দিলওয়ার হাসান >> গুলতিওয়ালা, রাজশকুন ও একটি খুনের ঘটনা >> জীবনের গল্পস্বল্প >> ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা

0
406

দিলওয়ার হাসান >> গুলতিওয়ালা, রাজশকুন ও একটি খুনের ঘটনা 

একটা বড় ভূষির বস্তা কালিগঙ্গা থেকে বেরিয়ে বানটিদিয়ার কাছে খালের ভেতর ঢুকে পড়ল। পড়ন্ত দুপুরে বানটিদিয়ার লোকজন ভাতঘুম দিচ্ছিল বলে বস্তাটা দেখতে পেল না। দেখল উত্তর সিটাইয়ের লোকেরা। তারা ভাতঘুম শেষ করে একে একে বাইরে বেরিয়ে আসছিল।
খালের দুপাশে ঘরবাড়ি। এখান থেকেই স্বর্ণকমলপুর শহরের শুরু। উত্তর সিটাইয়ের লোকেরা ভাবল এত বড় ভূষির বস্তাটা খালে ফেলল কারা, কেনই-বা ফেলল?
বস্তাটা ততক্ষণে ভাসতে-ভাসতে কলেজ রোড সংলগ্ন এলাকায় ঢুকে পড়েছে। খাল এখানে বাঁক নিয়ে শহরের বুকের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। আবার গিয়ে কালিগঙ্গায় পড়বে নতুনকান্দিতে।
কলেজ রোডের লোকজন ততক্ষণে বিকেলের চা-টা খেয়ে বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা ভূষির বস্তাটা ভাল করে খেয়াল করতেই দেখল ওটি একটা লাশ। ফুলে ফুলে ভূষির বস্তার মতো হয়ে গেছে। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন বুঝতে পারল এটা একটা মেয়েমানুষের লাশ। তখন তারা অবাক হলো।
লাশ ভেসে আসার খবর চাউর হলে লোকজন খালের দুপাশে ভিড় জমাল। এদিকটাতে খাল একটুখানি সরু বলে লোকজন লাশটা ভাল করে দেখতে পেল।
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। চোখ খোলা। শেষবারের মতো আকাশ দেখছে। দু’ পাশের কিছুই তার চোখে পড়ছে না। আষাঢ় মাস। জল টলটলে হয়ে আসছে। গাছের পাতারা থিরথির করে কাঁপছে।
লাশ বুবুনদের বাড়ির সামনে এলে সে চিৎকার করে উঠল : ভালচার, ভালচার । বুবুনের চোখ লাশের দিকে নয়, তার ওপর বসে থাকা রাজশকুনটার ওপর। এতক্ষণ কেউ খেয়ালই করেনি। লাশের বুকের মধ্যিখানে একটা ছুরি বেঁধান। সোনালি বাট ঝকমক করছে।
লাল মাথাওয়ালা দেখতে ভয়ঙ্কর শকুনটা ভয়ে ভয়ে মানুষের দিকে তাকাচ্ছে। মানুষ দেখে ভয় পায় না এমন প্রাণী জগতে নেই। বেশিক্ষণ আগে এসে বসেনি। লাশ এখনও অক্ষত। শকুন একটা ঠোকরও বসায়নি। গলাটা সাপের মতো লম্বা। মাথা, ঘাড় আর গলা কোঁচকানো লাল চামড়ায় ঢাকা। পা দুটো গোলাপি।
বুবুন এক দৌড়ে বাড়ির ভেতরে গেল, গুলতিটা বের করল তারপর মাটি দিয়ে বানানো মার্বেলের মতো এক মুঠো গুলি পকেটে পুরে বেরিয়ে এল।
ততক্ষণে খালের দু পাড়ে ভিড় জমে গেছে। একটা লোক চিৎকার করে উঠল : ওই যে ফুলকুমারি। কদিন আগেও মাধবী টকিজের সামনে তাকে হি হি করতে দেখেছি। কখন মরল। তাকে মারলই বা কে?
