জয়া চৌধুরী >> স্প্যানিশ যাদুপৃথিবীর টানে >> গদ্য

0
488

স্প্যানিশ জাদু পৃথিবীর টানে

পর্ব ১
“ভালবাসি, বিষণ্ণ, বিকেলে স্বপ্ন দেখা, সময় যখন ঝনঝন ঝরে পড়ে,
বসন্তের সুগন্ধ মাখা বাতাস সাথে নিয়ে
অথবা একঘেয়ে ঝিরঝির বৃষ্টি হিম হিম শীতকালে,
ঘণ্টাধ্বনি বয়ে আনে এক নির্মল প্রাণবন্ত শব্দ।
নিজেকে কল্পনা করি ব্রেতোনের এক সমুদ্রতীরে
সোনালি বালুরাশি ও বিপুল সে সমুদ্র এক
ওইসব সমুদ্রহরিৎ ঢেউয়ের শব্দ ও ফেনারাশির পৃষ্ঠদেশে
এবং অন্তহীন সে ঢেউয়ের অভিযোগ বারংবার মন্দ্রিত হয় কানে।
গ্রীষ্মের ওইসব দৃশ্যদের ভালবাসি আমি উষ্ণ সূর্য যেখানে ঝিকমিক করে,
আলোয় মাতাল পাখি কিচিরমিচির করে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে,
ওষধি আরকের মতো সুগন্ধী ফুল মেখে রাখে চারিপাশ আর প্রেইরী দিগন্ত এতখানি সবুজ!
কিন্তু আমার মরমী আত্মায় সবচেয়ে নিকটে তাই পৌঁছায় এসে,
যা তাকে কাঁদায় ও বিমুগ্ধ রাখে
এইই শুনতে থাকা, ওহ রোস্ত্রাঁ, স্তবকে গান গেয়ে যাওয়া ওঁর আত্মা।”
ব্রেতান্যিয়া ফ্রান্সের একটি নগরী।
আর্জেন্টিনার ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর এই কবিতাটি আবিষ্কৃত হয়েছিল ২০০৮ সালে। ‘সুর’ বা দক্ষিণ নামের বিশ্বখ্যাত সাহিত্য পত্রিকার ফাউন্ডেশন এটি আবিষ্কার করেন সে-বছর। ফরাসি কবি ও নাট্যকার এডমন্ড রোস্ত্রাঁর উদ্দেশ্যে কবিতাটি লিখেছিলেন ওকাম্পো। তাঁর ষোল বছর বয়সে লেখা এই সনেট পড়ে বোঝা যায় কেন তিনি পরবর্তী পঞ্চাশ বছর ধরে হিস্পানিক সাহিত্যের দুনিয়ার এক অতি উজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন সম্পাদনার মাধ্যমে। ‘সু’র পত্রিকায় সমাবেশ ঘটাবেন দার্শনিক ওর্তেগা গাসসেত, কবি খোর্খে লুইস বোর্খেস ইত্যাদি অজস্র স্পেনীয় ভাষার মহীরুহ লেখক, দার্শনিকদের। ওকাম্পো নাম বাঙালি শুনেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সূত্রে। বান্ধবীকে দেয়া তাঁর ‘বিজয়া’ নাম, তাদের সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে বাংলা ভাষায় কতই না লেখা হয়েছে। আসলে বাঙালি পাঠক স্প্যানিশ ভাষার বহু বিখ্যাত কবি ও লেখকের অনুরাগী বহু বছর ধরেই। ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে প্রায় এক শতাব্দীর গপ্পো সেসব কিংবা আরও বেশি। ১৯২৪ সালে নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার অনেক বছর পরে রবীন্দ্রনাথ যখন পেরু যাত্রা করেছিলেন, মাঝপথে যাত্রা স্থগিতে করে আর্জেন্টিনায় চলে গিয়েছিলেন। এবং তখনই দক্ষিণ আমেরিকার পাঁচটি দেশে পঞ্চাশ বছর ধরে চলা ‘সুর’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অভিজাত ওকাম্পো পরিবারের সবচেয়ে বড় মেয়ে ভিক্টোরিয়ার একটি বাগানবাড়িতে আতিথ্য নেন। দুমাস থেকে দেশে ফিরে আসেন। বয়সে অনেক ছোট অনুরাগী ও বন্ধু ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে সে এক অপূর্ব সখ্য