জিনি লকারবি >> কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা [পর্ব ৬] >> তর্জমা : আলম খোরশেদ

0
337
পর্ব ৬

সেন্সর করা সংবাদপত্র পড়াটা একটা প্রহসনের মতো ছিল। বড় হরফে লেখা হত যে, বাঙালিদের মুক্তিসংগ্রাম একটা চমক মাত্র। এটা অল্প কিছু ’দুষ্কৃতিকারী’ কিংবা ’ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’দের কাজ। যা যা ঘটছিল ভেতরে সেসব যদি সেই দুষ্কৃতিকারীদেরই কাজ হয়ে থাকে, তাহলে তারা নিশ্চয়ই খুবই কর্মব্যস্ত ছিল। বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন কেটে দিয়ে কলকারখানা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল, যাতে করে পাকিস্তান সরকারের রাজস্বে ঘাটতি পড়ে। পেট্রোল পাম্পগুলো নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছিল যেন পাকিস্তানি সেনাদের গাড়িগুলো চলতে না পারে। হ্যান্ড গ্রেনেড, ল্যান্ড মাইন, ঘরে বানানো হাতবোমা সবই বিস্ফোরিত হচ্ছিল, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে। সেতু উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল সেনাদের যাতায়াত বন্ধ করে দিতে। এগুলো প্রতিদিনই ঘটছিল, তারপরেও পাকিস্তানের প্রতি অনুগত লোকজন, আদর্শগত কিংবা সুবিধাগত যে-কারণেই হোক, শান্তির জন্য তাদের প্রস্তাবনা পেশ করেই যাচ্ছিল :
– উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হোক। (সামরিক দখলদারিত্বের শুরুতেই সব সাইনবোর্ড উর্দুতে করা হয়েছিল, কেননা বাংলা কিংবা ইংরেজিতে হলে উর্দুভাষীরা বুঝতে পারত না তারা কোথায় আছে।)
– আওয়ামি লিগের কার্যকরী কমিটির সকল সদস্য, সেনাবাহিনীর দিকে যারা কোনো গুলি ছুড়েছে, ছাত্ররা যারা পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়েছে, কিংবা জাতির পিতা জিন্নার ছবি, তাদেরকে হত্যা করা হবে।
– রেডিও পাকিস্তানের কোনো কর্মী যারা জয় বাংলার গান গেয়েছে অথবা যেকোনোভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করেছে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে।
– স্কুল, কলেজে ধর্মীয় বাণী প্রচার করা হবে অখণ্ড পাকিস্তানের দর্শন প্রচারের জন্য।
– পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনীতে কোনো বাঙালিকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
– প্রত্যেক পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ীকে বিনি পয়সায় বন্দুক ও গুলির লাইসেন্স দিতে হবে। (তা নাহলে তারা পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করবে, এতে করে পাকিস্তানপন্থীদের শক্তি ও অর্থবল হ্রাস পাবে।)
পাকিস্তান ও বাঙালিদের মধ্যে কেন এত ঘৃণার সূত্রপাত হয়েছিল, এর পরে কি আর তার ব্যাখ্যার দরকার পড়ে? সমাজের প্রায় সর্বস্তরেই এই অনুভূতি প্রবল ছিল, তবে বলাই বাহুল্য মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় সমর্থন ছিল তরুণ সম্প্রদায়। সরকারের বিরোধিতা করে অনেক ছাত্র স্কুলকলেজে যেতে অস্বীকার করে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুলকলেজ এম্নিতেই বন্ধ ছিল, অধিকাংশ ভালো শিক্ষকই যে ছিলেন হিন্দু। তাঁদের হয় হত্যা করা হয়েছে অথবা তাঁরা পলাতক ছিলেন। বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের দল ’মুক্তিবাহিনী’র অধিকাংশ জনবলই ছিল এই ছাত্র ও অন্যান্য তরুণেরা। আমরা সন্দেহ করতে শুরু করি যে, আমাদের গির্জার কিছু কিছু তরুণ সদস্যও তাতে যুক্ত হয়েছিল, কেননা সাধারণত যারা নিয়মিত প্রার্থনায় আসত তাদেরকেও হঠাৎ করে তাতে অনুপস্থিত দেখা যেতে লাগল। মিসেস দাশের ভ্রাতুষ্পুত্র স্টিফেন, যে আমাদের ভাষাবিভাগে খণ্ডকালীন কাজ করত, তার হঠাৎ হঠাৎ এমন সব সভায় ডাক পড়ে যেখানে সে কিছুতেই দেরি করে যেতে পারে না।
দাশেরা শহর থেকে পালিয়ে যাবার পর স্টিফেন তাদের বাড়িতেই থাকত। পাশের বাড়িতেই ছিল বাবলা ও তার পরিবার। বাবলার মা মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের খাওয়াতেন, যারা কাছেই কোনো একটা বাড়িতে ঘুমাত। যখন স্বাধীনতা একটা বাস্তবতা হয়ে ওঠে, তখন বাবলা মুক্তির এই সংগ্রামে তার কিছু ভূমিকার কথা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়।
”মুক্তিবাহিনী আমাদের বাড়িতে আসার পর আমি যিশুখ্রিষ্টে আমার কতটা বিশ্বাস সেটা প্রমাণের একটা সুযোগ পাই,” বাবলা আমাদের বলে। ”আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতাম ’মুক্তি’রা যখন আমাদের টেবিলে খেতে বসত। তারপর ধীরে ধীরে তারা আমাকে বিশ্বাস করতে শুরু করল। তারা প্রথমে আমাকে তাদের লিফলেট বিতরণ করতে অনুরোধ করে, যেখানে দুটো বার্তা লেখা ছিল : আমাদের মানুষদের এটা বোঝানো যে, মুক্তি ও বিজয় সম্ভব, এবং তারা যেন কিছুতেই মিলিটারির সঙ্গে সহযোগিতা না করে, তার জন্য আহ্বান জানানো।
