চৈতালী চট্টোপাধ্যায় >> কবিতা এবং সুমিতা মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ >> চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় বিশ্বায়ন যৌনতা প্রতিরোধ

0
392

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় >> কবিতাগুচ্ছ

সুখবিসুখ

একেকটা মৃত্যু দিয়ে ছোট ছোট কাগজের নৌকা বানাই। জলে
পোকা পড়ুক, তবু ভাসাবো বলে…

হাসপাতাল

ঠাণ্ডা, মরা ঠোঁট, তাও চুমু খাব। আর
আবার কতদিন দেখা হবে না তোমার-আমার!

আয়না

আনন্দের জোরে মিথ্যে বেঁচে আছি, ‌প্রাণসখি,
দুঃখ-পাতা-পথ, উড়িয়ে,ওর কাছে যা,লক্ষ্মী!

উৎসব

বসন্ত বাতাসে আহা বসন্ত বাতাসে –
ছেঁড়া-যৌবন, কান্না কন্যার, কোকিল হয়ে আসে!

মানবী জার্নাল

ছটা বেজে দশ।
ও পাশ ফিরল। টিফিন ভরছি। কুইক! কুইক!
বাস এসে গেছে, ছুটতে ছুটতে, আমিও ছুঁচ্ছি
ছেলের বয়স…
আটটা পঁচিশ।
চায়ের সঙ্গে রোদ এনে ঘরে ওকে জাগিয়েছি। খিদে-খিদে ভাব,
মরুকগে, ওর মিনি লাঞ্চবক্স সাজিয়ে দেব, তো,
আজও ট্রেন মিস্…
এগারোটা ষোল।
‘ডোন্ট ডিস্টার্ব’ বাইরে ঝোলান। কথা-বলা
শেষ। বস্ কী চাইছে? অ্যাজ ইউজুয়াল,
পায়ে পা ঘষল…
দুটো দুই। তাই
মিতালি ও আমি। পাতা ওড়াউড়ি। শূন্যে তাকাই।
ওটা কোন গাছ, শিমুল? পলাশ? বেট ধরি যদি,
চাইনিজ খাই…
সাতটা তিরিশ।
ঢের কাজ ফিরে। ওর বন্ধুকে ডেকেছে ডিনারে।
আমার জন্য ব্যথা-পা, এবং, রেলবাজারের ঘুমোনো আলোয়
আষাঢ়ে ইলিশ…
নটা বেজে ছয়।
ও ফেরেনি। তবে, ফিরবে। ক্লান্তি। টেবিল তৈরি।
বিলোল চক্ষে বন্ধুটিকেও গল্প দিচ্ছি। সরষের ঝাঁজ
সারা ঘরময়…
পৌনে বারোটা।
নিজেকে ভাবব? মানে ওর গায়ে হাত পড়লেও
আলো জ্বলল না, সেই কথা? না কি, বালিশে প্রথম
রক্তের ফোঁটা…

স্কিৎজোফ্রেনিয়া

‘মতিচ্ছন্ন’ যদি বলে বন্ধুরা,
আমি মুখ নীচু করে বুড়ো আঙুলের নখ খুঁটে যাব,
না কি খুব ফিচেল ধরনে, মাজাকি মারব!
সেদিন যে ফুল পাঠিয়েছি,
ফ্লোরিস্ট ফোন করে বলে দিল, ও বাড়িতে কেউ থাকে না –
আর সঙ্গীতা? সে-ও বিট্রে করল,
কফি হাউসের মুখে তোমাকে চেনালাম, তো
ফিরে এসে দিব্যি শোনার, ‘কই! কাউকে দেখিনি।’
ডাক্তারও জানিয়েছে, সত্যি নও! কল্পনা আমার!
এসব মুহূর্তে তুমি পাশ থেকে আশ্চর্য রকমভাবে সরে সরে যাও,
তোমাকে ধুরন্ধর ভাবব, ভয় হয়!
বড় বেদনার মতো লাগে

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় বিশ্বায়ন যৌনতা প্রতিরোধ >> সুমিতা মুখোপাধ্যায় >> প্রবন্ধ

