জাহানারা পারভীন >> জিবরান : ছন্নছাড়া এক মহাপ্রাণ >> প্রবন্ধ

0
781

জিবরান : ছন্নছাড়া এক মহাপ্রাণ

“জিবরান : দৃশ্যান্তরের দুনিয়া” শিরোনামে কহলিল জিবরানকে নিয়ে একটা বই লিখেছেন জাহানারা পারভীন। বইটি এই বইমেলাতেই প্রকাশিত হবে। এই লেখাটি সেই বইয়েরই একটা অংশ। মোট ১১টি প্রবন্ধ থাকছে বইতে। জিবরানের জীবনের অন্তিম দিনগুলি নিয়ে এই লেখাটি।

প্রফেট প্রকাশের পর সাত বছর সময় পেয়েছেন। এই সাত বছর সামাজিকতা, অস্থিরতা, অসুস্থতার। নিউ ইয়র্কের আরব অভিবাসীদের কাছে জিবরান এখন সেলিব্রেটি। আরবি সাহিত্যের পয়েট লরিয়েট। লেখা নয়, স্বদেশীদের কাছে তার কদর আন্তর্জাতিক খ্যাতির জন্য। অনেকের কাছে তিনি প্রাচ্যের সন্ত। মহাত্মা গান্ধীর মতো ব্যক্তিত্ব। গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের সঙ্গে ওঠাবসা। সাহিত্যের নানা অনুষ্ঠানে উপস্থিতি। বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে তার লেখা। নিউ ওরিয়েন্ট সোসাইটির তিনি সদস্য। এখানে আছেন মহাত্মা গান্ধী, জর্জ রাসেল, বার্টান্ড রাসেল, এইচ জি ওয়েলসের মতো ব্যক্তিত্বরা। সারাজীবনের অনিশ্চয়তার পর যখন থিতু হলো জীবন, চিরকালের দারিদ্র্য থেকে মুক্তি এল; তখন সৃষ্টিশীলতাকে এলোমেলো করে দেয় সময়খেকো আয়োজন। মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো কবির দিন কাটে কোলাহলে। যে খ্যতির জন্য সারাজীবনের অপেক্ষা; তার মুখোমুখী দাঁড়িয়ে এখন।
খ্যাতি হচ্ছে নেশার ছায়া, আলোর মাঝে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
নানা সামাজিতকায় লেখা ও আঁকা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অথচ পূর্ণকালীন লেখক জীবনে শুধুই শিল্পের সঙ্গে বসবাস। কোলাহলেও একাকীত্বের যন্ত্রণাকে উপভোগ করেছেন। স্বীকার করেছেন, একাকীত্ব যদি দুর্বলতার প্রতীক, তাহলে তিনি অবশ্যই দুর্বলতম মানুষ। একাকীত্বেও মানুষকে ভালোবেসেছেন। কারণ তারা ঈশ্বরের আত্মা। তার মনে হয়েছে প্রত্যেক হৃদয়েরই বিশেষ কেবলা আছে। প্রত্যেক আত্মারই বিশেষ দিক আছে; একাকীত্বের সময় যা আবর্তিত হয়। খ্যাতির ফাঁদে-পড়া জীবন এখন শুধুই উদযাপনের। বন্ধু, স্বজন শুভার্থীরা ভেঙে দেয় একান্ত আড়াল। তার কাছে এখন মানুষের অনেক দাবি। সবাই চায় লেখকের কথা শুনতে। তাকে একনজর দেখতে অনেকেই হাজির হন স্টুডিওতে। নানা প্রশ্ন করেন। যেন তিনি আল মোস্তাফা। তার কাছে আছে জীবনের নানা রহস্যের সূত্র। এসব দাবি মেটাতে খুন হয় আরাধ্য নির্জনতা। বাধাগ্রস্ত হয় লেখার পরিবেশ। জীবনের সবচেয়ে সংরক্ষিত এলাকায় হাজির অচেনা পাঠক। কথা বললেও তাদের সঙ্গে মেলাতে পারেন না। নিজের কাছেও অচেনা মনে হয় নিজেকে।
আশ্রমে এসে তারা দুঃখের কথা বলেন। অশান্তির কথা বলেন। আমার মধ্যে হয়তো অদ্ভুত কিছু একটা আছে। যার কারণে তারা সব কিছু খুলে বলেন। স্বীকারোক্তি দিয়ে দুদণ্ড শান্তি পেতে চান। আমার মাঝে তারা হয়তো দেখতে পান বিজয়ী দলনেতাকে। যে তাদের আত্মার দলনেতা। ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক।
