জিনি লকারবি >> কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা [পর্ব ৮] >> তর্জমা : আলম খোরশেদ

0
382

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে : জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা 

পর্ব ৮
স্মৃতিরোমন্থন
যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু এর শিকার যারা, অর্থাৎ জীবিতরা, তাদের সেবার দরকার ছিল। আমি যেহেতু রেড ক্রসের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেহেতু আমার দায়িত্ব পড়েছিল ডা. পিটারের সঙ্গে মিলে হোটেলের তিন তলায় একটা হাসপাতাল স্থাপন করা। সেখানকার প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করার জন্য আমাদেরকে শহরের আশেপাশের অঞ্চল জুড়ে বহু মাইল গাড়ি চালিয়ে চষে বেড়াতে হয়েছিল।
উন্মাদ হয়ে যাওয়া একটি শহরের হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য আমি আমাদের বালিশের ওয়ারসমূহ ও রিলিফের একটি লালরঙা স্কার্টের কাপড় বিসর্জন দিয়ে রেড ক্রসের কতগুলো পতাকা বানিয়ে নিই। আমি এই সৃজনশীল প্রয়াসে গর্ববোধ করি এবং আমাদের দুই গাড়ির নবস্থাপিত পতাকাদণ্ডে সেগুলো বাঁধবার উপক্রম করি, আর ঠিক তক্ষুনি রিড এসে উপস্থিত হন। তিনি বালিশের ঢাকনা দিয়ে বানানো রেড ক্রসের পতাকাগুলোর দিকে চেয়ে অভিযোগের স্বরে বললেন, ”তুমি এগুলোকে খ্রিষ্টীয় ক্রস বানিয়ে ফেলেছ। রেড ক্রসের ক্রসগুলোর চার বাহুই হয় সমান দৈর্ঘের।”
মেয়েরা ও আমি আবার নতুন করে শুরু করি এবং দ্রুতই আন্তর্জাতিক প্রতীকটির মোটামুটি চলনসই প্রতিকৃতি বানাতে সক্ষম হই। কিন্তু তারপরই আমি গাড়িপথের বাঁকটা দ্রুত ঘুরতে গিয়ে পতাকাদণ্ডটিকে দুই টুকরো করে ফেলি। আমার ফক্সওয়াগন পোকাটির ভোঁতা নাক সবসময়ই আঠামাখানো সেই টেপের দাগটি বহন করেই যাবে, যা দিয়ে আমরা রেড ক্রসের পতাকাটি শেষপর্যন্ত বাঁধতে পেরেছিলাম গাড়িতে।
আমি যেখানে গুলির ক্ষতের চিকিৎসা করছিলাম, হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম, এবং যাদেরকে বর্বরের মতো পেটানো হয়েছিল তাদের শরীরে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছিলাম, রিড তখন কাজ করছিলেন হারিয়ে যাওয়া মানুষদের সন্ধানকারী দপ্তরে। শত শত নাম জমা পড়ছিল যাদের খুব অল্প কজনকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল। প্রতিটি হৃদয়বিদারক গল্পেরই একইরকম বিন্যাস : গভীর রাতে দরজায় কড়ানাড়ার শব্দ, বাড়ির পুরুষদের বার করে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের সম্পর্কে আর কোনোকিছুই জানতে না পারা; কোনো এক দপ্তরে কি বাড়িতে হাজির হওয়ার একটি রহস্যময় নির্দেশ : মৃত্যুর সঙ্গে মোলাকাতের বিজ্ঞপ্তি।
গত নয় মাস যে-জায়গাগুলোতে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল সেগুলো ক্রমে খুলে দিয়ে পরিদর্শন করা হচ্ছিল।
দৃষ্টিনন্দন সার্কিট হাউসটি, যা একসময় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাত্রিবাসের স্থান ছিল, সেটি এক আতঙ্কের আখড়া হয়ে উঠেছিল। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছিল নির্যাতনের নানা যন্ত্রপাতি, লোকদের গুলি করে মারার জন্য নির্ধারিত বিশেষ স্থান ও গণকবর।
