তুষার আবদুল্লাহ > নুসরাতের শেকল পায়ের জীবন >> শিশুমনস্তত্ত্ব

0
1114

নুসরাতের মন-খারাপের গল্প

নুসরাতের বাবা সব সময় ছোট্ট নুসরাত আর তার মাকে সবসময় এটা করো, ওটা করবে না বলে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এই নিয়ে নুসরাতের মনে নানান প্রশ্ন জাগে। মন খারাপ হয়ে যায়। আমরা বড়রা কী কখনো ভেবে দেখেছি, ছোটরা এটা চায় কিনা, কিংবা এর সবটাই কি যৌক্তিক?
নুসরাত বড় হচ্ছিল নানা-নানুর সঙ্গে। নুসরাতের বয়স যখন দেড় বছর, তখনই ওর বাবা পড়তে লন্ডন চলে যায়। মায়ের সঙ্গে ও নানা বাড়িতে  এসে ওঠে। নুসরাতের মা চম্পাও চাকরি করে। সকাল থেকে রাত আটটা-নয়টা অফিসেই কেটে যায় চম্পার। মেয়েকে সময় দিতে পারে কম। তবে নিশ্চিত থাকে নানা-নানুর কাছে মেয়ে নিরাপদ ও যত্নেই থাকবে। নুসরাতও তার সব কিছুর জন্যই নানুর ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। বাবা বছরে একবারও আসে না। প্রথম যেবার ফিরলো সেবার নুসরাত স্কুলে যেতে শুরু করেছে। নানু  স্কুলে নিয়ে যায়। নিয়ে আসে কোন কোন দিন নানা। কিন্তু বাবা আসার পর নানা-নানুর কাছে যেতেই দেয় না। সারাক্ষণ নিজের সামনে নুসরাতকে বসিয়ে রাখে। টিভি দেখলেও বাবার সামনে বসে দেখতে হবে। স্কুলে যাওয়া আসাও বাবার সঙ্গে। নুসরাতের মাকেও বাবার বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে অফিস শেষ করে ফিরতে হয়। বাড়ি ফিরে ঘরের মধ্যে বাবার সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। পরিবারের অন্যদের সঙ্গে খাওয়াও যাবে না। টেলিফোনে কারো সঙ্গে কথাও বলতে হবে লুকিয়ে। রাত দশটা বাজতেই লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। ঘুম আসুক কিংবা না আসুক। প্রথমবার নুসরাত আর ওর মা ভেবেছিল বাবা যেহেতু অনেকদিন বাইরে ছিল, তাই মেয়েকে বউকে কাছাকাছি রাখতে চায়।  কিন্তু না দ্বিতীয়বার  এলো ছয় মাস পর। একই আচরণ তখনও। এসে প্রায় একবছর থাকলো ওদের সঙ্গে আচরণে পরিবর্তন হলো না। নুসরাত কারো সঙ্গে কথা বলতে পারে না। নানা-নানু, খালা-মামা, চাচা-চাচি এমনকি  খালাতো, চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গেও খেলতে দেয়না। বাবা’র সামনেই কথা বলতে হবে। চম্পাও বাবা-মায়ের সঙ্গে বুঝে-শুনে কথা বলে। ভাই বোনদের সঙ্গে কথা বলে স্বামীকে লুকিয়ে। ওই সময় থেকেই নুসরাত ক্ষণ-গননা করতে থাকে, বাবা কবে আবার বিদেশ চলে যাবে। সবার কাছে জানতে চায় বাবা কেন যাচ্ছে না। ঢাকায় বাবার এতো কি কাজ? সত্যি বাবা যখন সত্যি আবার লন্ডন চলে গেল তখন নাসরিনের কী যে আনন্দ! মনে হচ্ছিল ওকে যেন কেউ এতদিন খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল। মায়ের মুখেও যেন অনেক দিন পর প্রাণখোলা হাসি দেখতে পেল।
নুসরাত সব সময়ই চায় যেন বাবা ঢাকায় দেরি করে ফেরে। কি দরকার আসার। পড়া শেষ হলে ওখানেই চাকরি নিয়ে নেক। ওরা তো ঢাকায় বাবাকে ছাড়া ভালোই আছে। কিন্তু দেরিতে হলেও নুসরাতের বাবা ফেরে। তখন নুসরাত ক্লাস টু’তে উঠে গেছে। বাবা এবার এসে যেন মেয়ের চারদিকে আরো বৃত্ত একেঁ দিল। পায়ে পড়িয়ে দিল শেকল। গান শিখতে মানা করে দেয়।  