”তারা আমাকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণও দেয়,” সে আমাদের বলে এবং হাতে লেখা প্রশিক্ষণের বইটাও দেখায়, যেটা ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়া কেউ একজন মুখস্থ করে রেখেছিল এবং পরে হাতে লিখে অন্যদের জন্য এর অনুলিপি করে দিয়েছিল। চট্টগ্রাম থেকে দুই হাজারের মতো তরুণ প্রশিক্ষণের জন্য গিয়েছিল। কেউ কেউ যারা শরণার্থী হয়ে গিয়েছিল তারাও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেয়, তারপর দেশে ফিরে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে, যা ছিল মূলত, ’নিজের জীবন বিপন্ন না করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেই পালিয়ে আসা।’
আমরা জানতে পারি যে, আমরাও এই প্রক্রিয়ার অংশ ছিলাম, অন্তত লিনের টেপ রেকর্ডারটা ছিল। স্টিফেন যেন বাড়িতে একা একা বেশি নিঃসঙ্গ বোধ না করে তার অজুহাতে ছেলেরা সেটা আমাদের কাছ থেকে ধার নিয়েছিল। দিনের বেলায় স্টিফেন রেডিও পাকিস্তান থেকে উর্দু মিউজিক রেকর্ড করত, সন্ধ্যা বেলায় যখন মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তাদের বেডরুমে বসে আক্রমণের পরিকল্পনা করত তখন তারা সেটা জোরে জোরে বাজাত।
টহলদানকারী মিলিটারিরা কখনোই তাদের উপস্থিতির বিষয়ে সন্দেহ করেনি, যদিও একদিন একজন ঠিকই ভেতরে এসেছিল একটু বসে গল্প করবে বলে। সে আদতে তথ্য সংগ্রহেই এসেছিল কিনা সেটা জানার জন্য বাবলাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে অনুসরণ করার, যাতে করে প্রয়োজনে তারা তাকে অপহরণ করতে পারে।
তার কিছু অন্তর্ঘাতমূলক কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে সে ব্যাখ্যা করে, ”মিলিটারিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্যই আসলে এগুলো ধ্বংস করে দিতে হয়েছিল।”
এত বছর ধরে চেনা এই ছেলেটার ক্ষেত্রে এটা এমন অস্বাভাবিক একটা ব্যবহার ছিল! সে রবিবারের স্কুলে যোগ দিত এবং আমাদের কোনো এক শিক্ষাশিবিরে অংশ নিয়ে খ্রিষ্টের প্রতি সে তার দায়বদ্ধতার ঘোষণাও দিয়েছিল। মুক্তিবাহিনীতে থাকাকালীন পুরোটা সময় সে আমাদের গির্জায় এসেছিল।
”একজন খ্রিষ্টান হিসাবে, তুমি যা করছিলে সে-বিষয়ে কী মনে হচ্ছিল তোমার?” আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করি। ”কী তোমাকে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল?”
”প্রথম প্রথম,” সে বলে, ”এর অ্যাডভেঞ্চারের বোধটুকু।” তার কালো চোখগুলোতে আনন্দের ঝিলিক, কিন্তু তারপর যখন সে বলতে শুরু করল, তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। ”তারপর এটা ছিল দেশের জন্য কিছু একটা করার সুযোগ। দেশের জন্য ভালোবাসাই আমাকে আমি যা করেছি, তা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
”যোগ দেবার আগে আমি মি. মিনিখের সঙ্গে দেখা করে তাঁর সঙ্গে আলাপ করি। তিনি আমাকে বাইবেলের রোমান অংশ থেকে খুলে দেখান যে, আমাকে আমার দেশের প্রতি অবশ্যই অনুগত হতে হবে। আমি তখন তাঁকে বলি, ”মি. মিনিখ, আপনাদের আমেরিকায় ড্রাফট নামে একটা জিনিস আছে। তো, আপনাকে যদি যুদ্ধে যাবার জন্য ড্রাফট করা হত, আপনি যেতেন না?” তিনি বলেন, ”অবশ্যই যেতাম।”
একজন খ্রিষ্টান হিসাবে সেটাই ছিল বাবলার মুক্তিযুদ্ধে যাবার নৈতিক সমর্থন। তাকে তথ্য আদানপ্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ”আরামে দাঁড়াও থেকে বাজুকা ছোড়া” পর্যন্ত সবকিছুই শেখানো হয়, সে বলে। যেহেতু আমরা, ’হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়ায় তেমন দড় ছিলাম না সেহেতু আমরা ক্রিকট বল লোফালুফির অভ্যাস করি’- একেবারে মিলিটারির নাকের ডগায়।
মিলিটারিদের বোকা বানানোর একটা কৌশল ছিল তাদেরকে এটা বুঝতে দেওয়া যে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব বাহন রয়েছে, যখন বাস্তবে তারা আসলে সাধারণের ব্যবহৃত গণপরিবহন চড়ত, বিশেষ করে সেই বেবি ট্যাক্সিগুলো, যেগুলো শহরের সর্বত্র চরকির মতো ছুটে বেড়াত, এমনকি মানুষ, ছাগল, গরু, বাস, ট্রাকের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে। দুজন মুক্তিযোদ্ধা সবসময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। তারা চালককে এমন একটা জটিল নির্দেশনা দিত যে, তাকে বিভ্রান্ত হয়ে পথের দিশা খুঁজে পাওয়ার জন্য একটু থামতে হত। একটা ছেলে তখন তাকে ব্যস্ত রাখত, আর এই সুযোগে আরেকজন মনোবলবর্ধক লিফলেটগুলো, এবং কখনো সখনো একটা গ্রেনেডও ছুড়ে দিত বাইরে। সাধারণ লোকদেরও এই যুদ্ধে যুক্ত করা হয়েছিল: ভিক্ষুকেরা তাদের ভিক্ষাপাত্রে গোলাবারুদ বহন করত; গরুর গাড়িঅলা তার পাটের গাদার মধ্যে অস্ত্র লুকিয়ে রাখত, কৃষকেরা যে-জমি চাষ করত তার গর্তে বন্দুক লুকিয়ে রাখত।
আরও বিপজ্জনক ছিল ট্রান্সফর্মার উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা। বাবলা যখন এরকম কোনো একটা অপারেশনে তার ভূমিকার কথা বর্ণনা করছিল তখন এক পর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে উচ্চারণ করেছিল যে, বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই তাকে এই ধ্বংসাত্মক কাজগুলো করতে হচ্ছিল।
”কিছু একটা নষ্ট করা অনেক ভালো, স্বাধীনতার জন্য আরও পঁচিশ বছর (ভারতভাগের সময় থেকে) অপেক্ষা করার চেয়ে। আমরা আবার নতুন করে গড়ব, এবং আমরা জানতাম পৃথিবী আমাদেরকে সাহায্য করবে।