চমৎকার প্রাকৃতিক হ্রদ ফয়’স লেকের লাগোয়া পার্কটি, সেখানে আমাদের রবিবারের স্কুল পিকনিকগুলো হত, সৈন্যদের ব্যবহৃত ও অতঃপর পরিত্যক্ত মেয়েদের ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহে বোঝাই হয়ে ছিল।
নালাগুলো ফুলেফেঁপে ওঠা গলিত মৃতদেহে প্রায় বন্ধ গিয়েছিল। শহরের চারপাশে বিভিন্ন জায়গায় অগভীর গণকবর পাওয়া যাচ্ছিল যেখানে ফেলেদেওয়া লাশগুলো শেয়ালের খাদ্য হয়ে গিয়ে কেবল তাদের কঙ্কালগুলোই পড়ে ছিল।
কেউই কথা বলা বন্ধ করতে পারছিল না। স্বভাবত বাকপ্রিয় ও উদ্বায়ী স্বভাবের বাঙালিদের জন্য এতগুলো মাস মুখে কুলুপ এঁটে থাকা কঠিন ছিল বই কি। এখন সবাই-ই তাদের গল্প বলতে চাইছিল। আমরা প্রার্থনার মাঝখানে খ্রিষ্টানদের ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনেছি। তাদেরকে গির্জা থেকে বার করে নিয়ে গর্তের এক ধারে এবং হিন্দুদেরকে অন্য ধারে সারবেঁধে দাঁড় করানোর কথা শুনেছি। হিন্দুদেরকে গুলি করে গর্তে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল।
আমরা একটি মেয়ের কথা শুনি যাকে তার দাদির সুরক্ষা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আর্মি ব্যারাকে যাওয়া একটি জিপে তুলে নেওয়া হয়েছিল। সে কোনোমতে ড্রাইভারকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয় যে, তার পানির তেষ্টা পেয়েছে খুব। একটা হোটেলে ঢুকে তার মালিককে সে মিনতি করে তাকে বাঁচানোর জন্য। তিনি তার কথা শুনে তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন সাহসের সঙ্গেই। মিলিটারি তাঁকে মারধর করে, শেষ পর্যন্তও তিনি যখন মেয়েটি কোথায় তা বলতে অস্বীকার করেন, তখন তারা তাঁকে হত্যা করার জন্য তুলে নিয়ে যায়।
আমাদের হাসপাতালে একটি লোককে ভর্তি করা হয়েছিল যার মুখটা পুরো ঝলসে গিয়েছিল এবং যার ঠোঁটগুলো ছিল ছিন্নবিচ্ছিন্ন, সৈন্যরা তার ওপর এসিড ছুঁড়ে মেরেছিল কেননা তিনি তাঁর মেয়েকে তাদের হাতে তুলে দেননি। এখন বুঝতে পেরেছেন আমরা কেন আমাদের মেয়েদের নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম?
যারা শহর ছেড়ে পালিয়েছিল তারা পাতা ও শেকড়বাকড় খেয়ে বাঁচার কথা বলেছিল, যখন তারা টানা পনেরো দিন ধরে পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, কর্দমাক্ত খেত ও জলা ডিঙিয়ে হেঁটে গিয়েছিল। কেউ বলেছে, কোনো কোনো পরিবার তাদের সবক’টা শিশুকে বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি। যারা কোলে নেওয়ার জন্য বেশি ভারি অথচ আবার ভালো করে হাঁটতেও শেখেনি, তাদেরকে রাস্তার পাশে বসিয়ে রেখেই চলে যেতে হয়েছিল অনেককে; তাদের হাতে একটা বিস্কিট ধরিয়ে দিয়ে এই কথাটুকু বলে যে, মা তাদেরকে নিতে আসবে। তারা আর কখনোই আসেনি।
দৈনিক পত্রিকাগুলো মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন ছেপেছিল, যেমন এইটা, অ্যাডভোকেট সি. আর. দাশের লেখা, আমাদের নির্বাসনের দিনগুলোর চকিত বর্ণনা :