সংসার-সংস্কৃতির বিশ্বায়িত চেহারা! শিষ্টতার মুখোশের আড়ালে চলে সম্পর্কের নিম্নগামিতা। কবির কবিতা-বয়নে, রসের আয়োজনে কোথাও ফাঁক থাকে না এতটুকুও। তবু তারই তলে তলে গনগনে প্রতিবাদের তাপে সেঁকে ওঠে পাঠক মন।

“তোমাকে পণ্য করেছি আমি নিজেও… এ এক অস্থির সময়”

বিশ্বায়ন যদি হয় বিশ্ব অভিমুখি পথ, তবে প্রবন্ধটা শুরু করা যায় এইভাবে – “বিশ্ব বলতে একটা মুচমুচে পরোটা, রেকাবিতে। ভেঙে ভেঙে খেয়ে নাও রোজ।”
খাদ্য-খাদক সম্পর্কের প্রবৃত্তিগত অনিবার্যতা থেকে ভোগবাদের চরিতার্থতা বিশ্বায়নের একটা পরিক্রমা। আত্মীকরণের এই সর্বগ্রাসী উদগ্রতার ইতিহাস আজ সকলের জানা। রাষ্ট্রীয় সীমানার ধারণাকে একরকম নস্যাৎ করে দিয়েই জাতীয় স্তরের উপোষী অর্থনীতিতে দখল নিয়েছে বিশ্বের উন্মুক্ত বাজারের ধারণা এবং ধারণাগত দিক থেকেও বিশ্বায়ন ও খোলা বাজার সমার্থক হয়ে উঠেছে। প্রথম বিশ্বের উৎপাদিত দ্রব্য তা সে প্রযুক্তিবিদ্যা, সামরিক সরঞ্জাম থেকে মায় স্যানিটারি ন্যাপকিন, বিক্রির জন্য বাজার চাই। স্বভাবতই উন্মুক্ত বাজার মুনাফা লুটতে সিঁধ কেটেছে ভাবের ঘরে। অর্থনীতির পাশাপাশি বিশ্বায়ন সৃষ্টি করেছে এক সংস্কৃতির বাজার। “কিন্তু সময়ের মাপে তা এমন এক বড় উল্লম্ফন যা আমাদের কাছে এক সাংস্কৃতিক ধাক্কা, কালচারাল হিসেবে এসেছে…”। সেই জোরালো ধাক্কায় বিভ্রান্ত, বাংলা সাহিত্যের পরিচিত অভ্যস্ততা। ভালো-খারাপের আঙ্কিক হিসেব নয়, দেশকাল নির্বিশেষে গ্রাহ্য শুধু বাজার পণ্য মুনাফা,বিজ্ঞাপন আর বারান্দার টবে অর্গানিক মিথ্যের চাষ। আর এই কালচারাল শকে হতভম্ব না হলেও ক্ষুণ্ণ আধুনিক কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়। তার আঁতের গভীরে আজ ক্ষত। তাই সংক্ষিপ্ত কবিতার অবয়বে অনিঃশেষে ঢেলে দেন হৃদয় চুঁইয়ে নামা বিদ্রূপের গরল,

কে না জানে কাক-চিল বসে না –
কথায় রক্তনদী বয়ে যায়,
দু’জনে খিস্তি শুরু করলেই
মেয়ের জ্বর আসে আর বমি পায়…
কে না জানে ডোরবেল বাজলে,
চাপা মারপিট, খোলা দরজা-
ঠিকে ঝি মুচকি হেসে বলছে,
‘বস্তির মতো, ছি ছি লজ্জা’!”
(চর্চা পার হয়ে)

সংসার-সংস্কৃতির বিশ্বায়িত চেহারা! শিষ্টতার মুখোশের আড়ালে চলে সম্পর্কের নিম্নগামিতা। কবির কবিতা-বয়নে, রসের আয়োজনে কোথাও ফাঁক থাকে না এতটুকুও। তবু তারই তলে তলে গনগনে প্রতিবাদের তাপে সেঁকে ওঠে পাঠক মন।
তৃতীয়-বিশ্ব এখন প্রথম-বিশ্বের পুঁজি বিনিয়োগের সার্থক এক প্রয়োগক্ষেত্র। পাশ্চাত্যের ধনবান দেশগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তারা তো প্রায় গ্রামই! তাই বিশ্বায়নের খোলা বাজার ও মুক্ত অর্থনীতি অবধারিতভাবে বিত্ত বৈভবের ধারণাটাকে বদলে নিয়ে, মানুষকেও সরাসরি পণ্যসামগ্রী ভেবে নিয়ে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে বাজার উপযোগী করে নিয়েছে। মানুষ-ই উঠে এসেছে প্রভুত্বের নানা আয়োজনকে সঙ্গে নিয়ে।

