ঝর্না রহমান | মাতাল হাওয়ার মেলোডি | স্মৃতিগদ্য-৩ | উৎসব সংখ্যা ১৪২৯

0
91

গানে গানে কীভাবে কেটেছে, অথবা বলা যায় গান তাঁকে কীভাবে টেনেছে, এ হলো সেই স্মৃতিকথা। ঝর্না রহমানের সেই সুরময় শৈশবের কথা পড়ুন এখানে।

গুনগুন গুঞ্জন

শিশু জন্মের পর কেঁদে উঠে প্রথম তার উপস্থিতি জানান দেয়। আমার ধারনা, জন্মের পর আমি গান গেয়ে উঠেছিলাম, কিংবা আমার মা-ই গান গেয়ে উঠেছিলেন, অথবা কোনো পাখি গেয়ে উঠেছিল বা কোনো পাহাড়ি ঝরনা! মোট কথা আমার জন্মের সময় কোনো না কোনোভাবে গানের একটা শুভযোগ ঘটেছিল তা নইলে গান আমি এত ভালোবাসবো কেন?

আমি জন্মেছিলাম ১৯৫৯ সনের ২৮ জুন তারিখে ৩৯ নবদ্বীপ বসাক লেনের ছোট্ট একটা ভাড়া বাসায়। ধাত্রী হিসেবে আমার মায়ের পাশে ছিলেন হাতুড়ে দাই আর আম্মার শুভার্থী প্রতিবেশিনীগণ। আম্মার কাছে শুনেছি, তাঁরা অবাক হয়ে আমার শ্যামাঙ্গিনী জননীর গর্ভ থেকে প্রথম ভূমিষ্ঠ হওয়া বরফজাদীর মতো এক ধবধবে শিশুকে অবাক হয়ে দেখছিলেন। হয় তো তাঁরাই হাতে হাতে ধরে আমাকে ঘিরে গেয়ে উঠেছিলেন ‘খুকুমনি জনম নিল যেদিন মোদের ঘরে…।’ আম্মার কাছে শুনেছি, সেদিন চারপাশে ঝরছিল শ্রাবণের প্রথম সপ্তাহের বৃষ্টিধারা। হয়তো প্রকৃতিও সেদিন তার জলের সেতারে গান গেয়ে আমাকে স্বাগত জানিয়েছিল। তখন হয়তো কোন দূরান্তে স্রোতলহরির সংগীতধ্বনির মধ্যে আমার জন্য নাম পাঠিয়ে বয়ে গিয়েছিল কোনো ঝরনা! আমার জননী সেই সাংগীতিক ধ্বনির ’ঝরনা’ নামেই আমাকে ডেকে উঠেছিলেন!

কত ছোট বয়স থেকে আমি গানকে ভালোবেসেছি? অনেক ছোট! তখনও আমি স্কুলে ভর্তি হইনি। তখনও আমাদের রেডিও হয়নি। তখনও আমি কোনো সিনেমা দেখিনি! কিন্তু আম্মাকে দেখতাম, আমার ছোট বোনকে কোলে নিয়ে ‘ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি’ গাইতেন! মাঝে মাঝে গুনগুন করে গান করে গাইতেন, ‘মন ডোলে মেরা তন ডোলে’ আর ‘হাওয়া মে উড়তা যায়ে, মেরে লাল দোপাট্টা মলমল কাহোগি!’ একটু বড় হয়ে ওঠার পর আমার মায়ের মুখে একটা অন্যরকম গানের কলি শুনলাম! ‘কৃষ্ণচূড়া আগুন তুমি আগুন ঝরা বাণে, তুণ করেছ শূন্য তোমার গুণ করেছ গানে!’ শূন্য’ আর ‘গুণ’ শব্দে গিয়ে আম্মা গলার ভেতরে সুরটাকে কেমন খেলিয়ে খেলিয়ে দুষ্টু দুষ্টু ধাক্কা দেন। এই সুর আর ধ্বনির দোলাটাই আমার মাথায় প্রথম গানের শব্দতরঙ্গ হিসেবে ঢুকে গেল। সেই ঢেউ আমাকেও ছোট ছোট ধাক্কা দিতে শুরু করলো। যেখানেই গান শুনি আমার কান হরিণের মত খাড়া হয়ে ওঠে। ভালো লাগে সুর, ভালো লাগে শিল্পীর গলার ওঠানামা। কিন্তু স্কুলের চৌকাঠে পা রাখার আগেই আম্মা আমাকে তুমুল বেগে শেখাতে লাগলেন কবিতা। কাঠবিড়ালি কাঠবিড়ালি, বাবুদের তালপুকুরে, ও মা তোমার বাবার নাকে, আমাদের ছোট নদী, এক যে ছিল সাহেব তাহার, ঝিকিমিকি করে জল সোনালি নদীর, বাঁশবাগানের মাথার ওপর…..অজস্র সুন্দর সুন্দর পঙক্তি, মনের ভেতর ছাপ ফেলে যাওয়া সব ছবি, ঝংকৃত মন্দ্রিত সব শব্দ। সব শিখিয়ে পড়িয়ে আম্মা আমার মাথার ওপর রবীন্দ্র-নজরুল-সুকুমার-অচিন্ত্যকুমার-যতীন্দ্রমোহন সব্বাইকে একঝুড়িতে তুলে দিলেন। কাব্যগুরুদের মজার মজার কবিতা ঠাসা বিরাট সেই ঝুড়ি, তবে মাথায় বসে রইল ঠিকঠাক। ছড়া কবিতা আমার গলায় চলতে লাগলো গড়গড়িয়ে। বাসায় কেউ এলেই আম্মা গল্পচ্ছলে শুনিয়ে দেন, আমার ঘটে কত বিদ্যে, তারপর অতিথিরাই আমাকে টেনে এনে খাড়া করিয়ে দেন সামনে। আমি কলের পুতুলের মতো কলকল করে কবিতা বলি। কিন্তু আমার গলা চুলবুল করে গান করার জন্য! কারণ আম্মার গুনগুনানির পাশাপাশি এর-তার মুখে শুনে শুনে আমি গোপনে শিখে ফেলেছি ‘কৃষ্ণচূড়া আগুন তুমি’ গানটির একখানা কলি। আব্বা-আম্মা-ভাত-পানি-দাও-খাও-যাও-মাছ-ডিম-ফুল-পাখি-মেঘ-বৃষ্টি এরকম কিছু কথাবার্তা নিয়ে আমার তখন শব্দের টুনি-ঝুলি! কাজেই গীতা দত্তের সেই বিখ্যাত গানটির তূণ, শূন্য, গুণ এসব শব্দ আমার শ্রবণ অভিজ্ঞতায় তখনও নেই! আব্বার মুখে রূপকথার গল্প শুনে, সৈন্য, যুদ্ধ, তরোয়াল দিয়ে খুন করা এসব শব্দের চিত্রকল্প জানা হচ্ছিল। তাই গীতা দত্তের গানের বাণী দিব্যি আমার গলায় নতুন শব্দে নতুন অর্থদ্যোতনা নিয়ে বসে যায়! আমি গাইতাম, কৃষ্ণচূড়া আগুন তুমি আগুনঝরা গানে/ খুন করেছ সৈন্য তোমার ঘুম কেড়েছ গানে!! বেশ বড় হওয়া পর্যন্ত আমার গলায় গীতা দত্তের গানের তূণ আর গুণ শব্দ ‘খুন’ হতে লাগলো! আর তূণ? সে কি যে-সে শব্দ? সে তো শিখবো অ-নে-ক বড় হয়ে, যখন পরিচয় ঘটবে গানের রাজা রবীন্দ্রনাথের সাথে, রঙ-ফোটা এক অবাক ফালগুনে দেখা হবে এক বালকবীরের সাথে, যে নাকি তার গোপন তূণে লুকিয়ে রাখে অস্ত্র (অস্ত্র তোমার গোপন রাখো কোন তূণে/ দেখা পেলেম ফালগুনে।)! যাই হোক একটু একটু করে আমি গায়েপায়ে বড় হই আর গানেও আমার রীতিমত বাড় বাড়তে থাকে! কিন্তু গানের লিরিক শেখা তো চাট্টিখানি কথা নয়? সেটা কোথায় পাবো? তখনও আমাদের রেডিও হয়নি! সিনেমা দেখিনি! আর ছাপোষা চাকুরিজীবী পিতার কন্যাকে মাস্টার রেখে গান শেখানোর কথা তো চিন্তাও করা যায় না!