”তারা আরেকটি দলের অংশ ছিল, যারা নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের জন্য দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করে। দলে বিরাশি বছরের মা, তার ছেলে ও পুত্রবধূ, সঙ্গে পাকসেনাদের বর্বরতার শিকার হাজার দুয়েক মানুষ, যাদের গোটা গ্রাম অগুন লাগিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল ও অনেককে হত্যাও করা হয়েছিল।
”উঁচু পাহাড় ও বন্ধুর পথে টানা দুই দিনের হাঁটায় বৃদ্ধ মা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি আর নড়তে পারছিলেন না, কিন্তু নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের ঠিকানা ছিল আরও প্রায় একদিনেরও বেশি দূরত্বে।
”সেটা ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ই এপ্রিল সন্ধ্যা। বৃদ্ধাটি একটি গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি তাঁর ছেলে ও বউকে হাতের ইশারায় তাঁর কাছে আসতে বলেন, তারপর বলেন, তাঁর কোঁচকানো চিবুক বেয়ে তখন জল গড়িয়ে পড়ছিল, ’আমি আর যেতে পারব না। তোমরা আমাকে এখানেই রেখে এগিয়ে চলো।’ তিনি শ্বাস নেবার জন্য হাসফাঁস করছিলেন।
”ছেলে ও তার বউ তীব্রভাবে তার প্রতিবাদ করে এবং সঙ্গে অন্যেরাও। তারা তাঁকে সেখানে একা রেখে যেতে পারবে না। কিন্তু বৃদ্ধা তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, ’বোকামি কোরো না। এখন আবেগের কোনো সময় নেই। আমি আমার জীবন যাপন করেছি। তোমরা এখনও তরুণ। তোমাদের বাচ্চাদের ও বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবো। আমাকে এখানেই রেখে যাও। সকালেই শত্রুরা তাদের খুঁজে খুঁজে খুন করা অভিযান শুরু করবে। তারা বেশি দূরে নেই। আমাকে ছেড়ে তোমরা পালাও।’ তাঁর আর বেশিকিছু বলার শক্তি ছিল না।
”ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তারা সম্মতি দেয়। তিনি গাছের গায়ে হেলান দিয়ে ছিলেন, এবং দূরের পাহাড়ে যেখানে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারা একপাত্র মুড়ি ও খাবার জল রেখে যায় তাঁর কাছে। একে একে চোখে জল নিয়ে তারা বিদায় নেয়। বৃদ্ধা বিড়বিড় করে তাদের আশীর্বাদ করছিলেন।’
”কেউ জানে না তাঁর কী হয়েছিল; হয়তো কেউই জানবে না কোনোদিন। তিনি রাউজানের সেই অগ্নিদগ্ধ গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন।
কিছু কিছু গল্পে আবার হাসির খোরাকও ছিল। ঢাকায় একটা বিখ্যাত হিন্দু মন্দির ছিল, যেটি ছিল পর্যটক আগ্রহের স্থল। প্রথমদিকের হিন্দু নিধনপর্বেই এর পুরোহিতকে হত্যা করা হয়েছিল। মিলিটারি যখন তাদের এই মিথ্যাটিকে প্রচার করতে চেয়েছিল যে, ’সবই স্বাভাবিক আছে’; কোনো সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধেই কোনো নিধন অভিযান পরিচালিত হয়নি; তখন একদিন তারা সাধারণ সৈন্যদেরকে হিন্দু পুরোহিতের সাজে সাজিয়ে মন্দিরের সিঁড়িতে বসে ধ্যান করতে বলে। মিলিটারি গর্বিতভাবে বিদেশি সাংবাদিকদের এনে বলে, ’দেখুন নিজের চোখেই।’ সবকিছু পরিকল্পনা মতোই এগুচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে একজন পদস্থ অফিসারের আবির্ভাব হয় দৃশ্যপটে। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক হিন্দু পুরোহিত উঠে দাঁড়িয়ে তাদেরকে সশব্দে স্যালুট করে বসে!