কে না জানে,বিশতলা এ-ফ্ল্যাটে
অর্থনীতির চাপ সুগভীর।

জনস্বার্থ, রাষ্ট্রস্বার্থ, দারিদ্র্য, নারী-অবমাননা সবই এক-একটা আলতো মোড়ক মাত্র। বিশ্বায়নের সংস্কৃতি মানুষকে দেয়নি কোন শুশ্রূষা, বেঁচে থাকবার আগ্রহ। বরং যুগের জঠরে চারিয়ে দিয়েছে মূল্যবোধের প্রাচীনতাকে ভাসিয়ে দিয়ে বিশ্বায়নের উপযোগী সংস্কৃতি ।

প্রতিফলনের ফলে থোকা-থোকা
পণ্যের দিকে ঝুঁকে আসে মন, শপিংমল!
(পদার্থবিদ্যার দ্বিতীয় চ্যাপ্টার)

ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই গ্রহণ-বর্জনের মধ্যে দিয়ে বিশ্বায়নের সংস্কৃতি গড়ে নিয়েছে তার আপন বৃত্ত-বলয় । ফলে খুব সহজেই অভ্যেস হয়ে গেছে – ‘দুরন্ত সেলফোনে’ অথবা স্মার্ট টেলিফোনে। টাচ্-স্ক্রিন, শপিংমল, চাউমিন, রোলসেন্টার, আর্চিস, হলমার্ক অথবা ল’রিয়েলের কৃত্রিম রঙের হাতছানি সহজেই নেশা ধরিয়েছে, টেনে নিয়েছে ভোগসর্বস্ব জীবনের রসাতলে। জীবনের উন্মাদ স্পৃহা, করায়ত্ত করতে হবে আকাঙ্খার বস্তুটি! আশঙ্কা! এ তো ভৌতিক অর্থনীতির আগ্রাসীকরণ। ‘ভৌতিক’ বলা হচ্ছে কারণ একদিকে তা প্রান্তিক পুঁজির কথা বলে এবং অন্যদিকে তা ক্রেতার মনে এমন এক কৃত্রিম তাড়না সৃষ্টি করে যে সে তখন তার সাবেকি প্রকৃত সম্পদকে নষ্ট করেও বাজারচলতি পণ্যগুলির সংগ্রাহক হয়ে উঠতে চায় ।

হাতে তুলে নেয় সেলফোন, ল্যাপটপ, পেনড্রাইভ ।

বহির্জগত বহির্জগত তোমার কানে আছে
দুরন্ত সেলফোন
আমার গৃহকোণে বাজে শান্ত গ্রামাফোন
শরীরগুলি গ্রীষ্মে ওড়ে নর্দমায় নর্দমায়
আমি একা হাত রেখেছি ফোস্কা পড়া স্মৃতির গায়
(বিশ্বগ্রামকথা)

কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই কবিতাটির নাম রেখেছেন ‘বিশ্বগ্রামকথা’। বিশ্বায়নের সংকট সমাগত, তাই সেলফোন আর গ্রামাফোনের ঠোকাঠুকিটা শুধুই বস্তু নিরপেক্ষ হয়ে না থেকে রুচি ও মূল্যবোধের প্রশ্ন উস্কে দেয়। কবিতাটিতে সেলফোন আর গ্রামাফোনের প্যারাডক্স আরো নিবিড়ভাবে চারিয়ে দেয় কবি-মননের এক বিদ্রূপাত্মক অভিব্যক্তি। এখন আর গৃহকোণে ‘শান্ত গ্রামাফোন’-এর মতো নিটোল সাবেকি সম্পদের বিলাস নয়, শহুরে শপিংমলের উজ্জ্বল আলোর তলায় বেছে তুলতে হয় কোন এক মোড়কি-সংবাদ। এখানে বিশ্বায়নের বহুমাত্রিক যাপনের সূত্রগুলো একে একে সেঁটে যেতে থাকে :