দীর্ঘ দিন কিছু লেখা হয়নি। মাথায় একাধিক পরিকল্পনা। নাটক, কবিতা, গদ্য। মিকেলাঞ্জেলো, শেক্সপিয়ার, স্পিনোজা, বিটোভেনের জীবনী লেখার ইচ্ছে। আরবিতে নিজের জীবনী লেখার কথা ভাবেন। পরিবেশের অভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে ওঠে। নতুন পাণ্ডুলিপির অপেক্ষায় প্রকাশকরা। অগ্রিম টাকা দিয়ে চুক্তি করতে প্রস্তুত। আলফ্রেড ন্পুফ তাড়া দিচ্ছেন নতুন বইয়ের। লেখায় ফিরতে নিউ ইয়র্ক থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। এক দশক আগে বোস্টন ছেড়ে এসেছেন। নির্জনতার আশায় আবার ফেরেন পুরনো ডেরায়। বোনের আতিথেয়তায়। এখানেই লিখেছেন জেসাস দা সান অব মেন। ১৯২৪ সালের পুরোটাই থেকেছেন এখানে। পরের বছর নিউ ইয়র্কে ফিরলেও বেশিদিন থাকেননি। বারবার ফিরে এসেছেন। কখনও চার, কখনও ছয় কখনও আট মাসের সফর। বোস্টনে যতবার এসেছেন, গেছেন ডেনসন হাউসে। এই হাউসের কাজের ধরন নিয়ে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। অভিবাসীদের আমেরিকান সংস্কৃতিকে আকৃষ্ট করাই তাদের লক্ষ্য। এই লক্ষ্যের সঙ্গে একমত নন জিবরান। কখনও বোনকে নিয়ে চলে গেছেন সমুদ্রে। ভাইয়ের সাফল্যে খুশি বোন। একাই এতগুলো বছর কাটিয়েছেন মারিয়ানা। ভাইয়ের মতো থেকে গেছেন অবিবাহিত। নিজের রোজগারে সংসার চালিয়েছেন। কাধে তুলে নিয়েছেন মায়ের উত্তরাধিকারের বোঝা। বোষ্টনে থাকতেও সংসারের কথা ভাবতে হয়নি জিরবানকে। যতদূর পেরেছেন ভাইকে আগলে রেখেছেন বোন। নিউ ইয়র্কেও টাকা পাঠিয়েছেন ভাইকে। ১৯১১ সালের পর থেকে পোট্রেট একে কিছুটা অর্থ এসেছে। পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য বোনের কাছে শেষ বছরগুলোতে বারবার এসেছেন। সেসব দিনে অসুস্থ ভাইয়ের সেবায়, তার পছন্দের লেবানিজ খাবার রান্না করে, ভাইয়ের কাছে আসা অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত সময় কেটেছে মারিয়ানার। বোস্টনে ফেরা মানে কৈশোর, তারুণ্য, পরিবারের কাছে ফেরা।
পুরনো বন্ধুদের সবাই ব্যবসায়ী। জমানো টাকায় ব্যবসার কথা ভাবেন। মেরির পরামর্শ- বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ খাত আবাসন। ফারিস মালৌফ নামে এক বন্ধুর সঙ্গে যৌথভাবে বিনিয়োগ করেন। দশ বছরের জন্য একটা ভবন লিজ নেন। ব্যস্ততম এলাকা টেইলর স্ট্রিটে। সাততলা ভবনে দেড়শো রুম। এসব কক্ষ ভাড়া দিয়ে টাকা উঠে আসার কথা। প্রথম কিস্তিতে দুজনে ২৪ ডলার টাকা লগ্নি করেন। প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় প্রাইম রিয়েল স্টেট। ভবনের উন্নয়নে আরও ২৫ হাজার ডলার খরচ হয়। একসময় টের পান টাকা তুলে আনা অসম্ভব। মনে হয় তিনি একটা ছোট বালক। ছুটছেন চলন্ত ট্রাকের পেছনে। বড় অংকের টাকা লোকসানের পর মেরির পরামর্শ চান। নতুন করে অর্থ না খরচ করার পরামর্শ দেন মেরি। কিছু টাকাও পাঠান। মারিয়ানার নামে জমানো টাকাও তুলে আনা হয়। কিছু ঋণও করতে হয়। ১৯২৪ সালের অক্টোবরে মেরির কাছে ভুল স্বীকার করেন।
আমি একটা ভুল করছি। বড় ভুল। অনেকটা ছোট মানুষের বড় কিছু করার চেষ্টা। লোভ আর বোকামির খেসারত।
দুর্ভাগ্য, বোকামিকে দোষারোপ করতে করতে আশ্রমে ফেরার প্রস্তুতি নেন। সেখানে আবার পায়ে মাখবেন পৃথিবীর ধুলো। জীবন থেকে চলে গেছে একটা বছর। এই এক বছরের অর্জন শূন্য। না হলো ব্যবসা। না লেখালেখি। প্রবল অনুতাপে প্রফেটের উদ্ধৃতি মনে করে নিজেকে সান্ত্বনা দেন।

তুমি নির্দোষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পার না অনুতাপ
অনুতাপ তুলে নিতে পার না অপরাধীর মন থেকেও
অনুতাপ একা একা কথা বলে মাঝরাতে
যেন মানুষ একা একা কথা বলে
মাঝরাতে নিজের আয়নায় দেখে নিজের প্রতিচ্ছবি

