ছোটগল্প | খাঁচা | আবদুলরাজাক গুরনা | অনুবাদ মাসুদুজ্জামান

0
287

মন একটা সময় ছিল যখন হামিদের মনে হচ্ছিল যেন সে সবসময় দোকানেই থাকছে, আর তার জীবন সেখানেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। এরপর সে আর অস্বস্তি বোধ করেনি, অথবা সে রাতের শেষ প্রহরে এমন কিছু শুনতে পেতো, যা ভীতিকর হয়ে তার হৃদয়কে শূন্য করে দিয়েছিল। সে এখন জানে যে তারা জলাভূমি থেকে আসতো, যা মূল শহর থেকে শহরতলিকে বিভক্ত করে দিয়েছে আর এখন তা জীবনের সাথে গভীরভাবে মিশে গেছে। উপশহরের একটি প্রধান চৌরাস্তায় দোকানটি ভাল অবস্থানেই ছিল। সে প্রত্যুষের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে দোকানটা খুলতো। এই সময়েই শ্রমিকদের প্রথম দলটা উদ্দেশ্যহীনভাবে কাজ খুঁজতে বেরুতো আর শেষ মানুষটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ি ফিরে না যাওয়ার আগ পর্যন্ত দোকানটা বন্ধ করতো না। সে এইকথাটা বলতে পছন্দ করতো যে, এই জায়গা থেকে সে জীবনের চলমানতাকে দেখতে পায়। পিক আওয়ারে সে সবসময় পায়ের উপর থাকতো। কাস্টমারদের সাথে কথা বলতো এবং হাসি তামাশা করতো, আর যে-দক্ষতায় সে নিজেকে ও তার পণ্যদ্রব্যকে সামলাতো, তাতে তার বেশ আনন্দ হতো। পরে সে ক্লান্ত হয়ে বাক্সের মতো আসনে ডুবে যেতো, যে-আসনটি সারাদিন ব্যবহৃত হতো।

এক সন্ধ্যায় সে যখন দোকানটি বন্ধ করবে বলে ভাবছে, তখনই মেয়েটি হাজির হলো। মেয়েটিকে দেখে সে দুবার মাথা নাড়লো, এরকম হতাশাজনক সময়ে যদিও এটা ছিল একধরনের বিপজ্জনক কৌশল। দ্বিতীয়বার বিশাল একটা হাত তার গলা চেপে ধরছে আর তাকে মাটি থেকে শূন্যে তুলছে এরকম মনে করে তিনি গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। মেয়েটি তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখেমুখে তীব্র বিরক্তির ছাপ নিয়ে অপেক্ষা করছিল।

সে দীর্ঘ, বিরক্তিকর একমিনিট অপেক্ষা করার পর বললো, ‘ঘি’। ‘একশো টাকার মতো দেবেন।’ কথা বলতে বলতে সে তার অর্ধেক মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল, তার দৃষ্টিতে বিরক্তি। শরীরটা একটুকরো কাপড়ে জড়ানো, কাপড়ের প্রান্তটা বগলের নিচে চেপে রাখা। নরম কাপড় সেঁটে আছে তার শরীরে। এতেই তার চেহারার সুন্দর রূপরেখাটা বেশ ফুটে উঠলো। তার কাঁধ উন্মুক্ত আর অন্ধকারে ঝলমল করছিল। লোকটি মেয়েটার কাছে থাকা বাটিটা নিয়ে নিচু হয়ে ঘিটুকু ঢালতে থাকলো। মেয়েটাকে হঠাৎ তার আপন মনে হলো আর মনটা ব্যাথায় ভরে গেল। যখন সে ঘিয়ের বাটিটা তাকে ফেরত দিল, তখন মেয়েটি তার দিকে আবছায়াভাবে তাকালো। তার দৃষ্টি দূরে ছড়ানো আর ক্লান্তিতে ঝিকমিক করছে। সে দেখতে পেলো মেয়েটি তরুণী, ছোট গোলপানা মুখ আর শীর্ণ কাঁধ। কোনো কথা না বলে সে ঘুরে দাঁড়াল আর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, কংক্রিটের খানাখন্দের ওপর দিয়ে অনেকটা লাফিয়ে লাফিয়ে রাস্তা পার হলো। হামিদ তার ফিরে যাওয়ার এই দৃশ্যটা দেখছিল আর তার প্রতি সহানুভূতি দেখানোর জন্যে সতর্কবার্তা হিসেবে চিৎকার করে কিছু বলতে চেয়েছিল। সে কি করে জানবে সেই অন্ধকারে আরও কিছু ছিল কিনা? হামিদের গলা থেকে ক্ষীণ স্বরের কিছু কথা বেরিয়ে এলো, মেয়েটিকে ডাকার উৎসাহ তার নিভে গেল । সে অপেক্ষা করলো, মেয়েটির কান্না শুনতে পাবে বলে আশা করলো, কিন্তু এর পরিবর্তে আরও রাতের দিকে মেয়েটির অপসৃয়মান স্যান্ডেলের শব্দ শুনতে পেলো।

