ফয়েজ আহ্‌মদ | ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করো’ ও কার্টুনিস্ট ভীমরুলকে নিয়ে | জন্মবার্ষিকী | শিল্পকলা

0
60

শিল্পী কামরুল গণআন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে তেইশে মার্চ (১৯৭১) প্রথম এই কার্টুনটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দেয়ালে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তখন ক্যাপশন ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করো’ ছিল না। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর এই পূর্ণ পৃষ্ঠাব্যাপী কার্টুন মুজিবনগর সরকার এক রঙে লক্ষাধিক কপি পোস্টার হিসেবে ছাপিয়ে মুক্তাঞ্চলে বিলি করেছিলেন। এই কার্টুন সেদিন হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ ও শাণিত হাতিয়ার।

কামরুল হাসানের পক্ষে কেবলমাত্র কার্টুনিস্ট হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করা বিচিত্র ছিল না। তবে আজকের এই কামরলকে সেক্ষেত্রে আমরা অবশ্য অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতাম। কিন্তু বতিচেল্লির মহিলাদের আমরা যেমন চিহ্নিত করে দেখি, তেমনি আর কামরুলের উদ্ভাসিত রমণীদের হয়তো তখন আমরা ক্যানভাসে খুঁজে পেতাম না।

শুরুতে দৈশিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল বিমুখ। তিনি জীবনের প্রারম্ভে যে দেশটিকে নিজ ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্যে নির্বাচন করতে বাধ্য হলেন, তা ছিল সাম্প্রদায়িক এবং রাজনৈতিক নেতৃবর্গ ছিলেন অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর। প্রকৃতপক্ষে প্রথম দিকে কার্টুনের প্রতিই তাঁর প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা গিয়েছিল। এবং কার্টুনকে মূল প্রকাশ-মাধ্যম রপে গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল না। সেভাবে দেখলে ডেভিড লি বা ভারতীয় পিসিএল বা শঙ্করকে আমরা তাঁর মধ্যে পেতাম কিনা—এই বিষয়টি এখন বিবেচ্য হয়ে উঠতো। কিন্তু বর্তমানে উৎসাহী আলোচকদের কাছে তাঁর সেই কার্টুন প্রবণতার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই বিবেচনার মধ্যে আসে না। তাঁর চারকলার উৎকর্ষ নিয়েই বিচার বিবেচনা চলছে।

তিনি কার্টুন এঁকেই শিল্পজীবন শুরু করেছিলেন, তা নয়। পেশাচর্চা, ব্রতচারী, শিশু, কিশোর সংগঠনের প্রতি যৌবনে যেমন তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল, ঠিক তেমনি বক্তব্য প্রকাশের, বিশেষ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক, প্রতি তীব্র আসক্তি তাঁর ছিল বলেই তিনি কার্টুনের মাধ্যমকে অবলম্বন করেছিলেন বিদ্ধ অন্তরিন্দ্রিয়ের নিষুপ্ত বেদনা উন্মোচনের জন্যে।

দেশ বিভাগের পব থেকে কার্টুন আঁকার সময় কামরল ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন – ‘ভীমরুল’। ১৯৪৬ সালে সাপ্তাহিক ‘মিল্লাত’ পত্রিকায় তাঁর একটি কার্টুন বেরিয়েছিল ‘বহুরূপী ফজলুল হক’ নামে। এই রাজনৈতিক কার্টুনের মাধ্যমে তিনি বিশিষ্ট নেতাকে একদিকে পাকিস্তান আন্দোলন ও অখণ্ড ভারত এবং অপর দিকে জাতীয়তাবাদ-সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা-সাম্প্রদায়িকতার দ্বন্দ্বের প্রতীক রূপে উপস্থিত করেন। ফজলুল হকের গায়ে একপাশে শেরোয়ানি অপর পাশে ধুতি-চাদর। মাথার এক দিকে রুমী টুপি, অপর দিকে চৈতন্য। সমসাময়িক রাজনীতির কোনো কোনো নেতার দোদুল্যমান মত প্রকাশ এই কার্টুনটি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। আজো বতমান পরিপ্রেক্ষিতে সেই কার্টুনটি অনেকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দেশ বিভাগের সমসাময়িক কালে তিনি এই ভীমরুল নামে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘আলোড়ন’ পত্রিকাতেও নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন। ‘কমরেড’ কাগজে প্রকাশিত কামরুল হাসানের কার্টুন কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।

