ফজলুল কবিরী >> প্রজাতন্ত্রের খোঁজে >> জীবনের গল্পস্বল্প >> ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা

0
501

প্রজাতন্ত্রের খোঁজে

একদিন ভোরে দেখা গেল, কোনো এক রাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রজা তাদের মুঠোর মধ্যে নিজেদের অস্তিত্বকে অদৃশ্যকরণের তাবিজ ধরে আছে। এক-একজন প্রজার অদৃশ্য হওয়া থেকে শুরু করে তারপর দিনে দিনে হারিয়ে যেতে থাকে পুরো একটা জনপদের মানুষ। কেবল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক তিনটি গোষ্ঠী, যশঃপ্রার্থী কিছু প্রজাসেবক, রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুর, জঙ্গলের জীবজন্তু ও পোকামাকড়ের নিঃসঙ্গ উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
রাষ্ট্রের দুঃখ ও ক্লেদ বাড়িয়ে দিয়ে প্রজারা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে শুরু করে। রাস্তার ধারে, গলির চিপায়, টংয়ের দোকানে কোথাও সম্ভাব্য প্রজার হদিশ নেই। রাষ্ট্রের নৈমিত্তিক প্রয়োজনের মধ্যে যা যা লাগে, তার মধ্যে প্রজার গুরুত্ব কতখানি তা কেউ বলতে পারে না। রাষ্ট্রের নানান গোষ্ঠী রাস্তার পাশের ফুটপাত থেকে শুরু করে সুসজ্জিত দোকানে টোপ হিসেবে প্রজাদের সন্তানদের জন্য অ্যালফাবেট ও রাইমসের বই বিলাতে শুরু করে এই বিশ্বাসে যে তারা পিতামাতাকে তাবিজের কবল থেকে মুক্ত করতে পারবে। যদিও কয়েকটা নেড়ি কুত্তা কিংবা নোংরা পলিথিনের ব্যাগ ফুটপাতে চোখে পড়লেও শিশুদের চোখে পড়ে না। দু-একটা পাগল উশকোখুশকো চুল আর জীর্ণ জামা-কাপড়ের আড়াল ভেদ করে অ্যালফাবেটের বইগুলোতে দার্শনিকের মতো গম্ভীর ও উদাস দৃষ্টি নিয়ে কয়েক পলক তাকালেও তাদেরকে ঠিক প্রজা হিসেবে ভাবতে পারা যায় না। তারা খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে ফুটপাতের বই থেকে ঘেঁটেঘুঁটে মণিমুক্তা সংগ্রহ করে। তারপর খুব গোপনীয়তার সাথে কিছু একটা জামার ভেতর লুকিয়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
প্রজাদের আদৌ কোনো ভবিষ্যৎ এই জনপদে, আছে কি না তার সম্ভাব্য একটা সমাধান খুঁজে বের করার নিমিত্তে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক তিনটি গোষ্ঠিই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু করে। তারা নিজেদের করণীয় সম্পর্কে মতামত পরস্পরের কাছে তুলে ধরে। কীভাবে অধিক সংখ্যক প্রজার কাছে পৌঁছুনো যায় আর তাবিজের কবল থেকে মুক্ত করা যায় তা নিয়ে কর্মপরিকল্পনা শুরু হয়। যেসব মতামত উঠে আসে তাতে কেউই সন্তুষ্ট হতে পারে না। কারণ, প্রজাদের নিয়ে প্রত্যেকেরই নিজস্ব পর্যবেক্ষণ আছে; একে অপরকে কোনোভাবে ছাড় দিতে পারে না।
বৈঠকের পর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, কোনো সমাধান আসে না। সংক্ষুব্ধ পক্ষগুলো একমত না হয়ে বেরিয়ে যায়। বিকল্প উপায় খুঁজতে সমমনাদের সাথে বৈঠক করে। তারা নিশ্চিত করে যে রাস্তার ধারে, অলিগলিতে, এমনকি স্কুল-কলেজের সীমানা দেয়ালে নিজেদের ছবি ও দলীয় প্রতীক সম্বলিত পোস্টার-লিফলেট লাগিয়ে দেবে। প্রজাদের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য এটাই সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেখা যায় শহরের অলিগলি, রাস্তাঘাট ও স্কুল-কলেজের দেয়াল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকদের পোস্টার ও লিফলেটে ঢেকে যায়। প্রথমে তারা বেশ কৌতূহল নিয়ে বিষয়টা উপভোগ করে। তাদের চোখে-মুখে এক উজ্জ্বল তৃপ্তির রেখা খেলা করে। তাদের সফল হতেই হবে। মনোবল অনেক বেড়ে যায়।
