নিশাত জাহান রানা | ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে | হাসান আজিজুল হক বিশেষ সংখ্যা

0
234

সদ্য প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক স্মরণে প্রকাশিত হলো এই সংখ্যাটি। এতে সংকলিত হয়েছে চারটি লেখা। সংকলিত এই লেখাটি লিখেছেন নিশাত জাহান রানা।

নিশাত জাহান রানা | ফুরায় যা তা ফুরায় শুধু চোখে | প্রয়াণলেখ

যে ঘরের পাশে বারান্দা-ঢাকা বকুল গাছটিতে চেনা-অচেনা পাখিরা এসে বসে। ওখানে বসে তিনি কি যবগ্রামের উষর মাটি এলাকার বহুদূর তালগাছের মাথা থেকে উদাস দুপুরে ভেসে আসা সেই ঘুঘুর ডাক শোনার জন্য কান পেতে থাকতেন! যে-ঘুঘুর গল্প তিনি বলেছিলেন যাদুময় বাস্তবতায়! এখন কি আর সেই ডাক তিনি শুনতে পাবেন! সেই ঘুঘুটির মতোই এখন তো তাঁকে ডাকবো আমরা। ডাকবে অনন্ত পৃথিবী। তিনি কি শুনতে পাবেন!

এক দুপুরে ফোন করেছেন তিনি। কণ্ঠস্বরে অন্যদিনের মতো স্নেহভরা উষ্ণতা যেনো কিঞ্চিৎ অনুপস্থিত। খানিকটা ম্রিয়মাণ স্বরে বললেন – ‘শোনো, আমার মন খুব খারাপ। তোমার বিরুদ্ধে একটা অনুযোগ আছে। আমি প্রমাদ গুণলাম – কি অপরাধ করেছি! আকাশ-পাতাল হাতড়ে ফিরছি বিদ্যুৎগতিতে। নাহ! কিচ্ছু মনে পড়ছে না। টেলিফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে তিনি ধীরে ধীরে বললেন – ‘তোমার নাকি একটা বই বেরোলো! তুমি নাকি তোমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিচারণায় সবার কথা লিখেছো – সনৎ, শহীদুল, নাজিম মাহমুদ, আলী আনোয়ার – সবার কথা, কেবল আমার কথাই নাকি লেখোনি! আমি কি তোমায় কোনোদিন স্নেহ করিনি!’ তাঁর আর্দ্রস্বর মুহূর্তে আমার দু’চোখ ভরে দিল জলে। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। এরকম অলীক কাহিনি কে তাঁকে শোনালো! আমার সঙ্গে কার এমন শত্রুতা! তখন সদ্য প্রকাশিত হয়েছে আমার স্মৃতিকথা-গ্রন্থ অঞ্জলিভাষা। তাতে তো স্মৃতিচারণ করেছি কেবল সেইসব অসামান্য মানুষদের যাঁরা প্রয়াত। সেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তো অনুপস্থিত! অনেক চেষ্টায় সেদিন তাঁর ভ্রান্তি দূর করতে পেরেছিলাম। সেদিন মনে হয়েছিলো, কী অসীম সৌভাগ্য আমার!

আজ আমি শুধু তাঁরই কথা লিখতে চাই। কিন্তু, ঠিক কী লিখবো তাঁর কথা! আজও যে আমার চোখ ভরে আসছে জলে! অথচ জানি তো ‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’! পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মেই সবুজ পাতাটি ক্রমে শালিকের পায়ের মতো ধূসর হলদেটে হয়ে ওঠে। তারপর একদিন সব ক্লেশ মুছে ফেলে শীর্ণ খয়েরি পাতাটি ঝরে পড়ে মৃত্তিকার হৃদয়ের গভীরে। তবু কেন এতো ব্যথা বাজে! কেন ফিরে ফিরে আশা জাগে – এই বুঝি পুনরায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একুশে বইমেলায় আমার হাত ধরে তাঁর সদ্য প্রকাশিত বইটির প্রকাশকের স্টলের দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলবেন – ‘এখনো আমার এই বই চোখে দেখোনি? এসো শিগগিরি।’ তারপর এককপি বই চেয়ে নিয়ে, তাতে ‘পরম কল্যাণীয়াসু রানাকে হাসান আজিজুল হক’ – লিখতে লিখতে বলবেন, ‘আরে এখনো আমরা আছি বলে আদর করে লিখে দিচ্চি! এই বুড়োরা চলে গেলে আর এমন করে কে দেবে শুনি!’ তারপর হো হো করে হেসে উঠবেন সেই স্বভাবসুলভ ঢঙে!