লালবাগ স্কুলে থাকতেই মাসুম বাচ্চা আমি জীবনে প্রথম বেঞ্চের ওপরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি পেলাম। গান শোনার জন্য আমার উৎসুক কর্ণযুগলের সেই শাস্তি হয়েছিল গানের জন্যই। গান চুরির শাস্তি! সেই শাস্তির অপমান লজ্জা আর কষ্টের কথা মনে হলে এখনও আমার চোখ ভিজে ওঠে।

১৯৬৪ সনে আমি প্রথম স্কুলে ভর্তি হলাম। থাকি তখন আজিমপুর শাহসাব বাড়িতে ভাড়া বাসায়। আব্বা একদিন আমাকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য নিয়ে গেলেন লালবাগ গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুলে। স্কুল প্রাঙ্গণে পা রেখে আমার বুক দুরু দুরু করতে লাগলো। বাপরে! এত বড় বিল্ডিং! এত ছাত্রী! এতরকম কর্মকাণ্ড! হা করে দেখতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে উল্টে পড়ি আর কি! আব্বা বললেন, কী রে বাবা, স্কুল পছন্দ হয়েছে? ঠোঁট ফুলে ওঠে আমার। এখানে তো আমি হারিয়ে যাবো! কাঁদতে শুরু করলাম। স্কুলে পড়বো না আব্বা! আব্বা আদর করে বোঝালেন, স্কুল অনেক মজার জায়গা। কত নতুন বই পড়া হবে। খেলাধুলা হবে। সবাই আমাকে ভালোবাসবে। ইত্যাদি। আব্বা আমাকে হেড মিস্ট্রেসের রুমে নিয়ে গেলেন। আব্বাও আম্মার মতই হেডমিস্ট্রেসের কাছে আমার ‘কবিতা বলা’ গুণপনা জাহির করে দিলেন। সুতরাং বড় আপামনির সামনে আমি কয়েকখানা ‘কবিতা বললাম’। তাতেই হয়ে গেল! একটু লিখতেও দিলেন বড় আপা। আর হাতের লেখায় আমি সত্যিই তাক-লাগানো চৌকস! আম্মা আমাকে শুধু কবিতায় নয়, লেখায়ও রীতিমত দিগগজ করে তুলেছিলেন। ছয় বছরের চৌকাঠ না-পেরুনো এক শিশুর এত বিদ্যের তো অপচয় হতে পারে না! হেড মিস্ট্রেস আমাকে একবারে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে নিলেন! তরতর করে ক্লাস চলতে লাগলো। তবে ক্লাস তেমন ভালো লাগে না, আমার খুব ভালো লাগে স্কুলে সকাল বেলার অ্যাসেম্বলি। অ্যাসেম্বলি করাকে আমরা বলি ‘লাইনে যাওয়া’। কারণ সেখানে সবাই লাইন করে দাঁড়িয়ে গান করে। গান মানে একটি প্রার্থনা সংগীত (গোলাম মোস্তফা রচিত), হে খোদা দয়াময় রহমান রহিম, হে বিরাট হে মহান হে অনন্ত অসীম। আর দুটি জাতীয় সংগীত, প্রথমে পাকিস্তান জিন্দাবাদ এবং পরে পাকসার জমিন সাদবাদ, কিসওয়ারে হাসিন সাদবাদ। প্রার্থনা হোক, জাতীয় সংগীত হোক, গান তো! আমি পরম যত্নে গলা খেলিয়ে গান গাই। কিন্তু কথা তো সব বুঝি না! প্রার্থনা সংগীতটিতে ‘হে বিরাট হে মহান হে অনন্ত অসীম’ – কে গাচ্ছি ‘হেবিরা হেমাহা হেয়ানান তায়াশিম’, আর এক জায়গায় ‘তুমি মুক্ত স্বাধীন, বাধাবন্ধনহীন, তুমি এক তুমি অদ্বিতীয় চিরদিন’– এখানে শেষ লাইনটিকে গাইছি ‘তুমিও তুমিও দ্বিতীয় চিরদিন’ (হায় অদ্বিতীয় প্রভু, এই নাবুঝ বান্দার অজ্ঞতা তুমি ক্ষমা কোরো!)! আর জাতীয় সংগীত? নাজির আহমেদ রচিত ও আবদুল আহাদ সুরারোপিত পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতের বাংলা রূপটির মধ্যে অনেক শব্দ ছিল যে সব শব্দ আমাদের দেশ জনপদ প্রকৃতি বা সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, ‘যেমন পুরব বাংলার শ্যামলিমা, পঞ্চনদের তীরে অরুণিমা, ধূসর সিন্ধু মরুসাহারা, পেলো আযাদীর স্বাদ।’ এখানে গাইতাম, পনচানা দের তীরে অরনি মা, আবার ‘খাইবার দ্বারে দ্বারে পতাকাবাহী, মেঘনার কূলে যত বীর সিপাহী, প্রাচ্য প্রতীচ্যের মিলন গাহি, ঝাণ্ডা জাগিছে আযাদ’, এ অন্তরায় গাইতাম ‘খাইবার দ্বারে তার পতাকা বাহির’, মানে মনে করতাম, খাওয়ার ঘরের দরজার বাইরে পতাকা উড়ছে! নদী বিধৌত শস্য-শ্যামল সমতল বাংলার এক বালিকা কী করে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংযুক্ত পার্বত্য সীমান্তের খাইবার গিরিপথের নাম জানবে বা ভাববে! আবার আর-এক অন্তরায় – ‘সাম্য মৈত্রীর বন্ধনহার, তৌহিদী দীক্ষা কণ্ঠে যাহার, তিস্তা-বিতস্তা আজও মুছে দেয় গ্লানি দুঃখ বিষাদ’, এখানে এসে গাইতাম তিস্তা গো তিস্তা! (এক নাদান ছোট্ট বালিকা তখনও বাংলাদেশের তিস্তা নদীর নামই ভালো করে শোনেনি, পাঞ্জাবের ঝিলম নদীর অপর নাম বিতস্তা নদী সেটা কী করে জানবে? যাই হোক, গানের কথা বা পঙক্তিবিন্যাস হয় তো এখনও ঠিক হল না, অন্তরাও হয়তো আগে পিছে হোল। স্মৃতি খুঁড়ে এটুকু বের করতেই আমার ঘাম বের হয়ে গেল।) বাংলা গানের পরে পাকিস্তানের মূল জাতীয় সংগীত ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’। সেটা তো বাংলাও না। তখন জানতাম এটা উর্দু। কিন্তু হাফিজ জলন্ধরী রচিত ও আহমেদ গোলাম আলী সুরারোপিত এই গানটি আদতে ফারসি ভাষায় রচিত। বাংলা ভাষাভাষী শিশুরা নিশ্চয়ই সেই গানের কথার মাথামুণ্ডু কিছু না বুঝেই গাইত! এখনও মনে পড়লে হাসি পায়, কী যে গাইতাম! সে যা-ই গাইতাম, শত শত শিক্ষার্থী এক সুরে এক সাথে গান করছে, সমবেত কণ্ঠের একটা মোহময় ঐকতান বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে অনেক দূর, এটি আমার খুব ভালো লাগতো। অ্যাসেম্বলি শেষ হলেও আমার কানে লেগে থাকতো সেই গান, সেই সুরের দোলা, সারাক্ষণ গুনগুন করে গাইতাম। বাসায় এসে ছোট বোন ও খেলার সাথিদের নিয়ে স্কুল-স্কুল খেলা খেলতাম। দু হাতে মোনাজাত ধরে গাইতাম, হে খোদা দয়াময় রহমানো রহিম, হেবিরা হেমাহা হেয়ানান তায়াশিম, তুমি মুক্ত স্বাধীন, বাধাবন্ধনহীন, তুমিও তুমিও দ্বিতীয় চিরদিন… !

কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল

লালবাগ স্কুলে থাকতেই মাসুম বাচ্চা আমি জীবনে প্রথম বেঞ্চের ওপরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি পেলাম। গান শোনার জন্য আমার উৎসুক কর্ণযুগলের সেই শাস্তি হয়েছিল গানের জন্যই। গান চুরির শাস্তি! সেই শাস্তির অপমান লজ্জা আর কষ্টের কথা মনে হলে এখনও আমার চোখ ভিজে ওঠে। ১৯৬৫ সালের কথা। তখন আমি থ্রিতে উঠে গেছি। আমাদের ক্লাসে এক বড়লোকের বেটি ছিল, লম্বা লম্বা চুল! শিপ্রা বা শিখা নামের সেই মেয়ে দুই বেণি দুলিয়ে কাঁধে স্কুল ব্যাগ নাচাতে নাচাতে ক্লাসে ঢুকতো। তখন বেশিরভাগ ছাত্রীই বুকে বইখাতা চেপে স্কুলে আসতো। তবে আমার একটা ছোট চামড়ার সুটকেস ছিল। সুটকেসটি ভালো রেজাল্ট করে টু থেকে থ্রিতে ওঠার জন্য ছোট মামা মাহফুজুর রহমান আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। সে সময়ে বইয়ের ব্যাগ হিসেবে ছোট ছোট সুটকেস ব্যবহার করা হতো। যাই হোক, সেই ‘বড়লোকের বিটি’ বোধ হয় বাসায় মাস্টার রেখে গান শিখতো। কারণ ও ক্লাসে বসে সহপাঠিদের সাথে গানের গল্প করতো। সাথে করে নিয়ে আসতো গানের খাতা। সেটা খুলে ওর পাশে বসা ছাত্রীদের দেখাতো, খাতায় লেখা গান গেয়ে শোনাতো। আমার খুব ইচ্ছে করে, ওর গানের খাতাটা দেখি! কিন্তু আমি প্রচণ্ড মুখচোরা স্বভাবের। খাতা দেখবো দূরের কথা, এগিয়ে এসে ওর সাথে ভাবই জমাতে পারি না। তাই আড়াল থেকে শিপ্রা বা শিখাকে খুব লক্ষ করি। ওর কথা আর গান শোনার জন্য চুপ করে কান পেতে রাখি। ওকে গাইতে শুনে আমার খুব ভালো লেগে যায় ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ গানটি। কিন্তু শিপ্রা বা শিখার মুখে শুনে শুনে মনে মনে মাত্র দেড় কি দু লাইন শিখেছি! একদিন খুব সাহস করে ওর কাছে খাতাটা চাইলাম, বললাম, তোমার সামনে বসেই গানটি লিখে নেবো, দেবে একটু খাতাটা? উমহ! সেই বড়লোকের বিটি আমাকে বলে, ইশ, আমার খাতা কেন দেবো? এত ইচ্ছা থাকলে মাস্টার রেখে গান শিখে নাও! লজ্জায় কথা বন্ধ হয়ে যায় আমার। প্যাঁচা মুখ করে সরে যাই। কিন্তু মন পড়ে থাকে গানের খাতার ওপর। তক্কে তক্কে থাকি। কয়েকদিন পরে সুযোগ এসে যায়। টিফিন টাইমে সবাই ক্লাস থেকে বাইরে চলে গেলে আমি দুরু দুরু বুকে শিপ্রা বা শিখার ব্যাগ খুলে গানের খাতা বের করে দ্রুত হাতে লিখতে থাকি গানটি। কিন্তু কপাল খারাপ। একেবারে সিনেমার মত ঘণ্টা পড়ার আগেই কী কারণে যেন শিপ্রা বা শিখা একবার ক্লাসে এলো, আর আমি বমাল ধরা পড়ে গেলাম! চুরি করে সহপাঠির খাতা থেকে গান লেখার অপরাধ যত লঘুই হোক না কেন, ফাঁকা ক্লাসে অন্যের ব্যাগ থেকে জিনিস বের করা গর্হিত অপরাধ বটে। ফলে টিফিনের পরের ক্লাসের টিচারের কাছে শিপ্রা অনেকখানি রঙ চড়িয়ে আমার নামে অভিযোগ দাখিল করে। আমি ওর ব্যাগ থেকে পয়সা চুরি করতে যাচ্ছিলাম, তখনই ও ঢুকে পড়ে ইত্যাদি। লজ্জায় আমার মাথা নুয়ে পড়ে। মনে হয় মাটির সাথে মিশে যাবো। কিন্তু হঠাৎ আমি সবার চেয়ে বড় হয়ে উঠি। কারণ টিচারের নির্দেশে আমাকে উঠে দাঁড়াতে হয়েছে বেঞ্চের ওপর। সে সময়ে স্কুলের একটা ঐতিহ্যবাহী শাস্তি ছিল কান ধরে বেঞ্চের ওপরে দাঁড়ানো। বেঞ্চের ওপরে ওঠার পর চোখ দিয়ে আমার এমনিতেই গল গল করে পানি পড়ছিল। কান ধরতে বলাতে আমার হিক্কা উঠে গেল। সারা ক্লাস আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি কেন এখন দুম করে মরে যাচ্ছি না! কিংবা অজ্ঞান হয়ে ঠাস করে পড়েই বা যাচ্ছি না কেন! যাই হোক, দম চাপা হিক্কা শুনে টিচারের দয়া হল, বললেন, কেন ওর ব্যাগে হাত দিয়েছ? আমি কোনোমতে চুরি করে অর্ধেক লেখা গানের কাগজটা হার হাইনেসের সামনে দাখিল করি। আপার মুখ তখন গোলালু। গান লিখেছ? আমি কোনোমতে মাথা নাড়াই। দয়াময়ীর দয়া হয়! বেঞ্চি থেকেও আমার অবতরণ ঘটে। আপামনি বলেন, ওর কাছে চাইলেই তো হত! আর না বলে কারো জিনিসে হাত দেবে না বুঝেছ? বুঝবো না আবার? জন্মের মতো বুঝেছি! কুচুটে হিংসুটি ওই শিপ্রা বা শিখার জন্য ‘কোথাও আমার’ গানের কথাগুলো আর ঠিকমত শেখা হল না আমার। পরে যখন আমি শেরেবাংলা হাই স্কুলে ফোরে পড়ি, স্কুলের অনুষ্ঠানের জন্য ওই গানের সাথে একটা দলীয় নাচ করলাম, তখন রিহার্সালের সময় গাইতাম, সূর্য যখন আস্তে পড়ে ঢলে, মেঘে মেঘে আকাশ কুসুম তোলে… (সূর্য যখন অস্তে পড়ে ঢুলি/ মেঘে মেঘে আকাশ কুসুম তুলি)! কিন্তু তখন তো আমি ছিলাম ঠাকুরেরও দাদাঠাকুর। আমার মনে হতো সূর্য আস্তে আস্তে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ছে আর মেঘের গায়ে তার লালিমা লেগে মেঘগুলোকে দেখাচ্ছে আকাশের বাগানে ফোটা ফুলের মতো। অস্তাচলে যাওযার সময় সূর্য সেই ফুল তুলে নিচ্ছে। মনের ভেতরে কী যে অপূর্ব এক ছবি আঁকা হতো আমার বানানো এই ভুল কথাগুলোর মধ্য দিয়ে!

