নীলাঞ্জন ভট্টাচার্য >> আর্খেন্তিনায় রবীন্দ্রনাথের পরিগ্রহণ : প্রথম পর্যায় >> গদ্য

0
303

প্রাথমিকভাবে এই লেখাগুলি ইস্পানো-আমেরিকার বহু খ্যাতনামা পণ্ডিতকে ‘প্রাচ্য’ সম্পর্কে কৌতুহলী ও উৎসাহী করে তুলেছিল। অতএব ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের পরিগ্রহণের জমি একরকমভাবে প্রস্তুত ছিল। আর সেইজন্যই নোবেল পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যখন সুদূর বুয়েনোস আইরেসে রবীন্দ্রনাথের কবিতার এস্পানিওল ভাষান্তর প্রকাশিত হয়, তখন আশ্চর্য হওয়ার বিশেষ কিছু থাকে না।

বীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। কিন্তু বাংলার বাইরে বিশ্ব তাকে কীভাবে গ্রহণ করেছে, এ প্রসঙ্গে আলোচনা অনেক সময়েই সীমাবদ্ধ থেকে যায় ইংরেজি বিশ্বের মধ্যে। আর রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে ইস্পানো-আমেরিকার কথা এলেই বাঙালি পাঠকের মনে আসে ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর নাম। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুচর্চিত বিষয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মাহাত্ম্য সম্যকরূপে অনুধাবন করার জন্য এ কথা বোঝা জরুরি যে, ইম্পানো বা সমগ্র লাতিন আমেরিকাতেই রবীন্দ্রনাথের পরিগ্রহণ কেবলমাত্র ওকাম্পোতেই সীমাবদ্ধ নয়। আসলে ইস্পানো-বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ পৌঁছে গিয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার পাওয়ারও আগে, ১৯১৩ সালেই। আর ইংরেজি-বিশ্বে ইয়েটস, এজরা পাউন্ড প্রমুখের কাছে রবীন্দ্রনাথ যখন অপাঙক্তেয় হয়ে যাবেন, তখনও আমরা দেখব ইম্পানো-বিশ্বে তিনি একইরকম প্রাসঙ্গিক। এই প্রাসঙ্গিকতা বজায় থাকে তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরেও। আজও তাঁর লেখা নতুন করে ভাষান্তরিত হয় লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। এই প্রাসঙ্গিকতার কারণ বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ইস্পানো-বিশ্বে রবীন্দ্রনাথের পরিগ্রহণের ইতিহাসকে। স্থানাভাবের কারণে এই প্রবন্ধে আমি আর্খেন্তিনায় রবীন্দ্রনাথের পরিগ্রহণের (reception) প্রথম পর্যায়টি, অর্থাৎ ১৯১৩-১৯২৪, নিয়েই আলোচনা করব। ১৯১৩, অর্থাৎ যে-বছর রবীন্দ্রনাথের কবিতা প্রথম ইস্পানো-বিশ্বে ভাষান্তরিত হচ্ছে। ১৯২৪-এ রবীন্দ্রনাথ সশরীরে লাতিন আমেরিকায় পদার্পণের আগেই এই আলোচনা শেষ হবে; কেননা তার পরের বিস্তারিত ইতিহাস আরও জটিল, বহুচর্চিত। অর্থাৎ, তাত্ত্বিক পরিভাষায় বলতে গেলে, এই আলোচনা মূলত আর্খেন্তিনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক যোগাযোগ নিয়ে, প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নিয়ে নয়। কিন্তু মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে কিছুটা প্রাককথন জরুরি।

১.