বুবুন শকুনটাকে তাক করে একটা গুলি ছুড়ল। গুলিটা শকুনের পাখনায় গিয়ে লাগলে পাতা শরীরে পড়লে মানুষ যেরকম একটুখানি গা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দেয়, শকুনটাও তা-ই করল। বুবুন হামলাটা পেছন দিক থেকে করেছিল বলে শকুন বিরক্তকারীকে দেখতে পায়নি, একটুখানি আড়মোড়া ভাঙল শুধু। বুবুন পিছু ছাড়ল না। সে আবার একটা গুলি ছুড়ল। ওটা লাগল শকুনটার মাথায়। মাথা ঝাড়া দিয়ে লাশের ভুঁড়িতে ঠোকর বসাল। মুহূর্তের মধ্যে লাশটা ছিন্নভিন্ন করে ফেলল।
পাড়ার একটা মেয়ে বলল, ‘ বুবুন তুমি এত বড় শকুনটা মারতে পারবে না। তোমার দৌড় টুনটুনি, চডুই, শালিক, বড়জোর ঘুঘু।’
বুবুন এসব কথায় কান না দিয়ে ছুটতে লাগল। তখন হাকির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তার। হাকির আসল নাম আবদুল হাকিম। সে এ পাড়ার রইস মোল্লার বাড়ির রাখাল। তার গরু পালে। এ শহরের সবচেয়ে বোকা লোক বলে পরিচিত । হাকির মাথায় একটা চুলও নেই। সে মাকুন্দো। দাড়ি-গোঁফ পর্যন্ত ওঠেনি। পিনপিন করে নাকি সুরে কথা বলে।
হাকি বলল, ‘ তুমি শকুন ক্যান্ মারতেছ বুবুন? শকুনের গোস্ত তো খাওন যায় না । তুমার ঘুঘু মারন দরকার।’ বুবুন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘ হাকি তোমাকে সবাই কাতি বলে কেন?’
‘সেইতা আমি কমু ক্যাবা কইরা?’
‘তুমি যে একথা বলবে, তা আমি জানতাম। আচ্ছা হাকি সবাই শুধু লাশের কথা বলছে, এত সুন্দর শকুনটার কথা বলছে না কেন?’
‘শকুন দিয়া কী অয়? খালি মরা খায়। মরা গরু, মরা মানুষ…’
‘হ্যাঁ হাকি, ওরা রোগাক্রান্ত যে-কোনো মরা প্রাণী খেয়ে হজম করে ফেলতে পারে। এরাই অ্যানথ্রাক্স, যক্ষা আর খুরারোগের সংক্রমণ হতে প্রাণীদের বাঁচায়।’
হাকি বলল,’বাঁচায়, তাইলে তুমি অরে মারবার চাও ক্যান? ‘
‘ধুর, গুলতি দিয়ে কি শকুন মারা যায়? ওর সঙ্গে একটু মজা করছিলাম।’
তখন একটা লোক আর একটা লোককে বলল, ‘দ্যাখো, লাশের পেছনে ভেসে যাওয়া কচুরিপানা ফুলগুলান কী সুন্দর! মাঝে একটুখানি নীল আর পাপড়িগুলা হালকা বেগুনি! ‘
‘মরা বেইশ্যার লাশ দ্যাখ, পানাফুলের কীর্তন গাওনের কাম কি তুমার?’
‘কীর্তনতো শ্যাষ হয় নাই – ভাইজাও খাওন যায়। বড়ই স্বোয়াদ!’
লাশটা ভাল করে দেখার জন্যে তারা খালের আরও কিনারায় নেমে গেল। হাকি আর বুবুনও গেল। বুবুন পট করে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘আচ্ছা হাকি, খানকি মাগি কী? ওই লোকগুলা বলছিল?’
হাকি খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি জান না বুবুন?’
সে বাম হাতের তর্জনী বুড়ো আঙুলের সঙ্গে লাগিয়ে গোল একটা গর্ত বানিয়ে ডান হাতের তর্জনী তার ভেতর ঢুকিয়ে আগুপিছু করে বলল, ‘হেরা এইসব করে। বোঝ নাই?’
‘ধুর, তুমি কী সব বল, কিচ্ছু বুঝি না।’
‘তোমার বুঝন লাগব না বুবুন। তুমি পোলাপান। এইগুলা বড় মাইনষে গো কাম।’ তার পর আবার খিকখিক হাসি।
সামনের লোক দু’জনের একজন বলল, ‘কিন্তু ফুলকুমারিকে মারল কে? ডিসি অফিসের ক্লার্ক থেকে ধরে রিকশাওয়ালা কার সাথে খাতির আছিল না তার? সবারই পেয়ারের মানুষ আছিল সে।’
‘তবে খুনি ধরা পইড়া যাইব গা ছুরির ফিংগারপ্রিন্ট যদি ঠিকমতোন নিবার পারে পুলিশ।’
একথা শুনে ওদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোক চমকে উঠল – আবদুল গফুর, সাবরেজিস্ট্রার অফিসের কেরানি। টাকা ছাড়া ফাইল একটুও নাড়ায় না। মুখে কালো কালো বসন্তের দাগ।ফুলকুমারিকে রেগুলার তার মেসে নিয়ে যেত রাতে।
দু’জনের একজন বলল, ‘গফুর সাহেব ভাল আছেন? খবর কী আপনের?’