আইপডে তুলে-রাখা ৫০০ রকমের খুচরো ফুর্তি,
শপিংমল-ফেরত ঠান্ডা ঠান্ডা পেচ্ছাব,
মোবাইল-ক্যামেরায় জেনেবুঝে-ধরা নীল যৌনতা
(আঁতুড়ে নুন খাইয়ে মেরে দেওয়া হবে যাকে)

বিশ্বায়নের অনুষঙ্গে কবি চৈতালির এই নিরুত্তাপ অভিব্যক্তি যতখানি বাস্তব, তার চেয়েও বুঝি ঢের বেশি গা-সওয়া। ‘শপিংমল’ কবিতাটির শরীরেও গেঁথে থাকে ক্রয়ের ঝাঁঝালো বাসনা সঙ্গে বিদেশী ব্র্যান্ডের ম্যাজিকমন্ত্র,

ওর সঙ্গে অত কথা কীসের মা,
জিনিস কেন না কেন?, দেখছ তো হাসি সিন্থেটিক।
ঠিক! আমার পড়ন্ত জ্বলে-ওঠা, ফুটন্ত আদিখ্যেতায়,
কন্যাটি ব্র্যান্ডেড জল ঢেলে দেয়।

বিশ্বায়নের প্রবাহ যে সংস্কৃতির জন্ম দেয় তা বৈষম্যমূলক। নগরায়নের শিষ্টতার জায়গা দখল করে নেয়, “শপিংমল ফেরত ঠান্ডা ঠান্ডা পেচ্ছাব” (আঁতুড়ে নুন খাইয়ে মেরে দেওয়া হবে যাকে)। আর এরই সঙ্গে ঘৃতাহুতির মতো যৌনতার ব্যবহার যাপনের চর্চাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় বিশ্বায়নের দিকে।

কৃত্রিম হাসির অনুষঙ্গে তকমা-আঁটা মোড়কি সংবাদ জানিয়ে দেয়, একেই বুঝি বলে ব্রান্ডসর্বস্ব বিশ্বায়ন। নিখুঁত শব্দচয়নের নৈপুণ্য এ-কবির আর এক বৈশিষ্ট্য, তাই নির্মেদ কাব্যের শরীরী ভাবনায় সংক্ষিপ্ততা থাকলেও বক্তব্যের গভীরতা ধরতে পাঠককে বড় একটা শ্রম করতে হয় না। বিশ্বায়নের ধাক্কায় আজ কোনঠাসা দেশীয় কৌমসংস্কৃতির তামাম ঐতিহ্য,হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েছে বিশ্বের তাবড় নামী-দামি পণ্যের উপাচার, সমকালীনতার দাবি তাই ব্র্যান্ড! উচ্চ আয় নিম্ন আয়, শহর-গ্রামকে না পেতে চায় বিজ্ঞাপিত চক্চকে মোড়কের লোভনীয় পণ্য? জুড়ে যায় একটা শব্দ বিজ্ঞাপন। শহর ছেড়ে গ্রামে ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বেনোজলের মতো ঢুকে পড়ে ভোগবাদের বিশ্বজনীন প্রবণতা, সেই সুযোগে মুক্তবাণিজ্যের সম্মোহনী কৌশল। একদিকে যেমন নগরায়ণকে ভুলিয়ে দেয়, অন্যদিকে বাজার-উৎপাদিত নিত্য নতুন দ্রব্যসামগ্রী ও তার ‘অফার, অপ্রেসিভ, কমপালশন’-এ বাজারধর্মী ভোগস্পৃহাকে বহুগুনিত করে টেনে আনে শহরে। কবির কথায় “মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।” সম্মোহনের মায়াজালে নাগরিক সংস্কৃতিকে ভুলিয়ে দেয় তার আঁকড়া জীবনের যাপনপ্রণালী।

বিদেশের মতো, ওই সিঁড়ি নিজে-নিজে উঠে,
খাবারদাবারের কাছে নিয়ে যাবে,
চলন্ত সিঁড়িতে পা জড়িয়ে, গড়িয়ে নামবে ছাপা শাড়ি,
স্প্যাগেটিরা করুণা করবে, উঁহু, ধরে তুলবে না!
কুকুর গন্ধ শোঁকে সন্দেহজনক দম্পতির
সাজ-পরা দোকানের কাচ দেখে, যারা রোজ ফিরে যাচ্ছিল!
সুগন্ধ খেয়ে, আমি মেয়েকে বলছি, ‘কি রে, দর করবি না?