আবারও আমরা আমাদের বন্ধুদের খোঁজখবর জানার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। ব্রিটিশ ব্যাপ্টিস্ট চার্চের ঈশ্বরতুল্য পাদ্রি, তাঁর স্ত্রী ও দুই কিশোরী কন্যা নিয়ে যুদ্ধের পুরোটা সময় চট্টগ্রাম শহরের একটি জনাকীর্ণ এলাকায় বাস করেছেন।
রেভারেন্ড সরদার ব্যাখ্যা করে বলেন, ”শহর থেকে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য যে-ভাড়া চাওয়া হচ্ছিল সেই টাকাটা আমাদের ছিল না। আমাদের তাই থাকতেই হয়েছিল। আমরা ওল্ড টেস্টামেন্ট বইয়ের ইসরাইলের সন্তান অধ্যায়ের সেই বর্ণনাটা পড়ছিলাম, যেখানে লেখা ছিল, তারা দরজার সামনে রক্ত ছিটিয়ে রেখেছিল এবং তাতে করে তারা বেঁচে গিয়েছিল।” নাটকীয়ভাবে দরজার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলে চলেন, ”আমরা আমাদের সুরক্ষার জন্য সেই রক্তের দাগকে কল্পনায় নিজেদের করে ভেবে নিয়েছিলাম। মিলিটারি বহুবার আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গেছে, কিন্তু ঈশ্বর তাদের চোখ অন্ধ করে রেখেছিলেন।”
আমাদের গির্জার তরুণদের মধ্যে নিখিলকেই আমরা খুঁজে পাই সবার শেষে। নিখিল নিজে ব্যাপ্টিজম করা একজন বিশ্বাসী, কিন্তু তার পরিবারের বাকি সবাই ছিল হিন্দু। নিখিলকে তার এক কলেজবন্ধুর বাড়িতে রেখে তারা সবাই দূরের এক দুর্গম গ্রামে পালিয়ে যায়। মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী হিসাবে নিখিলদের পরিবারের একটা ভালো বাড়ি ও দোকান ছিল। বাড়িটা লুট করে সবকিছু নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এমনকি পারিবারিক ছবিগুলোও, যেগুলোর কোনো মূল্য থাকার কথা নয় অন্যদের কাছে। ক্রিসমাসের ঠিক আগে আমরা কোলকাতার এক হাসপাতাল থেকে চিঠি পাই :
’ডিসেম্বরের শুরুতে আমি শহর থেকে জনাশতেক লোকের সঙ্গে পালাতে চেষ্টা করি। পথে হিন্দুদের গুলি করে মারার জন্য ভাড়া করা বিশ্বাসঘাতকদের একটি দল দ্বারা আক্রান্ত হই আমরা। আমার পিঠে ও পায়ে গুলি লাগে। আমার এক বন্ধু আমাকে সীমান্ত পর্যন্ত আট ন মাইল দূরের পথ কোলে করে নিয়ে যায়, যেখানে ভারতীয় সেনারা আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয় এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে।
আমি শিগ্রি ফেরার আশা করি।
খ্রিস্টপ্রাণ,
নিখিল
মিসেস দাস শহরে ফিরে তাঁর বাড়িটিকে গোছানোর কাজ শুরু করেন, যেটি কয়েক মাস ধরে মুক্তিবাহিনীর লুকানোর জায়গা হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। আমরা একসঙ্গে কান্নাকাটি ও আনন্দ প্রকাশ করি এবং অবশেষে জানতে পারি গত নয়টি মাস তাঁরা কীভাবে কাটিয়েছিলেন।
তিনি শহর ত্যাগ না করলে তাঁর পরিণতি কী হত তা নিয়ে ভয় পাবার যথেষ্ট কারণ ছিল তাঁর। তাঁর ও তাঁর স্বামীর শহরত্যাগের ঠিক দুসপ্তাহ আগে (র্যা চেল এর আগেই আমাদের সঙ্গে মালুমঘাট চলে এসেছিল) মিসেস দাসকে মেয়েদের একটি জমায়েতে দেশের আশু সংকট বিষয়ে কিছু বলতে বলা হয়েছিল।
”মুজিবের দাবি ঠিক ছিল,” মিসেস দাস বলেন, ”আমি তাঁকে শতভাগ সমর্থন করি। মহিলাদের কয়েকজন মিছিল করে মুজিবের প্রতি তাদের সমর্থন প্রকাশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই মেয়েদের অনেকেই আমার ছাত্রী ছিল বলে তারা জোর দিয়ে বলে, তারা আমার, মানে তাদের শিক্ষকের সামনে হাঁটতে পারবে না কিছুতেই। আমাকে তাই একটা ব্যানার দেওয়া হল, যেটা ধরে আমি একেবারে মিছিলের সামনে ছিলাম। অনেকেই তাদের শিক্ষকের কথা শুনেই মিছিলে যোগদান করে।”
