ডা. এবিএম খুরশীদ আলম >> অনন্ত সাগর মাঝে দাও ভাসাইয়া >> স্মৃতি

0
1135

অনন্ত সাগর মাঝে দাও ভাসাইয়া

প্রতিদিন হোয়াটস অ্যাপে করোনা হাসপাতালে শয্যাব্যবস্থা, রোগীর ভর্তি, চিকিৎসার জন্য একটু বলে দেওয়া, ইত্যাকার শত ক্ষুদে বার্তা। কিন্তু সেদিন এসব দেখতে গিয়ে হঠাৎ চোখ আটকে গেল, প্রখ্যাত এক রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর দেওয়া বার্তায় উল্লেখ রয়েছে আরেক প্রখ্যাত শিল্পীর নিবিড় পরিচর্যা ওয়ার্ডে ভর্তির খবর।
শত শত দৃশ্য চোখের ওপর পলকে ভেসে উঠলো। মিতা, আমাদের মিতা হক – তীক্ষ্ণ স্বরক্ষেপণ, সরগমের নিখুঁত প্রয়োগ, অকল্পিত স্বরস্থান, অসম্ভব সুরেলা, খোলা, অবারিত কণ্ঠ, স্পষ্ট এবং দৃঢ় উচ্চারণ, রবীন্দ্রনাথের অনুন্মোচিত দিক জনসমক্ষে তুলে ধরার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন শিল্পীকে কোভিদ ছিনিয়ে নিল। অনেকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন কিন্তু কোভিদ শেষ সর্বনাশটুকু করল। খালেদ খান, তাঁর স্বামী চলে যাবার পর এমনিতেই দলছুট, ঘরে গুটিয়ে নেওয়া, নিজের গ্রাম কেরাণিগঞ্জে স্থায়ী নিবাস গড়া – তাঁর গানের স্কুল ‘সুরতীর্থ’র কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া, ঘনিষ্ঠ অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ হতে হতে আর দৃশ্যমান নয়, তারপরেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে ইউটিউবে খোঁজ করলেই বেরিয়ে আসতো তাঁর গাওয়া ‘চিরবন্ধু, চির নির্ভর, চির শান্তি।’সেই শান্তিতেই কি ঘুমাবেন বলে চলে গেলেন? এ প্রশ্নের উত্তর পৃথিবীর মানুষের জানা নেই। তবুও সবাই প্রশ্ন করে, কী আছে শেষে? পথের শেষ কোথায়?
ওয়াহিদ ভাই, আমাদেরকে তাঁর ‘আনন্দধ্বনি’ সঙ্গীতাঙ্গনে জড়ো করেছিলেন। বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তিনি, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা, সঙ্গীতগুরু, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর কাছে কী গুণে ভিড়তে পারার সুযোগ পেয়েছিলাম জানি না। আজ মনে হয়, ‘তোমার সভায় কত যে গান কতই আছে গুণী, গুণহীনের গানখানি আজ বাজলো তোমার প্রেমে।’ তাঁর প্রেমেই গুণহীন এই অধম স্থান পেয়েছিলো। অনেক হীরা-মুক্তার মাঝে পরিচিত হয়েছিলাম মিতার সাথে। আমাদের বয়সী, পাগলি পাগলি, ছটফটে – কিন্তু গানে নিমগ্ন হলে কী অসম্ভব ধীরস্থির, কী নিবেদন!