বাংলা বই পড়তে নিষেধ করে। ছবি আঁকা যাবে না। ধর্মের বই পড়তে বাধ্য করে। মাকেও চাকরি ছেড়ে দিতে বলে। হর্ঠাৎ নুসরাত জানতে পারে বাবা আপাতত আর লন্ডন যাচ্ছে না। আলাদা বাসায় ওঠে ওরা। ব্যস সবার সঙ্গে যোগাযোগে বন্ধ। নানুর বাড়িতে কোন অনুষ্ঠানেই আসা হয় না। বাবা যখন বাইরে থাকে কোন কাজে, তখন মা চুপেচুপে মোবাইল অন করে নানা নানুর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। খালাদের সঙ্গে কথা হয়। এখনো রাত দশটার মধ্যে ঘুম না পেলেও বাতি নিভিয়ে ঘুমাতে হবে। নুসরাতের কোন কিছু খেতে ইচ্ছে করলে খেতে পারবে না, মা চাইলেও মেয়েকে কিছু কিনে দিতে পারবে না বাবার সম্মতি ছাড়া। চম্পা নিজেও চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।  নানার সঙ্গে যখন ফোনে কথা হয়, তখন নুসরাত বলে-আমাকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছো কেন তোমরা?  ফুফুকেও ফোনে বলে – তোমার  ভাই এমন কেন? আমি  আর মা কি কোথাও পালিয়ে যাবো?
না। ওর বাবাই শেষ পর্যন্ত ওদের নিয়ে লন্ডনে চলে যায়। নুসরাত ভেবেছিল এখানে এসে নিশ্চয়ই বাবার আচরণও বদলে যাবে। এখানেতো আর আত্মীয় পরিজনদের কেউ নেই। নিজেদের মতো করে বাঁচতে পারবে ওরা। না, বাবা বদলালো না। লন্ডনেও ঘরে বন্দি করে রাখছে মা-মেয়েকে। একা দুইজন কেনাকাটা করতে দোকানে যেতে পারে না। কাছের পার্কে হাঁটতে যাওয়াও বারণ। ঢাকায় ভিডিও কলে সবার সঙ্গে কথা বলাও যাবে না বাবা ঘরে থাকলে। ঢাকা থেকে সবাই উন্মুখ হয়ে থাকে ওকে দেখার জন্য। মায়েরও মন উচাটন হয়ে থাকে ভাই-বোন, বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে, সেটাও করা যাচ্ছে না। বাবা কোন কাজে দূরে গেলে বা ঘরে না থাকলে ঢাকায় ভিডিও কল করা যায়। বছর তিন এভাবেই চলে গেল। নুসরাতের সময় এসে গেছে হাইস্কুলে যাওয়ার। মা এখানে এসেও ভালো নেই। মুখে হাসি থাকে না কখনও। কেমন বিধ্বস্ত হয়ে গেছে মুখটা। নুসরাত নিজেও স্কুল থেকে ফিরে বিছানাতেই শুয়ে থাকে। পড়ালেখা সব বিছানাতেই। দুই একদিন অ্যাপার্টমেন্টের সুইমিং পুলে যেতো সাঁতার কাটতে। বাবার নিষেধে এখন আর সুইমিংপুলেও যাওয়া হয় না।
এখনকার নতুন সমস্যা হলো নুসরাতের যে খালারা কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় থাকে তারা অনেকদিন পর দেশে যাচ্ছে ছুটিতে। নুসরাতদের এই সময়ের মধ্যেই প্রথমবারের মতো দেশে যাওয়ার কথা ছিল। বড়দিনের সময়ে। বাবা বলেছিলেনও টিকিট কাটার কথা। খবরটি নুসরাত, চম্পা এবং ঢাকায় সবার মনে আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছিল। তবে নানু চুপেচুপে বলেছিল মাকে-চম্পা, তোরা আগে আয়। জামাই না হয় কয়টা দিন পরে এসে তোদের নিয়ে যাবে। কারণ নানুর মনে ভয়, বাবা যদি ঢাকায় গিয়ে ওদের শেকলে আটকে রাখে, তাহলে সব আনন্দইতো মাটি। মা কিছু বলেনি বাবাকে। নিজের মতো করে দেশে ফেরার জন্য গোছগাছ করছিল। এর মধ্যেই একরাতে বাবা এসে বলে- এখন যাব না। সবাই গিয়ে ফিরে আসুক। তারপর আমরা যাবো। খামোখা এখন গেলে হৈ চৈ। গাদাগাদির কি দরকার। ব্যস চাঁদের আলোটাই যেন নিভে গেল। সবার মন চুপসে যায়। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকে যারা যাবে তাদের মনটাও খারাপ হয়ে গেল। ভেবেছিল সবাই কতদিন পর একসাথে হবে। সেই আনন্দ নুসরাতের বাবা ভণ্ডু করে দিল। চম্পা রান্না ঘরে গিয় লুকিয়ে কাঁদে। নুসরাত কাঁদে না বাবা এমনটাই করতে পারে যে কোন সময়, এটা ওর জানা। আগের মতোই স্বাভাবিক থাকে ও। বাবা’র কাছে কিছু জানতেও চায়নি ও। শুধু মাকে বলে- বিয়ে করার আগে, একটু  দেখে-শুনে নেবে না, কাকে বিয়ে করছো?
Share Now শেয়ার করুন