মেয়েটি দেখতে সত্যি আকর্ষণীয় ছিল, এবং কিছু কারণে যখন সে তার কথা চিন্তা করতে শুরু করলো আর রাতের গভীরে মেয়েটির অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কথা ভাবলো, তখন নিজের প্রতি সে ঘৃণা অনুভব করতে শুরু করলো। মেয়েটি তার দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। হামিদের কাছে তার শরীর এবং মুখটা এখন আর স্বাভাবিক থাকলো না। প্রতিদিন তার হাতমুখ বারবার ধোয়ার খুব বেশি কারণ থাকে না। বিছানা থেকে দোকানে আসতে লাগে মাত্র একমিনিট বা এর একটু বেশি, আর সে অন্য কোথাও যায়ও না। ধোয়াটোয়ার কোনো ব্যাপার কি ছিল? যথাযথ ব্যায়ামের অভাবে তার পা দুটো বেঢপ আকার নিয়েছে। সারা দিন সে এরকমই বন্দী থাকে; এভাবেই কেটে যাচ্ছে মাস ও বছর, সারা জীবন বোকার মতো দোকানেই তার জীবনটা কাটলো। সে ক্লান্ত হয়ে দোকানটি বন্ধ করলো, সে জানে রাতে তার স্বভাব-বিরুদ্ধ কিছু একটা করবে।

পরদিন সন্ধ্যায় মেয়েটি আবার দোকানে এল। হামিদ তার একজন নিয়মিত কাস্টমারের সঙ্গে কথা বলছিল, লোকটি তার চেয়ে অনেক বড়, মনসুর নামে পরিচিত। মনসুর কাছাকাছি থাকেন আর কোনো কোনো সন্ধ্যায় দোকানে এসে তার সঙ্গে গল্প জুড়ে দেন। তার চোখে ছানি থাকায় তিনি কানা ছিলেন এবং মানুষ এই দুর্দশার জন্যে তাকে উত্যক্ত করতো, নিষ্ঠুর খেলা খেলতো। কেউ কেউ মনসুর সম্পর্কে বলতো তিনি অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন, কারণ তার চোখ বিষ্ঠায় ভরা। তিনি দস্যি বালকদের কাছ থেকে দূরে থাকতে পারতেন না। হামিদ মাঝে মাঝে ভাবতো, মনসুর যদি তার দোকানে অনেকক্ষণ থেকে তাকে সঙ্গ দিত তাহলে ভালো হতো। কিন্তু সে শুধু আসতো কুৎসা আর গালগল্প করতে। মেয়েটিকে কাছে আসতে দেখে মনসুর কথা বলা বন্ধ করলো, তারপর দুর্বল আলোতে ট্যারা চোখে তাকে দেখার চেষ্টা করলো।