বিশ্বায়নের প্রবাহ যে সংস্কৃতির জন্ম দেয় তা বৈষম্যমূলক। নগরায়নের শিষ্টতার জায়গা দখল করে নেয়, “শপিংমল ফেরত ঠান্ডা ঠান্ডা পেচ্ছাব” (আঁতুড়ে নুন খাইয়ে মেরে দেওয়া হবে যাকে)। আর এরই সঙ্গে ঘৃতাহুতির মতো যৌনতার ব্যবহার যাপনের চর্চাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় বিশ্বায়নের দিকে। বিচলিত কবি চেতনা! হারিয়ে যাচ্ছে কি গ্রামীন সংস্কৃতি? নাকি রূপান্তরিত হয়ে তৈরি করে নিচ্ছে সাংস্কৃতিক ফিউশন? যেমন ভাবে প্রত্যন্ত মাটির-গান বিশ্বায়নের এক ধাক্কায় হিপহপ অথবা সালসার মতো পাশ্চাত্য নাচের অনুষঙ্গে হয়ে ওঠে এক আশ্চর্য মিশ্র সংস্কৃতি। তাই জিজ্ঞাসু কবি-মন :

তুমি কি খুব যৌনকাতর বিজ্ঞাপনের গ্রাম
সম্মোহন সম্মোহন ভুলিয়ে দিচ্ছে নাম
(বিশ্বগ্রামকথা)

পণ্যের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে, বিশ্বায়নের টানটান প্রতিযোগিতার বাজারে টিঁকে থাকতে গেলে চাই বাজারকে প্রভাবিত করা, আর তার জন্য আবশ্যিক মার্কেটিংয়ের চমক আর বিজ্ঞাপনের মোড়ক-সর্বস্বতা। এক্ষেত্রে অপরিহার্য, যৌনতার বহুবিধ ব্যবহারিক আর্ট ফর্ম আর এহেন শিল্পকর্মের জন্য প্রয়োজন, নারীর শরীরী ক্যানভাস। নিয়ন্ত্রণমুক্ত খোলা বাজারে সমস্ত পণ্যই বিক্রয়যোগ্য হয়ে ওঠে বিজ্ঞাপনের নিজস্ব ভাষায়। তাই হোর্ডিংয়ে পণ্যের সম্মোহন তৈরি করতে যৌনতাকে পুঁজি করে ঢুঁ মারতে হয় নারীশরীরের আনাচে-কানাচে। আয়োজিত উপাচার অনায়াসে তুলে ধরে ফাটকা অর্থনীতির সূচক। আর এভাবেই ‘বিশ্ববাজার’-এ রতি থেকে ক্রীড়া সবটুকুর উদ্দীপন-বিভাব হিসেবে অপরিহার্য হয়ে পড়ে বিদেশি পণ্যের সম্ভার।

আমার সেক্সের জন্য ফরাসি-সৌরভ,
তোমার খেলার জন্য স্মার্ট টেলিফোন।
(বিশ্ববাজার)

বিশ্বায়নের নিজস্ব ভঙ্গীতে বিচ্ছেদের সমাচার পরিবেশিত। তবু কোথাও যেন কবির গহন-গভীর মনোভূমে বেজে চলে, “এ ভরা বাদর/ মাহ ভাদর/ শূন্য মন্দির মোর।”

এমনকি নারী-পুরুষের সম্পর্কের বহুমাত্রিক আবেগ বিহ্বলতার ক্ষেত্রেও বিশ্বায়নের অনধিকার অনুপ্রবেশ ঘটে যায় বেশ সাড়ম্বরে।

সেদিন দেখলাম, আমার চুমু খাওয়াটাও তুমি, থুতুটুতু সমেত, ওই
দেওয়ালেতে পোস্ট করছ যখন, হা-হা, হু-হু, শব্দ তুলে
কিন্নর, গন্ধর্ব সব ছুটে এসে মন্তব্য জানাল।
(লোকাচার)

