জয়া চৌধুরী | স্প্যানিশ যাদুপৃথিবীর টানে | হিস্পানি সাহিত্যে ‘পান’ ও ফ্রান্সিস্কো কেভেদো এবং মারিও বেনেদেত্তি

0
115

হিস্পানি সাহিত্যের একটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘পান’ বা দ্ব্যর্থক বা বহুকৌনিক বিরোধাভাসধর্মী কৌতুক। এই পান ও ব্যঙ্গাত্মক লেখালেখির জন্যে প্রখ্যাত দুজন লেখককে নিয়ে এই লেখা। স্প্যানিশ সাহিত্যের এই দিকটি যাঁদের জানা নেই তাঁরা এ সম্পর্কে জানতে পারবেন।

স্প্যানিশ সাহিত্য না বলে বলা ভালো সম্পূর্ণ হিস্পানিক সাহিত্য যার হাত ধরে বিশ্ব বিজয় করেছিল তিনি হলেন মিগেল সেরভান্তেস সাভেদ্রা। আর ঘোড়া রোসিনান্তে-র লাগাম যার মুঠোয় ধরা ছিল তিনি হলে সেরভান্তেসের উপন্যাসের নায়ক দন কিহোতে। সেরভান্তেস যে যুগে সাহিত্য রচনা করতেন ঠিক সেই সময়েই ইংল্যান্ডে লেখালেখি করছিলেন উইলিয়াম শেক্সপীয়র। স্প্যানিশ সাহিত্যের সেই যুগটাকে বলা হয় স্বর্ণ যুগ। ১৪৯২ সালে তিনখানি জাহাজ ভর্তি নাবিক এবং তরোয়াল এবং খ্রিস্টধর্ম নিয়ে “নতুন পৃথিবীর” খোঁজে কলম্বাস স্পেন থেকে রওনা দিলেন, এবং তার ফলাফল হিসাবে সাহিত্যেও শুরু হল পালাবদল। তৎকালীন স্পেনে ইহুদী ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম ও মুসলমান ধর্মের মিশ্র প্রভাব ছিল। স্বর্ণ যুগ হল হিস্পানি সাহিত্যের ‘মানবিকতা’র যুগ থেকে ‘যুক্তিময়তা’র রীতিতে রূপান্তরের যুগ। সেই যুগের সৃষ্টিশৈলীকে মূলত দুভাগে ভাগ করতে পারি। একটি হল রেনেসাঁ-রীতি আর অন্যটি বারোক রীতি। রেনেসাঁর শ্রেষ্ঠ নামটি তো আগেই বলেছি। বারোকের শ্রেষ্ঠ নামটি তর্কযোগ্যভাবে ফ্রান্সিস্কো দে কেভেদো। একজন চিন্তক ও অত্যন্ত উঁচু মানের কবি হওয়া ছাড়াও কাস্তিলীয়ঁ ওরফে স্প্যানিশ ভাষায় তাঁর অসামান্য দখলের জন্য এবং চূড়ান্ত প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের ব্যবহারের কারণেও তিনি চিরস্মরণীয়। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে তার সাক্ষর পাওয়া যায়। ভাষাকে কীভাবে ভেঙেচুরে লিখতে হয় তিনি তার কৌশলের চরম উৎকর্ষে পৌঁছেছিলেন। কেভেদোর জন্ম হয়েছিল ১৫৮০ সালে স্পেনের আজকের রাজধানী মাদ্রিদে। ১৪৯২ সাল থেকে ১৫৮০ সাল, খেয়াল করলে বোঝা যাবে তখন নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের একশ বছর অতিক্রান্ত প্রায়, দোন কিহোতে তখনো লেখা হয় নি কিন্তু তার প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে। ১৬০৫ ও ১৬১৫ দু খণ্ডে বের হয় দোন কিহোতে।

খুব কম বয়স থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করেন কেভেদো। যা পরবর্তীকালে বারোক রীতির আরেক প্রবাদপ্রতিম কবি গোঙ্গোরার সঙ্গে জীবনব্যাপী শত্রুতায় পরিণত হয়। আসলে গোঙ্গোরা ছিলেন লিরিক্যাল কবি আর কেভেদো মূলত স্যাটায়ারধর্মী ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখতেন। শব্দের কারিকুরি আর মাঝে মাঝেই কথার মাঝে ‘পান’ ঢুকিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর কাছে বাঁ হাতের খেল। গোঙ্গোরা ছিলেন দীর্ঘনাসা কবি। এবার তাঁর চির শত্রু কেভেদোর কবিতাটি এখানে তুলে দিচ্ছি, দেখুন –

এক ছিল মনিষ্যি সাথে নাকখানি সাঁটা,
এক ছিল নাসিকা মহীয়ান সে,
এক ছিল নাসিকা জল্লাদ, সেও বটে লেখে,
এক ছিল তরোয়াল মাছ, বড় দাড়িওয়ালা।

