পাতাঝরার নৈঃশব্দ্য > মনোয়ার মোকাররম >> ছোটগল্প

0
1150

পাতাঝরার নৈঃশব্দ্য

জালালের জীবন-মৃত্যু এখন আমার হাতে। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, তাকে বাঁচিয়ে রাখব, নাকি মেরে ফেলব।

ঘড়িতে দেখি রাত ৩:৪৫, অর্থাৎ ভোর হতে চলেছে। এতটা রাত হয়েছে, টের পাইনি। রাত হওয়াটা তেমন কিছু নয়। আমি এমনিতেই রাতজাগা মানুষ। রাতেই আমার কাজ। সারাদিন আসলে আমি জীবন-জীবিকার কাজেই ব্যস্ত থাকি, খুব একটা সময় মেলে না। এই কাজ শুরু হয় রাতের বেলা।
ঘড়ির দিকে মনোযোগ পড়তেই টিকিটিক আওয়াজটা শুনতে পাচ্ছি। এতক্ষণ শুনতে পাইনি। হয়তো ঘড়িটা এতক্ষণে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে তার অবস্থান জানান দিতে পেরে। অবস্থান জানান দেওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য আমরা জানি যে, ঘড়ির প্রাণ নেই। তাই তাঁর থাকা না-থাকায় কী আসে যায়! আচ্ছা, মানুষের তো প্রাণ আছে? তা আছে। আমাদের প্রাণ কী ঘড়ির প্রাণের মতো। টিকটিক করে নিজের অবস্থান জানান দেবার এক চিরন্তন সংগ্রাম। নাকি উল্টো? ঘড়ির জন্যে হঠাৎ করে আমার একটু মায়াই লাগল। নিজের অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের সাথে আমাদের জীবন-যাপনের যে নিবিড় সম্পর্ক আছে, তা ঘড়ির কখনোই জানা হবে না।
যাই হোক, ঘড়ির আবেগ আছে কী নেই, তা আমাদের চিন্তার বিষয় নয়। চিন্তার বিষয় এখন জালাল জীবন-মৃত্যুতে আটকে আছে। ঘড়ির কাটার শব্দটা এখন আর কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছে না। বরং একেকটা টিকটিক শব্দ যেন হাতুড়ির মতো মাথার মগজে গেঁথে যাচ্ছে। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে।
বিষয় তেমন জটিল নয়। এমন নয় যে আমি এই প্রথম এরকম অবস্থায় পড়েছি। আমার জীবনে আমি বহুবার এরকম পরিস্থিতে পড়েছি এবং অবলীলায় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। কিন্তু আজ কী যেন একটা আমাকে বার বার টেনে ধরছে।
আমার স্ত্রী কখন যে আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি।
– কি শেষ হয়নি?
– না, জালালের কি করব বুঝে উঠতে পারছি না।
– এটা নিয়ে তুমি একটু বাড়াবাড়ি রকমের চিন্তা করছ। একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেল। তোমার ইচ্ছে হলে তুমি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখ, না হলে মৃত্যুতেই পরিসমাপ্ত হোক। সিদ্ধান্তহীনতায় আটকে থেকে সময় নষ্ট করার তো মানে দেখি না। তবে সিদ্ধান্ত যাই নাও না কেন, খুব বেশি পার্থক্য হবে বলে মনে হয় না। নাউ, ইটস আপ টু ইউ।

আমি কিছুটা আঁতকে উঠলাম। সচরাচর আমি এরকম আঁতকে উঠি না। হ্যাঁ, কথাটা সত্যি। আমিই এখন জালালের ভাগ্যবিধাতা। আমার হাতে দুইটা অপশন আছে। আমি চাইলে জালালকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, আবার মেরেও ফেলতে পারি।