আবার লেখায় ফেরার চেষ্টা করেন। সহকারী হিসেবে কাজ করতে এগিয়ে আসেন এক নারী। হেনরিয়েটা বৌটন। লেখালেখি করেন। গীর্জায় প্রফেট পাঠের দিন উপস্থিত ছিলেন। তার লেখায়ও প্রফেটের ছায়া। ৪৬ বছর বয়সী এই নারীর মধ্যে কবি আবিষ্কার করেন প্রিয় নারীদের গুণের সমন্বয়। জোসেফিনের সৌন্দর্য, চার্লটের মেধা, মেরির বুদ্ধিমত্তা। লেখা কপি করা, ডিকটেশন নিয়ে লেখাসহ নানা বিষয়ে সহায়তা করেছেন হেনরিয়েটা। শেষ বছরগুলোতে কবিকে কাছ থেকে দেখার স্মৃতিচারণ থেকে লিখেছেন গ্রন্থ ‘দিস মেন ফ্রম লেবানন’। এটাই ইংরেজি ভাষায় জিবরানের ওপর লেখা প্রথম গ্রন্থ। অসমাপ্ত লেখা দা গার্ডেন অব দা প্রফেট শেষ করেছেন। তার মৃত্যুর পর লেখা ও ছবির ওপর কতৃত্ব নিয়ে মেরি ও মারিয়ানার সঙ্গে কলহে জড়িয়েছেন বারবারা ইয়ং। ১৯৪৫ সালে ‘দিস মেন ফ্রম লেবানন’ ছাপা হয়েছে এই নামেই। প্রফেট প্রকাশের তিন বছর পর নতুন বইয়ের কাজ গোছাতে শুরু করেন। আগের কিছু লেখা। কিছুটা লিখেছেন ইংরেজিতে, কিছু আরবিতে। হাইকুর মতো।
সেই হচ্ছে বড় গায়ক, আমাদের নীরবতগুলো যে গাইতে পারে। ছোট ছোট বাক্য। কয়েক লাইনের। কোনটা তিন লাইনের, কোনটা চার, কোনটা পাচ লাইনের। আগের লেখা এসব প্রবচনগুচ্ছ গোছাতে থাকেন ইংরেজভাষী পাঠকদের জন্য। সুফি ঘরানার এসব প্রবচনে প্রফেটের প্রভাব, পাশাপাশি রয়েছে নতুন চিন্তা।
আমি নীরবতা শিখেছি বাচালের কাছে, অসহিষ্ণুর কাছে শিখেছি ধৈর্য। দয়ার পাঠ নিয়েছি নিষ্ঠুরের কাছে, তবুও বিস্ময়, এই শিক্ষকদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
৩২২টি উক্তি দিয়ে সাজানো হয় পাণ্ডুলিপি। যোগ করা হয় সাতটি ছবি। প্রফেটে যেমন ছিল ১২টা ছবি। ৪৫ পৃষ্ঠার ছোট বই। যেন একপাঠে শেষ করা যায়। নাম রাখেন ‘স্যান্ড অ্যান্ড ফোম’। বালি ও ফেনা। প্রথমেই জিবরান জানান, বহু যুগ ধরে সৈকতে হাঁটছেন, বালি ও ফেনার মধ্যে। একদিন বিশাল ঢেউ এসে মুছে দেবে পায়ের চিহ্ন। বাতাসে উড়বে ফেনা। শুধু সমুদ্র ও সৈকত থেকে যাবে অনন্তকাল। জীবনের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে লেখকের অভিজ্ঞতার প্রকাশ এই লেখা। ঈশ্বর, নারী, জন্ম, মৃত্যু, শরীর, সময়, স্বর্গ, সূর্য, আনন্দ, বেদনাসহ নানা বিষয়ে উক্তি। সেখানে দার্শনিকতা, নতুন চিন্তার ঝলক। জীবনকে নতুন করে দেখার চেষ্টা।

জীবন যখন হৃদয়ের কথা বলতে কোনও গায়ক খুঁজে পায় না
তখন সে হাজির করে একজন দার্শনিক, তার কথা বলতে