‘আপনার কাছে কি জুতার কালি আছে? কালো?’ মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো।
‘হ্যাঁ,’ হামিদ বললো। তার কণ্ঠস্বর যেন ঠান্ডায় জমে আসছিল, তাই সে গলা খাকারি দিয়ে বারবার বললো, ‘হ্যাঁ।’ মেয়েটি হাসল।
‘স্বাগত, প্রিয়তমা, আজ কেমন আছ?’ মনসুর জিজ্ঞেস করল। মনসুরের উচ্চারণ স্পষ্ট, ভারি, হামিদ বিস্মিত হয়ে ভাবলো এভাবে কথা বলাটা রসিকতা কিনা। ‘কী সুন্দর গন্ধ তোমার, এ তো সুগন্ধি! কোকিলের মতো কণ্ঠ আর হরিণের বাঁকানো শিঙের মতো শরীর। বলো হে মক্ষিকা, আজ রাতে কখন তোমার সময় হবে? আমার পিঠে মালিশ করার জন্য কাউকে দরকার।’

মেয়েটি মনসুরকে উপেক্ষা করলো। হামিদ শুনতে পেল মনসুর মেয়েটির সাথে কথা বলেই যাচ্ছে। একটা সময় সে উঁচু গলায় প্রশংসাসূচক গান গাইলো। বিভ্রান্ত হামিদ জুতা পালিশের কৌটাটা খুঁজে পেল না। যখন সে খুঁজে পেয়ে মেয়েটির দিকে ঘুরে দাঁড়ালো, তখন তার মনে হলো মেয়েটি এতক্ষণ তাকেই দেখছিল আর মজা পাচ্ছিল। হামিদ হাসলো, কিন্তু মেয়েটি ভ্রূকুটি করে দামটা দিল। পাশ থেকে মনসুর তার সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলছিল। উস্কে দিচ্ছিল, ফ্লার্ট করছিল আর মাঝে মাঝে তার জ্যাকেটের পকেটের টাকাগুলো ঝনঝন করে বাজাচ্ছিল। কিন্তু মেয়েটি ঘুরে দাঁড়িয়ে কোনো কথা না বলে চলে গেল।

‘ওর দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, সূর্য নিজেও তার উপর উজ্জ্বলতা ছড়াতে সাহস পাবে না। কতটা গর্বিত সে! কিন্তু আসল সত্য হল, সহজেই ওকে মেলে’, বলেই মনসুর তার শরীর ঝাকিয়ে খিকখিক করে হাসতে থাকলো। ‘অনেক দিন পর আমি তাকে পেতে যাচ্ছি। মেয়েটা কত নেবে বলেন তো? এরা সবসময় এটাই করে, এই নারীরা, শূন্যে নিস্পৃহ চোখে তাকায় আর ঘৃণ্য একটা চেহারা ফুটিয়ে তোলে… কিন্তু একবার যদি তাদের বিছানায় নিতে পারেন, তাহলে আপনি নিজের মতো তাদের পেয়ে যাবেন। তখন তারা বুঝতে পারে কে তাদের প্রভু।’

হামিদ দেখলো তার নিজের কেন যেন হাসি পাচ্ছে, পুরুষদের মধ্যে শান্তি অক্ষুণ্ণ থাকাটা জরুরি, কিন্তু সে ভাবতে পারলো না যে মেয়েটিকে কেনা যাবে। মেয়েটা প্রতিটি কর্মে এতটা প্রত্যয়ী আর এতটাই সহজ তার ভাবভঙ্গি যে, মনসুরের কথা হামিদ বিশ্বাস করলো না। বারবার তার মন মেয়েটির দিকে ধাবিত হচ্ছিল, এবং যখন সে একা হলো, কল্পনা করলো মেয়েটির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। রাতে দোকান বন্ধ করার পর কয়েক মিনিটের জন্যে সে দোকানের পেছনে বুড়ো মালিক ফাজিরের বাড়িতে গেল। কিন্তু মালিককে কোথাও দেখতে পেল না। অথচ এমনটা হবার কথা নয়, তিনি তার বিছানা ছেড়ে কোথাও যান না। কাছাকাছি থাকেন এমন এক মহিলা দিনের বেলা তার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি দোকান থেকে বিনামূল্যে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে গেছেন। রাতে অসুস্থ এই বুড়ো লোকটি হামিদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটাতে পছন্দ করে। তারা যখন কথা বলে মুমূর্ষু মানুষের ঘ্রাণে ঘরটা ভরে যায়। আলাপ করারও অবশ্য বেশি কিছু থাকে না। গরিবি হালের ব্যবসা নিয়ে সাধারণত যেসব অভিযোগ থাকে, তাই নিয়ে টুকটাক কথা হয়। সবচেয়ে বেশি হয় প্রার্থনা, বুড়ো স্বাস্থ্যটা যাতে ফিরে পায় সেই জন্যে প্রার্থনা করে সে। কখনও কখনও, যখন বুড়ো ভেঙে পড়েন, ফাজির অশ্রুসজল চোখে অপেক্ষমান মৃত্যুর কথা বলেন। এর পর হামিদ বৃদ্ধকে টয়লেটে নিয়ে যায়, নিশ্চিত হতে চায় যাতে তার উদর পরিষ্কার ও খালি হয়ে যায় এবং সে তাকে ছেড়ে চলে আসে। রাত গভীর হলে ফাজির নিজের সাথে বিড়বিড় করতে থাকেন আর মাঝে মাঝে অস্ফুট স্বরে হামিদের নাম ধরে ডাকতে থাকেন।