ফেসবুক, নেট, একটা গোলাপ, একটা দিন, কিছু চকলেট, একটু চুমু – বিশ্বায়িত প্রেমের এই ধারণার কাছে হার মানে সনাতন প্রেমের আকিঞ্চন। বোধ করি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে ভাবসম্মিলনে রাধার অনুযোগ…

কতদিন পরে বঁধুয়া এলে
দেখা না হইতে পরাণ গেলে
এতেক সহিল অবলা ব’লে
ফাটিয়া যাইত পাষাণ হলে।

প্রেমিক তাকে ছেড়ে চলে গেছে, গেলেই বা? তাতে কি? তার অন্তরেই যে কৃষ্ণের বাস। বিরহানলে জ্বলতে জ্বলতে শ্রীরাধিকা অনুভূতির কোন প্রগাঢ়তায় পৌঁছলে এ হেন অনুভব হতে পারে? কিন্তু বোধের এই তন্ময়তা আজ অপ্রতুল। তাই আবেগহীন নির্লিপ্ততায় কবি অনায়াসেই বুঝে নেন, হৃদয়হীন সম্পর্কের বাস্তবতাকে :

আমি হচ্ছি সেই খাদ্য,
যার সবটাই বিদেশি মশলায় বানানো –
তুমি হচ্ছ খাদক
(বিশ্ববাজার)

উচ্চকিত বহুতলের বিলাসী প্রকোষ্ঠে খাদ্য-খাদকের এই খেলা চলতেই থাকে। বরং উপচে পড়া ভোগের আয়োজন নিয়ে আসে শখের হতাশা, অবসাদের বিলাস আর প্রাচুর্যের বিড়ম্বনা। আর এসবই “বিশ্বায়নের চাষ-আবাদ।” থাকে না সম্পর্কের গভীরতা, সবটাই বিকিয়ে যায় ভোগস্পৃহা আর ভোগ্যপণ্যের খোলা বাজারে। সবটুকু মিলিয়েই বিশ্বায়নের স্তর ও তার সংস্কৃতি। যে-সংস্কৃতি আমাদের প্ররোচিত করে :

তো আমরা ম্যাজিক করে বাজারেই সংসার পাতি।
আপাতত, মৃত্যু অবধি
(বিশ্ববাজার)

এখানে বিদ্রূপের শান্ত নিরুদ্বেগ প্রকাশভঙ্গিটি কবির একেবারে নিজস্ব একটা রীতিশৈলী, আপাত নিরীহ হলেও তলে তলে জ্বালা ধরায়।

ভারি লজ্জা করে, তাই বাড়ি থেকে বেরোই না আজকাল…
হায়! তুমি যে গিয়াছ ইন্টারনেট বিছানো পথে, আর ফিরিলে না
(লোকাচার)

বিশ্বায়নের নিজস্ব ভঙ্গীতে বিচ্ছেদের সমাচার পরিবেশিত। তবু কোথাও যেন কবির গহন-গভীর মনোভূমে বেজে চলে, “এ ভরা বাদর/ মাহ ভাদর/ শূন্য মন্দির মোর।” তাই বুঝি কিছুই হারায় না, নেট খুলে রাত্রি যাপনের অতিআধুনিক কৃত্রিম অভ্যস্ততার পাশাপাশি অনায়াসে কবি চৈতালীর কবিতায় জায়গা করে নেয় চেনা জীবনের কতগুলো মৌলিক অভ্যেস :

ভুলে যাই। কবিতার বইতে উপুড় হই। রান্নাঘর করি। ফোন তুলে,
তোমাকে অস্ফুটে হ্যালো বলি।
(লোকাচার)

ভুবনব্যাপী ভোগাচারে বিলাসী জীবনের ছোঁয়াচ বাঁচিয়েও কবিমন সন্তর্পনে জিইয়ে রাখে প্রেমের মিঠি উদ্ভাস। আধুনিক বাংলা কবিতার পালাবদলে তাই কবি চৈতালী ব্যতিক্রমী, ঝকেঝকে, স্মার্ট তবু কোথাও যেন ‘শান্তিনিকেতনী ঝোলা’র মতই এথনিক, সাবেকি।

Share Now শেয়ার করুন