মেরির মনে হয় এসব কথা একজন পরিত্যক্ত, দুর্দর্শাগ্রস্থ সন্নাসীর গ্রাফিত্তি হিসেবে পড়া ঠিক হবে না। লেখকের নিঃসঙ্গতার মাপকাঠি নয় এসব উক্তি। বই প্রকাশের পর আসতে থাকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। হেরাল্ড ট্রিবিউনের সমালোচক লেখেন, লেখক আগে কলমে কালির পরিবর্তে যেন এসিড ভরে নেন।
পুরো বইয়ে নীতিকথা। সংক্ষিপ্ত বাক্য। বইটির নামকরণ সার্থক। বালির মধ্যে কেউ ফুল খুঁজতে যায় না। হাতে সমুদ্রের ফেনা নিয়ে খেলা করে। জিবরানের কথাগুলো শুকনো ফেনার মতো। মুহূর্তে মিলিয়ে যায়। বইয়ের পাতায় পাতায় প্রাচ্যদেশীয় দৃষ্টিভঙ্গী। অসহ্য সব নিরর্থক কথাবার্তা। জিবরানের আঁকা ছবিগুলো বরং আকর্ষণীয়। চাভানের মুরালের সঙ্গে এক বিকেলের অভিজ্ঞতার পর এগুলোকে আর্থার ডেভিসের দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।
লন্ডন টাইমস-এ এসব অসংলগ্ন কথার সমালোচনা করা হয়। বোস্টন ট্রান্সক্রিপ্ট স্যান্ড অ্যান্ড ফোমকে খারিজ করে দেয়। তাদের মতে বইটি উদ্ভট, অর্থহীন, অস্পষ্ট চিন্তার সমন্বয়। সমালোচকদের মন্তব্য আমলে না নিয়ে জিবরান বলেন, শ্রষ্টাকে সমালোকদের কথায় কান দিতে নেই। আরও একটা লেখার ইচ্ছে। যিশুর জীবনী। প্রফেটের মতো এই লেখার পরিকল্পনাও পুরনো। শৈশব থেকেই যীশু প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তার আদর্শ, চিন্তায় অনুপ্রাণিত জিবরান ভেবেছেন তার সৃষ্টিশীলতা অপূর্ণ থেকে যাবে যিশুর জীবনী ছাড়া। সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন থেকে বইপত্র আনিয়েছেন। যতটুকু সম্ভব পড়াশোনা করেন। ১৯০৯ সালে প্যারিস থেকে মেরিকে লেখেন, এটা হবে সবচেয়ে উচ্চভিলাসী, দীর্ঘ লেখা। লেখক জীবনের আশ্রয়। যিশুর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা থেকেই লেখার এই সিদ্ধান্ত। শৈশব থেকেই ঈশ্বর প্রদত্ত আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী নাজারানের প্রতি আকৃষ্ট জিবরান। ছোটবেলায় একবার যিশুর জীবনের ঘটনা শোনার পর গায়েব হয় যান। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া যায় গ্রামের সমাধিক্ষেত্রে। হাতে একগোছা ফুল। যিশুর যন্ত্রণার ভাগ চেয়ে প্রার্থনা করছেন। বারবার তার ছবি এঁকেছেন। বারবার তার স্বপ্নে এসেছেন যিশু। ১৯০৮ সালে এক স্বপ্নদৃশ্যের বর্ণনা করেছেন মেরির কাছে।
আমার হৃদয় আজ পরিপূর্ণ। একটা বিস্মিত, শান্ত, উষ্ণ সুখ। গতরাতে যিশুকে স্বপ্ন দেখেছি। ধূসর বাদামি পোশাক। বাদামি চুল। বড় কালো শান্ত চোখ জ্বলজ্বল করছে। তার ঠোঁটের তিক্ত স্মিত হাসি, সেই একই বার্ধক্যের দ্বীপ্তি। বিপরীত দিত থেকে আসা আলো তার চেহারাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। ও মেরি! কেন তাকে রোজ রাতে স্বপ্ন দেখি না? কেন তার মতো শান্তভাবে জীবনকে মেনে নিতে পারি না? পৃথিবীতে কেন তার মতো আর কাউকে এত উষ্ণ মন হয় না?
যিশুকে নিয়ে লেখা বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে প্রত্নতাত্ত্বিক আরনস্ট রেনানের লেখা। তার বই পড়ে মনে হয় যিশু জগতের শ্রেষ্ঠ কবি, সেরা শিল্পী। অতিপ্রাকৃতিক গুণের বাইরে এসে রেনান মানবিক গুণাবলীর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমনটা করেছেন মেটারলিংক তার ‘লাইফ অব জেসাস’ গ্রন্থে। মেরি হাসকেলের জার্নালে যিশু সম্পর্কে পাওয়া যায় জিবরানের নানা মন্তব্য। জিবরানের চোখে যিশু ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিমান ব্যক্তিত্ব। মানুষের মনকে বদলে দিয়েছেন। নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন। জিবরান মনে করতেন খিস্টানরা তার জীবন ও শিক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকের মানুষ যিশুর শিক্ষাকে পুরোপুরি আত্মস্থ করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। বেদবাক্যের মতো মুখস্থ করেছে। আত্মস্থ করতে পারেনি। তার দুর্বল বিষয়গুলের চর্চা করে গেছে। তার বিশাল সত্তা, শিক্ষার মূল কথা উপলব্ধি করতে পারেনি। যিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, স্বর্গের রাজত্ব মানুষের মধ্যেই আছে। জিবরানের কাছে, যিশুর জন্ম মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯২৬ সালের ১২ নভেম্বর ২ হাজার ডলার অগ্রিম দিয়ে চুক্তি করেন আলফ্রেড ন্পুফ। একবছর