প্রভুর সঙ্গে একান্তে নীরবে কিছুটা সময় কাটানো ছাড়া সে তার সকাল শুরু করেনি কোনোদিন, আর বাবলা যখন বাইরে কোনো মিশনে যেত, তখন তার মা কখনো ঘুমাতে পারেননি। তিনি গর্বসহকারে তাঁর সুদর্শন ছেলেকে চলে যেতে দেখতেন এবং তারপর তার ও তার সহযোদ্ধাদের জন্য প্রার্থনায় বসতেন। এই সাহসী বাঙালি নারী তাঁর দায়িত্বটুকুও পালন করেছিলেন। মুক্তিবাহিনীর এক সেক্টর কমান্ডার বাবলার বিছানায় ঘুমাতেন প্রায় প্রতিরাতে, তখন বাবলার মা তাঁকে ও অন্যান্যদেরকেও খাওয়াতে গিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিতেন, যারা পাশের বাড়িটি দিয়ে রহস্যজনকভাবে আসা-যাওয়া করত। খাওয়ানো ও প্রার্থনা করা ছাড়াও তাঁর অন্য কাজ ছিল। মুক্তিবাহিনীর কোনো সদস্য তাঁর দরজায় এলে তিনি তাদের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দিতেন। পরে বাবলা আমাদেরকে শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে সতর্ক গোপনীয়তায় তার সাব মেশিন গান ও কোল্ট .৩৮ হ্যান্ড গানখানি দেখায়।
ছেলেগুলোর সবচেয়ে বড় বিপদের বিষয় ছিল এটা যে, তাদের বাড়ির পেছনেই ছিল একটা রাজাকারেরর ক্যাম্প। এরা ছিল সরকারের ভাড়া করা এক পাল গুণ্ডা বদমাশ, যাদেরকে আধাসামরিক বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। তারা ছিল বাঙালি দালাল ও গুপ্তচর যাদের গেস্টাপোর মতো আচরণ জনগণকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল।
অবশেষে সেই দিনটা আসে, যেদিন বাবলার মায়ের হৃৎপিণ্ড কেঁপে ওঠে। আরও তিনজনের সঙ্গে বাবলা তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর অপারেশনে বেরিয়ে যায় : একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু উড়িয়ে দেওয়ার কাজে, যেটা ছিল চিটাগাং ও কুমিল্লার মধ্যেকার একমাত্র সংযোগ।
তাঁর প্রার্থনার দরকার ছিল তাদের। তারা আগেরদিন বিকালে সেই এলাকায় চলে যায়, কারও একজনের বাড়িতে থাকে, এবং গভীর রাতে ফিউজ ইত্যাদি লাগিয়ে সব তৈরি করে রাখে। ভোর চারটায় উঠে তারা কাজ শেষ করতে যায়।
”লোকে বলে মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের খুব সাহস, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমরা কাঁপছিলাম,” বাবলা স্বীকার করে।
” ’চলো এই পরিকল্পনা বাদ দিই,’ অন্য একজন পরার্মশ দেয়। তবে অবশ্যই আমরা তা করিনি। ধানখেতের ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে যাই, বুনো শূকরের মতো শব্দ করতে করতে। আমরা রেললাইন পর্যন্ত আসি, লাইনে তখন একটা ট্রেন। তার হেডলাইটের উজ্জ্বল আলো জ্বলছিল– আমরা ঠিক যা চাইছিলাম। আমরা এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে থাকি। দুইজন বিশেষজ্ঞ সেতুর সর্বোচ্চ ক্ষতি নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। আমরা সময়মতো ফিউজ জ্বালিয়ে দিই– নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য হাতে মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মতো সময় রেখে। এক দিকে বঙ্গোপসাগর, অন্য দিকে রেলওয়ে লাইন আর পাহাড়সারি।
”বুম! ফিউজ উড়ে গেল। আতঙ্ক ঘিরে ধরে আমাদের। আমরা দৌড়বিদের মতো ছুটতে শুরু করি। দৌড়াচ্ছি ঠিকই তবে কোথায় যাচ্ছি জানি না। কোনো নৌকোও ছিল না, তাহলে একটা চরের দিকে চলে যেতে পারতাম আমরা। কুকুরেরা ডেকে ওঠে। গুলির শব্দ শোনা যায়। লোকেরা সৈকতের দিকে ভিড় করে আসতে থাকে। এক তরুণ বলে, সে আমাদের সাহায্য করতে পারবে- কিন্তু আমরা জানতাম না তাকে বিশ্বাস করা যায় কিনা। একটা চিৎকার শোনা গেল, ’মিলিটারি আসছে!’
”আমাদের সবসময়ই একটা আপৎকালীন পরিকল্পনা থাকার কথা। এই পরিস্থিতিতেও আমাদের দুজন পকেট থেকে রাজাকারের ব্যাজ বার করে। সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর খোঁজে এলে এটা আমাদের চারজনকেই রক্ষা করত। তবে আমাদের এই পরিকল্পনায় হিতে বিপরীত হয়। মিলিটারিরা আমাদের কাছাকাছি আসে না ঠিকই, তবে আচমকা আমরা নিজেদেরকে বহুলোক দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখতে পাই, যে-লোকগুলো আমাদের বুকে রাজাকারের ব্যাজগুলো দেখেছে এবং বাঙালিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য আমাদের রক্ত নিতে এসেছে।
”আমরা জানতাম তারা যদি আমাদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নিয়ে যায়, তাহলে তাদের কেউ না কেউ আমাদের চিনবে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল এই ক্রুদ্ধ জনতাই আমাদের বিচার করতে যাচ্ছে। এখন কী করা? আমি প্রার্থনা করি এবং ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করেন। হঠাৎ করে জনতার মধ্য থেকে কেউ একজন আমাদের দলনেতাকে চিনতে পারে, এবং সে অন্যদের এটা বোঝাতে সক্ষম হয় যে, আমরা তাদের দলের মানুষ, আমরা আসলে মুক্তিযোদ্ধা।”
এর মধ্যে এই ঘটনার খবর চট্টগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বাবলার মা-ও বিস্ফোরণের কথা শুনেছেন, তারপর কেউ একজন তাঁকে জানায় যে, দুটো তরুণ ছেলে তাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাদের যে-বর্ণনা দেওয়া হয় সেটা তাদের দুজনের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তবে তারা দুজন নিরাপদে হেঁটে শহরে ফিরতে সক্ষম হয় এবং বাবলার মা এই খবরটা জানার প্রায় পরপরই বাবলা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে!