ফাজির বাড়িতেই হামিদের ঠাঁই হয়েছে। কিন্তু হামিদ ভিতরের দিককার উঠানে ঘুমায়। কখনো বৃষ্টি নামলে ছোট্ট দোকানের একটা জায়গা পরিষ্কার করে সেখানে ঘুমায়। সে তার রাতগুলো একাকী কাটায় এবং কখনো বাইরে যায় না। প্রায় এক বছর হলো সে দোকান ছেড়ে কোথাও যাচ্ছে না। এর আগে বুড়োটা শয্যাশায়ী হওয়ার আগ পর্য়ন্ত শুধু তার সঙ্গেই বাইরে যেতেন। প্রতি শুক্রবার ফাজি তাকে মসজিদে নিয়ে যেতেন এবং হামিদের মনে পড়ে সেখানে অনেক লোকসমাগম হতো আর ফাটলধরা ফুটপাথ দিয়ে বৃষ্টির বাষ্প উঠতো। বাড়ি ফেরার পথে তারা বাজারে যেত, এবং বুড়ো লোকটি ফল আর সবজির দোকানে গিয়ে সুস্বাদু ফল আর উজ্জ্বল রঙের শাকসবজির দরদাম করতো। কিছু কিছু হাতে তুলে নিয়ে গন্ধ বা স্পর্শ নিত। সেই কিশোর বয়স থেকে, যখন বুড়ো বাস করবার জন্যে প্রথম এই শহরে আসেন, তখন থেকেই হামিদ তার দোকানে কাজ করছে। ফাজির তাকে জায়গা দিয়েছে আর সে দোকানে কাজ করছে। প্রতিদিন কাজের শেষে সে একা একা রাত কাটায় আর মাঝে মাঝেই তার মনে পড়ে যায় বাবা-মা আর যে-শহরে সে জন্মেছে, সেই শহরের কথা। যদিও এখন সে আর বালক নেই, তবু স্মৃতিগুলি তাকে কাঁদায়; এমন অনুভূতির দ্বারা সে অবনমিত হয়ে আছে যা তাকে ছেড়ে যাবে না।

যখন মেয়েটি আবার দোকানে আসল, মটরশুটি আর চিনি কিনতে, হামিদ পরিমাণের চাইতে তাকে একটু বেশিই দিল। সে লক্ষ করলো মেয়েটি তাই দেখে হাসলো। হামিদ আনন্দে উদ্ভাসিত হলো, যদিও সে জানতো, মেয়েটি উপহাসের হাসিই হাসছে। পরের বার মেয়েটি কিছু একটা বললো, একটুখানি শুভেচ্ছা জানালো, কথা বললো সুন্দরভাবে। এর পর একদিন মেয়েটি বললো তার নাম রুকাইয়া আর সে অল্প কিছুদিন হয় আত্মীয়দের সাথে থাকবার জন্যে এখানে চলে এসেছে।
হামিদ জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনার বাড়ি কোথায়?’

