ছোটগল্প | আমার মা আফ্রিকার একটা খামারে থাকতেন | আবদুলরাজাক গুরনা | অনুবাদ রাবেয়া রব্বানী

0
181

মুনা শুনতে পেল তার মেয়ে খাদিজা বলছে, ”আমার মা আফ্রিকার একটা খামারে থাকতেন।” খাদিজা চায় তাকে কাদি বলে ডাকা হোক, বিশেষত তার বন্ধুদের সামনে, মুনা ব্যাপারটা মনে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। খাদিজা এবং তার দুই বান্ধবী ক্লেয়ার আর এমি সন্ধ্যাবেলা আউট অব আফ্রিকা নামক সিনেমাটা দেখেছে। বেশির ভাগ রবিবারে তারা এভাবে একে অপরের বাড়িতে গিয়ে সিনেমা দেখে। যা-ই হোক, আজ সিনেমাটা খাদিজার বাড়িতেই দেখা হয়েছে তবে ডিভিডিটা অন্য কারো।

গল্পের শেষে একধরনের নীরবতা নেমে আসে। সিনেমাটা শেষ হবার পর ঠিক সেরকম কিছুর তাড়নায় কাদি কথাটা বলেছে হয়ত। সিনেমাটা শেষ হবার পর  ঠিক সেরকম কিছুর তাড়নায় কাদি কথাটা বলেছে হয়ত। সিনেমাটার পুনঃপুনঃ উঠে আসা বোধের প্রতিধ্বনি ছিল বাক্যটায়। “আফ্রিকায় আমার একটা খামার ছিল,” কথাটা (‘আউট অব আফ্রিকা’র লেখক) ক্যারেন বিক্সেন একটা বিস্তীর্ণ প্রকৃতি জুড়ে ছড়িয়ে যাওয়া কর্কশ বিলাপের মতো উপস্থাপন করেছেন। হারানো প্রেম, হারানো খামার, হারানো স্বর্গ, পড়ন্ত হেমন্ত এই ধরণের অনুভূতি থেকেই কাদি হয়ত বলেছে, “আমার মা আফ্রিকার একটি খামারে থাকতেন।”

মুনার ইচ্ছে করল ছুটে যায় আর বলে, ব্যাপারটা আসলে এমন কিছু না, ব্যাপারটা এরকম না একেবারেই। কিন্তু এরপরই সে শুনতে পেল কাদি কথাটা বলার পরপরই কেউ একজন হেসে উঠেছে। মুনার অস্বস্তি হল, সে নিজের ইচ্ছাকে দমন করল। মুনার এও মনে হল হেসে উঠেছে আসলে এমি, হয়ত অবাক হয়ে বা আনন্দে কিংবা সেই হাসির আড়ালে এমি হয়ত ব্যঙ্গ করে বলতে চেয়েছে, তোমার মা আসলেই খামারে থাকতেন? এমি হয়ত মনে করেছে, কাদির বলা বাক্যটা কেবল তার কিশোরী বন্ধুদের সামনে গর্ব করা ছাড়া আর কিছুই না।
গল্পটা মুনার ছেলেবেলার। তার ছেলেমেয়েরা ছোটবেলা গল্প শুনতে ভালোবাসতো। কোনো কিছুর জন্য লাইন ধরে অপেক্ষা করার মতো করে তারা মাঝে মাঝে গল্প বলার তাড়া দিত। তখন মুনা বলত এমন গল্প। তার বড় ছেলে জামাল সব কিছু অবিকল মনে রাখত এবং বাড়িতে কেউ এলে সেই গল্পগুলি এভাবে উপস্থাপন করত যেন গল্পের পাত্র-পাত্রীরা তার খুব চেনা। যেমন, “আদেলা চাচা সব সময় টাকার ব্যাপারে এমন, তাই না। খুবই বাজে একটা ব্যাপার।“এখন জামাল বেশ বড় হয়ে গেছে। প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পর্যন্ত তার সময় নেই। সারারাত বাইরে থাকে, এক বন্ধুর বাড়িতে নাকি ঘুমায়, আসলে যে সে কি করে কেউ জানে না। তার জামাকাপড়ে ধোঁয়া, ঘাম আর সস্তা খাবারের গন্ধ পাওয়া যায়, যা এই বয়সী ছেলেরা যেসব জায়গায় যায় তার প্রমাণ। মুনা যদি তার ঘরে কাপড়চোপর ধোয়ার জন্য বাছাবাছি করতে যায়, জামাল উচ্চৈস্বরে চিৎকার করে ওঠে। জামাল তার পোশাক এমনটা রাখতেই ভালোবাসে। সে এখন এলোপাথাড়ি পা ঘষে ঘষে হাঁটে যেন তার পা আর পাছা নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে। কোনো একটা কারণে একটু বড় হতেই ছোটবেলার গল্পের সেই অপ-মূর্তিদের প্রতি জামাল আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল কিংবা আগ্রহ না দেখিয়ে যখন উপায় থাকত না, সে তার মাথা দ্রুত নাড়ত কারণ মুনা তখন জামালকে এমন কিছু মানুষের কথা মনে করিয়ে দিত যাদের কথা এক সময় সে পরিচিতের মতো বলত। জামাল চাইত গল্পগুলা যাতে দ্রুত শেষ হয়, মুনা যেমনটা লম্বা গল্প করে তেমনটা যাতে না করে জামাল চেষ্টা করত।