আমেরিকা মহাদেশের রিয়ো গ্রান্দে নদীর দক্ষিণে প্রসারিত যে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, তারই নাম লাতিন আমেরিকা (কয়েকটি ছোটো দেশ বাদে)। এই অংশের ছোটবড়ো সবকটি দেশই একসময়ে ছিল স্পেন, অথবা পর্তুগাল, অথবা ফ্রান্সের উপনিবেশ। এই দেশগুলির প্রাক-ঔপনিবেশিক সভ্যতা প্রায় পুরোটাই ধ্বংস করে দেয় ঔপনিবেশিক প্রভুরা। উপনিবেশবাদের নিয়ম মেনেই এখানে প্রচলিত হয় ঔপনিবেশের ভাষা। অতএব, ব্রাসিল এবং আর দু-একটি দেশ বাদ দিলে, বাকি সবকটি দেশেরই ভাষা মূলত কাস্তেইয়ানা (castellano), যাকে সাধারণভাবে আমরা বলে থাকি এস্পানিওল। এই দেশগুলিকেই একসঙ্গে বলা হয় ইস্পানো-আমেরিকা। লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশই স্বাধীনতা অর্জন করে উনিশ শতকের প্রথম দিকে। কিন্তু এই স্বাধীনতার অর্থ ছিল কেবলমাত্র সরাসরি ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া। যেহেতু প্রায় সমগ্র লাতিন আমেরিকাই ছিল স্থায়ী উপনিবেশ (ভারতের মতো অস্থায়ী নয়), বহুসংখ্যক ইউরোপীয় এখানে বসতি স্থাপন করেছিল পাকাপাকিভাবে। এই ইউরোপীয় বা তাদের বংশধরেরাই এই স্বাধীন দেশগুলিকে নতুন করে পরাধীন করে এক নব্য-উপনিবেশ স্থাপন করে, যে নব্য-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার সংগ্রাম চলে পরবর্তী প্রায় একশো-দেড়শো বছর ধরে। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যোগ হয় সাম্রাজ্যবাদ এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। যেমন ঘটেছে ভারতবর্ষেও, এই লড়াইয়ের একটি স্রোত বারেবারেই চেয়েছে উপনিবেশবাদী প্রভু, অর্থাৎ স্পেনকে অস্বীকার করতে, অন্যটি আবার বারেবারেই মুখ চেয়ে থেকেছে স্পেনের। ১৯১২-১৩ সালে এই লড়াই যখন পুরোদমে চলছে, তখনই লাতিন আমেরিকার সঙ্গে পরিচয় হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।

Thinking of Him শর্টফিল্মের স্থিরচিত্র

বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রথম এস্পানিওল তর্জমা বেরোয় মূল স্প্যানিশ ভূখণ্ডে ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি : সং অফারিংস-এর ম্যাকমিলান সংস্করণ বেরোনোর কয়েক মাসের মধ্যেই, মাদ্রিদের লা ত্রিবুনা নামক একটি দৈনিকে ‘গীতাঞ্জলি’ নামক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন রামোন পেরেজ দে আয়ালা (Ramon Perez de Ayala, ১৮৮০-১৯৬২)। এই প্রবন্ধটিতে আয়ালা রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতার অংশবিশেষও তুলে দেন। এর মধ্যে ছিল সং অফারিংস-এর ৬০ নম্বর কবিতা : ‘জগৎ পারাবারের তীরে শিশুরা করে মেলা।‘ এটিই সম্ভবত এস্পানিওল ভাষান্তরে সং অফারিংস-এর প্রথম সম্পূর্ণ কবিতা। অন্য যে দুটি কবিতা আয়ালা উদ্ধৃত করেন, তার একটি সং অফারিংস-এর ৫৯ ও ৫৭ সংখ্যক কবিতার মিশ্রণ, এবং অন্যটি ১, ১৯ ও ৭ সংখ্যক কবিতার মিশ্রণ। এই অদ্ভুত মিশ্রণের কারণ বোঝার আগে আমাদের দেখে নেওয়া দরকার প্রথম যে-কবিতাটি আয়ালা উদ্ধৃত করেন সেটিকে গীতাঞ্জলি-র কবিতা বলে উদ্ধৃত হলেও সেটি আসলে চৈতালি-র ‘কর্ম’ কবিতাটির ভাষান্তর, যেটির ইংরেজি তরজমা ছিল কবির জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে সেক্ষেত্রে আয়ালা এই কবিতাটি পেলেন কোথায়। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আজ দেখি যে ‘কর্ম’ কবিতাটির ইংরেজি তরজমা প্রকাশিত না হলেও, রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা দ্য ক্রেসেন্ট মুন-এর পাণ্ডুলিপিতে এই কবিতাটির একটি ইংরেজি তরজমা পাওয়া যায়। পাণ্ডুলিপিতে রদেনস্টাইনের হাতে লেখা একটি নোটও পাওয়া যায়, যেখানে তিনি এটিকেই দ্য ক্রেসেন্ট মুন-এর মূল পাণ্ডুলিপি বলে দাবি করেন, ‘যেগুলি পরবর্তীকালে স্টারজ মুরের দ্বারা প্রায় পুনর্লিখিত।’