এই প্রথম নয়। এর আগেও আমি এরকম পরিস্থিতিতে পড়েছি। এমন জালালের মতো আরো অনেককেই নির্মমভাবে হত্যা করেছি এবং ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছি যে, সেই মৃত্যু গভীরভাবে লোকজনের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। অতি আবেগপ্রবণ যারা তারা অনেকে মনের অজান্তে চোখের জলও ফেলেছে।
কখনো কখনো মনে হয়, আমরা আজকাল মানুষের বেঁচে থাকায় খুব বেশি আনন্দিত হই না। কিন্তু মানুষের মৃত্যুতে আনন্দিত হই। তবে এই আনন্দিত হওয়াটার একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ আছে। আমরা বলি, মানুষের মৃত্যুতে আমরা আসলে ব্যথিত হই। অত্যন্ত ব্যথিত হই। আমাদের শরীরে হরমোন সিস্টেমে যে বিশেষ ধরনের প্রভাব পড়ে, তাতে আমরা আকুল হই, ব্যাকুল হই, আমাদের চোখে জল পর্যন্ত গড়ায়। এই বিশেষ বেদনার মধ্যে একধরনের আনন্দবোধ আছে। এটাকে বলা যায় সহানুভূতির আনন্দ বা করুণাঘটিত আর্দ্র সুখ। আমরা লোকের দুঃখে, বিপদে, সহানুভূতি দেখিয়েও একধরনের আনন্দ পাই। বলা যায়, সমকালীন বিনোদনের এক নতুন মাধ্যম অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়া, নিজের হরমোনকে একটু সচল রাখা। কে জানে, কার মনে কী খেলা করে!
জালালের ক্ষেত্রে আমার সিদ্ধান্তহীনতার একটা কারণ এই সহানুভূতির আনন্দ বা করুণাঘটিত আর্দ্র সুখ। জালালকে মেরে ফেলে আমি অনায়াসেই মানুষের আবগের মৌচাকে একটা ঢিল ছুঁড়ে দিতে পারি। কিন্তু আজ ক্রমাগত কয়েকদিন ধরেই জালাল বলে যাচ্ছে আমাকে মেরো না। আমি মরতে চাই না। বাঁচতে চাই। আমি হারতে চাই না, আমি জয়ী হতে চাই। কিন্তু আমি ঠিক নিশ্চিত না। জালালের জয় নাকি পরাজয়, মৃত্যু নাকি বেঁচে থাকা, কোনটি আমাদের আবেগকে নাড়া দেবে।
আপনাদের হয়তো এতক্ষণে ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, কে এই জালাল, আমিই বা কে? আমি কী কোন সিরিয়াল কিলার? আমি কী ডাকাত, আমি কী কোন পেশাদার খুনি। আপনাদের ধৈর্য্যের অবসান হোক।

আমি এখন পর্যন্ত যাদের হত্যা করেছি তারা কেউ টু-শব্দটি করেনি। আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তারা নীরবে মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু জালাল ছেলেটা হঠাৎ বেঁকে বসলো। চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো,
– আমাকে কেন মারতে চান?