কাদি একইরকম হুবহু মনে রাখতে পারত না, তাকে প্রায়ই এটা সেটা মনে করিয়ে দিতে হত। যেমন, “হ্যাঁ, তুমি তো জানোই যে আমার খালুর নাম ছিল ওমর। তার একটা খামার ছিল। চৌদ্দ বছর বয়সে সেখানে আমি কয়েক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলাম।” অপ্রত্যাশিতভাবে মাঝে মাঝে তাকে ঠিকঠাক গল্প মনে করতে দেখা গেছে। এই সন্ধ্যার মতো। একটা সাম্রাজ্যের স্মৃতি আর আবেগী কাহিনি দেখার পর যেমন আজ কাদির মনে পড়ল খামারটার কথা, তারপর বন্ধুদের বলল, “আমার মা আফ্রিকায় একটি খামারে থাকতেন।” আসলে ব্যাপারটা একেবারেই এমন না। কোন সুইপিং ড্রাইভ, ঘোড়া, স্ফটিকের গ্লাস, চাকরবাকর, কোনো অধীনস্থ লোক, এমন কিছুই ছিল না সেখানে। মুনা নিজেই ছিল সেখানে একজন অধীনস্থ মানুষ, জীবনের এবং অন্যের। যাকে এখান থেকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল, তারপর ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল যারা তাকে ভালোবাসে বা যারা তার মালিক তাদের কাছে।

একথা শুনেই আসলে কাদির বান্ধবী হেসে উঠেছে। মুনা ভালো করেই জানে টেলিভিশনের সুন্দর জীবনটা দেখাই এই হাসির কারণ না। মেয়েটা নিশ্চিত যে কাদির মা সত্যিকারের আফ্রিকার খোলা আকাশের নিচে, ছায়াময় কোনো খামারে বাস করেনি, কোনো বাবলা গাছের এলাকা বা একটা আলোকিত বারান্দা তার ভাগ্যে জোটেনি। খুব সম্ভবত কাদির মা’র আফ্রিকা ছিল সেই আফ্রিকা, যার ঝলক টিভিতে দেখা যায়, রাস্তাভর্তি মানুষ, ধুলোমাখা মাঠে শিশুরা ঘুরছে বা মায়ের কোলে ঝুলে আছে।