রদেনস্টাইনের এই দাবি বাংলা জানা অনেক পাঠকের কাছেই হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু এ থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে এই কবিতাগুলি অন্তত দুজন ব্যক্তি দেখেছিলেন : রদেনস্টাইন এবং স্টারজ মুর। পেরেজ দে আয়লার জীবনীপঞ্জি মাথায় রাখলে মনে হয় হয়তো তিনি রদেনস্টাইন বা মুর বা তাঁদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের কাউকে চিনতেন, যাঁর মাধ্যমে কিছু কবিতা তাঁর হস্তগত হয়, কিন্তু তিনি জানতেন না যে এটি বহু-আলোচিত সং অফারিংস-এর কবিতা নয়, অথবা গুলিয়ে ফেলেছিলেন। এই উৎস পাঠটিকে চিহ্নিত করার পর, আয়লার ভাষান্তরটি পড়লে বোঝা যায় ভাষান্তরকারী হিসেবে তিনি কতটা দক্ষ ছিলেন। আমরা জানি না অন্য দুটি ভাষান্তরের পেছনেও এমন কোনো গল্প আছে কিনা, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে ইউরোপে যে আলোড়ন উঠেছিল, তা বোধহয় এর থেকে ভালোভাবেই বোঝা যায়। আর এ নিয়েও কোনো সংশয় থাকে না যে সেই আলোড়ন উঠতে শুরু করেছিল কবি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগেই। ইউরোপের এই আলোড়নের ঢেউ স্পর্শ করেছিল লাতিন আমেরিকাতেও। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন সত্ত্বেও তাদের মধ্যে ছিল, এবং আজও আছে, একধরনের সহজসরল সংযোগ। যে-কারণে, এক দেশের পরিগ্রহণের অভিঘাত পড়েছে অন্য দেশেও। প্রতিটি দেশের পরিগ্রহণকে চালিত করেছে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়। অতএব প্রতিটি দেশের পরিগ্রহণের ইতিহাস কিছুটা ভিন্ন, এবং এই ভিন্নতাকে অস্বীকার করলে ইতিহাসকেই অস্বীকার করা হয়। আর তাই এই পরিগ্রহণকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে তার প্রেক্ষিতটাও জানা জরুরি।

আর্খেন্তিনায় উনিশ শতকের শেষ দিকেই আরব্য রজনী, বাল্মীকির রামায়ণ, ভগবতগীতা, রুবাইয়াৎ ইত্যাদি বহু বই কাস্তেইয়ানোতে ভাষান্তরিত হতে থাকে। এই বইগুলিকে – এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথকেও পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল কিছু পত্রপত্রিকা।