এক ছিল রবিঘড়ি বদ নামে ডাকা,
এক ছিল আবগার ভাবুক বেচারি,
এক ছিল মুখ নিচু হাতিখান দিব্যি,
নাম তার ওভিদিও বড় নাসা নাকোয়ালা।

এক ছিল জাহাজের র্যা ম নামের যন্তর,
এক ছিল মিশরের পিরামিড হয়ত বা,
বারো জেতে নাকুরের বটে সেই একখানা।

এক ছিল নাকসম্রাট অন্তহীন আকার,
অনেকানেক নাক, আহা হিংসে নাক ভরা,
আনাসের মুখের ওপর ভয়ানক পাপ।

আনাস ছিলেন রোমান পুরোহিত। সেনাপতি পন্টিয়াকের কাছে যিশুখ্রিস্টকে বিচারের জন্য নিয়ে আসা হয় একথা সকলে জানেন। তার পরে এই পুরোহিতকে আনা হয়েছিল বিচারের জন্য।
কেভেদোর আর একটি বিখ্যাত সনেট লা পোব্রেসা বা ‘গরিবিয়ানা’ থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তবক তুলে ধরছি। দেখুন পাঠক –

গরিবিয়ানা, টাকাপয়সা

বেশ সত্যিটা তেতোই
আমি মুখ থেকে তা ওগরাতে চাই
আত্মাকে যদি ওর পিত্ত ছোঁয়
সত্যিটাকে লুকোনো বোকামি।
হয়ত জানা থাকতে পারে, ইয়ে, স্বাধীনতা
আমার আলসেমির ফাঁকে জন্ম দিতে পারে :
গরিবিয়ানা।

জ্ঞান না দিয়ে কে বানায়
একচোখো প্রাজ্ঞ নাগর?
কে টাকার কাঙাল বুড়োর কাছে
জর্ডন নদীর জলের মত করে?
প্রকৃত ঈশ্বর না হয়ে
কে বানায় পাথুরে রুটি?
টাকাপয়সা।

কেভেদোর পা কিছুটা বাঁকা ছিল, নারীবিদ্বেষী, অথচ বেশ্যাবাড়ি ও পানশালায় যাওয়া মানুষ। আবার এই মানুষটাই ধর্মীয় বা রাজনৈতিক লেখাও লিখেছেন অনেক। পাঁড় ব্যঙ্গ রচনাকার মানুষটির প্রচুর শত্রু ছিল। যদিও তাঁর চারপাশে ঘিরে থাকত ডিউক অফ লেরমা ও অসুনার মতো অভিজাত ও বিদ্বান সব মানুষজন। এই ডিউক অফ লেরমা ছিলেন স্পেনের রাজা তৃতীয় ফিলিপের সহকারী। কিন্তু ওনারা ইটালিতে অনেক রাজবিরোধী কর্মকাণ্ড করেছিলেন। এমনকী ভেনিসে গুপ্তচরগিরির অভিযোগ ও ছিল তাঁদের নামে। কেভেদোর ঘনিষ্ঠতা এদের সঙ্গেই ছিল। পরস্পর বিরোধী বহু শিরোপা তাঁর মাথায় চড়েছে বারবার। ব্যঙ্গ কবিতার জন্য তাঁকে নানা বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে – “ভুলের রাজা, নির্লজ্জপনায় ডক্টরেট, ভাঁড়ামি বিশেষজ্ঞ, নোংরামোয় গ্র্যাজুয়েট, বদ্গুণের অধ্যাপক, মানুষের মধ্যে থাকা ছদ্মবেশী দানব ইত্যাদি।” কিন্তু এতটা পরিপূর্ণ সাহিত্যিক বোধহয় আর পাওয়া যাবে না। নিচের নমুনাগুলি দেখুন :

“El que quiere de esta vida todas las cosas a su gusto, tendrá muchos disgustos”.
যে জীবন থেকে সব কিছু পছন্দসই চায়, তারই জোটে অপ্রতুল অপছন্দ।
“Nadie ofrece tanto como el que no va a cumplir”.
যে কথা রাখবে না তার চেয়ে বেশি কেউ কথা দেয় না
“La soberbia nunca baja de donde sube, pero siempre cae de donde subió”.
অহংকার যেখান থেকে বেড়ে ওঠে তা থেকে কখনও নামে না, কিন্তু তার সবসময় পতন হয় যেখান থেকে চড়েছিল।
“Las palabras son como monedas, que una vale por muchas como muchas no valen por una”.
শব্দ হল মুদ্রার মত, যা একটা দিয়ে অনেককিছু বোঝানো যায় কিন্তু অনেক শব্দ দিয়েও এককে বোঝানো যায় না।
Menos mal hacen los delincuentes que un mal juez”.
আসামীরা যত ক্ষতি করে তার চেয়ে একজন খারাপ বিচারক অনেক বেশি ক্ষতি করেন।
Donde hay poca justicia es un peligro tener razón”.
যেখানে বিচার নেই সেখানে যুক্তিবুদ্ধি থাকা বিপদ।
“El valiente tiene miedo del contrario; el cobarde, de su propio temor”.
সাহসীর ভয় থাকে বিরুদ্ধতাকে, কাপুরুষের ভয় তার নিজের ভীতিকে।