লালুনি খালাম্মাদের দেখতাম, কোলের ওপর ঢোল নিয়ে দু হাতে অদ্ভুত সুন্দর চাটি মেরে তাল বাজাতে বাজাতে গান করছেন। তালে তালে বাজিয়ে মেয়েদের মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত ছন্দে ছন্দে দুপাশে ঢেউ তুলে দুলতে থাকতো। আমি হা করে দেখতাম। মেয়েরা ঢোল বাজিয়ে গান গায় সেই প্রথম দেখি।

আজিমপুরে আমরা যে এলাকায় থাকতাম, সে জায়গায় ঢাকাইয়া আদিবাসীদের বাস ছিল বেশি। তাদেরকে বলা হত ঢাকাইয়া কুট্টি। উর্দু আর বাংলা মিশিয়ে কথা বলতেন। এই ঢাকাইয়া কুট্টিরা ছিলেন খুব আমুদে সম্প্রদায়। রঙচঙে কাপড় পড়তো। তরুণ যুবকেরা গলায় রুমাল পেঁচিয়ে টেরি কেটে রাস্তায় বেরিয়ে গলা ছেড়ে উর্দু কিংবা হিন্দি কোন জনপ্রিয় গানের কলি গাইতে গাইতে হেঁটে যেত। একটা না একটা উৎসব আয়োজন লেগেই থাকতো। আমাদের বাসার কাছেই সেই ঢাকাইয়া মহল্লা ছিল। প্রায়ই ওদের কোনো না কোনো বাসা থেকে হারমোনিয়াম আর ঢোলের বাদ্য ভেসে আসতো। আমার মনে হতো, আহা ওখানে যদি আমি থাকতে পারতাম! অনেকগুলো পরিবার ছিল সেখানে। ফুলের ব্যবসা করতেন ওঁরা। কাঁচা ফুল কিনে এনে পরিবারের সবাই দল বেঁধে বসে মাজারের জন্য ফুলের ঝালর, গিলাফ, আকন্দ আর গাঁদা ফুলের সাথে রঙিন সিলোফেন পেপার শোলা চিকমিকে ট্রেসিং পেপার (তাঁরা বলতেন বাদলা কাগজ) ইত্যাদির মিশেল দিয়ে নানারকম ফুলসজ্জার আইটেম তৈরি করতেন। কাজ করতে করতে ওঁরা দল বেঁধে গান করতেন। ছোট্ট এক একটা বাড়িতে গিজগিজ করা কয়েকটা ঘরে অনেকগুলো পরিবার বাস করতো। সারাক্ষণ এখানে চিৎকার চেঁচামেচি হৈচৈ ঝগড়াঝাঁটি চলতো। ছোট বাচ্চারাও বড়দের মতো গালিগালাজে অভ্যস্ত। ছোট্ট এক টুকরো উঠোন জুড়ে চলতো নানারকম কাজ। সব সময় ভেজা আর নোংরা সে উঠোন। কুয়োর পাড় নিয়ে বাথরুম নিয়ে আরো নানা বিষয়ের অধিকার নিয়ে লড়াই-ঝগড়া চলমানই থাকে। ওই গোটা মহল্লাই যেন সারক্ষণ টগবগ করে ফুটছে। ধোঁয়া উঠছে তাপ উঠছে গন্ধ ছুটছে। কেমন একটা জীবন্ত জীবন এখানে। আমি সুযোগ পেলেই এখানে চলে আসতাম। জানালার ফাঁক দিয়ে ওদের ফুলের ঝালর বানানো দেখতাম। মাঝে মাঝে ঘরের বাইরে ধুলোময়লার মধ্যে পেয়ে যেতাম একটুকরো বাদলা বা রঙকরা শোলার টুকরো। মনে হতো রূপকথার পৃথিবী থেকে পড়ে যাওয়া কোনো গল্প ওগুলো। কত দামী সম্পদ!