মোটামুটি উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকেই আর্খেন্তিনায় শুরু হয়ে গিয়েছিল এক সন্ধান – বা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক সন্ধান। নব্য-উপনিবেশবাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁরা সন্ধান করছিল নিজেদের যথার্থ পরিচয়ের, ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির এ বিকল্পের – সব মিলিয়ে এক জটিল আত্মানুসন্ধান। এই অনুসন্ধানের জন্য ইউরোপের মতো ইস্পানো-আমেরিকাও একসময়ে তাকিয়ে ছিল ভারতবর্ষের দিকে, অথবা বলা ভালো প্রাচ্যের দিকে। প্রাচ্য সম্পর্কে ইম্পানো-আমেরিকার ধারণা অবশ্যই কিছুটা ‘প্রতীচ্যে’র দ্বারা প্রভাবিত, কিন্তু, ঐতিহাসিক কারণে তা খানিকটা ভিন্ন ধরনেরও বটে। আর্খেন্তিনায় উনিশ শতকের শেষ দিকেই আরব্য রজনী, বাল্মীকির রামায়ণ, ভগবতগীতা, রুবাইয়াৎ ইত্যাদি বহু বই কাস্তেইয়ানোতে ভাষান্তরিত হতে থাকে। এই বইগুলিকে – এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথকেও পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল কিছু পত্রপত্রিকা। প্রাথমিকভাবে এই লেখাগুলি ইস্পানো-আমেরিকার বহু খ্যাতনামা পণ্ডিতকে ‘প্রাচ্য’ সম্পর্কে কৌতুহলী ও উৎসাহী করে তুলেছিল। অতএব ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের পরিগ্রহণের জমি একরকমভাবে প্রস্তুত ছিল। আর সেইজন্যই নোবেল পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যখন সুদূর বুয়েনোস আইরেসে রবীন্দ্রনাথের কবিতার এস্পানিওল ভাষান্তর প্রকাশিত হয়, তখন আশ্চর্য হওয়ার বিশেষ কিছু থাকে না।

২.

১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসেই, আর্খেন্তিনার নোসোত্রোস (Nostros) নামক পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ১২টি কবিতা প্রকাশিত হয়, তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির খবরসহ। এগুলি হল সং অফারিংস-এর ১-৬, ১৫-১৮ এবং ১০২-১০৩ সংখ্যক কবিতা। এস্পানিওল ভাষান্তর কে করেছিলেন কোনো নাম নেই। কেবল একটি ছোট ভূমিকায় বলা হয় যে সদ্য নোবেলপ্রাপ্ত ভারতীয় কবি, যাঁর জীবনী কয়েকদিন আগেই সব কাগজে ছাপা হয়েছে, এখানে তাঁরই কবিতার ভাষান্তর দেওয়া হল। অর্থাৎ সংবাদপত্রের খবর এবং ভাষান্তরগুলির মধ্যে সময়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়। আর্খেন্তিনায় তো বটেই, সম্ভবত সমগ্র লাতিন আমেরিকাতেই, এটিই রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রথম কাস্তেইয়ানো ভাষান্তর। মূলানুগ এই ভাষান্তরগুলির সঙ্গে ছিল রবীন্দ্রনাথের একটি শিল্পীর নামবিহীন প্রতিকৃতি।