– আমি কি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য?
– অবশ্যই বাধ্য, আপনি আমার জীবন নিয়ে খেলছেন, আর বলছেন আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য না?
– না, বাধ্য না। এমনই হয়ে আসছে। কেউ তো কখনো জানতে চায় নি? তুমি কেন জানতে চাচ্ছ?
– আমি জানতে চাচ্ছি আর আপনাকে উত্তরও দিতে হবে।
– ঠিক আছে, তোমার সাথে আমি বেশি তর্ক করতে চাই না। তোমাকে আসলে আমি মারতে চাচ্ছি মানুষের সহানুভূতি আদায়ের জন্যে। কারণ আমি দেখেছি যে, তোমাদের মৃত্যুতেই আমার লাভ।
– কিন্তু আপনার নিজের প্রতি আপনার কোন সহানুভূতি নেই?
– আমার প্রতি আমার সহানুভূতির ব্যাপার এখানে কিভাবে আসলো?
– আমাকে আপনি যে অবস্থায় আজ এনেছেন, আপনি নিজেও তো কোন একসময় এই অবস্থার ভেতর দিয়ে এসেছেন। আপনার কি অতীত মনে পড়ে না?
– অতীত নিয়ে আমি পড়ে থাকতে রাজি নই। তাছাড়া আমি যে-অবস্থার মধ্য দিয়ে এখানে এসেছি, অন্যকে সেই অবস্থার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়াতেও একটা আনন্দ আছে। আমি কিছুটা ক্রূর হাসি হাসি, নীরবে।
যদিও বলেছি যে অতীত নিয়ে আমি পড়ে থাকতে আমি রাজি নই, কিন্তু অতীত কি অত সহজে ভুলে যাওয়া যায়? আমিই কি ভুলতে পেরেছি। না, পারিনি। আমি ভুলতে পারিনি জীবনের একটা সময় – সময়, সুযোগ আর ভাগ্যের কাছে কী অসহায় ছিলাম আমি। নিজের অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রামের প্রতিটি মুহূর্তে কী এক নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি ভুলিনি। আর তাই হয়তো আমার সেই স্ট্রাগলের দিনগুলোর শোধ নিই আমি, আমার গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের উপর। আমার সব উপন্যাসের চরিত্রদের আমি অত্যন্ত করুণভাবে হত্যা করি- কখনো শারীরিকভাবে, কখনো মানসিকভাবে। আমার উপন্যাসের নায়কদের আমি তিলে তিলে পরাজিত করি। হত্যা করি। আমার নায়কদের আবেগঘন পরাজয় বা মৃত্যু দেখে আমার পাঠকদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। মিলনের চাইতে বিরহে আমার সফলতা। জয়ের চাইতে পরাজয়ে আমার প্রাপ্তি। মানুষের মনের স্পর্শকাতর জায়গাতে যত বেশি উঁহু-আহা’র করুণ সংগীতের সিম্ফোনি তৈরি করতে পারি, ততই আমার সার্থকতা। ততই আমার প্র্রসার। আর এ-কাজটি আমি এখন পর্যন্ত বেশ নিপুণভাবেই করে চলেছি। আমার বইয়ের একেকটি সংস্করণ নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। আর আমি খুঁজি নতুন কোন নায়ক, আর তার পরাজয়ের নতুন কোন পথ।
এই মুহূর্তে আমি জালালের ভাগ্য-বিধাতা। আমার নতুন উপন্যাসের নায়ক জালাল। উপন্যাসের একটা যুৎসই নামও রেখেছি, দৌড়। প্রথমে নাম রাখতে চেয়েছিলাম ‘জলে তাহার ছায়া’। কিন্তু এতে আসলে জয়-পরাজয়ের ভাবটা ঠিকমত ফুটে ওঠে না। এর চেয়ে দৌড় নামটা ভাল যায়। দৌড় মানে রেইস। জালাল এই রেইসে আছে। তার জীবন এক রেইস। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত সামলাতে সামলাতে জালালের জন্য অপেক্ষা করছে তার অমোঘ নিয়তি। পরাজয়। জালালকে আমি একটা খুব কঠিন রোগে ফেলে, হতে পারে সেটা করোনা ভাইরাসের কবলে ফেলে – একদম তরতাজা কারণ, কিংবা শেষ মুহূর্তে কোন একটা সড়ক দুর্ঘটনায়, কিংবা ছিনতাইকারীর কবলে ফেলে, কিংবা কোন কারণ ছাড়াই অনায়াসে মেরে ফেলতে পারি। কিন্তু যদি বলা হয় জালালকে বাঁচানোর একটা পথ করে দিতে, জালালকে জয়ী করতে, তাহলে হয়তো আমি কোন পথ খুঁজে পাব না। কেননা মৃত্যুর পথ খুব মসৃণ, জীবনের পথ অনেক জটিল।
– কি ভাবছেন?
– কিছু ভাবছি না।
– ভাবুন। আর কত?
– কি আর কত?
– এভাবে আমাদের নিয়ে আর কত খেলবেন?
– খেলার কিছু নেই। এটাইতো লেখকের কাজ। মানুষের জীবনের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা।
– ভালো বলেছেন! জীবনের ব্যাখ্যা। সেই ব্যাখ্যা বা উপস্থাপনাটা তো ভিন্নভাবেও করতে পারতেন।