মা ও ছেলে দুজনেই জানত তাদের সাহায্যের উৎস কী ছিল।
”ঈশ্বর আমাদের সকল প্রার্থনা শুনেছেন,” বাবলার মা আমাদের বলেন।” আমি একটা ফার্স্ট এইডের বাক্স মজুদ রেখেছিলাম, কিন্তু এইসব বিপজ্জনক, ভয়ংকর মুহূর্তেও ষোলোজনের একজনেরও একটা ব্যান্ড-এইডেরও দরকার পড়েনি। একজনের শার্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল, ব্যাস অইটুকুই। ঈশ্বর তাদের সবাইকে নিরাপদ রেখেছিলেন।
এই গল্প শুনে, আমি এই তরুণ ছেলেদেরকে নিয়ে (এবং এই মায়ের সম্পর্কেও) গর্ব অনুভব না করে পারিনি, যারা জেনেশুনে দেশের স্বাধীনতার জন্য তাদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছিল।

মিশনারি শিশুদের জন্য একটি গল্প

নভেম্বরের মধ্যেই আসল ঘটনার জন্য অবস্থা অনুকূল হয়ে ওঠে। বহু তরুণ তখন ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরেছে; পেশাদার মুক্তিসেনারাও ততদিনে পুরোপুরি তৈরি। নাটক শুরু হবার জন্য মঞ্চ একেবারে প্রস্তুত। শুধু পর্দা ওঠার বাকি।
চট্টগ্রামে তখনও রয়ে-যাওয়া এগারো আমেরিকান নাগরিক থ্যাংক্সগিভিংয়ের দিন ডিনারের জন্য একত্রিত হন। মার্কিন সরকার আমাদের বিপদের আশঙ্কা করে, প্রত্যেককে নিচের চিঠিটি সবে পাঠিয়েছে :

মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেল
ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান
নভেম্বর ২৪, ১৯৭১
প্রিয় আমেরিকান সহনাগরিক,
সাম্প্রতিক দিনগুলোর ঘটনাসমূহের মনোযোগী মূল্যায়নের পর, আমি এই মুহূর্তে সকল মার্কিন নাগরিকদের পোষ্য, ও খোদ নাগরিকদের মধ্যে যাদের উপস্থিতি পূর্ব পাকিস্তানে তেমন জরুরি নয়, তাদেরকে ব্যক্তিগত ব্যবস্থায় এক্ষুনি দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিচ্ছি।
অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন, এটি সকল মার্কিন নাগরিকের এই অঞ্চল ত্যাগ করার নির্দেশ নয়: এটি একটি বিজ্ঞপ্তিমাত্র, যার উদ্দেশ্য দেশত্যাগ যখন অনিবার্য হয়ে পড়বে তখনকার জন্য আপনাদের প্রস্তুত করা, এবং আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হচ্ছে, ওপরে যাদের কথা বলা হয়েছে, তারা যেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।
আপনি যদি একজন বেসরকারি মার্কিন নাগরিক হয়ে থাকেন যিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কর্মচারী নন, আপনার এ সম্পর্কে অবগত থাকা দরকার যে, শেষ পর্যন্ত কোনো জরুরি অবস্থায় দেশত্যাগের জন্য আপনি নিজেই দায়ী থাকবেন, তবে কনস্যুলেট আপনাকে সাহায্য করার জন্য সর্বোতভাবে প্রস্তুত। আপাতত, আমি আপনাদেরকে নিম্নবর্ণিত সাবধানতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছি :
১. শহরের ভেতরে কিংবা বাইরে অদরকারি ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন।
২. আপনার মূল্যবান কাগজপত্র, যেমন, পাসপোর্ট, বিমাপত্র, ব্যাংকবই এবং ঘড়ি, ক্যামেরা, গয়না ইত্যাদি বহনযোগ্য মূল্যবান সামগ্রী সব একসঙ্গে রাখুন।
৩. আপনার ব্যক্তিগত সম্পদের একটি তালিকা করে রাখুন, যদি কখনো জরুরিভাবে আপনাকে দেশত্যাগ করতে হয়, তখন যেন সেটা রেখে যেতে পারেন।
৪. আপনার যারা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা তাদেরকে অনুরোধ করব একটা স্যুটকেস গুছিয়ে রাখতে, সম্ভাব্য প্রস্থানের জন্য, যদিও আমরা এখন পর্যন্ত মনে করছি, অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যাপারে ঋজু হতে পারি। একই সঙ্গে আপনাদেরকেও ঠিক করে রাখতে হবে ভাড়া-করা কিংবা সামরিক বিমানে তড়িঘড়ি প্রস্থানের সময় আপনারা সঙ্গে করে কী কী জিনিস নিতে চান। এরকম পরিস্থিতিতে প্রতিটি পরিবার অনূর্ধ্ব চল্লিশ পাউন্ডের একটি স্যুটকেস বহন করতে পারবে সঙ্গে।
আপনারা যদি এখনই এই এলাকা ছাড়তে চান তাহলে অনুগ্রহ করে কন্স্যুলার অফিসকে অবগত করুন, যাতে করে তারা বর্তমানে এই অঞ্চলে বসবাসকারী আমেরিকানদের তালিকা থেকে আপনার নাম মুছে দিতে পারে। এটা জরুরি যে, আমরা সকল আমেরিকান নাগরিকের সর্বশেষ তথ্য ও অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকি।
আপনার সহযোগিতা ও সংবেদনশীলতা আমাদের কাছে অতীব মূল্যবান।
আপনার বিশ্বস্ত,
রবার্ট সি কার্ল
কনসাল-ইন-চার্জ

এখানে আমি আমার পরিবারকে কী লিখেছিলাম, সেটার পুনরাবৃত্তি করা ভালো হবে মনে করি (এই গোলমেলে পরিস্থিতিতে তাঁরা আমার চিঠি আদৌ পাবেন কিনা না জেনেই সেটা লেখা; আমেরিকার কূটনৈতিক ব্যাগে বহন-করা এবং ওয়াশিংটন থেকে কোনো কূটনীতিবিদের নিজহাতে ডাকে-দেওয়া চিঠিগুলো ব্যতিক্রম।):
”একটা ভালো সরকার আমাদের দেখাশোনা করছে।”
দূতাবাস কর্মীদের উদ্বেগের বাড়াবাড়ি দেখে প্রায়শই আমরা একে অপরকে বলছিলাম, ” আমাদের যেন কোনো ড্রাফট কার্ড পোড়ানেঅলার সঙ্গে দেখা না হয়। আমরা তাহলে তাদেরকে আচ্ছা করে কথা শুনিয়ে দেব।”
আমরা আমাদের পতাকার সুরক্ষাকে যতই প্রশংসা করি না কেন, আমরা সর্বদাই সচেতন ছিলাম যে, একজন আরও ভালো ঈশ্বরও আমাদের দেখভাল করছেন।