এই লেখা নিয়ে পড়ে থাকেন জিবরান। ১৯২৬ সালের নভেম্বর থেকে পরের বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। বিভিন্ন গ্রন্থে যিশুকে দাড়িসম্পন্ন মিষ্টি নারীর রূপে দেখে তিনি ক্লান্ত। এসব লেখকেরা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব দেখাতে গিয়ে কমনীয়তা দেখিয়েছেন। জিবরানের কাছে তিনি মানব ইতিহাসের প্রকৃত ব্যক্তিত্ব। শক্তিমান, দয়াবান মানুষ। পনের বছর আগে আবদুল বাহার মধ্যে দেখেছেন যিশুর প্রতিচ্ছবি। লেখা শেষ করে সম্পাদনার জন্য মেরিকে পাঠান। ১৯২৮ সালের অক্টোবরে ছাপা হয় ‘জেসাস দা সান অব মেন’। যিশুর অসাধারণ শক্তিকে উন্মোচন করেছেন। তার যিশু মানবিক। ঈশ্বর নয়, মানুষের পুত্র। মানুষের ক্ষমতা ও দুর্বলতার প্রতীক এই যিশু। এই যিশু কুমারী মাতার সন্তান নন। বাইবেলের বর্ণিত যিশুর সঙ্গে যোগ করেছেন কল্পনা। নিজের সৃষ্ট যিশু সম্পর্কে বলেছেন,
নাজারেনে দুর্বল না। শক্তিশালী। মানুষ তার শক্তিকে বুঝতে অস্বীকার করে। একজন ধর্মযোদ্ধা হিসেবে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতে মারা যান। এই বীরত্ব তার ঘাতক খুনীদেরও ভীত করে। যিশু ডানাভাঙা পাখি ছিলেন না। তিনি ছিলেন আবেগী ঝড়, সব বাকা ডানা ভেঙে দিয়েছেন। মানুষের কাছে তিনি এক অচেনা বিস্ময়।
যিশুর জীবনদর্শনের ওপর দুটো নাটকও লিখেছেন। ১৯২০ সালের শেষের দিকে। ‘লেজারাস অ্যান্ড হিজ বিলাভেড। দি ব্লাইন্ড। ইংরেজিতে লেখা দুটো নাটকই প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর পর। শেষ জীবনে লিখেছেন দা ওয়ান্ডারার। এটাই শেষ লেখা। শেষের দিকে চোখ বুলিয়েছেন ১৯১৫ সালে লেখা আর্থ গডের পাণ্ডুলিপিতে। সম্পাদনার মতো মনের অবস্থাও নেই। হাতে লেখা ৪৫ পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি। আর্থ গড নিয়ে সমালোচকদের মনোভাব দেখে যেতে পারেননি। বইটি প্রকাশিত হয় মার্চের শেষে, মৃত্যুর তিন সপ্তাহ আগে, ১৯৩১ সালে। জিবরানের অধিকাংশ লেখা গ্রহণ করেননি আমেরিকার সমালোচকরা। আর্থ গডও ভালো লাগেনি তাদের। স্যাটারডে রিভিউ অব লিটারেচার-এর আলোচকের মতে এখানে সৌন্দর্য নেই। নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন বইটি উইলিয়াম ব্লেকের অনুকরণ বলে খারিজ করে দেয়।
১৯২৮ সালের মে মাসে নিউ ইয়র্কে আসেন মেরি। ৪৫ বছরের বন্ধুকে দেখে বিস্মিত। একি চেহারা হয়েছে তার! দীর্ঘ আট মাস চিঠি লেখা হয়নি। এ সময়েও পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করেছেন। এই এক বছর জেসাস দ্যা সান অব মেন-এর কাজ করেছেন। মেরি বুঝতে পারেন এই লেখা লেখকের জীবনীশক্তি কতটা ক্ষয় করেছে। অনেক মোটা হয়ে গেছেন। ফুলে গেছে পা, পায়ের পাতা। চুলে পাক ধরেছে। চেহারায় অবসাদ। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত জিবরান। মেরির জানার উপায় নেই এক বছরে কতটা বেড়েছে মদ্যপান। অসুস্থতা আমলে নেননি। চিকিৎসকের কাছেও যাননি। ওষুধে অনীহা। অসুস্থতার কথা স্বীকার করতেও চান না। হৃদয় আর স্লায়ুও ভুগিয়েছে। মা, ভাই, বোনের মৃত্যুর পর থেকেই চিকিৎসায় অনাস্থা। নিজের মতো করে সেরে ওঠার কৌশল খুঁজেছেন। মে জিয়াদেকে জানিয়েছেন সেই কৌশলের সূত্র :
অদ্ভুত বিষয় হলো, কোনও সাহায্য ছাড়াই নিজেকে সুস্থ করে তুলতে পারি। চিকিৎসকরা বিবেচনা ও সন্দেহের উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নদ্রষ্টা। তারা প্রতিক্রিয়া দেখতে আগ্রহী। ওষুধ দিয়ে তা করার চেষ্টা করেন। অসুখের কারণের দিকে তাদের মনোযোগ নেই। আমি সমুদ্র ও বনের কাছে গিয়েছিলাম। ছমাস কাটিয়েছি প্রকৃতির সান্নিধ্যে। সব কারণ ও প্রতক্রিয়া উধাও হয়ে গেছে। আধুনিক ওষুধপত্র নিয়ে একটা বই লিখব ভাবছি। তুমি কি এই বইয়ের যৌথ লেখক হবে? চিকিৎসার মতো খাবারেও অনীহা। খুব কম খেতেন। সকালে একটা কমলা। এক কাপ টার্কিশ কফি। অথবা শুধুমাত্র কফি। অথবা এক টুকরো ফল। রাতের খাবারও সামান্য। কখনও কখনও রাতে না খেয়ে থাকতেন। দুপুর আর রাতের খাবারের মাঝামাঝি কিছুই খেতেন না। প্রায়ই খেতে ভুলে যেতেন। বলেছেন, খাবার আর কাজ একসঙ্গে যায় না। ক্ষুধার চেয়ে বেশী খাওয়া সম্ভব নয়। কফির ওপর নির্ভরতা নিয়ে বলেছেন, ঘরের কফিপাত্রটাই তার সবচেয়ে আপন। নিজের খ্যদ্যাভ্যাসের ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিজের মতো :