গড়ে উঠেছিল তাঁর। রবি-অনুরাগী বাঙালি অবশ্য এখনই বলে উঠবেন ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’গানটা তো ওঁকে ভেবেই লেখা। কথাটি একেবারেই কল্পনা। আদতে গানটি লেখা হয়েছিল ১৮৯৫ সালে আর কবি আর্জেন্টিনা গিয়েছিলেন ১৯২৪ সালে। ততদিনে ভিক্টোরিয়া তাঁর সঙ্গী লুইস বেরনার্দোর সঙ্গে দশ বছর সহবাসের পরে ১৯২২ সালেই আলাদা হয়ে গিয়েছেন। ওকাম্পোর সঙ্গে পরিচয়ের আগেই ১৯১২ সালে লেখা জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন -“বহু বাল্যকালে একটা গান শুনিয়াছিলাম “তোমায় বিদেশিনী সাজিয়ে কে দিলে!” সেই গানের ঐ একটিমাত্র পদ মনে এমন একটি অপরূপ চিত্র আঁকিয়া দিয়াছিল যে, আজও ঐ লাইনটা মনের মধ্যে গুঞ্জন করিয়া বেড়ায়। একদিন ঐ গানের ঐ পদটার মোহে আমিও একটি গান লিখিতে বসিয়াছিলাম। স্বরগুঞ্জনের সঙ্গে প্রথম লাইনটা লিখিয়াছিলাম, “আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী”- সঙ্গে যদি সুরটুকু না থাকিত তবে এ গানের কীভাব দাঁড়াইত বলিতে পারি না। কিন্তু ঐ সুরের মন্ত্রগুণে বিদেশিনীর এক অপরূপ মূর্তি মনে জাগিয়া উঠিল। আমার মন বলিতে লাগিল, আমাদের এই জগতের মধ্যে কোনো একটি বিদেশিনী আনাগোনা করে, কোন রহস্যসিন্ধুর পরপারে ঘাটের উপরে তাহার বাড়ি, তাহাকেই শারদপ্রাতে মাধবীরাত্রিতে ক্ষণে ক্ষণে দেখিতে পাই হৃদয়ের মাঝখানেও মাঝে মাঝে তাহার আভাস পাওয়া গেছে, আকাশে কান পাতিয়া কখনও তাহার কন্ঠস্বর কখনও বা শুনিয়াছি। সেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশ্ববিমোহিনী বিদেশিনীর দ্বারে আমার গানের সুর আমাকে আনিয়া উপস্থিত করিল এবং আমি কহিলাম –
ভুবন ভ্রমিয়া শেষে
এসেছি তোমারি দেশে,
আমি অতিথি তোমারি দ্বারে, ওগো বিদেশিনী।”
এতক্ষণ উদাহরণ এল সাহিত্যের। আসলে বাঙালির কাছে স্প্যানিশ ভাষা মানেই লাতিন আমেরিকার সাহিত্য, চে গেভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, দিমোন বলিভার, সালভাদোর আইয়েন্দের রাজনীতি, খোসে মার্তির গুয়ান্তানামেরা সঙ্গীত ইত্যাদি এবং অনেকখানি আবেগ। এমনকি বাঙালির সঙ্গে লাতিন মানুষের চেহারার মিলও যেন অনেকখানি। সম্প্রতি কোভিড ভাইরাসের অতিমারী আক্রমণের মাঝেই হন্ডুরাস- নিকারাগুয়া-কলম্বিয়ার সীমান্তে একটি ভয়াবহ সাইক্লোন আসে। তখন দেখেছি নিকারাগুয়া ও হন্ডুরাসের ভগ্ন পল্লীরূপ। বলে না দিলে বোঝা সম্ভব নয় উপমহাদেশের গ্রামীণ কোন দৃশ্য দেখছি কী না। অতএব প্রকৃতিও আমাদের এক করেই রেখেছে। মজার কথা হল সে ভূমির আদিম জনজাতিকে “ইন্ডিয়ান” বলে সম্বোধন করা হয় সেখানেও মূলে ছিল একটি আশ্চর্য ভুল। ১৪৯২ সালে কলম্বাস যখন ভারতবর্ষের খোঁজে জাহাজ অভিযানে বের হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা আবিষ্কার করেন তখন এই জনজাতিদের দেখে ভুল করে ভেবেছিলেন ভারতে এসে গেছেন। তাই তাদের নাম দেন ইন্ডিয়ান। এত কিছুই যদি “কাকতালীয়” ঘটনা পাশাপাশি ভাবা যায় তাহলে লাতিন দুনিয়াকে বাঙালিরা একটু বাড়াবাড়ি ভালবেসে ফেললেও অবাক হবার কিছু নেই।