দ্রুত সরে গিয়ে উল্টো দিকে হাঁটতে লাগল সে। তার পাম্পসুর মচমচ শব্দ মুহূর্তেই বাতাসে মিলিয়ে গেল।
লাশটা ভাসতে-ভাসতে থানার সামনে এলে দু’জন সিভিল ড্রেসের পুলিশ ছুটে এল। একজন বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ফুলকুমারি তুই আসপার আর সময় পাইলি না, এট্টু হাওয়া খাইতে বাড়াবার চাইছিলাম।’
ফুলকুমারি ভেসে যাচ্ছিল খালের পাড় ঘেঁষে। অন্য পুলিশ একটা কোটা দিয়ে টেনে লাশটা কিনারে নিয়ে এল। গন্ধ ছড়াচ্ছে। শকুন ঠুকরে-ঠুকরে নাড়িভূ়ঁড়ি বের করে ফেলেছে। শকুন কোটা আর লোকজন দেখে এক উড়ালে রাস্তার পাশের রেন্টিগাছে গিয়ে উঠল। মুখে মাংসের স্বাদ।
হাকি আর বুবুনও ওখানে ছিল। হাকি বলল, ‘বুবুন আর পারলা না।’
ততক্ষণে দীনু ডোম তার লোকজন নিয়ে হাজির। অকুস্হলে একজন লোকাল রিপোর্টার ছিল। সে পটপট বেশ কটা ছবি তুলল। ফটোস্টুডিও থেকে প্রিন্ট করিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে – সবার ক্যামেরা নেই।
খবর পেয়ে ফুলকুমারির মা ছুটে এল। হাড্ডিসার বুড়ি। যৌবনে সে-ও দেহব্যবসা করত। মেয়েকে সে-ই এ পথে নামিয়েছিল। বিলাপ করে কাঁদতে লাগল।
একজন পুলিশের লোক বলল, ‘এই তুমি ক্যারা?’
‘আমি অর মা, ক্যারা মারল আমার ম্যাইয়াডারে, কী দূষ করছিল হে? আমার ফুলরে, ও ফুল…’
পুলিশ বলল, ‘এ্যাই চল আমার লগে থানায়, তুমার জবানবন্দি নিয়োন লাগব।’
একজন রিপোর্টার বলল, ‘এ্যাই কে খুন করেছে তোমার মেয়েকে, কাওরে সন্দেহ হয়?’
পুলিশ তাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনে পরে জিগায়েন, আগে আমাগো ইন্টারোগেশন করবার দেন।’
ভ্যাবাচেকা খেয়ে সরে গেল সে। এক বুড়োকে গিয়ে ধরল, ‘এই মেয়েটাকে চেনেন নাকি?’
বুড়ো বলল, ‘আমি ইয়ারে চিনুম কিবা কইরা? তয় তারে হাটেবাজারে, দুহানে, সিনামা হলের ছ্যামায় দেহি। মাঝে মধ্যে রেশকায় ঘুরতেও দেহি।’
‘না, থাকপো ক্যামনে? খরাপ মেয়েছেলে – বেবুশ্যে, গুদমারানির বেটি, বোঝেন নাই?’
‘তারে কে খুন করছে এই বিষয়ে শুনছেন নাকি কিছু? ‘
‘না না, আইচ্ছা এহন যাই তাইলে।’ বুড়ো পালিয়ে বাঁচল।
লাশটি ভক্ষণের আশা ছাড়তে পারেনি শকুনটা। গাছের ডালে বসে আছে ঝিম মেরে। বুবুনের পকেটে তখনও বেশকটা গুলি। সে সদ্ব্যবহার করতে চাইল। কিন্ত রেন্টিগাছের ডালটা এত উঁচুতে যে বুবুনের গুলি সেখানে পৌঁছুল না।
হাকি তখনও যায়নি। বলল, ‘বুবুন বাড়ি যাওগা। তুমার মায় চিন্তা করবানে?’
