ধারাবাহিক উপন্যাস | প্রস্থানের স্মৃতি | আবদুলরাজাক গুরনা | অনুবাদ সিলভিয়া স্বর্ণা

0
64

নোবেল সাহিত্য পুরস্কারজয়ী আবদুলরাজাক গুরনার রচিত Memory of Departure উপন্যাসের অনুবাদ

পর্ব ১

মার মা বাড়ির পেছনের উঠানে ছিলেন, শুরু করলেন আগুন জ্বালানো। আমি বাইরে যাওয়ার আগে তিনি প্রার্থনায় যা জপ করছিলেন, তা আমার কানে পৌঁছেছিল। দেখতে পেলাম তার মাথাটি মালশার উপর ঝুকে আছে, কয়লার আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। পানির পাত্রটা তার পায়ের কাছে প্রস্তুত হয়ে আছে। যখন তিনি ঘুরে তাকালেন, আমি দেখলাম আগুনে তার মুখটা কালো হয়ে গেছে আর তার চোখে জল। আমি রুটি কেনার টাকা চাইলাম, শুনেই তার ভ্রু এমনভাবে কুঁচকে গেল যেন জ্বলন্ত আগুনটা এখনই নিভে যাবে।  তার শরীর হাতড়ে গিঁট দিয়ে বাঁধা ন্যাকড়াটি টেনে বার করলেন যেখানে তিনি টাকা রাখেন। তিনি আমার হাতে যে পয়সাকড়ি দিলেন সেগুলি তার শরীরের উত্তাপে গরম ছিল, পয়সার ধারগুলো ছাড়াই পয়সাগুলোকে বেশ নরম আর গোলাকার লাগলো।

‘এইভাবে চিরকাল টাকাপয়সা নিও না,’ তিনি বললেন, এবং আমার মুখের দিকে চোখ না তুলে আগুনের দিকে ফিরে গেলেন। আমি তাকে অভিবাদন না করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম এবং তার দিকে পিঠ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছি দেখে কষ্ট হতে লাগলো।
তার বয়স প্রায় তিরিশের মতো, কিন্তু তাকে অনেক বয়স্ক মনে হয়। ইতিমধ্যে মধ্যে তার চুল সাদা হয়ে গেছে, আর বিগত বছরগুলি তার মুখশ্রী নষ্ট করে দিয়েছে। তিক্ততার চিহ্ন তার মুখে। যখনেই দেখতাম, তার দৃষ্টি প্রায়ই হতাশাপূর্ণ লাগতো এবং বুঝতে পারতাম অবহেলাপূর্ণ ছোট ছোট কাজ তার কাছে বিরক্তিকর লাগতো। কখনও কখনও তার মুখ হাসিতে উদ্ভাসিত হতো, কিন্তু তা ছিল ধীর আর অনেকটাই অনিচ্ছাকৃত। তার এই অবস্থার জন্যে আমি নিজেকে দায়ী মনে করতাম, কিন্তু আমি এও ভাবতাম, তিনি হয়তো আমার পৌরুষত্বের জন্যে শুভেচ্ছা জানিয়ে হাসতে পারতেন।

বাড়ির পাশের অন্ধকার গলি, আমি সেখান দিয়ে হেঁটে গেলাম। ভারি বিন্দু বিন্দু শিশির ধুলোকে শূন্যে জমিয়ে দিয়েছে, রাস্তার পাশের কুঁড়েঘরের টিনের ছাদগুলো চকচকে করছে। যদিও কয়লার চাঁই ওই রাস্তাটাকে খানাখন্দ  বানিয়ে ফেলেছে, তবু রাস্তাটাকে মাটির কুঁড়েঘরের তুলনায় মসৃণ আর শক্ত মনে হলো। জায়গাটার নাম কেঞ্জ। শ্রমজীবী ও ব্যর্থ মানুষেরা এখানে বাস করে। থাকে যৌনকর্মীরা আর চিহ্নিত সমকামীদের নিয়ে ব্যবসা চলে। মাতালরা এখানে আসে সস্তায় তেন্দে মদ কেনার জন্যে। রাতের বেলায় এখানে শোনা যায় বিমর্ষ ব্যথিত মানুষজনের উথলে ওঠা কান্নার ঢেউ। একটি খালি বাস যাচ্ছিল, খানাখন্দে ভেঙে পড়া রাস্তার জন্যে বিকট শব্দ করলো, একধরনের হাহাকার ধ্বনি যেন বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো। বাসটা সবুজ ও সাদা রঙে আঁকা, হেডলাইটটা দুর্বল আর এর আলো সকালের আলোর মতো হলুদ।