ইদানীং ভাষাটি শিক্ষার ক্ষেত্রে বলা যায় জোয়ার এসেছে সে ছবি আগ্রহী মাত্রেরই চোখে ধরা পড়বে। তার কারণ হিসাবে অনেক কিছুই বলা যায় । মোক্ষম কারণটি তো আসলে অর্থনৈতিক। ভাষা সর্বকালেই অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত। সে আপনি যতই কাব্যি করুন গপ্পো লিখুন ভাষার শুরু তো প্রয়োজন থেকে। মনের ভাবটি প্রকাশ করব বলেই না ভাষার আশ্রয় নিই। তার পর দেখি সেই ভাষা আমার অন্ন জোটাতে সুবিধা করে দেয় কী না। আজকের পৃথিবীতে মাতৃগর্ভ থেকে বের হবার পরমুহূর্ত থেকেই শুরু হয়ে যায় সে খোঁজ, সকলেই জানে। কিন্তু বিদেশি ভাষা শেখা? একটু চোখ মেলে রাখলেই ধরতে পারবেন আজকাল ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নিয়মিত পড়াশুনার পাশাপাশি বিদেশি ভাষা শেখার দারুণ ঝোঁক এসেছে। যে সব ভাষা শেখার চাহিদা তুঙ্গে তাদের মধ্যে একেবারে প্রথম তিনটি ভাষার মধ্যে উঠে এসেছে স্প্যানিশ। এই তো সেদিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করল যে তাদের দেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ব্যবহারকারী ভাষা হল স্প্যানিশ। আর ভাষাটির গুরুত্ব বাড়ার আরো একটি মোক্ষম কারণ হল গোটা দুনিয়ায় একুশটি দেশ এ ভাষায় কথা বলে। ওদিকে সাহিত্যের এগারোটি নোবেল পদক পেয়েছে এই একটি ভাষার সাহিত্যই। সুতরাং সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক দুটি কারণই মোক্ষম।
যখন প্রথম দিন স্প্যানিশ ক্লাসে যাই ভাবতেও পারি নি তা এতদিন ধরে পড়েই যাব। এবং আজ আপনাদের ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর লেখা একটি কবিতাও অনুবাদ করে পড়াব। তিনি অবশ্য কবিতা খুব কম লিখেছেন, অধিকাংশই প্রবন্ধ। কিন্তু এত কিছু একদিনে ঘটেনি। ভাষাটি বড়ই মধুর। বাংলা বা ফরাসির তুলনায় কম মিষ্টি নয় এ-ভাষার ধ্বনি মাধুর্য। আর হবে নাই বা কেন! এর মূল যে লুকিয়ে লাতিন ভাষাতে। পৃথিবীর আদি ভাষাগুলির মধ্যে একটি হল লাতিন। বাঙালি জানে বাংলা ভাষার মূল সংস্কৃতের কথা। বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্রের বাংলা পড়লে টের পাওয়া যায় সংস্কৃতের উচ্চারণ ঝংকারের রেশ কতখানি! ঠিক তেমনই লাতিন ভাষার মাধুর্যও যারা প্রাচীন গ্রীক রোমান ইত্যাদি ভাষা চর্চা করেন তারা বুঝতে পারেন। পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্য পতনের পরে শুদ্ধ লাতিন ভাষার চর্চা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তখন স্পেনের কাস্তিলিয়া প্রদেশে রোমান-কাস্তিলিয়ান নামের একটা ভাষার উদ্ভব হতে থাকে, এটিই স্প্যানিশ ভাষার পূর্বসূরি। কারণ স্পেন তখন রোমান সাম্রাজ্যের অঙ্গ ছিল। যার জন্য এখনো স্পেনে গেলে প্রাচীন রোমান কলোসিয়াম দেখতে পাওয়া যায়। কলোসিয়াম মানে বহু আসন বিশিষ্ট আম্ফিথিয়েটার মানে প্রেক্ষাগৃহ আর কী। ভীষণ রকমের রোমানীয় ব্যাপার এটি। স্প্যানিশ আসলে রোমান ভাষা ও লাতিন ভাষার একটি মিশ্রণ। অথবা বলা যেতে পারে রোমান ভাষাগোত্রের অন্যান্য যে সব ভাষা আছে তার মধ্যে স্প্যানিশও আছে। ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি শাখা হল রোমানীয় শাখা। তার মধ্যে স্প্যানিশ ভাষাটি প্রকৃতপক্ষে ইতালীয় ইত্যাদি আরো কটি ভাষার মতন “অশুদ্ধ লাতিন” ভাষার শাখা থেকে উৎপন্ন । মনে করা হয় ত্রয়োদশ শতক থেকে এ ভাষার উৎপত্তি। বলতে গেলে অনেক পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করতে হয় এ বিষয়ে, কীভাবে স্পেনে ভাষাটির উপরে আরবের মুসলমান শাসকদের প্রভাব পড়েছিল, অস্তগামী রোমান সাম্রাজ্যের অবশেষ কিভাবে প্রভাব ফেলেছিল অথবা রোমানের সঙ্গে ভাস্কো ভাষার সংমিশ্রণই বা কিভাবে ঘটেছিল। সংক্ষেপে বলি, দীর্ঘ পরিমার্জন ও পরিবর্তনের পরে ১৪৯২ সালে কলম্বিয়ার লাতিন আমেরিকা আবিষ্কারের সময়কে ধরে নেওয়া যেতে পারে এখনকার মান্য-স্প্যানিশের পরিণতিকাল। স্পেনের কাস্তিলিয়া প্রদেশ থেকে জাত বলে এ ভাষাকে কাস্তিলিয়া বলেও ডাকেন সকলে। স্পেন দেশটির মধ্যে ব্যবহৃত ‘স্প্যানিশ’ নামে, আর অবশিষ্ট হিস্পানিক ভাষাবিশ্বে একে কাস্তিলিয়া বলা হয়।
যত বেশি পড়ছি ততই টের পাচ্ছি এতদিনেও স্প্যানিশ কিছুই শিখে উঠতে পারি নি। তবুও প্রথম দিনগুলির কথা তো ভোলা যায় না। আজ সেরকম একটি দিনের কথা বলে কলম রাখব। শিক্ষক জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলুন তো কোন সে অ্যালফাবেট যা এসি মেশিনেও থাকে আবার এয়ার পোর্টেও থাকে আবার পৃথিবীর তিনভাগ জুড়েই থাকে? প্রশ্ন শুনে মাথা গুলিয়ে গেছিল। একে তো প্রথম দিন সবে স্বরবর্ণ চিনেছি। ও প্রায় ইংরিজির মতই সংখ্যা। একখানা বেশি, তবে তার ফ্যাঁকড়া অনেক। আরো আটখানি দিয়াত্রিকো থাকে। সে আবার কী? না, না, এখানে স্প্যানিশের ক্লাস খুলে বসি নি পাঠক। বলতে চাইছিলাম আমার অসহায় অবস্থার কথা। আসলে সদ্য অক্ষর চিনে ধাঁধার উত্তর দেওয়া কী চাট্টিখানি কেরামতি? যথারীতি মাথা চুলকাচ্ছি। জগতের সব ক্লাসেই যেমন আমাদের ক্লাসেও তেমনি কিছু দারুন চালাক ছাত্রছাত্রী ছিল। হুট করে একজন বলে দিল উত্তর – MAR । শিক্ষক মশাই তো দারুণ পিঠ চাপড়ালেন তার। ক্লাস শেষে কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করলাম – ভাই আমিও যা তুমিও তো তাই, আজকেই প্রথম অক্ষর চিনলে তাহলে দুম করে অমন ঠিক উত্তরটা দিলে কী করে বল তো? তুমি কি স্প্যানিশ আগেই জানতে? সে হেসে বলল – ধুর, না না। আসলে বুদ্ধি খাটালাম। পৃথিবীর তিনভাগ জুড়ে তো জল থাকে। মানে সমুদ্র। আমি চট করে গুগল ট্রান্সলেটর খুলে দেখে নিলাম স্প্যানিশ ভাষায় সমুদ্র হল MAR। এদিকে এসি মেশিন বানানেও A আবার এয়ারপোর্টেও A; ব্যাস দুয়ে দুয়ে চার হল। এমনি করে নাও ভাসালাম স্প্যানিশ দরিয়ায়।
Share Now শেয়ার করুন