‘মোয়েমবেমারিংগো,’ মেয়েটি বললো। একটি হাত প্রসারিত করে বোঝালো যে জায়গাটা অনেক দূরে। ‘কিন্তু আপনি যদি সেখানে যেতে চান তাহলে পিছনের রাস্তা আর পাহাড়ের উপর দিয়ে যেতে হবে।’
হামিদ দেখলো মেয়েটি নীল সুতির একটা পোশাক পরেছে, গৃহকর্মী বলে দিনের বেলা সে কাজের সময় এই পোশাকটা পরে। যখন হামিদ তাকে জিজ্ঞাসা করলো কোথায় সে কাজ করে, প্রথমে মৃদু গলায় সে এমনভাবে উত্তর দিল যে প্রশ্নটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর পর সে তাকে বললো, যতক্ষণ না ভালো কোনো কাজ পাচ্ছে, ততক্ষণ যেখানে এখন কাজ করছে শহরের সেই নতুন হোটেলেই কাজ করে যাবে।

‘সবচেয়ে ভালো হচ্ছে ইকিউয়েটর হোটেলে কাজ করা। সেখানে সুইমিং পুল আছে আর পুরো হোটেলটা কার্পেটে মোড়া। সেখানে যারা কাজ করেন তাদের প্রায় সবাই মজুঙ্গু, অর্থাৎ ইউরোপীয়। কয়েকজন ভারতীয়ও আছে, কিন্তু জঙ্গল থেকে উঠে আসা কেউ নেই যারা জিনিসপত্তর দুর্গন্ধে ভরিয়ে দেবে।’

রাতে দোকান বন্ধ করার পর সে তার ঘুমানোর জায়গা, অর্থাৎ বাড়ির উঠোনের পেছনের দরজায় এসে দাঁড়ালো। রাস্তাগুলি এসময় ফাঁকা হয়ে যায় আর নীরব হয়ে পড়ে, দিনের মতো এখন আর জায়গাটা রুক্ষ, বিপজ্জনক নয়। সে এখন প্রায়ই রুকাইয়ার কথা ভাবে, আর মাঝে মাঝে তার নাম ধরে ডাকে। কিন্তু যতই তার কথা চিন্তা করে ততই সে তার ভেতরকার বিচ্ছিন্নতা ও নোংরা পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। তার মনে পড়ে যায় প্রথমবার কী অবজ্ঞার চোখেই না মেয়েটি তাকে দেখছিল আর শেষ বিকেলের ছায়ায় মধ্যে মিলিয়ে গিয়েছিল। হামিদের ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে স্পর্শ করতে…। সে ভাবলো, বছরের পর বছর অন্ধকারের জগতে থাকতে থাকতে তার এমনটা হয়েছে। এখন সে চোখ মেলে অচেনা বিদেশি শহরের রাস্তাগুলো দেখলো আর কল্পনা করলো এমন একটা অচেনা মেয়ের স্পর্শই তাকে মুক্তি দিতে পারে।

একদিন রাতে সে ঘরের দরোজাটা লাগিয়ে দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল। ধীরে ধীরে হেঁটে সে কাছের স্ট্রিট ল্যাম্পের দিকে এগিয়ে গেল, এর পর আরেকটি। অনেক কিছুই তার কাছে নতুন লাগছে, কিন্তু সে ভয় পেল না। শুনলো পাশ দিয়ে সশব্দে কিছু একটা যাচ্ছে, কিন্তু সে তাকালো না। যদি সে না জানতো যে কোথায় যাচ্ছে, তাহলে ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই, তবে এরপরও একটা কিছু যখন-তখন ঘটতে পারতো। কিন্তু সে স্বস্তিতে ছিল।

সে রাস্তার কোণে সারি সারি দোকানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একটা-দুটো দোকানে তখন আলো জ্বলছিল। এরপর আলোর ঝলকানি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আরেক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। কাউকেই সে দেখল না, না পুলিশ, না রাতের প্রহরী। একটি পার্কে গিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য একটি কাঠের বেঞ্চে বসল, ভাবলো সবকিছুই তো পরিচিত মনে হচ্ছে। রাস্তার এক কোণে ছিল একটা ঘড়ির টাওয়ার। নীরব নিস্তব্ধ রাতে মৃদুভাবে ক্লিক ক্লিক বেজে চলেছে। ধাতব ল্যাম্পপোস্টগুলো একটা বর্গক্ষেত্রের পাশে নির্বোধের মতো সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। বাসগুলো এক প্রান্তে সারি সারি পার্ক করা। সমুদ্র থেকে এই জায়গাটার দূরত্ব এমন যে সে সমুদ্রের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।