এই ঘটনায় মিসেস দাস চিহ্নিত হয়ে যান। তার সঙ্গে যোগ করুন হিন্দুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নিষ্ঠুরতা, বিশেষ করে নারী নিপীড়নের বিষয়টা, ফলে মিস্টার ও মিসেস দাসের মালুমঘাটে পালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট কারণ ছিল।
”আমরা মালুমঘাটে পৌঁছাই, যেখানে লিন, জিনি, কেচামরা, ওল্সেনরা এবং আমাদের আরও অনেক বন্ধুই ছিল।
”ডা. ওল্সেন বলেন, ’আপনারা একটা শান্তিপূর্ণ জায়গায় এসেছেন। কেউ আপনাদের ক্ষতি করবে না। আপনার নিজের বাড়িতেই এসেছেন।’”
আমরা যখন তাড়াহুড়ো করে বার্মার ভেতর দিয়ে দেশত্যাগ করি, মি. ও মিসেস দাস তখনও মালুমঘাটে ছিলেন। আমরা তাঁদের বাকি গল্পটা শোনার জন্য উন্মুখ ছিলাম।
”অনেকেই আশ্রয়ের জন্য মালুমঘাটে ভিড় করছিল। কিন্তু ২৩শে এপ্রিল ডা. কেচাম ও ডা. ওল্সেন এসে আমাদের বলেন যে, মিলিটারি দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে এবং আমাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে, কেননা খানসেনারা নৃশংসভাবে শিকার সন্ধান করে তাদের খুন করছে। এই দুই ডা. চোখের জল ফেলছিলেন যখন তাঁরা আমাদের এই কথা বলছিলেন।
”ডা. ওল্সেন হাসপাতাল কর্মীদের, বিশেষ করে হিন্দুদেরকে আমাদের অরণ্যকেন্দ্র হেব্রনে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছিলেন, যখন তাঁর সেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাটি ঘটে। তাঁর ভাঙা হাত নিয়েও তিনি এইসব আয়োজন করে যাচ্ছিলেন।
”এরই মধ্যে আরও চারজন আমাদের সঙ্গে যোগ দেন, সবাই ডাক্তার; ড. পিটার ও রেবা ম্যাক্ফিল্ড এবং আর দুজন মুসলিম ডাক্তার। আমরা মোট এগারোজন ছিলাম, যখন আমরা বার্মার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি, সেখান থেকে ভারতে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে, যেখানে আমার এক ভাই ও বোন আর অনেক আত্মীয়স্বজন ছিল।
”আমি মালুমঘাট ছেড়ে যাবার দৃশ্যটার কথা কোনোদিন ভুলব না। আমাদের কি আর দেখা হবে?, এই প্রশ্নটাই আমাদের মনে খেলা করছিল। ডা. কেচাম আমাদের এই প্রস্থানে এতটাই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি আমাদের সামনে থেকে সরে গিয়ে কেবল কাঁদছিলেন আর কাঁদছিলেন।
”হাজার হাজার শরণার্থী চট্টগ্রাম ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে বার্মায় স্রোতের মতো গিয়ে ঢুকছিল। আমরা যেহেতু শিক্ষিত পেশাদার ছিলাম আমাদেরকে একটা সরকারি বিশ্রামাগারে থাকতে দেওয়া হল, তবে মাত্র একসপ্তাহের জন্য। তারপর আমাদের এগারোজনের সবাইকে একটা কুঁড়েঘরেই থাকতে হয়েছিল।
”ডা. কেচাম হাসপাতাল ছেড়ে-যাওয়া সকল শরণার্থীকেই একশত করে টাকা দিয়েছিলেন। আমরা তাঁর এই উদারতার জন্য কী কৃতজ্ঞই না ছিলাম। বার্মার সরকার আমাদেরকে মাত্র একমাসের চাল দিয়েছিল। আমরা সেখানে সাত মাস ছিলাম, কেননা আমাদেরকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না, এমনকি আমাদের আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও না।
