পীযূষ কান্তি বড়ুয়া >> নামে ফকির অর্জনে সম্রাট >> প্রয়াণলেখ

0
254

তাঁর কণ্ঠই কালজয়ী করে তুলেছে কোন এক সখিনাকে, যিনি অজস্র খেটে খাওয়া মানুষের প্রিয়তমা পত্নীর প্রতীক হয়ে আবহমান বাঙালির সুখ-দুঃখকে সর্বজনীন করে তুলেছেন।

ব কণ্ঠ জনতাকে জাগিয়ে তোলে না। সব কণ্ঠ গণমানুষের কথা বলে না। সমাজের বঞ্চিত মানুষের দুঃখ-বেদনাকে, শোষিত হওয়ার অবর্ণনীয় যন্ত্রণাকে খুব কম কণ্ঠই ধারণ করে সঙ্গীতের মাধ্যমে জাগরণ ঘটাতে পেরেছে। যারা পারে তারাই গণকণ্ঠ। তারাই গণসঙ্গীতের উপযুক্ত প্রতিনিধি। সংগ্রামে সংগ্রামে আত্মবিনির্মাণের পথ খুঁজে নেয়া বাঙালিকে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, কাজী নজরুল ইসলাম, আবদুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ প্রমুখ জাগরণী কণ্ঠগুলো জাগিয়ে দিয়ে গেছে বিপ্লবে-বিদ্রোহে। সেই তালিকায় এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর।

ফরিদপুরের ভাঙা থানার কালামৃধা গ্রাম আলোকিত হয়ে উঠেছে এই ফকিরের জন্মে। বাবা মোহাম্মদ হাচেন উদ্দিন ফকির আর মা হাবিবুন্নেছা বেগমের ঘরে যে তারিখে তিনি আবির্ভূত হলেন, তার মাত্র বছর দুয়েক পরে একই তারিখে বাঙালি ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে অর্জন করে তাবৎ পৃথিবীর সম্ভ্রম। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে-শিশুর জন্ম, তার জীবন যে জাগরণের ঝর্ণাধারায় অবগাহিত হবে তা যেন নিয়তি নির্ধারিত। সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর হয়েও তিনি কলম নয়, কণ্ঠকেই বল্লমে পরিণত করে তুলেছেন। এই কণ্ঠ-বল্লমই তাঁকে নির্মাণ করে তুলেছে শোষিতের ফকির আলমগীররূপে।

হবিগঞ্জের জালালী কইতর হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর গুরুপ্রতিম আর অমর বিপ্লবী চে’ গুয়েভারার তিনি ভাবশিষ্য। বৃহত্তর ফরিদপুরের বিশ্বজয়ী হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাতিঘর। সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষের মুক্তির ঐশ্বরিক দূত নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে কোলাকুলিতে বক্ষসুধা লাভ করে তিনি নিজে যেমন ধন্য হয়েছেন, তেমনি ধন্য করেছেন গান শুনিয়ে স্বয়ং মাদিবাকেও। মে দিবসে শ্রমিকের ঘামের গানে ফকিরহীন বিকল্প কণ্ঠ এখনও খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ। কাস্তে-হাতুড়ির কষ্ট কিংবা রিকশা শ্রমিকের প্যাডেল চালানোর ক্লান্ত পায়ের সুর তাঁর কণ্ঠে বেজে ওঠে বিশ্বসংগীত হয়ে। ‘নাম তার ছিল জন হেনরি’ বলে শিকাগোর হে মার্কেটের ইতিহাস যেভাবে বেদনার কলি ফোটায় তাঁর সুরে ও ভাবনায় তাতে আর কারো কষ্ট হয় না সে ইতিহাসকে চিত্ররূপময় করে অনুধাবন করতে। মূলত ফকির আলমগীর একজন মরমী শিল্পী যাঁকে জাগ্রত করে তুলেছে সেই অন্ধ বাউলশিল্পী যিনি মায়ের গানে বিভোর হয়েছিলেন ফেরী পারাপারে। ঊনিশশো সাতাত্তরে শোনা সেই গান তাঁর মেধায় মঞ্জরিত হয়ে পেয়ে যায় নূতন রূপ। চলচ্চিত্রে মাতিয়ে বেড়ায় শ্রোতার বিমুগ্ধ শ্রবণে। তাঁর কণ্ঠই কালজয়ী করে তুলেছে কোন এক সখিনাকে, যিনি অজস্র খেটে খাওয়া মানুষের প্রিয়তমা পত্নীর প্রতীক হয়ে আবহমান বাঙালির সুখ-দুঃখকে সর্বজনীন করে তুলেছেন।