শব্দের জন্যে তৈরি ছিল এবং আবিষ্কার করল জলপ্রপাত থেকে বেশি দূরে নয় সে। জলের গন্ধ হঠাৎ তাকে তার বাবার বাড়ির কথা মনে করিয়ে দিল। সেই শহরটিও সমুদ্রের ধারে। একদিন সেও অন্য আর দশটা শিশুর মতো ওই সমুদ্র সৈকতে আর অগভীর জায়গায় খেলত। এখন সে ভাবতেই পারেন না যে এরকম কোথাও সে ছিল, কোথাও ছিল তার বাড়ি। জল সমুদ্র প্রাচীরের গায়ে ধীরে ধীরে আঘাত করছিল, এবং কংক্রিটের শরীরে সাদা ফেনা ভেঙে ভেঙে উঁকি মেরে থেমে যাচ্ছিল। একটা জেটিতে তখনও আলো জ্বলজ্বল করছে আর যান্ত্রিক কর্মকাণ্ড চলছে। রাতের এই সময়টাতে কেউ কাজ করছে, ভাবা যায় না।

উপসাগর জুড়ে আলো জ্বলছে, অন্ধকারের পটে একক বিচ্ছিন্ন আলোর বিন্দুগুলো ফুটে আছে। কারা থাকে ওখানে? সে এসব দেখে বিস্মিত। ভয়ের একটা কাঁপুনি তার শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেল। সে শহরের সেই অন্ধকার কোণে বসবাসকারী মানুষের ভাবভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করল। তার মনে আভাসিত হলো নিষ্ঠুর মুখের বলশালী কিছূ পুরুষের ছবি, যারা তার দিকে তাকাবে আর হাসবে। হামিদ দেখল, যেখানে ছায়াগুলি অপরিচিত ব্যক্তির অপেক্ষায় ছিল, যেখানে পরে নারীরা পুরুষের শরীরের ওপর ঢলে পড়ছিল, সেখান থেকে অন্ধকার সরে যাচ্ছে। সে শুনতে পেল তাদের মাটি কাঁপানো পায়ের আওয়াজ আর শত্রুর রক্তস্রোতের উপর দিয়ে বিজয়োল্লাশে ফেটে পড়ার মতো উল্লাস। তারা শুধু যে শারীরিক হুমকি তৈরি করছিল বলে নয়, এই উপসাগরের অন্ধকারের লোকদের দাপট দেখে তাঁর ভীষণ ভয় হতে থাকলো। এই লোকগুলো জানে তারা কে, কোথায় আছে, আর তিনি কে? তার তো কোনো অবস্থানই নেই।

সে জানে, যা-কিছু ঘটছে সে তা প্রতিরোধ করতে অক্ষম। ফলে, সে আবার দোকানের দিকে পা বাড়াল। তবে তার এমন অনুভূতি হলো যে সে দুঃসাহসিক কিছু দেখে ফেলেছে। পরে এমন একটা অভ্যাস হয়ে গেল যে, রাতে দোকান বন্ধ করে ফাজিরের সাথে দেখা করেই সে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে আসতো।

