দাউদ হায়দার | হিরন্ময় কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা | জন্মবার্ষিকী

0
96

সম্পাদকীয় নোট : আজ ৩০ সেপ্টেম্বর। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার ৭২তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর এই জন্মদিনটিতে তীরন্দাজ-এর শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে একটি অগ্রন্থিত দুর্লভ লেখা পুনঃপ্রকাশ করা হলো। লেখাটি লিখেছিলেন কবি দাউদ হায়দার। মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শোনিতে সমুদ্রপাত’ প্রকাশের পরপরই দাউদ এই লেখাটি লেখেন এবং এটি প্রখ্যাত ‘বই’ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩৮০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। কাব্যজীবনের সূচনাতেই মুহম্মদ নূরুল হুদা যে একজন স্বতন্ত্র উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবে আভির্ভুত হয়েছিলেন, সমসময়ের সতীর্থ কবি হিসেবে দাউদ হায়দার সেটা ঠিকই সনাক্ত করতে পেরেছিলেন। 

মুহম্মদ নূরুল হুদা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি, অন্তত আমার মতে। একজন কবি শুধু তাঁর কাব্যকলায় প্রমাণ রাখতে পারেন – শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
আমি যখন শোনিতে সমুদ্রপাত সম্পূর্ণ আয়ত্তে এনে ফেলি; তখনই দেখতে পাই সমুদ্রের বিশালতা কতখানি।

সামান্য কাহিনি যেমন অনেক সময় বিশ্বকে আন্দোলিত করে, পরিপার্শ্বের দৃশ্যমালাকে সজীব করে; তখনই চোখের সামনে দৃশ্যমান – একজন মানুষের কার্যাবলী তথা রূপের সঠিক বর্ণনা।

‘সত্যের অধিক সত্য’ হয়ে আমার কাছে একজন কবি এসে, সত্যবান রূপে নতজানু হয়ে ধরা দেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর ক্রিয়াকলাপ তুলে ধরেন।

ক্ষমতার এমন বহিঃপ্রকাশ, শুধু কবিই দিতে পারেন।

অনেকদিন আগে আমি একটি ব্যক্তিগত প্রবন্ধে উচ্চারণ করেছিলাম; কবিতা যেমনই হোক না কেন; তার শরীরে যদি নিপুণভাবে রক্তের ব্যবহার হয় তাহলে নিঃসন্দেহে সুন্দরী হয়ে উঠবে। তবে তার জন্যে প্রয়োজন দক্ষ কারিগর। একজন কারিগর রক্ত ব্যবহার করলেই; কারিগরী প্রস্ফুটিত হবে; এমন কথাও নেই। তবে তাকে অবশ্যই জানতে হবে কোথায় রক্তের ব্যবহার চলতে পারে।

মানবিক প্রেমে উল্লসিত হয়ে কখনো কখনো নিজেরাই বলে উঠি; আমার অস্তিত্বে তোমার ভালোবাসা; ভালবাসায় আমি উজ্জ্বল। উজ্জ্বলতায় আমি তুমি একাত্মা। একাত্মা; সন্দেহ নেই, তবে, মিলনই সবচেয়ে গাঢ়তর সম্পর্ক। সম্পর্কেই মহীয়ান।
মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’ আমার কাছে একটি প্রিয়তম কবিতার পাণ্ডুলিপি হিসেবে ধরা দিয়েছে।

তাঁর প্রত্যেকটি কবিতায়; শব্দাবলীতে ছন্দের যে মিউজিক; বর্তমান কালের যে কোন কবির কবিতাতেই তা দুর্লভ।

কিছুক্ষণ আগে বাংলাদেশের একজন তথাকথিত বিখ্যাত কবির কাব্যগ্রন্থ পাঠ করছিলাম; সেখানে দেখতে পেলাম; কাব্যের এমন সমারোহ যেন পল্টনের ময়দানে কোন রাজনৈতিক নেতা। তার কোন আগা মাথা নেই; যেমন ইচ্ছে তেমন বলে যাচ্ছে; কেউ বাধা দিচ্ছে না।

অথচ কোন কিছুই হচ্ছে না। উক্ত কাব্যগ্রন্থকে; কবিতার বই না বলে পদ্যের এবং বাক্যের গ্রন্থাবলী বলে চিহ্নিত করেছি। এগুলো আমার মতামত। মতামতে দ্বিমত হলে; আপনাকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে – কবিতা কি। কবিতার সঠিক বর্ণনায় আপনাকে যেতেই হবে।

মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘শোনিতে সমুদ্রপাত’-এ মোট ৩৭টি কবিতা আছে। প্রত্যেকটি কবিতায় এক-একটি কাহিনিসহ প্রত্যেক শব্দ-ছন্দের যে ব্যবহার; যে-কোনো কাব্যরসিককেই মোহিত করবে।

১। জনকের ধুসর দাড়িতেও লেগে রয়
ফসল তোলার আগে ধানখেতে
পোকার প্রকোপ

২। সত্যের অধিক সত্য; পৃথিবীর শেষতম ঘোষণা

৩। দূরে যাচ্ছ; বৃষ্টির প্রপাত থেকে দূরো যাচ্ছ রিমঝিম পায়
বাজিয়ে শঙ্খের চুড়ি,
হাওয়ায় এলিয়ে দিয়ে কালো কেশদাম ঘূর্ণি নৃত্যে মেতে দুরে যাচ্ছ
দূরে যাচ্ছ তুমিও উর্বশী

৪। যেখানেই হাত রাখি তোমার শরীর

৫। জেনেছো যেখানে যাবে সেখানে নরক
লতানো জিহ্বার মতো লকলকে আগুনের শিখা,
সাপের দঙ্গল
তোমাকে ছিঁড়বে এসে, ছিঁড়বে নখরে দাঁতে
কলঙ্কিত তনুর তিমির।

৬। বিশাল রৌদ্রের স্নেহে আস্তে আস্তে ঝড়ে ডালপালা,
জলীয় বাষ্পের গান
মহৎ উত্থানলোকে বৃক্ষলীন সন্ততির ঘাড়ে ও গর্দানে
যেমন আদিম রৌদ্র; মানবিক কেশের বাহার।

৭। ধুসর অরণ্যে রণে চাঁদের চরণ
অথবা চাঁদের বুকে মানুষের পা’র
বাতাসের কানে কানে সবুজ নিশান
কিংবা
নিশানের কানে কানে বাতাসের স্বর ।

৮। তোমার মাথার কাছে আম্মা আর ফুফুদের কোরানের সুর
মিশে যাচ্ছে শ্রাবণের তীব্র ধারাপাতে

৯। গুটিয়ে যাও গুটিয়ে গেলেই সুখ
রোদ দুপুরে পুড়বে না আর বুক

১০। তখনি সে আলো জ্বালে,
সেও যেন দেখবেই খুঁটিয়ে আমাকে

উদ্ধৃত কবিতাগুলো থেকে নিশ্চয় প্রমাণিত হচ্ছে; কারিগরের কতখানি দক্ষতা। হুদার দক্ষতা সম্পর্কে কেউ-ই; আমার মনে হয়, দ্বিমত পোষণ করবেন না। কেননা, তাঁর ছন্দপতন তো দূরের কথা; বাক্যের এমন ব্যবহার; যেন রেডিয়াম ঘড়ির মতো হিরন্ময় পংক্তিগুলো জ্বলছে।

আমার বক্তব্যের সপক্ষে আরো একটি যুক্তি দাঁড় করানো যায় – প্রতীক কিংবা কাহিনি দিয়ে কবিতা হয় না; অন্তত বর্তমানে; সবাই জানেন। ছন্দ প্ৰতীক শব্দাবলী এই ত্রয়ীর মিশ্রণে কবিতা হয়ে ওঠে একটি সফল কবিতা এবং গান। গান যেমন মানুষকে আনন্দ দেয় ঠিক তেমনি কবিতা হৃদয়কে সচকিত করে।

মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিসেবে ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’ উল্লেখযোগ্য সংযোজন; অন্তত আমাদের কাব্য-জগতে সন্দেহ নেই; তবে আমার মতে কাব্যগ্রন্থটি আরো কিছুদিন পরে প্রকাশ পেলে ভালো হতো। তথাকথিত কবিদের ভিড়ের চাপে তাঁর সমুদ্র নদীর পর্যায়ে চলে গেছে।

নদীতেই প্রমাণ পাওয়া গেছে; সমুদ্র এখানেই নিহিত।

বলছিলাম, কিছুদিন পরে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হলে ভালো হতো। তার কারণ, তাড়াহুড়োর মধ্যে প্রকাশিত হবার ফলে প্রচ্ছদ ছাপা কাগজ সবই যেন কেমন খাপছাড়া হয়ে গেছে।

শোনিতে সমুদ্রপাত | মুহম্মদ নূরুল হুদা | শব্দরূপ প্রকাশনী | ঢাকা

 

 

Share Now শেয়ার করুন