কলিম মাস্টারের সাথে আপনি এরকম না করলেও পারতেন। কি হতো বেচারির চিকিৎসার একটা বন্দোবস্ত করে দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে দিলে? একরামউল্লাহ- তাকে বিনা দোষে এক লজ্জাকর অভিযোগে পুরো গ্রামের লোকের সামনে বেইজ্জতি করলেন, বেচারিকে শেষে উন্মাদ বানিয়ে হিজল গাছে ঝুলিয়ে দিলেন।

তার মতো কত লোক দোষ করে পার পেয়ে যাচ্ছে, আর আপনি একটা নির্ভেজাল লোককে ফাঁসিয়ে দিলেন।
– নির্ভেজাল লোকেরাই তো ফাঁসে।
– আলতাফের জীবনটা কত দরকারি ছিল, বেচারার পরিবারের জন্যে। ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বেরোবে। বুড়ো মা-বাবার কত স্বপ্ন ছিল এইবার সংসারের হাল ধরবে, তাদের দুর্দিন শেষ হলো বুঝি। অথচ আপনি তাকে বাসচাপা দিয়ে মেরে ফেললেন।
– হারুন চেয়ারম্যান। বেচারির ছোট-ছোট দুইটা বাচ্চা। তাকেও আপনি বাঁচতে দিলেন না। রাতের আঁধারে তার প্রতিপক্ষের হাতে তাকে শেষ করে দিলেন। তারপর ওই যে আমিনুল, মিথ্যা খুনের মামলায় তার ফাঁসি হলো। আপনি চাইলেই এমনভাবে সাক্ষীসাবুদ উপস্থাপন করতে পারতেন যে, ছেলেটা মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যেতো। সবকিছু তো আপনার হাতেই ছিল। আপনি লেখক, আপনিই এখানে কারিগর। কিন্তু আপনি আপনার উপন্যাসে আপনার নায়কদের এরকম করুণ পরিণতি কেন দেন? আমাকে নিয়েও এখন খেলছেন। ইন্টারভিউর পর ইন্টারভিউ দেওয়াচ্ছেন, চাকরি দিচ্ছেন না। প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিলেন, তার বিয়ে দিলেন অন্য আরেকজনের সাথে। এখন আবার জীবন নিয়ে নেবার পাঁয়তারা করছেন!
আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়। বড্ড সাহস বেড়েছে জালালের। আমি চিৎকার করে বললাম, তোমার নিয়তি আমার হাতে। আমি তোমাকে যে পরিণতি দেব, তোমাকে তাই বরণ করে নিতে হবে। আমরা সবাই যার-যার নিয়তি নিয়ে এসেছি। আমি এই পৃথিবীতে এসেছি আমার নিয়তি নিয়ে। আমার ভাগ্যবিধাতাও উপরে বসে আমাকে নিয়ে খেলেছেন, খেলছেন। আমিও তোমাকে নিয়ে খেলব। তোমাকে তাই মেনে নিতে হবে।

আমি কলম নিয়ে দ্রুত লিখতে বসলাম। এতক্ষণ মনের মধ্যে যাও কিঞ্চিত দ্বিধা ছিল জালালের পরিণতি নিয়ে, জালালের গোয়ার্তুমির পর আর কোন অবকাশ রইলো না। জালালের মৃত্যু, জালালের পরাজয় হবে এ-যাবৎকালে আমার লেখা সবচেয়ে করুণ উপন্যাস।