নভেম্বরের শেষ দিনে, মিসেস বসু ও আমি আমাদের নিয়মিত মঙ্গলবারের রিলিফ ক্লাসের জন্য রওনা হই। রিলিফদান কোনো ঐচ্ছিক মিশনারি তৎপরতা ছিল না। আপনাকে ত্রাণকাজে যুক্ত থাকতেই হত। লোকেরা যখন অনাহারে মরছিল তখন আপনি নিষ্ক্রিয় বসে থাকবেন, সেটা সম্ভব ছিল না। নভেম্বর নাগাদ আমাদের রিলিফ তালিকায় ২৬০টি পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতি পরিবারে কমপক্ষে ছয়জন মানুষকে ধরে আনুমানিক ১৫৬০ জন লোককে আমরা সীমিতভাবে হলেও সাহায্য করেছিলাম। এরা সবাই শহরের মধ্যেই বাস করত। এদের কেউ কেউ খ্রিষ্টান ছিল, যাদের পরিবারপ্রধান কাজ হারিয়েছেন, অনেকে আবার বরাবরই গরিব, যাদের যেকোনো পরিস্থিতিইে সাহায্যের দরকার পড়ে, তবে সিংহভাগই ছিল হিন্দু জনগোষ্ঠীর, যাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, অথবা যদি তখনও সেগুলো দণ্ডায়মান থেকে থাকে, সেটা তার খোলসমাত্র। কেউ কেউ, সামনের সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করে, মেঝেতে গর্ত করে তাদের টাকাপয়সা ও মূল্যবান সামগ্রী লুকিয়ে রেখেছিল। তাদের এই অপরাধকেও উপেক্ষা করা হয়নি। মিলিটারি ঘরের মেঝে তুলে ফেলে, মাটির নিচ দিয়ে গর্ত করে সেসব বার করে নেয়। আমরা তাদেরকে কাপড়চোপড়, কম্বল, তোয়ালে, শিশুখাদ্য, দুধ, পুষ্টিকর বিস্কিট, অল্পস্বলপ টিনজাত মাছ, মাংস ও ফল সরবরাহ করি।
মঙ্গলবারের ক্লাসে ধর্মপ্রচার ও ত্রাণকার্য দুটোই একসঙ্গে করা হত। চল্লিশজন নারী, প্রত্যেকের সঙ্গে কমপক্ষে একটি শিশু, আমাদের বিশ্বাসী সদস্য মণীন্দ্রর ৮ বাই ১০ ফুট ঘরে গাদাগাদি করে জমায়েত হত। মণীন্দ্র হল সেই হিন্দু, যে তার ধর্মত্যাগ করেছিল বলে পরিবার তাকে বছরের পর বছর ধরে পরিত্যাগ করেছিল। তবে এখন টেবিল উল্টে গিয়েছিল। এলাকায় সে খ্রিষ্টান নামেই পরিচিত ছিল। তার বাড়ির ওপর ক্রস-আঁকা একটি সাইনবোর্ডের অস্তিত্ব মিলিটারি ও রাজাকারদের এটাই জানাত যে, ”এই সম্পত্তির মালিক একজন খ্রিষ্টান।” অগণিত মানুষ, তার অত্মীয়রাসমেত, এই সাইনবার্ডের নিচে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এক পর্যায়ে মণীন্দ্র তেরোটি মেয়েকে আশ্রয়দান ও দেখাশোনা করেছিল, যা না হলে তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যেত।
সেই মঙ্গলবারটি, ৩০শে নভেম্বর, আর সব দিনের মতোই ছিল। ছোট্ট ঘরখানি লোকে ভর্তি। দরজার ফাঁক দিয়েই যেটুকু আলো আসার সেটুকু আলোই ছিল ঘরের ভেতর। আমরা সবাই মেঝেতে বসা ছিলাম, যদিও শিক্ষক হিসাবে মিসেস বসু ও আমার জন্য একটা বাঁশের চাটাই বরাদ্দ ছিল। আমরা গান দিয়ে শুরু করি, একই গান বারেবারে গাওয়া হয়, কেননা খুব অল্প মেয়েই পড়তে জানত, ফলে তাদেরকে শুনে শুনেই মুখস্থ করে নিতে হত কথাগুলো। বাইরে অনেক কথাবার্তার কোলাহল ছিল, লোকেরা ধর্মীয় কার্যকলাপ শেষ হবার অপেক্ষায় ছিল, যাতে করে তারা তাদের শিশুখাদ্য, বিস্কিট, দুধের রেশন হাতে পেতে পারে। ভেতরে বাচ্চারা কাঁদছিল, তাদেরকে মাথার ওপর দিয়ে দরজার পাশে দাঁড়ানো কোনো আত্মীয়ের কছে চালান করে দেওয়া হচ্ছিল। বাচ্চারা মেঝে ভিজিয়ে ফেলছিল। এই ডায়াপারহীন দেশে, মায়েরা অবিচলিতভাবে তাদের নগ্ন পা ব্যবহার করে এইসব ছোটখাটো জলের ডোবাসমূহ শুকিয়ে ফেলছিল কিংবা চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছিল দ্রুত, আর বাকিরা তখন তার পথ থেকে দূরে সরে দাঁড়াচ্ছিল। বয়স্ক নারীরা আমাদের পড়ার পুনরাবৃত্তি করছিলেন – এমনটাই ভদ্রভাবে জানান দিতে যে, তাঁরা আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করছিলেন।
সেদিন আমরা একেবারে গোড়ায় ফিরে যাওয়ার একটা তাড়না অনুভব করি এবং এতগুলো সপ্তাহ ধরে যে-মৌলিক নির্দেশনার ওপর আমরা জোর দিচ্ছিলাম সেটা নিয়ে একটু পর্যালোচনা করি : মানুষমাত্রই পাপী। ঈশ্বর হলেন ভালোবাসা। ঈশ্বর চান মানুষ তাঁর কাছে আসুক, কিন্তু পাপ তাঁর কাছ থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। যিশুখ্রিষ্ট পৃথিবীতে আসেন এবং তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি সেই পাপকে দূর করেন। মানুষ আরও একবার ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে তখন। কেউই, তার পক্ষে সম্ভবপর কোনো কৃত্যের মাধ্যমেই এই নৈকট্য অর্জন করতে পারে না। কোনো ভালো কাজ, প্রাণী উৎসর্গ, ফুল ও ফলের নৈবেদ্য, অন্তহীন প্রার্থনা ও ধ্যান – একজন মানুষের পক্ষে যা যা করা সম্ভব তার কোনোটাই তাকে সেই পরিত্রাণ এনে দেবে না। পরিত্রাণ ঈশ্বরের দেওয়া একটা বিনামূল্যের উপহার। এর ওপর বিশ্বাস রেখে এবং এই অমূল্য উপহার গ্রহণ করেই কেবল মানুষ পরিত্রাণ লাভ করতে পারে।
ছবি ও গল্পসহকারে কতবার যে আমরা এই বার্তা প্রচার করেছি। সেদিন আমরা অনুভব করি, সময় এসেছে তাদেরকে প্রশ্ন করার : ”আপনারা এই জিনিস বহুবার শুনেছেন। এখন বলুন এ-বিষয়ে কী করতে পারেন আপনারা?” এর তেমন কোনো সদুত্তর পাই না আমরা, তবে অনেককেই সেদিন চিন্তিতমুখে বেরুতে দেখি। কে বলতে পারে ঠিক কোন অনুভূতি খেলা করছিল তাদের হৃদয়ে সেই বিকালে?
