শুধু মিষ্টি হেসে ‘অসভ্য’ বলেছে। আমনের মায়ের ঝুলন্ত মৃত শরীরটা রেবাই প্রথম আবিষ্কার করেছিল তাদের বাড়িতে। রেবা কি সেদিন আমাকে খুঁজতে গিয়েছিল? নাকি বাবাকে? তার উত্তর কেবল মা-ই জানতেন। কিন্তু মা তো ঝুলে পড়লেন, মিলিয়ে গেলেন জ্যোৎস্নায়। আচ্ছা রেবাও কি মিলিয়ে গেছে জ্যোৎস্নায়? আমনের চোখ তখনো জানালা দিয়ে এমন কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে যা বোধহয় দূর অতীত হয়ে গেছে কিংবা এসবই হয়তো ভবিষতে ঘটবে। বাইরে আবার মেঘ ঘনিয়ে আসছে। হালকা মেঘগুলো এখন ঘনো হয়ে আসছে। চাঁদটাকে তারা এক্ষুনি গিলে খাবে।

– তোমার বাবা কথা দিয়েছিলেন… রেবাকে নেবেন… কিন্তু তোমার মা তো তার আগেই… কিন্তু রেবার তো তোমাদের বাড়িতে যাওয়ার…
ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে তীব্র গতিতে কিছু একটা ছুটে এসে দেয়াল ঘড়ির কাচটা চূর্ণবিচুর্ণ করে দিল। এভাবে কি সময়ের গলা টিপে ধরা যায়? যায় না, তবুও রতি যেন প্রায় চিৎকার আর ধমকের সুরে বলে উঠলো,
– বাবা!
বাবা, আমন দুজনেই অন্ধকারেও রতির অস্তিত্ব খুঁজে নিল। কিন্তু দেখলো অন্ধকার কোণটিতে রতি নেই কেবল দরজার পর্দা দুটো হালকা বাতাসে দুলছে। বাবা আমন দুজনেই তখন ভগ্ন সময়ের হাতে পড়ে নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। কেবল তারা দুজনে ভাঙা কাচের টুকরোগুলো একজায়গায় জড়ো করার চেষ্টা করছেন অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে।

রতি মায়ের ঘরে একবার উঁকি দিয়ে দেখলো মা ঘুমুচ্ছে। মায়ের মুখটা একেবারে ছোট্টবেলার রেবার মতো মনে হচ্ছে। কেবল এই রেবার মুখে বয়সের বলিরেখার ছাপ, অর্ধ পাকা চুল আর এলোমেলো গোঙানির আওয়াজ। রতি একবার মায়ের ঘরে ঢুকতে চাইলো কিন্তু কি ভেবে আবার চলে যেতে চাইলো। তারপর আবার সে পর্দা ঠেলে মায়ের ঘরে ঢুকতেই একটা পুরোনো ট্রাঙ্কে পা লেগে শব্দ করে উঠতেই মায়ের গোঙানিটা আরেকটু বেড়ে গেল। এরপর পা টিপে রতি বেরিয়ে আসতেই তার পায়ে কিছু একটা বাধলো। হাতে নিয়ে দেখলো ছোট একটা ফ্রক, লাল টুকটুকে একটা ফ্রক। রতি আরেকবার ঘুরে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে চোখ রাখলো, দেখলো অদ্ভূত হলুদ আলোতে মায়ের বিছানা ভেসে যাচ্ছে। মায়ের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে আছে ছোট্ট রেবা। রেবার মুখে মায়ের একটা স্তন আর একটা স্তনের উপর রেবার ছোট্ট আঙুলের চিকন পাতলা আঁচড় কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