এরপর সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে কবির ইংরেজি বইগুলির ভাষান্তর। ১৯১৫ সালেই বেরোয় পোয়েমাস (Poemas) নামে একটি বই যাতে ছিল দ্য গার্ডেনার-এর ২৫টি কবিতা। ভাষান্তর করেন কার্লোস মুজ্জিও সায়েঞ্জ পেনিয়া (Carlos Muzzio SaneZ-Pena, ১৮৮৫-১৯৫৪)। আর্খেন্তিনার প্রসিদ্ধ এই লেখক ও সাংবাদিক পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের একাধিক ইংরেজি বইয়ের ভাষান্তর করেন। প্রকৃতপক্ষে, আর্খেন্তিনা তথা ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক পরিচিতির সিংহভাগ কৃতিত্ব এই লেখকের। ১৯১৪-১৫ সাল নাগাদ, এদিসিওনেস মিনিমাস নামক একটি প্রকাশনা সংস্থা বিভিন্ন বিদেশি লেখক যাঁদের লেখা মূলত ভাষান্তরের মাধ্যমে আর্খেন্তিনায় এসেছে, তাঁদের লেখা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টার দ্বিতীয় ফসল পেনিয়ার পোয়েমাস। এই বইয়ের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর লেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ভূমিকায় যদিও কোনো স্বাক্ষর নেই, কিন্তু ভারতীয় সাহিত্য সম্পর্কে লেখকের জ্ঞান আমাদের চমৎকৃত করে। লক্ষণীয় যে, লেখক এখানে রবীন্দ্রনাথেরে ইউরোপীয় পরিচিতির মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেন রদেনস্টাইনকে। যদিও ততদিনে ইভলিন আন্ডারহিল ও ইয়েটসের কল্যাণে ‘মিস্টিক কবি’র তকমা রবীন্দ্রনাথের গায়ে লেগে গেছে, তবুও এই লেখায় প্রথমেই উল্লিখিত হয় সাধনা-র কথা। পেনিয়ার উদ্ধৃতিতে এখানে স্পষ্টভাবেই বলা হয় যে, এই কবিতাগুলি (অর্থাৎ, দ্য গার্ডেনার-এর কবিতাগুলি) রবীন্দ্রনাথের অন্য সমস্ত লেখা, এমনকি গীতাঞ্জলির চেয়েও শ্রেষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথকে তার নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতে বোঝার চেষ্টাও দেখা যায় যখন তাঁর কবিতা প্রসঙ্গে উল্লিখিত হয় জয়দেবের গীতগোবিন্দর কথা। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯১৪ সালে এই পেনিয়াই ভাষান্তর করেন ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াৎ। ফলে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে একজন বিচ্ছিন্ন কবি নন, বরং একটি ধারার প্রতিভূ।
১৯১৬ সালে নোসোত্রোস-এর প্রকাশনা সংস্থার দ্বারাই প্রকাশিত হয় পেনিয়ার ভাষান্তরে কবীরের কবিতা, লোস পোয়েমাস দে কবির (Los poemas de Kabir)। এখানে কবীরের ৪৯টি কবিতার কাস্তেইয়ানো ভাষান্তর করা হয়। ভূমিকায় পেনিয়া কবীর ও তাঁর সময়, দর্শন ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেখানে ক্ষিতিমোহন সেনের সংগৃহীত কবীরের দোঁহা, রবীন্দ্রনাথ, অজিতকুমার চক্রবর্তী সকলের কথাই আলোচিত হয়, যদিও পেনিয়ার উৎস-পাঠ কোনটি তা খুব পরিষ্কার বোঝা যায় না। কিন্তু পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের আর-এক ভাষান্তরকারী খোয়াকিন গোঞ্জালেজ (Joaquin V. Gonzalez, ১৮৬৩-১৯২৩) বলেন যে রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে কবীরের বাণীর প্রতি পেনিয়াই প্রথম তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অতএব ধরে নেওয়া যায় যে পেনিয়া এখানে ওয়ান হান্ড্রেড পোয়েমস অফ কবীর থেকেই কিছু কবিতার ভাষান্তর করেন। এই লেখায় যেভাবে তিনি ঋগ্বেদ, মনুসংহিতা, বৌদ্ধ ও সুফি দর্শন ইত্যাদি সম্পর্কে মন্তব্য করেন তা থেকে বোঝা যায় যে ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনের সঙ্গে তিনি যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন।

১৯১৭-এ প্রকাশিত হয়, পেনিয়ার ভাষান্তরেই, ফুট গ্যাদারিংস-এর কাস্তেইয়ানো তর্জমা লা কোসেচা দে লা ফুতা (La cosecha de la fruta)-র দ্বিতীয় সংস্করণ, খোয়াকিন গোঞ্জালেজের ভূমিকা-সহ। এখানেও আমরা দেখি আলোচনা কেবলমাত্র রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, লেখক এই কবিতাগুলিকে কবির অন্য লেখাগুলির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে পড়বার চেষ্টা করেন। আসে সাধনা-র কথা, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ও নাটকগুলির কথা। উল্লিখিত হয় অবনীন্দ্রনাথের ছবির কথাও, এমনকি হিতোপদেশ, পঞ্চতন্ত্র-র কথাও। লেখাটি পড়লে ভারতবর্ষ সম্পর্কে ইস্পনো-আমেরিকার উৎসাহের কথা বুঝতে অসুবিধা হয় না, তবে এই উৎসাহ ততটা ভারতের বর্তমান বাস্তব সম্পর্কে নয়, যতটা এক সুদুর ‘প্রাচ্যের প্রতীক’ সম্পর্কে। অনেকটাই ভাবোচ্ছ্বাসে পূর্ণ এই ভূমিকায় বারেবারেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা করা হয় খ্রিস্ট বা সান খুয়ান দে লা ক্রুজের। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কীভাবে গোঞ্জালেজ তাঁর পাঠকদের সচেতন করে দেন কবিতার বহুস্বর সম্পর্কে, তাদের সংরূপ সম্পর্কে, খেয়াল করতে বলেন কীভাবে কবিতাগুলির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে একটি ভাব, ধরিয়ে দেন কীভাবে কবি ব্যবহার করেন আগুনের রূপক, কীভাবে তাঁর কবিতায় ব্যক্তিসত্তা লীন হয়ে যায় বিশ্বসত্তায়।

