তর্জনীতে মানচিত্র আঁকলেন তিনি >> ৭ই মার্চ উপলক্ষে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ >> মাহবুব সাদিক / মাসুদুজ্জামান / মুজিবুল হক কবীর / অনিকেত শামীম / জুনান নাশিত / মিহির মুসাকী

0
221

তর্জনীতে মানচিত্র আঁকলেন তিনি >> ৭ই মার্চ উপলক্ষে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ

মাহবুব সাদিক >> দুরন্ত তর্জনী তার

চেতনা জলের তলে মাঝে মাঝে তাকাই কখনো
দেখি তরুণ জীবন ছিল রক্তঝরার ক্রুর দিন –
তবে সেখানেও ছিল কিছু অনিন্দ্য সৌন্দর্য়কণা
ছিল স্বস্তিকর ক্ষণ – ছিল পিপাসার্ত মানবের
পানযোগ্য মিঠেজল; ছিলেন এমন মানুষ
যাঁরা জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে জাতীয় মুক্তির
দিক দিশা নিতেন হৃদয় এঁকে –
আমরা সেই ঋজু হৃদয়ের ছবি দেখেছি বহুবার,
দেখেছি ষাটের দশক জোড়া – দেখেছি অন্তিম ষাটে
বাঙালির হৃদয়কোষে বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন বুনে
বাংলার মুক্তির বীজ – স্বাধীনতার রাঙা স্বপ্ন-সাধ
সেই স্বপ্ন বুকে পুরে ভয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা সবাই –
অঙ্কুরিত সেই বীজ ডালপালা মেলে একাত্তরে হলো মহিরুহ;

স্মৃতির ধূসর ঝোপ-ঝাড়ের ফাঁকে আজো আমি দেখি
বঙ্গবন্ধুর সেই দুরন্ত তর্জনী ভালোবেসে আজও ছুঁয়ে আছে
তোমাকে-আমাকে আর তাবৎ বাঙালির তৃষিত হৃদয়।

মাসুদুজ্জামান >> বাংলাদেশের কবি

অন্তরীক্ষে শূন্যে কার উত্থিত আঙুল
পতাকার মতো গাঢ় অসীমে উড্ডীন
জড়িয়ে গিয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ-ঝলক
তূর্য় তুমি এসো বজ্রে ঘেরা শুভদিন

শূন্যতার কোনো স্পষ্ট অবয়ব নেই
দিয়েছেন তিনি উদ্ভিদের সূর্য়দেশ
অপার ঝিলিক স্ফুলিঙ্গ ও অগ্নিকোণ
মেষপালকের চোখে স্বপ্ন অনিঃশেষ

গোধূলির দ্যুতি অসীম শূন্যতা থেকে
তখন দাঁড়ালো যেন হৃৎপিণ্ড ঘিরেই
সবুজের দিকে ধেয়ে আসা সব নেকড়ে
ঢুকে গেল কোনা অলৌকিক অরণ্যেই

আঙুলের তুলির আঁচড়ে একটা ছবি
ফুটিয়ে তুললেন মানচিত্র সৌরকবি

মুজিবুল হক কবীর >> মেঘনাদ কণ্ঠ

তোমার আঙুলের ইশারায় জেগে ওঠে এই চরাচর,
আমরা প্রস্তুত হই নানা আয়োজনে।
হৃদয়ে জোয়ার আসে,
জোয়ারের জল টলমল করে ওঠে নীরব হৃদয়ে
শরীরে-শিরায় জাগে কাল ভৈরবীর গান,
আসে জাগরণ মহাজাগরণ।

গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসে মেঘনাদ কণ্ঠ
কেঁপে ওঠে রুক্ষসূক্ষ্ণ হাওয়া,
সবুজপত্রী ডাল, জলজ পাখির ডানার পালক,
সোনালি ধানের উদ্যত শির,
কেঁপে ওঠে নিখিলমানব।
তোমার একটি আঙুলের ইশারায়
হাজার হাজার বর্গমাইল জুড়ে মানুষের ঢল নামে –
মহাকাশ নড়ে ওঠে, আমরা সবাই মাকড়সার মতো স্বপ্ন পূরণের জাল বুনে চলি,