এখানে লালুনি আর কালুনি নামে দুই বোনের পরিবার ছিল। লালুনি ফর্সা আর কালুনি কালো। বয়সে বড় হলেও আমার আম্মার সাথে একসময় এই দুই বোনের গলায় গলায় ভাব হয়ে গেল। আম্মা ওঁদেরকে ডাকেন লালুনি আপা আর কালুনি আপা, আমরা ডাকি লালুনি খালাম্মা আর কালুনি খালাম্মা। আম্মার সখ্যের সুবাদে গানের আওয়াজ শুনলে ওঁদের বাড়িতে যেতে আর বাধা রইলো না। লালুনি খালাম্মাদের দেখতাম, কোলের ওপর ঢোল নিয়ে দু হাতে অদ্ভুত সুন্দর চাটি মেরে তাল বাজাতে বাজাতে গান করছেন। তালে তালে বাজিয়ে মেয়েদের মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত ছন্দে ছন্দে দুপাশে ঢেউ তুলে দুলতে থাকতো। আমি হা করে দেখতাম। মেয়েরা ঢোল বাজিয়ে গান গায় সেই প্রথম দেখি। ওঁরা ছোট্ট একটা প্রায়ান্ধকার কুঠরিতে মেঝেতে পাটি বা চাদর বিছিয়ে পরিবারের কয়েকজন মিলে গান করতেন। তবে সে গানের ভাষা ছিল উর্দু। ভাষা না বুঝলেও ঢোলের উচ্চ রবের সাথে তালে তালে মাথা নাড়িয়ে ঝোঁক দিয়ে গাওয়া সেই গান আমাকে এক মায়ার রাজ্যে নিয়ে যেত।

আজিমপুরে আমাদের বাসার কাছেই ছিলো চুড়িপট্টি। দেয়াল দিয়ে ঘেরা। কোথাও কোথাও ইট খসে গিয়ে ফোকর হয়েছে। চুড়িপট্টি ছিল আমার তীব্র আকর্ষণের জায়গা। ছোট বলে কোনোদিন ভেতরে ঢোকার সাহস পাইনি। তবে দেয়ালের ভাঙা ফোকর দিয়ে একটুখানি ভেতরে চলে যেতাম। একপাশে একটা ঘরের একটা জানালা খোল থাকতো। কিন্তু জানালার ওপাশে নানারকম জিনিসপত্র থাকাতে ভেতরটা দেখতে পেতাম না। আমার মাথার নাগালেও আসতো না পুরোটা। ঘাড় উঁচু করে কোনোমতে একটু দেখা যেত। মনে হত ছায়াছায়া মানুষেরা কতরকম নড়াচড়া করছে। নানান রকম শব্দ পাওয়া যেত। কল্পনায় শব্দগুলোকে জোড়া দিয়ে দিয়ে চুড়ি তৈরি করা দেখতাম। তবে দেয়ালের সেই অপরিসর স্থানটুকুতে পাওয়া যেতো নানা আকারের চুড়ির টুকরো। আমার মতো ছোট ছোট বাচ্চাদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সেটাই। আমার খেলার বাকসোতে অনেকগুলো চুড়ির টুকরো জমিয়ে রেখেছিলাম। একবার ইঞ্চি তিনেক লম্বা একটা চুড়ির শেকল কুড়িয়ে পেলাম। সেটা ফ্রকের তলায় করে নিয়ে আসতে গিয়ে মনে হচ্ছিল আমি কোনো রাজবাড়ির পুরো খাজাঞ্চিখানা চুরি করে জামার তলায় লুকিয়ে ফেলেছি। যেমন জয়ের আনন্দ তেমন ভয়ের ধুকপুকুনি।

আজিমপুরে থাকতেই আমি কীভাবে যেন আর এক মহল্লায় এক কাওয়ালি মাহফিলের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভবত সেটা ছিল কাওয়ালি চর্চার একটা কেন্দ্র। একটা ঘরে রোজ বিকেলেই (কারণ আমি যেদিনই গেছি সেদিনই দেখেছি কাওয়ালি হচ্ছে) কয়েকজন মিলে কাওয়ালি গাইতেন। এদের সবাই পুরুষ। তরুণ যুবক থেকে বয়স্ক পুরুষ মিলিয়ে দশ বারো জন ছিলেন সেই দলে। কখনো একজন কখনো দুজন ওস্তাদের সামনে হারমোনিয়াম থাকতো আর থাকতো ঢোল আর তবলা। কিন্তু কাওয়ালির আসরে শ্রোতা হিসেবে থাকতো অনেক মানুষ। আমি বাসা থেকে চুপি চুপি বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে সেই কাওয়ালি কেন্দ্রে চলে যেতাম। দূর থেকেই দেখতাম দরজার বাইরে অনেক জুতো স্যান্ডেল। আর সমবেত কণ্ঠের জাদুকরি দোলা-লাগা ছন্দোময় গানের ঢেউ বেরিয়ে এসে বাইরের গাছপালা ঘরবাড়ি সব কিছুতে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আরও ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চার সাথে আমি কান পেতে কাওয়ালি শুনতাম। যারা গাইছেন তাঁদের বেশিরভাগের মাথায় টুপি। সবাই দুহাতে ছন্দে ছন্দে তালিয়া বাজান। দারুণ লাগতো এই তালে তালে করতালি। আমার হাতদুটোও ছটফট করতো তালি বাজানোর জন্য। কিন্তু কেউ যদি দেখে ফেলে তা হলে নিশ্চয়ই আমাকে তালি বাজাতে দেখলে হাসবে। লজ্জা লাগতো। মুঠোর ভেতর লুকিয়ে রাখতাম তালি। গায়কদের তালির শব্দে নেশা ধরে যেত। তবে কাওয়ালি গানের ভেতর থেকে ইয়া আল্লা, রাসুলুল্লাহ, হাবিবাল্লা, কলিমাল্লা এরকম কিছু শব্দ ছাড়া আর কিছু ধরতে পারতাম না। কিন্তু কাওয়ালির ছন্দ যেন আমার রোমকূপের ভেতরে ঢুকে যেত। বিকেল হলেই এক নিষিদ্ধ টান আমি টের পেতাম। আমি যেতাম আম্মাকে লুকিয়ে। মনে হত, বাসা থেকে অত দূরে কাওয়ালি শুনতে যাওয়ার কথা বললে আম্মা আমাকে কিছুতেই যেতে দেবেন না। জানতে পারলে বকাও দেবেন, তাই সন্ধ্যা হওয়ার আগে আবার দৌড়াতে দৌড়াতে বাসায় ফিরে আসতাম। কাওয়ালির মজমা আর নিষিদ্ধ আনন্দ আমাকে আবিষ্ট করে রাখতো! তখন কোনো কোনো গানের মুখড়া, অর্থ না বুঝেও আমি শিখে ফেলেছিলাম। সে সব অংশ আমার শ্রুতির ভেতরে দিব্যি মাইফেল বসিয়ে বাজতে থাকতো। কল্পনার মেহফিলে তালিয়া বাজাতে বাজাতে আমি বাসায় ফিরে আসতাম। কখনো আম্মা বলতেন, কোথায় গেছিলি? অম্লান বদনে বলে দিতাম অমুকের সাথে খেলছিলাম, কিংবা জুম্মনদের গুল্লি খেলা দেখছিলাম!