হতে পারে কাদির বন্ধু তার মতো করে ভাবেনি। হতে পারে মেয়েটা আসলে হাসে নাই। মুনা লজ্জা পেল যে সে অনুমান করে এতদূর ভেবে ফেলেছে, এমনকি দৌড়ে গিয়ে তাদের কিছু বলতেও চেয়েছে। একটা তিক্ত অনুভূতি মনের ভেতর পাঁক খাওয়ায় মুনা অবাক হল। এটা তো তার বয়সের ব্যাপার না! কিন্তু সে কাদির বাক্যটাতে একটা মিনতি শুনতে পেয়েছে, যেন কাদি বলতে চাইছে, ”দয়া করে ভাবো আমার মা যখন আফ্রিকায় ছিল তখন দেখতে এমন ছিল আর তাই আমি তোমাদের মতো দেখতে।” কিংবা হতে পারে এটা কোন মিনতি ছিল না, কাদি আফ্রিকাকে যেমন দেখেছে তেমনটা ভাবাই তার জন্য স্বাভাবিক এবং তার মা সেখানে সেভাবেই থাকত এমন ভাবাটাও অন্যায় কিছু না।

মেয়েগুলোর বয়স সবে চৌদ্দ। যে-খামারে সে থেকেছে, সেটা বিলাসবহুল কিছু ছিল না বরং ছিল ছোট এবং সাধারণ। সেটা আফ্রিকার কোন জায়গা না, কিন্তু বাস্তবের একটি জায়গা, যেখানে সবকিছুর নিজস্ব নাম ছিল। যেখানে ঘাসের গন্ধ আর পাতা থেকে শুরু করে আবহাওয়ার ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলো সত্যি ছিল… এই কথাগুলো মুনা যদি গিয়ে বলত তবে তাদেরকে বিব্রতই করা হতো, বিশেষ করে কাদিকে।

“আমার মা আফ্রিকার একটা খামারে থাকতেন,” কাদির এই কথাটা শোনার পর থেকে মুনা নড়তে পারেনি। কেমন একটা ক্রোধে নিশ্চল হয়ে ছিল। এখন আস্তে আস্তে রাগটা প্রশমিত হয়ে মনের ভেতরে একরকম অনুতাপ আর অপরাধবোধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করছে। মুনা আনমনা হয়েই ভাবল, এমন রেগে যাওয়ার কি আছে? মেয়েগুলো অন্য জগতের। তার নরম মনের মেয়ে আর তার বান্ধবীরা একটা আহত কচ্ছপ আর আটকে পড়া সিলের দুর্ভাগ্য দেখেও কেঁদে ফেলত হয়তো, তবে যারা এরকম দুর্ভাগ্যের যোগ্য তাদের দিক থেকে বরং মুখ ফিরিয়ে নিত।

স্মৃতি মুনাকে পোড়ায়। সে ভুলতে পারে না। সে বুঝতেই পারে কেন কিছু কিছু জিনিস থেকে সে এখনো মুক্তি পায়নি। সে হয়রান হয়ে যায় ভেবে ভেবে, বাড়ি থেকে দূরে থাকা রাস্তার মানুষগুলোও কি এইরকমভাবে ভুগতে থাকে! মুনা আশ্চর্য হয়, দূরত্ব কিভাবে স্মৃতিচারণের ধরন পালটে দেয়!

গ্রামে পাঠানোর বন্দোবস্তের কথা মুনা এক কানে শুনতে পেয়েছিল, তবে সেটা যেন মোটেও মুনার না, অন্য কারো। তারা বাবা তখন বাড়িতে ছিল না, ইতিমধ্যে কয়েক মাস ধরে লাপাত্তা এবং অদূর ভবিষ্যতেও যে ফিরে আসবে, এমন কোনো নিশ্চয়তাও ছিল না। শিশুকাল থেকেই মুনা তার বাবার এমন দীর্ঘ দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে অবাক হত না। সে ব্যাপারটাতে এতই অভ্যস্ত ছিল যে, কখনো আলাদাভাবে ভেবেই দেখেনি বাবা নেই বরং বাবা বাড়িতে থাকলেই মুনাকে আলাদাভাবে খেয়াল করতে হতো। মুনার বাবা ফিরে এলেই নানান কিছু ঘটত, যেন তার মা হয়তো কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা বিশেষ কোনো কাজের আগে তার বাবার ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকত। হতে পারে মুনার বাবা এটাই পছন্দ করতেন কিংবা এও হতে পারে লম্বা অনুপস্থিতির পর তার বাবা যে টাকা নিয়ে ফিরে আসত, তা দিয়েই কাজগুলো করা হতো। মুনার ধারণা বছরের পর বছর তার বাবার অনুপস্থিতিতে তার মা ন্যুব্জ হয়ে পড়েছিল আর তাই মুনা আর তার বোন তার মায়ের সাথে যে জীবনযাপন করত তাতে প্রাণ ছিল না।