সাতই মার্চ।
অগ্নিগর্ভ দিন,
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
উত্তাল জনসমুদ্র-হৃদয়-সংবেদ নিয়ে দাঁড়াও ত্রিকালদর্শী –
এমন অমল, সুন্দর তীর-তীব্র শব্দমালা কেউ শোনেনি কখনো –
এমন বারুদমাখা শব্দপুঞ্জ
শুধু তোমার কণ্ঠেই মানায়।

আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে তুমি আছো হে স্বাধীনতার রূপকার,
পনেরোই আগস্ট – চলতি হাওয়া থেমে যাওয়ার রাত,
হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ার রাত,
মধ্যযামে বত্রিশ নম্বর বাড়ির সিঁড়িতে পা রাখে ঘাতক শ্বাপদেরা,
তোমার শালপ্রাংশু দেহ, সিংহ-হৃদয় লুটিয়ে পড়ে
মসৃণ সিঁড়িতে ধাতববৃষ্টিতে,
আমাদের দু’চোখের তীরে আজ ঘুরেফিরে শ্রাবণের প্রথম দিনের মেঘপুঞ্জ –
আমরা কখনো নির্বাক, কখনো সরব শুধু
তোমারই নামে।

আমাদের মাথার উপরে টাঙিয়ে দিয়েছো তুমি
একখানি স্বাধীন আকাশ, উড়িয়ে দিয়েছো চিরহরিতের দেশে
প্রতীকনির্ভর উজ্জ্বল পতাকা; দাঁড়াবার জন্য নিরঙ্কুশ নিরাপদ ভূমি।
হে মহানায়ক
তুমি আছো আমাদের নিত্য অনুভবে, হৃদয়ের অবিভাজ্য মোহনায়।

অনিকেত শামীম >> তর্জনীর স্পর্ধিত অহংকার

কতবার অন্ধকার যেতে পারো তুমি, বাংলাদেশ।
তোমার তো রয়েছে গৌরবগাঁথা
আলোকোজ্জ্বল রৌদ্রের অমা
স্পর্ধিত অহংকারে একটি তর্জনী
আমাদের জাগিয়ে তোলে, সাহস জোগায়।

বাংলার জল-মাটি-কাঁদায় বেড়ে ওঠা
একজন মহামানব আমাদের মুক্তির দিশারী
তোমার বজ্রনিনাদ কণ্ঠ এখনও
বাংলার আকাশে-বাতাসে ঘুরে বেড়ায়,
জীবনের রূঢ় গোপনতায় যখন নিষ্পলক চোখ জলে ভিজে যায়
তখন মহাকাশব্যাপী তোমার সেই বজ্রনিনাদ কণ্ঠ
দিগন্তের প্রচ্ছদ মাড়িয়ে আমাদের সচকিত করে তোলে
আমরা বুক টান করে উঠে দাঁড়াই
আর ধুলো-মাটির সংসারে ছিন্নভিন্ন বসন্তের পঙ্ক্তি সাজাই।

কত আর অন্ধকারে যাবে তুমি বাংলাদেশ।

জীর্ণ করোটিজুড়ে বিষণ্ণতার বিষবৃক্ষ ছেয়ে আছে
সবখানেই বাসা বেঁধেছে ফনাতোলা বিষাক্ত সাপ
আমাদের মানচিত্র ঠুকরে ঠুকরে যাচ্ছে ধূর্ত খাটাশ
হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে গর্বিত পতাকা

না, এভাবে সমূহ-বিনাশের দিকে যেতে পারো না বাংলাদেশ!