একজন কণ্ঠযোদ্ধার চেয়ে একজন সাহিত্যিক ফকির আলমগীরও কম শক্তিশালী নন আমাদের প্রাপ্তির তালিকায়। নয় নয়টা গ্রন্থের স্রষ্টা ফকির আলমগীর চেষ্টা করেছেন সর্বাত্মক, বাংলাদেশের গণসঙ্গীতকে লেখার মাধ্যমে দীর্ঘজীবী করতে।

নামের মধ্যে দিল্লির বাদশাহর ছোঁয়া থাকলেও চাল-চলনে আপাদমস্তক তিনি ছিলেন ঋষির মতো সাদাসিধে, সহজ সরল। তাঁর হাতে গড়া ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর কার্যক্রমই তাঁর চারিত্রিক বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির পাঠে হাতেখড়ি হলেও তিনি তাঁর কণ্ঠের মাধ্যমেই বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। একদিকে অন্ত্যজ শ্রেণিকে যেমন গানের মাধ্যমে টেনে এনেছেন পাদপ্রদীপের আলোয় তেমনি বর্ণবাদকেও ধারাল বল্লমে বিদ্ধ করেছেন নিজস্ব মানবীয় চৈতন্যে। তাঁর ব্যক্তিসত্তায় প্রতীকায়িত হয় কবি সুকান্ত কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার শব্দবিন্যাস আর তাঁর কণ্ঠে মূর্ত হয় নদীমাতৃক বাংলার সোঁদা মাটির সৌরভ। একুশে পদক তাঁর জীবনকে মূল্যায়নের উল্লেখযোগ্য নিয়ামক হলেও গণমানুষের ভালোবাসা তাঁর কর্মমুখর জীবনের অবাঙমানসগোচর সাক্ষ্য। স্বাধীন বাংলাদেশের পপ সঙ্গীতের পঞ্চ পাণ্ডবের (অন্য চারজন যথাক্রমে আজম খান, ফিরোজ সাঁই, পিলু মমতাজ ও ফেরদৌস ওয়াহিদ) তিনি অন্যতম। ভাষা আন্দোলনকালে দু-বছরের শিশু ফকির মায়ের বোল নিজের মুখে ফোটানোর প্রয়াসে লিপ্ত থাকলেও মহান মুক্তিযুদ্ধে কণ্ঠসৈনিক বা শব্দসৈনিক হয়ে দেশের ডাকে নিজের দায় মিটিয়েছেন কড়ায় গণ্ডায়। তাঁর মতো শব্দসৈনিকদের উদ্দীপ্ত উদাত্ত কণ্ঠের অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হয়ে ফিরেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে।

একজন কণ্ঠযোদ্ধার চেয়ে একজন সাহিত্যিক ফকির আলমগীরও কম শক্তিশালী নন আমাদের প্রাপ্তির তালিকায়। নয়-নয়টা গ্রন্থের স্রষ্টা ফকির আলমগীর চেষ্টা করেছেন সর্বাত্মক, বাংলাদেশের গণসঙ্গীতকে লেখার মাধ্যমে দীর্ঘজীবী করতে। ঊনিশশো চুরাশিতে প্রকাশিত হওয়া ভ্রমণ গদ্যগ্রন্থ ‘চেনা চায়না’ তাঁকে গ্রন্থকার হিসেবে পুনর্জন্ম দিলেও তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজয়ের গান’ এবং ‘গণসংগীতের অতীত ও বর্তমান’ এ’দুটো গ্রন্থের মলাটের জীবন্ত ইতিহাসে।