একটা সময় যে-কোনো কিছুর ভার নেয়া মুনার মায়ের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল আর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি মাথায় হাত রেখে বসে থাকতেন। মাথাব্যথা, বলে একটা সাধারণ কাজও করতে পারতেন না। মুনা আর তার বোন হাওয়া পা টিপে মায়ের চারপাশে হাঁটত, বসে থাকত যখন তার মায়ের ধীরগতির নিশ্বাসের শব্দ দুবোনের মাঝে একমাত্র শব্দ হয়ে উঠত। মায়ের কান্না দেখে মুনা আর তার বোন অসহায় বোধ করত। তারা ঝগড়া শুরু করলেই তার মায়ের কান্না শুরু হত আর তা থামানো যেত না, যতক্ষণ না ঝগড়া মিটে যায়, এটাই তার অস্ত্র ছিল। মাঝে মাঝে মুনার মা মেয়েদের ছোটখাট অপরাধ বা আঘাতেই সারাদিন কাঁদত। যে পর্যন্ত না তিনজন মিলে এক অসহ্য যন্ত্রণায় কেঁদে কেঁদে এক হত, সেই কান্না চলত।

একদিন তার খালা আমিনা বেড়াতে এসেছিল আর তখনই মুনা তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্তের কথা শুনেছিল। মুনার মায়ের বড় বোন আমিনা খালা বলেছিল, দুটো মেয়ে তার বোনের একটু বেশি চাপ হয়ে যাচ্ছে আর তাই সে মুনাকে সাথে নিয়ে যাবে এবং যে-পর্যন্ত মুনার মা কিছুটা সেরে না ওঠে সে মুনাকে রাখবে। হাওয়া তার মায়ের দেখাশোনা করবে, বিশ্রাম নিতে সাহায্য করবে আর তাকে সুস্থ করে তুলবে। মুনাকে আমিনা খালা বলেছিল, তুই আমার সাথে গ্রামে চল, আমার সাথে কাজ করবি।

তার মনে নেই কেউ তার স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে এই কথাটা বলেছিল কিনা কিন্তু যাওয়ার কথা শোনার পর এই কথাটাই প্রথমে ভেবেছিল মুনা যে, কয়েকদিন পর স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। একঘণ্টার মধ্যেই মুনা কয়েকদিন থাকার মতো কাপড়চোপর গুছিয়ে ফেলেছিল। তারপর শেষবার তার বাবার উপহার হিসাবে আনা একটা পশমি চাদর পরে সে তার খালার সাথে বাসস্ট্যান্ডে হেঁটে গিয়েছিল। তার মনে আছে কারণ সেই প্রথম শালটা সে গায়ে দিয়েছিল। খামারটা শহর থেকে মাত্র পনেরো মাইল দূরে ছিল। শিশুবয়সে সেখানে সে বারকয়েক গিয়েছিল। বছরে ওমর খালুকে সে দেখতে পেত বেশ কয়েকবার। তিনি শহরে এলে তাদের ডেকে পাঠাতেন। কিন্তু কখনো তার মনে হয়নি খালুর বাড়িতে সে কয়েক সপ্তাহ থাকতে যাবে।

ওমর খালু তেমন একটা হাসতেন না। এমন না সে অসুখী বা বদরাগী স্বভাবের ছিল। তার স্বভাবই ছিল, না-হাসা। কিন্তু মুনাকে ফুটপাথ ধরে তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে দেখে ওমর খালু হেসেছিলেন। ওমর খালু তখন ছাউনি দেওয়া বারান্দায় বসে বসে তালপাতা দিয়ে ঝুড়ি বানাচ্ছিলেন, তাদের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শব্দ তিনি শুনেই তাকিয়েছিলেন, তার নীরব মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল।

