জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক > কবিতাগুচ্ছ >> ভাষান্তর : ফারজানা নাজ শম্পা

0
1503
Carl Sandberg

মররাজের আফ্রো-আমেরিকান নীলবর্ণ সংগীতলহরী

আমি এক বয়োবৃদ্ধ ভ্রমররাজ, মধুরসের,
ফুলে ফুলে গুঞ্জন তুলি।
আমি মিষ্টিসুধাময় বয়োবৃদ্ধ ভ্রমররাজ,
ফুল ফুলে জাগাই গুণ গুণ সুরলহরী।
নারীদেহ বহন করে সজীব পরাগ রেনু;
যার খানিকটা আমি অষ্টপ্রহর আস্বাদন করি।

উপত্যকা আলোকিত করে আছে লিলিফুল
আরও আছে মিষ্টি লতানো গোলাপগুচ্ছ;
উপত্যকা আলোকিত করে আছে লিলিফুল
ভরে আছে মিষ্টি লতানো গোলাপগুচ্ছ;
একই সঙ্গে আছে কৃষ্ণাক্ষী সুন্দরী সুসানের উপস্থিতি,
রাতের নীল নৈঃশব্দ্যের এ যেন নিখুঁত অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশ।

আমার মুখনিঃসৃত স্বতন্ত্ৰ বা একক কোনো কৃষ্ণ শব্দে উচ্চারিত কথা
তুমি বিশ্বাস করতে বাধ্য, এমন তো নয়।
তুমি বাধ্য নও আমার উচ্চারিত
স্বতন্ত্র বা একক, কোন কৃষ্ণশব্দ ধারণ করতে।
কিন্তু বিস্মিত হয়ো না মেয়ে
যদি আজ আমি তোমার ফুলে হুল বিঁধিয়ে দিই।

দেবদূত

কাব্যভুবনে প্রলম্বিত হাত
চোখেরই সমতুল্য সে –

তুমি নিশ্চয়ই উপলব্ধি
করতে পারছো
আমি কি বলতে চাইছি

যখন কলম
তীর্যকভাবে হেলে পরে কাগজের পৃষ্ঠায় –
সৃষ্টি হয় বিস্ময় –
মুখের কথা
হাতের ভাষায় পরিণত হয়
তুমি এবং আমি তাই অবলোকন করি –

শেলীর প্রজ্ঞা

তুমি এসেছিলে
পাঁচটি শীতঋতু অতিক্রম করে, ‘ক’,
গোলাপের কণ্টকিত অন্তরায় হয়ে
এবং যখন শুধুমাত্র শব্দ আর শব্দেরা,
পিতলের নিষ্প্রভ উজ্জ্বলতা নিয়ে বিকশিত হয়েছিল।
অনেকটা বিলম্বিত তুষারঝড়ের মতো
তুমি আমাদের ঘরের দরোজায় এসে এক উদ্দাম আবক্ষ মূর্তির মতো আছড়ে পড়েছিলে,
সরব এপ্রিলরূপে, তুষার আর বৃষ্টি হয়ে
কবিতার মতো শক্তি হয়ে
সকল পাশবিক আবর্জনার টেবিল সরিয়ে –
সেইভাবে, যাতে আমরা কিছুটা আস্থা রাখতে পেরেছিলাম!
আমি পারিনা।
আমি শুনেছিলাম বাবা-মাকে বারবার বলতো
সে তাকে কত বেশি ভালোবেসেছিল
আমি দেখেছিলাম বাবার মুষ্টিবদ্ধ হাত
কীভাবে সাবলীল শোভনভাবে মার গালে আঘাত হানে,
মা তখন অচেতন হয়ে পড়েছিল।

সকল গোলাপেই কাঁটা আছে।
আর শব্দেরা ভ্রান্তি আর মিথ্যায় পরিণত হয়।
আমি দেখেছিলাম এইভাবে
ভালোবাসা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

‘ক’-এর জন্যে আমার আফ্রো-আমেরিকান নীলসংগীত

মনোহর যুবক, তোমার অশ্রুধারা সংবরণ করো,
তোমার আপাদমস্তক আবৃত করো ঢিলেঢালা প্রলম্বিত কৃষ্ণস্বরূপে।
মনোহর সুন্দর যুবক, তোমার অশ্রুধারা শুষ্ক করো,
তোমার তো জানা আছো, আমার প্রত্যাবর্তনের কথা
আমি তোমার বেহিসেবী বিলাসী অনুরাগী প্রেমিকা
আর আমি স্তুপ করা আবর্জনা বয়ে বেড়ানো এক ক্রীতদাস।