সেখান দিয়ে বুবুনের মন্টু মামা যাচ্ছিল। সে বলল, ‘বুবুন তুই এখানে কী করছিস?’ হাকি আঙুল উঁচিয়ে বলল, ‘উই উই যে…’
মন্টু মামা ওপরে তাকাল। বলল,’ এ-তো দেখছি এশীয় রাজশকুন। কেমন বিচ্ছিরি। আমাদের দেশে আজকাল তেমন একটা পাওয়া যায় না। দেখতে ভয়ঙ্কর হলে কী হবে। কারও দিকে তেড়ে যায় না। ঠোকর-টোকরও মারে না। ওর লোভ মরা প্রাণীতে। পেলেই হামলে পড়ে।
‘গুলতি দিয়ে শকুন মারবি? খুট্যাল। তোর সাহস তো কম নয় বুবুন। শকুনের ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে আছিস? ওটা যদি তোর মাথায় হাগু করে দেয় তাহলে কি হবে জানিস? মাথা মুড়িয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তোকে।’
বুবুন বলল, ‘প্রায়শ্চিত্ত? সে আবার কী মামা?’
‘তোর মুণ্ডু।’
মামা চলে গেল রেগেমেগে।
‘হাকি, তুমি জানো প্রায়শ্চিত্ত কাকে বলে?’
‘ধুরো যা, তুমি যে কীসব কও বুবুন, আমি যাই গা।’
তখন নানান রঙের কাপড় জোড়া দিয়ে বানানো ক্লাউনের ড্রেস পরা শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় চানাচুরওয়ালা টিনের চোঙায় গান গেয়ে উঠল, ‘বাবু
মিলায় মজাদার চানাচুর গরম…’
গলায় ঝুলানো তার চানাচুরের ডালায় রাখা পিতলের ঘটি থেকে গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে। চানাচুরওয়ালা গরম শব্দটার দীর্ঘ ও বিকৃত উচ্চারণ করলে বুবুনের কানে ভেসে আসতে লাগল – গ্রামগ্রামগ্রামগ্রামগ্রাম…জংলি লেবুর রসে মাখানো এই গরম চানাচুর বুবুনের প্রিয়। পাঁচ টাকার কিনল। হাকি ততক্ষণে চলে গেছে। বুবুন ভাবল, হাকি থাকলে একটুখানি দেওয়া যেত।

সারা বিকেল ফুলকুমারি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে শহরে খুব আলোচনা হলো। নিরীহ মেয়েটার জন্যে আফসোস করল অনেক।
সন্ধ্যায় তারা সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত ‘বাবা কেনো চাকর’ (শ্রেষ্ঠাংশে : রাজ্জাক, ববিতা, বাপ্পারাজ, খলিল, ডলি জহুর) দেখতে শহরের একমাত্র সিনেমা হল ‘মাধবী টকিজে’ গিয়ে ভিড় জমাল।
লোকে লোকারণ্য। টিকেট কাউন্টারের সামনে গিজগিজ করছে মানুষ। মারামারি লেগে গেল শেষে। রিজার্ভ পুলিশ এসে মৃদু লাঠিচার্জ করলে জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। পরে তাদেরকে টিকেট কাউন্টারের সামনে লাইন করে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো।
ফুলকুমারির মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ড বিষয়ে কিছুই জানত না তার এমন একজন রেগুলার খদ্দের সিনেমা হলের সামনে এসে তাকে না পেয়ে সাংঘাতিক ক্ষেপে গেল আর মনে মনে অকথ্য গাল পারতে লাগল। পরে সে ভাবল – খাড়ে খানকিডা এই সাইন্জা বেলা কুন নাংয়ের লগে শুইয়া আচে ক্যারা জানে? পাইয়া লই একবার শালীরে চুলকানি এক্কেবারে ভাইঙা দিমু।
তিনটি স্থানীয় সাপ্তাহিকে ফুলকুমারি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হলো। সাংবাদিকতার এথিক্স ও কোড অব কনডাক্ট না-জানায় তারা ফুলকুমারির বেশ কটা বীভৎস ছবি তাদের পত্রিকায় ছাপিয়ে দিল।

Share Now শেয়ার করুন