কিন্তু এভাবে ঘুরে বেড়ানোটা ফাজিরের পছন্দ হচ্ছে না। ফাজিরের অভিযোগ হলো তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন। কিন্তু হামিদ তার বকাঝকাকে গায়ে মাখলো না। যখন তখন মানুষজনকে দেখার জন্যে মানুষের কাছে ছুটতে থাকলো। কিন্তু একঝলক দেখার আগেই তারা অতীত হয়ে যায়। দিনের বেলায় তার নজর থাকতো সেই মেয়েটির উপর, মেয়েটি এখন তার পুরাটা দখল করে ফেলেছে। রাতে সে কল্পনা করতো মেয়েটি তার সাথে আছে। যখন সে নীরব রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো, তখন সে ভাবতে চেষ্টা করতো মেয়েটি তার সাথেই আছে, কথা বলছে, হাসছে, এবং কখনও কখনও তার কাঁধে হাত রাখছে। যখন সে দোকানে আসত, তখন সে অতিরিক্ত এমন কিছু রেখে যেত যে মেয়েটির হাসির জন্য হামিদ অপেক্ষা করত। প্রায়ই তারা কথা বলত, বেশ কয়েকটি কথায় শুভেচ্ছা বিনিময় করতো। যখন মেয়েটির খাবারের অভাব হতো, তখন হামিদ অন্যদের জন্যে রাখা খাবার গোপনে তাকে দিয়ে দিত। আরেকটু যখন সাহস হলো, তখন সে তার রূপের প্রশংসা করতে থাকলো। মেয়েটি একটু নমিত হলেই সে তাকে উজ্জ্বল হাসি উপহার দিত। মনসুরের সেদিনের আত্মগর্ব আর বাগাড়ম্বরের কথা মনে পড়তেই হামিদ হেসে ফেলতো। কয়েক শ টাকা দিয়ে কেনার মেয়ে সে নয়, কিন্তু কেউ যদি সাহসের সঙ্গে তার কানের কাছে গুনগুন করতো, ভালো ব্যবহার করতো, তাহলে তার হৃদয় জয় করতে পারতো। কী ঘিনঘিনে কানা মনসুর, কী হামিদ, একেবারেই মেয়েটির যোগ্য নয়।

একসন্ধ্যায় রুকাইয়া চিনি কিনতে দোকানে এলো। তখনও তার পরনে ছিল কাজের সময়ের নীল পোশাক। হাত ঘামে ভেজা। দোকানে তখন অন্য কোন কাস্টমার ছিল না, আর মেয়েটিরও তাড়া আছে বলে হামিদের মনে হয়নি। মেয়েটি তাকে চটুল কথা বলে উত্যক্ত করতে থাকলো, হামিদ যে কত কঠোর পরিশ্রম করে সেকথাও বললো।

‘আপনি এই দোকানে যত ঘণ্টা ব্যয় করেন, অন্য কোথাও এই সময়টা দিলে ধনী হয়ে যেতেন। আপনি কি আঙিনায় সেই গর্তটা খুঁজে পেয়েছেন যেখানে আপনার টাকাগুলো লুকিয়ে রাখতে চান? সবাই মনে করেন প্রত্যেক দোকানদারের গোপন সিন্দুক আছে। আপনি কি আপনার শহরে ফিরে যাবার জন্যে সঞ্চয় করছেন?’
হামিদ প্রতিবাদ করে বলল, ‘আমার কোনো টাকাপয়সা নেই। এখানকার যা কিছু তাও আমার নয়।’
মেয়েটি অবিশ্বাসের সাথে হাসল। ‘কিন্তু আপনি তো অনেক পরিশ্রম করছেন,’ সে বলল। ‘কিন্তু আপনার তো আনন্দ করার কিছু নেই।’ বলেই সে আরেকটু হাসলো। হামিদ তাকে আরও একচামচ চিনি বেশি দিল।
‘ধন্যবাদ আপনাকে,’ সে বলল। এরপর সামনের দিকে ঝুঁকে সে তার কাছ থেকে চিনির ঠোঙাটা নিল। প্রয়োজনের চেয়ে আরও কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো; তারপর ধীরে ধীরে ফিরে গেল। ‘তুমি সবসময় প্রতিটি জিনিস কিছু না কিছু বেশি দিচ্ছ। আমি জানি, বিনিময়ে তুমি কিছু চাইবে। যখন তুমি চাইবে, তখন আমাকে এইসব ছোট ছোট উপহারের চাইতে বেশি কিছু দিতে হবে।’

হামিদ জবাব দিল না, লজ্জায় সে অভিভূত। মেয়েটি স্মিত হেসে সরে গেল। অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার আগে মেয়েটি চমৎকার একটা হাসি উপহার দিয়ে তার দিকে তাকালো।

 

 

 

 

 

 

Share Now শেয়ার করুন