পবিত্র সরকার >> শঙ্খ ঘোষ, কবিতা থেকে মিছিলে >> শঙ্খ ঘোষ স্মরণে >> গদ্য

0
487

শঙ্খ ঘোষ, কবিতা থেকে মিছিলে

শিরদাঁড়া সোজা রেখে একজন কবি যে সময়ে চলে গেলেন তাকে হয়তো যথাসময় বলা যায় এক দিক থেকে।  বয়েস হয়েছিল, শরীর বা কণ্ঠস্বরও তেমন বশে ছিল না।  তবু তাঁর উল্টোডাঙার বিদ্যাসাগর নিবাসের ফ্ল্যাটে গেল ভেতরের ঘর থেকে চলে আসতেন, তাঁর নতুন উঁচু চেয়ারে সটান বসতেন, এবং অতিথির বিদায়ের সময় কারও বারণ না শুনে টলোমলো পায়ে দরজা পর্যন্ত আসতেন।  তাঁকে দেখে মনে হত মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্কই নেই, সে যতই উইংসের পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাক না কেন।  কিন্তু সর্বধ্বংসী করোনা এসে তাঁকে ছিনিয়ে নিল আমাদের কাছ থেকে।

কবিদের অনেকের মাত্র একটা পরিচয় বড় হয়ে থাকে—কবি।  সেটাই যথেষ্ট, কারণ কবিতার অন্ধিসন্ধি খুঁজতেই আমাদের আয়াস শেষ হয়।  শঙ্খ ঘোষ বাংলা সাহিত্যের এক জন শ্রেষ্ঠ কবি, সে কথা নানা ভাবে উৎকীর্ণ থাকবে।  কোন্ অভিমুখের কবি তিনি ?  একদিকে গভীরভাবে ব্যক্তিগত বোধ, সম্পর্ক আর বন্ধন এবং এ সবের অনিবার্য দ্বন্দ্ব তাঁর কবিতাকে মেদুর করে রাখে,  অন্য দিকে বাইরের সমাজের যে বঞ্চিত, পীড়িত, প্রতিবাদ করতে গিয়ে লাঞ্ছিত নির্যাতিত মানুষেরা—তাঁরাও তাঁকে প্রতিনিয়ত তাদের কথা বলবার দাবি জানায়।  আমাদের মতে, গত শতাব্দীর তিরিশের বছরগুলির ব্যক্তিকেন্দ্রিক কবিতার ধারা (তা সব সময়ে বিশুদ্ধ ব্যক্তিকেন্দ্রিক থাকেনি), এবং চল্লিশের বছরগুলির যে বামপন্থী সমাজমুখী কবিতার ধারা, শঙ্খ ঘোষের মধ্যে তার একটা সার্থক সমন্বয় ঘটেছিল।  ফলে এই ছত্রগুলি যেমন আমাদের ব্যক্তিগত বেদনাকে দুলিয়ে দেয়—‘আমাদের মাঝখানে প্রথম বৃষ্টির বিন্দু নীল/আর তুমি নিচু হয়ে তুলে নাও একমুঠো মাটি //শূন্যে ছড়াও, আর চোখে চোখে না তাকিয়ে বলো :/ ভেবো না। ভেবো না কিছু। দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।’  আবার এই কাছাকাছি সময়ের ছত্রগুলিও আমাদের আর-এক ভাবে কাঁপায়—‘আজ মনে হয যন সত্তর বছর পর/ঠিক ঠিক সবাই স্বাধীন–/গরিবি কোথাও নেই, ভুখা নেই কোনোখানে/সামনে শুধু স্বচ্ছ অচ্ছে দিন।//তিসরা ঝাঁকি  দিকে দিকে, কোনোখানে কালবুর্গি,/কোথাও বা গৌরী লঙ্কেশের/খরা জরা জলস্রোতে রক্তস্রোতে বেসে যায়/স্বপ্ন যত ভবিষ্য দেশের// গলায় মুণ্ডুর মালা, তাথৈ তাথৈ নাচে/গোটা দেশ হয়েছে ভাস্বর–/ আজ সে পরীক্ষা হবে আমরা শুধু শববাহক/নাকি কোনো সত্যভাষী স্বর।’ এই ‘সত্য’ কথাটা তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র ভূমিকায় সেই ১৯৭০-এই তিনি বলেছিলেন, ‘সত্য কথা বলা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই কবিতার।’