১৯১৫ সালে প্রখ্যাত দার্শনিক, পণ্ডিত লা প্লাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন আচার্য, খোয়াকিন গোঞ্জালেজ ভাষান্তর করলেন রবীন্দ্রনাথের একটি সম্পূর্ণ বই; নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত, বহু-প্রশংসিত গীতাঞ্জলি নয়, আর্হেন্তিনায়, এবং সম্ভবত সমগ্র ইস্পনো-আমেরিকাতেই, প্রথম ভাষান্তরিত হল রবীন্দ্রনাথের তর্জমায় কবীরের একশোটি দোহা, সিয়েন পোয়েমাস দে কবীর (Cien poemas de Kabir)। কিন্তু, এর প্রথম প্রকাশ বই হিসেবে নয়, ১৯১৮ সালে আতেনেয়া (Atenea) নামক একটি পত্রিকার ৪ এবং ৫, দুটি সংখ্যা জুড়ে। যদিও ১৯১৫ সালেই ভাষান্তর হয়ে গিয়েছিল, গোঞ্জালেজ এগুলি প্রকাশ করতে চাননি। ১৯১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের সময়ে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে যে বিদায় সংবর্ধনা দেয়, তাতে আপ্লুত হয়ে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তিনি এই কবিতাগুলি প্রকাশ করেন এই সদ্য-প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায়। এবং আতেনেয়া কর্তৃপক্ষ তাদের কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ, কোনো ধরনের সম্পাদকীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই – যে-কথা তাঁরা ঘোষণা করে দেন প্রারম্ভেই গোঞ্জালেজের একটি বিস্তারিত ভূমিকাসহ – এই কবিতাগুলি প্রকাশ করেন।

“আমি নীরবেই এই মতামত পোষণ করেছি… যখন আমি রবীন্দ্রনাথ পড়তে পারলাম… প্রেমের সংগীতের এমন উজ্জ্বল তারের সঙ্গে নিজের সামান্য সুর মিলিয়ে দিতে পেরে আমার আনন্দ আর বাধা মানল না… কারণ আমাদের চারপাশে যা কিছু রয়েছে তার শেষ কথা প্রেমই।”