”সেখানেই আমি ঈশ্বরকে এমনভাবে জানি যা আগে কখনও করিনি। আমরা অসুস্থ ছিলাম, অনেকেই রক্ত আমাশায় ভুগছিলেন। আমরা ক্ষুধার্তও ছিলাম। আমরা বার্তাবাহকের মাধ্যমে মালুমঘাটে আমাদের আসার কথা জানিয়ে ডা. কেচামকে চিঠি লিখেছিলাম, কিন্তু কয়েকমাস কেটে গেলেও আমরা কোনো উত্তর পাইনি। আমরা পরে জেনেছিলাম যে, তিনি আমাদের প্রত্যেকের চিঠির জবাব দিয়েছিলেন এবং সবাইকে টাকা ও রসদও পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ডাকপিয়নেরা তিনি যখনই যাকিছু পাঠিয়েছিলেন সেগুলো সবই লোপাট করে দিয়েছিল।
”এমনও দিন গেছে যখন আমাদের হাতে মাত্র পাঁচ টাকা ছিল। আমি প্রার্থনা করি, ’প্রভু আমাদের জন্য সাহায্য পাঠান, যদি আপনি চান আমরা এখানেই থাকি।’
”লিন তার মায়ের কাছে চিঠি লিখে বার্মার শরণার্থী শিবিরে আমার, ও ভারতে আমার ভাইয়ের ঠিকানা দিয়েছিল; লিনের মা আমাদেরকে টাকা পাঠিয়েছিলেন, এবং লিনের মায়ের মাধ্যমে আমার ভাইও আমাদেরকে দুটো আলাদা খামে টাকা পাঠিয়েছিল (যদি কোনো কারণে একটা খাম খোয়া যায়)। বেশ অনেকদিন লেগেছিল এই চেক ও আন্তর্জাতিক মানি অর্ডার ভাঙিয়ে টাকাটা হাতে পেতে, তবে শেষ পর্যন্ত তা পেয়েছিলাম আমরা।
”ব্যাংককে একটা অনুবাদ সম্মেলনে একবার আমার ও লিনের সঙ্গে দেখা-হওয়া বাইবেল সোসাইটির প্রতিনিধিকে লিখি আমাদের জন্য প্রার্থনা করতে। ঈশ্বরের প্রশংসা, তারা আমাদের জন্য প্রার্থনা করেছিল এবং আমাদের পার্থিব চাহিদার দিকেও নজর রেখেছিল। সব মিলিয়ে তারা আমাদেরকে ৭০০ টাকা পাঠিয়েছিল। ঈশ্বর আমাদেরকে তাঁর নিজের হাতেই রেখেছিলেন।
”এই সময়ে ঈশ্বর যখন আমাদের এই মরিয়া অবস্থা বিষয়ে সচেতন ছিলেন, তখন শয়তানও কিন্তু আমাদেরকে ছেড়ে কথা বলছিল না। আমাদের মাথায় এমন সব চিন্তা ভিড় করে এসেছিল যার কথা ভাবলে এখন আমি লজ্জা পাই। মিশনারিরা কেন আমাদেরকে পরিত্যাগ করেছে? তারা কেন আমাদের চিঠির উত্তর দিল না? আমি এইসব অন্তরের উদ্বেগের সঙ্গে লড়াই করে এক পর্যায়ে উপলব্ধি করি, আমার ফিরেই যাওয়া উচিত। আমি এটা নিয়ে প্রার্থনার পর প্রার্থনা করছিলাম। এর পরেই এল মালুমঘাটের প্রথম চিঠি। মি. ওয়াল্শের চিঠি। ’ফিরে আসুন,’ তিনি লিখেছিলেন, ’আমরা আপনাদের দেখভাল করব।’
”তবে সে এক ফেরাই বটে! আমি দৃঢপ্রতিজ্ঞ ছিলাম ফিরেই যাব। ’এমনকি তারা যদি আমাকে মেরেও ফেলে,’ আমি বলি। কেননা আমরা শুনেছিলাম লোকেরা পূর্ব পাকিস্তানে ফিরতে চেয়েও মারা পড়েছিল। দুই মুসলিম ডাক্তার থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং বাকি নয় জন, না দশজন, কেননা ম্যাকফিল্ডদের বাচ্চাটা তো বার্মাতেই জন্মেছিল – সীমান্তের উদ্দেশে যাত্রা করি।
”মি. ওয়াল্শ এক দূতকে দিয়ে আমাদের জন্য দুইশত টাকা পাঠিয়েছিলেন, এবং সেটা আমরা পেয়ে যাই! মালুমঘাটে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে এটা কী ভূমিকাই না রেখেছিল! কিন্তু তার আগে আমাদের সামনে অন্য বিপদও অপেক্ষা করছিল। আমরা আশা করেছিলাম যে, মি. ওয়াল্শ বা অন্য কেউ মালুমঘাটের আমাদের সঙ্গে সীমান্তে দেখা করবেন, কিন্তু এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে তাঁরা তা করতে পারেননি। তাঁরা আমাদের নিরপাত্তার জন্য বাকি সব ব্যবস্থাই করেছিলেন। অনেক ফেরত-আসা শরণার্থীকে ’অভ্যর্থনা কেন্দ্রে’ নিয়ে গিয়ে মারধর করে মেরে ফেলাও হয়েছিল।