শঙ্খ ঘোষের এই মানুষের কথা, দেশের কথা, প্রতিবেশের কথা কোনও দলের পরিচয়ের দ্বারা চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।  ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ তাঁর রাজনৈতিক বন্ধুদের ক্ষুব্ধ করেছিল, এমন হতেই পারে।  কখনও তীব্র ব্যঙ্গে, কখনও গভীর বেদনায় তাঁর কলম থেকে নানা সময়ে নানা পঙ্‌ক্তি বেরিযে এসেছে, সেগুলি তো ঐতিহাসিক স্মৃতি হিসেবে জেগে আছে।  আবার মরিচঝাঁপি ও নন্দীগ্রাম সম্বন্ধে তাঁর অবস্থান তাঁর অনেক বামপন্থী ভক্তকে বিভ্রান্ত করেছিল।  আমাদের মতে ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা ভাষ্যের চেয়ে তিনি মানবিক সংকটের দ্বারা বেশি অভিভূত হয়েছেন।  কারণ তিনি দেখেছেন, ‘প্রতিদিন ভোরের কাগজে/ বর্বরতা শব্দ তার সনাতন অভিধানে নিত্যনব প্রসারণ খোঁজে।’

শুধু কবিতা নয়, তাঁর গদ্যও অসাধারণ।  শুনে আশ্চর্য লাগতে পারে যে, কবিতার চেয়ে তাঁর গদ্যের পরিমাণ বেশি।  আর সে গদ্য উষ্ণ, ব্যক্তিগত, আন্তরিক—নিজেকে প্রশ্ন করতে করতে এগিয়ে যাওয়া—যে প্রশ্নগুলি পাঠকারই করবার কথা, সেগুলি তিনিই করেন, আর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে বিপুল স্বাচ্ছন্দ্য তরতর করে এগিয়ে যান।  তাঁর সমালোচনামূলক লেখা যেমন পাঠকের কাছে আদৌ দুর্বোধ্য নয়, তেমনই তাঁঋ স্মৃতিচারণাগুলির আকর্ষণও অপ্রতিরোধ্য।  শঙ্খ ঘোষকে কেবল কবি হিসেবে যাঁরা পড়বেন তাঁরা তাঁর আশ্চর্য গদ্যের রস থেকে নিজেদের বঞ্চিত করবেন।

মানুষটিকে তো দীর্ঘদিন থেকে দেখেছি।  গত শতকের ষাটের বছরগুলির গোড়া থেকে, ১৯৬৬তে যাদবপুরে এক বিভাগে সহকর্মী হলাম।  শুধু সহকর্মী নয়, বহু প্রতিবাদ মিছিলে কলকাতার পথে তাঁর সহযাত্রী।  যৌবনে প্রচুর হাঁটতে ভালোবাসতেন, মিছিলেও হাঁটায় তাঁর কোনও ক্লান্তি চিল না।   শান্ত অনুচ্চ কণ্ঠস্বর, অথচ তারই কী শক্তি ।  তার পড়ানো আর রবীন্দ্রভাষ্যে সবাই মুগ্ধ, তাঁর বক্তৃতা শোনা একটা অভিজ্ঞতা।  তাঁর নিজের কবিতার আবৃত্তি সকলকে স্তব্ধ করে রাখে।  আমাদের তিনি অ্গ্রজ, ছোটবড় সকলে তাঁর কাছে আশ্রয় পায়।  ছাত্রছাত্রীদের তিনি বন্ধু, তিনি নাথ।  কত কবি যে শঙ্খ ঘোষ আর তাঁর কবিতা  আছে বলেই কবিতার কাছে এসেছে, নিজেদের কবিতাকে আরও উজ্জ্বল করার চেষ্টা করেছে তার ইয়ত্তা নেই।  শঙ্খ ঘোষ বহু কবিকেও নির্মাণ করেছেন বা নির্মিত হতে সাহায্য করেছেন।  এ সব কথা বলবার লোক আছে, তরুণ কবিরাও নিশ্চয়ই বলবেন।  কিন্তু বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের এক দুর্গত সময়ে তিনি যে নিজের একটা পুরস্কারের টাকা থেকে সাহিত্য পরিষদকে পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন—পুরস্কারের পুরো টাকাটাই, তা হয়তো সব খবরে স্থান পাবে না। কিংবা লন্ডনের বন্ধু নিমাই চট্টোপাধ্যায়ের বহু কোটি টাকার উত্তরাধিকার সাহিত্য পরিষদে নিয়ে এসেছেন, সে খবরও বেশি বাঙালি রাখেন না সম্ভবত।

তাঁর শূন্য স্থান আর কবে আমাদের সংস্কৃতি পূরণ করতে পারবে’ কে জানে ?

Share Now শেয়ার করুন