বৃহস্পতিবার সকাল, ডিসেম্বর ২, ৫টা থেকে ৬টার মধ্যেই মুক্তিবাহিনী আক্রমণ শুরু করে। তারা সেই এক বেলার জন্যই একশতেরও বেশি অপারেশন পরিকল্পনা করে রেখেছিল, এবং তার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি বাস্তবায়িত করে। বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার ও পেট্রল পাম্পগুলো যখন উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল তখন আমাদের বাড়িঘরশুদ্ধু কেঁপে কেঁপে ওঠে। ষোলো বছরের লুসি, যে-আমাদের সঙ্গে বেশ ক’মাস ধরে বাস করছিল, সেই রাতে লিনের ঘরে একাই ঘুমুচ্ছিল। লিন একদিনের সফরে হাসপাতালে গিয়েছিল। এতগুলো বিস্ফোরণের পর লুসি সিদ্ধান্ত নেয়, সে আমার ঘরেই চলে আসবে। আমাদেরকে যদি উড়িয়েই দেওয়া হয়, তাহলে যেন আমরা একসঙ্গেই উড়ে যাই।
সেদিন রেড ক্রস আমাদেরকে পাঁচটি বড় বস্তাভরা কাপড় পাঠালো। আমরা বাকি বিকেল ও সন্ধ্যার সময়টা কাপড়গুলো ঝাড়াই বাছাই করে এবং তার মধ্যেকার বেখাপ্পা জিনিসগুলো দেখে হাসাহাসি করে কাটালাম। কাপড়গুলো মোক্ষম সময়েই এসেছিল। পরদিন আমাদের একটি বিশাল বিতরণ অনুষ্ঠান ছিল, আর এই কাপড়গুলো ছিল আমাদের এযাবৎ পাওয়া সবচে ভালো সংগ্রহ। কিন্তু রাতের বেলায় মাইকে শোনা গেল সারাদেশ জুড়ে কঠোর কার্ফ্যু জারি করা হয়েছে। কেউই কোথাও যেতে পারছিল না। কাপড়গুলো বিতরণ করার কোনো সুযোগই ছিল না, হাসপাতাল থেকে লিনেরও ফেরার কোনো উপায় ছিল না।
ডিসেম্বর ৪, শনিবার সকাল, আমরা বজ্রের আওয়াজে জেগে উঠি! লুসি আর আমি লাফ দিয়ে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করি। আকাশ একেবারে ধোঁয়াটে, অনেকটা শীতের তুষারঝড়ের মতো। একটি ছোট ছেলে জানতে চায়, ”আজকে কি একেবারেই সকাল হবে না?” সাতটা নাগাদ আমরা নাস্তা শেষ করছিলাম প্রায়, যখন প্লেনের শব্দ শোনা যায়। খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমরা সাতটা নামহীন বিমানকে দেখলাম, নিখুঁত বিন্যাসে বিমানবন্দর অঞ্চলের দিকে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে। আমরা সাংঘাতিকরকম বোমাবর্ষণের শব্দ পাচ্ছিলাম এবং বুঝতে পারলাম বিমানগুলো আসলে ভারতের; ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশটা আসলে ছিল পেট্রোলের, যেহেতু মধ্যরাত থেকেই বিমানগুলো মোট পাঁচবারের মতো ইস্টার্ন রিফাইনারির ওপর বোমা ফেলেছে। বিমান বিধ্বংসী কামান ও ভূমি থেকে ছোড়া গোলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল চারিদিক থেকে। আমরা তাড়াতাড়ি বসার ঘরের আসবাবগুলোকে দেয়ালের দিকে ঠেলে দিই এবং একটা ম্যাট্রেস টেনে এনে তার ওপর বসে থাকি।
লাউডস্পিকারে করে ঘোষণা দিয়ে যায় যে, দুপুরে কার্ফ্যু কিছুক্ষণের জন্য তোলা হবে। এটা কার্ফ্যুর কারণে অপ্রস্তুত লোকদেরকে খাদ্য কেনার জন্য কিছুটা সময় করে দিয়েছিল। বারোটা বাজতে না বাজতেই নন্দীবাবু বাড়িতে আসেন, আতঙ্কে একেবারে মৃতপ্রায় চেহারায়। তিনি তাঁর মেয়েদের আর বাড়িতে রাখতে পারবেন না কিছুতেই। কার্ফ্যু বলবৎ থাকায় মিলিটারি তাদের সবাইকে বাড়িতে আটকে রেখে, যেকোনো বাড়িতে ঢুকে যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারবে কেননা লোকেরা তখন কোনো সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারবে না। তিনি কি মেয়েদেরকে আমাদের এখানে নিয়ে আসতে পারেন? ’অবশ্যই’, আমরা বলি।
কিন্তু তাদেরকে গোপনে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে ওঠার আগেই রিড এসে হাজির হন। আবার আমাদের সরে যাবার সময় এসেছে, তিনি ঘোষণা করেন। আমাদের তৈরি হবার জন্য আড়াইটা পর্যন্ত সময় আছে, এরপর আমরা সবাই তাঁর বাড়িতে যাচ্ছি। এটাই আমাদের বিকল্প পকিল্পনাই ছিল, যদি খারাপ কিছু ঘটে। বাড়িতে যথেষ্ট চাল, দুধ ও টিনের মাছ মজুদ করা ছিল; গ্রিসের খ্রিষ্টান গির্জার উপহার সেগুলো। (আমরা যেরকম একটা আন্তর্জাতিক রেডক্রসের সঙ্গে কাজ করছিলাম আমাদেরকে তিনটে কি চারটি ভাষা জানতেই হত, অন্তত তা বুঝতে পারতে হত। আমাদের খাবারের বাক্সগুলোর গায়ে গ্রিকে লেখা ছিল। সৌভাগ্যক্রমে লিন গ্রিক পড়তে পারত। ওষুধপত্রের নামধাম লেখা ইটালিয়ান ভাষায়, যেটা খুবই বিপজ্জনক হতে পারত, আর কাপড়ের লেবেলে নাম ও মাপ লেখা ছিল ফরাসি ভাষায়। আমি একটি দুই বছরের বাচ্চার জন্য ৭৫ লেখা সাইজের একজোড়া প্যান্ট দিয়ে দিয়েছিলাম!)