পাঠ নাও বাংলার সাফল্যগাথা,
একটি তর্জনীর ইশারায় কীভাবে জেগে উঠেছিল
গ্রামবাংলার জনপদ, পাঠ নাও –
সেই বজ্রনিনাদ আর তর্জনীর স্পর্ধিত অহংকারে
হেসে উঠবে তুমি বিশ্বসভায়, আমার বাংলাদেশ।

জুনান নাশিত >> তোমার তর্জনী

আকাশের একগুচ্ছ ছায়ার গল্পে
তোমার তর্জনীর ডাক
একদিন প্রান্তর পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল
দিগন্তের সমারোহে
ছোপ ছোপ কালো নিশানার পাহারা ভেঙে
তোমার উত্থিত হাতের ঝাঁঝে চাপা পড়েছিল অযুত-নিযুত স্বৈরঢাক
স্বাধীন ও রক্তাক্ত আকাঙ্ক্ষায় যেদিন প্রাচীর গড়েছিল জিঘাংসা পাগল শকুনের দল
সেদিন, সেদিন তোমার ওই একক তর্জনী গর্জে উঠেছিল
যেন এক স্পর্শকাতর সময়ের পাড়
যে সময়টা ছিল জনতার
কবিতামুখর এক ঘোরগ্রস্ত কাল।

তোমার তর্জনী বেয়ে গড়িয়ে পড়া বিন্দু বিন্দু ঘাম
যেন একেকটি রক্তের ফোঁটা
মিশে গিয়েছিল তিরিশ লক্ষ শহীদের ঝাঁঝরা বুকের গভীর থেকে
নিঃশেষে গড়িয়ে পড়া নরম আলোর উৎসারণে
তোমার উদ্বাহু স্বপ্নের ধ্বনি প্রতিধ্বনির রেশ
তর্জনীর চারপাশে পাক খেতে খেতে
ঘূর্ণি তুলেছিল বঙ্গোপসাগর থেকে হিমালয়ের নিস্তব্ধ চূড়ায়।

তোমার তর্জনী এখনও অপলক, অতন্দ্র !
বাংলার ঘর থেকে ঘরে
শস্যচেরা বীজের বাহুতে
তোমার বোধের উল্কি
এখনো নিশানা

স্বপ্নভূক গাঙ্গেয় বদ্বীপ সীমানার।

মিহির মুসাকী >> ৭ই মার্চের ভাষণের মানে

গৌতম বুদ্ধ নির্বাণে গেছেন
বাংলাদেশের শিখা কখনো যাবে না নির্মাণে,
স্বাধীনতা বুঝতে হলে
বুঝতে হবে পিতা,
আপনার ৭ই মার্চের ভাষণের মানে

বুঝতে হবে কেন দাবালন উঠেছিল জ্বলে সারা বাংলায়
আপনার মুক্তির ডাকে,
বঙ্গবন্ধু, যখন আপনার তর্জনী আকাশ পানে –
নেমেছিল রাজপথে কোটি বাঙালি
ফুটেছিলো বিদ্রোহের ফুল স্লোগানে স্লোগানে।

শূন্য হাতে কী করে হয় গেরিলাযুদ্ধ?
অস্ত্র তখন বিশ্বাস আর মনোবল,
চোখে জ্বলে ঘৃণার বারুদ
ভেঙে যায় বন্ধন-শৃঙ্খল।
আপনার কথায় দুর্গ হলো বাংলার প্রতিটি ঘর,
বাংলা ফিরে পেলো তার শক্তি, হারানো সুর
সাড়ে সাত কোটি সন্তান
নেতা আপনি, পিতা আপনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর।

আপনার ভয়ে পরাজিত হানাদার শেয়াল
পালিয়েছিল গুটিয়ে লেজ একাত্তরে,
পিতা আপনি, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি
বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা চিরকাল অন্তরজুড়ে।

সূত্র : বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি
Share Now শেয়ার করুন