এই ভূমিকাটি পড়লে দেখা যায় যে গোঞ্জালেজ রবীন্দ্রনাথের ইংরেজিতে প্রকাশিত প্রায় সব বই পড়েছেন, তিনি বোলপুরে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের কথা, বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসংগীত ইত্যাদির উল্লেখ করেন, যা থেকে বোঝা যায় কবীর এবং রবীন্দ্রনাথের রচনার পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত ধারণা ছিল, যদিও তিনি স্পষ্টভাবে এ কথাও জানিয়ে দেন যে তিনি সংস্কৃত, বাংলা বা কোনো ভারতীয় ভাষা জানেন না। এই ভূমিকায়, একজন যথার্থ ভাষান্তরকারী হিসেবে, তিনি তাঁর পাঠকদের কাছে পৌছিয়ে দেন তাঁর পাঠ-পদ্ধতিও। আর সেইজন্যই এই লেখাটি ইস্পানো-আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের পরিগ্রহণ বোঝার জন্য এবং ভাষান্তর-চর্চার জন্যেও, একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে। চারটি অংশে বিভক্ত সুদীর্ঘ এই ভূমিকার শুরুতেই গোঞ্জালেজ বলেন যে তিনি ব্যাখ্যা করতে চান তাঁর এই বইটি ভাষান্তরের জন্য বেছে নেওয়ার কারণ। প্রথমত, তিনি বলেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাহিত্য কীভাবে বিভিন্ন সময়ে ভাষান্তরিত সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। ইস্পনো-আমেরিকায় ভারতীয় সাহিত্য ভাষান্তরের ইতিহাস, ভারতীয় দর্শন ইত্যাদি নিয়ে সুদীর্ঘ আলোচনার পর তিনি ব্যাখ্যা করেন রবীন্দ্রনাথের বিশেষত্ব, “যবে থেকে আমি পড়াশোনা শুরু করেছি এবং আমাদের দেশের গভীর সমস্যাগুলিকে ইতিহাস থেকে তুলে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে পেরেছি, আমার মনে হয়েছে তাঁর ভেতর রয়েছে এক ঘৃণা যা প্রায় ঐতিহাসিক নিয়ম মেনে বারে বারেই নিজেকে প্রকাশ করেছে। আমি নীরবেই এই মতামত পোষণ করেছি… যখন আমি রবীন্দ্রনাথ পড়তে পারলাম… প্রেমের সংগীতের এমন উজ্জ্বল তারের সঙ্গে নিজের সামান্য সুর মিলিয়ে দিতে পেরে আমার আনন্দ আর বাধা মানল না… কারণ আমাদের চারপাশে যা কিছু রয়েছে তার শেষ কথা প্রেমই।” গোঞ্জালেজ দেখান দান্তে থেকে শুরু করে সান খুয়ান দে লা ক্রুজ, কবীর, রবীন্দ্রনাথ সবাই আসলে বিভিন্নভাবে এই প্রেমের কথাই বলেন।
নব-উপনিবেশবাদ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ-সহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ যখন তাদের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় ধ্বস্ত, ঠিক সেই সময়েই সেখানে পৌঁছেছিল রবীন্দ্রনাথের সুরে কবীরের বাণী। আর সেই বাণী এসে পৌঁছাল তখনই, যখন ইউরোপীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য লাতিন আমেরিকা সন্ধান করছে এক বিকল্পের। শুধু তাই নয়, এই প্রেমের সুর এল এমন এক দেশ থেকে যাদের নিজেদেরই রয়েছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস, যারা নিজেরাই পরাভূত, অত্যাচারিত। সেই পরাভূত দেশেরই কবি রবীন্দ্রনাথ, যাকে স্বীকৃতি জানাতে বাধ্য হয়েছে উপনিবেশবাদী শক্তিও। সেইজন্যই রবীন্দ্রনাথ আর্খেন্তিনায় হয়ে উঠলেন এতটাই প্রাসঙ্গিক। ইস্পানো-আমেরিকার নিজস্ব সাহিত্য তখন সদ্য আধুনিকতার (modernismo) এক পর্ব পেরিয়ে যাত্রা করতে চলেছে দ্বিতীয় পর্বের দিকে। একদিকে নিজেদের বাস্তবতাকে তুলে ধরতে তারা খোঁজ করছে নতুন কোনো সংরূপের, আর অন্য দিকে সেই কঠিন বাস্তবতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তাঁরা চাইছে প্রায় পরাবাস্তব এক সত্য এবং সুন্দরের সন্ধান। এই সবই তাঁরা পেয়েছিলেন