কয়েকটি শুভযোগ

১৯৬৬ সনে আব্বার অফিস ট্রান্সফারের সুবাদে আমরা আজিমপুর শাহসাববাড়ি থেকে কমলাপুরে চলে এলাম। আব্বা ছিলেন পোস্টমাস্টার। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাছে আমাদের নতুন বাসা হল। তখন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন মাত্র নির্মিত হচ্ছে। বিশাল জায়গা জুড়ে কর্মযজ্ঞ। কমলাপুরে আসার পর আমার গানপাগল মনটার জন্য কয়েকটা শুভযোগ দেখা দিল। প্রথমত; যে জায়গাতে আমাদের বাসা হল সে জায়গাটার বেশিরভাগ ছিল আমার চতুর্থ মামা হারুনর রশীদের খালুশ শ্বশুরের আর এক অংশ ছিল আমার মেজো খালুর কেনা। পনের ষোলো কাঠার বিশাল প্লট। মামার খালুশ শ্বশুরের বাড়ি করার পরও অনেকটা জায়গা পতিত রয়ে গেছে। সেখানে একটা দোচালা ঘর, পানির ইঁদারা (আমরা বলতাম কুয়া), ইঁদারা ঘিরে চমৎকার খোলা উঠোন, পালান সবই আছে। খালুশ শ্বশুরের বদান্যতায় হারুন মামা সে বাড়িতে বাস করতে লাগলেন, সেই সাথে বিনা ভাড়ায় ঘর তুলে থাকার জন্য মামা তার বোনের পরিবারকেও, মানে আমাদেরও নিয়ে এলেন। তাতে আমার আব্বার কাঁধ থেকে বাসাভাড়ার ভারটা নেমে গেল। ব্যাপারটা বেশ হল। আমরা আর মামারা! আবার ‘আমরা আর খালারা’ও হয়! মামীর খালা, মানে মামার খালাশাশুড়ির একটি মাত্র কন্যা, নাম বিলকিস। সেও হল আমার খালা! আমার চেয়ে এক দেড় বছরের বড়। তাই তাকে ডাকতে হলো বিলকিস খালাম্মা। তবে একই ক্লাস আমরা। আব্বা আমাকে বিলকিস খালাম্মার স্কুলেই ভর্তি করে দিলেন। স্কুলের নাম কমলাপুর শেরে বাংলা প্রাইমারি স্কুল (পরে এর নাম হয়েছিল শেরে বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সে স্কুলে আমি আরও একবার পড়েছি!)। রূপকথার রাজকন্যা পরমাসুন্দরী বিলকিস ছিলেন রাজারানীর একমাত্র সন্তান! বাপমায়ের পরম আদরিণী সেই কন্যাটি আমার সহপাঠি হল বটে, তবে একদিকে বয়সে বড়, আবার সম্পর্কে খালা, তাই তার সাথে খুব সহজে মিশতে পারি না। তাকে মনে হয় দূরদ্বীপবাসিনী কোনো জলপরীকন্যা। পরম শ্রদ্ধেয় এই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আমার বুক ধুকপুক করে। পরীর দেশের হেঁশেল থেকে ঘি মাখন আর ময়দা ঠেসে, তুলতুলে করে ছেনেছুনে তার মুখখানা তৈরি হয়েছে। নরম আর জ্বলজ্বলে চামড়ায় ঢাকা গোল মুখ। তার মধ্যে মা দুগগার মতো, যেন টিপে টিপে বসানো হয়েছে নাক আর ঠোঁট। আধখানা চাঁদের মতো কপালের নিচে, পানি থেকে সদ্য তুলে আনা চকচকে মাছের মতো একজোড়া চোখ। কালো সিলকের সুতোর মতো চুল। সেই চুলে প্যাঁচানো খেজুর পাতার পাটির মতো নকশা করে রোজ চুল আঁচড়ে দেয় তার মা। কোমর ছাড়িয়ে পড়ে লম্বা দুটো বেনির ডগা। জানালায় দাঁড়িয়ে রোজ লুকিয়ে দেখতাম এই রাজকন্যার কেশবিন্যাস। নেশা লেগে যেত এই রূপসী খালার মুখের দিকে তাকিয়ে।

মামা, মামী, খালা, নানা নানি সব মিলিয়ে দারুণ একটা আত্মীয় পল্লী হয়ে গেল আমাদের কমলাপুরের বাসস্থান। হারুন মামী ছিলেন খুব শৌখিন আর আমুদে মহিলা। তিনিও দেখতে অপরূপ সুন্দরী। নিজের সৌন্দর্যের প্রতি যথেষ্ট সচেতনও। স্লিভলেস ব্লাউজ পরেন। ব্লাউজের নিচে বডিস পরেন। গোসল শেষে প্রতিদিন মামী চোখে চিকন করে কাজল আঁকেন। কপালে ছোট করে মাঝে মাঝে টিপও দেন! নায়িকাদের মতো পাতা কেটে চুল আঁচড়ান। মামীর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি আমি। মামী খুব ভালোবাসেন গান শুনতে, গুনগুন করে গাইতে, সিনেমা দেখতে আর সিনেমার গল্প বলতে। আমি হয়ে গেলাম মামীর আঠাভাগ্নি। সারাক্ষণ মামীর সাথে আঠার মতো লেগে থাকি। মামীর গলায় শুনি, তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার, একটা গান লিখো আমার জন্য, ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে আমি বনফুল গো। মামী আমাকে বলেন, তোমার গলা কত সুন্দর, তুমি এ গানগুলো শিখে নাও। মামীর সাথে আম্মাও সারাদিন গল্প করেন। সংসারের কাজ কর্ম শেষ করে হাতে কোনো সেলাই বা অন্য কোনো কাজ নিয়ে বিকেলের মায়াবী উঠোনে মামী আর আম্মা গল্প করতে বসেন। গল্পগোধূলির আলো এসে ওঁদের চারপাশ ঘিরে নাচতে থাকে। মামীর সাহচর্য আম্মার ঘুমন্ত বিনোদনপ্রিয় মনটাকে উস্কে দেয়। একদিন মামা টিকেট কেটে এনে দিলে আম্মা আর মামী ‘একা একা’ গিয়ে সিনেমা দেখে এলেন। সেটা ছিল ‘তালাশ’ কিংবা ‘চান্দা’ সিনেমা। সিনেমায় যাওয়ার জন্য আম্মাও মামীর মতো চোখে হালকা কাজলের টান দিলেন। দুই ভ্রুর মাঝখানে দিলেন তিলের মতো ছোট্ট কাজলের টিপ। সিঁথির দুপাশে বসে গেল কালো কেশের দুটি সুরচিত পাতা! হায় আল্লা! আমার আম্মাকেও তখন সিনেমার নায়িকার মতো দেখতে লাগছিল। আমি তো তখনও সিনেমা দেখিনি, নায়িকারা কেমন হয় সে ব্যাপারেও ততটা ওয়াকিবহাল নই! তবু মনে হল অপূর্ব সুন্দর লাগলেই তাদের নায়িকার মতো লাগছে বলা যায়।