সাধারণত একবেলা খাই। আমার কল্পনা আর খাবার একসঙ্গে যায় না। মাসে এক বা দুইদিন অভুক্ত থাকি। শরীর খারাপ হলে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেই। আমার এক বন্ধু একবার অসুস্থ হয়। একুশ দিন সে কিছুই খায়নি। ফলে সে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।

নিজের মতো করে সেরে ওঠার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে যোগ হয় মানসিক অশান্তি। লিখতে না পারার যন্ত্রণা। মনে হয় ফুরিয়ে গেছেন। হারিয়ে ফেলেছেন লেখার ক্ষমতা। গার্ডেন অব দ্য প্রফেট শেষ করা যায়নি। বারবার থেমে গেছে লেখার কাজ। নিজের প্রতি অযত্ন, চিকিৎসায় অনীহা। আত্মঘাতি প্রবণতার সঙ্গে যোগ হয় মদের আসক্তি। শেষের দিকে মারিয়ানাকে লেখা প্রতিটা চিঠিতে প্রিয় পানীয় আরাক পাঠাতে অনুরোধ করেছেন। এই মদ নিউ ইয়র্কে পাওয়া যেত না বলে এই শহরকে মনে হয়েছে ওয়েস্টল্যান্ড। অ্যালকোহলে আসক্তি ধীরে ধীর শরীরকে অকোজো করে দেয়। মনে হয় এই অসুস্থতা তাকে পরিত্যক্ত করে ফেলেছে। বুঝতে পারেন সময় ফুরিয়ে এসেছে। পরিবারের সদস্যদের আয়ুর দৈর্ঘও কম। মা-বাবা তুলনুমূলক কম বয়সে মারা গেছেন। ৪৫ বছরের কাছকাছি সময়ে। মনে হয় আবার সেরে উঠবেন। মনের মতো একটা লেখা লিখতে পারেন যদি। লেখার খরা কেটে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কবি মে জিয়াদেকে জানান :

চমৎকার একটা লেখা লিখতে পারতাম যদি! পুরোপুরি সেরে উঠতাম। একবার চিৎকার করে কাঁদতে পারতাম যদি! আবার স্বাস্থ্য ফিরে পেতাম। নিজেকে একটা ছোট আগ্নেয়গিরী মনে হয় আমার, যার জ্বালামুখ বন্ধ হয়ে গেছে। দয়া করে আগের লেখার কথা মনে করিয়ে দিও না। বলো না- এরই মধ্যে অনেক কিছু লিখেছি। সেসব লেখার কথা মনে হলে কষ্ট পাই। সেসব অর্থহীন লেখা যন্ত্রণা বাড়ায়। তাদের দুর্বলতা আমাকে আছড়ে মারে। কেন লিখেছি সেসব লেখা? এই পৃথিবীতে আমার জন্ম হয়েছে একটা ছোট বই লেখার জন্য। বাঁচার জন্য, দুর্ভোগ পোহানোর জন্য। একটা জীবন্ত শব্দ উচ্চারণের জন্য। যতক্ষণ পর্যন্ত ওই শব্দ উচ্চারণ করত না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত চুপ থাকতে পারব না।