আমি ভাবছি, আমি লেখায় মনোনিবেশ করবো আর জালাল ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাবে। এ আমার কল্পিত সৃষ্টি। জালালের দিকে তাকাতেই দেখলাম সে একটা ক্রূর হাসি নিয়ে আমাকে দেখছে। এরপর আমি আরও লক্ষ করলাম, আমার শেলফের ভিতর রাখা অন্য বইগুলো থেকে একে-একে বেরিয়ে আসছে আমার সৃষ্ট একেকটি চরিত্র। ওই তো দেখা যাচ্ছে আলতাফকে, যে-কিনা বাসচাপা পরে মরেছিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একরামউল্লাহ, ব্যাভিচারের অপবাদ মাথায় নিয়ে যে হিজল গাছে ফাঁসিতে ঝুলেছিল। আছে হারুন চেয়ারম্যান, আমার আরেক গল্পে যে ক্ষমতার কোন্দলে খুন হয়েছিল প্রতিপক্ষের হাতে। আছে কলিম মাস্টার, চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে যিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সবাই এগিয়ে আসছে। জালাল তাদেরকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা কি চায়?
কলিম মাস্টার এগিয়ে এসে কলম সমেত আমার হাতখানা চেপে ধরলো। আমি প্রাণপনে চেষ্টা করে যাচ্ছি একটু সময় পেলেই জালালের ভাগ্যটা লিখে ফেলবো। কিন্তু একে-একে আলতাফ, একরামউল্লাহ, হারুন চেয়ারম্যান সবাই এসে আমার হাত চেপে ধরেছে। কে একজন একটানে কলমটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল। এ কি এরা সবাই আমাকে চেপে ধরেছে কেন? ওদিকে জালাল অট্টহাসি হেসে বলছে, আজ আমরা সবাই আপনার ভাগ্য লিখব!
আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। সারা শরীর কেমন ঘামে ভেজা, যেমনটা ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার পর হয়, তেমনি। আয়েশা বিছানায় ঘুমাচ্ছে। তাঁর ঘুম খুব গভীর। টেবিলে মগে পানি রাখা আছে। পানি খেয়ে নিলাম। একটু ভয় মতন লেগেছে। লিখতে-লিখতে কখন টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। আজ আর ঘুম আসবে না। লেখাটাও আজই শেষ করতে হবে। কাল পরশুর মধ্যে প্রকাশককে পাণ্ডুলিপি দিতে হবে। তারপর প্রুফ দেখা, প্রচ্ছদ, ছাপা, বইমেলারও আর সময় নেই। দু-দুটা উপন্যাস দিতে হবে। আমার আগের বইগুলোর বিক্রি বেশ ভালো। প্রকাশকেরা বলেছেন, সে-ধাঁচের হৃদয়স্পর্শী লেখা চাই। এটা আমার জন্যে তেমন কঠিন কিছু না। দুই উপন্যাসের দুই নায়ককে দুইভাবে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যাব। মৃত্যুর উপায় বের করতে তেমন কোন কষ্ট করা লাগে না। মরার হাজারটা কারণ আছে। শুধু বর্ণনাটা হতে হবে হৃদয়স্পর্শী, যেন একেবারে পাঠকের অন্তরে গিয়ে বেঁধে।

ভোর হয়ে যাচ্ছে। জানালার কাঁচ দিয়ে দেখছি ভোরের নিষ্পাপ সূর্যকিরণ। আলো ফুটছে রূপোর রেখায়। একটু একটু করে উজ্জ্বল হচ্ছে পৃথিবী। আমিও লিখে চলেছি জালালের ভাগ্যরেখা। সেখানে শুধুই নৈঃশব্দ্য। কোন আলোর রেখা নেই।

এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোন গাছের কোন পাতাটি নীরবে নিঃশব্দে ঝরে গেলো, কে তার খবর রাখে! আর আমিতো এক অধম লেখক।
জালালকে এখন আর আশেপাশে দেখতে পাচ্ছি না।
মনোয়ার মোকাররম 
কবি ও ছোটগল্পকার। প্রকাশিত গ্রন্থ সুখ পোড়ানো ছাই (কবিতা, ভাষাচিত্র ২০২০)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে মাস্টার্স। ফরেন সার্ভিসে আছেন। বর্তমান কর্মস্থল অটোয়া, কানাডা।
Share Now শেয়ার করুন