আমাকে সম্বোধন করে বলো মিষ্টি আলু
অথবা মিষ্টি-মধুর কড়াইশুটি বলে ডাকো,
আমার ওষ্ঠে তুমি পাবে মিষ্টি চিনির স্বাদ
আর আমার উরুদেশে মিলবে মধু।
রুটিয়ালি জোসেফিন শিম ভাজে
কিন্তু আমি যবের দানা মিশিয়ে সেদ্ধ করি সুস্বাদু শুকরের লেজ

আমার হাড় গিটারের তন্ত্রীর মতো বেজে ওঠে
দোতারার ঐকতানে এলোমেলোভাবে ওঠে সুর আর নীলসংগীত।
আমার হাড় এমনই ক্ষীণ এক বাঁশির মতো যে
এই নীলগান তোমার গুঞ্জরিত সুরকেও থামিয়ে দেবে।
তুমি কি পাশে থাকবে, হে আমার প্রিয়তম পুরুষ,
হে প্রিয় আমার, হুইস্কির মদিরা দিয়ে আমার এই আগমনকে মধুর করে তোলো।

বিকর্ষণ

চন্দ্র আর সূর্য আততায়ী রূপে
পরস্পর পরস্পরকে একটু একটু করে হত্যা করে।

সব ঘরেই বিদ্যুতের আলোর মতোই ছুরিকাঘাত হয়
রঙধনু নোংরা নর্দমার পানির মধ্যে হয় নিমজ্জিত।

শুক্রকীট সূর্যমুখী ফুলের কাণ্ডে রোদের তাপ পোহায়
সকল সৌন্দর্য এঁটেল কাদামাটিতে পরিণত হয়।

রোমের ক্রুশবিদ্ধ সার্কাসে, প্লেটো অদৃশ্য হয়ে যান
মেষপালককে ভেড়া বিচ্ছিন্ন করতে প্ররোচিত করে

হায়, শুধু স্বর্গশক্তি যদি
মাতৃত্বের শবাগারের সকল নিদারুণ কষ্টকে দূর করতে পারতো!

কত সহজেই তাহলে সকল নবজাতক ভূমিষ্ঠ হতে পারতো,
এই কসাইখানাতুল্য বিরূপ বিশ্বে।

আর আকাশের ওই যে তারাগুলি
কাস্তের মতো বিনম্রভাবে মাথা নোয়াতো
অশ্রুধারার মাঝে নবান্নের শস্যক্ষেত্রে প্রচুর ফসল কাটার
ধূম লেগে যেতো।

জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক >>

কানাডীয় জনপ্রিয় কবি, ঔপন্যাসিক, সম্পাদক, নাট্যকার, অধ্যাপক। পূর্বপুরুষ আফ্রিকা থেকে এসে কানাডায় স্থায়ী হয়েছেন। তাঁর লেখায় ঊনবিংশ শতাব্দীর বর্ণবাদের নির্মমতার ও কানাডিয়ান কৃষ্ণাঙ্গদের নিত্য জীবনধারা, কানাডীয় রাষ্ট্র ও সমাজে কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসীদের প্রতি বৈষম্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, প্রকৃতি, মানবপ্রেম, যৌনতা, মানবাধিকার ইত্যাদির বিমিশ্রণ ঘটেছে। এই ধারাটি কানাডীয় সাহিত্যে অনেকটাই নতুন বলা যায়। তাঁর কবিতায় গভীর জীবনবোধ সম্পন্ন এক দার্শনিকের পরিচয় মেলে। কানাডীয় সাহিত্যে এই নতুন ধারাসৃষ্টির অনন্য অবদানের জন্য কানাডীয় সরকার ২০১৬ সালে তাকে দুই বছরের জন্য পার্লামেন্টের সভাকবি বা ‘পয়েট লরিয়েট’-এর সর্বোচ্চ সম্মানে অভিষিক্ত করে। এজন্য তাঁকে কয়েকটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। ক্লার্কের জন্ম কানাডার উইন্ডসর নোভাস্কোশিয়া অঞ্চলে ১৯৬০ সালে। ক্লার্ক মাত্র পনের বছর বয়সে ‘স্ক্রিবলিং পোয়েট্রি’ বা অনিয়মিত ভাবে খানিকটা খাপছাড়াভাবে কবিতা লেখার অভ্যাসটি রপ্ত করেন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘হোয়াইলাহ ফলস’, যা আর্চবিল্ড সম্মানে ভূষিত হয়। বর্তমানে তিনি কানাডীয় সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন।

ফারজানা নাজ শম্পা >>

কানাডা প্রবাসী। কবি, ছোটগল্পকার, অনুবাদক। পাশাপাশি সম্পাদনাও করছেন। সম্প্রতি জর্জ এলিয়টের ক্লার্কের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসের অনুবাদ তিনি শেষ করেছেন। কানাডীয় সাহিত্যজগতে বাংলাদেশের একজন লেখক-অনুবাদক-সাংবাদিক হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।

                       ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

Share Now শেয়ার করুন