কলাবাগান, ধানমন্ডি, গ্রিনরোড, হাতিরপুল, আসাদগেট, আগারগাঁ, তালতলা হরেক জায়গায় ওয়াহিদ ভাই থেকেছেন।  সাথে তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ আর ছিলো মিতা, তাঁর ভাইয়ের আদরের কন্যাটি। কী অনায়াসসাধ্য ছিলো মিতার কণ্ঠ! যে-গান তুলতে আমাদের ঘাম ছুটে যেতো, মিতা শুনত আর তুলে নিত। একটি গান চাতালে বড়হংস সারং রাগে – ‘তাহারে আরতি করে চন্দ্রতপন।’ অল্প বয়স তখন, ভারী গান গেয়ে বাহবা নেবার একটা গোপন ইচ্ছা – কিন্তু শেখায় কে? দেখায় কে? ‘আনন্দধ্বনি’তে আগে গিয়ে বসে আছি, মিতাকে বলতেই গড়গড় করে গেয়ে দিল। তখন রেডিও/ রেকর্ড/ ক্যাসেটের যুগ – কোথায় শোনা আর কোথায় শেখা! গলা থেকে গলাতে তোলা একমাত্র মাধ্যম।
আরেকদিন বৃষ্টিভরা বিকেলে, ‘আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে’ – এই আবার শব্দে একই স্বরের যে দিত্ব খেলা – যা বেদনার অভিঘাতে ব্যর্থ প্রেমিকের মনে দোলা দেয়, সেই বারে, বারে, বারে শোনানো গান আবার শোনাতে চাওয়ার আকুলতা। মিতার কণ্ঠে কিন্নর যেন ভর করেছিলো ওই দিন। ‘তেমনি করে আমারে যদি জাগালে আজি নাথ’ – জাগানো যদি হলো, তাহলে অন্তত করুণ আঁখিপাতে করুণা দেখানোর আকুল আবেদন মিতার গলায় মূর্ত হতো।
তখন আমি একটা মফস্বল শহরে চাকরি করি – রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সভাপতি। প্রশিক্ষণে মিতাকে নিয়ে গেলাম আমাদের বাড়িতে। পাঁচতলার সেই খোলা ঘরে কিংবা ফরিদা বিদ্যায়তনের বাঁশের বেড়ার ক্লাসে – কী নিবিড় পাঠদান! কত ছাত্র, কত শিক্ষার্থীকে টেনে নিয়ে আসা কিংবা রবীন্দ্রনাথের গানের দিকে ঠেলে দেওয়ায় ছিলো তাঁর অক্লান্ত শ্রম। তা দেখে মন আপনিই আনত হতো। ওয়াহিদ ভাই ছিলেন গানের ফেরিওয়ালা। আমরা তাঁর সাথী ছিলাম। কিন্তু মিতা হক, বুলবুল ইসলাম, নীলোৎপল সাধ্য, লাইসা আহমেদ লিসা, শারমীন সাথী ময়না – এরা ছিলো সত্যিকার অর্থেই গানের বাহন। মনে আছে ২৫তম সম্মেলনে বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তনে গাইবার সুযোগ পেয়ে ঘাবড়ে গেলাম। মিতা, আমার বন্ধু, হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। স্টেজে বসিয়ে হারমোনিয়ম টেনে ধরে গাইয়ে ছাড়লো, ‘যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায় ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে।’ সেই মিতা কোথায় পালিয়ে গেল!
১৯৮৬ সালে রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের গানের ভাণ্ডারি শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যিনি রসায়নের অধ্যাপক হয়েও সঙ্গীতে গভীর দক্ষতার জন্য সঙ্গীত ভবনের প্রথম অধ্যক্ষ হয়েছিলেন, তিনি এলেন। এয়ারপোর্টে আমরা গিয়েছিলাম – বুলবুল, নীলোৎপল, শোয়েব, মিতা, লোপা। আমি ওই বিমানবন্দরেই ঘাড়ে এস্রাজ নিয়ে চলছি আর তিনি গাইছিলেন, ‘চলে এসো ঘরে পরবাসী।’ সেদিন মিতাসহ সবাই তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছিলাম।
ধানমন্ডি এক নম্বর রোডে, সেটা সম্ভবত মালেকা আজিম খানের বাসা, সেখানে শৈলজারঞ্জনের তালিম, ওয়াহিদ ভাইয়ের তবলার স্বর ধরে ধরে তিনি তালিম দিয়েছিলেন কত কত গানের। একটা গান খুবই মনে পড়ে, ‘আমি শ্রাবণ আকাশে ওই দিয়েছি পাতি।’ আমাদের মধ্যে ওই লম্বা গানের সুরের নানা মারপ্যাঁচ সম্পূর্ণটুকু তুলতে পেরেছিলো মিতাই। এর আগে ও পরে এখানে আর কাউকে ওই গান গাইতে শুনিনি।
‘যে গিয়েছে দেখার বাহিরে আজি তারি উদ্দেশে চাহিরে…/ সেই বারে বারে ফিরে ফিরে চাওয়া ছায়ায় রয়েছে লেগে মেঘে মেঘে’ – বলে এস্রাজে যে মোচড় শৈলজারঞ্জন দিলেন – আমার এখনও মনে আছে, ওই মীড় ও গমকের দ্যোতনা মিতার কণ্ঠে কেমন প্রাণ পেতো। এখনও কানে বাজে। পুরনো শিল্পকলা একাডেমির সেই টিনের ছাওয়া, দুপাশ খোলা মিলনায়তনে শৈলজারঞ্জনের সংবর্ধনা – মিতা গাইলো,