আহা! সত্যিই কোনোদিন এতো বিখ্যাত সাহিত্যিক এমন আদর করে তাঁর বই হাতে তুলে দেননি তো কখনো! বস্তুত তিনি যে এমন শক্তিশালী ধীমান মৃত্তিকা-সংলগ্ন বিখ্যাত লেখক তা-কি আলাদা করে কখনো মনে থাকতো আমার! অথবা আমাদের অনেকের!! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে প্রায় চল্লিশটি বছর তাঁর চোখের সামনে আমরা অনেকে যেমন জীবনের চড়াই-উৎরাই পার হচ্ছিলাম, তেমনি তিনিও তো ক্রমশ দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই যাত্রায় তিনি তো দু’হাত বাড়িয়ে আমাদের সহযাত্রী করে নিয়েছিলেন। আজ তাঁর একাকী শেষযাত্রার মুহূর্তে আমি সেদিনের পরম যত্নে তুলে দেয়া বইটি আবার উল্টেপাল্টে দেখি। আবার পড়ি। সে-বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন :

’স্মৃতিকে কতটা পিছনে নেয়া যায়? নিশ্চয়ই চেতনার পেছনে নয়। আমার ধারণা শুধুমাত্র চেতনাতেও স্মৃতি নেই, যদি থাকেও তা আধো-অন্ধকারেই ডুবে থাকে। আত্মচেতনা থেকেই স্মৃতির শুরু। জন্মের পর থেকে চেতনা আছে, গূঢ় রহস্যময় চেতনা-কিন্তু স্মৃতি নেই। চেতনা-আত্মচেতনার মাঝখানের সান্ধ্য জায়গাটায় অনেকবার ফিরে যেতে চেয়েছি। সে যেন শুধু চাঁদের আলোই নয়, স্বপ্নের চাঁদের আলো। কোনোকিছুই ঠিকমতো ঠাহর হয় না। বস্তু বস্তুর চেহারা ত্যাগ করে, ভয় মূর্ত চেহারায় সামনে এসে দাঁড়ায়, কল্পনাও বস্তু হয়ে ওঠে।’

আজ তাঁর লেখা পড়ছি আর মনে হচ্ছে – তিনি কি এখন চেতনা-আত্মচেতনার মাঝের সেই সান্ধ্য জায়গাটিতে ফিরে গেছেন! সেই স্বপ্নের চাঁদের আলোয় ধূসর কোনো পৃথিবীতে! দর্শনের অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক কি সেখান থেকে ‘শকুন’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘ভূষণের একদিন’ বা ‘জীবন ঘষে আগুন’-এর মতো দুর্দান্ত একটি গল্পের অভিনব কোনো উপাদান নিয়ে ফিরবেন – যেভাবে কল্পনাও বস্তু হয়ে ওঠে!

কল্পনাকে কী বাস্তব করে তোলার ঝোঁক তার লেখার ভেতরে কোথাও ছিল, নাকি তাঁর মধ্যে প্রবল বাস্তব-ঘনিষ্ঠতাই আছে শুধু! সবিনয়ে নিজের বিশ্লেষণে যে তিনি বলেছেন, ‘বাস্তব বাদ দিয়ে আমি কোনোকিছু ভেবে উঠতে পারি না। লেখক হিসেবে হয়তো এটা আমার দুর্বলতা যে, কিছুই উদ্ভাবন করতে পারি না’ –  সেকথাটা কি কিয়দংশে সত্য! এসব নিয়ে তাঁর সঙ্গে তো আমি আলাদা করে কখনো কথা বলিনি। আমি তাঁকে পেয়েছি তাঁর স্বতস্ফূর্ত জীবনগল্প শোনানোর বৈশিষ্ট্যের ভেতর দিয়ে। আর সে বৈশিষ্ট্যের খবর তারা জানেন যারা তাঁর অসামান্য আড্ডার অংশীজন হতে পেরেছেন। অসামান্য তাঁর সেন্স অব হিউমার। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে কিংবা ছিন্ন পত্রাবলীতে যে উপচে পড়া রসবোধ বা কৌতুকবোধ, তেমনটাই যেন কৌতুক ছলকে উঠতো তাঁর অবিরাম আড্ডার পাত্র থেকে। তার মধ্যেই বোনা থাকতো লাতিন আমেরিকার সাহিত্যপ্রসঙ্গে তাঁর ভাবনা অথবা বাংলাদেশের নবীন লেখকদের সম্পর্কে তাঁর প্রচ্ছন্ন কৌতূহল; রবীন্দ্রনাথের কোনো গানের বাণীর বহুকৌণিক বিশ্লেষণ কিংবা দেশের বর্তমান হালচাল। তাঁর প্রাণভোমরাটি কি ছিল আড্ডা নামের সোনার কৌটোয়!