বাংলাদেশ অঞ্চলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম দিকে (১৯৪৮, মার্চ) নাজিমদ্দিনকে নিয়ে কোলকাতার ‘আলোড়ন’ পত্রিকায় ভীমরুল যে কার্টুন এঁকেছিলেন, তার বিরুদ্ধে তৎকালীন মুসলিম লীগ কতৃপক্ষ তীব্র সমালোচনা করতে থাকে। পত্রিকাটির সেই সংখ্যা পুব বাংলায় প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কয়েকটি কপি কোনক্রমে নোয়াখালিতে পৌঁছাতে পারে। সেখান থেকেই প্রথমে কার্টুনটির বিরুদ্ধে সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। কার্টুনের বিষয়বস্তু ছিল : স্টেজে দাঁড়িয়ে নাজিমদ্দিন সাহেব বলছেন—উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা…। জিন্না সাহেব পেছন থেকে প্রম্পট্ করছেন। এই দৃশ্যটা শাসকদের কাছে সহনীয় ছিল না। জাতির পিতাকে অপমান করা হয়েছে বলে প্রচার শুরু করে দেয়।

বর্তমান জেনারেশনের কাছে কামরুল হাসান কার্টুনিস্ট হিসেবে মোটেই পরিচিত নন। চারুশিল্প আন্দোলন ও চিত্রকলার প্রধান জীবিত শিল্পী হিসেবেই তাঁকে সম্মানের সাথে প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। তাঁর অঙ্কিত চিত্রের সংখ্যা এতো বেশি যে, জয়নুল আবেদীন থেকে শুরু করে অর্ধডজন প্রধান শিল্পীর শিল্পকর্ম একত্র করলেও তাঁর চিত্রকলার সংখ্যা বোধ হয় অতিক্ৰম করা যাবে না। বিভিন্ন মাধ্যম স্কেচ, ইলাসট্রেশন, জলরঙ, তেলরঙ ইত্যাদি নিয়ে তিনি সাড়ে ৮ হাজারের উপর চিত্র এবং এঁকেছেন। সে কারণে সূচনায় যে কার্টুন আঁকতেন সে কথা সবার ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক।

বাংলাদেশে কার্টুনিস্টের অভাব প্রকট কেন? এই কথার উত্তরে তিনি বলেন : তবে আমি যে অবস্থায় কার্টুন আঁকা ছেড়ে দিয়েছি, সে অবস্থার যে বিশেষ উন্নতি হয়েছে, তা নয়। রাজনৈতিক -সামাজিক অবস্থার একটা স্থিতিশীলতা দরকার। আর একই সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহনশীলতা অবশ্যই থাকতে হবে। কার্টুন সমাজগঠনে ও রাষ্ট্রনীতিকে সার্থকভাবে প্রয়োগের ব্যাপারে সহায়তা করতে পারে। অচেতন রাজনীতিকগণ একে ঠাট্টা হিসেবে গণ্য করেন বলেই সহ্য করতে পারেন না। তদুপরি একজন শিল্পী এদেশে কেবলমাত্র কার্টুন এঁকে অর্থনৈতিক দিক থেকে বেঁচে থাকতে পারেন না। এ সমস্ত কারণেই আমাদের দেশে প্রকৃত ও একনিষ্ঠ কার্টুনিস্ট ক’জন আর টিকে থাকতে পারছেন।

তিনি রনবী ও এনায়েতের নাম উল্লেখ করে বলেন, এদের সব কথা কি প্রকাশ পায়? তোমরা কার্টুনিস্টদের শিল্পকর্মের মর্যাদা কোন দষ্টিকোণ থেকে দিয়ে থাক এবং এই শিল্পের আর্থিক মূল্যই বা কতো?

তিনি এ সমস্ত প্রশ্নের মাধ্যমে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর লুক্কায়িত রয়েছে, তাকেই স্বীকার করে নিতে হয়।

মূর্ত বা বিমূর্ত চিত্রকলা ও বিচিত্র রঙের জগতে তিনি বর্তমানে আবদ্ধ হয়ে আছেন। সাধারণ মানুষের শ্রম, জীবন ও জীবিকা তাঁর তুলি-কলমের প্রধান উপাদান। তবুও যাঁরা তাঁর ব্যক্তিগত স্টুডিওতে আড্ডা দেন, তাঁরা জানেন যে কামরুলের অনেক স্কেচে ও ব্রাশে আঁকা চিত্ৰই কার্টুনের বিষয়বস্তু বা কার্টুন। এ যাবৎ তিনি বহু সংখ্যক শিশু-কিশোর পুস্তক ও পত্রিকায় ছবি এঁকেছেন। এ সমস্ত চিত্রেও অনেক ক্ষেত্রে কার্টুনের অভিব্যাক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কার্টুন আঁকার হাত ও মানসিক দিকটা এখনো সিরিয়াস চিত্রকলার আবর্তে সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যায়নি। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে কামরুলের মধ্যে ভীমরুলকে দেখতে পাওয়া যায়।

কার্টুন আঁকা বন্ধ করে দিয়েছেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি সাম্প্রতিককালে তাঁর স্টুডিওতেই এক আড্ডায় দিয়েছেন। কিছুদিন যেতেই দেখলাম, বিভিন্ন সিরিয়াসধর্মী ড্রয়িংয়ের মধ্যে কার্টুনের আদল এসে যেতে লাগল। আরো উপলব্ধি করলাম যে, কার্টুনের ছকে বাঁধা গণ্ডী থেকে না বেরুলে প্রকাশভঙ্গির ব্যাপ্তি ও বিস্তার ব্যাহত হয়। সেজন্যে আমি মনে করি, কার্টুনিস্টকে কার্টুনই আঁকতে।