অপরদিকে অন্য পক্ষগুলো নির্লজ্জ ও বেহায়া কর্মকাণ্ডের জন্য পরস্পরকে দায়ী করে। তারা ভাবে মানুষের মুক্তি ও সংগ্রামের প্রশ্নে সুবিধাবাদীরা একেকটা বিষফোঁড়া। এদের হাতে পড়ে দেশ ও সমাজ রসাতলে যাচ্ছে। আর কোনো প্রজা রাষ্ট্রে ফিরে আসবে না। আর কোনো প্রজা সমাজে তৈরি হবে না। কিন্তু একটা যুতসই পাল্টা কর্মসূচি দিতে গিয়ে তারা হিমশিম খায়। প্রজাদের কাছাকাছি যাওয়ার প্রশ্নে বিকল্প উপায় সহজে খুঁজে পায় না। তারা ভাবে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা মুভমেন্ট খুব জরুরি ভিত্তিতে শুরু করা গেলে অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত ও অগ্রসর প্রজাদের একটা অংশকে এই তাবিজের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করা যাবে।
সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রের সমব্যথী বন্ধু-বান্ধব ও সুধীজনের সহায়তায় বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রজাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নানাবিধ যুক্তি তুলে ধরতে শুরু করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একযোগে সবাই সরব প্রচারণায় নেমে পড়ে। সমগ্র রাষ্ট্রে কীভাবে একশ্রেণির নিপীড়ক গোষ্ঠী বিস্তার লাভ করেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেয়। তাবিজ নয়, রাষ্ট্র ও প্রজাই সত্য এই বিশ্বাস তাদের অন্তরে ধারণ করার পরামর্শ দেয়।
একটা হই হই কাণ্ড, রই রই ব্যাপার শুরু হয়। একপক্ষ অপর পক্ষকে ধরাশায়ী করার নতুন ও অভিনব পদ্ধতি বের করার চেষ্টা করে। তারা নিজেদের মতো করে প্রজাবৃদ্ধির লক্ষ্যে নিত্যনতুন বিষয় ও ভাবনার খোঁজে নেমে পড়ে। একপক্ষের নিজেদের ইশতেহারে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে সুন্দর সুন্দর কথা বলে। তাদের ইশহেতারে নাপিতের যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ-বেদনা যেমন উঠে আসে, তেমনি শরণার্থীদের দেশত্যাগ ও মানবেতর জীবনও ধরা পড়ে। অন্যপক্ষের ইশতেহারে প্রজাদের প্রেম-বিরহ-রোমান্স যেমন জায়গা পায়, তেমনি যেকোনো ধরনের ধর্মবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
কেউ কেউ বেনামে আর কেউ বা প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও প্রজাদের প্রতি দায়বদ্ধতার ফিরিস্তি দিয়ে নিজেদের গুণকীর্তন করে। কেউ কেউ রাজনীতি বিজ্ঞানের দাঁড়ি-কমা ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংগ্রামের কথা প্রকাশ্যে প্রচার করে। নিজেদেরকে সমকালের কিংবদন্তি হিসেবে জাহির করে। প্রজারা তাদেরকে এখনও বুঝতে পারছে না ভেবে উষ্মা প্রকাশ করে। প্রাণিকূলের মধ্যে একমাত্র প্রজারাই এমন মূর্খ ও বোকা বলে ঘোষণা দেয়। কেউ কেউ ভবিষ্যতের প্রজাদের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক অর্জনকে একেকটা এটম বোমা হিসেবে প্রচার করে। এটম বোমার মতই প্রজাদের নতুন এক জীবনবোধের দিশা দেওয়ার কথা বলে। সুদুরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনাগুলো ভবিষ্যতের প্রজাদের স্বপ্ন পূরণে কাজ করবে। তাদের প্রচারণায় বড় বড় নেতাদের নাম উঠে আসে ক্রমাগতভাবে। তারা বিশ্বের সব নামীদামী রাষ্ট্রনেতাদের নিয়ে সমাবেশ করার মতো কর্মসূচিও হাতে নেয়। দেখা যায় সমকালীন বিশ্বের অনেক নামী নেতা ও রাষ্ট্রনায়কদের পদচারণায় প্রজাবিহীন রাষ্ট্র মুখরিত হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী পক্ষগুলোর মনে আশা জাগিয়ে কিছু কিছু প্রজা নিজেদের তাবিজগুলো গুপ্ত স্থানে লুকিয়ে রেখে কৌতূহলবশত সমাবেশে ভিড় করে। বিদেশি রাষ্ট্রীয় অতিথিদের সাথে সেলফি তুলে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে। তারপর উৎফুল্ল আয়োজকদের দিকে একপলক তাকিয়ে খুশিমনে সমাগম থেকে বেরিয়ে আসে।
অন্যপক্ষ এতসব বিষয়ে মনোযোগ না দিয়ে নিজেদের মতো করে প্রচারণার নানান কৌশল আবিষ্কার করতে থাকে। প্রজাদের ফিরিয়ে আনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। ক্যানভাসারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তারপর খুঁজেপেতে নিজেদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে ক্যানভাসারের ভূমিকায় রাস্তায় নামিয়ে দেয়। ক্যানভাসাররা মলমের কৌটা, জোঁকভর্তি বয়াম, নামিদামি ছবি সম্বলিত মালিশ ও নানাবিধ ঔষধি লতাপাতার সাথে প্রজাদের জন্য উপকারি কিছু তাবিজ-কবজও বিনামূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করে। তরুণ প্রজাদের বিনোদনের জন্য রগরগে কিছু চটি বইয়ের ব্যবস্থাও থাকে।