আড্ডার সেই উচ্চকিত হাসির আওয়াজ যদিও খুব কমই মিলেছে তাঁর লেখায়। সেখানে তিনি যেন বড় নির্মোহভাবে তুলে আনেন প্রধানত প্রান্তিক জীবনের অথবা গ্রামীণ জীবনের ক্রূর বাস্তবতা।

জীবনের নির্মম উপহাসে ছিন্নভিন্ন হওয়া সাধারণ মানুষকে তিনি গভীর মমতায় চিত্রিত করেন। যখন ‘আগুনপাখি’র দৃঢ়চিত্ত নারীটি দেশভাগের ফলে ছত্রাখান হয়ে যাওয়া তার পরিপার্শ্ব এবং সংসারমঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে – যেতে পারি কিন্তু কেনে যাবো? কেউ কি আমারে বুঝায়ে বলতে পারো? তখন কিন্তু তাঁর আড্ডায় উপচে-ওঠা হাসিটি নিঃশব্দ থাকে। যেন সে এক অন্য হাসান আজিজুল হক। যিনি তাঁর মায়ের চরিত্র ধার করে আঁকেন উপন্যাস।

আবার ধর্ষিতা সাবিত্রির বিপর্যয়কাহিনীর রহস্যসন্ধানে যখন তিনি অক্লান্ত ভ্রমণ করেন, তখনও শুনতে পাই না হাসান আজিজুল হকের আড্ডার হাসি। সত্যি পাই না কি! আমি যেন দেখতে পাই তাঁর সেই তীব্র ধারালো চোখের বিদ্রুপময় হাসিটি। সে-হাসির ভাষা ভিন্ন। তার ভেতরে তো আছে ক্ষুরধার প্রশ্ন, আছে রাগ, আছে ক্ষোভ, আছে প্রতিবাদ।

আজ যেনো আড্ডাবাজ হাসান আজিজুল হক আর লেখক হাসান আজিজুল হক আমাকে মাঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত অবধি দৌড় করাচ্ছেন। মহাকালের রথে চেপে যখন তিনি সমকাল থেকে চিরকালীনের দেশে পাড়ি দিচ্ছেন তখন সময়ের অন্যপারে দাঁড়িয়ে আমি কি ছুঁতে চাইছি ফেলে আসা দিনগুলিতে কাছে থেকে দেখা প্রাণচঞ্চল মানুষটির বহুমাত্রিক স্বরূপ!

সে-এক সময় আমার। গল্প-উপন্যাস (Fiction) পড়বার আগ্রহ তখন একেবারেই কমে গেছে। মাঝে মাঝে চেষ্টা চালাই বটে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেন খুব টেনে রাখে না। সেইসময় আগুনপাখি এবং সাবিত্রী উপাখ্যান পড়েছি কি-না, একথা তিনি বেশ কয়েকবার জানতে চাওয়ার পরই আমি বই দুটো নিয়ে বসি। আর আগুনপাখির প্রথম বাক্যেই প্রায় ধরাশায়ী হয়ে যাই।

`আমার মায়ের য্যাকন মিত্যু হলো আমার বয়স ত্যাকন আট-ল’বছর হবে। ভাইটোর বয়স দেড়-দু বছর। এই দুই ভাই-বুনকে অকুলে ভাসিয়ে মা আমার চোখ বুজল। ত্যাকনকার দিনে কে যি কিসে মরত ধরবার বাগ ছিল না। এত রোগের নামও ত্যাকন জানতো না লোকে। ডাক্তার বদ্যিও ছিল না তেমন। মরবার আগে মুখে যেদি ওষুধ পড়ত, তাই কতো! পেরায় পিতি বছর কলেরা-বসন্তেই কতো যি লোক মরতো, তার সীমাসংখ্যা নাই। আমার মা যি কলেরা-বসন্তে না মরে অজানা কি একটো রোগে মারা গেল তাই কতো ভাগ্যি!’