আজি গোধূলিলগনে এই বাদলগগনে
তার চরণধ্বনি আমি হৃদয়ে গণি –
সে আসিবে আমার মন বলে সারাবেলা
অকারণ পুলকে আঁখি ভাসে জলে।

গান তো নয় যেন জলরঙে আঁকা কাইয়ুম চৌধুরীর ছবি। বাদল আকাশ, মূর্তমান দয়িতার উন্মুখ অপেক্ষা – কারণ তার মন বলছে সে আসবে। কত গানের কথা বলব? মিতার সাথে গাওয়া, কাছে থেকে গাওয়া, শোনা, ওয়াহিদ ভাইয়ের সেই হারমোনিয়াম – মিতা গাইছে, ওয়াহিদ ভাই বাজাচ্ছেন। আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু – প্রায়ই মৃত্যুর পরে বাঙালির স্মৃতিতর্পণের এই গান যেন এক অপ্রতিরোধ্য প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। মিতার গলায় যারা এ গান শুনেছেন তারা জানেন, কী ব্যাথা, কী বেদনা মূর্ত করেছিল সে।
বেশ আগে, ও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছে। দেখতে গেলাম। বলল, এই তুমি জানো আমার ডাক্তারের নাম… বলেই হেসে গড়াগড়ি। কেন? না, এত বড় অধ্যাপকের এমন শিশুর মতো নাম! আমার হাত ধরে বলল, আবার এসো। ওই বোধহয় শেষ দেখা আর আজ শুনলাম ভোরে মিতা চলে গেছে।
রবীন্দ্রনাথের গানে যাদের ঘুম আসে, যারা এটাকে দুঃখ জাগানিয়া না বলে ঘুমপাড়ানিয়া অপবাদ দেন, তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, ভালো করে মিতাকে শুনুন। ওর গানের উজ্জ্বল আলোকে আপনার অন্তর উদ্ভাসিত হবে। মিতার সাথে গাওয়া একটা গান দিয়েই অর্ঘ্য দিই :

তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূর আমি ধাই
কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু
কোথা বিচ্ছেদ নাই ।

আমরাও চলে আসবো। নিশ্চই ওয়াহিদ ভাই আমাদের সবাইকে হাত ধরে সখার মতো নিয়ে যাবেন। তুমি আবার গাইবে, ‘দোলে প্রেমের দোলনচাঁপা হৃদয় আকাশে –।’ আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনবো। ভালো থেকো বন্ধু ।

লেখক বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। ব্যক্তিগত জীবনে মিতা হকের বন্ধু ছিলেন।

Share Now শেয়ার করুন