আড়াইটার মধ্যেই আমরা তৈরি হয়ে যাই – জব্বার ও তার বউ, তার দুইটা ছোট বাচ্চা, তাদের দশ বছরের ভ্রাতুষ্পুত্র, আবুল, লুসি ও আমি – ম্যাট্রেস, স্লিপিং ব্যাগ এবং বাড়ির সব খাদ্যবস্তু এবং মূল্যবান জিনিসপত্রসহ, যার মধ্যে ছিল ভাষাশিক্ষাপ্রকল্প ও লিনের বাইবেল তর্জমার কাগজপত্রসমূহ। আমি ফোক্সওয়াগন বাসটি চালাই, যা আমি এর আগে কখনো করিনি। আরও বোমারু বিমানের আগমনের চেয়ে সেটাও আমাকে কোনো অংশে কম ভীত করেনি। রিড ছোট ফোক্সওয়াগনটাকে গলির মাথায় নন্দীদের বাড়ির যতটা কাছাকাছি নেওয়া সম্ভব নিয়ে যান। মেয়েরা চুপেচুপে এসে গাড়িতে ঢুকে পড়ে। ২৫শে মার্চের রাতের পর এই প্রথমবারের মতো তারা বাড়ির বাইরে এল!
রিডের বাড়িতে, দেশত্যাগ করা মানুষদের রেখে-যাওয়া আসবাবগুলোর পুনর্বিন্যাস করাটা ছিল প্রথম কাজ আমাদের। তাঁর একার বাড়িটি হঠাৎ করেই কুড়িজন লোকের থাকার ঘর হয়ে গেল। সেখানে আমার বাড়ির লোকজন তো ছিলই, নন্দীদের সবচেয়ে বড় তিন মেয়ে, বসুদের তিনজন বড় মেয়ে ও খোকা সেনের পরিবারের সদস্যেরাও ছিল।
খোকা একজন বিশ্বস্ত প্রচারক ছিলেন, বাইবেল করেসপন্ডেন্স স্কুলের পরিচালক ছিলেন বহুবছর ধরে, কিন্তু তাঁর স্ত্রী ছিলেন একজন গোঁড়া হিন্দু নারী। তাঁর দশ বছরেরও অধিককালের পরিত্রাণের জীবনে তিনি একটিবারের জন্যও গির্জার কাজে অংশ নেননি বা গস্পেলের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাননি। তাঁর গ্রামের বাড়িটিকে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি গোঁয়ারের মতো গ্রামেই থেকে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর দুই কিশোরী কন্যা ও দুটি ছোট ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন রিডের বাড়িতে, তাদের বাবার সঙ্গে থাকার জন্য। সবক’টা বাচ্চাই গির্জার কাজে যুক্ত হয়েছিল। বড় মেয়েরা বাইবেল করেসপন্ডেন্স কোর্স শেষ করেছিল এবং শিক্ষাশিবিরেও যোগ দিয়েছিল। ছোট বাচ্চারা রবিবারের স্কুল বাদ দেয়নি কখনো, এবং রিডের পেছন পেছন ছুটতে গিয়ে তাদেরকে কোরাস গানগুলো গাইতে হচ্ছিল ক্লান্তিহীনভাবে। শেষ পর্যন্ত যখন আর একদিনের জন্যও গ্রামে থাকাটা নির্বুদ্ধিতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, তখন তিনিও এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। খোকার দুই মেয়েকে ধরে আমাদের বাড়িটি মোট নয়জন মেয়ের একটি হোস্টেলই হয়ে গিয়েছিল। তারা মেঝেতে যার যার জায়গা পছন্দ করে, রাতের বেলায় তাদের বিছানা পেতে নিত সেখানে।
রবিবারে এই দলটাকে গির্জায় নেবার চেষ্টা না করে রিড ও খোকা সেন নিজেরাই বিভিন্ন এলাকায় যেতেন। এভাবে বেশ কয়েকটা ছোট ছোট পাড়ার গির্জাও তৈরি হল। আমাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সবাই আসত সভা করতে, এমনকি খোকার বউও।
রবিবার বিকালে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে আমরা একটা বার্তা পেলাম – উর্দুতে বলাই বাহুল্য – শত্রু আক্রমণের সময় কী করতে হবে সে-বিষয়ে। মৌখিক নির্দেশাবলির পর, কেউ একজন এসে বাংলায় লেখা একটা লিফলেটও দিয়ে গেল। জনসংখ্যার পঁচাত্তর শতাংশ নিরক্ষর বাঙালি সেটা নিয়ে কী করবে, সেটা যে-কারো অনুমান।
লিফলেটে লেখা নির্দেশনা ছিল প্রত্যেক জানালার কাচে বাদামি রঙা কাগজের ফালি কেটে লাগানো, লাফ দিয়ে পড়ার জন্য একটা ট্রেঞ্চ কাটা, আর কানে গোঁজার জন্য তুলার বান্ডিল প্রস্তুত রাখার। ট্রেঞ্চগুলো শহরের রসিকতা হয়ে দাঁড়ায়। সরকার নির্দেশ দিয়েছিল প্রত্যেক রাস্তার মাঝখানের দ্বীপে একটা করে এবং ঘাসেঢাকা মাঠের মধ্যে বেশকিছু ট্রেঞ্চ কাটার। কিন্তু সমুদ্রের কাছে বলে পানির স্তর এত উঁচুতে ছিল যে, খানিকক্ষণ খোড়ার পরেই গর্তগুলো পানিতে ভরে যেত। তার সঙ্গে যোগ করুন লোকেদের এই রাস্তার মাঝখানের দ্বীপগুলোকে এবং যে-কোনো সুবিধাজনক জায়গাকেই মূত্রাগার হিসাবে ব্যবহার করার প্রবণতা, তখন আপনার হাতে দুটোই পথ খোলা থাকত : হয় শত্রুদের বোমার আঘাতে অক্কা পাওয়া অথবা সেরকমই কোনো এক নিরাপদ ট্রেঞ্চের ভেতর ডুবে মরা।