আমাকে কেমন বিদ্ধ করে ফেলেন তিনি এক নারীর অসাধারণ জীবনভাষ্যে। ভিন্ন স্থানিকভাষায় দৃঢ়চরিত্র সেই নারী বয়ান করে তার জীবনগাথা। এতো সেই ভাষা – যে-ভাষাভাষী চরিত্রদের বাস্তব গল্প ফিরে ফিরে কতবার শুনেছি তাঁর আড্ডার সরস আখ্যানে অথবা একাকী গল্প-গাছায়! 

এরপর সেই নারীর জীবনযাত্রার কাহিনি অসামান্য নিপুণতায়-দক্ষতায় যে তিনি বিস্তার দিলেন, পাঠের মুহূর্তে আশঙ্কা হয় – কোথাও যেন একটি শব্দও মগ্নতা থেকে স্খলিত না হয়ে পড়ে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে স্থাপিত ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’-এর জন্য তাঁকে একবছরের নিয়োগ দেয়া হলো। একটি বাড়িও বরাদ্দ দেয়া হলো। প্রিয় রাজশাহী ছেড়ে একনাগাড়ে কিছুতেই অত দীর্ঘসময় তিনি ঢাকায় থাকতে চান না। তবু শেষপর্যন্ত স্থির হলো যাওয়া-আসার মধ্যে মাঝে মাঝে থাকবেন বরাদ্দকৃত বাড়িটিতে। তাঁকে নিয়ে পান্থপথের আসবাবপত্রের দোকানে স্বল্পমূল্যে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে ঘোরাঘুরিও করলাম। সেইসময়, একদিন সকালে, নাস্তার টেবিলে বেগুনভর্তা, রুটি, মুড়ির সমাহার দেখে তাঁর খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে কৌতুহলী হয়ে কিছু প্রশ্ন করছিলাম। প্রতিক্রিয়ায় শুনছিলাম তাঁর জন্মভূমি বর্ধমানের গল্প। রাঢ়-বঙ্গের গল্প। তাঁর ছেড়ে আসা মাটির গল্প। বলছিলেন বড় আনন্দ-উজ্জ্বল মুখে। যে-গল্পসমূহ তিনি বারেবারে বলেছেন। নানা ছলে বলেছেন। শুধু সীমান্ত বিবেচনায় তাঁর শেকড়ের টান অব্যাহত ছিল না তো, তা ছিল মাটির টান-মানুষের টান, ভূমিলগ্ন যে মানব-মানবী তাঁর লেখালেখির প্রাঙ্গন জুড়ে রাজত্ব করেছে আজীবন-তাদের টান। সেই সকালে যুক্ত থেকে সদ্য প্রকাশিত একটা বই দিতে গিয়েছিলাম তাঁকে। খেতে খেতেই পাতা উল্টে যাচ্ছিলেন। কোথাও একটিও ভুল চোখে পড়লো না বলে বিস্মিত হয়েছিলেন। বড় খুশি হয়েছিলেন তিনি – আমি ‘সিরিয়াসলি’ প্রকাশনার কাজ করছি জানতে পেরে। তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘তাহলে আমারও একটা বই করো!’ এইভাবে শুরু হলো তাঁর ইংল্যান্ড-স্কটল্যান্ড-প্যারিস ভ্রমণের দিনগুলির লিপিবদ্ধ দিনপঞ্জির গ্রন্থে রূপান্তর প্রক্রিয়া।

বড় কঠিন ছিল তাঁর হস্তলিপি উদ্ধার। অনভিজ্ঞ চোখে তা সুকঠিনই বলা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকাল থেকে জানি তাঁর স্বহস্তে লিখিত প্রবন্ধ ত্রুটিহীনভাবে উদ্ধার করা কেমন দুরূহ! এই দিনপঞ্জিটি গ্রন্থে রূপান্তর প্রক্রিয়াও সেই কঠিন পথ পাড়ি দিলো অনেকদিন ধরে। ঢাকা-রাজশাহী পান্ডুলিপি চালাচালির পর বেশ কয়েকজনের মিলিত চেষ্টায় সম্পন্ন হলো কাজটি। প্রথমে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল লন্ডন ডায়েরি নামে। পরে বর্ধিত সংস্করণটি প্রকাশিত হয় ‘আমার যে দিন গেছে ভেসে’ শিরোনামে। ‘যুক্ত’ অফিসে আড্ডা দিতে এসে একদিন তিনি সর্বশেষ প্রুফ কপিটি অনুমোদন করলেন।