কেভেদো যেমন স্পেনীয় রসসাহিত্যের সম্রাট ঠিক তেমনই বুম যুগের হিস্পানিক সাহিত্যের হিউমারের উজ্জ্বল নাম উরুগুয়ের মারিও বেনেদেত্তি। সাহিত্যে হিউমারের সঙ্গে সমালোচনা মেশানোয় তার জুড়ি মেলা ভার। সদ্য শতবার্ষিকী পেরনো এই মহান সাহিত্যিক জীবনে ৮০টির বেশি বই লিখেছেন। আমি তাঁর দুটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করব। পান, হিউমার যেখানে ছত্রে ছত্রে পাঠককে রসে জারিত করে – La tegua , El ejercicio del criterio। প্রথমটি তাঁর বহু চর্চিত উপন্যাস হলেও দ্বিতীয় বইটি তাঁর চার দশকের লেখা প্রবন্ধের সংকলন। প্রবন্ধ কত সরস হয় তাঁর উজ্জ্বল উদাহরণ এই বইটি। এবং সমালোচকদের মতে এটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তিও বলা যায়। কিন্তু বলতে গেলে সব লেখাতেই ছত্রে ছত্রে উইট ও হিউমারের সহাবস্থান। কার্লোস ফুয়েন্তেসের মতই বেনেদেত্তিও বহু শব্দ উদ্ভাবন করেছেন, যা তাঁর একান্ত পাঠক হলেই বুঝতে পারবেন। এই যেমন এই শব্দটি – zoomiótica – এর অর্থ মানুষের করা বিভিন্ন ধরনের কাজের সঙ্গে জন্তুর স্বভাবকে মিলিয়ে দেখা। El puercoespín mimoso বা আহ্লাদী সজারু নামের এই গল্পটি বহু নন্দিত। এর শুরুতেই রয়েছে মহাজ্ঞানী ছাত্রদের কোন এক স্কুলে একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রছাত্রীদের বলছেন – “… আমি তোমাদের বিভিন্ন তথ্য, উদ্ধৃতি, আচরণ বলব তোমাদের খুঁজে বের করবে এর সঙ্গে মানানসই চিড়িয়াখানার শব্দের রূপকগুলি।” গল্পের শুরুই হচ্ছে তির্যক দৃষ্টি দিয়ে। পড়তে পড়তে এক জায়গায় দেখি লিখছেন, “আমরা দেখছি তাহলে সেন্যোরিতা সিলভিয়া – একজন রাজনীতিক যত জনপ্রিয় হন ততই সম্পত্তির অধিকারী হন, তিনি যখন কোন গরিব মানুষ প্রসঙ্গে উদ্ধৃতি দেন তখন গলার স্বর প্রায় মাটি ঘেঁষা আওয়াজে বলেন। কুম্ভীরাশ্রু! এক্কেবারে তাই , সেন্যোর রোদ্রিগেস আপনি যখন টিভিতে দেখেন ছাত্রদের একটা নির্দিষ্ট হত্যা করা হচ্ছে – গায়ে মুরগীর ত্বক লাগিয়ে নিই, ব্যস।” কিংবা আর একটি জায়গায় দেখছি, “ধরুন, একজন গ্যাংস্টার যদি দুটো ব্যাংক লুট করার পরে বাড়ি ফিরে আসে। তারপর যুবতী বউয়ের আদর আর যত্নে ডুবে যায় তাঁকে আপনি কী বলবেন? – এটা বলা কঠিন প্রফেসর। আমরা দেখছি কী বলা যেতে পারে… এটাকে বলতে পারি আহ্লাদী সজারু। চলবে?”

হিস্পানিক সাহিত্যে স্যাটায়ার অনেকের লেখাতেই পাওয়া গেলেও হিউমারের তত প্রতুলতা নেই। কিন্তু বুম যুগের সাহিত্যিকদের মধ্যেও উজ্জ্বল মারিও বেনেদেত্তি। এই সাহিত্যে জীবনের কঠিন বাস্তবের মধ্য থেকে রস যারা তুলে আনেন তাদের জানতে হলে বাঙালি পাঠককে এদের পড়তেই হবে।

 

 

Share Now শেয়ার করুন