রতি অন্ধকার ভেদ করে দ্রুত মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বসার ঘরে গিয়ে দেখলো তখনো আমন আর বাবা ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো জড়ো করে চলেছেন। রতি জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢাললো, ঢকঢক করে খেলো। বাবা বা আমন কেউই তার দিকে একবারের জন্যও তাকালেন না। রতি এবার শান্ত পায়ে তার ঘরের দিকে গেল। ঘরে ঢোকার আগে সে একবার রেবার ঘরে উঁকি দিল। ছোটবেলায় এটাই ছিল তাদের দুজনের ঘর। অনেকটা বয়স পর্যন্ত দুটিতে একসাথে ঘুমিয়েছে। রেবার কোলে মাথা রেখে ঘুমপাড়ানি গানও সে শুনেছে। রেবা তার দু-কি-তিন বছরের বড় হবে কিন্তু রেবাকেই সে সব থেকে বেশি মেরেছে। এখন এই খাটটিতে রেবা একলাই থাকে। তার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে বাবা। রতি রেবার বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিয়েছে।
এ-ঘরটায় আজ দুদিন হলো কেউ বাতি জ্বালায় না। কিন্তু জানালাটা খোলা ছিল। বাইরে থেকে একটা তির্যক আলো এসে ঘরের মধ্যে পড়েছে, বিশেষ করে বিছানাটা অনেক উজ্জ্বল হয়ে আছে। অন্ধকার। তার কি তীব্র শক্তি। সব থেকে বেশি বোধহয় অন্ধকারেই দেখা যায়। অন্ধকারেই দৃশ্যের সীমারেখা মুছে যায়। জন্ম নেয় নতুন দৃশ্যের। যা কিছু দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল তার ভেতরে সত্যের কতটুকু থাকে? দিন মানেই কি আলো? সত্য? সুন্দর? তাহলে রাত কি? অন্ধকার কি? মানুষের অসীম প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়ত মানুষের আরও কোটি বছর লেগে যাবে কিংবা মানুষের ফসিল থেকে সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে উত্তর প্রজন্মের কোন এক মানুষ। যেমন করে উত্তর খুঁজে আমরা জেনেছি মানবের ইতিহাস, যেমন করে আমরা ঘোষণা করি হোমো স্যাপিয়েনের মহিমানিত্ব ইতিহাস, যেমন করে পায়ের নিচে পিষে চটকে দিই ছোট্ট দূর্বা ঘাস। তীব্র আলো নাকি তীব্র অন্ধকার! কিছু বুঝে ওঠার আগেই রতির আঙুলগুলো স্পর্শ করলো নরম কোমল ছোট্ট কয়েকটি আঙুল। সেই তীব্র আলো কি তীব্র অন্ধকার থেকে রতিকে টেনে নিয়ে এলো শুভ্রতার মাঝে। রতি দেখলো একটা ছোট্ট মেয়ে তার হাত ধরে আছে। রতির একবার মনে হলো আরে এইতো রেবা, আবার নিজের মনেই বললো, রেবার তো এখন ত্রিশ। মেয়েটি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো। রতি কোন বাধা দিলো না। মেয়েটির হাত ধরে সে একটা বিশাল হলঘরে এসে পৌঁছালো। ঘরটা এত বড় আর তার সিলিং এতো উঁচু যে বাতাসের শব্দ দেয়ালগুলো ছুঁয়ে দিয়ে গমগম করছে। সে দেখতে পেল ঘরটির মাঝখানে বাবা মাথা নিচু করে বসে আছে, বাবার পাশেই আমন বসে আছে। কিছু দূরে একটা লাল শাড়ি পরিহিত নারী শুয়ে আছে আর মা সেই নারীর সামনে ঝুকে আছে। ঘরটি থেকে একটা সিঁড়ি উপড়ে উঠে গেছে, সেই সিড়ির গোড়ায় বসে আছে আমনের মা। তিনি তার হাতের মধ্যে একটা শাড়ি গুটিয়ে নিচ্ছেন। সিঁড়ির পাশে রাখা কেবিনেটের উপর কনুইয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমনের বাবা। কোটের হাতা টানটান করে নিয়ে টাই চেক করে নিচ্ছেন আবার তার চকচকে বুটের উপর ঝুকে দেখে নিচ্ছেন কালিটা ঠিক আছে কিনা। তিনি একনাগাড়ে পাইপ টানছেন আর কিছুক্ষণ পরপর তার হাতঘড়িটায় সময় দেখছেন। ছোট্ট মেয়েটি রতির আঙুল ছেড়ে দিয়ে লাল শাড়ি পড়া নারীটির সামনে গিয়ে বসে পড়লো। রতিও তার পিছু নিল। রতি নারীটির সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো। রতির একবার মনে হলো আরে এতো রেবা! আবার ভাবলো না এ রেবা নয়। কয়েকজন লোক এসে মেয়েটিকে সাদা কাপড়ে ঢেকে দিয়ে গেল। কারা তারা? তাদের কোনদিন দেখেনি রতি। তাহলে এ সত্যিই রেবা। রেবাকে লাল শাড়িতে কী সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু ও ঘুমোচ্ছে কেন? দুদিন তো ঘূমোয়নি মেয়েটা। রেবার পাশেই ছোট্ট একটা একুরিয়ামের জার যেটা রতিই কিনে দিয়েছিল আর তার সাথে একটা গোল্ডফিশ। জারটা ভেঙে পড়ে আছে আর মাছটা তখনো খাবি খাচ্ছে মেঝেতে। ছোট্ট মেয়েটি মাছটাকে যতবার ধরতে যাচ্ছে ততবার সেটা হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই চলতে থাকলো অনন্তকাল বা মহাশূন্যে কোটি বছর কিন্তু লাল শাড়ি পরা সুন্দর রেবা যেন সেই মহাশূন্যের কোটি বছরকে মিথ্যে করে দিয়ে উঠে বসলো আর খপ করে ধরে ফেললো গোল্ডফিশটিকে। সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট মেয়েটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। সে-হাসিতে যেন এই বিশাল ঘরের জানালায় ঝড় উঠলো, জানালার কাঁচগুলো একে একে ভেঙে পরতে লাগলো। ছোট্ট মেয়েটির হাতে রেবা মাছটিকে দিল। এরপর তারা দুজনেই একে অন্যের হাত ধরে যখন ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালো তখন আকাশ ঘন নীল আর অসংখ্য নক্ষত্র মুড়িয়ে রেখেছে রাতের আকাশ, বাতাসের গতিবেগ একদম নেই, মনে হলো প্রচণ্ড শব্দ করে পৃথিবী যেন এইমাত্র নিজের পায়ে দাঁড়ালো।

 

 

Share Now শেয়ার করুন