জোবায়দা মীর্যা ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা। জোবায়দার ছোট দুই বোন হচ্ছেন প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ও অধ্যাপক সনজীদা খাতুন ও ফাহমিদা খাতুন। অন্য দুই বোনের নাম ওবায়দা আর মাহমুদা। ভাই সংগীত শিল্পী ও রহস্যরোমাঞ্চ লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন। অবশ্য শৈশবে এসব কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম জোবায়দা মীর্যার বোনেরা ভালো গান করেন। তাদের নাম সনজীদা খাতুন আর ফাহমিদা খাতুন।

গানের প্রতি আম্মারও খুব টান ছিলো। আম্মা আর তার পিঠেপিঠি বড় বোন, আমাদের মমতাজ খালাম্মা, এরা দুজন মিলে তখনকার জনপ্রিয় হিন্দি গানগুলো গাইতেন। আমার নানাজান ছিলেন অলিআল্লা মানুষ। গান শুনলে বকা দেন। তাই তারা গলা চেপে চেপে গাইতেন। আম্মা এসব গল্প মামির সাথে করতেন। মামীর সাথে সিনেমা দেখার পর আম্মার গানের আগ্রহটা অন্যরকমভাবে বাড়লো। এখন আম্মা আর মামী মিলে একজন আর একজনের চুলে বিলি দিতে দিতে বিখ্যাত গানগুলো মাঝে মাঝে গেয়ে উঠতেন। একজন থেমে গেলে আর একজন সুর খুঁজতেন। একজনের কথার ভুল ধরিয়ে দিতেন অন্যজন। হেসে উঠতেন তাঁরা। আর আমি তাঁদের পাশে আলোর সাথে মিশে ত্রসরেণু হয়ে, বাতাসের আড়ালে বাতাসের ঢেউ হয়ে, গাছের পাতা হয়ে, ঘাস হয়ে, ছায়া হয়ে ঘন হয়ে থাকতাম। কেন? শুধু গানের সুরগুলোকে ধরে ফেলার জন্য। গানের গল্পগুলোকে কুড়িয়ে নেবার জন্য। আম্মা একদিন একটা নতুন জামা বানানো শেষ করে আমাকে পরিয়ে দিয়ে চারদিক ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। আম্মা আমাকে ডানে বললে ডানে ঘুরি, বামে বললে বামে ঘুরি। আমাকে দেখে আম্মার চোখমুখ ঝলমল করে। হঠাৎ আম্মা বলেন, নাচ তো! জামার ঝুলটা ঘুরিয়ে একটু নেচে দেখা! এ কথা শুনে আম্মার ‘সোহাগ চাঁদবদনি ধনি’ বালা তো অবাক! বালা তো তখনও নাচ জানে না! নাচবে কী করে! সুতরাং বালা হাবালার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। মিনমিন করে বলি, কীভাবে নাচবো? আমি তো নাচতে পারি না! আম্মা বলেন, আমি গান করি, তুই নাচ। গানের সাথে ঘুরে ঘুরে হাত পা নাড়লেই নাচ হয়ে যাবে! সত্যি? এভাবে নাচতে হয়?
সেদিন জননীর গানের সাথে তার সপ্তমবর্ষীয়া কন্যা স্বরচিত কোরিওগ্রাফিতে ঘুরে ঘুরে নাচলো। তার সাথে নাচলো নতুন জামার রঙ ওড়ানো ঘের, নাচলো ফ্রকের ফ্রিল, নাচলো জামরুল গাছের সবুজ কিশলয়, উঠোনে পোকা খুঁজতে আসা চড়ু ই পাখি, আর আব্বার সবজি ক্ষেতের লাউকুমড়ার লতায় ঝুলে থাকা ঢলোঢলো পাতা। আম্মা সেদিন তখনকার দিনের ক্রেজ, হিন্দি ফিলম ‘দীদার’-এর সুপার ডুপার হিট দুটো গানের অংশবিশেষ গাইলেন। একটা ছিল শামসাদ বেগমের ‘চমন মে রাহকে ভিরানা মেরা দিল হোতা যাতা হায়’, আর একটি হল, লতা মুঙ্গেশকরের গাওয়া ‘ও বাচপানকে দিন ভুলানা দেনা’। স্বর্ণযুগের এই চিরায়ুষ্মান গান দুটি শুনলে আজও আমার মনে কমলাপুরের বাসার উঠোনে আম্মার গানের কথা মনে পড়ে। আম্মা সেদিন আমার মনের ভেতরে দুটি চিরসবুজ গানের দুটি আয়ুশ্চারা লাগিয়ে দিয়েছিলেন, ওরা শেকড় ছড়াতে থাকে। ঝিলমিল ঝিলমিল কাচের মতো সবুজ পাতায় নাচতে থাকে গানের রোদ্দুর।

দ্বিতীয় শুভযোগটি ছিল, আমাদের প্রতিবেশি একটি শিক্ষিত সংস্কৃতিমনা পরিবারের সাথে আমাদের সখ্য। সে পরিবার ছিল মীর্যা পরিবার। মীর্যা সাহেবের নাম মনে নেই। বেগমের নামটা মনে আছে। জোবায়দা মীর্যা। জোবায়দা মীর্যা ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা। জোবায়দার ছোট দুই বোন হচ্ছেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও অধ্যাপক সনজীদা খাতুন ও ফাহমিদা খাতুন। অন্য দুই বোনের নাম ওবায়দা আর মাহমুদা। ভাই সংগীত শিল্পী ও রহস্যরোমাঞ্চ লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন। অবশ্য শৈশবে এসব কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম জোবায়দা মীর্যার বোনেরা ভালো গান করেন। তাদের নাম সনজীদা খাতুন আর ফাহমিদা খাতুন। জোবায়দা সবার বড় ছিলেন। জোবায়দা মীর্যার তিন কন্যা, শবনম, মহুয়া আর শুক্লা। তিন জনের মধ্যে শুক্লা আমার সমবয়সী। মহুয়া আপা আমাদের চেয়ে বড় হলেও আমরা একই সাথে খেলতাম। আর শবনম আপা তার ভয়াবহ সৌন্দর্য নিয়ে ঘরেই থাকতেন। নাইন কিংবা টেনের ছাত্রী ছিলেন। বই পড়তেন। চুল বাঁধতেন। রেডিও শুনতেন। ওঁর ঘরের ভেতর থেকে রেডিওর আওয়াজ ভেসে আসতো আর চারপাশকে অদ্ভুত রহস্যময় রোমাঞ্চে ভরিয়ে তুলতো। ওঁরা সবাই বইয়ের ভাষায় কথা বলতেন। ফলে ভাষার ব্যাপারে খুব সতর্ক হয়ে গেলাম আমি। খবরদার, ঠোঁট ফস্কে যেন অশুদ্ধ কথা না বেরোয়!