সেই সাথে রাষ্ট্রের একশ্রেণির মানুষ কীভাবে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে চলেছে তা মুখে মুখে বর্ণনা করে। ক্যানভাসারের বয়ানের টানটান উত্তেজনা উপভোগ করার জন্য তারা কিছু সংখ্যক প্রজার সরব উপস্থিতি কামনা করে।
এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা আচমকা কিছু উন্নতবক্ষা লাইভ-সুন্দরী ভাড়া করে। তাদের লাইভ প্রচারণা চলাকালে প্রজাদের জন্য নানারকম উপঢৌকনের ব্যবস্থা রাখার কথা জানা যায়। এই অভিনব প্রচার কৌশলে চারদিক থেকে অসংখ্য হিট পড়তে থাকে।
এরইমধ্যে রাষ্ট্রের তিন পক্ষের দ্বন্দ্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। সমঝোতার পরিবর্তে সংঘাতই হয়ে ওঠে মূলমন্ত্র।
ফুটপাতের হকার কিংবা ক্যানভাসারদের সবাইকে সংঘাতের মধ্যে তৎপরতা চালিয়ে যেতে হয়। প্রজা সৃষ্টির এইসব প্রকল্প শেষমেশ স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যক্তিগত লোভ ও স্বার্থের মধ্যে আটকে যায়।
একপক্ষ অন্য পক্ষের খারাপ পরিণতি দেখে খুশি হয়। তারা প্রচার করে এই জনপদকে এবার অশুভ শক্তি ও দুবৃর্ত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এরা ঘাপটি মেরে আছে রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে। রাষ্ট্রে একটা ভাঙনের সুর বেজে ওঠে।
এই নিয়ে শাসকদের মধ্যে বিভাজন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। তাদের মধ্যে স্পষ্টত তিনটি পক্ষ দৃশ্যমান হতে থাকে। জাতীয়তাবাদী, মানবাধিকারবাদী ও সুবিধাবাদী – এই তিন পক্ষে তারা বিভক্ত হয়ে পড়ে।
অবস্থা এমন পর্যায়ে যায় যে, পারস্পরিক মতবিরোধ সামাল দিতে গিয়ে কেউ কারও বিপদে এগিয়ে আসার ফুরসত পায় না। তাদের যাবতীয় রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থমকে যায়। একে অন্যের হীনতা ও দীনতার নানান ফিরিস্তি তুলে ধরে ।
একে একে সব আলো নিভে যেতে থাকে। ফুটপাতে দাঁড়ালে হকারের মলিন মুখ চোখে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ-সুন্দরীদের পাশে নতুন কোনো উপঢৌকনের ফাঁদ চোখে পড়ে না। ক্যানভাসারদের মলম ও মালিশের পাশে প্রজা বশীকরণের তাবিজ-কবজের দেখা মেলে না।
এই নিস্তেজ ও হতাশাগ্রস্ত সময়ে প্রজারা আগের চেয়ে আরও বেশি রাষ্ট্রবিমুখ হয়ে ওঠে। জীবনের নানান অনুসঙ্গ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে অদৃশ্যকরণ তাবিজের কবলে আরও বেশি পতিত হয়। তাদের কল্পনাপ্রতিভা থেকে রাষ্ট্র সম্পর্কিত সকল ফ্যান্টাসি ধীরে ধীরে লুপ্ত হতে থাকে।
কোনো কোনো গভীর রাতে তাদরেকে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। যাদের ঘরের বাইরে খোলা জায়গা নেই তারা ছাদে যায়। সবাই ঠিক একই সময়ে নিজেদের অজান্তে খোলা আকাশের দিকে তাকায়। তাদের মনে পড়ে একদিন এই জনপদ অসংখ্য প্রজার পদচারনায় মুখরিত ছিল। রাত যত গভীর হয়, তাদের দুঃখ ও ক্লেদ তত বাড়ে।
তারা ভাবতে থাকে এই জনপদ পুনরায় জেগে উঠবে অসংখ্য প্রজার পদচারণায়। প্রজারাই হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক। তারাই তুলে আনবে রাষ্ট্রের জীবিত কিংবা মৃতদের সংগ্রাম ও সাফল্যের খতিয়ান। শেষপর্যন্ত কোনো প্রজাশূন্য রাষ্ট্রের চরিত্র হয়ে তারা ইতিহাসের গ্লানি বয়ে বেড়াবে না।
ধীরে ধীরে তাদের পাশে অসংখ্য নতুন প্রজা ভিড় করতে শুরু করে।
গভীর রাতের গভীরতর এই যে মাজেজা প্রজাদের মধ্যে খেলা করেছে, প্রজাশূন্য রাষ্ট্রের অধিপতিরা সিংহাসনের কাছে থেকে বা দূরে থেকে তা আন্দাজ করতে পারে না।

Share Now শেয়ার করুন