বাড়িটা একটা ছোট জলা পর্যন্ত চলে যাওয়া ঢালের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। খামারটা ছিল বাড়ির পেছন থেকে জলার ছয় একর জায়গা ঘিরে। খামারে কাটানো প্রথম রাতের কথা আর গ্রামের অখণ্ড নিস্তব্ধতার কথা মুনার সবসময় মনে পড়ে। আসলে ঠিক নিস্তব্ধতা না, সবসময় আঁচড় কাটার মতো হিসহিসে একটা শব্দ হতো, তাতে রাতের শ্রবণাতীত অবর্ণনীয় রহস্য আরও ঘনীভূত হতো। বাড়ির বাইরে গেলেই সেই নিস্তব্ধতা তার উপর নীরব গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ত। ঘুমের মধ্যে মুনা কর্কশ চিৎকার শুনতে পেত কিন্তু চোখ খুললেই তা মিলিয়ে যেত, জলা থেকে ব্যাঙের গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও মুনা শুনতে পেত।

তারা মুনাকে একটা নিজস্ব কামরা দিয়েছিল থাকতে। আমিনা খালা বলেছিল, “এখানে তুই কয়েক সপ্তাহ থাকবি তাই এখানে নিজের মতো গুছিয়ে নে।” বাড়িটা ছিল ছোট। মাত্র দুটো কামরা আর একটা স্টোর রুম। একেবারে কুঁড়েঘর না, একটা ছোটখাট কৃষকের আবাস বলা যায়। বছরের নানান সময় ধরেই মুনার থাকার কামরাটাও স্টোর রুম হিসাবেই ব্যবহৃত হতো। সাদা রঙ করা দেয়ালে কোনো তরল বা গাছের নির্যাস ছিটকে পড়ার দাগ স্থায়ী হয়ে লেগেছিল, যা আর তুলে ফেলা সম্ভব হয়নি। পরিত্যক্ত ছোট জানালাটা জলা থেকে বেশ দূরে ঢালের উপর একসারি কলাগাছের বরাবর তাক করা ছিল।

দিনের বেলা মুনাকে আমিনা খালার কাছাকাছি থাকতে বলা হতো আর কাজ বুঝে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। মুনা বুঝত তার দিকে নজর রাখার দরকার বলেই এমনটা করা হতো। কেননা সে ছিল একটা চৌদ্দ বছরের মেয়ে। মুনা তার খালাকে উঠান ঝাড়ু দেওয়া, রান্না করা, কাপড় ধোঁয়া, ফলমূল ধুয়ে প্যাকেট করা তারপর তা বাক্সবন্দী করে শহরে পাঠানোর কাজে সাহায্য করত। প্রথম প্রথম মুনা ক্লান্ত হয়ে পড়ত। কিন্তু এই একঘেয়ে নিয়মে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে কয়েক দিন পর থেকেই মুনা একরকম প্রশান্তি অনুভব করত। সন্ধ্যায় যদি মুনা ক্লান্ত না হয়ে পড়ত আর ওমর খালুর মেজাজ যদি ভালো থাকত, তাহলে তাকে খামারের কাজ দেখাতে নিয়ে যেত এবং মাঝে মাঝে তাকে রাস্তায় নিয়ে যেত। সেই লম্বা আমগাছটা, যেখান থেকে লোকজন বাসে উঠত, সে-পর্যন্ত হেঁটে যেত। সেখানে একটা ছোট দোকান ছিল, ওমর খালু যদি বেঞ্চে বসে থাকা লোকজনের সাথে কুশল বিনিময় করতে বসত, তখন দোকানি কফি বানিয়ে দিত। ওমর খালু প্রথম দিন বলেছিল, ”ভেতরে যা আর সবার সাথে কথা বল।” এরপর থেকে মুনা সবসময় ভেতর বাড়ির মহিলাদের সাথে গল্পগুজব করতো, যে পর্যন্ত না ওমর খালু গাছের নিচে বসে আড্ডা শেষ করে।