তিন কন্যার বাবা খুব রাশভারি। চোখে চশমা, হাতে খবরের কাগজ। তিনি বোধ হয় কোনো কলেজে অধ্যাপনা করতেন। কারণ আব্বা আম্মা বলতেন ‘প্রফেসর সাহেবের বাসা’। মাকে, মানে জোবায়দা মীর্যাকে আমরা দেখিনি। শুনেছি তিনি উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে আছেন। ওদের একজন ভাই ছিলেন। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেও খুব গম্ভীর মানুষ। সে থাকতো বাগানের ভেতর আলাদা আর একটা দালানের ঘরে। খুব ভয় পেতাম ওদিকটাতে যেতে। মনে হত গেলই সেই ভাইয়া চশমার ভেতর দিয়ে কটমট করে তাকাবে! শুক্লা আর মহুয়া আপা ছাড়া ওদের সবাইকেই মনে হত শুধু বড়দের পৃথিবীর মানুষ। আমরা কখনো অধ্যাপক সাহেব বা বড় ভাইকে আমাদের সাথে কথাবার্তা বলতে দেখিনি। কিন্তু শুক্লা, মহুয়া আপা, আমি আর আমার ছোট বোন কাজল, আমরা চারজনে মিলে তৈরি করে ফেলেছিলাম সাংস্কৃতিক দল। প্রতিদিনই দৌড়াদৌড়ি আর চোখ পলান্তি খেলা শেষে আমরা শুক্লাদের বারান্দার বিশাল সিঁড়িতে বসে গল্প করতাম আর করতাম গান। শুক্লা মহুয়া আপা দুজনেই রবীন্দ্রনাথের গান করতো। সিঁড়ির ধার ঘেঁসে স্পাইডার লিলির ঝোপ। সাদা সাদা সরু পাপড়ি বাঁকিয়ে ফুটে থাকা ফুলের দল আমাদের সাথে দুলে দুলে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতো – হারে রে রে রে রে আমায় ছেড়ে দে রে দে রে! নিত্য নতুন পরিকল্পনা করি আমরা। নিজেরাই গান আর নাচের স্টেজ শো করি। স্টেজ বলতে শুক্লাদের শোবার ঘরে খাটের স্ট্যান্ডে দড়ি টাঙিয়ে শাড়ি ঝুলিয়ে পর্দা টাঙানো হয়। তারপর আমরাই দর্শক আমরাই পারফরমার। যাকে যখন গান গাইতে হবে সে দর্শক সারি থেকে উঠে গিয়ে খাটে দাঁড়িয়ে গান করবে। নাচও হয়। লালবাগ স্কুলে পানিশমেন্ট খাওয়া সেই অভিশপ্ত গান ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার মানা’ সেটা শুক্লা আর মহুয়া আপার সঙ্গত পেয়ে নাচে পরিণত হল। সূর্য যখন অস্তে পড়ে ঢুলি, মেঘে মেঘে আকাশ কুসুম তুলি… বুকের ওপর দু হাতের পাতা ক্রস করে ফুলের মতো ছড়িয়ে কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত দোলাতে দোলাতে বসে গিয়ে সূর্যের অস্তাচলে ঢলে পড়ার মুদ্রাটাকে মনে হত অদ্ভুত সুন্দর। নৃত্যকলায় অঙ্গসঞ্চালনার আনন্দে বুঁদ হয়ে গানের কথাকে আর সেভাবে বুঝতে পারতাম না। গাইতাম সূর্য যখন আস্তে পড়ে ঢলে, মেঘে মেঘে আকাশ কুসুম তোলে। পরে নাচের এই বিদ্যে জাহির করেছিলাম স্কুলের একটা অনুষ্ঠানেও। হাত পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে কী যে নৃত্যকলা করতাম! কিন্তু আমার মামী প্রতিদিন সেটা একবার করে দেখতে চাইতেন। এভাবে একদিন মঞ্চস্থ হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতার নাট্যরূপ। মহুয়া আপা রাজা, শুক্লা হল রানী, বাদবাকি আমরা দাসী আর প্রজা। মহুয়া আপা ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতা পড়ে আমাদের পাট বুঝিয়ে দিলেন! অভিনয়ের সময় কবিতা আবৃত্তি করতে হবে আমাকে। এমন কি যখন আমি দাসী হয়ে রানীর পেছন পেছন নদীতে যাবো, দরিদ্র প্রজাদের ঘরে আগুন লাগাবো, বা রাণীর শরীর থেকে সব ‘ভূষণ’ টেনে খুলে ফেলবো, তখনও আমিই পড়বো কবিতা! কারণ কবিতা মুখস্থতে আমি মাস্টার! সে নাটক দেখতে বসলেন আম্মা মামী এমন কি, আদরের দুলালী রাজকন্যা বিলকিস খালাম্মা আর রূপের গরবী রূপকুমারী শবনম আপাও। বিলকিস খালাম্মা কখনও নিজের লেখাপড়া ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে আগ্রহ দেখাতো না। আমরা তখন ফোর কি ফাইভ। সিলেবাসে ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতা নেই। কিন্তু নাটক করার উন্মাদনায় আর রিহার্সালের আবৃত্তিতে সে কবিতা তখনই মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তবে, শাড়ি টাঙিয়ে স্টেজ বানানো, কাগজের মুকুট পরে রাজা-রানী সাজা, তারপর বড়দের সামনে তা অভিনয় করা, সবকিছুই রীতিমত রোমহর্ষক ঘটনা ছিল আমাদের জন্য। রানীর কুবলয়ের জন্য প্রপস ছিল শাপলা। খাতার কাগজ কেটে বানিয়েছিলাম সেই শাপলা। (নিজ হাতে গড়া সেই ‘কাঁচা ঘর’ পদ্মখানাকে কী যে খাসা মনে হয়েছিল!) শাড়িপরা শুক্লারানী সেই পদ্ম হাতে হেলে দুলে হেঁটে গেল আমাদের সামনে দিয়ে। আমার ঠোঁট থেকে পঙক্তি ঝরতে লাগলো, ফিরে গেল রানী কুবলয় হাতে দীপ্ত অরুণ বসনা! রানী চলে গেলে কী হবে, কুবলয় ফুটে রইলো আমার স্মৃতির সরোবরে!

 

Share Now শেয়ার করুন