বাধ্যতামূলক কার্ফ্যুর সময় আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে সবাইকে ঘরে ঢুকে যেতে হবে এবং ছয়টার মধ্যে বাতি নিভিয়ে দিতে হবে। পরদিন সূর্যোদয় পর্যন্ত এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারই ছিল নিয়ম। এর ফলে দীর্ঘ ও একঘেয়ে একসন্ধ্যার জন্ম হয়। রিড তখন একটা পরিকল্পনা নিয়ে আসেন। কার্ডবোর্ডের বাক্স ঠিকঠাক মাপে কেটে আমরা ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য যত ছিদ্র ছিল বাইরের দিকে মুখ করা, সেগুলো বন্ধ করে দিই। তারপর আমরা রিলিফের দুটো কম্বলকে জোড়া দিয়ে প্রতিটি জানলায় আটকে দিই। ভাগ্যক্রমে, ডিসেম্বরের চট্টগ্রাম ছিল খুব ঠান্ডা, তা নাহলে আমাদেরকে হয়ত দমবন্ধ হয়েই মারা যেতে হত। এইসব সাবধানতা অবলম্বন করে, বসার ঘরে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে আমরা সবাই সেখানে জড়ো হই, আরেকটা মোমবাতি জ্বালানো হয় প্রয়োজনে রান্নাঘর কিংবা বাথরুমে ব্যবহারের জন্য। রিড মাঝেমধ্যেই বাড়ির চারপাশে ঘুরে নিশ্চিত হতেন যে, কোনো আলো বাইরে যাচ্ছে না।
প্রত্যেক সন্ধ্যায়, রাতের খাবারের পর রিড একটা বাইবেলসভা বসাতের গস্পেল থেকে যোহন পুস্তক পর্যন্ত। সেই দিনগুলো ঈশ্বরের বাণীগুলোকে মেয়েদের কাছে বুঝিয়ে বলার অবারিত সুযোগ দিয়েছিল আমাদের। সেখানে কোনো তাড়া ছিল না; আমরা চাইলেও কোথাও যেতে পারতাম না। মেয়েরা প্রশ্ন করার জন্য স্বাধীন ছিল এবং তারা তা করেওছিল। তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপে, নন্দীদের তিনজনেই এমন একটা সময়ের দিকে ইঙ্গিত করে যখন তারা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে, খোকার মেয়েরা যারা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার জন্য, বিশেষ করে জনসম্মুখে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই আনুগত্যের কথা ঘোষণা করার কারণে কতটা মূল্য দিতে হবে সে-বিষয়ে অনেক বেশি জানত, তারা বলে, তাদের মনে কিছু প্রশ্ন রয়েছে, আগে সেগুলোর জবাব পেতে হবে তাদের। তারা অবশ্যই খ্রিষ্টে বিশ্বাস করতে চায়, কিন্তু জানে সেই পথে কত বাধা। আগে এইসব বাধাসমূহকে দূর করতে হবে।
পশ্চিমা খ্রিষ্টানেরা পুরোপুরি বুঝতে পারবে না অন্য ধর্ম থেকে রূপান্তরিতেরা কী কী সব বাধার মুখোমুখি হত, সেসব আমাদের জীবনচর্যায় এমনই অচেনা। যেমন, এই ধরনের সমস্যা : ”আমি যদি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করি তাহলে কি আমার সব আত্মীয় আমার বিরুদ্ধে চলে যাবে? আমি কি আমার পুরো পরিবারের সামাজিক অবস্থানকে আঘাত করব? অখ্রিষ্টান বন্ধু ও আত্মীয়রা কি আমাদের বাড়িতে একসঙ্গে বসে খেতে পারবে? আমি কাকেই বা বিয়ে করব? (আসলে হবে, তারা কার সঙ্গে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করবে?) আমার স্বামী মারা গেলে, কে আমার ভরণপোষণ করবে? আমি মারা গেলে কে-ইবা আমার শেষকৃত্য ও মুখাগ্নি করবে?”
প্রতি সন্ধ্যায় বাইবেল পাঠের পর একটা সময় আসত, যখন আমি মেয়েদের অন্তহীন প্রশ্ন এবং ’ওহ আন্টি’বাচক উচ্ছ্বাস থেকে পালিয়ে গিয়ে আমার জন্য বরাদ্দকৃত এক বালতি গরম জলে স্নান করে বিশ্রাম নিতাম। রিডকে এর মধ্যে সরি, পেগিটি অথবা চাইনিজ চেকার্স খেলার সার্বক্ষণিক চাহিদার মোকাবিলা করতে হত।
সোমবারে আমি গাড়ি চালিয়ে আমাদের বাড়ি অব্দি যাই। সাহিত্য বিভাগের তিন তরুণের সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা করেছিলাম যেন তারা সকালবেলাটা আমাদের বাড়িতেই কাজ করে। তারা তাহলে যারা আমাদের খোঁজ করতে এসেছিল তাদেরকে বলতে পারত আমরা কোথায় আছি এবং একই সঙ্গে বাড়িটিতে যে তখনও লোকজন বাস করছে তার একটা প্রমাণ রাখতে পারত। আমরা একজন দারোয়ানও রেখেছিলাম সেখানে, তবে প্রতিবার গুলির শব্দ পাওয়ামাত্র তিনি পড়িমড়ি হয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে যেতেন। আমরা এখনও জানি না আমাদেও বাড়ির সামনের দরজাটি কে ভেঙেছিল, ভীতসন্ত্রস্ত তিনি নাকি কুকুরটি!
সোমবার বিকালে আমরা ’শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার’ মহড়াটি অনুশীলন করে দেখার একটা সুযোগ পাই। ভারতীয় বোমারুরা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে কৌশলগত স্থানগুলোতে বোমা ফেলে যাচ্ছিল যথারীতি। শুধু বাঙালিদের কাছেই তারা শত্রু ছিল না : তাদের কাছে তারা ছিল ত্রাণকর্তা এবং প্রত্যেকেই দেখতে চাইছিল তারা আসলে কী করছে এবং তা দেখে তাদের দক্ষতার প্রশংসা করতে। সেই প্রথমবারের মতো দিনের বেলার আক্রমণের সময় সবাইকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে আমাদের বসার ঘরে পাতা জাজিমের ওপর বসিয়ে রাখাটা খুব কঠিন ছিল। রিড অফিসে ছিলেন, সেখানে সব কর্মচারী ও কৌতূহলীরা লনে এসে সেই প্রদর্শনী দেখেছিল।

[চলবে]

Share Now শেয়ার করুন