হাজার গানের কণ্ঠকর্মী ফকির আলমগীর গানে কণ্ঠ দেন নি কেবল, তিনি তাঁর গাওয়া গানে গলিয়ে দিয়েছেন হৃদয়, একাকার করে ঢেলে দিয়েছেন তাঁর চেতনা। ফলে সেই কণ্ঠধ্বনি আর গান হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে জীবনবেদ। তা মুহূর্তেই কেড়ে নেয় উৎকর্ণ শ্রবণ, উৎকীর্ণ হয়ে ওঠে প্রাণের শিলালিপিতে নিমেষেই। তাঁকে সারল্য দিয়ে মেপে বাঙালিয়ানা দিয়ে অনুধাবন করতে হয়। তিনি একজীবনের পাঠশালা যার সকল সত্তায় লিপিবদ্ধ আছে প্রকৃত শিক্ষার সফল ও সার্থক পাঠ। ভাঙার মাটির আলোকিত সত্তা জুড়ে লাগিয়েছেন শ্রমজীবী মানুষের পাওয়া না-পাওয়ার টুকরোটাকরা জীবন সুরের গাঁথুনিতে। এর মধ্য দিয়েই নিজের জীবনের বিনির্মাণ ঘটেছে।

একজন জর্জ হ্যারিসন বাংলাদেশের জন্যে গান গেয়ে অমর হয়ে আছেন। একজন ভূপেন হাজারিকা মহেশের গান গেয়ে গঙ্গার ঢেউয়ে বয়ে যান প্রতিনিয়ত। আর একজন ফকির আলমগীর গান গেয়ে অমর করে গেছেন সখিনাকে, যে-সখিনা বাংলাদেশের, তৃতীয় বিশ্বের হতদরিদ্র মানুষের জীবন সংগ্রামের কাহিনিকাব্যের কালজয়ী চরিত্র হয়ে উঠেছে। কাল্লু মাতব্বরের মর্মস্পর্শী সঙ্গীতালেখ্য আজও অনুরণিত হয়, আজও মায়ের মহিমা কীর্তন করে গাওয়া গান প্রতিটা মায়ের কলজে শীতল করে দেয়, অশ্রুধারা বইয়ে দেয় আবেগকম্পিত বাঙালির মন ও মনন জুড়ে।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যিনি বাঁশি বাজিয়ে ভরিয়ে দিতেন শ্রোতার হৃদয়, তিনি তাঁর ভাঙা কণ্ঠ নিয়ে দ্বিধায় থাকতেন ভক্তদের প্রতিক্রিয়ার। কিন্তু ভাঙা কণ্ঠের মাধুর্যই তাঁকে করে তুলেছে একজন ফকির আলমগীর, যিনি এক এবং অদ্বিতীয়। বন্ধুবৎসল এই ঋষিতুল্য কণ্ঠযোদ্ধার বন্ধু ফেরদৌস ওয়াহিদ যাঁকে বাংলা গানের বাঘ হিসেবে অভিহিত করেন, তিনি আসলে কণ্ঠশৌর্যে শার্দুল কিন্তু মানসচেতনায় পরিযায়ী তুলোট মেঘ। বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শূন্য দিনের আবির্ভুত প্রাণ মুক্তিযুদ্ধের সময় একুশ বছরের টগবগে যুবক হয়ে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যিক ভাষণে। করোনাহত বিশ্বমারীর দিনে সেই রক্ত মাতাল করা একাত্তরকেই যেন তিনি বরণ করে নিলেন অগস্ত্য যাত্রায়। যে-বীর যৌবনে মৃত্যুঞ্জয়ী, সে-বীরের জীবন মৃত্যুতে চিরঞ্জীব। জাতির এ শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতি লাল সালাম।

Share Now শেয়ার করুন