”আমরা এমন একটা জায়গা দিয়ে বার্মা সীমান্ত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করি, যেখানে কেবল একটা সরু খাল দুটো দেশকে পৃথক করে রেখেছিল। একবার এপাশে চলে আসার পর আর কোনো যানবাহন পাওয়া যাচ্ছিল না। বেশ কয়েকটা বাস এসেছিল, কিন্তু তারা আমাদেরকে নিতে রাজি হয়নি। আমরা কীভাবেই না প্রার্থনা করেছিলাম! এবং ঈশ্বর তার জবাব দিলেন – একটা খালি বাস। তার ড্রাইভার আমাদেরেক নিতে রাজি হয়েছিল, কেননা মিশনারিদের পাঠানো দুইশত টাকার বদৌলতে আমরা ভাড়া হিসাবে সে যা চেয়েছিল তা-ই তাকে দিতে পারছিলাম। তবে সে আমাদের জানাল যে, তার একটা টায়ারের অবস্থা বেশ খারাপ, সেটা যদি কোনো কারণে ফেটে যায় তাহলে সেটা ঠিক করার জন্য যে-কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে সেটুকু সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু কী দশা হবে, সেটা যদি কোনো লোকালয়ে ফাটে? কী হবে যদি পাকসেনারা সেখানে চলে আসে? তারা আমাদের নির্ঘাৎ মেরে ফেলবে। তারা আমার খোঁজে ছিল আমি জানতাম।
”আমরা ভাবলাম দেখিই না একটা ঝুঁকি নিয়ে, ঈশ্বর নিশ্চয়ই আমাদের রক্ষা করবেন, এই ভরসায়। আমরা বুঝেছিলাম তিনিই এই খালি বাসটা পাঠিয়েছেন – একেবারে অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা। মাইলের পর মাইল প্রভু সেই টায়ারেই আমাদের এগিয়ে নিয়ে চললেন। আর তারপরই আমাদের ভয় সত্য প্রতীয়মান হয়। পাঞ্জাবি পুলিশ আমাদের থামালো। তারা জিজ্ঞাসা করল আমরা কোথায় যাচ্ছি।
” ’মালুমঘাটে,’ আমরা জবাব দিই।
” ’আপনারা কি সবাই রোগী?’ তারা আরও জানতে চায়।
”আমি জবাব দিই, ’না আমি মিশনারিদের সঙ্গে সেখানে কাজ করি।’
” ’আপনি সেখানে যেতে পারবেন না,’ তারা উত্তর দেয়। ’আপনাকে কক্সবাজারে ফিরে যেতে হবে।’
”ফিরে যাও! সেটার অর্থ কেবল একটাই। তারা আমাদের সবাইকে হত্যা করবে। কিন্তু ঈশ্বর আমাদেরকে তাঁর হাতের মধ্যে রেখেছিলেন। ঠিক তখনই আমার স্বামী একটা ছোট আশ্রয়মতো জায়গার দিকে এগিয়ে যান এবং সেখানে দুজন বাঙালি পুলিশ ছিল, আমার স্বামী তাদেরকে পাঁচ টাকা সাধেন। তারা আমাদের হয়ে তদবির করে এবং পাঞ্জাবিরা আমাদের ছেড়ে দেয়! টায়ারটি এর পরে ঠিকই ফেটেছিল, কিন্তু ততক্ষণে আমরা একটা নির্জন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলাম।
”আমি মালুমঘাটে আগমনের কথা কোনোদিন ভুলব না। আমাদের ও বন্ধুদের কী আনন্দই না হয়েছিল যখন আমরা তাদের বলি ঈশ্বর কীভাবে আমাদেরকে হাতে ধরে রক্ষা করেছিলেন! ঢাকা ও চট্টগ্রামে যেসব ভয়াবহ ঘটনা ঘটছিল আমরা তার গল্প শুনতে থাকি। লিন ’একদিনের জন্য এসেছিল’ যাতে করে আমরা আমাদের অনুবাদপ্রকল্প নিয়ে কথা বলতে পারি এবং একে অপরের সঙ্গে উল্লাস করতে পারি, কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সে চট্টগ্রামে আর ফিরে যেতে পারেনি। আমি কাঁদছিলাম আর প্রার্থনা করছিলাম, ’হে ঈশ্বর, আমার দেশটার কী অবস্থা করেছে? আপনি কি আমাদের লোকদের মুক্ত করে দেবেন না? এবং তার ঠিক এক সপ্তাহ পরেই – স্বাধীনতা!”
(চলবে)
Share Now শেয়ার করুন