সেই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথের লেখায়। আর তাই, নোবেল-পুরস্কৃত গীতাঞ্জলি নয়, আর্খেন্তিনায় অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল কবীরের কবিতাগুলি, এবং দ্য গার্ডেনার, ফুট গ্যাদারিংস ইত্যাদি বই। বিশ শতকের শেষেও কবীরের কবিতাগুলির নতুন নতুন ভাষান্তর বেরোয়। অন্যদিকে গীতাঞ্জলির ভাষান্তরের জন্য ইম্পানো-আমেরিকাকে অপেক্ষা করতে হবে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত, যখন আবেল আলার্কোন সং অফারিংস-এর ৯৬টি কবিতার তর্জমা করেন গীতাঞ্জলি : ওরাসিওনেস লিরিকাস বইয়ে। ১৯২২-২৩ নাগাদ কোলেখিয়ো নাসিওনাল মেরসেদেস থেকে বেরোয় লাতিন আমেরিকা কবিতার এল মানান্তিয়াল নামক একটি সংকলনে – রুবেন দারিও, আমাদো নের্ভো প্রমুখ দিকপাল কবিদের পাশাপাশি জায়গা করে নেয় রবীন্দ্রনাথের দুটি কবিতা, যদিও এই ভাষান্তর কে বা কারা করেছিলেন, কোনো নাম পাওয়া যায় না। মূলত ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসী আর্খেন্তিনার নতুন প্রজন্ম হয়তো অনেকটাই অনুপ্রেরণা পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথের দেবতার থেকে যিনি নাথ-বন্ধু-সখা হয়ে পাশে থাকেন, দূর থেকে বিচার করেন না, যে-কথা বলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়ের কথা স্মরণ করে। কিন্তু ইস্পনো-বিশ্বে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় শুধু গীতাঞ্জলির কবি হিসেবেই থেমে থাকেনি একথা বোধহয় নিঃসন্দেহে বলা যায়। হয়ে উঠেছিলেন প্রায় এক প্রতিষ্ঠানের সমান। আর সেইজন্যই শুধু অনুপ্রেরণা নয়, একই সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিষ্ঠান-বিরোধীদের লক্ষ্যও। ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ আর্খেন্তিনায় পৌঁছানোর কিছু আগে – যখন রাষ্ট্র হয়ে গেছে বিশ্বকবির আগমন সংবাদ আর দেশজুড়ে চলছে তার ব্যাপক প্রস্তুতি – এই প্রতিষ্ঠান-বিরোধীদের একটি বিখ্যাত পত্রিকা মারতিন ফিয়েররো-তে প্রকাশিত হয় একটি কবিতা। হেক্তর কাস্তিইয়োর লেখা কবিতাটির নাম রবীন্দ্রনাথের জন্য প্রার্থনা। রবীন্দ্রনাথের লেখায় যে প্রেম, যে আধ্যাত্মিকতার কথা অন্য কবিরা বারেবারেই উল্লেখ করেন, যে বিশ্বমানবতার সুর তাঁর কবিতায় শোনা যায়, সেইগুলিকেই সূক্ষ্মভাবে ও দক্ষ হাতে ব্যঙ্গ করে লেখা এই কবিতাটি আমাদের বুঝিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা ও জনপ্রিয়তা আর্খেন্তিনায় কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের আগেই। হয়তো-বা এই ইতিহাস আমাদের সাহায্য করবে নিজেদের চেনা কবিকে নতুন করে চিনতে!

গ্রন্থসূত্র

Saenz-pena, Carlos Muzsio, Los Poemas de Kabir. Buenos Aires: Nosotros. 1916 Print.
Tagore, Rabindranath, Cien Poemas de Kabir. Joaquin V. Gonalez, Buenos Aires; libreria Hachete S.A., 1923. Print
Gitajal: Oraciones Liricas. Trans. Abel Alarcon. Madrid: Imprenta de M. Garcia y G. Saez. 1917. Print.
La Cosecha de la Fruta. Trans. Carlos Muzzio Saenz-Pena. end. Buenos Aires:
Sociedad Cooperatgive Editoria Limitada, 1917. Print.
Poemas. Trans. Carlos Muzzio Saenz-Pena. Buenos Alres: Ediciones Minimas, 1915. Print.

 

আপনি যদি এই লেখাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে চান তাহলে আমাদের নিচের দুটি ফেসবুক পেজ ভিজিট করুন

Teerandaz Antorjal

তীরন্দাজ Teerandaz

Share Now শেয়ার করুন