৪৬তম জন্মদিন ঘটাকরে উদযাপন করে বন্ধুরা। ১৯২৯ সালের ৬ জানুয়ারি। আয়োজন করা হয় নৈশভোজের। প্রফেট, লেজারাস এবং জেসাস দা সান অব ম্যান থেকে পাঠ করা হয়। জিবরান পড়েন ম্যাডম্যান ও ফোররানার থেকে। তাকে আরবি সাহিত্যের পোয়েট লরিয়েট ঘোষণা করা হয়। একদিন আগে ৫ জানুয়ারি তাকে সংবর্ধনা দেয় আমেরিকান আরব কলোনি। আরব লেটারে লেখালেখির পচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে। এরাবিটাহ এই ডিনারের আয়োজক। ভেনু নিউ ইয়র্কের অভিজাত হোটেল মেক আলপিন। আরবি সাহিত্যে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন বক্তারা। বলেন, জিবরান সেই রাতের হিরো। তার নতুন চিন্তার প্রশংসা করা হয়। বক্তারা বলেন, আজকাল বৈরুত, কায়রো, বাগদাদ বা বুয়েন্স আইরেসে এমন কোনও আরবি পত্রিকা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে কোনও না কোনও তরুণ লেখক জিবরানের অনুকরণে লেখার চেষ্টা করেনি। যার জন্য এই আনুষ্ঠানিকতা, তিনি অসুস্থ। এসব থেকে দূরে থাকলেই স্বস্তি। জিবরান বসেন পেছনের সারিতে। ছবিতে তাকে খুঁজে পেতে যে কারো কষ্ট হবে। অথচ তিনিই আসরের মধ্যমনি। এত সম্মান যার জন্য, তার মন বিষণ্ণ। পরের দিন জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সবাই যখন প্রশংসায় ব্যস্ত তখন এক পর্যায়ে হলরুম থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান। পেছনে পেছনে যান অনুষ্ঠানের আয়োজক সাংবাদিক আমরা রিড। ডাইনিং রুমে গিয়ে দেখেন অঝোরে কাঁদছেন কবি। জিবরান জানান, তার সৃষ্টিশীলতা শেষ হয়ে গেছে। এ এক গভীর সংকট। মৃত্যুর আগেই যেন মৃত্যু হয়েছে তার। আলমা রিডকে জানান, নিজের কোনও লেখা নিয়েই সন্তুষ্ট নন।
কী ট্রাজেডি দেখ! আমি লেখক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। আমি সত্যটা জানি। প্রতিদিন এই সত্যের মুখোমুখি হচ্ছি। আমি আর আগের মতো লিখতে পারব না। কখনও পারব না।
দুঃখিত লেখকের মনোবল বাড়াতে প্রফেটের প্রসঙ্গ তোলেন আলমা রিড। প্রশংসা করেন লেজারাসের। বলেন, নতুন ধরনের চিন্তা আছে এখানেও। নতুন লেখাগুলোও মনযোগ পেতে পারে। আলমা রিডের স্মৃতিচারণে সেদিন জিবরানের যে মানসকি বিপর্যস্ততার খবর পাওয়া যায়, তাতে একটা বিষয় পরিস্কার; প্রফেটের পর আরও একটি বড় কাজ না করতে পারার অক্ষমতা, ট্রিওলজি শেষ করতে না পারার ব্যর্থতা মেনে নিতে পারেননি। লেখক সত্ত্বার মৃত্যুকেই মনে করেছেন আত্মিক মৃত্যু। এই অনুভূতি শেষ সময়টা বিষাক্ত করে তোলে। ফলে দৈহিক মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা সহজ হয়ে ওঠে। ১৯২৯ সালের একটানা দশ মাস কাটান বোস্টনে। সাউথ এন্ড থেকে সরিয়ে বোনকে নতুন এলাকায় ফ্লাট কিনে দেন। আগের জনাকীর্ণ এলাকায় ৩০ বছর থেকেছেন মারিয়ানা। নতুন ফ্লাট ৭৬ টেইলর স্ট্রিটে। নিরিবিলি পরিবেশ। বোনকে ভালো পরিবেশে সরাতে পেরে স্বস্তি পান। ভাইয়ের মন রাখতে পুরনো প্রতিবেশীদের ছেড়ে নতুন বাসায় ওঠেন মারিয়ানা। বোন জানেন শারীরিক যন্ত্রণা উপশমে ভাইয়ের চাই কিছুটা মানসিক শান্তি। একটা ব্যবসায় কিছু অর্থ বিনিয়োগ করেন। এবার অনেক সতর্ক। পাঁচ বছর আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে অনচ্ছিুক। তার অবর্তমানে বোনের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। দীর্ঘ সময় নিউ ইয়র্কে ফেরা হয় না। প্রতিটি বইয়ের নতুন সংস্করণ হচ্ছে। ইংরেজি বইগুলোও অনুবাদ হচ্ছে বিভিন্ন ভাষায়। এমন কোনও দিন নেই যেদিন ডাক, টেলিগ্রাম, টেলিফোন, দর্শনার্থীর ভিড় সামাল দিতে হয় না। দশ মাস পর আবারো ফেরেন সেই পৃথিবীতে। যে পৃথিবীকে ঘৃণা করেন। আবারো সেই পুরনো কোলাহল। চিলির কবি গ্যাব্রিয়েল মিস্ত্রাল আসেন দেখা করতে। সাক্ষাৎকার নেন প্রিয় লেখকের। মিস্ত্রালের বরাতে জানা যায়, কথা বলতে বলতে বেশ কবার উঠে গেছেন জিবরান। দূরে রাখা বোতল থেকে একটু একটু পান করে এসেছেন। সেই বোতলকে মোটেও ওষুধের বোতল মনে হয়নি মিস্ত্রালের। ততদিনে মদই আশ্রয়। শারীরিক যন্ত্রণা কমানোর উপায়। মৃত্যুর এক বছর আগে, ১৯৩০ সালের মার্চে সম্পদের উইল করেন। সবকিছু ভাগ করে দেন মারিয়ানা, মেরি ও বিসররীর মানুষের মধ্যে। মেরিকে সব ছবি, পাণ্ডুলিপি; মারিয়ানাকে অর্থ এবং জন্মগ্রামের মানুষকে দেন প্রফেটসহ সব বইয়ের সম্মানীর উত্তরাধিকার। এসব টাকা ব্যয় হবে গ্রামের মানুষের উন্নয়নে। জুলাই মাসে আবারও বোস্টনে যান, মেরিকে পড়তে দেন আর্থ গডের পাণ্ডুলিপি। প্রকাশের তারিখ ঘোষণার পরও অসমাপ্ত থেকে যায় গার্ডেন অব দা প্রফেট। মৃত্যুর আগে শেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ওয়ান্ডারার। আইনজীবীর হাতে উইল তুলে দিয়ে অপেক্ষায় থাকেন মৃত্যুর।
মৃত্যু আর নতুন কি?