মোজাম্বারু গাছের কাণ্ড আর শাখা-প্রশাখার বৃত্তটি শূন্য হয়ে আছে। সবুজ মসজিদ থেকে প্রার্থনার গুনগুন ধ্বনি ভেসে এলো, বিশ্বাসীরা সব একত্রিত হয়েছে। দূরে একটা মোরগ ডেকে উঠলো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরের প্রান্তগুলি বর্গাকারে চৌকো মতো জায়গায় মাটির মধ্যে গেঁথে আছে, অসতর্কভাবে পা ফেললেই বিপদ। বৃষ্টির সাথে সাথে, পৃথিবী অঙ্কুরিত ঘাসের ক্ষেতে পরিণত হয়, কিন্তু এখন তো শুকনো মৌসুমের মাঝামাঝি কাল।
সমুদ্রের খুব কাছেই কেঞ্জ। সবসময় বাতাসে কিসের যেন গন্ধ ভেসে বেড়ায়। এরকম নোংরা দিনে, লবণের ধোঁয়া নাক ও কানের সাথে রেখার মতো সম্পর্ক তৈরি করে। নরম কোনো সকালে, দিনের শুরুতে সমুদ্রের বাতাস এসে হৃদয়কে শীতল করে দেয়। বছরের পর বছর এরকমই চলছে, ক্রীতদাসরা এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। তাদের পায়ের আঙুলগুলো শিশিরে হিম হয়ে জমে যায়, হৃদয় বিদ্বেষে বিদ্বেষে অন্ধকারে ভরে ওঠে। সজীব সুস্বাস্থ্যের পেশিবহুল শরীর নিয়ে তারা এখানে আসে আর সমুদ্রকে উপহার হিসেবে নিজেদের সমর্পণ করে।

ইয়েমেনের দোকানি আমাকে কোন কথা না বলে একটা রুটি দিল। তিনি আমার টাকা নেওয়ার আগে শার্টে হাত মুছলেন, একজন ভিখিরিকে যেন সম্মান দেখালেন। তার মুখে ছিল নিষ্প্রভ হাসি, কিন্তু নিশ্বাসের তলায় ধ্বংস হও, এরকম কোনো অভিশাপ বুঝি উচ্চারিত হলো।

আমি বাড়িতে ফিরে বাবাকে প্রার্থনায় বসে থাকতে দেখলাম। তিনি বাড়ির উঠোনে মাটিতে বসেছিলেন, পা নিচের দিকে ভাঁজ করা। চোখ বন্ধ এবং মাথাটা বুকের উপর ঝুকে আছে। তার হাতের মুঠি বন্ধ, হাঁটুর উপর বিশ্রাম নিচ্ছেন, ডান হাতের তর্জনী মাটিতে গাঁথা।

আমি রুটিটা কয়েক টুকরো করলাম, তারপর বোনদের ঘুম থেকে ডেকে তুলতে গেলাম। তারা আমার দাদীর ঘরে শুয়েছিল, যে-ঘরের দেয়াল সবসময় বগলের ঘামের গন্ধে ঘনীভূত থাকতো। দাদীর সংকুচিত শরীর ভাঁজ করা, বিছানার পাশে একটা হাত ঝুলছে। জাকিয়া শুয়ে আছে তার পাশে। জাকিয়া হচ্ছে আমার দুই বোনের বড়টা, এরই মধ্যে সে জেগে গেছে। সাঈদাকে ডেকে তোলা সবসময়ই কঠিন। আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে তুলতে গেলেই সে সরে গেল, পেছনটা আমার দিকে ফেরানো আর ডাকাডাকি করার জন্যে ভীষণ অসন্তুষ্ট। তার উপর বিরক্ত হলাম, এবং শেষ পর্যন্ত তাকে কাঁধ ধরে টেনে তুললাম।
‘এই কি করছো তুমি? সাঈদার চিৎকারে দাদীর ঘুম ভেঙে গেল। ‘সতর্ক হও. তুমি কি আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবা নাকি? কোনো কথা কানে যায় না?’
আমরা তাকে বি মকুবা বলে ডাকি, বয়স্ক নারী। তাকে তখন খুব দুর্বল আর দয়ালু দেখাচ্ছিল, নিষ্ঠুরতা ছাড়া করুণার ছিটেফোটাও তার মধ্যে দেখতে পেলাম না। যখন চলে আসছি তখন পেছনে তার বিড়বিড় কথাগুলো শুনতে পেলাম।
‘কিছুই বলবে না। কাউকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিরক্ত কোরো না। এখানে আসো!’ হঠাৎ চিৎকার করে বললেন, ‘শয়তানের বাচ্চা! আমি কে তুমি জানো?
‘ফেরো, এখানে ফিরে আসো!’

আমি পিছনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। তার আর্তনাদ ভেতরে ঢোকার সময়টুকুর জন্যে অপেক্ষা করলাম। বাবার উদ্দেশ্যে তার কান্নার ধ্বনি শুনছি, কণ্ঠস্বর ব্যথায় কঁকিয়ে উঠছে। বাবা তখনো আমার সামনের উঠানে প্রার্থনারত অবস্থায় বসে ছিল। আমার মা তার দিকে তাকালেন, কিন্তু চারদিকের চিৎকারের মধ্যে তার চোখ বুঁজে আছে। মা আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। তুমি আবার সেখানে যাও। মা আমার বইপত্র আনার জন্যে দ্রুত ঘরে ঢুকলেন, আমাকে একমুহূর্তের জন্যে বাবার কাছে একা রেখে চলে গেলেন। তিনি আমাকে একটুকরো রুটি আর এক কাপ চা খাওয়ার পয়সা দিলেন। দিনটা ছিল আমার পনেরোতম জন্মদিনের সকাল।

(চলবে)

Share Now শেয়ার করুন