একদিন আরও একজন লোক আড্ডা থেকে উঠে তাদের সাথে হেঁটে বাড়ির দিকে গিয়েছিল। লোকটা ওমর খালুর চেয়ে বেশ ছোট ছিল, খুব সম্ভবত ত্রিশের কিছু বেশি হবে বয়স লোকটার। হাসিখুশি মুখ আর উজ্জ্বল চোখের সেই মানুষটার নাম ছিল ঈসা। ওমর খালু মুনাকে বলেছিল, ঈসা তাদের একজন কাছের প্রতিবেশী। মুনা তাদের পেছনে পেছনে হাঁটছিল এবং দুজনের কথাবার্তার ভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিল তাদের অন্তরঙ্গতা কতখানি। পরে মুনা জানতে পেরেছিল ঈসা প্রায়ই ওমর খালুদের নিমন্ত্রণ করত কিন্তু এরপর সে তার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে পেম্বায় কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। ঈসা এলে বারান্দায় ওমর খালুর সাথে আড্ডা দিত, কফি পান করতে করতে হাসাহাসি করত। মাঝে মাঝে আমিনা খালাও তাদের সাথে বসত। ঈসা তাদের খুবই ভালো বন্ধু ছিল। আমিনা খালা তার স্ত্রী আর সন্তানদের কথা জিজ্ঞেস করত, মাঝে মাঝে ঈসাকে ছেলে বলে সম্বোধন করত।

ঈসা সব সময় মুনাকে কাছে ডেকে কুশল জিজ্ঞাসা করত। মুনা খেয়াল না করে পারেনি যে ঈসা লুকিয়ে লুকিয়ে মুনার দিকে তাকিয়ে থাকতো। মুনা তার এই আগ্রহকে খেয়াল না করে পারেনি। বেশ কয়েক দিন এভাবেই চলছিল। ধীরে ধীরে ঈসা প্রতিদিন আসতে শুরু করেছিল। তার গভীর ও গোপন চাউনিতে মুনার শরীরে জ্বালা ধরে যেত। ঈসাকে দেখে মনে হতো তার কোন তাড়া নেই। আর একদিন ঈসা মুনার দিকে তাকিয়ে গোপন হাসি ছুঁড়ে দিয়েছিল। মুনাও একটা হাসি ফিরিয়ে দিয়ে, খুশি মনে অন্য দিকে তাকিয়েছিল।

যা ঘটছিল তা না বোঝার কোনো অবকাশ ছিল না। ওমর খালুকে বেশ ভীত-সন্ত্রস্ত আর অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যেত। ঈসা থাকা কালে মুনা এলে আমিনা খালা সব সময় তাকে এটা সেটা কাজ ধরিয়ে দিত, তবে খালা-খালু দুজনের কেউই মুনাকে কিছু বলেনি। ঈসার চাউনি আর হাসি মুনাকে আলোড়িত করলেও ভীতও করত। যেহেতু ঈসা কিছুই বলেনি আর তার খালা-খালু বেশ সতর্ক, তাই মুনা বেশ নিরাপদেই সেই নিছক খেলায় অংশ নিত।
এক রাতে ঈসা মুনার জানালা পর্যন্ত এসেছিল। হতে পারে সেটাই প্রথম বার না, এর আগেও ঈসা এসেছিল। জানালাটা দেয়ালের উপরের দিকে ছিল, ছিল দুটো কাঠের পাল্লা। প্রথম প্রথম গ্রামের অন্ধকারকে ভয় পেত মুনা আর দুই পাল্লাই লাগিয়ে রাখত। কিন্তু আস্তে আস্তে একটা খোলা রাখতে শুরুর করেছিল। একদিন মুনা কিছু একটা হচ্ছে এই অনুভূতি নিয়ে জেগে উঠেছিল, জেগেই সে সোজা জানালার দিকে তাকিয়েছিল। রাতের বাতাসে যতটা দীপ্তি ছড়িয়ে ছিল তাতে জানালায় একজন মানুষের ছায়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মুখে হাত চাপা দেওয়ার আগে একটা ঊর্ধ্বশ্বাস না গিলে ফেলে সে পারেনি। এক মুহূর্ত দেখেই মুনা বুঝেছিল ঈসাই ছিল সেখানে। মুনা নিজেকে শান্ত করে এমনভাবে শুয়ে ছিল যেন সে ঘুমিয়ে পড়েছে। কয়েক মুহূর্ত পরেই মুনা ঈসার শ্বাসপ্রশ্বাস শুনতে পেয়েছিল। মুনা বুঝতে পেরেছিল একরকম টান আছে তাদের মধ্যে আর তাই সে জেগে উঠেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথার ছায়াটা সরে গিয়েছিল কিন্তু জানালাটা লাগিয়ে দেওয়ার সাহস তখন মুনার হয়নি এই ভেবে যে, যদি তখন ঈসা তাকে ধরে ফেলে। বাকি রাত মুনা জানালার দিকে মুখ দিয়ে ঝিমোতে ঝিমোতে কাটিয়েছিল।