রোদে গলে মিলিয়ে যাওয়া!
নগ্ন দাঁড়িয়ে থাকা, বাতাসে!

মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন। এই আকাঙ্ক্ষাকে নিবৃত্ত করেছেন, অসমাপ্ত কাজের জন্য। নিজেকে মনে করিয়ে দিয়েছেন হাতের বাকি লেখার কথা। তবে আত্মহত্যাকে সমর্থন করেননি। যদিও নিজের হাতে জীবনকে শেষ করার সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তার মনে হয়েছে একজন মানুষ আত্মরক্ষার ভেতরেই আত্মহত্যা করতে পারে। এভাবেই সব সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। অল্প বয়স থেকেই মৃতু্র কথা ভেবেছেন। কৈশোরে ডের মাধ্যমে পরিচয় রোমান্টিক লেখকদের সঙ্গে। তাদের কাছে মৃত্যু ভিলেন নয়। বৃহত্তর জীবনে প্রবেশের সুযোগ। অতীতের মানুষ মনে করতো ঘুম আর মৃত্যু ভাইবোন। কোনও কোনও রোমান্টিক লেখক মৃত্যুকে দুই বোন হিসেবেও দেখেছেন। তারা একই রকম উর্বর, রহস্যময়, গোপন। জিবরানের মৃত্যুভাবনাও রোমান্টিক। পশ্চিমা লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত। তারুণ্যে মেরিকে বলেছেন- প্রেমে পড়েছেন মৃত্যুর। মৃত্যুর সৌন্দর্য নিয়ে লিখেছেন। বলেছেন মৃত্যু চেহারাকে আলোকিত করে। মৃত্যুর সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লিখেছেন। জিবরানের লেখার আলোচনা প্রসঙ্গে বারবার তাকে তুলনা করা হয়েছে প্রাচ্যের আরেক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। প্রেমের মতো মৃত্যু নিয়েও দুজনের ভাবনা কাছাকাছি। রবীন্দ্রনাথও মনে করতেন মৃত্যু জীবনেরই আরেক নাম। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মরন শ্যামের মতো উদার, প্রেমিকের মতো বন্ধু। বলেছেন, মরন রে তুঁহু মম শ্যাম সমান।
প্রাচীনকালে মৃত্যুকে ভাবা হতো জীবনের বোন। জিবরানও একই ভাবনার অনুসারী। মৃত্যু তার কাছে দুঃখ যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণের উপায়। অল্প বয়সেই হারিয়েছেন মা-বাবা, ভাই-বোন। স্বজন হারানোর বেদনায় উপলব্ধি করছেন মৃত্যুকে। তার প্রথম দিকের লেখায় মৃত্যুর বন্দনা। মৃত্যু যেন প্রিয় স্বদেশে ফেরা। এ পয়েটস ডেথ ইজ লাইফ কবিতায় মৃত্যুকে আহ্বান জানিয়েছেন বারবার। প্রফেটেও বলেছেন মৃত্যু আর জীবন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বলেছেন- মৃত্যুর রহস্য জানতে হলে জীবনের হৃদয়ে খুঁজে পেতে হবে মৃত্যুকে।

মৃত্যুকে অনুভব করতে চাইলে
জীবনের মাঝে ছড়িয়ে দাও হৃদয়
জীবন ও মৃত্যু এক
যেমন একসঙ্গে প্রবাহিত হয় সাগর ও নদী

Share Now শেয়ার করুন