হবে—সিরিয়াস বিষয়ের ব্যাপারেও তাই।

একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন : এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই। অন্য কোনো বাধা ছিল কি? তিনি উত্তর দেন : কাকে নিয়ে আঁকব? কারো চরিত্র প্রকাশ করলে অথবা সরকারের সমালোচনা ব্যক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সহনশীলতা প্রদর্শন করেন না – অপব্যাখ্যা শুরু হয়। তা ছাড়া কার্টুন প্রকাশের জন্যে ন্যায়নিষ্ঠ-নির্ভয় পত্রিকারও প্রয়োজন। কার্টুন একটি বলিষ্ঠ মাধ্যম। তিন ঘণ্টাব্যাপী রাজনৈতিক বক্তব্য লিখেও যেখানে প্রত্যাশিত ফললাভ করা যায় না, সে ক্ষেত্রে একটি কার্টুনই যথেষ্ট।

জনসাধারণত শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলা, এমনকি পীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলার মধ্যেই কার্টুনের বৈশিষ্ট্য নিহিত। দেশপ্রেমমূলক কার্টুনই কেবল এই বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করতে সক্ষম।

শিপীর এই স্পষ্ট বক্তব্যের ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করার কোনো অবকাশ ছিল না। এক্ষেত্রে তাঁর তিনটে বিশেষ কার্টুনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ২৫শে মার্চের পরে স্বাধীনতার মন্ত্রে দিক্ষিত বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ যখন মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত, তখন মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত ঢাকার ‘পিপল’ পত্রিকায় ভীমরুলের একটি কার্টুন মুদ্রিত হয় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে নিয়ে – বাঙালির মাথার খুলির উপর রক্তপায়ী ইয়াহিয়ার করাল মূর্তি উপবিষ্ট। দেশের অভ্যন্তরে গোপনে পত্রিকার এই ইস্যুটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। শিল্পীর রাজনৈতিক দায়বোধ থেকেই তিনি এই আলোচিত কার্টুনটি এঁকেছিলেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর তাঁর কার্টুন অংকনের প্রতি আকর্ষণ প্রায় নেই বললেই চলে; অন্তত পত্রিকায় প্রকাশ করার ব্যাপারে তিনি উৎসাহী নন। কিন্তু তবুও কয়েক বছর পরে ‘সাঁকো’ নামক একটি সাময়িকীতে প্রয়াত কবি আবদুল গণি হাজারীর সেই বিখ্যাত কবিতা ‘কতিপয় আমলার স্ত্ৰী’র কার্টুনধর্মী চিত্র অংকন করেছিলেন। আবার তাঁকে স্যাটায়ার আকর্ষণ করে – ক্ষণকালের জন্যে ভীমরুলকে দেখতে পাই।

আমরা তাঁর সবচাইতে গুরত্বপূর্ণ এবং সমগ্র দেশবাসীকে মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণাদানকারী রাজনৈতিক কার্টুনটির কথা ভুলতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধের সাথেই যেন তাঁর ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করো’ কার্টুনটি সম্পৃক্ত হয়ে আছে। হত্যাযজ্ঞের উদ্বোধক, গণহত্যার প্রধান ইয়াহিয়ার ভয়াবহ মুখমণ্ডল নিয়ে অংকিত কার্টুনটির জন্ম হয়েছিল ঢাকাতেই। শিল্পী কামরুল গণ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে তেইশে মার্চ (১৯৭১) প্রথম এই কার্টুনটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দেয়ালে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। একই কার্টুনের দশটি কপি নিজ হাতে এঁকে শহীদ মিনার অঞ্চলে টাঙিয়ে দেন। (সেদিন দেশের সর্বত্র স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।) তখন ক্যাপশন ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করো’ ছিল না। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মে মাসে শিল্পী মুজিবনগরের ক্যাপশনসহ প্রথমে দু-রঙে এই কার্টুনটি চূড়ান্তভাবে অংকন করেন। তাঁর এই পূর্ণ পৃষ্ঠাব্যাপী কার্টুন মুজিবনগর সরকার এক রঙে লক্ষাধিক কপি পোস্টার হিসেবে ছাপিয়ে মুক্তাঞ্চলে বিলি করেছিলেন। এই কার্টুন সেদিন হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ ও শাণিত হাতিয়ার। কার্টুনিস্ট ভীমরুলের জাতির জন্যে এই ছিল সবশ্রেষ্ঠ অবদান।

রচনাকাল : সেপ্টেম্বর ১৯৮৫

Share Now শেয়ার করুন