দৈবের বশে তাঁর জীবনের গতিপথে অনুপ্রবেশ ঘটেছে আমার মতো হয়তো অনেকেরই। তবে আমরা কেউ কেউ হয়তো তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি আরো একটু বেশি। রসের ভিয়েন দেয়া কথার নরম কিংবা কড়া পাক সন্দেশই তো নয়, তাঁকে আমরা পেয়েছি লেখালেখি বা আড্ডার বাইরের নানা ক্রিয়াকলাপেও। সেই কলাপখানি বহুবর্ণে সজ্জিত। কখনো মনোজ মিত্রের বিখ্যাত নাটক ১চাক ভাঙা মধু’, মীর মশাররফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পণ’ বা আরো অনেক নাটকে দুর্দান্ত অভিনয়ে; কখনো স্বননের অনুষ্ঠানে সুকুমারের ছড়া পাঠে; কখনো উচ্চারণের ক্লাসে। এক লেখায় বিশিষ্ট চিন্তাবিদ লেখক সনৎকুমার সাহা এরকম বলেন,

হাসান আজিজুল হক ও সহপাঠী নাজিম মাহমুদ ছিলেন আলী আনোয়ারের সব নাট্যাভিযানের সঙ্গী। অভিনয় প্রতিভাতেও ছিলেন তাঁরা অসামান্য। হায়! ওই সব অভিনয়ের কোন নিদর্শন ধরা নেই। তিনজনই আমাদের নাট্যকলার প্রেরণা পুরুষ।

আশির দশক জুড়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিনগুলি তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ অন্যান্য বন্ধুদের অসীম স্নেহে কৃপাসিক্ত। রাজশাহী ছেড়ে ঢাকা এসেছি আশির দশকের শেষভাগে। তাঁরাও একে একে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, কিন্তু এই চারটি দশক ধরে স্নেহের ধারা ক্রমশ বেগবানই হয়েছে।

অবসর নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই বসবাসের জন্য যে বাড়িটি তিনি তৈরি করলেন, তার নাম ‘উজান’। পাল উড়িয়ে ভেসে চলবেন এবার। উজানে কতো গাছ লাগালেন তিনি। ফুলের গাছ-ফলের গাছ। একবার নিজের লাগানো গাছের বিদেশী পেপে খাইয়ে অবাক করে দিলেন। গত বছর দু’য়েক ধরে যখনই ফোন করতেন, কথা হতো, তার মধ্যে ফিরে ফিরে বলতেন, ‘তা তুমি রাজশাহী আসছো কবে। ওই যে দেখে গিয়েছিলে দোতলার ঘরের কাজ চলছে, ওটা কিন্তু তৈরি হয়ে গেছে। এবার এসে ক’দিন আমার সঙ্গে থেকে যাও।’যাওয়া হয়নি। যেমন বহু কিছুই হয় না এ জীবনে। কিন্তু রাজশাহীতে যাব তো আবার। যাব বারবার। যাব উজানের ঠিক পাশেই। সেখানে আছেন তাঁর প্রাণের বন্ধু, আমার প্রণম্য শিক্ষক সনৎকুমার সাহা। যখন উজানের পাশ দিয়ে যাব, দেখতে পাবো শিউলী ফুলে ছাওয়া তাঁর বাড়ির দরোজা। দেখতে পাবো তাঁর লেখার ঘর। যে ঘরের পাশে বারান্দা-ঢাকা বকুল গাছটিতে চেনা-অচেনা পাখিরা এসে বসে। ওখানে বসে তিনি কি যবগ্রামের উষর মাটি এলাকার বহুদূর তালগাছের মাথা থেকে উদাস দুপুরে ভেসে আসা সেই ঘুঘুর ডাক শোনার জন্য কান পেতে থাকতেন! যে-ঘুঘুর গল্প তিনি বলেছিলেন যাদুময় বাস্তবতায়! এখন কি আর সেই ডাক তিনি শুনতে পাবেন! সেই ঘুঘুটির মতোই এখন তো তাঁকে ডাকবো আমরা। ডাকবে অনন্ত পৃথিবী। তিনি কি শুনতে পাবেন!

 

 

Share Now শেয়ার করুন