পরদিন সকালে মুনা তার ঘরের পিছনে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল একটা শক্ত মাটির ঢিবির উপর দাঁড়িয়ে ঈসা ভেতরের দিকটা দেখেছিল, যদিও সেখানে দাঁড়ানোর পরও ঈসাকে জানালার গরাদের উপর ভর দিতে হতো। সেই সন্ধ্যায় ঈসা ওমরের বাড়িতে এলে মুনা উঠানের ভেতরেই ছিল আর ঈসাকে অভিবাদন জানানোর সময় নিজের কণ্ঠকে কেঁপে উঠতে শুনেছিল। রাতে মুনা তার জানালার দুই পাল্লা বন্ধ রেখে ঈসার জন্য অপেক্ষা করছিল। মুনা শুনতে পেয়েছিল ঈসা এসে জানালার পাল্লায় ধাক্কা দিচ্ছে, নরমভাবে মিনতি করছে, “আমার কাছ থেকে লুকিয়ে থেকো না।” মুনা অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ঈসার শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর ঈসা জানালার গরাদ ছেড়ে দিতেই ধরাস একটা শব্দ হয়েছিল। কিছুতেই সেই ভয় থেকে বের হতে না পেরে সকাল বেলা আমিনা খালাকে দেখেই সে বলে দিয়েছিল কথাটা। কয়েক মুহূর্ত আমিনা খালা কোন কথা বলতে পারেনি। তাকে দুখী দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যেন মুনা তাকে কোনো ভীষণ লোকসানের একটা খবর শুনিয়েছে। আমিনা খালা কেবল বলেছিল, ”ওমরকে কিছু বলিস না।”

এরপর আমিনা খালা মুনাকে তার কাপড়চোপর গুছিয়ে নিতে বলেছিল।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা আম গাছের নিচের বাস স্ট্যান্ডের দিকে রওয়ানা হয়েছিল। ওমর খালু এত তাড়াহুড়োর কারণ বুঝতে না পেরে বলেছিলেন, কি এমন হয়েছে, কিসের এত তাড়া?

আমিনা খালা বলেছিল, “না কিছু না। আসলে আমি ভুলে গিয়েছিলাম আজ মুনাকে তার বাসার দিয়ে আসার কথা। “জানোই তো কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেছে মেয়েটা এসেছে।”
এখন মুনা শুনতে পেল কাদি তাকে ডাকছে, মা তুমি কোথায়?

চৌদ্দ বছরের হাস্যোচ্ছল, সম্পূর্ণ নিরাপদ কাদি রান্নাঘরের যেখানে মুনা তার স্মৃতির পাহাড় নিয়ে বসে আছে, সেখানে এল। কাদি পেছন থেকে মুনাকে জড়িয়ে ধরায় তার লম্বা চুল মুনার মাথার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
মুনার মাথার উপর একটা চুমু খেয়ে কাদি জিজ্ঞেস করল, কি করছ মা? তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই রান্নাঘর থেকে বের হতে হতে বলল, আমরা এমির বাসায় যাচ্ছি,কয়েক ঘণ্টা পর ফিরে আসব, মা।
মুনা বলল, “ব্যাপারটা এমন না, ওই যে আফ্রিকার খামারের কথা বললি।”

“আচ্ছা। ও, তুমি শুনেছ? আমি তো এমনি ওদের মুখে তালা দিতে কথাটা বলেছিলাম, যাতে ওরা হিংসায় জ্বলে ওঠে।”

Share Now শেয়ার করুন